শহীদ রফিকুল ইসলাম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
: তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসাইনের মুক্তির দাবিতে মিছিল করে ফেরার পথে পুলিশ অতর্কিতে গুলি বর্ষণ করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ রফিকুল ইসলাম
শহীদ রফিকুল ইসলাম ২০১২ সালের চৌদ্দ আগস্ট তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘জানি না খোদা, কি কারনে দুনিয়ার জীবন এত কঠিন লাগে। আল্লাহ তুমি দয়া করো আমার প্রতি। আমাকে সকল হতাশা থেকে মুক্তি দাও। দাও সে পথ, যে পথ সত্য ও সুন্দর।’ তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি হতাশাকে পছন্দ করি না। আমি চাই আমার জীবন হোক ভোরের সূর্যের মতো আলোকময়।’ জন্ম : ১৮ নভেম্বর ১৯৯৩, শাহাদাতবরণ : ১০ অক্টোবর ২০১৩।
শহীদের পরিচিতি চুয়াডাঙ্গা সদর থানার, ৩নং কুতুবপুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া পশ্চিমপাড়া গ্রামে এক হত-দরিদ্র পিতামাতার সংসারে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ রফিকুল ইসলাম। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, মায়ের নাম রহিমা খাতুন। সরোজগঞ্জ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা শেষ করে তিনি সরোজগঞ্জ হাই স্কুলে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। বদরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার অভাবে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে ভর্তি হন অর্থনীতিতে অনার্সে। শহীদ হওয়ার সময় তিনি অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পিতামাতার দুই সন্তানের একজন তিনি। তাঁর একমাত্র ভাই রানা আহমেদ দারিদ্র্যের কারণে পড়ালেখা বন্ধ করে পিতাকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতেন। শহীদ রফিক ছিলেন পরিবারের সবার জন্য আশার আলো। সেই আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে স্বৈরাচারী বন্দুকের নল।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান তিনি ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাথী এবং সরোজগঞ্জ বাজার উপশাখার সভাপতি। যেদিন তিনি শাহাদাতবরণ করেন সেদিন কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের মুক্তির দাবিতে চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার উদ্যোগে মিছিলের আয়োজন করা হয়। মিছিল শেষে সবাই যখন বিদায় নিয়ে যার যার এলাকায় ফিরছিলো ঠিক তখনই পেছন থেকে পুলিশ সরাসরি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। পুলিশের ছোঁড়া গুলি শহীদ রফিকের মাথায় বিদ্ধ হয়। দর্শনা হল্ট স্টেশনে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন শহীদ রফিক। পুলিশ তাঁর লাশ নিয়ে যায়। পরদিন জুমাবার সরোজগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে শহীদের বিশাল নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। জানাযা শেষে তাকে বোয়ালিয়া পশ্চিমপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়। কবরস্থানটি নবগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত।
কেমন ছিলেন শহীদ রফিকুল ইসলাম হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তান রফিকুল ইসলাম ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। প্রথম শ্রেণি থেকেই তাঁর রোল নম্বর ছিলো এক। স্কুল জীবনে তিনি সব সময় এই অবস্থান বজায় রেখেছেন। পিতামাতাকে বিভিন্ন
কাজ-কর্মে সহায়তা করতেন। আচার-ব্যবহার ও আমল-আখলাকে তাঁর অসাধারণত্ব সবার হৃদয় কাড়তো। শুধু মানুষ নয়, পশু-পাখির প্রতিও ছিলো তাঁর অসম্ভব মায়া মমতা। তাঁর ডায়েরির দু’টি উক্তি থেকে অনুধাবন করা যায় তাঁর পেরেশানি। শহীদের ছোট ভাই রানা একবার ঝড়ের পরে ডানা ভাঙ্গা একটি ঘুঘু পাখিকে ঘরে নিয়ে এসে বন্দী করে রাখে। এটা দেখে শহীদ রফিক ওই পাখিটাকে হলুদ বাটা লাগিয়ে কিছুটা সুস্থ করে বাগানে ছেড়ে দিয়ে আসেন। যেদিন তিনি শহীদ হন সেদিনও ঘর থেকে বের হবার আগে গরুর ঘাস, মুরগির খাবার দিয়ে বের হয়ে যান।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের মুক্তির দাবিতে চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত মিছিল শেষে ফেরার পথে পেছন থেকে পুলিশের সরাসরি গুলিতে শহীদ হন রফিকুল ইসলাম।
শহীদের আপনজনদের কথা শহীদ রফিকুল ইসলামের পিতা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলে ছিলো একটা সোনার টুকরা। সে নামাজ পড়তো, অন্যদেরও নামাজ পড়তে বলতো। আমি কখনো কখনো নামাজ পড়তে না পারলে সে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হতো, গরম হয়ে যেতো। তাঁর নম্রতা, ভদ্রতা ছিলো সবার কাছে প্রশংসনীয়। সে ছিলো আমার বন্ধুর মতো। আমরা বাপ-বেটা দু’জন এক জায়গায় দাঁড়ালে মনে হতো দু’জন বন্ধু। তিনি বলেন, ‘একদিন ওর মা ভাত রান্না করছে, এমন সময় আমি বাড়ি আসি। আমাকে দেখে সে বললো, ‘তোমার ছেলে শিবিরের মিছিল মিটিং এ যাচ্ছে। তুমি ওকে বুঝাও না কেন? ওর মার কথা শুনেই আমি বলে ফেললাম,
‘তুমি এত কথা বলছ কেন? ইসলামের জন্য না হয় আমার একটা ছেলে শহীদ হয়ে যাবে। আল্লাহ আমায় সেই কথাই কবুল করেছেন। আমার ছেলে ইসলামের জন্যই শহীদ হয়েছে। ও যে ওইদিন ওই মিছিলে যাবে, সেটা আমাকে বলেছিল।’ শহীদের মা বলেন, ‘আমরা হতদরিদ্র পরিবার, আমাদেরকে কেউ তেমন চিনতো না। ওর বাবা খুব কষ্ট করে ভ্যান চালিয়ে ওদের পড়ালেখার খরচ জোগানোর চেষ্টা করেন। ও যেদিন শহীদ হয়ে যায়, তার আগের দিন আমি একটা স্বপ্ন দেখি। দেখি, একটা ছেলে পড়ে আছে। আমি ভাবলাম, আমার বোনের নাতনি অসুস্থ, ওকে দেখে আসি। ওকে দেখতে যাই, ফিরে আসি। কিন্তু আমার মন কেমন কেমন করতে থাকে। আমার ছেলে যাওয়ার সময় গরুর ঘাস, মুরগির খাবার দিয়ে বলল, মা আজ আর ঘাস কাটতে ইচ্ছে করছে না। আমি বললাম, ‘কোথাও যাবি।’ তেমন কিছু বলল না। ওর ভাইকে বলেছে, দর্শনায় যাবো। মিল দেখতে যাচ্ছি। এভাবে আমার ছেলে শহীদ হয়ে গেল। আল্লাহ যা ভালো মনে করেছেন তাই করেছেন। আমি আল্লাহর প্রতি খুশি। শহীদের ভাই রানা আহমেদ বলেন, আমার ভাই সব সময় আমার খেয়াল রাখতো। আমি মাঝে মাঝে কারো সাথে মারামারিতে লেগে যেতাম। এজন্য বেশি খেয়াল রাখতো। সংসারের কাজ করতো। আমি করতে চাইতাম না। ও বলতো, আমিও তো করছি। তুইও টুকটাক কর। তোরে তো আমি লেখাপড়া ছাড়তে বলি নাই। আসলে আমি পড়ালেখায় অত ভালো না। তাই নিজেই ছেড়ে দিয়েছি। তারপরও ভাই বলতো পড়। সেদিন ও আমার কাছে টাকা চাইলো। আমি বললাম ৫০ টাকা আছে তুই ৩০ টাকা নিয়ে যা আর আমার জন্য ২০ টাকা রেখে যা। সেই যে ৩০ টাকা নিয়ে গেল, তারপর ভাই আমার ফিরলো শহীদ হয়ে।
পারিবারিক অবস্থা হত-দরিদ্র পরিবারটির অবস্থা আগের মতোই আছে। অতি কষ্টে ১০ শতক জমি কিনে নিজের একটা ঠিকানা তৈরি করেছে এই বাস্তুহীন পরিবারটি। গরু পালন ও শ্রমিকের কাজ করেই উপার্জন করতে হয় শহীদের পিতা ও ভাইকে।
ভাই-বোনদের বিবরণ একমাত্র ভাই : রানা আহমেদ।
গণমাধ্যমে শাহাদাতের খবর ১১ অক্টোবর ২০১৩, দৈনিক প্রথম আলো “চুয়াডাঙ্গায় গুলিতে শিবির কর্মী নিহত” শিরোনামে নিম্নোক্ত খবর প্রচার করে– রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল বৃহস্পতিবার ইসলামী ছাত্রশিবির ঝটিকা মিছিল ও পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এতে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় শিবিরের কর্মী রফিকুল ইসলাম (২২) নিহত এবং বিভিন্ন স্থানে শিবিরের বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন। প্রতিবাদে শিবির তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ শুক্রবার দেশব্যাপী দোয়া মাহফিল, শনিবার বিক্ষোভ এবং রোববার চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও মেহেরপুর জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। সংগঠনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের মুক্তির দাবিতে গতকাল দেশব্যাপী বিক্ষোভ করেন ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে দর্শনা পৌর জামায়াতের সভাপতি আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে জামায়াত-শিবিরের পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী মিছিল বের করেন। মিছিলটি দর্শনা বাজার থেকে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সমাবেশ করে। সমাবেশ শেষে নেতা-কর্মীরা কেরুজ পূজামণ্ডপ এলাকা পার হয়ে দর্শনা হল্ট স্টেশন এলাকায় গেলে পুলিশ বাধা দেয়। শুরু হয় দুই পক্ষে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ। পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পুলিশ শিবিরের কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে রফিকুল ইসলাম মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। রফিকুল ইসলাম চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার
বোয়ালিয়া গ্রামের শহীদুল ইসলামের ছেলে। (নোট: ছবিতে পিতার নাম শহীদুল উল্লেখ থাকলেও উপরের অংশে দেলোয়ার হোসেন উল্লেখ আছে)। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ওয়াহিদ মাহমুদ জানান, বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পুলিশ রফিকুল ইসলামকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসে। জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি রুহুল আমিন দাবি করেন, শিবিরের নেতা-কর্মীরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে ফেরার পথে পুলিশ বিনা উসকানিতে গুলি ছোঁড়ে। এতে রফিকুল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ সুপার আবদুর রহিম শাহ চৌধুরী বলেন, পুলিশ আত্মরক্ষার্থে ১৫টি গুলি চালালে শিবিরের এক কর্মী আহত হন। তাঁকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। তিনি বদরগঞ্জ বাকিবিল্লাহ কামিল মাদরাসার ছাত্র।
এক নজরে শহীদ রফিকুল ইসলাম
নাম : রফিকুল ইসলাম
পিতা : মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন
মাতা : রহিমা খাতুন
জন্ম : ১৮ নভেম্বর ১৯৯৩
ঠিকানা : গ্রাম- বোয়ালিয়া পশ্চিম পাড়া, ৩ নং কুতুবপুর ইউনিয়ন, চুয়াডাঙ্গা সদর
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ
ভাই-বোনের সংখ্যা : দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট
সাংগঠনিক মান : সাথী
দায়িত্ব : সভাপতি, সরোজগঞ্জ বাজার শাখা
কিভাবে শহীদ হলেন : তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসাইনের মুক্তির দাবিতে মিছিল করে ফেরার পথে পুলিশ অতর্কিতে গুলি বর্ষণ করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন
শাহাদাতের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০১৩
শহীদ রফিকুল ইসলাম ২০১২ সালের চৌদ্দ আগস্ট তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘জানি না খোদা, কি কারনে দুনিয়ার জীবন এত কঠিন লাগে। আল্লাহ তুমি দয়া করো আমার প্রতি। আমাকে সকল হতাশা থেকে মুক্তি দাও। দাও সে পথ, যে পথ সত্য ও সুন্দর।’ তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি হতাশাকে পছন্দ করি না। আমি চাই আমার জীবন হোক ভোরের সূর্যের মতো আলোকময়।’ জন্ম : ১৮ নভেম্বর ১৯৯৩, শাহাদাতবরণ : ১০ অক্টোবর ২০১৩।
শহীদের পরিচিতি চুয়াডাঙ্গা সদর থানার, ৩নং কুতুবপুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া পশ্চিমপাড়া গ্রামে এক হত-দরিদ্র পিতামাতার সংসারে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ রফিকুল ইসলাম। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, মায়ের নাম রহিমা খাতুন। সরোজগঞ্জ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা শেষ করে তিনি সরোজগঞ্জ হাই স্কুলে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। বদরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার অভাবে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে ভর্তি হন অর্থনীতিতে অনার্সে। শহীদ হওয়ার সময় তিনি অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পিতামাতার দুই সন্তানের একজন তিনি। তাঁর একমাত্র ভাই রানা আহমেদ দারিদ্র্যের কারণে পড়ালেখা বন্ধ করে পিতাকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতেন। শহীদ রফিক ছিলেন পরিবারের সবার জন্য আশার আলো। সেই আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে স্বৈরাচারী বন্দুকের নল।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান তিনি ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাথী এবং সরোজগঞ্জ বাজার উপশাখার সভাপতি। যেদিন তিনি শাহাদাতবরণ করেন সেদিন কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের মুক্তির দাবিতে চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার উদ্যোগে মিছিলের আয়োজন করা হয়। মিছিল শেষে সবাই যখন বিদায় নিয়ে যার যার এলাকায় ফিরছিলো ঠিক তখনই পেছন থেকে পুলিশ সরাসরি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। পুলিশের ছোঁড়া গুলি শহীদ রফিকের মাথায় বিদ্ধ হয়। দর্শনা হল্ট স্টেশনে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন শহীদ রফিক। পুলিশ তাঁর লাশ নিয়ে যায়। পরদিন জুমাবার সরোজগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে শহীদের বিশাল নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। জানাযা শেষে তাকে বোয়ালিয়া পশ্চিমপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়। কবরস্থানটি নবগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত।
কেমন ছিলেন শহীদ রফিকুল ইসলাম হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তান রফিকুল ইসলাম ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। প্রথম শ্রেণি থেকেই তাঁর রোল নম্বর ছিলো এক। স্কুল জীবনে তিনি সব সময় এই অবস্থান বজায় রেখেছেন। পিতামাতাকে বিভিন্ন
কাজ-কর্মে সহায়তা করতেন। আচার-ব্যবহার ও আমল-আখলাকে তাঁর অসাধারণত্ব সবার হৃদয় কাড়তো। শুধু মানুষ নয়, পশু-পাখির প্রতিও ছিলো তাঁর অসম্ভব মায়া মমতা। তাঁর ডায়েরির দু’টি উক্তি থেকে অনুধাবন করা যায় তাঁর পেরেশানি। শহীদের ছোট ভাই রানা একবার ঝড়ের পরে ডানা ভাঙ্গা একটি ঘুঘু পাখিকে ঘরে নিয়ে এসে বন্দী করে রাখে। এটা দেখে শহীদ রফিক ওই পাখিটাকে হলুদ বাটা লাগিয়ে কিছুটা সুস্থ করে বাগানে ছেড়ে দিয়ে আসেন। যেদিন তিনি শহীদ হন সেদিনও ঘর থেকে বের হবার আগে গরুর ঘাস, মুরগির খাবার দিয়ে বের হয়ে যান।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের মুক্তির দাবিতে চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত মিছিল শেষে ফেরার পথে পেছন থেকে পুলিশের সরাসরি গুলিতে শহীদ হন রফিকুল ইসলাম।
শহীদের আপনজনদের কথা শহীদ রফিকুল ইসলামের পিতা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলে ছিলো একটা সোনার টুকরা। সে নামাজ পড়তো, অন্যদেরও নামাজ পড়তে বলতো। আমি কখনো কখনো নামাজ পড়তে না পারলে সে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হতো, গরম হয়ে যেতো। তাঁর নম্রতা, ভদ্রতা ছিলো সবার কাছে প্রশংসনীয়। সে ছিলো আমার বন্ধুর মতো। আমরা বাপ-বেটা দু’জন এক জায়গায় দাঁড়ালে মনে হতো দু’জন বন্ধু। তিনি বলেন, ‘একদিন ওর মা ভাত রান্না করছে, এমন সময় আমি বাড়ি আসি। আমাকে দেখে সে বললো, ‘তোমার ছেলে শিবিরের মিছিল মিটিং এ যাচ্ছে। তুমি ওকে বুঝাও না কেন? ওর মার কথা শুনেই আমি বলে ফেললাম,
‘তুমি এত কথা বলছ কেন? ইসলামের জন্য না হয় আমার একটা ছেলে শহীদ হয়ে যাবে। আল্লাহ আমায় সেই কথাই কবুল করেছেন। আমার ছেলে ইসলামের জন্যই শহীদ হয়েছে। ও যে ওইদিন ওই মিছিলে যাবে, সেটা আমাকে বলেছিল।’ শহীদের মা বলেন, ‘আমরা হতদরিদ্র পরিবার, আমাদেরকে কেউ তেমন চিনতো না। ওর বাবা খুব কষ্ট করে ভ্যান চালিয়ে ওদের পড়ালেখার খরচ জোগানোর চেষ্টা করেন। ও যেদিন শহীদ হয়ে যায়, তার আগের দিন আমি একটা স্বপ্ন দেখি। দেখি, একটা ছেলে পড়ে আছে। আমি ভাবলাম, আমার বোনের নাতনি অসুস্থ, ওকে দেখে আসি। ওকে দেখতে যাই, ফিরে আসি। কিন্তু আমার মন কেমন কেমন করতে থাকে। আমার ছেলে যাওয়ার সময় গরুর ঘাস, মুরগির খাবার দিয়ে বলল, মা আজ আর ঘাস কাটতে ইচ্ছে করছে না। আমি বললাম, ‘কোথাও যাবি।’ তেমন কিছু বলল না। ওর ভাইকে বলেছে, দর্শনায় যাবো। মিল দেখতে যাচ্ছি। এভাবে আমার ছেলে শহীদ হয়ে গেল। আল্লাহ যা ভালো মনে করেছেন তাই করেছেন। আমি আল্লাহর প্রতি খুশি। শহীদের ভাই রানা আহমেদ বলেন, আমার ভাই সব সময় আমার খেয়াল রাখতো। আমি মাঝে মাঝে কারো সাথে মারামারিতে লেগে যেতাম। এজন্য বেশি খেয়াল রাখতো। সংসারের কাজ করতো। আমি করতে চাইতাম না। ও বলতো, আমিও তো করছি। তুইও টুকটাক কর। তোরে তো আমি লেখাপড়া ছাড়তে বলি নাই। আসলে আমি পড়ালেখায় অত ভালো না। তাই নিজেই ছেড়ে দিয়েছি। তারপরও ভাই বলতো পড়। সেদিন ও আমার কাছে টাকা চাইলো। আমি বললাম ৫০ টাকা আছে তুই ৩০ টাকা নিয়ে যা আর আমার জন্য ২০ টাকা রেখে যা। সেই যে ৩০ টাকা নিয়ে গেল, তারপর ভাই আমার ফিরলো শহীদ হয়ে।
পারিবারিক অবস্থা হত-দরিদ্র পরিবারটির অবস্থা আগের মতোই আছে। অতি কষ্টে ১০ শতক জমি কিনে নিজের একটা ঠিকানা তৈরি করেছে এই বাস্তুহীন পরিবারটি। গরু পালন ও শ্রমিকের কাজ করেই উপার্জন করতে হয় শহীদের পিতা ও ভাইকে।
ভাই-বোনদের বিবরণ একমাত্র ভাই : রানা আহমেদ।
গণমাধ্যমে শাহাদাতের খবর ১১ অক্টোবর ২০১৩, দৈনিক প্রথম আলো “চুয়াডাঙ্গায় গুলিতে শিবির কর্মী নিহত” শিরোনামে নিম্নোক্ত খবর প্রচার করে– রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল বৃহস্পতিবার ইসলামী ছাত্রশিবির ঝটিকা মিছিল ও পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এতে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় শিবিরের কর্মী রফিকুল ইসলাম (২২) নিহত এবং বিভিন্ন স্থানে শিবিরের বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন। প্রতিবাদে শিবির তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ শুক্রবার দেশব্যাপী দোয়া মাহফিল, শনিবার বিক্ষোভ এবং রোববার চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও মেহেরপুর জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। সংগঠনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের মুক্তির দাবিতে গতকাল দেশব্যাপী বিক্ষোভ করেন ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে দর্শনা পৌর জামায়াতের সভাপতি আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে জামায়াত-শিবিরের পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী মিছিল বের করেন। মিছিলটি দর্শনা বাজার থেকে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সমাবেশ করে। সমাবেশ শেষে নেতা-কর্মীরা কেরুজ পূজামণ্ডপ এলাকা পার হয়ে দর্শনা হল্ট স্টেশন এলাকায় গেলে পুলিশ বাধা দেয়। শুরু হয় দুই পক্ষে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ। পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পুলিশ শিবিরের কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে রফিকুল ইসলাম মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। রফিকুল ইসলাম চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার
বোয়ালিয়া গ্রামের শহীদুল ইসলামের ছেলে। (নোট: ছবিতে পিতার নাম শহীদুল উল্লেখ থাকলেও উপরের অংশে দেলোয়ার হোসেন উল্লেখ আছে)। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ওয়াহিদ মাহমুদ জানান, বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পুলিশ রফিকুল ইসলামকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসে। জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি রুহুল আমিন দাবি করেন, শিবিরের নেতা-কর্মীরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে ফেরার পথে পুলিশ বিনা উসকানিতে গুলি ছোঁড়ে। এতে রফিকুল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ সুপার আবদুর রহিম শাহ চৌধুরী বলেন, পুলিশ আত্মরক্ষার্থে ১৫টি গুলি চালালে শিবিরের এক কর্মী আহত হন। তাঁকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। তিনি বদরগঞ্জ বাকিবিল্লাহ কামিল মাদরাসার ছাত্র।
এক নজরে শহীদ রফিকুল ইসলাম
নাম : রফিকুল ইসলাম
পিতা : মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন
মাতা : রহিমা খাতুন
জন্ম : ১৮ নভেম্বর ১৯৯৩
ঠিকানা : গ্রাম- বোয়ালিয়া পশ্চিম পাড়া, ৩ নং কুতুবপুর ইউনিয়ন, চুয়াডাঙ্গা সদর
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ
ভাই-বোনের সংখ্যা : দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট
সাংগঠনিক মান : সাথী
দায়িত্ব : সভাপতি, সরোজগঞ্জ বাজার শাখা
কিভাবে শহীদ হলেন : তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসাইনের মুক্তির দাবিতে মিছিল করে ফেরার পথে পুলিশ অতর্কিতে গুলি বর্ষণ করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন
শাহাদাতের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০১৩
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍