মাহাবুব হোসেন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : ব্যবসায়ী
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
শৈশব ও সংগ্রামের শুরু ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি, কুমিল্লা সদর উপজেলার দক্ষিণ দুর্গাপুর ইউনিয়নের ভূঁইয়া বাড়িতে জন্ম নেন মাহবুব হোসেন। এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া মাহবুব ছোটবেলা থেকেই জীবনের কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে বোঝাপড়া করে বড় হন। তার বাবা আব্দুল মতিন ছিলেন একজন দিনমজুর, যিনি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। মা মোছা: পারভীন একজন গৃহিণী, যিনি সংসারের প্রতিটি কোণে অভাবের ছাপ মুছতে গিয়ে নিজেকে ধ্বংস করেছেন। স্কুলে ভর্তি হলেও অভাবের কারণে পড়াশোনা নিয়মিত রাখতে পাওেননি মাহবুব। সংসারের চাহিদাই তখন তার প্রধান পাঠশালা হয়ে ওঠে।
জীবিকার জন্য ঢাকায় আসা কৈশোরেই মাহবুব ঢাকায় পাড়ি জমান জীবিকার সন্ধানে। রাজধানীর গুলিস্তান হকার মার্কেটে অল্পবয়সেই পণ্য ফেরি করতে শুরু করেন। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে শহরের ব্যস্ত রাস্তায় পণ্য সাজানো, হাঁকডাক করা, দিনের শেষে কিছু টাকা নিয়ে ঘরে ফেরা এই চক্রে চলত তার জীবন। তবে সে জীবনেও ছিল আনন্দ, ছিল আশাবাদ। তার একটি ছোট পরিবার গড়ে ওঠে, স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র মহিদুল ইসলামকে নিয়ে। মাহবুবের স্বপ্ন ছিল সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করা। সেই স্বপ্নের মূল্য তিনি পরে রক্ত দিয়েই দিয়েছেন। বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যোগ ২০২৪ সালের জুলাই মাস পুরো দেশ উত্তাল ছিল বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে। ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ সবাই মিলে রাজপথে নেমে এসেছিল। মাহবুব তখন শুধু একজন হকার ছিলেন না তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন প্রতিবাদী মানুষ। ২১ জুলাই, দুপুর ১২টার দিকে তিনি যাত্রাবাড়ী ও কাজলা মোড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যুক্ত হন। তার উপস্থিতি ছিল নির্ভীক কারণ তিনি জানতেন, এই আন্দোলন শুধু তার জন্য নয়, তার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যও। হেলিকপ্টার থেকে গুলি মৃত্যুপ্রায় মুহূর্ত সেদিন রাষ্ট্র শক্তির নির্মমতা সীমা ছাড়িয়ে যায়। র্যাব হেলিকপ্টার থেকে আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালানো হয় এমন ঘটনা দেশের ইতিহাসে বিরল। একটি গুলি মাহবুবের পেটে বিদ্ধ হয়। গুলিটি পেটের ভেতর প্রবেশ করে পেছনের হাড় ভেঙে খাদ্যনালী ছিন্ন করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মাহবুব রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে যান। যারা পাশে ছিল, তারা কান্না চেপে চিৎকার করে ওঠে। সেখানে আন্দোলনরত সাধারন ও ছাত্রজনতা তাৎক্ষনিকভাবে হাসপাতালে নিয়ে যান। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া না হলে মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর এক অসম আন্দোলন প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে, পরে সিএমএইচ-এ তাকে ভর্তি করা হয়। তিনি ছিলেন মৃত্যুর খুব কাছাকাছি। চিকিৎসকেরা জানান, তার অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ মারাত্মক। আইসিইউতে অনেকদিন কাটে। পেট, পিঠ ও অন্ত্রের বড় অপারেশন করতে হয়। দীর্ঘ ছয় মাস হাসপাতালে থাকাকালীন তার স্ত্রী দিনরাত পাশে ছিলেন। রাতে কখনো বিছানায় ঘুমাননি চেয়ারে বসে, চোখে কান্না নিয়ে কাটিয়েছেন শত শত ঘন্টা। একজন সাধারণ হকারের জন্য এমন চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব ছিল তবু আত্মীয়-স্বজনদের ধার-কর্য করে চলছিল সব। অক্ষমতার দেহে এক জীবন্ত কারাগার অপারেশনের পর মাহবুবের জীবন আর আগের মতো থাকেনি। চিকিৎসক জানিয়ে দেন তিনি আর কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবেন না। হাঁটাচলা নিষেধ। দাঁড়ালেও ৫-৬ মিনিটের বেশি পারেন না। বাম পাশে চাপ পড়লেই প্রচণ্ড ব্যথায় কাতর হন। নামাজ পড়েন চেয়ারে বসে। বাথরুমে যেতেও অন্যের সাহায্য দরকার হয়। একজন পরিণত মানুষ, যিনি একদিন স্বাধীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, আজ নিজের শরীরেই বন্দী। তার চোখে মুখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন,“এটাই কি আমার প্রাপ্য ছিল?” স্ত্রী একমাত্র আশ্রয়, একা লড়ছেন সবকিছুর বিরুদ্ধে এই পুরো এক বছরে তার সেবাযত্ন করার জন্য আঠার মতো লেগে আছেন তার অর্ধাঙ্গী। তিনি একজন নারী, যিনি এখন শুধু একজন গৃহিণী নন একজন নার্স, একজন রাঁধুনি, একজন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপক, আবার একজন সেবিকা। রাতে স্বামীর ব্যথা উঠলে পাশে বসে থাকেন, সকালে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দেন, দুপুরে খাবার রান্না করেন, সন্ধ্যায় ঔষধের খোঁজে বের হন। তার চোখে ঘুম নেই, মনে স্বস্তি নেই, তবুও মুখে তিনি হাসি রাখেন শুধু যাতে স্বামী ভেঙে না পড়েন। পিতার স্ট্রোক, পরিবারে আরও এক পক্ষাঘাত মাহবুবের বাবা আব্দুল মতিন গতবছর স্ট্রোক করেন এবং এরপর পুরোপুরি প্যারালাইসড হয়ে যান। এখন ঘরে দু’জন পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ একজন বৃদ্ধ পিতা, আরেকজন আহত ছেলে। এই দুইজনের জন্য ওষুধ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাবার, চকিৎসা সবকিছুর ভার স্ত্রী একাই বহন করছেন। এই দৃশ্য শুধু একটি পরিবার নয়, একটি রাষ্ট্রের চরম নিষ্ঠুরতারও প্রতিচ্ছবি। সন্তানের ভবিষ্যৎও অন্ধকার তাদের একমাত্র সন্তান মহিদুল ইসলাম এখন প্লে শ্রেণিতে পড়ে। পড়ালেখার খরচ চালানোই কঠিন। কুরআন শিক্ষার জন্য একজন শিক্ষক পর্যন্ত রাখার সামর্থ্য নেই। বাবা হাঁটতে পারেন না, দাদু শুয়ে আছেন বিছানায় এই শিশুটির চোখে “খেলা” নেই, “আশা” নেই শুধু একরাশ বোবা প্রশ্ন। এই শিশুটিও যেন জন্ম থেকেই রাষ্ট্রের নীরবতার শিকার হয়ে বড় হচ্ছে। বাসাভাড়া বকেয়া, খাবার অনিশ্চিত তাদের বাসাভাড়া ৬-৭ মাস ধরে বকেয়া পড়ে আছে। বাড়িওয়ালা অনেক ভালো তাই এখনও বাসা ছাড়তে বলেননি। দুধ, মাছ, ফল তো দূরে থাক এখন ডাল-ভাতটুকু জোটানোই কঠিন হয়ে গেছে। যেন বেঁচে থাকা মানেই সংগ্রাম। ভবিষ্যতের অপারেশন আশঙ্কার আরেক নাম। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মাহবুবের শরীরে এখনও জটিলতা রয়ে গেছে। ২০২৭ সালের শেষ বা ২০২৮ সালের শুরুতে তার আরেকটি বড় অপারেশন প্রয়োজন হবে। এ অপারেশন ব্যর্থ হলে তার শরীরটা আগের মতে সচল হবে না বরং আরও খারাপ হতে পারে। কিন্তু অপারেশনের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তা সংগ্রহের কোনো উপায় নেই। এখানে রাষ্ট্র নিশ্চুপ, সমাজ নির্বাক। মাহবুব শুধু একজন নয়, একটি বাস্তবতার নাম। মাহবুব হোসেন এখন একজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি নন, বরং এক পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রতীক। এক স্নেহময় পিতা, এক দায়িত্ববান স্বামী, এক সংগ্রামী নাগরিক যে শুধু রুটি খুঁজেছিল, কিন্তু পেয়েছিল গুলি। আমরা যদি তার পাশে না দাঁড়াই, তবে আগামীকাল আরও বহু “মাহবুব”তৈরি হবে। তার জন্য প্রয়োজন মানবিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের স্বীকৃতি। না হলে ভবিষ্যৎ ইতিহাসে রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, আর মাহবুবদের কান্না থেকে যাবে আমাদের বিবেকের গায়ে চিরস্থায়ী দাগ হয়ে। এই মানুষটি আর কিচ্ছু চান না শুধু চান মানুষ হয়ে বাঁচতে। তার জীবনের এই দীর্ঘ ক্রন্দন যেন আরেকজনের ভবিষ্যৎ ঠেকাতে পারে এই আবেদন আমাদের সকলের কাছে।
্রস্তাবনা ১। মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান ২। সন্তানের পড়াশোনার জন্য মাসিক হারে অর্থ প্রদান ৩। কোনো ব্যবস্যার ব্যবস্থা করে দেওয়া (কাপড়/মুদী দোকান) ৪। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে ঋণ প্রদান ৫। বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু ৬। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তি
এক নজরে মাহাবুব হোসেন
নাম : মাহাবুব হোসেন
জন্ম তারিখ : ০১ জানুয়ারি, ১৯৯৫
জন্মস্থান : কুমিল্লা সদর
নিজজেলা : কুমিল্লা
পেশা : ব্যবসায়ী
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : হকার মার্কেট গুলিস্থান (বর্তমানে বেকার)
স্থায়ী ঠিকানা : মহল্লা: ভূইয়া বাড়ি, ইউনিয়ন: ৩ নং দক্ষিণ দুর্গাপুর, থানা: কুমিল্লা সদর, জেলা: কুমিল্লা
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: শনির আখড়া, এলাকা: গ্যাস রোড, থানা: কদমতলী, জেলা: ঢাকা
পিতা : আব্দুল মতিন, পেশা ও বয়স: বৃদ্ধ (৬৫)
মাতা : মোছা: পারভীন, পেশা ও বয়স: বৃদ্ধা (৫৫)
বাড়ি : কাঠ ও টিনের
সম্পদ : নেই
সন্তানের বিবরন
১. মহিদুল ইসলাম, বয়স : ০৬, শ্রেণি: নার্সারী
আহত হওয়ার স্থান : শনির আখড়া, কাজলা
আক্রমনকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার সময় ও তারিখ: ২১ জুলাই দুপুর ১২.০০টা
জীবিকার জন্য ঢাকায় আসা কৈশোরেই মাহবুব ঢাকায় পাড়ি জমান জীবিকার সন্ধানে। রাজধানীর গুলিস্তান হকার মার্কেটে অল্পবয়সেই পণ্য ফেরি করতে শুরু করেন। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে শহরের ব্যস্ত রাস্তায় পণ্য সাজানো, হাঁকডাক করা, দিনের শেষে কিছু টাকা নিয়ে ঘরে ফেরা এই চক্রে চলত তার জীবন। তবে সে জীবনেও ছিল আনন্দ, ছিল আশাবাদ। তার একটি ছোট পরিবার গড়ে ওঠে, স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র মহিদুল ইসলামকে নিয়ে। মাহবুবের স্বপ্ন ছিল সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করা। সেই স্বপ্নের মূল্য তিনি পরে রক্ত দিয়েই দিয়েছেন। বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যোগ ২০২৪ সালের জুলাই মাস পুরো দেশ উত্তাল ছিল বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে। ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ সবাই মিলে রাজপথে নেমে এসেছিল। মাহবুব তখন শুধু একজন হকার ছিলেন না তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন প্রতিবাদী মানুষ। ২১ জুলাই, দুপুর ১২টার দিকে তিনি যাত্রাবাড়ী ও কাজলা মোড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যুক্ত হন। তার উপস্থিতি ছিল নির্ভীক কারণ তিনি জানতেন, এই আন্দোলন শুধু তার জন্য নয়, তার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যও। হেলিকপ্টার থেকে গুলি মৃত্যুপ্রায় মুহূর্ত সেদিন রাষ্ট্র শক্তির নির্মমতা সীমা ছাড়িয়ে যায়। র্যাব হেলিকপ্টার থেকে আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালানো হয় এমন ঘটনা দেশের ইতিহাসে বিরল। একটি গুলি মাহবুবের পেটে বিদ্ধ হয়। গুলিটি পেটের ভেতর প্রবেশ করে পেছনের হাড় ভেঙে খাদ্যনালী ছিন্ন করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মাহবুব রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে যান। যারা পাশে ছিল, তারা কান্না চেপে চিৎকার করে ওঠে। সেখানে আন্দোলনরত সাধারন ও ছাত্রজনতা তাৎক্ষনিকভাবে হাসপাতালে নিয়ে যান। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া না হলে মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর এক অসম আন্দোলন প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে, পরে সিএমএইচ-এ তাকে ভর্তি করা হয়। তিনি ছিলেন মৃত্যুর খুব কাছাকাছি। চিকিৎসকেরা জানান, তার অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ মারাত্মক। আইসিইউতে অনেকদিন কাটে। পেট, পিঠ ও অন্ত্রের বড় অপারেশন করতে হয়। দীর্ঘ ছয় মাস হাসপাতালে থাকাকালীন তার স্ত্রী দিনরাত পাশে ছিলেন। রাতে কখনো বিছানায় ঘুমাননি চেয়ারে বসে, চোখে কান্না নিয়ে কাটিয়েছেন শত শত ঘন্টা। একজন সাধারণ হকারের জন্য এমন চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব ছিল তবু আত্মীয়-স্বজনদের ধার-কর্য করে চলছিল সব। অক্ষমতার দেহে এক জীবন্ত কারাগার অপারেশনের পর মাহবুবের জীবন আর আগের মতো থাকেনি। চিকিৎসক জানিয়ে দেন তিনি আর কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবেন না। হাঁটাচলা নিষেধ। দাঁড়ালেও ৫-৬ মিনিটের বেশি পারেন না। বাম পাশে চাপ পড়লেই প্রচণ্ড ব্যথায় কাতর হন। নামাজ পড়েন চেয়ারে বসে। বাথরুমে যেতেও অন্যের সাহায্য দরকার হয়। একজন পরিণত মানুষ, যিনি একদিন স্বাধীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, আজ নিজের শরীরেই বন্দী। তার চোখে মুখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন,“এটাই কি আমার প্রাপ্য ছিল?” স্ত্রী একমাত্র আশ্রয়, একা লড়ছেন সবকিছুর বিরুদ্ধে এই পুরো এক বছরে তার সেবাযত্ন করার জন্য আঠার মতো লেগে আছেন তার অর্ধাঙ্গী। তিনি একজন নারী, যিনি এখন শুধু একজন গৃহিণী নন একজন নার্স, একজন রাঁধুনি, একজন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপক, আবার একজন সেবিকা। রাতে স্বামীর ব্যথা উঠলে পাশে বসে থাকেন, সকালে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দেন, দুপুরে খাবার রান্না করেন, সন্ধ্যায় ঔষধের খোঁজে বের হন। তার চোখে ঘুম নেই, মনে স্বস্তি নেই, তবুও মুখে তিনি হাসি রাখেন শুধু যাতে স্বামী ভেঙে না পড়েন। পিতার স্ট্রোক, পরিবারে আরও এক পক্ষাঘাত মাহবুবের বাবা আব্দুল মতিন গতবছর স্ট্রোক করেন এবং এরপর পুরোপুরি প্যারালাইসড হয়ে যান। এখন ঘরে দু’জন পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ একজন বৃদ্ধ পিতা, আরেকজন আহত ছেলে। এই দুইজনের জন্য ওষুধ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাবার, চকিৎসা সবকিছুর ভার স্ত্রী একাই বহন করছেন। এই দৃশ্য শুধু একটি পরিবার নয়, একটি রাষ্ট্রের চরম নিষ্ঠুরতারও প্রতিচ্ছবি। সন্তানের ভবিষ্যৎও অন্ধকার তাদের একমাত্র সন্তান মহিদুল ইসলাম এখন প্লে শ্রেণিতে পড়ে। পড়ালেখার খরচ চালানোই কঠিন। কুরআন শিক্ষার জন্য একজন শিক্ষক পর্যন্ত রাখার সামর্থ্য নেই। বাবা হাঁটতে পারেন না, দাদু শুয়ে আছেন বিছানায় এই শিশুটির চোখে “খেলা” নেই, “আশা” নেই শুধু একরাশ বোবা প্রশ্ন। এই শিশুটিও যেন জন্ম থেকেই রাষ্ট্রের নীরবতার শিকার হয়ে বড় হচ্ছে। বাসাভাড়া বকেয়া, খাবার অনিশ্চিত তাদের বাসাভাড়া ৬-৭ মাস ধরে বকেয়া পড়ে আছে। বাড়িওয়ালা অনেক ভালো তাই এখনও বাসা ছাড়তে বলেননি। দুধ, মাছ, ফল তো দূরে থাক এখন ডাল-ভাতটুকু জোটানোই কঠিন হয়ে গেছে। যেন বেঁচে থাকা মানেই সংগ্রাম। ভবিষ্যতের অপারেশন আশঙ্কার আরেক নাম। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মাহবুবের শরীরে এখনও জটিলতা রয়ে গেছে। ২০২৭ সালের শেষ বা ২০২৮ সালের শুরুতে তার আরেকটি বড় অপারেশন প্রয়োজন হবে। এ অপারেশন ব্যর্থ হলে তার শরীরটা আগের মতে সচল হবে না বরং আরও খারাপ হতে পারে। কিন্তু অপারেশনের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তা সংগ্রহের কোনো উপায় নেই। এখানে রাষ্ট্র নিশ্চুপ, সমাজ নির্বাক। মাহবুব শুধু একজন নয়, একটি বাস্তবতার নাম। মাহবুব হোসেন এখন একজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি নন, বরং এক পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রতীক। এক স্নেহময় পিতা, এক দায়িত্ববান স্বামী, এক সংগ্রামী নাগরিক যে শুধু রুটি খুঁজেছিল, কিন্তু পেয়েছিল গুলি। আমরা যদি তার পাশে না দাঁড়াই, তবে আগামীকাল আরও বহু “মাহবুব”তৈরি হবে। তার জন্য প্রয়োজন মানবিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের স্বীকৃতি। না হলে ভবিষ্যৎ ইতিহাসে রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, আর মাহবুবদের কান্না থেকে যাবে আমাদের বিবেকের গায়ে চিরস্থায়ী দাগ হয়ে। এই মানুষটি আর কিচ্ছু চান না শুধু চান মানুষ হয়ে বাঁচতে। তার জীবনের এই দীর্ঘ ক্রন্দন যেন আরেকজনের ভবিষ্যৎ ঠেকাতে পারে এই আবেদন আমাদের সকলের কাছে।
্রস্তাবনা ১। মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান ২। সন্তানের পড়াশোনার জন্য মাসিক হারে অর্থ প্রদান ৩। কোনো ব্যবস্যার ব্যবস্থা করে দেওয়া (কাপড়/মুদী দোকান) ৪। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে ঋণ প্রদান ৫। বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু ৬। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তি
এক নজরে মাহাবুব হোসেন
নাম : মাহাবুব হোসেন
জন্ম তারিখ : ০১ জানুয়ারি, ১৯৯৫
জন্মস্থান : কুমিল্লা সদর
নিজজেলা : কুমিল্লা
পেশা : ব্যবসায়ী
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : হকার মার্কেট গুলিস্থান (বর্তমানে বেকার)
স্থায়ী ঠিকানা : মহল্লা: ভূইয়া বাড়ি, ইউনিয়ন: ৩ নং দক্ষিণ দুর্গাপুর, থানা: কুমিল্লা সদর, জেলা: কুমিল্লা
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: শনির আখড়া, এলাকা: গ্যাস রোড, থানা: কদমতলী, জেলা: ঢাকা
পিতা : আব্দুল মতিন, পেশা ও বয়স: বৃদ্ধ (৬৫)
মাতা : মোছা: পারভীন, পেশা ও বয়স: বৃদ্ধা (৫৫)
বাড়ি : কাঠ ও টিনের
সম্পদ : নেই
সন্তানের বিবরন
১. মহিদুল ইসলাম, বয়স : ০৬, শ্রেণি: নার্সারী
আহত হওয়ার স্থান : শনির আখড়া, কাজলা
আক্রমনকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার সময় ও তারিখ: ২১ জুলাই দুপুর ১২.০০টা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍