হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / মো: মতিউর রহমান নিজামী
মো: মতিউর রহমান নিজামী

মো: মতিউর রহমান নিজামী

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান আলেম, চিন্তাবিদ ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি শিক্ষা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সামাজিক নেতৃত্বে রেখেছেন শক্তিশালী ভূমিকা। পাবনার মনমথপুরে জন্ম নেওয়া এই শান্ত স্বভাবের নেতা ছাত্রজীবন থেকেই ইসলামী আন্দোলন ও জাতীয় রাজনীতিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তিনি সুদূরপ্রসারী উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশগঠনে রেখে গেছেন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি মুসলিম বিশ্বের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরে সম্মান অর্জন করেন। তাঁর জীবন, কর্ম ও অবদান আজও বহু মানুষের কাছে নেতৃত্ব, নীতি ও ত্যাগের এক অনন্য প্রতীক।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

গণমানুষের নেতা শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী
পরিচিতি:
মতিউর রহমান নিজামী একটি জীবন,একটি ইতিহাস। আল্লাহ প্রদত্ত এক বিস্ময়কর প্রতিভা। ব্যক্তিগত জীবনে স্বচ্ছ চিন্তা,সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত,নরম দিল ও অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী,অত্যন্ত ভদ্রনম্র,মার্জিত, পরিশীলিত,মৃদুভাষী এক অসাধারণ ইসলামী ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী শান্তি ও স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণের প্রিয় দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর এবং বাংলাদেশের প্রথম সারির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞ আলেম,ইসলামী চিন্তাবিদ,সুলেখক,ইসলামপ্রিয় জনগণের রুহানি উস্তাদ ও বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ। ২০১৫ সালে আমেরিকার বিখ্যাত সংস্থা "দ্য রয়েল ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার" প্রকাশিত তালিকায় বিশ্বের ৫০ প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্বের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।ছাত্রজীবনে স্বৈরাচারী আইয়ুববিরোধী আন্দোলন থেকে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের প্রতিটি নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি বলিষ্ঠ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মাওলানা নিজামীর বলিষ্ঠ ভূমিকা বাংলাদেশের মর্যাদাকে বহির্বিশ্বে উজ্জ্বল করেছে।১৯৯১ এবং ২০০১ সালে মোট দুইবার তিনি বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।২০০১-২০০৬ মেয়াদে তিনি বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে সর্বমহলে নিজেকে একজন সৎ,দক্ষ ও অমায়িক নেতার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। সুদীর্ঘ ৪৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে দেশবাসীর কল্যাণে নিবেদিত মাওলানা নিজামীর ব্যক্তিত্ব দেশবাসীর হৃদয়ে তাদের প্রিয় নেতা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।যেসব মিথ্যা,বানোয়াট ও কাল্পনিক অভিযোগের ভিত্তিতে মাওলানা নিজামীকে ফাঁসির মতো সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত করা হলো তা ন্যায়বিচারের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে।কারণ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন অপরাধের তদন্তে স্বাধীনতাত্তোর গঠিত বিভিন্ন তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং সরকারি নথিতে কোথাও তাঁর নাম ছিল না। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পূর্ব পর্যন্ত তথাকথিত মিথ্যা অভিযোগে সারা বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে কোন মামলা তো দূরে থাক একটি জিডি পর্যন্ত করা হয়নি। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সময়ে শেখ হাসিনা কর্তৃক জনাব নিজামীর নাম পাশে বসে সাংবাদিক সম্মেলনে ক্যারাটেকৌশর সরকারপক্ষীয় প্রতিষ্ঠাতার দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়নে জামায়াত নেতৃবৃন্দের সাথে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের অনেক বৈঠক হয়েছে। এমনকি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারগঠনে ও দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন চেয়ে তাদের সিনিয়র নেতাদেরকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তখন নিশ্চয়ই মাওলানা নিজামী রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী ছিলেন না!
অনেকে বলে থাকেন,আওয়ামী লীগের সাথে থাকলে সঙ্গী,বিরোধী হলেই জঙ্গি-যুদ্ধাপরাধী।
মূলত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর অপরাধ হলো,তিনি ইসলামী আন্দোলনের নেতা ছিলেন, ছিলেন নীতির প্রশ্নে আপসহীন।তাঁর রাজনীতি ছিল ব্যক্তি ও দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে। তিনি ছিলেন দেশের জনগণ ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের পক্ষে।বাংলাদেশকে যারা তাঁবেদার রাষ্ট্র বানাতে চায় তাদের অবৈধ স্বার্থ হাসিলের পথে মাওলানা নিজামী ও তাঁর দল জামায়াতে ইসলামীকে তারা প্রধান বাঁধা হিসেবে ধরে নিয়েছে। সে জন্য পরিকল্পিতভাবে সর্বজন শ্রদ্ধেয়,গণমানুষের প্রাণপ্রিয় এ নেতাকে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মিথ্যা অভিযোগ ও সাজানো সাক্ষীর ভিত্তিতে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে হত্যা করেছে।জাতিসংঘ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন, শীর্ষ ইসলামী ব্যক্তিত্ব,বিভিন্ন দেশের সমালোচনা ও ফাঁসি কার্যকর না করার অনুরোধ উপেক্ষা করে নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করে জুলুমবাজ সরকার। তাঁর মতো পরিচ্ছন্ন ও বর্ষীয়ান একজন রাজনীতিবিদের রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে বিদায় নেয়া সত্যিই উদারতা ও সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য বেদনাবিধুর, লজ্জাজনক ও দুঃখজনক। মাওলানা নিজামীর এই ফাঁসি মুসলিম উম্মাহর দেহে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, তা বর্তমান আওয়ামী সরকার কর্তৃক পরিকল্পিত এক অমার্জনীয় ও নজিরবিহীন ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

জন্ম ও শিক্ষা:
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম লুৎফর রহমান খান একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও আল্লাহভীরু লোক ছিলেন। নিজগ্রাম মনমথপুর প্রাইমারি স্কুলে তাঁর লেখাপড়ার হাতেখড়ি। এরপর সাঁথিয়ার বোয়াইলমারী মাদরাসা হয়ে পাবনার শিবপুর ত্বহা সিনিয়র মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে সমগ্র বোর্ডে ষোলতম ও ১৯৬১ সালে একই মাদরাসা থেকে ফাজিল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।
১৯৬৩ সালে মতিউর রহমান নিজামী অন্যতম শ্রেষ্ঠ দীনি শিক্ষাকেন্দ্র মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা থেকে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কামিল পরীক্ষায় ফেকাহশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬৭ সালে কৃতিত্বের সাথে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন।

ছাত্রজীবনে নেতৃত্ব ও ভূমিকা:
১৯৬১ সাল থেকে ইসলামী ছাত্রসংঘের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে তিনি ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঐ সময় মাওলানা তার ছাত্রত্ব বজায় রাখা ও আদায়ে জন্য আন্দোলন করছিল। ১৯৬২-৬৩ সালে কামিল শেষ বর্ষের মেধাবী ছাত্রনেতা নিজামী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে মাদরাসাছাত্রদের ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
ছাত্রনেতা নিজামী ১৯৬২-৬৬ সাল পর্যন্ত ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় অফিস সেক্রেটারি, ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরপর তিন বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। পর পর দু'বার তিনি এ দায়িত্বে থেকে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এ দায়িত্ব থেকে বিদায় গ্রহণ করেন।

পারিবারিক জীবন:
১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর শামসুন্নাহারের সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। শামসুন্নাহার নিজামী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনিও ছাত্রজীবন থেকে ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী চার ছেলে ও দুই কন্যাসন্তানের জনক।

স্বৈরাচারী আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে মাওলানা নিজামী:
১৯৬৪ সালে আইয়ুব খান প্রণীত অনৈসলামিক ও অগণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী সর্বপ্রথম সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ইসলামী আন্দোলনকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে সরকার ১৯৬৪ সালের ৬ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা সরকারি যড়যন্ত্র ও দমননীতির কাছে মাথা নত না করে COP, DAC, PDM-এর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকে। এ সময় ইসলামী ছাত্রসংঘ মাওলানা নিজামীর নেতৃতে ৮ দফা দাবিতে স্বৈরাচারবিরোধী গণ আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৬৯ সালে নুর খান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের পক্ষে জনমত গড়তে গিয়ে নিজামীর প্রিয় সাথী মেধাবী ছাত্রনেতা আবদুল মালেক বাম ও সেকুলারপন্থীদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন।

সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ছাত্রনেতা:
আইয়ুববিরোধী আন্দোলন চলাকালে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী আসাদ নিহত হন। আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও মাওলানা নিজামী আসাদের জানাজায় উপস্থিত হন। ছাত্র নেতৃবৃন্দের অনুরোধে তিনি জানাজায় ইমামতি করেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে মাওলানা নিজামী ছাত্রনেতা হিসেবে সকলের নিকট সম্মানের পাত্র ছিলেন।
১৯৭০ সালে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ার কারণে যে আন্দোলন শুরু হয়, তখন তিনি ছিলেন ছাত্রনেতা। সেই আন্দোলনকে তিনি সমর্থন করেছিলেন। নির্বাচিত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে বিনা শর্তে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছিলেন।

জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান ও নেতৃত্ব প্রদান:
ছাত্রজীবন শেষে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তিনি পর্যায়ক্রমে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হিসেবে ১৯৭৯-১৯৮২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সংগঠনের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন এবং ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থাকেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একটানা ১২ বছর মাওলানা নিজামী জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০০ সালের ১৬ নভেম্বর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচিত হন। শাহাদাতবরণ পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

ইসলামী আন্দোলনের নেতা হিসেবে দক্ষতা ও নেতৃত্ব:
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও ইসলামের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার কারণে আধিপত্যবাদ ও মতলবভোগী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে বহুমুখী ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস ও সেশনজট-সহ সর্ব ক্ষেত্রে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর কর্তৃক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের বৈঠক ডাকা হয়। আমন্ত্রিত হয়ে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এ বৈঠকে উপস্থিত হন এ সময় পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর ওপর নগ্নহামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন এবং দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন থেকে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ১৯৯৬ পরবর্তী আওয়ামী লীগের শাসনামলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আওয়ামী-পুলিশ-বাহিনী সরাসরি তাঁর মতো প্রাজ্ঞ ও প্রবীণ রাজনীতিবিদের ওপর লাঠিচার্জ করার দুঃসাহস প্রদর্শন করে। কিন্তু কোন হুমকি, আঘাত ও আক্রমণ কখনো তাঁকে বিচলিত করতে পারেনি।

প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা নিজামী:
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী একজন প্রখ্যাত আলেমে দীন, অসংখ্য আলেম ও ইসলামপ্রিয় জনগণের রুহানি উস্তাদ। দেশে-বিদেশে তিনি বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম ও স্কলারদের নিকট প্রখ্যাত আলেমে দীন হিসেবে সমাদৃত।

জাতীয় রাজনীতিতে মাওলানা নিজামী:
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রতিটি গণ-আন্দোলনে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮২-৯০ সালে তদানীন্তন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মাওলানা নিজামী বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন। ফলে একাধিকবার তিনি স্বৈরশাসকের আক্রোশের শিকার হন। ৩ জোটের পাশাপাশি জামায়াতের আন্দোলন এবং তাঁর সাহসী নেতৃত্বের কারণে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে এবং ১৯৯০ সালে জাতি অপশাসনের হাত থেকে মুক্তি লাভ করে।
১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামী প্রদত্ত ফর্মুলা অনুযায়ী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচন বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের এই ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে কেয়ারটেকার সরকারের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে সংসদে মাওলানা নিজামী বিল উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে সংসদের ভেতরে ও বাইরে জামায়াতে ইসলামীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে কেয়ারটেকার সরকারের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মাওলানা নিজামীর সংগ্রামী ভূমিকা জাতির মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় দেশের ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী শক্তিসমূহ আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। আওয়ামী লীগ কর্তৃক ইসলাম ও মুসলমানদের ঈমান-আকিদা ধ্বংস, পৌত্তলিকতার প্রচলন, মাদরাসা শিক্ষা বন্ধের চক্রান্ত, কুখ্যাত জননিরাপত্তা আইনের ছদ্মাবরণে বিরোধী দল দমন, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও দেশের অখণ্ডতাবিরোধী পার্বত্য কালোচুক্তি, গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তির নামে প্রহসন, সর্বোপরি দেশ-জাতিকে ধ্বংসের বহুমুখী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে মাওলানা নিজামীর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।
২০০৭ সালের অবৈধ কেয়ারটেকার সরকারের সময়ে তিনি দেশকে বিরাজনীতিকরণ ও ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল ও জরুরি আইন জারির প্রতিবাদে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়াও ফারাক্কা বাঁধ, টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মাওলানা নিজামী।

চারদলীয় ঐক্যজোটের শীর্ষ নেতা মাওলানা নিজামী:
১৯৯৬ সালে জাতির ঘাড়ে চেপে বসা আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ১৯৯৯ সালের শেষ দিকে গঠিত চারদলীয় ঐক্যজোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। চারদলীয় ঐক্যজোট ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয় লাভ করে এবং সরকার গঠন করে। নানা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রকে পরাজিত করে চারদলীয় ঐক্যজোট অটুট রাখা ও শক্তিশালী করার পেছনে মাওলানা নিজামীর বলিষ্ঠ ভূমিকা, অপরিসীম ধৈর্য ও ত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জাতীয় সংসদে মাওলানা নিজামী:
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জাতীয় সংসদে মাওলানা নিজামীর বুদ্ধিবৃত্তিক, তথ্য-যুক্তিনির্ভর, উপস্থাপনা ও সময়োপযোগী বক্তব্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলনেতার দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি সংসদের পার্লামেন্টারি ও মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য ছিলেন। গঠনমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালনের কারনে তিনি বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
দেশগঠনে অবদান ও জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা:
দেশগঠন ও জাতীয় উন্নয়নে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ভূমিকা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি সফলতার সাথে কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে মন্ত্রী হিসাবে তিনি সততা ও দক্ষতার সাথে সংস্কার ও উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। মন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রতিটি চাষির বাড়িতে 'চাষির বাড়ি বাগান বাড়ি' স্লোগানে উন্নয়নমূলক যে যুগান্তকারী মডেল কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যার ধারাবাহিকতায় আজও 'একটি বাড়ি একটি খামার' প্রকল্প হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তিনি শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি শতকরা ১০.৪৫ ভাগে উন্নীতকরণ, সুষ্ঠুভাবে সার সরবরাহ, বন্ধ শিল্প চালু, সাভারে চামড়া শিল্প নগরী স্থাপনসহ অনেক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। চিনি শিল্পে প্রায় ৭০ কোটি টাকা মুনাফা অর্জনসহ ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন মাওলানা নিজামী।
তিনি এ দেশের কৃষিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত বিশ্বখাদ্য সম্মেলন ও থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড রাইস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন তিনি। মাওলানা নিজামী কৃষি মন্ত্রণালয়ে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছেন। তার সততা, দক্ষতা ও একাগ্রতা পুরো সেক্টরকেই প্রভাবিত করে।
তাঁর-ই উদ্যোগে পণ্যের নকল ও ভেজাল প্রতিরোধ এবং বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন শিল্প ও সেবাসামগ্রী বিশ্বের বিভিন্ন মান প্রণয়ন ও স্বীকৃতি প্রদানকারী সংস্থাসমূহ কর্তৃক স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যে ন্যাশনাল অ্যাক্রিডিটেশন বোর্ড গঠন করা হয়।
মাওলানা নিজামীর হাতের ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে সাঁথিয়া-বেড়ার চিত্র। সাঁথিয়া-বেড়ার উন্নয়নের রূপকার তিনি। শুধু সাঁথিয়া-বেড়াই নয়, পাবনার সামষ্টিক উন্নয়নেও রয়েছে তাঁর অনন্য অবদান।
জঙ্গিবাদ দমনে মাওলানা নিজামীর বলিষ্ঠ অবস্থান:
চারদলীয় ঐক্যজোট সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দেশবিরোধী শক্তির ক্রীড়নক একটি গোষ্ঠী দেশব্যাপী ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে বোমা হামলা চালায়। অথচ ইসলাম কখনোই কোনরূপ সহিংসতার পথকে সমর্থন করে না। কিন্তু এই গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ইসলামের বদনাম রটানোর জন্য এবং দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকে থামিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে এ-হামলা পরিচালনা করে। জামায়াতে ইসলামী ও এর আমীর মাওলানা নিজামীর সোচ্চার ভূমিকার কারণে ইসলামের নামে বোমা হামলাকারী এসব ঘাতকদের মুখোশ জাতির সামনে খুলে যায়। চারদলীয় জোট সরকারের সময়েই জেএমবির শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার হয়। তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন:
দেশব্যাপী প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, উন্নয়ন ও মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে মাওলানা নিজামী পালন করেন আন্তরিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা। কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি ও মান প্রদান এবং ফাজিল-কামিলের মান প্রদানের মতো চারদলীয় জোট সরকারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পেছনে মাওলানা নিজামীর তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মাওলানা নিজামী:
প্রতিটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মুসলিম উম্মাহর পক্ষে মাওলানা নিজামী অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন।বাবরী মসজিদ ভাঙা, বসনিয়া-হারজেগোভিনায় মুসলিম গণহত্যা, ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনি মুসলমানদের সাথে ন্যক্কারজনক আচরণ, লেবাননে বর্বরোচিত ইসরাইলি হামলা নিয়ে মাওলানা নিজামী সময়োপযোগী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন।
জামান অধ্যাপক হেন্স কিপেনবার্গ 'মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে এক যুদ্ধবাজ ও ইসলামকে জঙ্গি বা রণমুখী ধর্ম' অভিহিত করার বিরুদ্ধে ও ডেনমার্কে মহানবী (সা)-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের প্রতিবাদে তার প্রদত্ত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। এটি একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের নেতা মাওলানা নিজামী:
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইস্যুতে মাওলানা নিজামীর প্রজ্ঞাপূর্ণ ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ২০০২ সালের ২৭ মার্চ মুসলিম দুনিয়ার বিখ্যাত চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ডক্টর ইউসুফ আল কারযাভীর নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যের দশজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা নিজামীর সাথে সাক্ষাৎ করেন।
মাওলানা নিজামী একাধিকবার রাবেতা আল আলম আল ইসলামীর সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ (রাবেতা), সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটির স্থায়ী সদস্য ছিলেন। মাওলানা নিজামীসহ মুসলিম বিশ্বের ৫২ জন বিশিষ্টি চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী আরব ও মুসলিম বিশ্বের জনগণের প্রতি ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত আহবান জানান।
২০০৩ সালের ১৫-১৭ অক্টোবর চীনে অনুষ্ঠিত Sustained Elimination of Iodine Deficiency Disorder শীর্ষক সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী।
২০০৬ সালে মাওলানা নিজামী ইংল্যান্ডের শীর্ষ বৈদেশিক ও কূটনৈতিক নীতিনির্ধারণী বিশেষজ্ঞ ফোরাম 'চ্যাথাম হাউজের' আমন্ত্রণে 'বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইসলামী রাজনৈতিক দলসমূহ। জামায়াতের ভূমিকা' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে তিনি এ-সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
উল্লেখ্য, চ্যাথাম হাউজ ব্রিটেনের অন্যতম শীর্ষ নীতিনির্ধারণী বিশেষজ্ঞ ফোরাম, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রেখে থাকেন। মাওলানা নিজামী প্রথম বাংলাদেশী নেতা, যিনি চেখম হাউজের আমন্ত্রণে সেখানে বক্তব্য রাখেন।তিনি বহুবার সৌদি বাদশাহর রয়েল গেস্ট হিসেবে পবিত্র হজ পালন করেন।

লেখক ও চিন্তাবিদ নিজামী:
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সংগঠনের দায়িত্ব পালন ও রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও ইসলামী সাহিত্য ও গবেষণায় মৌলিক চিন্তার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
বাল্যকাল থেকেই লেখালেখির প্রতি মাওলানা নিজামীর ঝোঁক ছিল। তিনি বিভিন্ন ম্যাগাজিন, সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তাঁর সৃজনশীল ও গবেষণাধর্মী এবং তথ্যসমৃদ্ধ লেখা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রাজনৈতিক ও ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর ৬১টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

অন্যায়ভাবে বারবার গ্রেফতার মাওলানা নিজামী:
২০০৭ সালের অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্যায়ভাবে মাওলানা নিজামীকে গ্যাটকো মামলায় ২০০৮ সালের ১৮ মে দিবাগত রাতে গ্রেফতার করে। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তিনি ওই বছর ১৫ জুলাই মুক্তি লাভ করেন। এর কয়েক মাস পর ১০ নভেম্বর বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি মামলায় বিশেষ জজ আদালতে হাজির হতে গেলে জামিন না দিয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। হাইকোর্ট তাকে ১২ নভেম্বর জামিন দিলে তিনি ১৬ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। ২০১০ সালের ২৯ জুন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বানোয়াট-ঠুনকো অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ৯টি হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো হয় মাওলানা নিজামীকে। এসব মামলায় তাকে ২৪ দিন রিমান্ডে নেয়া হয়। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান ও শীর্ষ স্থানীয় আলেমকে রিমান্ডে নিয়ে মানসিক নির্যাতনের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে করেছে কলঙ্কিত।
অন্যান্য মামলায় জামিন পাওয়ার পরও সরকার হীন উদ্দেশ্যে কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১০ সালের ২ আগস্ট তাঁকে গ্রেফতার দেখায়।

কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার:
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার জামায়াত নেতৃত্বকে সাজা দেয়ার আয়োজন সম্পন্ন করে। ১৯৭৩ সালের আইনে সংশোধন এনে দলীয় তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে মিথ্যা অভিযোগ ও সাজানো সাক্ষী দিয়ে কথিত মানবতাবিরোধী বিচারের রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই বিচারের জন্য প্রণীত আইন ও বিধিমালা নিয়ে শুরু থেকেই দেশে-বিদেশে বিশেষজ্ঞগণ গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‍্যাপ, আইনজীবীদের বিশ্বের সর্ববৃহৎ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ও সংস্থা এ নিয়ে আইন সংশোধনের জন্য নানা সুপারিশও দিয়েছে। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাতই করেনি। সরকার তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরতরে শেষ করে দেয়ার জন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দকে একের পর এক হত্যা করেই চলছে। ইতোমধ্যে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল স্বীকার করেছেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই বিচার হচ্ছে।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যার জন্যই আইন:
যুদ্ধাপরাধের জন্য প্রণীত আইনটি নিজেই ন্যায়বিচারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এটি মূলত এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে যাতে রাষ্ট্রপক্ষ সবক্ষেত্রেই আইনি পন্থায় বেআইনি সুবিধা লাভ করতে পারে। ট্রাইব্যুনাল গঠন থেকে শুরু করে তদন্ত, বিচারক নিয়োগসহ সাক্ষ্যগ্রহণ এমনকি ফাঁসি কার্যকর করা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই এ বিশেষ সুবিধার প্রতিফলন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৬ নং ধারা অনুযায়ী সরকার চাইলে এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবে। যেখানে সরকার নিজেই বাদি সেখানে ট্রাইব্যুনাল গঠন ও বিচারক নিয়োগের এখতিয়ার সরকারের হাতে থাকায় নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল গঠন বা ন্যায়বিচার কোনটি-ই সম্ভব না। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনাল চাইলে দ্রুত বিচারের স্বার্থে কোন সাক্ষ্য ছাড়াই বিচারকার্য সম্পন্ন করতে পারবে আবার চাইলে রায় দেয়ার জন্য একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যই পর্যাপ্ত মনে করতে পারবে।
শুধু তাই নয়, দেশীয় আদালতে বিচার হলেও সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধির মত মৌলিক আইনগুলোকে বাতিল করে পত্রিকায় ছাপানো খবর বা প্রবন্ধ, সাময়িকী, সিনেমা, টেপ রেকর্ডারসহ সব ধরনের অনির্ভরযোগ্য প্রমাণপত্র গ্রহণের এখতিয়ার আদালতের রয়েছে, যা ন্যায়বিচারের পথকে বন্ধ করে দিয়েছে। যখন একজন বিচারকের স্কাইপ কেলেঙ্কারি জনসাধারণের নিকট প্রকাশ পায় তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি মূলত বিচারের নামে প্রহসনের নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়।
২১ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, শুধু আসামিপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আইনটি এরকম ছিল কারণ তারা নিশ্চিত ছিল যে, আদালত অভিযুক্তদের ফাঁসি দেবে। কিন্তু পক্ষপাতদুষ্ট বিচারক নিয়োগ দেয়ার
পরও যখন শহীদ আবদুল কাদের মোল্লাকে শুধু যাবৎজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় তখন বিচারিক হত্যা নিশ্চিত করার জন্য ধারাটি সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকেও আপিল করার অধিকার দিয়ে সংশোধনীর ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা প্রদান করা হয়, যা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। তখন বুঝার আর বাকি থাকে না যে, এটি আসলেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনের মাধ্যমে একটি বিচারিক হত্যার আয়োজন ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এর সর্বশেষ শিকার মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। এ দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ সকল ইসলামী নেতৃবৃন্দ তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।

মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি:
আল বদর কমান্ডার হিসেবে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায় চাপানো হয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের যত পত্রিকা এবং গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট আছে, তার কোথাও আল বদর বাহিনীর সাথে মাওলানা নিজামীর দূরতম কোন সম্পর্ক আছে বলে প্রমাণ নেই। এসব পত্রিকা ও গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট সরকার পক্ষই আদালতে দাখিল করেছিল।
সাক্ষী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী ও সালমা হক বলেছেন, ১৯৭১ সালের পত্রিকায় দেখেছেন মাওলানা নিজামী আল বদর বাহিনীর প্রধান, কিন্তু সরকারপক্ষের দাখিল করা ১৯৭১ সালের কোন পত্রিকায়ই এ ধরনের উদ্ভট খবর নেই। এ ব্যাপারে আদালতের যুক্তি, পত্রিকায় না থাকলেও তারা ২ জন যেহেতু সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি, ধরে নিতে হবে তারা পত্রিকায় দেখেছেন।
বলা হয়েছে ছাত্রসংঘ মানেই আল বদর। যেহেতু মাওলানা নিজামী ছাত্রসংঘের প্রধান ছিলেন, সেহেতু তিনি পদাধিকার বলে আল বদর বাহিনীরও প্রধান। মাওলানা নিজামী ছাত্রসংঘের প্রধান ছিলেন ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। এরপর থেকে তিনি ছাত্রসংঘে ছিলেন না। বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা সেপ্টেম্বরের পরে হয়েছে। সেই হত্যাকাণ্ডের দায় দায়িত্ব তার ওপর চাপানো হয় কিভাবে?
এ ব্যাপারে আদালত বলেছেন, মাওলানা নিজামী ৫ বছর ছাত্রসংঘের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাই তিনি ছাত্রসংঘ থেকে অবসর নিলেও একদিনে তাঁর এই সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। এর চেয়ে খোঁড়া অজুহাত আর কী হতে পারে?
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে দুইজন মহিলা সাক্ষী বলেছেন, তাদের স্বামীকে যারা ধরে নিয়ে যায়, তারা বলেছে,হাইকমান্ড নিজামীর নির্দেশে তারা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এ দু'টি ঘটনা নিয়ে মামলা হয়।বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে এ রকম আরো ৪০টিরও বেশি মামলা হয়েছিল। এসব মামলার কোথাও মাওলানা নিজামীর নাম তখন আসেনি। ওই দুই মহিলা সাক্ষী তাদের স্বামীদের হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অসংখ্যবার সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। একজন সাক্ষী তার স্বামীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে বই লিখেছেন। আরেকজন শাহরিয়ার কবিরের মতো চরম জামায়াতবিদ্বেষী মানুষের বইয়ে তার স্বামীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিশদ বর্ণনা দেন। এ সবের কোথাও তারা এ ঘটনার সাথে মাওলানা নিজামীর দূরতম কোন সম্পর্ক ছিল, তা বলেনি। এমনকি এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছেও তারা মাওলানা নিজামীর নাম বলেনি। শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তারা আদালতে এসে প্রথমবারের মতো মাওলানা নিজামীর নাম বলে।
এ ব্যাপারে আদালত বলেন, হয়তো এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছে, অথবা ভুলবশত বলার পরও লিখেনি। যেখানে মাওলানা নিজামী একমাত্র আসামি, সেখানে তার ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তার জিজ্ঞেস করতে ভুলে যাওয়া বা লিখতে ভুলে যাওয়ার কথা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে?

পাবনার ঘটনা:
১৯৭১ সালে মাওলানা নিজামী পরিচিত ছাত্রনেতা ছিলেন, তিনি সে সময় বাংলাদেশের যে স্থানেই গিয়েছেন, পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট এসেছে। এমনকি সরকারের গোপন গোয়েন্দা রিপোর্ট, যা সরকার আদালতে দাখিল করেছে, সেখানেও বর্ণিত রয়েছে। ১৯৭১ সালে তিনি পাবনা গিয়েছেন, এ মর্মে কোন রিপোর্ট পত্রিকায়ও আসেনি। গোয়েন্দা রিপোর্টেও ছিল না। এমনকি কট্টর জামায়াতবিদ্বেষী ড. এম এ হাসান তার লিখিত বই 'যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ' চার্জে বর্ণিত পাবনার ঘটনাসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা দিলেও কোথাও মাওলানা নিজামীর নাম উল্লেখ করেননি। সরকার ১৯৭২ সালে পাবনা জেলার রাজাকার, আল বদর ও স্বাধীনতাবিরোধীদের যে তালিকা তৈরি করে, সেখানে কোথাও মাওলানা নিজামীর নাম নেই। এ ব্যাপারেও আদালত বলেন যে, ১৯৭২ সালে প্রস্তুতকৃত রাজাকার, আল বদরের প্রাথমিক তালিকা ছিল, সেখানে সমস্ত রাজাকার, আল বদরের নাম থাকা জরুরি নয়। এটা কি বাস্তবসম্মত যুক্তি হতে পারে? কেননা, এই মামলায় মাওলানা নিজামীকে রাজাকার আল বদরদের নেতা হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। এমনকি দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানি আর্মি তার কথায় অপরাধ সংঘটিত করতো।এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় যে, সরকার পক্ষের দাবি সত্য হলে, এমনকি প্রাথমিক তালিকায় তার নাম থাকবে না।
সর্বোপরি ১৯৮৬ সালের আগে, প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনপ্রিয় ইসলামী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন, তার আগে কোথাও কোন পত্রিকা/বই, মামলার নথিতে আল বদর প্রধান বা সদস্য অথবা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত অথবা পাবনা বা ঢাকায় ১৯৭১ সালে সংঘটিত কোন অপরাধের সাথে জড়িত বলে কোথাও মাওলানা নিজামীর নাম আসেনি।

প্রধান বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে যা বললেন:
মাওলানা নিজামীর আপিল শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে বেশ কিছু প্রশ্ন করেন। এতে তিনি জিজ্ঞেস করেন, নিজামীর সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়ে আপনাদের কাছে তো কোন প্রমাণ নেই। এতে তাঁকে ফাঁসি দেয়া যাবে কি? প্রধান বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে জানতে চান, "এটা কি কারেক্ট যে ১৯৮৬ সালের আগে নিজামী সাহেবের বিরুদ্ধে নাকি কিছুই নাই? আমাদেরকে একটা কিছু দেখান যেটা ১৯৮৬ সালের আগে প্রকাশিত।" অ্যাটর্নি জেনারেল কোন কিছু দেখাতে ব্যর্থ হন।
এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং হত্যাও সংঘটিত হয়েছে এ বিষয়গুলো তো নিজামীর আইনজীবীরা স্বীকার করেছেন। কিন্তু নিজামী সরাসরি হত্যা, ধর্ষণে জড়িত ছিলেন। এমন কোন প্রমাণ আপনাদের কাছে আছে? প্রধান বিচারপতি আবার প্রশ্ন করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকলে তাঁকে ফাঁসি দেয়া যাবে কি? (সূত্র: শীর্ষ নিউজ, এনটিভি অনলাইন ০৭ডিসেম্বর ২০১৫)

ছোট্ট অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মাওলানা নিজামী:
মাওলানা নিজামীর মেজো ছেলে ডা. নাঈম খালেদ শেষ সাক্ষাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমরা কনডেম সেলে শেষ সাক্ষাতের দিন আব্বুর কক্ষের সামনে যাই। সেলটির নাম রজনীগন্ধা। সেলের সর্বশেষ কক্ষ ৮ নম্বর প্রকোষ্ঠে আব্বু ছিলেন। রুমটি জানালাবিহীন, দৈর্ঘ্যে প্রস্থে আনুমানিক ৮/৮ ফিট, একদিকে লোহার গরাদ দিয়ে ঘেরা আর তার সামনে ছোট একটি আধো অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ।
রুমের ভেতরে সবুজ একটি জায়নামাজে বসে আব্বু আমাদের উল্টোদিকে কেবলামুখী হয়ে দোয়া করছিলেন। শান্ত ও স্পষ্ট উচ্চারণে আরবিতে দোয়া করছিলেন, খুব উচ্চস্বরেও না আবার খুব নিচুস্বরেও না। প্রতিটি বাক্যের মাঝে স্বভাবসুলভ একটু বিরতি। ঠিক যেমনটা আমরা আমাদের ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। পাশে হালকা বাদামি রঙের একটি বাচ্চা বিড়াল বসা। যেন উনার সাথে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাচ্ছে। মুয়াজ (উনার তিন বছর বয়সী নাতী) সিঁড়ি বেয়ে উঠে লোহার গরাদ ধরে বলল, "দাদু দরজা খোলো আমরা আসছি"। আব্বু শান্তভাবে মোনাজাত শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন। আমাদের দেখে লোহার গরাদের কাছে এসে বললেন, "তোমরা আসছো? এটাই তাহলে শেষ দেখা?"
উনি সিকের ওপার থেকেই সবার সাথে হাত মেলালেন। উনার পরনে ছিল সাদা সুতি পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরমে আর জানালাবিহীন রুমের কারণে উনার পাঞ্জাবীটি ঘামে ভেজা, কিন্তু মুখটা প্রশান্ত; কষ্ট বা উদ্বেগের লেশমাত্র নেই। দেখে কে বলবে একটু পরে উনার ফাঁসি দেবে এই জালিম সরকার।
এ সময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আব্বু আম্মুকে বলেন আজ থেকে তুমি ওদের বাবা ও মা দুটোই। তোমার মাঝে যেন ওরা আমাকে দেখতে পায়। আর তুমিও আমাদের সন্তানদের মাঝে আমাকে খুঁজে পাবে।
আব্বু আমাদেরকে বলেন, "তোমরা ভাইবোনেরা মিলেমিশে থাকবে, আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) পথে চলবে, মায়ের খেদমত করবে। তোমরা তোমাদের মায়ের মাঝেই আমাকে খুঁজে পাবে। আর তোমাদের আম্মা যেন তোমাদের মাঝে আমাকে খুঁজে পায়। তোমরা তোমাদের আব্বুকে যেভাবে দেখেছো সেটাই মানুষকে বলবে, আমার ব্যাপারে বাড়তি কথা বলা থেকে বিরত থাকবে। আমার বয়স এখন ৭৫ বছর, আমার সহকর্মীদের অনেকেই আমার মত লম্বা হায়াত লাভ করে নাই, তোমরা তোমাদের বাবাকে দীর্ঘদিন পেয়েছ, হায়াত মাউত আল্লাহর হাতে, আমার মৃত্যু যদি আল্লাহ আজকে রাতেই লিখে রেখে থাকেন তাহলে বাসায় থাকলেও মৃত্যু হতো। সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখবে আর শুকরিয়া আদায় করবে।"
এরপর আব্বু বিশেষ করে যারা তার জন্য, অন্যান্য নেতৃবৃন্দের জন্য সর্বোপরি ইসলামী আন্দোলনের জন্য কষ্ট করছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ ও সালাম জানাতে বলেন। সকলের কাছে দোয়া কামনা করেন যেন আল্লাহ তায়ালা তার শাহাদাত কবুল করেন।
তখন আম্মু বলেন, 'আল্লাহ তোমাকে দুনিয়াতেও সম্মানিত করেছেন, আখেরাতেও সম্মানিত করবেন ইনশাআল্লাহ'। আব্বু তখন বলেন, আমি সামান্য অজপাড়াগাঁয়ের ছেলে। আল্লাহর রহমতে আমার জন্য গোটা দুনিয়া ও বড়-বড় আলেমরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, দোয়া করেছেন। আমার মুক্তির ব্যাপারে ওআইসিতে আলোচনা হবে দেখে শেখ হাসিনা ওআইসি সম্মেলনে যায়নি, এগুলোতো পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার।
আমরা আব্বুকে বলি, আমাদের জন্য কাল কেয়ামতের দিনে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন, যেন আমরা জান্নাতে যেতে পারি। আব্বু বলেন, "তোমরা জান্নাতে যাওয়ার মতো আমল কর, তাহলে ইনশাআল্লাহ জান্নাতে যেতে পারবে।"

শাহাদাতের পূর্বে মাওলানা নিজামীর দীর্ঘ মোনাজাত:
এরপর আব্বু আমাদের অনুরোধে আল্লাহর কাছে দু'হাত তুলে দোয়া করেন। প্রায় ঘন্টাখানেক এই মোনাজাতপর্ব স্থায়ী হয়। আল্লাহর প্রশংসা ও নবী করীম (সাঃ) এর প্রতি দরুদ পাঠ করার পর প্রথমে প্রায় ২০ মিনিট, রাসূল (সা)-এর শিখিয়ে দেয়া মাসনুন দোয়াগুলো, যেগুলো আব্বুকে সারা জীবন করতে দেখেছি সেগুলো পাঠ করেন।
অতঃপর তিনি বলেন, "হে আল্লাহ আমি তোমার এক নগণ্য গুনাহগার বান্দাহ, তুমি আমাকে যতটুকু তোমার দ্বীনের খেদমত করার তাওফিক দিয়েছো তা মেহেরবানি করে কবুল করে নাও। আমাকে ইসলাম ও ঈমানের ওপর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টিকে থাকার তাওফিক দাও আর শাহাদাতের মৃত্যু দান কর। হে আল্লাহ তুমি আমাকে আর আমার বংশধরদেরকে নামায কায়েমকারী বানাও আর আমাকে আমার পিতা-মাতাকে আর সকল মুমিনদেরকে কাল কিয়ামতের দিনে ক্ষমা কর।
হে আল্লাহ আমাদেরকে পরিপূর্ণ ঈমান দান কর, তোমার ওপর সত্যিকারের ভরসা করার তাওফিক দান কর। আমাদের জিহবাকে তোমার সার্বক্ষণিক জিকিরকারী বানাও। আমরা তোমার কাছে, তোমার ভয়ে ভীত অন্তর, উপকারী জ্ঞান, হালাল প্রশস্ত রিজিক, সুস্থ বুদ্ধি ও দ্বীনের সঠিক বুঝ ভিক্ষা চাচ্ছি। হে আল্লাহ আমাদেরকে মৃত্যুর পূর্বে তওবা করার তাওফিক দাও, মৃত্যুর সময় আরাম দান কর, মৃত্যুর পরে তোমার ক্ষমা লাভ করার তাওফিক দাও ও দোজখের আগুন থেকে রক্ষা কর। হে আল্লাহ তোমার হালালকৃত জিনিসের মাধ্যমে হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দাও, তোমার আনুগত্যের মাধ্যমে তোমার নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দাও আর আমাদেরকে তুমি ছাড়া কারোও মুখাপেক্ষী করো না। আল্লাহ তোমার নূর দিয়ে আমাদেরকে হেদায়াত দান কর। আমাদের সকল গুনাহ খাতা তোমার সামনে পরিষ্কার, তোমার কাছেই ক্ষমা চাচ্ছি ও তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করছি। ইয়া হান্নান ইয়া মান্নান।"
তিনি আরো দোয়া করেন, "হে আল্লাহ তুমি এই দেশকে তোমার দ্বীনের জন্য কবুল করে নাও, এই দেশের জন্য শান্তির ফয়সালা করে দাও। এ দেশকে গুম, খুন, রাহাজানি ও আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে রক্ষা কর"।
তিনি দেশ ও দেশবাসীর সুখ সমৃদ্ধির জন্যও দোয়া করেন। এই আবেগঘন মোনাজাতের সময় আমার মেয়ে কয়েকজন জেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চোখে পানি দেখেছে বলে পরে আমাকে জানায়। ব্যক্তিজীবনে একজন চিকিৎসক হওয়ায় আমাকে এর আগে বহু মৃত্যু দেখতে হয়েছে। বহু লোককে দেখেছি রোগে শোকে মৃত্যুর প্রহর গুনতে। আমি দেখেছি তাদের চেহারায় মৃত্যুর ছায়া, কিংবা একটি মুহূর্ত বেশি বেঁচে থাকার আকুতি। কিন্তু আব্বুকে শেষ সাক্ষাতে দেখতে গিয়ে আমি জীবনে প্রথম দেখলাম নির্ভীক একজন জান্নাতি মেহমানকে, তাঁর মহান রবের সাথে মিলিত হওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি নিতে। আব্বুর কাছে সুযোগ ছিল রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়া নিয়ে কালক্ষেপণ করার। মৃত্যুর সময় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তা আমরা সবাই জানি। আজ দেখলাম অন্তরে সেই বিশ্বাসকে ধারণ করে কিভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়। সাক্ষাতের শেষপর্যায়ে আব্বু জিজ্ঞেস করলেন সাঁথিয়ায় দাফন করতে কে কে যাবে? আমি বললাম আমি আর মোমেন যাবো। তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সাবধানে যেতে বললেন আর মিঠু ভাইকে সাথে রাখতে বললেন। আম্মাকে রাতে সাঁথিয়া যেতে মানা করলেন। মোমেনকে জানাযার নামাজের ইমামতি করতে বললেন। মোমেন প্যান্ট শার্ট পরে ছিল, তিনি বললেন পাঞ্জাবি পরে জানাজা পড়াতে।

তিনটি বই পড়তে বললেন মাওলানা নিজামী:
সাক্ষাতের শেষ দিকে মাওলানা নিজামী বলেন, আমার অসিয়তগুলো তোমরা আমার লেখা বইগুলোতে পাবে। বিশেষ করে জেলে বসে লেখা দু'টি বই- কুরআন হাদিসের আলোকে রাসূল মুহাম্মদ (সা) ও আদাবে জিন্দেগি এবং আগে লেখা বই কুরআনের আলোকে মুমিনের জীবন প্রভৃতি। বইগুলো পড়তে বলেন।

বাবার কাছ থেকে শেষ বিদায়:
সবশেষে আমার সবচেয়ে ববোন মহসিনা আপাকে বললেন, "আম্মু আমি তোমাকে নিয়ে বেশি চিন্তিত, তুমি আমার মা, আমার সবচেয়ে বড় সন্তান, তোমার মুখেই প্রথম আমি আব্বু ডাক শুনেছি। তুমি শান্তথকো। "আম্মুকে বললেন, "আমার সোনার টুকরা ৬ ছেলেমেয়েকে রেখে গেলাম তুমি এদের মাঝেই আমাকে খুঁজে পাবে। তোমরা যাও, আমি তোমাদের যাওয়া দেখি।" আমরা একে একে হাত মিলিয়ে আমাদের জান্নাতি বাবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। ছোট্ট বিড়ালটিও আমাদের পিছু নিলো। শেষ সময়ের দেখা আব্বুর উজ্জ্বল চেহারাটি সারাটি পথ চোখে ভাসছিল।

জীবিত বাবাকে রেখে চললাম দাফনের প্রস্তুতি নিতে:
জেল থেকে বের হয়ে রওয়ানা হলাম সাঁথিয়ার উদ্দেশে, জীবিত বাবাকে রেখে চললাম তার দাফনের প্রস্তুতি নিতে। রাসূল (সা)-এর সেই হাদিসটি তখন বার বার মনে পছিল, যখন তোমরা কোন বিপদ মুসিবতে পবে তখন স্মরণ কর সবচেয়ে বমুসিবতের কথা। সেটা হবে আমাকে হারানোর মুসিবত (ইবনে মাজাহ)। এই উম্মত রাসূল (সা)কে হারানোর কষ্ট সহ্য করেছে। এই উম্মত সবই সহ্য করতে পারবে। রাব্বানা আফরিগ আলাইনা সাবরাও ওয়া সাব্বিত আকদামানা ওয়ানসুরনা আলাল ক্বাওমিল কাফিরিন।

আমি প্রস্তুত:
পরিবারের সাথে শেষ সাক্ষাতের সময় সবাইকে নিয়ে মোনাজাত শেষে মাওলানা নিজামী তার ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেনকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি ফাঁসির মঞ্চে লুঙ্গি পরে না পাঞ্জাবি-পাজামা পরে যাবেন? মোমেন বললেন, পাঞ্জাবি-পাজামা পরে যাবেন। আল্লাহর প্রিয় বান্দা, মর্দে মুজাহিদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করার প্রেরণায় কতটা ব্যাকুল ছিলেন, তা এখান থেকেই স্ট বুঝা যায়। পরিবারের সদস্যদের বিদায় দিয়ে মহান রবের পানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন মাওলানা নিজামী। জল্লাদরা যখন তার কক্ষের সামনে যায়, তিনি বললেন, 'আমি প্রস্তুত'।

অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় প্রিয় নেতার বিদায়:
রায় কার্যকরের নির্বাহী আদেশ ১০ মে সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কারাগারে পাঠানো হয়। রাত ১২টা ১০ মিনিটে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী মহান রবের পানে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। রাত ১টা ৩০ মিনিটে কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে শহীদ নিজামীর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রওনা করে তার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে। সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে লাশবাহী বহর পৌঁছে সাঁথিয়ার মনমথপুরে জন্মভূমিতে। সেখানে পূর্ব থেকেই উপস্থিত ছিলেন তার পরিবারের সদস্যগণ ও হাজারো শোকাহত জনতা। শহীদ নিজামীর কফিনবাহী গাড়ির বহর বাড়িতে পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সাধারণ মানুষ তাদের নেতাকে এক নজর দেখার জন্য আকুতি করতে থাকে এবং ডুকরে কেঁদে ওঠে। কিন্তু মানুষের এই কান্না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হৃদয় গলাতে পারেনি, ফলে শেষবারের মত তাদের প্রিয় নেতার মুখ দেখতে পারেনি সাধারণ জনতা। তাদের সমস্বরের কান্নায় মনমথপুরের আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। উপস্থিত জনস্রোত সামলাতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকেও হিমশিম খেতে হয়।
তারপর কফিনবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যাওয়া হয় বাড়িসংলগ্ন মনমথপুর কবরস্থানে। সেখানে পূর্ব থেকেই অপেক্ষমাণ হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে জানাযায় দাঁড়িয়ে যায়। সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত জানাযায় হাজার হাজার মানুষ শরিক হন। জানাযা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আইনশৃংখলা বাহিনীর লোকেরা লাশ নিয়ে যায় কবরস্থানে। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো সাধারণ মানুষ কবরস্থানে ঢুকে পড়তে চাইলে আইনশৃংখলা বাহিনী তাদের বাধা দেয়। তাদের বাধা উপেক্ষা করে হাজার-হাজার মানুষ কবরস্থানে প্রবেশ করে। শতবাধা বিপত্তি। উপেক্ষা করে দাফনের পর একই স্থানে ২৬ বার গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়, যা ইতিহাসে বিরল।

দেশে-বিদেশে জানাযা:
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাযা দেশে বিদেশে বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। এসব জানাযায় লাখ লাখ জনতা অংশগ্রহণ করে। কেন্দ্রীয়ভাবে ১১ মে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে একাধিক গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত তৌহিদী জনতা মাওলানা নিজামীর জন্য চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে তাঁর শাহাদাতের মর্যাদা কামনা করেন। গায়েবানা জানাযা শেষ হওয়ার পর মুসল্লিরা শ্লোগান দিতে দিতে ও ভি চিহ্ন দেখিয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে যান।
চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দান ও তার সংলগ্ন সড়ক, সিলেটের সরকারি আলিয়া মাদরাসা ময়দান, রাজশাহীর হেতেম খাঁ গোরস্থানসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা, জনপদে গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বাইরে মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী, জেদ্দা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, মিশিগান, ব্রুকলেন, লন্ডনের আলতাব আলী পার্ক, তুরস্কের আঙ্কারা, ইস্তাম্বুল, ওমান, বাহরাইন, কাতার, মালয়েশিয়া, কুয়েত, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, কানাডার মন্টিয়াল, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, কাশ্মিরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মাগফেরাত কামনায় অসংখ্য গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।

দেশের শীর্ষ ওলামা-মাশায়েখদের অভিমত:
জাস্টিস ত্বকী ওসমানীর টুইট বার্তা এবং মাওলানা মুহিউদ্দীন খানস্থায়ী সদস্য, রাবেতা আলম আল ইসলাম, সভাপতি, সম্মিলিত ওলামা-মাশায়েখ পরিষদ, সিনিয়র সহসভাপতি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, সম্পাদক, মাসিক মদীনা
মাওলানা নিজামীর শাহাদাতের পর গোটা বিশ্ব প্রতিবাদ করেছে, তখন হাসপাতালে তাঁর শয্যা পাশে বিশ্বখ্যাত আলেম জাস্টিস তৃকী ওসমানীর শহীদ নিজামীকে হত্যার নিন্দা জানিয়ে দেয়া টুইট বার্তা পড়া হচ্ছিল, তখন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান চোখের পানি ফেলে বললেন, আহ! উনার মতো একজন বিশ্ববরেণ্য আলেমকে খুন করে ফেললো!
হাফেজ মাওলানা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী হুজুর
আমীরে শরিয়াত, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, নায়েবে আমীর, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ
আমার আব্বার ইন্তেকালের পরে সর্বপ্রথম মাওলানা নিজামীকে দেখি (১৯৮৭ সালে)। তিনি জামেয়া সুফিয়া এ সময় আগমন করেন এবং "ইসলামী রাজনীতি" সম্পর্কে আলোচনা করেন। আমার আব্বা যে একজন ইসলামী রাজনীতির সিপাহসালার ছিলেন বাংলার জমিনে সে রাজনীতির বদ্ধদুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়ে যান মাওলানা নিজামী। এ জন্য আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।
তাঁর ফাঁসিতে আমরা গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই এবং তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও শাহাদাতের মাকাম লাভ করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী
চেয়ারম্যান, ইসলামী ঐক্যজোট
১৯৬২ সালে আলিম পরীক্ষার্থীদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়। তখন আমি নরসিংদী জেলার বুনিয়াদি দারুল উলুম সিনিয়র মাদরাসার ছাত্র। আলিম পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় অবস্থানকালে হোসনি দালান এলাকায় এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৯ সালে বিএনপি, জাপা, জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোটের সমন্বয়ে চারদলীয় জোট গঠিত হলে একত্রে কাজ করার আরো সুযোগ ঘটে।
মাওলানা নিজামীর সাথে পরিচয়ের সুবাদে তাঁর সাথে উঠা-বসার সুযোগ হয়। কিন্তু কোনদিন মনোমালিন্য হয়নি। তিনি ছিলেন অমায়িক সদালাপী ও সজ্জন ব্যক্তিত্ব।

মাওলানা জয়নুল আবেদিন
অধ্যক্ষ, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, ঢাকা
শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী একজন বিচক্ষণ আলেমে দীন, বিনয়ী, নম্র-ভদ্র, সদালাপী ও উদার মনের অধিকারী ছিলেন। সর্বশ্রেণীর আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখসহ সকল মহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল অতুলনীয়। মন্ত্রী থাকা অবস্থায়ও দেশের শীর্ষ আলেমদেরকে তিনি নিজ হাতে আপ্যায়ন করিয়ে তৃপ্তি অনুভব করতেন। বিশ্ববিখ্যাত বরেণ্য এ আলেমে দীন ও সাবেক সফল এই মন্ত্রীকে যে আইনে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে তা সারা বিশ্বে প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি সারা জীবন ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। সমাজসেবায় ছিলেন সদা সোচ্চার। তাঁর মত নিষ্কলুষ, স্বচ্ছ ব্যক্তিত্বকে ফাঁসি দেয়া দুর্ভাগ্যজনক। ঈমানী অগ্নিপরীক্ষায় চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা যুগ যুগ ধরে সর্বস্তরের ঈমানদারদের ঈমানী শক্তি জোগাবে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতে উচ্চমর্যাদা দান করুন।

মাওলানা জাফরুল্লাহ খান
মহাসচিব, সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহ, যুগ্ম মহাসচিব
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন
নির্ভীক কলমসৈনিক মাওলানা মহিউদ্দীন খান (দা.বা)-এর নেতৃত্বে সিরাত কমিটির আয়োজনে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের হল রুমে সিরাত সম্মেলনে ঘোষক আমার অজ্ঞাতসারেই আমার নাম ঘোষণা করলেন। কিন্তু আমি অপ্রস্তুত, আমার বক্তব্য রাখতে হবে-এটার ধারণাও ছিল না। যাক ঘোষণার প্রতি সম্মান রক্ষার্থে দাঁড়ালাম এবং মঞ্চে উপস্থিত মাওলানা নিজামী সাহেবকে দেখলাম। তাই আমি কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেলাম। ব্যস মাওলানা সুলতান জওক সাহেবের বক্তৃতার সূত্র ধরে আমি আমার বক্তৃতার ঘোড়া চালালাম, মুসলিম ঐক্যের অন্তরায় জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করে মাওলানা নিজামী সাহেবের কড়া সমালোচনা করলাম। কিন্তু তিনি প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অস্ত্রের ভাষায় জবাব দিলেন না। অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় নিজেকে ছাত্র এবং ওলামায়ে কেরামকে উস্তাদতুল্য ঘোষণা দিয়ে তাঁকে ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ জানালেন। এতে আমি অবাক হয়ে যাই, তিনি যে কত মহান, উদার, সভ্য, ভদ্র, বিনয়ী ও ধৈর্যশীল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর কথার ওজন ও কুরআন-হাদিসের রেফারেন্স শুনে থ' হয়ে যাই। বুঝলাম, যা ভাবি, তিনি তা নন।

আবু তাহের জিহাদী
আমীর, ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন কমিটি, মুহতামিম, জামেয়া ইমদাদিয়া, ঢাকা
শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী অত্যন্ত জ্ঞানী, বিচক্ষণ ও ইসলামী আন্দোলনের বিশ্ববরেণ্য নেতা ছিলেন। তাঁর এই শাহাদাতে ইসলামী আন্দোলন স্তিমিত হবে বলে আমি মনে করি না। বরং ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায় চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন তা যুগ-যুগ ধরে সর্বস্তরের ঈমানদারকে শক্তি জোগাবে।

মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী
সভাপতি, বাংলাদেশ আইম্মাহ পরিষদ
আবহমান কাল থেকেই প্রতি যুগে কিছু কিছু এমন ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছে, যাদের দ্বারা কাপুরুষ জাতির হীনমনে প্রেরণার সৃষ্টি হয়েছে। তেমনি এক সাহসী রাজনৈতিক কাগুরি ছিলেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (রহ)। তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠ। মজলুম ও নির্যাতিত-অত্যাচারিতদের পক্ষে জালেমের বিরুদ্ধে আপসহীন।

মাওলানা আরিফ বিল্লাহ সিদ্দিকী
ছোট পীর, শর্মীনা দরবার শরীফ
শহীদ মাওলানা নিজামী (রহ) ছিলেন বর্তমান প্রজন্যের মুসলিম মিল্লাতের আদর্শবান ত্যাগী নেতৃত্বের অধিকারী বিপ্লবী নেতা। একজন আদর্শ নেতার চরিত্রের মাঝে যে গুণাবলি বিরাজমান থাকা দরকার আমরা তা পেয়েছি হযরত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর প্রতিটি পর্যায়ে। আমরা তাঁর ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, রাজনীতিজীবনের প্রতিটি কর্মক্ষেত্র পেয়েছি রাসুলে পাকের আদর্শের নমুনা।

মুহাম্মদ কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী
পীর সাহেব, টেকেরহাট, মাদারীপুর
শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একজন নিবেদিতপ্রাণ অকুতোভয় সিপাহসালারের নাম। তিনি ছিলেন বর্তমান মুসলিম মিল্লাতের নেতৃত্ব প্রদানকারী ব্যক্তিবর্গের মধ্যে তাকওয়া ও পরহেজগারির উৎকৃষ্ট নমুনা সংবলিত একজন অনুসরণযোগ্য বহু গুণে গুণান্বিত মানুষ। তাঁর শাহাদাতের মাধ্যমে মুসলিমবিশ্ব একজন কল্যাণকামী চিন্তাবিদকে হারালো আর সেই সাথে আমাদের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটলো।

বিক্ষুব্ধ জনতা রাজপথে:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রতিবাদে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ করেছে দেশের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা। এ ছাড়াও দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল পালনসহ দেশের আনাচে কানাচে জনগণ উত্তাল প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সরকারের পেটুয়া বাহিনীর সব বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে। একই সাথে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, মসজিদ-মাদরাসা ও এতিমখানায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। অসংখ্য নারী-পুরুষ ব্যক্তিগতভাবে নফল সালাত, সাওম ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর দরবারে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম কামনা করেন ও অত্যাচারী জালিম শাসকের বিরুদ্ধে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে ফরিয়াদ জানান।

আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে প্রতিক্রিয়ায় ঝড়:
জাতিসংঘ
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরে গভীর উদ্বেগ জানায় জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মহাসচিবের স্পোজ্যান স্টিফেন ডুজার্স গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, মহাসচিব বরাবরই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ঠিক রেখেছেন।

তুরস্ক ও ওআইসি
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার জন্য আহবান জানিয়েছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ও ওআইসির চেয়ারম্যান রজপ তায়েপ এরদোগান। তিনি বলেছিলেন, আজ বাংলাদেশে ৭৫ বছর বয়সী একজন মুজাহিদের বিরুদ্ধে ফাঁসির দণ্ড দেয়া হয়েছে। যিনি এ পৃথিবীতে কোন ধরনের অপরাধ করে থাকতে পারেন বলে আমরা বিশ্বাস করি না। তারপরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় তুরস্ক বাংলাদেশ থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র নিন্দা জানানো হয়।

পাকিস্তান
পাকিস্তানের সংসদে নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় এবং এ বিষয়টি জাতিসংঘ এবং ওআইসিতে উত্থাপনের আহ্বান জানানো হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন
মাওলানা নিজামীর ফাঁসির দণ্ডাদেশ স্থগিত করতে মার্কিন কংগ্রেসের টম লেন্টাস হিউম্যান রাইটস কমিশন আহ্বান জানায়। বিচারে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের অনুপস্থিতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের টম লেন্টাস হিউম্যান রাইটস কমিশন এ আহ্বান জানায়। মাওলানা নিজামীর বিচারপ্রক্রিয়া সুস্পষ্টত মানসম্মত হয়নি বলে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের যুদ্ধাপরাধ ও বৈশ্বিক অপরাধের বিচারবিষয়ক বিভাগের সাবেক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‍্যাপ।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বার বার বিচারের ত্রুটি নিয়ে কথা বলে আসছে। তারা মনে করে, নৃশংসতাকে ত্রুটিপূর্ণ বিচারপ্রক্রিয়া দিয়ে ভোলানো ঠিক হবে না। সাজা স্থগিত করে আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচারের মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাধীন তদন্ত করার আহবান জানায় ইংল্যান্ডের বার হিউম্যান রাইটস কমিটি। নিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তানের মানবাধিকার কর্মী আসমা জাহাঙ্গীর, যিনি ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পুরস্কার পাওয়া চার পাকিস্তানির একজন। তিনি বলেন, নিজামী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে বিভাজিত করবে। এ ছাড়াও নিন্দা জানিয়েছে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), বার হিউম্যান রাইটস কমিটি ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস, ইসলামিক হিউম্যান রাইটস কমিশন (IHRC, নো পিচ উইদাউট জাস্টিজ (NPWJ), রাইটার ইউনিয়ন অব তার্কি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আরো যেসব সংগঠন নিন্দা জানিয়েছে- মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড, জামায়াত-ই-ইসলামী পাকিস্তান, জামায়াত-ই-ইসলামী হিন্দ, তুরস্কের সাদাত পার্টি, ফিলিস্তিন উলামা পরিষদ, মালয়েশিয়ার আবিম ও পাস পার্টি, তুরস্কের সর্ববৃহৎ ছাত্রসংগঠন এনাতোলিয়ান ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন, মুসলিম উম্মাহ নর্থ আফ্রিকা, ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা প্রভৃতি সংগঠন ও সংস্থা।

আন্তর্জাতিক ইসলামী স্কলার
মাওলানা নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করতে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন আল্লামা ইউসুফ আল কারযাভী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক রমাদান, ইসলামিক স্কলার হারুন ইয়াহিয়া, ইসলামিক স্কলার ওমর সুলাইমান, জাস্টিস ত্বাকী ওসমানী, হিজবুল মুজাহিদিন ব্রাজিলের প্রখ্যাত আলেম শায়খ রুদ্রিগোয়েজ প্রমুখ।

আন্তর্জাতিক মিডিয়ার গুরুত্বসহকারে সংবাদ প্রচার
আল জাজিরা, বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্যা গার্ডিয়ান, রয়টার্স, হাফিংটন পোস্ট, এবিসি নিউজ, ডন পাকিস্তান, মুসলিম মিরর, নিউজ উইক মিডল ইস্ট, ভয়েস অব আমেরিকা, ওয়ার্ল্ড বুলেটিন, ট্রিবিউন এক্সপ্রেস, সিএনএন, এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, নাউ নিউজসহ বিশ্ব মিডিয়ায় খবরটি গুরুত্বসহ প্রচার করা হয়।

নেতাকর্মী ও দেশবাসীর উদ্দেশে শহীদ নিজামী
শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ১০ নসিহত আমাদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে-
১. অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
২. মু'মিন কখনো হতাশ হয় না।
৩. জীবনে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দায়ী ইলাল্লাহ হিসেবে কাজ করে যেতে হবে।
৪. বাতিলের গভীর ষড়যন্ত্র ও বিদ্যমান সমস্যা বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে মোকাবেলা করতে হবে।
৫. সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
৬. মহিলাদের আত্মত্মগঠন ও চরিত্রগঠনের দিকে মনোযোগী হতে হবে।
৭. ইসলামী আন্দোলনে নেতৃত্বের সঙ্কট হবে না। পরিস্থিতি যত কঠিন হবে তত দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।
৮. আমার বয়স হয়েছে, যে কোন সময় মৃত্যু আসবেই। আমি শাহাদাতের মৃত্যু চাই।
৯. আমার শাহাদাত পরিবর্তনের সূচনা করবে ইনশাআল্লাহ।
১০. দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই। সবাইকে সালাম জানাই। যদি দুনিয়ায় আর দেখা না হয়, ইনশাআল্লাহ আবার দেখা হবে জান্নাতে।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍

🎬 সম্পর্কিত ভিডিও