মো: আব্দুল কাদের
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
মোহাম্মদ আব্দুল কাদের একজন পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল ও পরিবারের প্রতি নিবেদিত প্রাণ মানুষ। ১৯৮৫ সালের ৩০ জুন তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানাধীন গোবিন্দপুর, দনিয়া এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে, সৎ পথে থেকে কষ্ট করে হলেও একটি সম্মানজনক জীবন গড়বেন। জীবন সংগ্রামের পথে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ এসেছে, তবে তিনি কখনো হার মানেননি। পরিবারই ছিল তার জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। মেয়েদের শিক্ষা ও সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত যত্নবান। প্রতিদিনের জীবনের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মানসিক শান্তি ও ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছেন।
তার মতো একজন সংগ্রামী মানুষ আমাদের সমাজে অনুপ্রেরণার উৎস। নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও পরিশ্রম এই তিন গুণকে ভিত্তি করে মোহাম্মদ আব্দুল কাদের তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে গেছেন এবং এখনো এগিয়ে চলেছেন পরিবারকে আলোকিত ভবিষ্যতের পথে নিয়ে যেতে।
পারিবারিক অবস্থা
পিতা হায়দার আলী বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যুপরবর্তী সময়ে পরিবারটির ভরসা হয়ে উঠেন মোহাম্মদ আব্দুল কাদের। মা রহিমা বেগম বর্তমানে ৯৫ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত নানা দুর্বলতায় ভুগছেন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি ছেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। মা ও সন্তানদের মুখের হাসিই যেন কাদেরের জীবনের প্রধান প্রেরণা।
তিনি একজন আদর্শ পিতা, যিনি তার তিন কন্যা ফাতিহা কাদির, ফতেমা ও ফাহিমাকে
ঘিরে গড়ে তুলেছেন একটি ভালোবাসা ও দায়িতপূর্ণ পরিবার। সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব, ভরণপোষণ, শিখ ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের কাজ একাই নিজের কাঁধে নিয়েছেন। প্রতিদিন কষ্ট করে আয়-রোজগার করে সন্তানের বিষ্যৎ গড়তে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মোহাম্মদ আব্দুল কাদো । জীবনে নেই কোনো আরাম-আয়েশ বা বিলাসিতা। সৎপথে চলা, কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ ও আত্মনিবেদনই তার জীবনদর্শন। অন্যদের সাহায্য করার ইচ্ছা থাকলেও, নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে থেকে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে ভালো রাখাই তার একমাত্র লক্ষ্য। তাঁর মতো একজন সংগ্রামী মানুষ আমাদের সমাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাজধানীতে চলমান ছাত্র আন্দোলনের সময় মোহাম্মদ আব্দুল কাদের কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, শুধু মানবিকতা থেকে আন্দোলনরত পিপাসার্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পানি সরবরাহ করেন। তিনি বোতল কেটে প্লাস বানিয়ে নিজ উদ্যোগে ড্রামের পর ড্রাম পানি বিতরণ করেন। কিন্তু এই মানবিক কাজই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সূচনা।
পরদিন ১৮ জুলাই, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। এর ঠিক ছয়দিন পর, ২৪ জুলাই রাত আনুমানিক ২টার দিকে পুলিশ তার বাড়িতে হানা দেয়। প্রাণভয়ে তিনি নোয়াখালীতে আত্মগোপন করেন, কিন্তু সেখানেও তাকে
দেয়া হয়নি। তিনদিনের অভিযানের পর নোয়াখালী সদর থানা থেকে পুলিশ তাকে আটক করে এবং সেখানে ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তার শরীরকে ব্যবহার করা হয় যেন একটি বল, ফুটবলের মতো লাথি মারা হয় তাকে। এরপর তাকে ঢাকায় এনে যাত্রাবাড়ী থানায় এবং সেখান থেকে গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চোখ বেঁধে, হাত বেঁধে তাকে ঝুলিয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত বেধড়ক মারধর করা হয়। এমন নির্যাতন, যা তার শরীর ও মনকে আজও বিধ্বস্ত করে রেখেছে। পরবর্তীতে আদালতে তোলা হলে তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় এবং সেই রিমান্ড শেষে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বিবরণ
এই নির্মম নির্যাতনের ফলে মোহাম্মদ আব্দুল কাদের আজও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। তার শরীরে এখনো বহন করে বেড়াচ্ছেন সেই নৃশংসতার ক্ষতচিহ্ন। পায়ে রয়েছে প্রচণ্ড ফোলা, মাথায় গভীর আঘাতের দাগ স্পষ্ট, পিঠ, হাত ও পায়ের তালুতে অসংখ্য ক্ষত আজও তার যন্ত্রণা বাড়িয়ে দেয়।
শরীরের যন্ত্রণা ছাড়াও মানসিক আঘাত যেন আরও ভয়াবহ। রাতে ঘুম আসে না, চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে সেই বিভীষিকাময় রাতের দৃশ্য। চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে যেভাবে ঝুলিয়ে মারধর করা হয়েছিল, রক্তমাখা শরীরে অসহায় আর্তচিৎকার আজও তার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। প্রতি মুহূর্তে সেই নির্যাতনের স্মৃতি তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। এমনকি পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাও যেন কঠিন হয়ে উঠেছে। এই ঘটনা শুধু একজন মানুষের ওপর বর্বরতা নয় বরং মানবতার ওপরই এক নির্মম আঘাত। মোহাম্মদ আব্দুল কাদের আজও সে দিনের ভয়াবহতা বয়ে বেড়াচ্ছেন প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
বর্তমানে মোহাম্মদ আব্দুল কাদেরের চিকিৎসা চলমান। শারীরিক ক্ষতের পাশাপাশি তার মানসিক স্বাস্থ্যও চরম বিপর্যন্ত অবস্থায় রয়েছে। মাথার যন্ত্রণা, পায়ের ব্যথা, পিঠের ক্ষত সবই তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। তাকে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, মানসিক চিকিৎসা, বিশ্রাম এবং মানবিক পুনর্বাসন। কিন্তু তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য অত্যন্ত সীমিত একজন ভুক্তভোগীর পক্ষে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
প্রস্তাবনা: ১. আপাতত কর্মসংস্থানের প্রয়োজন নেই। ২. তবে চিকিৎসার খরচ বহন করা যেতে পারে।
মোহাম্মদ আব্দুল কাদের রাজনীতিক ছিলেন না, অপরাধী তো নয়ই। তিনি শুধু একজন সাধারণ মানুষ, যিনি একটুকু মানবতা দেখাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রের নির্মম শিকার হয়েছেন। তার গল্প এককথায় বিচারহীনতার প্রতীক, নিরীহ নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নগ্ন উদাহরণ। আজও তার দেহের আঘাত এবং মানসিক যন্ত্রণা সাক্ষ্য দেয় এই সমাজে মানবিকতা কেমন নির্মমভাবে দমন করা হয়।
এক নজরে মো: আব্দুল কাদির
নাম : মো: আব্দুল কাদের
পিতা: মরহুম হায়দার আলী
মাতা : মরহুমা রহিমা বেগম
মেয়ে: ফাতিহা
মেয়ে: ফতেমা
মেয়ে: ফাহিমা
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
স্থায়ী ঠিকানা : গোবিন্দপুর, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৪ জুলাই থেকে ২ আগস্ট ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍