মো: রোমান হোসেন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : সবজি বিক্রেতা
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
পরিচিতি ঢাকার কদমতলী থানার দনিয়ার জনতারবাগ নামক সময়ের নিভৃত এক পাড়ায় ১৯৮৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মো: রোমান হোসেন। পিতা মৃত আবুল হোসেন ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক, যিনি সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাঠে হাল ধরা হাতে জীবনের কঠিন বাস্তবতা মোকাবিলা করতেন। মা আয়েশা বেগম এক নিভৃতচারী মমতাময়ী নারী, যিনি সংসারের প্রতিটি কোণায় দায়িত্ব, নৈতিকতা আর ভালোবাসার ছায়া ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমন এক অনাড়ম্বর পরিবেশেই জন্ম নিয়েছিল এক দুর্দমনীয় চেতনার বীজ।
পারিবারিক জীবন মো: রোমান হোসেনের সংসার জীবন ছিল শান্ত ও সাদামাটা, কিন্তু গভীর ভালোবাসা আর আদর্শে গাঁথা। তাঁর স্ত্রী, সন্তানদের প্রতি যেমন দায়িত্বশীল ছিলেন, তেমনি তাঁদের মধ্যেও গড়ে তুলেছেন নৈতিকতা ও মানবিকতা। তাঁর একমাত্র কন্যা সুরাইয়া হোসেন বর্তমানে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত, পুত্র আরাফাত হোসেন প্রথম শ্রেণির ছাত্র। এ দুই সন্তান তাঁর জীবনের স্বপ্ন, ভবিষ্যতের আশ্রয়। সংসারের সীমিত পরিসরেও তিনি আদর্শের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, যা একজন পিতার নিঃশব্দ বিপ্লব। কর্মজীবন সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে মিশে থাকা রুহুল আমিন কখনো বিলাসিতার পথে হাঁটেননি। জীবিকার প্রয়োজনে যেসব কাজই করেছেন, তাতে থেকেছে সততা, নিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ। জীবনের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি ব্যস্ততায় তিনি ছিলেন সংবেদনশীল, দূরদর্শী এবং সমাজমনস্ক। কর্মক্ষেত্র ছিল তাঁর নীরব যুদ্ধের ময়দান, যেখানে তিনি ন্যায় ও আদর্শকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে গেছেন। সংগ্রামী-বিপ্লবী জীবন মো: রুহুল আমিনের জীবন শুধু একটি নাম নয়; একটি আদর্শ, এক অবিচল সংগ্রামের প্রতীক। তিনি সমাজের বৈষম্য, দুর্নীতি ও
ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন অকুণ্ঠ সাহসে। ভয়, রক্ত, নির্যাতন কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ নিয়ে, বুক চিতিয়ে। তাঁর আত্মত্যাগ আজ ইতিহাসের পাতায় এক উজ্জ্বল আলো, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলবে স্বাধীনতা ও সাহসের পথে। তাঁর সংগ্রামী জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল প্রতিরোধের দীপ্ত এক শপথ। সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ আমি মো: রোমান হোসেন, রায়েরবাগ এলাকার একজন সাধারণ সবজি বিক্রেতা। তবে শুধু পেটের দায়ে বাজারে দাঁড়াইনি-এই দেশের মাটি, মানুষ আর স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে আমি ছাত্র-জনতার ন্যায্য আন্দোলনের একজন ক্ষুদ্র সৈনিক হিসেবেও রাজপথে ছিলাম। ৫ আগস্ট সকালে রায়েরবাগ থেকে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে যাত্রাবাড়ীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের কণ্ঠে ছিল শুধুই স্বাধীনতার দাবি, অধিকার ও ভোটের মর্যাদা ফেরানোর আহ্বান। কিন্তু যাত্রাবাড়ী এলাকায় পৌঁছেই দেখি, রাজপথে দাঁড়িয়ে আছে হিংস্র, অমানবিক এক শক্তি। পুলিশ বাহিনী, যারা রাষ্ট্রের জনগণের রক্ষক হওয়ার কথা, তারাই আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হঠাৎ করেই শুরু হয় লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল আর গুলিবর্ষণ। চারপাশে হাহাকার, চিৎকার, কারও চোখে পানি, কারও শরীরে রক্ত। আমি তখন মিছিলের সামনের সারিতে ছিলাম। সকাল আনুমানিক ১১:৩০ মিনিটে হঠাৎ একটি গুলি আমার পায়ের গোড়ালিতে এসে লাগে; এক পাশ দিয়ে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, ব্যথায় কাতরাচ্ছিলাম, কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। রক্তে ভিজে থাকা শরীরটা নিয়েও আমাকে ছাড়েনি তারা। পুলিশের একজন আমার গুলিবিদ্ধ শরীরের উপর দাঁড়িয়ে রাইফেলের বাট দিয়ে আমাকে উপর্যুপরি মারতে থাকে- ওদের নিষ্ঠুর আঘাতে মাথা, পাঁজর ও পিঠ সর্বত্রই থেতলে যায়। ওরা যেন মানুষ নয়, ওরা যেন অন্ধ হিংসার প্রতিচ্ছবি। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। এরপর যা শুনেছি,তা সহযোদ্ধাদের মুখে; তারা আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় রয়েল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়, কিন্তু ক্ষত ছিল শুধু শরীরে নয়; গভীর এক ক্ষত ছিল আত্মা ও হৃদয়ে। এই আমি একজন শ্রমজীবী মানুষ যার হাতে ছিল শুধু সবজি আর মাথায় ছিল ন্যায়বোধ-সেই আমাকেই তারা গুলি করল, পিটিয়ে রক্তাক্ত করল, কারণ আমি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ন্যায়ের কণ্ঠ তুলেছিলাম। চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা পুলিশের গুলিতে যখন আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি,তখন আমার শরীর থেকে থেমে থেমে গড়িয়ে পড়ছিল রক্ত। আমি আর জ্ঞান রাখতে পারিনি, কিন্তু স্থানীয় জনগণ, এই দেশের সাধারণ মানুষ, সে মুহূর্তে আমার কাছে ফেরেশতার মতো এগিয়ে আসে। আমাকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় যাত্রাবড়ি রয়েল হাসপাতালে সেখানে অবস্থা খারাপ হওয়াতে রাখেনি। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে আমাকে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসকরা আমার পায়ের গুলিবিদ্ধ অংশে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। গুলি আমার গোড়ালিতে বিদ্ধ হয়ে এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। যার ফলে পায়ের হাড় মারাত্মকভাবে ভেঙে গিয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে সেখানে আমার পায়ে প্লাস্টার করা হয় এবং রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়। কয়েকদিনের পর্যবেক্ষণশেষে সাময়িক স্থিতি ফিরলে আমাকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ব্যথা কমছিল না। বরং হেঁটে চলা তো দূরের কথা, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নড়াও ছিল যন্ত্রণাদায়ক। চিকিৎসকদের পরামর্শে এরপর আমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ইসলামিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে পাঁচ দিন ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন চিকিৎসকরা। পরবর্তীতে আমার পায়ে দু’টি জটিল অপারেশন করা হয় এবং পায়ের ভেঙে যাওয়া হাড় জোড়া দিতে ধাতব রড বসানো হয়। এই অপারেশনের পর আজও আমি পুরোপুরি সোজা হয়ে হাঁটতে পারি না। প্রতিটি পা ফেলা যেন একেকটা যন্ত্রণার পাহাড় টপকানো। শুধু হাড় নয়, গুলির ক্ষত এখনও রয়ে গেছে আমার শরীরে। প্রতিদিন অনুভব করি সেই ফ্যাসিবাদী বর্বরতার রেশ। চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পুর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি করতেন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা। বর্তমান অবস্থা: তিনি ভারী কেনো কাজ করতে পারেন না। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে হলে নিয়মিত ওষুধ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম অত্যন্ত জরুরি। অর্থনৈতিক অবস্থা : মো: রোমান হোসেনের পরিবারে তার বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, ছেলে, এবং একটি বোন রয়েছেন যে ৮ম শ্রেণিতে পড়েন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তার আয়েই পুরো পরিবারের খরচ চলতো। বর্তমানে তার অসুস্থতা ও ফলে পরিবারটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে।
এক নজরে মো: রোমান হোসেন
নাম : মো: রোমান হোসেন
জন্ম তারিখ : ৩১-১২-১৯৮৮
জন্মস্থান : কদমতলী, ঢাকা
পেশা : সবজি বিক্রেতা
স্ত্রীর নাম : রিনা আক্তার
স্ত্রীর পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ২৪
নিজ জেলা : ঢাকা
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: জনতারবাগ, ইউনিয়ন: দনিয়া, থানা: কদমতলী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত আবুল হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স : মৃত
মায়ের নাম : আয়েশা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৫
মাসিক আয় : ১০,০০০ টাকা
আয়ের উৎস : ব্যবসা
বাড়ির বিবরণ : ভাড়া বাসা
সম্পদের পরিমাণ : নেই
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
সন্তানদের নাম
১. সুরাইয়া হোসেন, বয়স: ১১, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৭ম, সম্পর্ক: মেয়ে ২. আরাফাত হোসেন, বয়স: ৬, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ১ম, সম্পর্ক: ছেলে
আহতের বিবরণ আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার যাত্রাবাড়ী রায়েরবাগ, শনির আখড়া এলাকায়
তারিখ ও সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১.৩০ মিনিটের দিকে আক্রমণকারী : পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্তৃক আঘাতের ধরণ : পায়ের গোড়ালিতে গুলি লেগে এক পাশ থেকে ঢুকে অন্য পাশে বের হয়ে গেছে চিকিৎসা : প্রথমে পঙ্গু হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ ইসলামিয়া হাসপাতাল থেকে
পারিবারিক জীবন মো: রোমান হোসেনের সংসার জীবন ছিল শান্ত ও সাদামাটা, কিন্তু গভীর ভালোবাসা আর আদর্শে গাঁথা। তাঁর স্ত্রী, সন্তানদের প্রতি যেমন দায়িত্বশীল ছিলেন, তেমনি তাঁদের মধ্যেও গড়ে তুলেছেন নৈতিকতা ও মানবিকতা। তাঁর একমাত্র কন্যা সুরাইয়া হোসেন বর্তমানে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত, পুত্র আরাফাত হোসেন প্রথম শ্রেণির ছাত্র। এ দুই সন্তান তাঁর জীবনের স্বপ্ন, ভবিষ্যতের আশ্রয়। সংসারের সীমিত পরিসরেও তিনি আদর্শের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, যা একজন পিতার নিঃশব্দ বিপ্লব। কর্মজীবন সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে মিশে থাকা রুহুল আমিন কখনো বিলাসিতার পথে হাঁটেননি। জীবিকার প্রয়োজনে যেসব কাজই করেছেন, তাতে থেকেছে সততা, নিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ। জীবনের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি ব্যস্ততায় তিনি ছিলেন সংবেদনশীল, দূরদর্শী এবং সমাজমনস্ক। কর্মক্ষেত্র ছিল তাঁর নীরব যুদ্ধের ময়দান, যেখানে তিনি ন্যায় ও আদর্শকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে গেছেন। সংগ্রামী-বিপ্লবী জীবন মো: রুহুল আমিনের জীবন শুধু একটি নাম নয়; একটি আদর্শ, এক অবিচল সংগ্রামের প্রতীক। তিনি সমাজের বৈষম্য, দুর্নীতি ও
ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন অকুণ্ঠ সাহসে। ভয়, রক্ত, নির্যাতন কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ নিয়ে, বুক চিতিয়ে। তাঁর আত্মত্যাগ আজ ইতিহাসের পাতায় এক উজ্জ্বল আলো, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলবে স্বাধীনতা ও সাহসের পথে। তাঁর সংগ্রামী জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল প্রতিরোধের দীপ্ত এক শপথ। সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ আমি মো: রোমান হোসেন, রায়েরবাগ এলাকার একজন সাধারণ সবজি বিক্রেতা। তবে শুধু পেটের দায়ে বাজারে দাঁড়াইনি-এই দেশের মাটি, মানুষ আর স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে আমি ছাত্র-জনতার ন্যায্য আন্দোলনের একজন ক্ষুদ্র সৈনিক হিসেবেও রাজপথে ছিলাম। ৫ আগস্ট সকালে রায়েরবাগ থেকে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে যাত্রাবাড়ীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের কণ্ঠে ছিল শুধুই স্বাধীনতার দাবি, অধিকার ও ভোটের মর্যাদা ফেরানোর আহ্বান। কিন্তু যাত্রাবাড়ী এলাকায় পৌঁছেই দেখি, রাজপথে দাঁড়িয়ে আছে হিংস্র, অমানবিক এক শক্তি। পুলিশ বাহিনী, যারা রাষ্ট্রের জনগণের রক্ষক হওয়ার কথা, তারাই আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হঠাৎ করেই শুরু হয় লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল আর গুলিবর্ষণ। চারপাশে হাহাকার, চিৎকার, কারও চোখে পানি, কারও শরীরে রক্ত। আমি তখন মিছিলের সামনের সারিতে ছিলাম। সকাল আনুমানিক ১১:৩০ মিনিটে হঠাৎ একটি গুলি আমার পায়ের গোড়ালিতে এসে লাগে; এক পাশ দিয়ে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, ব্যথায় কাতরাচ্ছিলাম, কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। রক্তে ভিজে থাকা শরীরটা নিয়েও আমাকে ছাড়েনি তারা। পুলিশের একজন আমার গুলিবিদ্ধ শরীরের উপর দাঁড়িয়ে রাইফেলের বাট দিয়ে আমাকে উপর্যুপরি মারতে থাকে- ওদের নিষ্ঠুর আঘাতে মাথা, পাঁজর ও পিঠ সর্বত্রই থেতলে যায়। ওরা যেন মানুষ নয়, ওরা যেন অন্ধ হিংসার প্রতিচ্ছবি। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। এরপর যা শুনেছি,তা সহযোদ্ধাদের মুখে; তারা আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় রয়েল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়, কিন্তু ক্ষত ছিল শুধু শরীরে নয়; গভীর এক ক্ষত ছিল আত্মা ও হৃদয়ে। এই আমি একজন শ্রমজীবী মানুষ যার হাতে ছিল শুধু সবজি আর মাথায় ছিল ন্যায়বোধ-সেই আমাকেই তারা গুলি করল, পিটিয়ে রক্তাক্ত করল, কারণ আমি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ন্যায়ের কণ্ঠ তুলেছিলাম। চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা পুলিশের গুলিতে যখন আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি,তখন আমার শরীর থেকে থেমে থেমে গড়িয়ে পড়ছিল রক্ত। আমি আর জ্ঞান রাখতে পারিনি, কিন্তু স্থানীয় জনগণ, এই দেশের সাধারণ মানুষ, সে মুহূর্তে আমার কাছে ফেরেশতার মতো এগিয়ে আসে। আমাকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় যাত্রাবড়ি রয়েল হাসপাতালে সেখানে অবস্থা খারাপ হওয়াতে রাখেনি। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে আমাকে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসকরা আমার পায়ের গুলিবিদ্ধ অংশে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। গুলি আমার গোড়ালিতে বিদ্ধ হয়ে এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। যার ফলে পায়ের হাড় মারাত্মকভাবে ভেঙে গিয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে সেখানে আমার পায়ে প্লাস্টার করা হয় এবং রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়। কয়েকদিনের পর্যবেক্ষণশেষে সাময়িক স্থিতি ফিরলে আমাকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ব্যথা কমছিল না। বরং হেঁটে চলা তো দূরের কথা, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নড়াও ছিল যন্ত্রণাদায়ক। চিকিৎসকদের পরামর্শে এরপর আমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ইসলামিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে পাঁচ দিন ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন চিকিৎসকরা। পরবর্তীতে আমার পায়ে দু’টি জটিল অপারেশন করা হয় এবং পায়ের ভেঙে যাওয়া হাড় জোড়া দিতে ধাতব রড বসানো হয়। এই অপারেশনের পর আজও আমি পুরোপুরি সোজা হয়ে হাঁটতে পারি না। প্রতিটি পা ফেলা যেন একেকটা যন্ত্রণার পাহাড় টপকানো। শুধু হাড় নয়, গুলির ক্ষত এখনও রয়ে গেছে আমার শরীরে। প্রতিদিন অনুভব করি সেই ফ্যাসিবাদী বর্বরতার রেশ। চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পুর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি করতেন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা। বর্তমান অবস্থা: তিনি ভারী কেনো কাজ করতে পারেন না। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে হলে নিয়মিত ওষুধ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম অত্যন্ত জরুরি। অর্থনৈতিক অবস্থা : মো: রোমান হোসেনের পরিবারে তার বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, ছেলে, এবং একটি বোন রয়েছেন যে ৮ম শ্রেণিতে পড়েন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তার আয়েই পুরো পরিবারের খরচ চলতো। বর্তমানে তার অসুস্থতা ও ফলে পরিবারটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে।
এক নজরে মো: রোমান হোসেন
নাম : মো: রোমান হোসেন
জন্ম তারিখ : ৩১-১২-১৯৮৮
জন্মস্থান : কদমতলী, ঢাকা
পেশা : সবজি বিক্রেতা
স্ত্রীর নাম : রিনা আক্তার
স্ত্রীর পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ২৪
নিজ জেলা : ঢাকা
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: জনতারবাগ, ইউনিয়ন: দনিয়া, থানা: কদমতলী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত আবুল হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স : মৃত
মায়ের নাম : আয়েশা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৫
মাসিক আয় : ১০,০০০ টাকা
আয়ের উৎস : ব্যবসা
বাড়ির বিবরণ : ভাড়া বাসা
সম্পদের পরিমাণ : নেই
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
সন্তানদের নাম
১. সুরাইয়া হোসেন, বয়স: ১১, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৭ম, সম্পর্ক: মেয়ে ২. আরাফাত হোসেন, বয়স: ৬, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ১ম, সম্পর্ক: ছেলে
আহতের বিবরণ আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার যাত্রাবাড়ী রায়েরবাগ, শনির আখড়া এলাকায়
তারিখ ও সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১.৩০ মিনিটের দিকে আক্রমণকারী : পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্তৃক আঘাতের ধরণ : পায়ের গোড়ালিতে গুলি লেগে এক পাশ থেকে ঢুকে অন্য পাশে বের হয়ে গেছে চিকিৎসা : প্রথমে পঙ্গু হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ ইসলামিয়া হাসপাতাল থেকে
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍