মো: সাহলম গাজী
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ঠিকানা : শনির আখড়া, ঢাকা
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
পরিচয় নিম্নবিত্ত গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম নেয়া সাহসী ও সংগ্রামী এক মানুষ সাহলম গাজী। যিনি জীবনভর সংগ্রাম করে গেছেন শুধু নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে। তিনি ১৯৯৬ সালের ১১ জুলাই চাঁদপুর জেলার সদর থানার এক প্রান্তিক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবুল ফজল ও মাতা আয়শা বেগম দু’জনেই আজ এ পৃথিবীতে নেই। অল্প বয়সেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে পরিবারহীন এক জীবন শুরু হয় তার। শৈশব থেকেই তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে বেঁচে থাকার জন্য, দু’ মুঠো অন্নের জন্য এবং একটি সামান্য আশ্রয়ের জন্য।
অভাব-অনটনের মাঝেই সাহলম বেড়ে উঠেছেন। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তাকে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে দেয়নি, কিন্তু জীবন তাকে শেখায় বাস্তবতা, শেখায় লড়াই। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং শনির আখড়ায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি একজন দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন, বিশেষ করে টাইলস বসানোর কাজ করে সামান্য উপার্জনে সংসার চালাতেন। তার জীবন ছিল সাধারণ, কিন্তু তাঁর চরিত্র ছিল অসাধারণ। মুখে সহজ সরল কথা, চোখে সৎ মানুষের দৃঢ়তা, আর মনে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অবিচল অবস্থান। পারিবারিক অবস্থা সাহলম গাজীর পরিবারে রয়েছে তার দুই ছেলে। বড় ছেলে শামিম যার বয়স ১৫, বর্তমানে কর্মহীন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ছোট ছেলে নাইম অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। সে এখনো শিক্ষা ও স্বপ্নে বিশ্বাসী। সাহলম চেয়েছিলেন, তার সন্তানেরা যেন অন্তত তার মতো সংগ্রামে না জড়ায়, যেন তারা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়। তাই সীমাহীন কষ্টের মাঝেও সন্তানদের পড়াশুনার খরচ জোগাতে কোনো কার্পণ্য করতেন না। যদিও সাহলমের জীবন ছিল দারিদ্র্য ও শ্রমের গল্প, কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল অগাধ সাহস ও ন্যায়ের প্রতি অনুরাগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য বড় পদে থাকাই জরুরি নয়, সত্যের পক্ষে দৃঢ় থাকা একজন সাধারণ মানুষকেও করতে পারে অসাধারণ। নিঃস্বতা তাকে দমাতে পারেনি, বরং আরও বেশি জোরালো করেছে তার আত্মবিশ্বাস ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সাহলম গাজী ছিলেন সেসব নিঃশব্দ বীরদের একজন, যারা নীরবে সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলেন। ঘটনার বিবরণ দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে। দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। সাহলম গাজী, যিনি কখনোই রাজনীতি করতেন না, শুধু একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে রাজপথে নামেন। তিনি মনে করতেন এই প্রজন্মের ছাত্ররা, যারা জাতির ভবিষ্যৎ, তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে একজন সাধারণ মানুষকেও পাশে থাকতে হবে।
জুমার নামাজ শেষ করে সমস্ত কাজ ফেলে তিনি যান রায়েরবাগে আন্দোলনে অংশ নিতে। বিকেল পর্যন্ত আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু বিকেল গড়াতেই চিত্র পাল্টে যায়। পুলিশের দিকে থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। সন্ধ্যার পর, রাত ১০টার দিকে, যখন আন্দোলনে আহত অনেক ছাত্র ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ছিল, সাহলম গাজী তখনও মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি কয়েকজন আহত তরুণকে সহায়তা করতে গিয়ে হঠাৎ পুলিশের একটি গুলি সরাসরি তার ডান পায়ে এসে আঘাত হানে। গুলিটি এতটাই গভীরভাবে ঢুকে যায় যে, তার পায়ের রগ ছিঁড়ে যায় এবং মুহূর্তেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারপাশে তখনও গুলির আওয়াজ, চিৎকার, আতঙ্কে থমকে যাওয়া শহর। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ সাহলম গাজীর জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই যখন তিনি রায়েরবাগে আন্দোলনে আহত হন। পুলিশের গুলিতে তাঁর ডান পায়ের রগ ছিঁড়ে যায়, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, চারপাশে তখনও চলছিল গুলির শব্দ আর আতঙ্কের চিৎকার। একজন সাধারণ, নিরীহ মানুষ যিনি শুধু ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছিলেন, হয়ে ওঠেন নিষ্ঠুর রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার। তাকে দ্রুত রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, উপরমহলের নির্দেশ আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা না করতে। একজন গুরুতর আহত মানুষ, যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, কিন্তু কেউ তার চিকিৎসায় হাত বাড়ায়নি। এরপর সাহলমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু চিত্র ছিল একই রকম নিষ্ঠুর। চিকিৎসকরা তার কাছে ঘেঁষতেও ভয় পাচ্ছিলেন, কেউ তার নাম নথিভুক্ত করেননি, এমনকি কাগজে স্বাক্ষর পর্যন্ত নেয়নি। ফলে দুই দিন ধরে সাহলম গাজী রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালের এক কোণে পড়ে ছিলেন অসহায়, অবহেলিত, উপেক্ষিত। পায়ের ক্ষত থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছিল, যন্ত্রণা তার শরীর ও স্নায়ুকে ধীরে ধীরে নিস্তেজ করে দিচ্ছিল। একসময় এক অজ্ঞাতনামা নিরাপত্তা রক্ষী, মানবতার তাড়নায় সাহস করে তাঁর হয়ে চিকিৎসা কাগজে স্বাক্ষর করেন। তখনই শুরু হয় চিকিৎসা। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে পায়ের কোষ ও রগে। চিকিৎসকদের ভাষায়, জীবন বাঁচাতে হলে পা কেটে ফেলতেই হবে। আজ সাহলম গাজী চিরদিনের জন্য পঙ্গু। এক সময়ের কর্মঠ দিনমজুর, যিনি নিজের শ্রমে সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন, এখন নিজেই হাঁটতে পারেন না। পরিবারের কোনো আয় নেই, বড় ছেলে কর্মহীন, ছোট ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন খাবার জোগাড় করাও এখন দুরূহ। চিকিৎসা খরচের জন্য তিনি এরই মধ্যে তিন লক্ষ টাকারও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
এটাই কি ছিল তার প্রাপ্য? যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, আজ তিনিই সমাজ ও রাষ্ট্রের করুণ আর্তি করছেন “একটুকু মানবতা, সামান্য সহানুভূতি।” তার জীবনের গল্প শুধু একজন মানুষের দুর্ভাগ্যের গল্প নয়, এটি এই সমাজের নৈতিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি। সাহলম গাজী আজও আশা করেন এই সমাজ একদিন তাকে ভুলে যাবে না। সাহলম গাজী এখন শুধুই একজন প্রতিবাদী নাগরিক নন, তিনি এক জীবন্ত ইতিহাস। তার হারানো পায়ের প্রতিটি শিরায় জমে আছে অবহেলা, যন্ত্রণা আর অনুশোচনা। তিনি আর কাজ করতে পারেন না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। প্রতি রাত কাটে অজানা অনিশ্চয়তায়। একটি গুলি শুধু তার পা কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তার স্বপ্ন, সম্মান, স্বাধীনতা এবং স্বাভাবিক জীবন। এই মানুষটির পাশে দাঁড়ানো মানেই মানবতা, বিবেক এবং ন্যায়ের জয়। আমরা যদি এখনও চোখ না খুলি, তাহলে হয়তো এমন মানুষ বারবার অন্যায়ের শিকার হবে, আর আমরা নীরব দর্শকই রয়ে যাব। প্রস্তাবনা ১.একটি হুইল চেয়ার বা সহায়ক ডিভাইস ২.পরিবার চালানোর জন্য মাসিক ভাতা ৩.সন্তানদের পড়ালেখার জন্য সহযোগিতা ৪.পুনর্বাসন সহায়তা ও মানসিক চিকিৎসা
এক নজরে মো: সাহলম গাজী নাম : মো: সাহলম গাজী পিতা : আবুল ফজল, মৃত মাতা : আয়শা বেগম, মৃত ছেলে : শামিম, ১৫ ভাই : নাইম, ছাত্র, নবম শ্রেণি পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৪ জন ঠিকানা : শনির আখড়া, ঢাকা আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪ আক্রমণকারী : পুলিশ আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ, ঢাকা
গুলির দাগ ও স্বাধীনতার অনন্য আলো
মো: সাহলম গাজী ক্রমিক: ০৯৯ আইডি: ঢাকা সিটি ০৯৯
জন্ম পরিচয় নিম্নবিত্ত গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম নেয়া সাহসী ও সংগ্রামী এক মানুষ সাহলম গাজী। যিনি জীবনভর সংগ্রাম করে গেছেন শুধু নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে। তিনি ১৯৯৬ সালের ১১ জুলাই চাঁদপুর জেলার সদর থানার এক প্রান্তিক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবুল ফজল ও মাতা আয়শা বেগম দু’জনেই আজ এ পৃথিবীতে নেই। অল্প বয়সেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে পরিবারহীন এক জীবন শুরু হয় তার। শৈশব থেকেই তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে বেঁচে থাকার জন্য, দু’ মুঠো অন্নের জন্য এবং একটি সামান্য আশ্রয়ের জন্য।
অভাব-অনটনের মাঝেই সাহলম বেড়ে উঠেছেন। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তাকে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে দেয়নি, কিন্তু জীবন তাকে শেখায় বাস্তবতা, শেখায় লড়াই। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং শনির আখড়ায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি একজন দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন, বিশেষ করে টাইলস বসানোর কাজ করে সামান্য উপার্জনে সংসার চালাতেন। তার জীবন ছিল সাধারণ, কিন্তু তাঁর চরিত্র ছিল অসাধারণ। মুখে সহজ সরল কথা, চোখে সৎ মানুষের দৃঢ়তা, আর মনে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অবিচল অবস্থান। পারিবারিক অবস্থা সাহলম গাজীর পরিবারে রয়েছে তার দুই ছেলে। বড় ছেলে শামিম যার বয়স ১৫, বর্তমানে কর্মহীন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ছোট ছেলে নাইম অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। সে এখনো শিক্ষা ও স্বপ্নে বিশ্বাসী। সাহলম চেয়েছিলেন, তার সন্তানেরা যেন অন্তত তার মতো সংগ্রামে না জড়ায়, যেন তারা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়। তাই সীমাহীন কষ্টের মাঝেও সন্তানদের পড়াশুনার খরচ জোগাতে কোনো কার্পণ্য করতেন না। যদিও সাহলমের জীবন ছিল দারিদ্র্য ও শ্রমের গল্প, কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল অগাধ সাহস ও ন্যায়ের প্রতি অনুরাগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য বড় পদে থাকাই জরুরি নয়, সত্যের পক্ষে দৃঢ় থাকা একজন সাধারণ মানুষকেও করতে পারে অসাধারণ। নিঃস্বতা তাকে দমাতে পারেনি, বরং আরও বেশি জোরালো করেছে তার আত্মবিশ্বাস ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সাহলম গাজী ছিলেন সেসব নিঃশব্দ বীরদের একজন, যারা নীরবে সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলেন। ঘটনার বিবরণ দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে। দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। সাহলম গাজী, যিনি কখনোই রাজনীতি করতেন না, শুধু একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে রাজপথে নামেন। তিনি মনে করতেন এই প্রজন্মের ছাত্ররা, যারা জাতির ভবিষ্যৎ, তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে একজন সাধারণ মানুষকেও পাশে থাকতে হবে।
জুমার নামাজ শেষ করে সমস্ত কাজ ফেলে তিনি যান রায়েরবাগে আন্দোলনে অংশ নিতে। বিকেল পর্যন্ত আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু বিকেল গড়াতেই চিত্র পাল্টে যায়। পুলিশের দিকে থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। সন্ধ্যার পর, রাত ১০টার দিকে, যখন আন্দোলনে আহত অনেক ছাত্র ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ছিল, সাহলম গাজী তখনও মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি কয়েকজন আহত তরুণকে সহায়তা করতে গিয়ে হঠাৎ পুলিশের একটি গুলি সরাসরি তার ডান পায়ে এসে আঘাত হানে। গুলিটি এতটাই গভীরভাবে ঢুকে যায় যে, তার পায়ের রগ ছিঁড়ে যায় এবং মুহূর্তেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারপাশে তখনও গুলির আওয়াজ, চিৎকার, আতঙ্কে থমকে যাওয়া শহর। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ সাহলম গাজীর জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই যখন তিনি রায়েরবাগে আন্দোলনে আহত হন। পুলিশের গুলিতে তাঁর ডান পায়ের রগ ছিঁড়ে যায়, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, চারপাশে তখনও চলছিল গুলির শব্দ আর আতঙ্কের চিৎকার। একজন সাধারণ, নিরীহ মানুষ যিনি শুধু ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছিলেন, হয়ে ওঠেন নিষ্ঠুর রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার। তাকে দ্রুত রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, উপরমহলের নির্দেশ আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা না করতে। একজন গুরুতর আহত মানুষ, যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, কিন্তু কেউ তার চিকিৎসায় হাত বাড়ায়নি। এরপর সাহলমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু চিত্র ছিল একই রকম নিষ্ঠুর। চিকিৎসকরা তার কাছে ঘেঁষতেও ভয় পাচ্ছিলেন, কেউ তার নাম নথিভুক্ত করেননি, এমনকি কাগজে স্বাক্ষর পর্যন্ত নেয়নি। ফলে দুই দিন ধরে সাহলম গাজী রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালের এক কোণে পড়ে ছিলেন অসহায়, অবহেলিত, উপেক্ষিত। পায়ের ক্ষত থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছিল, যন্ত্রণা তার শরীর ও স্নায়ুকে ধীরে ধীরে নিস্তেজ করে দিচ্ছিল। একসময় এক অজ্ঞাতনামা নিরাপত্তা রক্ষী, মানবতার তাড়নায় সাহস করে তাঁর হয়ে চিকিৎসা কাগজে স্বাক্ষর করেন। তখনই শুরু হয় চিকিৎসা। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে পায়ের কোষ ও রগে। চিকিৎসকদের ভাষায়, জীবন বাঁচাতে হলে পা কেটে ফেলতেই হবে। আজ সাহলম গাজী চিরদিনের জন্য পঙ্গু। এক সময়ের কর্মঠ দিনমজুর, যিনি নিজের শ্রমে সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন, এখন নিজেই হাঁটতে পারেন না। পরিবারের কোনো আয় নেই, বড় ছেলে কর্মহীন, ছোট ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন খাবার জোগাড় করাও এখন দুরূহ। চিকিৎসা খরচের জন্য তিনি এরই মধ্যে তিন লক্ষ টাকারও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
এটাই কি ছিল তার প্রাপ্য? যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, আজ তিনিই সমাজ ও রাষ্ট্রের করুণ আর্তি করছেন “একটুকু মানবতা, সামান্য সহানুভূতি।” তার জীবনের গল্প শুধু একজন মানুষের দুর্ভাগ্যের গল্প নয়, এটি এই সমাজের নৈতিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি। সাহলম গাজী আজও আশা করেন এই সমাজ একদিন তাকে ভুলে যাবে না। সাহলম গাজী এখন শুধুই একজন প্রতিবাদী নাগরিক নন, তিনি এক জীবন্ত ইতিহাস। তার হারানো পায়ের প্রতিটি শিরায় জমে আছে অবহেলা, যন্ত্রণা আর অনুশোচনা। তিনি আর কাজ করতে পারেন না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। প্রতি রাত কাটে অজানা অনিশ্চয়তায়। একটি গুলি শুধু তার পা কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তার স্বপ্ন, সম্মান, স্বাধীনতা এবং স্বাভাবিক জীবন। এই মানুষটির পাশে দাঁড়ানো মানেই মানবতা, বিবেক এবং ন্যায়ের জয়। আমরা যদি এখনও চোখ না খুলি, তাহলে হয়তো এমন মানুষ বারবার অন্যায়ের শিকার হবে, আর আমরা নীরব দর্শকই রয়ে যাব। প্রস্তাবনা ১.একটি হুইল চেয়ার বা সহায়ক ডিভাইস ২.পরিবার চালানোর জন্য মাসিক ভাতা ৩.সন্তানদের পড়ালেখার জন্য সহযোগিতা ৪.পুনর্বাসন সহায়তা ও মানসিক চিকিৎসা
এক নজরে মো: সাহলম গাজী
নাম : মো: সাহলম গাজী
পিতা : আবুল ফজল, মৃত
মাতা : আয়শা বেগম, মৃত
ছেলে : শামিম, ১৫
ভাই : নাইম, ছাত্র, নবম শ্রেণি
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ঠিকানা : শনির আখড়া, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ, ঢাকা
অভাব-অনটনের মাঝেই সাহলম বেড়ে উঠেছেন। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তাকে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে দেয়নি, কিন্তু জীবন তাকে শেখায় বাস্তবতা, শেখায় লড়াই। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং শনির আখড়ায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি একজন দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন, বিশেষ করে টাইলস বসানোর কাজ করে সামান্য উপার্জনে সংসার চালাতেন। তার জীবন ছিল সাধারণ, কিন্তু তাঁর চরিত্র ছিল অসাধারণ। মুখে সহজ সরল কথা, চোখে সৎ মানুষের দৃঢ়তা, আর মনে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অবিচল অবস্থান। পারিবারিক অবস্থা সাহলম গাজীর পরিবারে রয়েছে তার দুই ছেলে। বড় ছেলে শামিম যার বয়স ১৫, বর্তমানে কর্মহীন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ছোট ছেলে নাইম অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। সে এখনো শিক্ষা ও স্বপ্নে বিশ্বাসী। সাহলম চেয়েছিলেন, তার সন্তানেরা যেন অন্তত তার মতো সংগ্রামে না জড়ায়, যেন তারা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়। তাই সীমাহীন কষ্টের মাঝেও সন্তানদের পড়াশুনার খরচ জোগাতে কোনো কার্পণ্য করতেন না। যদিও সাহলমের জীবন ছিল দারিদ্র্য ও শ্রমের গল্প, কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল অগাধ সাহস ও ন্যায়ের প্রতি অনুরাগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য বড় পদে থাকাই জরুরি নয়, সত্যের পক্ষে দৃঢ় থাকা একজন সাধারণ মানুষকেও করতে পারে অসাধারণ। নিঃস্বতা তাকে দমাতে পারেনি, বরং আরও বেশি জোরালো করেছে তার আত্মবিশ্বাস ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সাহলম গাজী ছিলেন সেসব নিঃশব্দ বীরদের একজন, যারা নীরবে সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলেন। ঘটনার বিবরণ দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে। দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। সাহলম গাজী, যিনি কখনোই রাজনীতি করতেন না, শুধু একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে রাজপথে নামেন। তিনি মনে করতেন এই প্রজন্মের ছাত্ররা, যারা জাতির ভবিষ্যৎ, তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে একজন সাধারণ মানুষকেও পাশে থাকতে হবে।
জুমার নামাজ শেষ করে সমস্ত কাজ ফেলে তিনি যান রায়েরবাগে আন্দোলনে অংশ নিতে। বিকেল পর্যন্ত আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু বিকেল গড়াতেই চিত্র পাল্টে যায়। পুলিশের দিকে থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। সন্ধ্যার পর, রাত ১০টার দিকে, যখন আন্দোলনে আহত অনেক ছাত্র ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ছিল, সাহলম গাজী তখনও মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি কয়েকজন আহত তরুণকে সহায়তা করতে গিয়ে হঠাৎ পুলিশের একটি গুলি সরাসরি তার ডান পায়ে এসে আঘাত হানে। গুলিটি এতটাই গভীরভাবে ঢুকে যায় যে, তার পায়ের রগ ছিঁড়ে যায় এবং মুহূর্তেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারপাশে তখনও গুলির আওয়াজ, চিৎকার, আতঙ্কে থমকে যাওয়া শহর। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ সাহলম গাজীর জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই যখন তিনি রায়েরবাগে আন্দোলনে আহত হন। পুলিশের গুলিতে তাঁর ডান পায়ের রগ ছিঁড়ে যায়, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, চারপাশে তখনও চলছিল গুলির শব্দ আর আতঙ্কের চিৎকার। একজন সাধারণ, নিরীহ মানুষ যিনি শুধু ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছিলেন, হয়ে ওঠেন নিষ্ঠুর রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার। তাকে দ্রুত রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, উপরমহলের নির্দেশ আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা না করতে। একজন গুরুতর আহত মানুষ, যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, কিন্তু কেউ তার চিকিৎসায় হাত বাড়ায়নি। এরপর সাহলমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু চিত্র ছিল একই রকম নিষ্ঠুর। চিকিৎসকরা তার কাছে ঘেঁষতেও ভয় পাচ্ছিলেন, কেউ তার নাম নথিভুক্ত করেননি, এমনকি কাগজে স্বাক্ষর পর্যন্ত নেয়নি। ফলে দুই দিন ধরে সাহলম গাজী রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালের এক কোণে পড়ে ছিলেন অসহায়, অবহেলিত, উপেক্ষিত। পায়ের ক্ষত থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছিল, যন্ত্রণা তার শরীর ও স্নায়ুকে ধীরে ধীরে নিস্তেজ করে দিচ্ছিল। একসময় এক অজ্ঞাতনামা নিরাপত্তা রক্ষী, মানবতার তাড়নায় সাহস করে তাঁর হয়ে চিকিৎসা কাগজে স্বাক্ষর করেন। তখনই শুরু হয় চিকিৎসা। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে পায়ের কোষ ও রগে। চিকিৎসকদের ভাষায়, জীবন বাঁচাতে হলে পা কেটে ফেলতেই হবে। আজ সাহলম গাজী চিরদিনের জন্য পঙ্গু। এক সময়ের কর্মঠ দিনমজুর, যিনি নিজের শ্রমে সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন, এখন নিজেই হাঁটতে পারেন না। পরিবারের কোনো আয় নেই, বড় ছেলে কর্মহীন, ছোট ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন খাবার জোগাড় করাও এখন দুরূহ। চিকিৎসা খরচের জন্য তিনি এরই মধ্যে তিন লক্ষ টাকারও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
এটাই কি ছিল তার প্রাপ্য? যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, আজ তিনিই সমাজ ও রাষ্ট্রের করুণ আর্তি করছেন “একটুকু মানবতা, সামান্য সহানুভূতি।” তার জীবনের গল্প শুধু একজন মানুষের দুর্ভাগ্যের গল্প নয়, এটি এই সমাজের নৈতিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি। সাহলম গাজী আজও আশা করেন এই সমাজ একদিন তাকে ভুলে যাবে না। সাহলম গাজী এখন শুধুই একজন প্রতিবাদী নাগরিক নন, তিনি এক জীবন্ত ইতিহাস। তার হারানো পায়ের প্রতিটি শিরায় জমে আছে অবহেলা, যন্ত্রণা আর অনুশোচনা। তিনি আর কাজ করতে পারেন না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। প্রতি রাত কাটে অজানা অনিশ্চয়তায়। একটি গুলি শুধু তার পা কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তার স্বপ্ন, সম্মান, স্বাধীনতা এবং স্বাভাবিক জীবন। এই মানুষটির পাশে দাঁড়ানো মানেই মানবতা, বিবেক এবং ন্যায়ের জয়। আমরা যদি এখনও চোখ না খুলি, তাহলে হয়তো এমন মানুষ বারবার অন্যায়ের শিকার হবে, আর আমরা নীরব দর্শকই রয়ে যাব। প্রস্তাবনা ১.একটি হুইল চেয়ার বা সহায়ক ডিভাইস ২.পরিবার চালানোর জন্য মাসিক ভাতা ৩.সন্তানদের পড়ালেখার জন্য সহযোগিতা ৪.পুনর্বাসন সহায়তা ও মানসিক চিকিৎসা
এক নজরে মো: সাহলম গাজী নাম : মো: সাহলম গাজী পিতা : আবুল ফজল, মৃত মাতা : আয়শা বেগম, মৃত ছেলে : শামিম, ১৫ ভাই : নাইম, ছাত্র, নবম শ্রেণি পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৪ জন ঠিকানা : শনির আখড়া, ঢাকা আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪ আক্রমণকারী : পুলিশ আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ, ঢাকা
গুলির দাগ ও স্বাধীনতার অনন্য আলো
মো: সাহলম গাজী ক্রমিক: ০৯৯ আইডি: ঢাকা সিটি ০৯৯
জন্ম পরিচয় নিম্নবিত্ত গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম নেয়া সাহসী ও সংগ্রামী এক মানুষ সাহলম গাজী। যিনি জীবনভর সংগ্রাম করে গেছেন শুধু নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে। তিনি ১৯৯৬ সালের ১১ জুলাই চাঁদপুর জেলার সদর থানার এক প্রান্তিক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবুল ফজল ও মাতা আয়শা বেগম দু’জনেই আজ এ পৃথিবীতে নেই। অল্প বয়সেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে পরিবারহীন এক জীবন শুরু হয় তার। শৈশব থেকেই তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে বেঁচে থাকার জন্য, দু’ মুঠো অন্নের জন্য এবং একটি সামান্য আশ্রয়ের জন্য।
অভাব-অনটনের মাঝেই সাহলম বেড়ে উঠেছেন। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তাকে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে দেয়নি, কিন্তু জীবন তাকে শেখায় বাস্তবতা, শেখায় লড়াই। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং শনির আখড়ায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি একজন দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন, বিশেষ করে টাইলস বসানোর কাজ করে সামান্য উপার্জনে সংসার চালাতেন। তার জীবন ছিল সাধারণ, কিন্তু তাঁর চরিত্র ছিল অসাধারণ। মুখে সহজ সরল কথা, চোখে সৎ মানুষের দৃঢ়তা, আর মনে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অবিচল অবস্থান। পারিবারিক অবস্থা সাহলম গাজীর পরিবারে রয়েছে তার দুই ছেলে। বড় ছেলে শামিম যার বয়স ১৫, বর্তমানে কর্মহীন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ছোট ছেলে নাইম অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। সে এখনো শিক্ষা ও স্বপ্নে বিশ্বাসী। সাহলম চেয়েছিলেন, তার সন্তানেরা যেন অন্তত তার মতো সংগ্রামে না জড়ায়, যেন তারা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়। তাই সীমাহীন কষ্টের মাঝেও সন্তানদের পড়াশুনার খরচ জোগাতে কোনো কার্পণ্য করতেন না। যদিও সাহলমের জীবন ছিল দারিদ্র্য ও শ্রমের গল্প, কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল অগাধ সাহস ও ন্যায়ের প্রতি অনুরাগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য বড় পদে থাকাই জরুরি নয়, সত্যের পক্ষে দৃঢ় থাকা একজন সাধারণ মানুষকেও করতে পারে অসাধারণ। নিঃস্বতা তাকে দমাতে পারেনি, বরং আরও বেশি জোরালো করেছে তার আত্মবিশ্বাস ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সাহলম গাজী ছিলেন সেসব নিঃশব্দ বীরদের একজন, যারা নীরবে সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলেন। ঘটনার বিবরণ দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে। দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। সাহলম গাজী, যিনি কখনোই রাজনীতি করতেন না, শুধু একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে রাজপথে নামেন। তিনি মনে করতেন এই প্রজন্মের ছাত্ররা, যারা জাতির ভবিষ্যৎ, তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে একজন সাধারণ মানুষকেও পাশে থাকতে হবে।
জুমার নামাজ শেষ করে সমস্ত কাজ ফেলে তিনি যান রায়েরবাগে আন্দোলনে অংশ নিতে। বিকেল পর্যন্ত আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু বিকেল গড়াতেই চিত্র পাল্টে যায়। পুলিশের দিকে থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। সন্ধ্যার পর, রাত ১০টার দিকে, যখন আন্দোলনে আহত অনেক ছাত্র ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ছিল, সাহলম গাজী তখনও মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি কয়েকজন আহত তরুণকে সহায়তা করতে গিয়ে হঠাৎ পুলিশের একটি গুলি সরাসরি তার ডান পায়ে এসে আঘাত হানে। গুলিটি এতটাই গভীরভাবে ঢুকে যায় যে, তার পায়ের রগ ছিঁড়ে যায় এবং মুহূর্তেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারপাশে তখনও গুলির আওয়াজ, চিৎকার, আতঙ্কে থমকে যাওয়া শহর। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ সাহলম গাজীর জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই যখন তিনি রায়েরবাগে আন্দোলনে আহত হন। পুলিশের গুলিতে তাঁর ডান পায়ের রগ ছিঁড়ে যায়, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, চারপাশে তখনও চলছিল গুলির শব্দ আর আতঙ্কের চিৎকার। একজন সাধারণ, নিরীহ মানুষ যিনি শুধু ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছিলেন, হয়ে ওঠেন নিষ্ঠুর রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার। তাকে দ্রুত রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, উপরমহলের নির্দেশ আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা না করতে। একজন গুরুতর আহত মানুষ, যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, কিন্তু কেউ তার চিকিৎসায় হাত বাড়ায়নি। এরপর সাহলমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু চিত্র ছিল একই রকম নিষ্ঠুর। চিকিৎসকরা তার কাছে ঘেঁষতেও ভয় পাচ্ছিলেন, কেউ তার নাম নথিভুক্ত করেননি, এমনকি কাগজে স্বাক্ষর পর্যন্ত নেয়নি। ফলে দুই দিন ধরে সাহলম গাজী রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালের এক কোণে পড়ে ছিলেন অসহায়, অবহেলিত, উপেক্ষিত। পায়ের ক্ষত থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছিল, যন্ত্রণা তার শরীর ও স্নায়ুকে ধীরে ধীরে নিস্তেজ করে দিচ্ছিল। একসময় এক অজ্ঞাতনামা নিরাপত্তা রক্ষী, মানবতার তাড়নায় সাহস করে তাঁর হয়ে চিকিৎসা কাগজে স্বাক্ষর করেন। তখনই শুরু হয় চিকিৎসা। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে পায়ের কোষ ও রগে। চিকিৎসকদের ভাষায়, জীবন বাঁচাতে হলে পা কেটে ফেলতেই হবে। আজ সাহলম গাজী চিরদিনের জন্য পঙ্গু। এক সময়ের কর্মঠ দিনমজুর, যিনি নিজের শ্রমে সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন, এখন নিজেই হাঁটতে পারেন না। পরিবারের কোনো আয় নেই, বড় ছেলে কর্মহীন, ছোট ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন খাবার জোগাড় করাও এখন দুরূহ। চিকিৎসা খরচের জন্য তিনি এরই মধ্যে তিন লক্ষ টাকারও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
এটাই কি ছিল তার প্রাপ্য? যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, আজ তিনিই সমাজ ও রাষ্ট্রের করুণ আর্তি করছেন “একটুকু মানবতা, সামান্য সহানুভূতি।” তার জীবনের গল্প শুধু একজন মানুষের দুর্ভাগ্যের গল্প নয়, এটি এই সমাজের নৈতিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি। সাহলম গাজী আজও আশা করেন এই সমাজ একদিন তাকে ভুলে যাবে না। সাহলম গাজী এখন শুধুই একজন প্রতিবাদী নাগরিক নন, তিনি এক জীবন্ত ইতিহাস। তার হারানো পায়ের প্রতিটি শিরায় জমে আছে অবহেলা, যন্ত্রণা আর অনুশোচনা। তিনি আর কাজ করতে পারেন না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। প্রতি রাত কাটে অজানা অনিশ্চয়তায়। একটি গুলি শুধু তার পা কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তার স্বপ্ন, সম্মান, স্বাধীনতা এবং স্বাভাবিক জীবন। এই মানুষটির পাশে দাঁড়ানো মানেই মানবতা, বিবেক এবং ন্যায়ের জয়। আমরা যদি এখনও চোখ না খুলি, তাহলে হয়তো এমন মানুষ বারবার অন্যায়ের শিকার হবে, আর আমরা নীরব দর্শকই রয়ে যাব। প্রস্তাবনা ১.একটি হুইল চেয়ার বা সহায়ক ডিভাইস ২.পরিবার চালানোর জন্য মাসিক ভাতা ৩.সন্তানদের পড়ালেখার জন্য সহযোগিতা ৪.পুনর্বাসন সহায়তা ও মানসিক চিকিৎসা
এক নজরে মো: সাহলম গাজী
নাম : মো: সাহলম গাজী
পিতা : আবুল ফজল, মৃত
মাতা : আয়শা বেগম, মৃত
ছেলে : শামিম, ১৫
ভাই : নাইম, ছাত্র, নবম শ্রেণি
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ঠিকানা : শনির আখড়া, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ, ঢাকা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍