হোম / আহতদের তালিকা / রেজাউল করিম
রেজাউল করিম

রেজাউল করিম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

রেজাউল করিম ২০০৪ সালের ৮ মার্চ মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী ইউনিয়নের বাজার হোসেন্দী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন চিন্তাশীল, সমাজ সচেতন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী মনোভাবের অধিকারী।
পারিবারিক জীবন
রেজাউল করিমের পরিবার ছিল এক সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি। তাঁর পিতা জাহাঙ্গীর মিয়া একজন পা-হীন অটোচালক, যিনি শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদের মানুষ করেছেন। মা রুপালী আক্তার একজন মমতাময়ী ও নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত নারী, যিনি পরিবারের ভিত্ গড়ে তুলেছেন ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। রেজাউলের স্ত্রী এবং একটি ছোট কন্যা সন্তান রয়েছে, নাম আয়েশা ছিদ্দিকা, বয়স মাত্র ৯ মাস। তাঁর একমাত্র ভাই সওয়াদ করিম বর্তমানে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কর্মজীবন তার কর্মজীবন ছিল সংগ্রামের ছায়ায় গড়া। তিনি মূলত একজন শিক্ষার্থী ছিলেন, কিন্তু সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁকে খুব অল্প বয়সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে তোলে। অধ্যয়নরত অবস্থাতেই তিনি বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম এবং ছাত্র-রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলে ধরা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। রেজাউল করিম জীবিকার জন্য কোনো স্থায়ী চাকরি গ্রহণ না করলেও তিনি বিভিন্ন সময়ে
খণ্ডকালীন কাজের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের খরচ বহনের চেষ্টা করতেন। তাঁর কর্মজীবনের মূল লক্ষ্য ছিল নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির চেয়ে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণ সাধন। অর্থ, সুবিধা কিংবা স্বার্থ নয়-ন্যায়, অধিকার এবং দেশের মানুষের স্বাধীন ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নই ছিল তাঁর জীবনের প্রকৃত কর্মপথ। সংগ্রামী জীবন রেজাউল করিম ছোটবেলা থেকেই সমাজের বৈষম্য, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে গভীর প্রতিবাদী মনোভাব পোষণ করতেন। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে আন্দোলনের পথে টেনে নেয়। তিনি সক্রিয়ভাবে ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং এই আন্দোলনে গুরুতরভাবে আহত হন, যার ফলে তাঁর শিক্ষাজীবন থমকে যায়। কিন্তু থেমে যায়নি তাঁর সংগ্রাম। তিনি ভয়, নিপীড়ন ও প্রাণহানির আশঙ্কাকে উপেক্ষা করে রাজপথে দাঁড়িয়েছেন ন্যায়ের পক্ষে। রেজাউলের এই সাহস, আত্মত্যাগ ও দৃঢ়চেতা মনোভাব শুধু তাঁর প্রজন্ম নয় বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ রেজাউল করিম একজন কোরআনের হাফেজ এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। তিনি দাওরায়ে হাদীস (তাকমীল) স্তরে পড়াশোনা করছিলেন, সেই সঙ্গে পরিবারিক দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর পিতা,জাহাঙ্গীর মিয়া, ছোটবেলায় একটি দুর্ঘটনায় একটি পা হারান, ফলে পরিবারের আর্থিক ভার অনেকটাই রেজাউলের উপর এসে পড়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে আয়োজিত একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণের সময় রেজাউল পুলিশের গুলিতে গুরুতরভাবে আহত হন। ঐদিনের ঐতিহাসিক সংঘর্ষে বহু আন্দোলনকারী শহীদ হন এবং অসংখ্য তরুণ-যোদ্ধা মারাত্মক আহত হন। পুলিশ সরাসরি গুলি চালালে রেজাউলের পায়ের গোড়ালিতে গুলি লাগে, যার ফলে তার পায়ের হাড় তিন টুকরো হয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পুলিশ তাকে ছাত্রলীগের হাতে তুলে দেয়। সে অবস্থায় রেজাউল প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দেন এবং সেখান থেকেই পড়ে যান ড্রেনে। আশপাশে থাকা সহযোদ্ধা ছাত্ররা ও তার বাবা এবং চাচা উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। সংবাদ পেয়ে তাঁর স্ত্রী-যার কোলে তখন মাত্র সাত মাস বয়সী শিশু কন্যা; দৌড়ে ছুটে যান হাসপাতালে। পরবর্তীতে গুরুতর অবস্থায় রেজাউল করিমকে জাতীয় পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর চিকিৎসা চলে। বর্তমানে তিনি গুরুতর শারীরিক সমস্যার কারণে কর্মক্ষম নন এবং বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। একসময় যে তরুণ দেশের স্বপ্ন দেখতেন, আজ তিনি জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণে লড়াই করছেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ ও বীরত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সাহসী অধ্যায় হয়ে থাকবে। চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা রেজাউল করিম, একজন কোরআনের হাফেজ ও দাওরায়ে হাদীস অধ্যয়নরত ছাত্র, যিনি একসময় মসজিদে তারাবির নামাজে ইমামতি করতেন; আজ গুরুতর শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। ৫ আগস্টের গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এখন পর্যন্ত তাঁর চারটি জটিল অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে, যা বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। চিকিৎসকদের মতে, রেজাউলের পায়ের হাড় তিন টুকরো হয়ে যাওয়ায় তার স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে তার পায়ে কোনো অনুভূতি নেই, ফলে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা বা দাঁড়ানো একপ্রকার অসম্ভব হয়ে উঠেছে। চলাফেরার জন্য তাকে ক্রাচের উপর নির্ভর করতে হয়। চিকিৎসকরা আরও জানিয়েছেন, তার পূর্ণ সুস্থতার জন্য ভবিষ্যতে অন্তত দু’টি বড় অপারেশন প্রয়োজন। বর্তমানে রেজাউলের শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে থাকলেও, তিনি এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। নামাজ পড়ানোর মতো অবস্থাও তাঁর ফিরে আসেনি। প্রতিনিয়ত তাঁকে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে চিকিৎসা ফলোআপের জন্য। এই দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা শুধু তাঁর শারীরিক কষ্ট নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ ও মানসিক যন্ত্রণার বোঝাও বহন করে চলেছে তার পরিবার। তবুও রেজাউলের অদম্য মনোবল ও ধৈর্য তাকে লড়াই করে টিকে থাকার শক্তি জোগাচ্ছে। বর্তমান অবস্থা বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তিনি এখনও স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারেন না এবং নামাজ পড়ানোর মতো অবস্থায় ফিরে যেতে পারেননি। তার চিকিৎসা এখনো চলমান এবং প্রতি সপ্তাহে তাকে হাসপাতালে ফলোআপে যেতে হচ্ছে। ২টা সার্জারি বাকি আছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
এক নজরে রেজাউল করিম
নাম : রেজাউল করিম
জন্ম তারিখ : ০৮/০৩/২০০৪
জন্মস্থান : গজারিয়া, মুন্সিগঞ্জ
পেশা : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা : মুন্সিগঞ্জ
স্ত্রীর নাম : আখি আক্তার
পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ু২০
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: বাজার হোসেন্দী, ইউনিয়ন: হোসেন্দী, থানা: গজারিয়া, জেলা: মুন্সিগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা : ৮নং, জাপানি বাজার, কদমতলী, ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : জাহাঙ্গীর মিয়া
পিতার পেশা ও বয়স : অটো চালক, ৪৫
মায়ের নাম : রুপালি আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৮
মাসিক আয় : ১৫০০০
আয়ের উৎস : ড্রাইভিং
বাড়ির বিবরণ : ভাড়া বাড়ি
সম্পদের পরিমাণ : ৬ শতক
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
সন্তানদের নাম
১. আয়েশা ছিদ্দিকা, বয়স: ৯ মাস, সম্পক: মেয়ে
ভাই-বোনদের নাম
১. সওয়াদ করিম, বয়স: ১৬, পেশা: ছাত্র, শ্রেণী: ৮ম, সম্পর্ক: ভাই পুর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: শিক্ষার্থী
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের পাশে
তারিখ ও সময় : ৫ আগস্ট, ২০২৪ সকাল ১১.০০ মিনিটের দিকে আক্রমণকারী : পুলিশের গুলিতে আঘাতের ধরন: পুলিশ সরাসরি গুলি চালালে রেজাউলের পায়ের গোড়ালিতে গুলি লাগে, যার ফলে তার পায়ের হাড় তিন টুকরো হয়ে যায় চিকিৎসা : ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍