হোম / আহতদের তালিকা / মোহাদ্দেস আমিন
মোহাদ্দেস আমিন

মোহাদ্দেস আমিন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি
মোহাদ্দেস আমিন জন্মগ্রহণ করেন ২০০৮ সালের ১১ জানুয়ারি নোয়াখালীর কাবিরহাট উপজেলার রাকেশপুর গ্রামে। তিনি পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তৃতীয়, এক দরিদ্র দিনমজুর পরিবারের সন্তান। প্রতিদিনের কষ্টার্জিত উপার্জনেই সংসার চলত কোনোমতে। মা ছিলেন গৃহিণী, কিন্তু সংসারের ভার কাঁধে নিয়ে তিনিই সন্তানদের লালনপালনের মূল দায় তুলে নিয়েছিলেন। গ্রামের মানুষ মোহাদ্দেসকে চিনতেন শান্ত, মার্জিত ও ধর্মভীরু কিশোর হিসেবে, যিনি গালাগাল শুনলে মুখ ফিরিয়ে নিতেন, প্রয়োজন হলে নিজের খাতাও দিয়ে দিতেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। অনেকেই বলতেন, “এই ছেলে একদিন আলেম হবে, জাতির উপকার করবে।”
শিক্ষা ও আত্মগঠনের যাত্রা ছোট থেকেই ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল মোহাদ্দেসের। প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা চলে আসেন আলিম পর্যায়ের পড়াশোনার জন্য। ভর্তি হন দেশের একটি সুপরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায়। তিনি শুধুই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন না, ছিলেন একজন বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র। ইসলামিক জ্ঞান ও আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিতেন। একদিকে তাঁর কণ্ঠ ছিল অসাধারণ! ক্বিরাত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। অন্যদিকে ইংরেজি ও গণিতেও ছিল অসাধারণ দক্ষতা। শিক্ষকরা তাকে “মডেল স্টুডেন্ট” বলে ডাকতেন। ২০২৪ সালে তিনি দাখিল পরীক্ষার্থী ছিলেন। প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মনোযোগ দিয়ে। তাঁর স্বপ্ন ছিল, দাখিল-আলিম শেষ করে উচ্চতর ইসলামী জ্ঞান অর্জন করবেন, সম্ভব হলে মিসরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবেন। ঘটনার দিন তারিখ ছিল ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, বৃহস্পতিবার। বিকাল ৩টার দিকে প্রতিদিনের মতো আন্দোলনে যোগদান করতে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন মোহাদ্দেস, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর কাজলার দিকে রওনা দেন। পিঠে বইয়ের ব্যাগ, হাতে পানির বোতল, স্বপ্নে ভরা চোখে চলছিলেন চেনা পথে। কিন্তু সেদিন ঢাকা ছিল অশান্ত। চলছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দমন অভিযান চলছিল। মোহাদ্দেস প্রথমে কোনো বিক্ষোভে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু যখন পুলিশ নির্বিচারে সাধারণ ছাত্রদের ধরে নিয়ে যেতে থাকে, তখন প্রতিবাদ জানাতে মোহাদ্দেসসহ আরো অনেক ছাত্র যাত্রাবাড়ী থানা ঘেরাও করেন। এক পর্যায়ে পুলিশ আত্মসমর্পণ করে ছাত্রদের ছেড়ে দেয়। তবে সবাই বের হয়ে যাবার আগেই থানার গেট লক করে দেয় পুলিশ। মোহাদ্দেস গেটের ভেতরে আটকে পড়েন। তারপরই শুরু হয় নির্মমতার চরম বাস্তবতা; বুটের লাথি, লাঠিপেটা, অকথ্য গালাগালি। ভয়ে দিশেহারা মোহাদ্দেস শেষ চেষ্টা করেন থানার দেয়াল টপকে পালানোর।
ঠিক তখনই পুলিশ সামনে থেকে তার দিকে রাবার বুলেট ছুঁড়তে শুরু করে। পরপর তার শরীরে ১০০টিরও বেশি ছররা গুলিবিদ্ধ হয়। পিঠ, কোমর, উরু ও ডান পায়ের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পেয়ে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। তখনও তাঁর ব্যাগের ভেতরে ছিল কোরআনের কপি, হাদিসের নোট আর দাখিল পরীক্ষার প্রস্তুতির খাতা। আহত অবস্থায় উদ্ধার ও চিকিৎসা শুরুর দিকে পথচারীরা ভয়ে এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, ভাবছিলেন হয়তো কোনো রাজনৈতিক কর্মী।পরে কয়েকজন বুঝতে পারেন, এই কিশোর একজন নিরীহ ছাত্র,তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বুলেট অপসারণ করেন, কিন্তু বেশিরভাগই শরীরের গভীরে, স্নায়ু ও পেশির কাছাকাছি এমনভাবে আটকে যায় যে, সবগুলো বের করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকরা জানান, এগুলো অপসারণ করলে স্থায়ী পক্ষাঘাতের ঝুঁকি থাকবে। যন্ত্রণা যার নিত্যদিনের সঙ্গী মোহাদ্দেসের শরীরে এখনো ৯০টিরও বেশি ছররা গুলি রয়ে গেছে। প্রতিদিন ব্যথায় কাতরান, হাঁটলে পায়ে ‘ব্লক’ ধরে যায়, কোমরে টান পড়ে, মাঝে মাঝে জ্বর আসে। ৪/৫ মিনিটের বেশি হাঁটতে পারেন না। ঘুম ভেঙে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আম্মু, আমার শরীরটা আবার আগের মতো হবে না?” চলাফেরা সীমিত, ফিজিওথেরাপি আর ব্যথানাশকই এখন তাঁর সঙ্গী। বই ধরতে গেলে হাত কাঁপে। সহপাঠীরা এসে চোখের জল ফেলেন, আর তিনি চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন নিজের পুরোনো ব্যাগটার দিকে যেখানে আজও রয়ে গেছে তাঁর এক জীবনের স্বপ্ন। শিক্ষা জীবনের ছেদ ও মানসিক যন্ত্রণা এই মেধাবী কিশোর ২০২৫ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। নিয়মিত মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ। ঘরে বসে থাকতে থাকতে মাঝে মাঝে বলেন, “আমি তো কোনো রাজনীতি করিনি, শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিলাম.. তাহলে আমাকে গুলি করল কেন?” পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে মোহাদ্দেসের পরিবার ঋণে ডুবে গেছে। যেদিন ব্যথা বেশি ওঠে, সেদিন ওষুধের দাম নিয়ে মা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন, আত্মীয়ের কাছে যান, পরিচিতের কাছে যান, কখনো চোখে জল, কখনো মুখে নীরব প্রার্থনা নিয়ে। এই পরিবার কখনো কারো কাছে হাত পাতেনি, কিন্তু এখন জীবন বাঁচাতে হাত পেতে বাঁচতে হচ্ছে।
পুর্নবাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা ১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান ২. উন্নত চিকিৎসা ও শরীরে রয়ে যাওয়া ছররা গুলি অপসারণের জন্য মেডিকেল সহায়তা ৩. শিক্ষা বৃত্তি নিশ্চিত করা ৪. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু ৫. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তি ৬. মানসিক কাউন্সিলিং ও চলাফেরা সহজ করতে ফিজিওথেরাপি
এক নজরে মোহাদ্দেস আমিন
নাম : মোহাদ্দেস আমিন
জন্ম তারিখ : ০১ জানুয়ারি ২০০৮
জন্মস্থান : কবিরহাট
নিজ জেলা : নোয়াখালী
পেশা : শিক্ষার্থী
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, ঢাকা স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: রাকেশপুর, ইউনিয়ন: চাপরাশিরহাট, ডাকঘর: মনিরামপুর, থানা: কাবিরহাট সদর, জেলা: নোয়াখালী
বর্তমান ঠিকানা : ঠিকানা: গ্রাম: কদমতলী, থানা: কদমতলী, জেলা: ঢাকা
পিতা : রফিক আমিন,
পেশা ও বয়স: চা দোকানদার (৫০)
মাতা : বিবি কুলসুম
,বয়স ও পেশা: গৃহিণী (৪২)
মাসিক আয় : ১২০০০
সম্পদ : কোনো জায়গা-জমি নেই
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ০৬ জন
ভাই-বোনের পরিচয়
১. মোহাদ্দেস (২২ বছর, শিক্ষার্থী, অনার্স ৪র্থ বর্ষ)
২. মোহাম্মদ (১৫ বছর, শিক্ষার্থী, এসএসসি)
৩. মোসাম্মাৎ আফরিন (৫ বছর, শিক্ষার্থী, নার্সারি)
আহত হওয়ার বিবরণ আহত হওয়ার স্থান : শনির আখড়া, কাজলা আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার সময় ও তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২.০০টা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍