শহীদ সাইফুল ইসলাম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ সাইফুল ইসলাম ছিলেন পরিশ্রমী, আমানতদার ও আত্মসংযমী। তাঁর পিতা মাওলানা নূরুল ইসলাম জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁর অন্তরে শহীদ হওয়ার তামান্না জাগ্রত ছিল।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
জন্ম : ০২ নভেম্বর ১৯৯৪ শাহাদাতবরণ : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩।
শহীদের পরিচিতি
নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বামনী রামপুর ইউনিয়নের করিমউল্যাহ মাঝির বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ সাইফুল ইসলাম। তাঁর পিতার নাম মাওলানা নূরুল ইসলাম, মায়ের নাম আয়েশা খাতুন। দরিদ্র পিতা-মাতার সংসারে ১২ জন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৬ষ্ঠ। পিতা-মাতা দরিদ্র হয়েও সন্তানদের শিক্ষিত মানুষ করার স্বপ্ন দেখেন। বড় ও মেজ ছেলেকে অনেক কষ্টে কামিল পাশ করান। শহীদ সাইফুল ইসলামের পড়ালেখা অব্যাহত রাখার জন্য পিতা তাঁর জমি বিক্রি করে দেন। স্বপ্ন দেখেন, ছেলে একদিন বড় ইঞ্জিনিয়ার হবে। বামনী ফাজিল মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করে শহীদ সাইফুল ইসলাম ভর্তি হন বামনী কলেজে এইচ.এস.সি তে। শাহাদাত বরণকালে তিনি ছিলেন এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী। তাঁর ব্যক্তিগত লক্ষ্য ছিল একজন বিসিএস ক্যাডার হওয়া।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
ঘটনাস্থল শহীদের নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে। প্রতিবাদ মিছিলের খবর পেয়ে তিনি শত শত লোক সঙ্গে নিয়ে সিএনজি, রিক্সা ও বিভিন্ন বাহন যোগে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জামে মসজিদ চত্বর থেকে মিছিল শুরু হলে তিনি এর অগ্রভাগে অবস্থান করেন। তাঁর শেষ কথা ছিল, ‘প্রয়োজনে জীবন দিবো, তবুও বাতিলকে স্থান দিবো না।’ মিছিলে পুলিশ, বিজিবি ও ছাত্রলীগ, যুবলীগ একযোগে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আক্রমণ শুরু করলে বেলা ৩ টা ৩০ মিনিটে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদাতবরণ করেন। শহীদের সাথীরা তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। এখানেই বিপুলসংখ্যক এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে শহীদের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
কেমন ছিলেন শহীদ সাইফুল ইসলাম
শহীদের পিতা বলেন, আমার ছেলে সেই ছোটবেলা থেকেই শহীদ হওয়ার তামান্না পোষণ করতো মনে। সে ছিল পরিশ্রমী। আমানতদার, আত্মসংযমী। ফজরের সময় সবার আগে জেগে উঠতো সে। তারপর সবাইকে ডেকে ডেকে তুলতো। শাহাদাতের পূর্বেও সে মিছিলের সম্মুখ সারিতে ভূমিকা পালন করেছিলো। শহীদের ছোট ভাই মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ছোট ভাইয়ের প্রতি তাঁর যে ভালবাসা ছিল এটা বলে বুঝানো কষ্টকর। তিনি সবসময় আমার লেখাপড়ার খেয়াল রাখতেন, আমার খেলা-ধুলার খবর নিতেন। খেলায় আমি তেমন ভালো না। এজন্য তিনি আমার বন্ধুদের বলতেন, আমাকে নিয়ে যেন একটু বেশি বেশি প্র্যাকটিজ করানো হয়। মাদরাসায় দায়িত্বশীল ভাইদের বলতেন, আমি যেন দ্রুত সংগঠনে যোগ দিয়ে অগ্রসর হয়ে যাই। তিনি সবসময় দাওয়াতী কাজে ব্যস্ত থাকতেন। সবাইকে দ্বীনের পথে চলার জন্য আহ্বান করতেন। এজন্য এলাকাবাসীর কাছেও তিনি খুব প্রিয় ছিলেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার প্রতিবাদে পর দিন ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় সারাদেশের মতোই প্রতিবাদ বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। বিক্ষোভে আক্রমণ করে পুলিশ, বিজিবি, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তারা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলে পড়ে। অজস্র গুলি আর শত শত টিয়ারসেলে প্রকম্পিত হয় এলাকা। এ সময় বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে শাহাদাত বরণ করেন শহীদ সাইফুল ইসলাম।
আপনজনদের কথা
তাঁর প্রিয় ছোট ভাই মোঃ তাজুল ইসলাম বলেন, সে দিন জোহরের নামাজের শেষে আবু আহমদ ভাই আমাকে বললেন মিছিল আছে, তুমি যাবে এখান থেকে। আমার মনে হলো, আজ মিছিলে গেলে শহীদ হয়ে যেতে পারি। আমার মনে ভয় ঢুকে যায়। আমি তো গুনাহগার। তারপরও আমি যাওয়ার প্রতীক্ষায় ছিলাম, কিন্তু যাওয়ার সময় কিভাবে যেন সবাই চলে যায়। আমি থেকে যাই। শেষ পর্যন্ত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা করি। এমন সময় দেখি শহীদ সাইফুল ইসলাম আমার ভাই, দৌড়ে দৌড়ে আসছেন। আমি বললাম ভাইয়া আজকে মিছিলে যাইয়েন না। তিনি আমার কথা না শুনে উল্টো আমাকে বললেন, আমি মিছিলে যাচ্ছি, মাকে বলিস। এর কিছুক্ষণ পরই শুনি প্রিয় ভাই সাইফুল ইসলাম ওই ময়দানে শহীদ হয়ে গেছেন।
ব্যক্তিগত তথ্য
শহীদ সাইফুল ইসলাম ছিলেন ছাত্র সংগঠনের সাথী এবং স্থানীয় ইউনিয়ন সভাপতি। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি টিউশনি করে নিজের খরচ জোগানোর চেষ্টা করতেন।
পারিবারিক অবস্থা
শহীদের দরিদ্র পিতা এখনো তাঁর ছয় সন্তানের লেখা-পড়া চালিয়ে নিচ্ছেন। পুরো পরিবারটি ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত।
ভাই-বোনদের বিবরণ
১। আনোয়ার হোসেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ২। দেলোয়ার হোসেন, শিক্ষকতা করেন। ৩। শাহেনা আক্তার, গৃহিণী। ৪। আসিফুর ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ারিং। ৫। সুফিয়া ফেরদৌস, গৃহিণী। ৬। শাহাদত ইসলাম, ছাত্র। ৭। জহুরুল ইসলাম, ছাত্র। ৮। ওবায়দুর ইসলাম, ছাত্র। ৯। সায়তানা আক্তার, ছাত্রী। ১০। তাজুল ইসলাম, ছাত্র। ১১। ফারহানা আক্তার, ছাত্রী।
এক নজরে শহীদ সাইফুল ইসলাম
নাম : শহীদ সাইফুল ইসলাম
পিতা : মাওলানা নূরুল ইসলাম
মাতা : আয়েশা খাতুন
জন্ম : ০২ নভেম্বর ১৯৯৪
ঠিকানা : করিমউল্যাহ মাঝির বাড়ি, গ্রাম- রামপুর, উপজেলা- কোম্পানীগঞ্জ, জেলা- নোয়াখালী
সর্বশেষ পড়ালেখা : এইচএসসি পরীক্ষার্থী, বামনী কলেজ
ভাই-বোনের সংখ্যা : ১২ জন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৬ষ্ঠ
সাংগঠনিক মান : সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির
সাংগঠনিক দায়িত্ব : ইউনিয়ন সভাপতি
কিভাবে শহীদ হলেন : শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের প্রতিবাদে আয়োজিত মিছিলে পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন।
শাহাদাতের তারিখ : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍