মো: নুর নবী
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : ছাত্র, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, মাস্টার্স, বিভাগ, ইসলামী স্ট্যাডিজ
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের উপর স্বৈরাচারের পাশবিক নির্যাতন
মো: নুর নবী পেশা: ছাত্র, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী স্টাডিজ ক্রমিক: ০৯৮ আইডি: ঢাকা সিটি ০৯৮
জন্ম ও বেড়ে ওঠা সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েও অসাধারণ হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে যে তরুণ, তার নাম নূরনবী। ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর, কুমিল্লার দেবিদ্বারের সুলতানপুর গ্রামের এক পরিশ্রমী পরিবারে জন্ম তার। মা পারভিন আক্তার ও বাবা নুরুল ইসলাম ছিলেন সৎ ও সংগ্রামী মানুষ। বাবার ছোট্ট দোকান ছিল জীবনজীবিকার উপায়, কিন্তু তাদের সংসারে ছিল পরিশ্রম, মূল্যবোধ আর স্বপ্নের আলো। নূরনবী ছোটবেলা থেকেই ছিল মেধাবী, আত্মপ্রত্যয়ী ও নীতিবান। পড়ালেখার প্রতি তার গভীর আগ্রহ, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। সব মিলিয়ে সে ছিল অনন্য। কঠিন বাস্তবতার মাঝেও নিজের স্বপ্নে অবিচল থেকেছে সে। তার জীবনচর্চা প্রমাণ করে জন্ম নয়, মনন ও প্রচেষ্টাই মানুষকে গড়ে তোলে। নূরনবী আজ তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি প্রেরণার নাম। যে নিজেকে গড়েছে আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে।
চোখে স্বপ্ন, কাঁধে দায়িত্ব : তার গ্রামের মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করার পর নূরনবী ভর্তি হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে চলা ছিল এক নতুন আত্মত্যাগের অধ্যায়। ঢাকায় এসে সে মেসে উঠেছিল সহপাঠীদের সঙ্গে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায়। তার মাসিক খরচ চলত বাবার চা বিক্রির আয় এবং বড় ভাইয়ের সীমিত সহায়তায়। অভাব-অনটনের মাঝেও কখনো হতাশা তাকে গ্রাস করতে পারেনি। বরং দেশের ভবিষ্যৎ, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে তার চিন্তা ছিল সুস্পষ্ট, স্পষ্টভাষী। কথা বলত এক আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মতো। নূরনবীর জীবন যাত্রা প্রমাণ করে সংগ্রাম থাকলেও স্বপ্ন যদি বড় হয়, তবে পথ পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের জুলাই যখন ছাত্ররা আবার রাস্তায় নামে : ১ জুলাই ২০২৪, শুরু হয় ইতিহাস গড়ার এক আন্দোলন। রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, শিক্ষা-চাকরি নিয়ে অসাম্য, ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে সরব হয় নতুন প্রজন্ম। নূরনবী তখন জড়িয়ে পড়েন আন্দোলনের প্রতিটি পরতে। দিনে ক্লাস করতেন, রাতে প্ল্যাকার্ড লিখতেন। ছোট ছোট স্লোগান থেকে শুরু করে বড় বক্তৃতা সর্বত্রই ছিল তার সরব উপস্থিতি। ১১ জুলাই-নেতৃত্বে উঠে আসার গল্প : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনা আন্দোলনকে ঘনীভূত করে তোলে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরনো নেতৃত্ব হুমকি পেয়ে পিছিয়ে গেলে, ভয় না পেয়ে সামনে আসেন নূরনবীসহ আরো কয়েকজন। “আমরা কেউ থাকবো না? তাহলে আন্দোলনের সামনে থাকবে কে?” এই কথাগুলো বলেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বাকি সবার মতো নুর নবীও উঠে আসে সামনের সারিতে। ১১ জুলাই সকাল ১১টা, নূরনবীদের নেতৃত্বে মিছিল বের হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। সে মিছিল শুধু রাস্তাই দখল করেনি, দখল করেছিলো মানুষের হৃদয়। মিছিলটি ঝড়ের বেগে প্রায় ৮ কিলোমিটার ধেয়ে এসে দখল নেয় শাহবাগ। উজ্জীবিত করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। ছাত্ররা তখন থেকেই এক নামে চেনে তাকে। ১৫ জুলাই-এক আঘাতে হাজার স্বপ্ন ভেঙে যায় : সেদিন ছিল শুক্রবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল করছিল। নূরনবী সেই মিছিলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। হঠাৎই পুলিশ ও ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের উপর একসাথে হামলা করে। বিশেষকরে ছাত্রলীগ মেয়েদের উপর আক্রমণ করে। নূরনবীসহ আরও কিছু শিক্ষার্থী মেয়েদের রক্ষা করতে বাঁধার প্রাচীর তৈরি করে। একটি শক্ত লাঠির আঘাতে নূরনবীর ডান হাত ভেঙ্গে যায়। পরের দিন সে ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকলো। সহযোদ্ধার মৃত্যু, তবুও নেতৃত্ব ছাড়েননি : ১৬ জুলাই সহযোদ্ধা আবু সাঈদ গুলিতে নিহত হন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হয় গায়েবী জানাজা। ব্যথিত কণ্ঠে সে বলেছিল, “এই রক্ত শুধু একজনের না, এ রক্ত আমাদের সবার ওপর ঋণ রেখে গেল।”
১৬ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েরও চারজন গুলিবিদ্ধ হয়, আন্দোলনের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে ভয়। কিন্তু নূরনবী নেতৃত্ব ছাড়েননি। হাত ভাঙা ছিল, কিন্তু মনের শক্তি দ্বিগুণ। ১৮ জুলাই পুলিশের রেড হয় তার মেসে : এখনই যদি গ্রেফতার হয় তাহলে আন্দোলন থেমে যাবে। তাই সহযোদ্ধাদের কাছে রেড হওয়ার খবর জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ কোনো কিছু ছাড়াই মেস ছেড়ে আশ্রয় নেয় এক গোপন জায়গায়। সেখান থেকেই সে তার আন্দোলনে সহযোদ্ধাদের নির্দেশনা দিতে থাকে। ১৯ জুলাই নিজের ঘরেও শান্তি নেই : বাড়ি যেখানে ছেলেটা জন্মেছিল, সেই বাড়িতে যায় পুলিশ। সুলতানপুর গ্রামের ঘরটি কাঁপে বুটের আওয়াজে। মা কাঁদেন, ছোট ভাই লুকিয়ে পড়ে। কেউ জানে না, ছেলেটার অপরাধ কী? সে কেন ভয়ংকর হয়ে উঠল পুলিশের চোখে? ১৯ জুলাই একদিনেই সবকিছু পাল্টে যায় : সেদিন দুপুর ১২টা। নূরনবী নেতৃত্বে কিছু শিক্ষার্থী জগ্ননাথের সামনে একত্রিত হ্য়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পুলিশের সাথে বাকবিতণ্ডা চলতে থাকে। শিক্ষকরা এসে শিক্ষার্থীদের বুঝানোর চেষ্টা করে। ছাত্ররা সেদিন আন্দোলন না করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং চলে যাচ্ছিল। পেছন থেকে নূরনবীকে কথা বলার জন্য ডেকে কিছু বুঝে উঠার আগেই পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে নেয়। কিছু শিক্ষার্থী তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও সম্ভব হয় না। পুলিশি নির্যাতনের ভয়ংকর বর্ণনা দিলেন নূরনবী (দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত) : ‘প্রস্রাব করার সময় আমাকে বিদ্যুতের শক দেয়। হাতে একটা ইনজেকশন দেয়। ওরা আমার অন্ডোকোষে জোরে জোরে আঘাত করে। বার বার আমার মনে হচ্ছিল আমি মরে যাব। আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এডিসি বদরুল আমাকে ডেকে আলাদা করে। ডিবির পাঁচটা গাড়ি এসেছিল। তারা শুধু আমাকে এখান থেকে উঠিয়ে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। গাড়িতে উঠিয়েই আমাকে মার শুরু করে। বিশেষ করে সহকারী কমিশনার গোলাম মোস্তফা এবং তার সাথে যারা ছিল। যখন আমাকে ডিবি অফিসে নেওয়া হয়, তখন আমি ভেবেছিলাম গাড়িতে যে টর্চার করা হয়েছে, এর চেয়ে বেশি টর্চার আর হতে পারে না। আমাকে হয়ত এখন তারা ছেড়ে দেবে না হয় গ্রেপ্তার দেখাবে। কিন্ত এর চেয়ে যে পাশবিক নির্যাতন যে তারা করতে পারে, তা আমার কল্পনায় ছিল না। আমাকে যখন ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়, তখন চোখে কালো কাপড় বেঁধে দেয়। শুরুতে এক চেয়ারে বসিয়ে আমার শরীরের সব কাপড়চোপড় খুলে ফেলে। আমাকে মারছিল আর বারবার বলছিল, তোর তথ্য আমরা অনেক দিন থেকে শুনেছি, ক্যাম্পাস থেকে কয়েকজন তোর কথা আগেই বলেছে। তুই জঙ্গি, তুই শিবির। শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে বলেছে, তুই ছাত্রদল করিস। তারা যেভাবে আমাকে মেরেছিল, আমি ভেবেছিলাম আমার পায়ের অংশ পচে যাবে বা কেটে ফেলতে হবে।’ আমাকে চিত করিয়ে শুইয়ে বলে তোর এক হাত তো ছাত্রলীগ ভেঙেছে, আরেক হাত আমরা ভেঙে দেব। আমার নাভির নিচ থেকে হাঁটু পর্যন্ত মারধর করে। রুটি যেভাবে বেলে ঠিক সেভাবে আমার হাঁটু থেকে নাভি পর্যন্ত লাঠি দিয়ে চাপ দেয়। আমি কান্না করলেই বলত তোকে মেরেই ফেলব। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে এভাবে মারত। পুলিশ গত ১৫ জুলাই থেকে আমার ফোন ট্র্যাক করছিল। অনেকের বাসায় ছাত্রলীগ কর্মীরা বন্দুক তাক করে। আমি আমার মায়ের থেকে ১৭ তারিখ বিদায় নিয়েছিলাম এই বলে যে, আমি মরে গেলে কেঁদো না। আর বেঁচে থাকলে বিকেলে ফোন দেব। এই ভয়েস রেকর্ডটা তারা শুনিয়ে শুনিয়ে মেরেছে। একপর্যায়ে ওরা আমার হাত-পা দুই দিক করে পা দিয়ে চেপে ধরে। পরবর্তীতে তারা আমার থেকে বিএনসিসির কার্ড পায়। তখন বলে, আমি এত শক্ত কেন? এ জঙ্গি, সে জঙ্গি ট্রেনিং নিয়েছে। আমি এটা বলতে পারিনি যে আমি সেনা মহড়ায় অংশ নিয়েছি, আমি অন্তত জঙ্গি হতে পারি না। আমাকে উলঙ্গ অবস্থায় রেখে দেয়। একটা সময়ে বিকেলে ডিবি হারুন এসে বলে একে বাঁচিয়ে রাখছ কেন? একে ক্রসফায়ার দে। আমার দুই হাঁটুতে হাতুলি দিয়ে পিটিয়ে ওরা ভেঙে ফেলে। আমি ভেবেই নিয়েছিলাম আমাকে মেরেই ফেলবে। কারাগারে নেওয়ার পর আমি অনেক গার্ডকে কান্না করে বলেছি, আমাকে হাসপাতালে নেন। আমাকে হাসপাতালে নেয়নি। কারাগারে পানিতে মরিচ দিয়ে রাখা হত যেন পানি খেতে না পারি, গোসল করতে না পারি। ‘ডিবি পুলিশ আমাকে বলে, তোকে ক্রসফায়ার দেব। তুই রেডি হয়ে নে। আমরা ছয়জন ছিলাম মোট। রমনায় নিয়ে আমাদের চোখ খুলে দেওয়া হলো। আমার হাতে পেট্রোল বোমা ধরায়ে দিল। ভিডিও করা শুরু করল। তারা যে এভাবে মামলা সাজাবে আমি ভাবতেও পারিনি। দেশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ এ রকম পর্যায়ে যাবে ভাবিনি। ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ দেশের মানুষের আস্থার জায়গা হওয়া উচিত ছিল। যাই হোক তারা আমাকে মারেনি। আমি বেঁচে ফিরেছি। স্বাধীন দেশে আবার ফিরতে পেরেছি। এটা আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। এ সময় সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক, মাসুদ রানা, সোহান, স্বর্না আক্তার রিয়া, মোস্তাফিজুর রহমান, ফয়সাল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে নাইমা আক্তার রিতা, বিএম তানজীল, শাহিন আলম শান ও স্বপনসহ অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। কেরানীগঞ্জ জেলের স্বৈরাচারী অভিজ্ঞতা : “কে টাকা দেয়?” “কোথা থেকে চালাচ্ছো?” সে চুপ থাকে। সে জানে, তার অপরাধ সে সত্য কথা বলেছে, সে স্বৈরাচারী রাক্ষসী হাসিনাকে ভয় করেনি। মুক্তি পেলেও আর কোনোদিন মুক্ত হয়নি বের হওয়ার পর তার জীবন থমকে যায়। সিএমএইচ ও বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা শুরু হয়। ডাক্তার জানায়, তার গোপনাঙ্গে চিরস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সে এখনো রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে। মাঝে মাঝে জেগে উঠে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলে “তারা আসছে” তার সারা শরীরে দাগ আঘাতের দাগ, অপমানের দাগ। স্বৈরাচরী নরপিশাচরা ভুলে গেলেও, ইতিহাস কখনও ভুলবে না। নূরনবী আজ বেঁচে আছেন, কিন্তু কোনোদিন স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন কিনা জানা নেই। তার শরীর এখনো ব্যথায় চি ৎকার করে, শরীরে অসংখ্য ফ্যাসিস্ট হাসিনার পালিত পুলিশী নির্যতনের কালো দাগ। কিন্তু রাষ্ট্রের তরফ থেকে এখনো আসেনি কোনো খোঁজ, কোনো তদন্ত, এমনকি কোনো দুঃখ প্রকাশও নয়। সে একজন শিক্ষার্থী ছিলো, একজন বিপ্লবী শিক্ষার্থী, জঙ্গি না, অপরাধী তো নয়ই। তবুও তার নাম লেখা হলো পুলিশের রেজিস্টারে, জামা খুলে তাকে মারধর করা হলো রাষ্ট্রীয় হেফাজতে, তার শরীরে ইনজেকশন ঢুকিয়ে বলা হলো- তোর মতো আরও দশজনকে শেষ করব। তার হাতে আজো ব্যথা যে হাতে একদিন মিছিলের পতাকা ছিল। তার চোখে আজো ঘুম নেই যে চোখে একদিন স্বপ্ন ছিল “একটি সমান বাংলাদেশের”। তার শরীরে কালো দাগ যেগুলো ধুয়ে যায় না,কারণ সেগুলো কেবল চামড়ায় নয়, আত্মায় লেগে আছে।
কিন্তু ইতিহাস জানে,ইতিহাস লিখে রাখবে একজন নূরনবী ছিল। যখন কোনো সরকার দাবি করবে তারা কারও ওপর গুলি চালায়নি, তখন ইতিহাস সামনে রাখবে নূরনবীর ছবিকে। যখন কোনো রাষ্ট্রপতি বলবেন “সবাইকে সমান চোখে দেখি”, তখন কেউ একজন নূরনবীর কালো দাগ দেখিয়ে বলবে, “এইটা দেখেছেন?” রাষ্ট্র চাইলেও মুছে ফেলতে পারবে না এই ক্ষতগুলো, কারণ প্রতিটি দাগের নিচে লেখা আছে “সাম্য নেই”। তাকে ইতিহাস একদিন হয়তো বীর বলবে না, তাকে নিয়ে হয়তো মুর্যাল আঁকা হবে না, কিন্তু প্রতিটি সচেতন তরুণ তার নাম জানবে এই ছেলেটি নিজের শরীর দিয়ে প্রমাণ করে গেছে, যে পতাকার নিচে দাঁড়ালেও সবসময় সুরক্ষা মেলে না। পাঠকের প্রতি প্রশ্ন রেখে যাই। তুমি হ্যাঁ, তুমি, যে এখন এই লেখা পড়ছো, তুমি কি দেখছো তার চোখে কোনো ভয়ের ছায়া? না কি দেখছো এক পতাকাবাহী সৈনিক, যার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, কিন্তু তার স্বপ্ন এখনো জ্বলছে? “স্বৈরাচার হাসিনা আমার হাত ভেঙেছে, শরীর পুড়িয়েছে, নাম দিয়েছে অপরাধী। তবুও আমি নিজেকে বলি আমি ন্যায়ের পক্ষের একজন মানুষ ছিলাম, আছি, থাকবো।”
এক নজরে নুরনবী
নাম : নুরনবী
জন্ম তারিখ : ১১ ডিসেম্বর ২০০১
জন্মস্থান : দেবিদ্বার
পেশা : ছাত্র, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, মাস্টার্স, বিভাগ, ইসলামী স্ট্যাডিজ
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: সুলতানপুর, ইউনিয়ন: গঙ্গামশুল, থানা: দেবিদ্বার, জেলা: কুমিল্লা
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: লোহারপুল, এলাকা: সূত্রাপুর, থানা: সুত্রাপুর, জেলা: ঢাকা
পিতা : নুরুল ইসলাম,
পেশা ও বয়স: চা বিক্রেতা (৫৮)
মাতা : পারভিন আক্তার,
বয়স ও পেশা: গৃহিণী
মাসিক আয় : ৩০,০০০
আয়ের উৎস : বাবা ও বড় ভাই
বাড়ি : টিনশেড
সম্পদ : ঘরের জায়গা
ভাই-বোনের পরিচয়
১. আসমা আক্তার (২৮), বিবাহিতা গৃহিণী,
২. নুর আহমদ (২৭) শিক্ষকতা
৩. মোস্তফা (২১), শিক্ষার্থী: অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ,
৪. আকলিমা (১৯) বিবাহিতা, গৃহিণী
আহত হওয়ার স্থান : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার সময় ও তারিখ: ১৯ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২.০০টা পুর্নবাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে শিক্ষাবৃত্তি ভাতা প্রদান,
২. তার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি/বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু,
৪. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তি
মো: নুর নবী পেশা: ছাত্র, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী স্টাডিজ ক্রমিক: ০৯৮ আইডি: ঢাকা সিটি ০৯৮
জন্ম ও বেড়ে ওঠা সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েও অসাধারণ হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে যে তরুণ, তার নাম নূরনবী। ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর, কুমিল্লার দেবিদ্বারের সুলতানপুর গ্রামের এক পরিশ্রমী পরিবারে জন্ম তার। মা পারভিন আক্তার ও বাবা নুরুল ইসলাম ছিলেন সৎ ও সংগ্রামী মানুষ। বাবার ছোট্ট দোকান ছিল জীবনজীবিকার উপায়, কিন্তু তাদের সংসারে ছিল পরিশ্রম, মূল্যবোধ আর স্বপ্নের আলো। নূরনবী ছোটবেলা থেকেই ছিল মেধাবী, আত্মপ্রত্যয়ী ও নীতিবান। পড়ালেখার প্রতি তার গভীর আগ্রহ, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। সব মিলিয়ে সে ছিল অনন্য। কঠিন বাস্তবতার মাঝেও নিজের স্বপ্নে অবিচল থেকেছে সে। তার জীবনচর্চা প্রমাণ করে জন্ম নয়, মনন ও প্রচেষ্টাই মানুষকে গড়ে তোলে। নূরনবী আজ তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি প্রেরণার নাম। যে নিজেকে গড়েছে আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে।
চোখে স্বপ্ন, কাঁধে দায়িত্ব : তার গ্রামের মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করার পর নূরনবী ভর্তি হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে চলা ছিল এক নতুন আত্মত্যাগের অধ্যায়। ঢাকায় এসে সে মেসে উঠেছিল সহপাঠীদের সঙ্গে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায়। তার মাসিক খরচ চলত বাবার চা বিক্রির আয় এবং বড় ভাইয়ের সীমিত সহায়তায়। অভাব-অনটনের মাঝেও কখনো হতাশা তাকে গ্রাস করতে পারেনি। বরং দেশের ভবিষ্যৎ, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে তার চিন্তা ছিল সুস্পষ্ট, স্পষ্টভাষী। কথা বলত এক আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মতো। নূরনবীর জীবন যাত্রা প্রমাণ করে সংগ্রাম থাকলেও স্বপ্ন যদি বড় হয়, তবে পথ পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের জুলাই যখন ছাত্ররা আবার রাস্তায় নামে : ১ জুলাই ২০২৪, শুরু হয় ইতিহাস গড়ার এক আন্দোলন। রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, শিক্ষা-চাকরি নিয়ে অসাম্য, ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে সরব হয় নতুন প্রজন্ম। নূরনবী তখন জড়িয়ে পড়েন আন্দোলনের প্রতিটি পরতে। দিনে ক্লাস করতেন, রাতে প্ল্যাকার্ড লিখতেন। ছোট ছোট স্লোগান থেকে শুরু করে বড় বক্তৃতা সর্বত্রই ছিল তার সরব উপস্থিতি। ১১ জুলাই-নেতৃত্বে উঠে আসার গল্প : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনা আন্দোলনকে ঘনীভূত করে তোলে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরনো নেতৃত্ব হুমকি পেয়ে পিছিয়ে গেলে, ভয় না পেয়ে সামনে আসেন নূরনবীসহ আরো কয়েকজন। “আমরা কেউ থাকবো না? তাহলে আন্দোলনের সামনে থাকবে কে?” এই কথাগুলো বলেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বাকি সবার মতো নুর নবীও উঠে আসে সামনের সারিতে। ১১ জুলাই সকাল ১১টা, নূরনবীদের নেতৃত্বে মিছিল বের হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। সে মিছিল শুধু রাস্তাই দখল করেনি, দখল করেছিলো মানুষের হৃদয়। মিছিলটি ঝড়ের বেগে প্রায় ৮ কিলোমিটার ধেয়ে এসে দখল নেয় শাহবাগ। উজ্জীবিত করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। ছাত্ররা তখন থেকেই এক নামে চেনে তাকে। ১৫ জুলাই-এক আঘাতে হাজার স্বপ্ন ভেঙে যায় : সেদিন ছিল শুক্রবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল করছিল। নূরনবী সেই মিছিলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। হঠাৎই পুলিশ ও ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের উপর একসাথে হামলা করে। বিশেষকরে ছাত্রলীগ মেয়েদের উপর আক্রমণ করে। নূরনবীসহ আরও কিছু শিক্ষার্থী মেয়েদের রক্ষা করতে বাঁধার প্রাচীর তৈরি করে। একটি শক্ত লাঠির আঘাতে নূরনবীর ডান হাত ভেঙ্গে যায়। পরের দিন সে ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকলো। সহযোদ্ধার মৃত্যু, তবুও নেতৃত্ব ছাড়েননি : ১৬ জুলাই সহযোদ্ধা আবু সাঈদ গুলিতে নিহত হন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হয় গায়েবী জানাজা। ব্যথিত কণ্ঠে সে বলেছিল, “এই রক্ত শুধু একজনের না, এ রক্ত আমাদের সবার ওপর ঋণ রেখে গেল।”
১৬ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েরও চারজন গুলিবিদ্ধ হয়, আন্দোলনের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে ভয়। কিন্তু নূরনবী নেতৃত্ব ছাড়েননি। হাত ভাঙা ছিল, কিন্তু মনের শক্তি দ্বিগুণ। ১৮ জুলাই পুলিশের রেড হয় তার মেসে : এখনই যদি গ্রেফতার হয় তাহলে আন্দোলন থেমে যাবে। তাই সহযোদ্ধাদের কাছে রেড হওয়ার খবর জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ কোনো কিছু ছাড়াই মেস ছেড়ে আশ্রয় নেয় এক গোপন জায়গায়। সেখান থেকেই সে তার আন্দোলনে সহযোদ্ধাদের নির্দেশনা দিতে থাকে। ১৯ জুলাই নিজের ঘরেও শান্তি নেই : বাড়ি যেখানে ছেলেটা জন্মেছিল, সেই বাড়িতে যায় পুলিশ। সুলতানপুর গ্রামের ঘরটি কাঁপে বুটের আওয়াজে। মা কাঁদেন, ছোট ভাই লুকিয়ে পড়ে। কেউ জানে না, ছেলেটার অপরাধ কী? সে কেন ভয়ংকর হয়ে উঠল পুলিশের চোখে? ১৯ জুলাই একদিনেই সবকিছু পাল্টে যায় : সেদিন দুপুর ১২টা। নূরনবী নেতৃত্বে কিছু শিক্ষার্থী জগ্ননাথের সামনে একত্রিত হ্য়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পুলিশের সাথে বাকবিতণ্ডা চলতে থাকে। শিক্ষকরা এসে শিক্ষার্থীদের বুঝানোর চেষ্টা করে। ছাত্ররা সেদিন আন্দোলন না করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং চলে যাচ্ছিল। পেছন থেকে নূরনবীকে কথা বলার জন্য ডেকে কিছু বুঝে উঠার আগেই পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে নেয়। কিছু শিক্ষার্থী তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও সম্ভব হয় না। পুলিশি নির্যাতনের ভয়ংকর বর্ণনা দিলেন নূরনবী (দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত) : ‘প্রস্রাব করার সময় আমাকে বিদ্যুতের শক দেয়। হাতে একটা ইনজেকশন দেয়। ওরা আমার অন্ডোকোষে জোরে জোরে আঘাত করে। বার বার আমার মনে হচ্ছিল আমি মরে যাব। আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এডিসি বদরুল আমাকে ডেকে আলাদা করে। ডিবির পাঁচটা গাড়ি এসেছিল। তারা শুধু আমাকে এখান থেকে উঠিয়ে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। গাড়িতে উঠিয়েই আমাকে মার শুরু করে। বিশেষ করে সহকারী কমিশনার গোলাম মোস্তফা এবং তার সাথে যারা ছিল। যখন আমাকে ডিবি অফিসে নেওয়া হয়, তখন আমি ভেবেছিলাম গাড়িতে যে টর্চার করা হয়েছে, এর চেয়ে বেশি টর্চার আর হতে পারে না। আমাকে হয়ত এখন তারা ছেড়ে দেবে না হয় গ্রেপ্তার দেখাবে। কিন্ত এর চেয়ে যে পাশবিক নির্যাতন যে তারা করতে পারে, তা আমার কল্পনায় ছিল না। আমাকে যখন ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়, তখন চোখে কালো কাপড় বেঁধে দেয়। শুরুতে এক চেয়ারে বসিয়ে আমার শরীরের সব কাপড়চোপড় খুলে ফেলে। আমাকে মারছিল আর বারবার বলছিল, তোর তথ্য আমরা অনেক দিন থেকে শুনেছি, ক্যাম্পাস থেকে কয়েকজন তোর কথা আগেই বলেছে। তুই জঙ্গি, তুই শিবির। শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে বলেছে, তুই ছাত্রদল করিস। তারা যেভাবে আমাকে মেরেছিল, আমি ভেবেছিলাম আমার পায়ের অংশ পচে যাবে বা কেটে ফেলতে হবে।’ আমাকে চিত করিয়ে শুইয়ে বলে তোর এক হাত তো ছাত্রলীগ ভেঙেছে, আরেক হাত আমরা ভেঙে দেব। আমার নাভির নিচ থেকে হাঁটু পর্যন্ত মারধর করে। রুটি যেভাবে বেলে ঠিক সেভাবে আমার হাঁটু থেকে নাভি পর্যন্ত লাঠি দিয়ে চাপ দেয়। আমি কান্না করলেই বলত তোকে মেরেই ফেলব। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে এভাবে মারত। পুলিশ গত ১৫ জুলাই থেকে আমার ফোন ট্র্যাক করছিল। অনেকের বাসায় ছাত্রলীগ কর্মীরা বন্দুক তাক করে। আমি আমার মায়ের থেকে ১৭ তারিখ বিদায় নিয়েছিলাম এই বলে যে, আমি মরে গেলে কেঁদো না। আর বেঁচে থাকলে বিকেলে ফোন দেব। এই ভয়েস রেকর্ডটা তারা শুনিয়ে শুনিয়ে মেরেছে। একপর্যায়ে ওরা আমার হাত-পা দুই দিক করে পা দিয়ে চেপে ধরে। পরবর্তীতে তারা আমার থেকে বিএনসিসির কার্ড পায়। তখন বলে, আমি এত শক্ত কেন? এ জঙ্গি, সে জঙ্গি ট্রেনিং নিয়েছে। আমি এটা বলতে পারিনি যে আমি সেনা মহড়ায় অংশ নিয়েছি, আমি অন্তত জঙ্গি হতে পারি না। আমাকে উলঙ্গ অবস্থায় রেখে দেয়। একটা সময়ে বিকেলে ডিবি হারুন এসে বলে একে বাঁচিয়ে রাখছ কেন? একে ক্রসফায়ার দে। আমার দুই হাঁটুতে হাতুলি দিয়ে পিটিয়ে ওরা ভেঙে ফেলে। আমি ভেবেই নিয়েছিলাম আমাকে মেরেই ফেলবে। কারাগারে নেওয়ার পর আমি অনেক গার্ডকে কান্না করে বলেছি, আমাকে হাসপাতালে নেন। আমাকে হাসপাতালে নেয়নি। কারাগারে পানিতে মরিচ দিয়ে রাখা হত যেন পানি খেতে না পারি, গোসল করতে না পারি। ‘ডিবি পুলিশ আমাকে বলে, তোকে ক্রসফায়ার দেব। তুই রেডি হয়ে নে। আমরা ছয়জন ছিলাম মোট। রমনায় নিয়ে আমাদের চোখ খুলে দেওয়া হলো। আমার হাতে পেট্রোল বোমা ধরায়ে দিল। ভিডিও করা শুরু করল। তারা যে এভাবে মামলা সাজাবে আমি ভাবতেও পারিনি। দেশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ এ রকম পর্যায়ে যাবে ভাবিনি। ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ দেশের মানুষের আস্থার জায়গা হওয়া উচিত ছিল। যাই হোক তারা আমাকে মারেনি। আমি বেঁচে ফিরেছি। স্বাধীন দেশে আবার ফিরতে পেরেছি। এটা আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। এ সময় সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক, মাসুদ রানা, সোহান, স্বর্না আক্তার রিয়া, মোস্তাফিজুর রহমান, ফয়সাল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে নাইমা আক্তার রিতা, বিএম তানজীল, শাহিন আলম শান ও স্বপনসহ অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। কেরানীগঞ্জ জেলের স্বৈরাচারী অভিজ্ঞতা : “কে টাকা দেয়?” “কোথা থেকে চালাচ্ছো?” সে চুপ থাকে। সে জানে, তার অপরাধ সে সত্য কথা বলেছে, সে স্বৈরাচারী রাক্ষসী হাসিনাকে ভয় করেনি। মুক্তি পেলেও আর কোনোদিন মুক্ত হয়নি বের হওয়ার পর তার জীবন থমকে যায়। সিএমএইচ ও বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা শুরু হয়। ডাক্তার জানায়, তার গোপনাঙ্গে চিরস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সে এখনো রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে। মাঝে মাঝে জেগে উঠে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলে “তারা আসছে” তার সারা শরীরে দাগ আঘাতের দাগ, অপমানের দাগ। স্বৈরাচরী নরপিশাচরা ভুলে গেলেও, ইতিহাস কখনও ভুলবে না। নূরনবী আজ বেঁচে আছেন, কিন্তু কোনোদিন স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন কিনা জানা নেই। তার শরীর এখনো ব্যথায় চি ৎকার করে, শরীরে অসংখ্য ফ্যাসিস্ট হাসিনার পালিত পুলিশী নির্যতনের কালো দাগ। কিন্তু রাষ্ট্রের তরফ থেকে এখনো আসেনি কোনো খোঁজ, কোনো তদন্ত, এমনকি কোনো দুঃখ প্রকাশও নয়। সে একজন শিক্ষার্থী ছিলো, একজন বিপ্লবী শিক্ষার্থী, জঙ্গি না, অপরাধী তো নয়ই। তবুও তার নাম লেখা হলো পুলিশের রেজিস্টারে, জামা খুলে তাকে মারধর করা হলো রাষ্ট্রীয় হেফাজতে, তার শরীরে ইনজেকশন ঢুকিয়ে বলা হলো- তোর মতো আরও দশজনকে শেষ করব। তার হাতে আজো ব্যথা যে হাতে একদিন মিছিলের পতাকা ছিল। তার চোখে আজো ঘুম নেই যে চোখে একদিন স্বপ্ন ছিল “একটি সমান বাংলাদেশের”। তার শরীরে কালো দাগ যেগুলো ধুয়ে যায় না,কারণ সেগুলো কেবল চামড়ায় নয়, আত্মায় লেগে আছে।
কিন্তু ইতিহাস জানে,ইতিহাস লিখে রাখবে একজন নূরনবী ছিল। যখন কোনো সরকার দাবি করবে তারা কারও ওপর গুলি চালায়নি, তখন ইতিহাস সামনে রাখবে নূরনবীর ছবিকে। যখন কোনো রাষ্ট্রপতি বলবেন “সবাইকে সমান চোখে দেখি”, তখন কেউ একজন নূরনবীর কালো দাগ দেখিয়ে বলবে, “এইটা দেখেছেন?” রাষ্ট্র চাইলেও মুছে ফেলতে পারবে না এই ক্ষতগুলো, কারণ প্রতিটি দাগের নিচে লেখা আছে “সাম্য নেই”। তাকে ইতিহাস একদিন হয়তো বীর বলবে না, তাকে নিয়ে হয়তো মুর্যাল আঁকা হবে না, কিন্তু প্রতিটি সচেতন তরুণ তার নাম জানবে এই ছেলেটি নিজের শরীর দিয়ে প্রমাণ করে গেছে, যে পতাকার নিচে দাঁড়ালেও সবসময় সুরক্ষা মেলে না। পাঠকের প্রতি প্রশ্ন রেখে যাই। তুমি হ্যাঁ, তুমি, যে এখন এই লেখা পড়ছো, তুমি কি দেখছো তার চোখে কোনো ভয়ের ছায়া? না কি দেখছো এক পতাকাবাহী সৈনিক, যার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, কিন্তু তার স্বপ্ন এখনো জ্বলছে? “স্বৈরাচার হাসিনা আমার হাত ভেঙেছে, শরীর পুড়িয়েছে, নাম দিয়েছে অপরাধী। তবুও আমি নিজেকে বলি আমি ন্যায়ের পক্ষের একজন মানুষ ছিলাম, আছি, থাকবো।”
এক নজরে নুরনবী
নাম : নুরনবী
জন্ম তারিখ : ১১ ডিসেম্বর ২০০১
জন্মস্থান : দেবিদ্বার
পেশা : ছাত্র, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, মাস্টার্স, বিভাগ, ইসলামী স্ট্যাডিজ
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: সুলতানপুর, ইউনিয়ন: গঙ্গামশুল, থানা: দেবিদ্বার, জেলা: কুমিল্লা
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: লোহারপুল, এলাকা: সূত্রাপুর, থানা: সুত্রাপুর, জেলা: ঢাকা
পিতা : নুরুল ইসলাম,
পেশা ও বয়স: চা বিক্রেতা (৫৮)
মাতা : পারভিন আক্তার,
বয়স ও পেশা: গৃহিণী
মাসিক আয় : ৩০,০০০
আয়ের উৎস : বাবা ও বড় ভাই
বাড়ি : টিনশেড
সম্পদ : ঘরের জায়গা
ভাই-বোনের পরিচয়
১. আসমা আক্তার (২৮), বিবাহিতা গৃহিণী,
২. নুর আহমদ (২৭) শিক্ষকতা
৩. মোস্তফা (২১), শিক্ষার্থী: অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ,
৪. আকলিমা (১৯) বিবাহিতা, গৃহিণী
আহত হওয়ার স্থান : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার সময় ও তারিখ: ১৯ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২.০০টা পুর্নবাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে শিক্ষাবৃত্তি ভাতা প্রদান,
২. তার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি/বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু,
৪. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তি
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍