হোম / আহতদের তালিকা / ফেরদৌস পাটোয়ারী
ফেরদৌস পাটোয়ারী

ফেরদৌস পাটোয়ারী

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ঠিকানা : কদমতলী, রায়েরবাগ, ঢাকা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

পরিচয় ফেরদৌস পাটোয়ারী, একজন পরিশ্রমী ও মানবিক চেতনায় উদ্দীপ্ত দিনমজুর, ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরের ১ তারিখে ঢাকার কদমতলী, রায়েরবাগ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন পরিশ্রমী, সংগ্রামী এবং মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ শাটার মিস্ত্রী। যিনি জীবনের প্রতিটি ধাপে কষ্টকে সঙ্গী করে সামনে এগিয়ে চলেছেন। ছোটবেলা থেকেই নানা আর্থিক অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। তার পিতা আলী আহমদ এবং মাতা শামসুন্নাহার উভয়েই এখন মরহুম, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া সংগ্রামী চেতনা আজও ফেরদৌসের জীবনের চালিকাশক্তি।
তার স্বপ্ন, তার সন্তানরা যেন তার মতো জীবনযুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে যেন তারা পড়ালেখা করে সমাজে একজন সম্মানিত ও সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। নিজের কষ্টের কথা না ভেবে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ফেরদৌস পাটোয়ারী এই সমাজে এক নিঃশব্দ নায়ক, যিনি নিজেকে হারিয়ে পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার এক জীবন্ত প্রতীক। পারিবারিক প্রেক্ষাপট বর্তমানে তিনি তার স্ত্রী এবং তিন সন্তানসহ একটি পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে রায়েরবাগ এলাকায় বসবাস করছেন। বড় মেয়ে ইশরাত জাহান বর্তমানে বিএ প্রথম বর্ষে পড়ছেন, তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারে মায়ের পাশে হাত বাড়িয়ে দেন। মেঝো ছেলে ফারদিন অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এবং কনিষ্ঠ ছেলে তারিক মাহতাব প্রথম শ্রেণিতে স্কুলে যায়। সন্তানদের লেখাপড়া ও ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ফেরদৌস সবকিছু ত্যাগ করে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। তবে তার এ সংগ্রামী জীবন মোটেই সহজ নয়। একজন দিনমজুর হিসেবে তার মাসিক আয় মাত্র ১৫,০০০ টাকা, যা দিয়ে পাঁচজনের পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, চিকিৎসা, বাসা ভাড়া এসব সামলানো একপ্রকার অসম্ভব বললেই চলে। তবুও ফেরদৌস হাল ছাড়েন না। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজের সন্ধানে বের হন, কখনও নির্মাণস্থলে, কখনও বাজারে বা মাল টানার কাজে দিন পার করেন। কখনো হয়তো পুরোপুরি কাজ জোটে না, তবু তিনি সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সাহস হারান না।
ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, যখন সারা দেশজুড়ে বৈষম্যমূলক কোটানীতি ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা উত্তাল হয়ে ওঠে, তখন ফেরদৌস পাটোয়ারীও সেই ন্যায়ের লড়াইয়ে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। একজন সাধারণ দিনমজুর হয়েও তিনি বুঝেছিলেন, এই লড়াই শুধু ছাত্রদের নয় সমগ্র দেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। তাই তিনি তার দিনমজুরের কাজ ফেলে রেখে সকাল থেকেই রায়েরবাগ এলাকায় ছাত্রদের চলমান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। রাজপথে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্টভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান জানান এবং দিনজুড়ে ছাত্রদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিবাদে অংশ নেন। কিন্তু বিকেলবেলায় পরিস্থিতি হঠাৎ করেই ভয়াবহ মোড় নেয়। রায়েরবাগ মোড়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। সে সময় ফেরদৌস পাটোয়ারীর শরীরে ১৫ থেকে ১৬টি রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়। সাধারণ এক দিনমজুর, যার হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র, শুধু ছিল ন্যায় ও সংবেদনশীলতার প্রত্যয় তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রীয় দমননীতির নির্মম শিকার। এই ঘটনার ভয়াবহতা শুধু শারীরিক জখমে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয় এই রাষ্ট্রে কি সাধারণ মানুষের ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোরও অধিকার নেই? ফেরদৌস পাটোয়ারীর ওপর চালানো এই সহিংসতা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, এবং প্রমাণ করে, আজকের দিনে প্রতিবাদ করাও এক ধরনের সাহসিকতা, যা একজন দিনমজুরও দেখাতে পারেন। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ এই ভয়াবহ ঘটনার পর ফেরদৌস পাটোয়ারী বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। অর্থাভাবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলে স্থানীয় এক চিকিৎসকের সহায়তায় অনেক কষ্টে তার শরীর থেকে ১৩টি রাবার বুলেট অপসারণ করা হয়। তবে এখন তার শরীরে দু’টি রাবার বুলেট রয়ে গেছে, যা গভীরে ঢুকে পড়ায় অপারেশন ছাড়া সরানো সম্ভব নয়।
চিকিৎসকদের মতে, এগুলো আপাতত জীবনঝুঁকির কারণ না হলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ফেরদৌস চোখে ঝাপসা দেখছেন, যা চিকিৎসকদের ভাষায় একটি গুরুতর শারীরিক সংকেত। বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রয়োজন হলেও অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে তিনি উন্নত চিকিৎসা নিতে পারছেন না। এখন তিনি প্রতিনিয়ত ব্যথা, দুর্বলতা ও দুশ্চিন্তার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। বর্তমান অবস্থা বর্তমানে তার চিকিৎসা আংশিকভাবে চালু থাকলেও নিয়মিত চেকআপ ও উন্নত চোখের চিকিৎসা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। ১. বর্তমান শারীরিক ও আর্থিক অবস্থা। ২. শরীরে ২টি রাবার বুলেট এখনো রয়েছে। ৩. মাঝে মাঝে চোখে ঝাপসা দেখা দেয়। ৪. মাথা ভারী লাগা ও চোখে ব্যথার অনুভব হয়। ৫. দৈহিক দুর্বলতা বাড়ছে, পরিশ্রম করতে সমস্যা হয়।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তার উপর রনির্ভরশীল তিন সন্তান ও পরিবার। প্রস্তাবনা ১. একটা মুদী দোকানের ব্যাবস্থা করা। ২. যত দ্রুত সম্ভব চোখের অপারেশন করানো। ফেরদৌস পাটোয়ারী শুধুই একজন দিনমজুর নন তিনি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো সাহসী একজন বাবা, একজন পথযাত্রী, যিনি সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন। আজ তার শরীরে বুলেট, চোখে অন্ধকার, আর হাতে অক্ষমতা।
এক নজরে মোঃ ফেরদৌস পাটোয়ারী
নাম : মো: ফেরদৌস পাটোয়ারী
পিতা : আলী আহমদ, প্রয়াত
মাতা : শামসুন্নাহার, প্রয়াত
মেয়ে : ইশরাত জাহান, বয়স ২১
ছেলে : ফারদিন, বয়স ১৪
ছেলে : তারিক মাহতাব, বয়স ৬
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ঠিকানা : কদমতলী, রায়েরবাগ, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ, ঢাকা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍