মো: সোহেল উদ্দিন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : চায়ের দোকানদার
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
মো: সোহেল উদ্দিন ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি, ঢাকা জেলার শ্যামপুর থানার মেরাজনগরের রায়েরবাগ এলাকায় এক প্রান্তিক ও শ্রমজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এই অঞ্চলের ধুলোমাখা গলি আর জীবনের কঠোর বাস্তবতা তাকে শৈশব থেকেই গড়ে তোলে সংবেদনশীল ও সংগ্রামী। তাঁর পিতা, মৃত আব্দুল মজিদ একজন পরিশ্রমী দিনমজুর ছিলেন, যিনি জীবনের প্রতিটি ঘামে সন্তানদের জন্য আদর্শের বাতিঘর জ্বালিয়ে গেছেন। আর মা, ফাতেমা বেগম এক প্রজ্ঞাবান ও মমতাময়ী নারী, যিনি সন্তানদের হৃদয়ে বপন করেছিলেন দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং আত্মবিশ্বাসের অমূল্য বীজ।
পারিবারিক জীবন সোহেল মিয়া একজন পরিবারের অভিভাবক, যার জীবনচিত্রে ভালোবাসা ও সংগ্রামের গভীর ছাপ স্পষ্ট। তাঁর সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ে শারমিন আক্তার (২৩) বিবাহিত, মেঝো মেয়ে শিফা আক্তার (২০) তিনিও বিবাহিত এবং কনিষ্ঠ পুত্র (১৬) একজন শ্রমিক, গ্রিলের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। অভাব-অনটনের মধ্যেও পরিবারে যে আত্মিক বন্ধন ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠেছে,তা সোহেল মিয়ার সুনাগরিক ও দায়িত্বশীল পিতার ভূমিকাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। কর্ম জীবন ছোটবেলা থেকেই সোহেল মিয়া সমাজের বৈষম্য, অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদী মনোভাব পোষণ করতেন। তিনি কেবল নিজের জীবনের প্রয়োজনে নয়, বরং সামগ্রিক মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে সমাজের অসংগতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্ধকার কোণে আলো ছড়িয়ে দেয়ার মানসিকতা ছিল তার অন্তরে সদা জাগ্রত। তিনি কখনো সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি; বরং দৃঢ়কণ্ঠে ন্যায়ের পক্ষে নিজের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন। প্রবীণ সংগ্রামী জীবন জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় শুরু হয় যখন মো: সোহেল উদ্দিন ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দেশের রাজপথে নেমে আসেন। সে সময় বয়স তাঁকে পেছনে টানেনি,বরং অভিজ্ঞতা ও আদর্শিক দৃঢ়তা তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে নির্ভয়ে। ভয়, নিপীড়ন, রক্ত-কোনো কিছুকেই তিনি কভু পরোয়া করেননি। তার সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ শুধু তাঁর সময়কেই নয়, আগামী প্রজন্মকেও পথ দেখাবে। প্রবীণ এই সংগ্রামী যোদ্ধার জীবন-আখ্যান বাঙালির ইতিহাসে সাহস ও প্রেরণার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ জুলাই আন্দোলনের এক প্রবীণ বীরের কাছে শুনুন তার নিজস্ব জবানীতে। সেদিন মাগরিবের নামাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। প্রতিদিনের মতো শান্ত-নিরিবিলিভাবেই নামাজ পড়ে বাসার নিচে দাঁড়িয়েছিলাম। চারপাশে কিছু লোকজন জড়ো ছিল, কেউ রাস্তা পার হচ্ছিল, কেউ গল্প করছিল; যেন প্রতিদিনকার সাধারণ বিকেলের মতোই। হঠাৎ, যেন বজ্রাঘাত! কোনো রকম ইশারা বা হুঁশিয়ারি ছাড়াই গুলির শব্দ ছুটে এলো। পুলিশ আমাদের দিকে তাক করেই গুলি চালায়। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কোনো মানুষ নই-তারা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু সেনা দমন করছে! সেই গুলির একটি আমার ডান পায়ে আঘাত করে; হাঁটুর নিচে, গোড়ালির ওপর। গুলিটা ভেদ করে দু’পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই আমি পড়ে যাই রক্তে ভেসে, চারপাশ ঘোলাটে হয়ে আসে, শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। তখন আমি শুধু শুনতে পাই মানুষের চিৎকার, আর অনুভব করি, এক নিষ্ঠুর সরকারের বন্দুকের নল আমার হাড় চুরমার করে দিয়েছে। স্থানীয় লোকজন আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে ছুটে যায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও যেন মানবতা অনুপস্থিত ছিল। অবশেষে আমাকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। আমার পায়ের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছে। চিকিৎসক বলেছে, হয়তো আর কখনো আগের মতো হাঁটতে পারব না।
জানিনা, কী অপরাধ ছিল আমার? নামাজ পড়া? সাধারণ মানুষ হওয়া? নাকি এই দেশের নাগরিক হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা? আওয়ামী সরকারের এই বর্বরতা প্রমাণ করে দিয়েছে; তারা মানুষ নয়, তারা এক ফ্যাসিস্ট শক্তি, যারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গুলি চালাতেও দ্বিধা করেনি। আমি আজও সেই গুলির ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছি। কিন্তু ভেতরের যে ক্ষত-মানবতা, অধিকার আর নিরাপত্তাহীনতার সে যন্ত্রণা; তা কোনো অস্ত্রোপচারেও সেরে উঠবে না। চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা পুলিশের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর মো: সোহেল উদ্দিনকে দ্রুত স্থানীয় এক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তার রক্তাক্ত শরীরে প্রথম প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার গুরুত্ব বুঝে কিছু সময় পরই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয় তার জীবনের প্রথম অস্ত্রোপচার। গুলিটি তার হাঁটুর নিচে, পায়ের গোড়ালির ওপরে আঘাত করে এবং অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়,ফলে তার পায়ের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। চিকিৎসকরা জানান, আঘাতটি ছিল গভীর ও জটিল, যা তার স্নায়ুতন্ত্র এবং হাড়ের গঠনে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছে। অপারেশনের পরও তিনি আর আগের মতো স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারছেন না। তার পায়ে এখন কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। প্রতিদিনের জীবন যাপনে তাকে ভরসা করতে হচ্ছে পায়ের ঠেঙ্গি (ক্রাচ)-এর উপর। একদিন যে পা তাকে জীবিকার জন্য রাজপথে দাঁড় করিয়েছিল, আজ সেটিই তার চলাচলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। বর্তমানে মো: সোহেল উদ্দিন রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তার দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, থেরাপি ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চলছে। তবে উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থ, যা একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে একা বহন করা দুঃসাধ্য। তাঁর এই দুর্বিষহ অবস্থাই প্রমাণ করে, কী ভয়াবহ ছিল সেই বর্বর গুলির মুহূর্ত- যা একজন কর্মক্ষম মানুষকে এক লহমায় অসহায় করে দিয়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং। পুর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: চায়ের দোকান কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
আঘাতের ধরণ: গুলির একটি তার হাঁটুর নিচে, পায়ের গোড়ালির ওপরে আঘাত করে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, ফলে তার পায়ের হাড় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়। বর্তমান অবস্থা : বর্তমানে তার পায়ে কোনো শক্তি নেই। তাকে চলাফেরার জন্য পায়ের ঠেঙ্গি (ক্রাচ) ব্যবহার করতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক অবস্থা : বর্তমানে তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। মাঝে মাঝে স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে বসেন। সংসারের খরচ চালাতে তিনি তার গ্রিলমিস্ত্রি ছেলের উপর নির্ভরশীল। তার দুই মেয়ে বিবাহিত।
এক নজরে মো: সোহেল উদ্দিন
নাম : মো: সোহেল উদ্দিন
জন্ম তারিখ : ০১-০১-১৯৭৮
জন্মস্থান : শ্যামপুর,ঢাকা
পেশা : চায়ের দোকানদার
স্ত্রীর নাম : ডলি আক্তার
স্ত্রীর পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৮
নিজ জেলা : ঢাকা
পেশাগত পরিচয় : চায়ের দোকান
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: রায়েরবাগ, ইউনিয়ন: মেরাজনগর, থানা: শ্যামপুর, জেলা: ঢাকা
বর্তমান ঠিকানা : রায়েরবাগ, মদিনাবাগ, কদমতলী, ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত আব্দুল মজিদ
পিতার পেশা ও বয়স : মৃত
মায়ের নাম : ফাতেমা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৭০
মাসিক আয় : ১৫,০০০
আয়ের উৎস : দোকান এবং ছেলের দিনমজুরি
বাড়ির বিবরণ : টিনের বাড়ি
সম্পদের পরিমাণ : ৫ কাঠা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
সন্তানদের নাম
১. শারমিন আক্তার, বয়স: ২৩, পেশা: বিবাহিত, গৃহিণী, সম্পর্ক: মেয়ে
২. শিফা আক্তার, বয়স: ২০, পেশা: বিবাহিত, গৃহিণী, সম্পর্ক: মেয়ে ৩. শাহাদাত হোসেন, বয়স: ১৬, পেশা: গ্রিলের কাজ, সম্পক: ছেলে আহত হওয়ার বিবরণ আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার যাত্রাবাড়ী রায়েরবাগের মদিনাবাগ এলাকায়
তারিখ ও সময় : ২০ জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিটের দিকে আক্রমণকারী : পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্তৃক। চিকিৎসা : ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতাল চিকিৎসার ব্যয় : প্রায় ৬ লাখ
পারিবারিক জীবন সোহেল মিয়া একজন পরিবারের অভিভাবক, যার জীবনচিত্রে ভালোবাসা ও সংগ্রামের গভীর ছাপ স্পষ্ট। তাঁর সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ে শারমিন আক্তার (২৩) বিবাহিত, মেঝো মেয়ে শিফা আক্তার (২০) তিনিও বিবাহিত এবং কনিষ্ঠ পুত্র (১৬) একজন শ্রমিক, গ্রিলের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। অভাব-অনটনের মধ্যেও পরিবারে যে আত্মিক বন্ধন ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠেছে,তা সোহেল মিয়ার সুনাগরিক ও দায়িত্বশীল পিতার ভূমিকাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। কর্ম জীবন ছোটবেলা থেকেই সোহেল মিয়া সমাজের বৈষম্য, অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদী মনোভাব পোষণ করতেন। তিনি কেবল নিজের জীবনের প্রয়োজনে নয়, বরং সামগ্রিক মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে সমাজের অসংগতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্ধকার কোণে আলো ছড়িয়ে দেয়ার মানসিকতা ছিল তার অন্তরে সদা জাগ্রত। তিনি কখনো সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি; বরং দৃঢ়কণ্ঠে ন্যায়ের পক্ষে নিজের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন। প্রবীণ সংগ্রামী জীবন জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় শুরু হয় যখন মো: সোহেল উদ্দিন ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দেশের রাজপথে নেমে আসেন। সে সময় বয়স তাঁকে পেছনে টানেনি,বরং অভিজ্ঞতা ও আদর্শিক দৃঢ়তা তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে নির্ভয়ে। ভয়, নিপীড়ন, রক্ত-কোনো কিছুকেই তিনি কভু পরোয়া করেননি। তার সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ শুধু তাঁর সময়কেই নয়, আগামী প্রজন্মকেও পথ দেখাবে। প্রবীণ এই সংগ্রামী যোদ্ধার জীবন-আখ্যান বাঙালির ইতিহাসে সাহস ও প্রেরণার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ জুলাই আন্দোলনের এক প্রবীণ বীরের কাছে শুনুন তার নিজস্ব জবানীতে। সেদিন মাগরিবের নামাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। প্রতিদিনের মতো শান্ত-নিরিবিলিভাবেই নামাজ পড়ে বাসার নিচে দাঁড়িয়েছিলাম। চারপাশে কিছু লোকজন জড়ো ছিল, কেউ রাস্তা পার হচ্ছিল, কেউ গল্প করছিল; যেন প্রতিদিনকার সাধারণ বিকেলের মতোই। হঠাৎ, যেন বজ্রাঘাত! কোনো রকম ইশারা বা হুঁশিয়ারি ছাড়াই গুলির শব্দ ছুটে এলো। পুলিশ আমাদের দিকে তাক করেই গুলি চালায়। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কোনো মানুষ নই-তারা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু সেনা দমন করছে! সেই গুলির একটি আমার ডান পায়ে আঘাত করে; হাঁটুর নিচে, গোড়ালির ওপর। গুলিটা ভেদ করে দু’পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই আমি পড়ে যাই রক্তে ভেসে, চারপাশ ঘোলাটে হয়ে আসে, শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। তখন আমি শুধু শুনতে পাই মানুষের চিৎকার, আর অনুভব করি, এক নিষ্ঠুর সরকারের বন্দুকের নল আমার হাড় চুরমার করে দিয়েছে। স্থানীয় লোকজন আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে ছুটে যায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও যেন মানবতা অনুপস্থিত ছিল। অবশেষে আমাকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। আমার পায়ের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছে। চিকিৎসক বলেছে, হয়তো আর কখনো আগের মতো হাঁটতে পারব না।
জানিনা, কী অপরাধ ছিল আমার? নামাজ পড়া? সাধারণ মানুষ হওয়া? নাকি এই দেশের নাগরিক হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা? আওয়ামী সরকারের এই বর্বরতা প্রমাণ করে দিয়েছে; তারা মানুষ নয়, তারা এক ফ্যাসিস্ট শক্তি, যারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গুলি চালাতেও দ্বিধা করেনি। আমি আজও সেই গুলির ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছি। কিন্তু ভেতরের যে ক্ষত-মানবতা, অধিকার আর নিরাপত্তাহীনতার সে যন্ত্রণা; তা কোনো অস্ত্রোপচারেও সেরে উঠবে না। চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা পুলিশের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর মো: সোহেল উদ্দিনকে দ্রুত স্থানীয় এক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তার রক্তাক্ত শরীরে প্রথম প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার গুরুত্ব বুঝে কিছু সময় পরই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয় তার জীবনের প্রথম অস্ত্রোপচার। গুলিটি তার হাঁটুর নিচে, পায়ের গোড়ালির ওপরে আঘাত করে এবং অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়,ফলে তার পায়ের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। চিকিৎসকরা জানান, আঘাতটি ছিল গভীর ও জটিল, যা তার স্নায়ুতন্ত্র এবং হাড়ের গঠনে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছে। অপারেশনের পরও তিনি আর আগের মতো স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারছেন না। তার পায়ে এখন কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। প্রতিদিনের জীবন যাপনে তাকে ভরসা করতে হচ্ছে পায়ের ঠেঙ্গি (ক্রাচ)-এর উপর। একদিন যে পা তাকে জীবিকার জন্য রাজপথে দাঁড় করিয়েছিল, আজ সেটিই তার চলাচলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। বর্তমানে মো: সোহেল উদ্দিন রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তার দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, থেরাপি ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চলছে। তবে উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থ, যা একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে একা বহন করা দুঃসাধ্য। তাঁর এই দুর্বিষহ অবস্থাই প্রমাণ করে, কী ভয়াবহ ছিল সেই বর্বর গুলির মুহূর্ত- যা একজন কর্মক্ষম মানুষকে এক লহমায় অসহায় করে দিয়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং। পুর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: চায়ের দোকান কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
আঘাতের ধরণ: গুলির একটি তার হাঁটুর নিচে, পায়ের গোড়ালির ওপরে আঘাত করে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, ফলে তার পায়ের হাড় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়। বর্তমান অবস্থা : বর্তমানে তার পায়ে কোনো শক্তি নেই। তাকে চলাফেরার জন্য পায়ের ঠেঙ্গি (ক্রাচ) ব্যবহার করতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক অবস্থা : বর্তমানে তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। মাঝে মাঝে স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে বসেন। সংসারের খরচ চালাতে তিনি তার গ্রিলমিস্ত্রি ছেলের উপর নির্ভরশীল। তার দুই মেয়ে বিবাহিত।
এক নজরে মো: সোহেল উদ্দিন
নাম : মো: সোহেল উদ্দিন
জন্ম তারিখ : ০১-০১-১৯৭৮
জন্মস্থান : শ্যামপুর,ঢাকা
পেশা : চায়ের দোকানদার
স্ত্রীর নাম : ডলি আক্তার
স্ত্রীর পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৮
নিজ জেলা : ঢাকা
পেশাগত পরিচয় : চায়ের দোকান
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: রায়েরবাগ, ইউনিয়ন: মেরাজনগর, থানা: শ্যামপুর, জেলা: ঢাকা
বর্তমান ঠিকানা : রায়েরবাগ, মদিনাবাগ, কদমতলী, ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত আব্দুল মজিদ
পিতার পেশা ও বয়স : মৃত
মায়ের নাম : ফাতেমা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৭০
মাসিক আয় : ১৫,০০০
আয়ের উৎস : দোকান এবং ছেলের দিনমজুরি
বাড়ির বিবরণ : টিনের বাড়ি
সম্পদের পরিমাণ : ৫ কাঠা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
সন্তানদের নাম
১. শারমিন আক্তার, বয়স: ২৩, পেশা: বিবাহিত, গৃহিণী, সম্পর্ক: মেয়ে
২. শিফা আক্তার, বয়স: ২০, পেশা: বিবাহিত, গৃহিণী, সম্পর্ক: মেয়ে ৩. শাহাদাত হোসেন, বয়স: ১৬, পেশা: গ্রিলের কাজ, সম্পক: ছেলে আহত হওয়ার বিবরণ আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার যাত্রাবাড়ী রায়েরবাগের মদিনাবাগ এলাকায়
তারিখ ও সময় : ২০ জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিটের দিকে আক্রমণকারী : পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্তৃক। চিকিৎসা : ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতাল চিকিৎসার ব্যয় : প্রায় ৬ লাখ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍