হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ আবুজর গিফারী
শহীদ আবুজর গিফারী

শহীদ আবুজর গিফারী

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

দিনটি ছিলো ১৮ মার্চ ২০১৬। পবিত্র জুময়ার নামাজ আদায় করে শহীদ আবুজর গিফারী মসজিদ থেকে ফিরে নিজ বাড়িতে ঢুকছিলেন। এমন সময় দু'টি মটরসাইকেল যোগে চার ব্যক্তি শহীদ গিফারীর পথ রোধ করে দাঁড়ায়। তারা নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে গিফারীর হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেয় এবং মটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়। এরপর ২৫ দিন পর্যন্ত তার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে। ২৫ দিন পর ১৩ এপ্রিল তাঁর লাশ পাওয়া যায় যশোর মাইজদিয়া বাজার সংলগ্ন বিরাম শ্মশান পুকুর পাড়ে।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ আবুজর গিফারীর চরিত্র ও আচার-ব্যবহার ছিলো ইনসানে কামিলের মতো। তিনি তাঁর পরিবার, সংগঠন ও এলাকাবাসীর নিকট প্রিয়পাত্র ছিলেন।
জন্য। ১৬ এপ্রিল, ১৯৯৫, শাহাদাতবরণ। ১২ এপ্রিল, ২০১৬ ইং।
শহীদের পরিচিতি
ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ থানার চাপলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ আবুজর গিফারী। তাঁর পিতার নাম নূর ইসলাম, মায়ের নাম কুলসুম খাতুন। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র পুত্র সন্তান। দরিদ্র পিতা-মাতার ঘরে জন্ম নিলেও মেধা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে তিনি ছিলেন এক ঐশ্বর্যমণ্ডিত তরুণ। নলডাঙ্গা সরকারি ভূষণ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর ভর্তি হন কালিমঞ্জ মাহতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজে। এই কলেজ থেকে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। তারপর ভর্তি হন যশোর সরকারি এমএম কলেজে বাংলা বিভাগে। শাহাদাতবরণ কালে তিনি ছিলেন অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
দিনটি ছিলো ১৮ মার্চ ২০১৬। পবিত্র জুময়ার নামাজ আদায় করে শহীদ আবুজর গিফারী মসজিদ থেকে ফিরে নিজ বাড়িতে ঢুকছিলেন। এমন সময় দু'টি মটরসাইকেল যোগে চার ব্যক্তি শহীদ গিফারীর পথ রোধ করে দাঁড়ায়। তারা নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে গিফারীর হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেয় এবং মটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়। এরপর ২৫ দিন পর্যন্ত তার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে। ২৫ দিন পর ১৩ এপ্রিল তাঁর লাশ পাওয়া যায় যশোর মাইজদিয়া বাজার সংলগ্ন বিরাম শ্মশান পুকুর পাড়ে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী আবুজর গিফারীকে গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করলে তাঁর পিতা নুর ইসলাম কালিমগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি কারেন ২২ মার্চ। ২৩ তারিখ দুপুর সাড়ে ১২ টায় ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে শহীদ পরিবার। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শহীদের পিতা নুর ইসলাম। তিনি বলেন, ৬ দিন পার হয়ে গেলেও তাঁর পুত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অথচ ৬ দিন আগে পবিত্র জুমার নামাজ আদায় করে নিজ বাড়িতে ফেরার সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাকে বাড়ির সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ছেলেকে উদ্ধারে তিনি প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।
শেষ পর্যন্ত ঘটনার ২৬ দিন পর ১৩ এপ্রিল তাঁর লাশ পাওয়া যায় বিরান শ্মশান পুকুর পাড়ে। একই সময় একই স্থানে পাওয়া যায় আরেকটি গুলিবিদ্ধ লাশ। ওই লাশটি সরকারি কেসি কলেজ ঝিনাইদহের বিবিএ অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র শহীদ শামীম মাহমুদের।
শহীদের আপন জনদের কথা:
শহীদের পিতা নুর ইসলাম বলেন, আবুজর গিফারী আমার ছেলে। তাঁর সম্পর্কে আমি কি আর বলব। আমাদের এলাকার প্রতিটি মানুষ বলতে পারবে তাঁর সম্পর্কে। সে ছিলো তুলনাবিহীন। পিতা-মাতার প্রতি তাঁর কি যে অপরিসীম ভালবাসা ছিলো। আমরাও ভালোবাসতাম তাকে। তাকে হারিয়ে আমরা যে কি অবস্থায় আছি বলে বোঝানো যাবে না। তাঁর কত ঘটনা কত কাহিনী। আমি কিছুই বলতে পারি না। পারব না। তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন ছিলো ছেলে এমএ পাস করে একটা ভালো চাকরি করবে পরিবারের হাল ধরবে। ছেলেরও ইচ্ছে ছিলো এমএ পাস করে ভালো কোনো কাজ জোগাড় করে নেয়ার। আমাদের কারোই সে স্বপ্ন পূরণ হলো না।
ঝিনাইদলেন দুই শিবির নেতা আবুযর গিফারী ও শামিম হোসেন কে আটকের পর হত্যার প্রতিবাদে ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে
বিক্ষোভ মিছিল "ঝিনাইদহে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেয়া দুই শিবির নেতার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার" শিরোনামে সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় নিম্মোক্ত খবর প্রচারিত হয়-
ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ পৌরসভা শিবিরের সভাপতি আবুজর গিফারি এবং কে সি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও শিবির নেতা শামীমকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া গেছে। ১৩ এপ্রিল বুধবার সকাল ৮টার দিকে যশোরের হৈবতপুর মৌজার বিরামপুর শ্মশান থেকে অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে যশোর কোতোয়ালি থানার পুলিশ লাশ দুইটি উদ্ধার করে। খবর পেয়ে নিহত আবুজর গিফারীর চাচাতো ভাই পাননু মিয়া ও শামিমের ভাই তাজনিম হুসাইন ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ দুইটি আবুজর ও শামীমের বলে শনাক্ত করেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌরসভার চাপালী গ্রামের নুর ইসলামের ছেলে যশোর এমএম কলেজের ছাত্র আবুজর গিফারীকে গত ১৮ মার্চ জুমার নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার সময় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মোটরসাইকেলে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। নিখোঁজ সন্তানের উদ্ধারের দাবিতে আবুজরের বাবা সেলুনকর্মী নুর ইসলাম গত ২৪ মার্চ ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই তার ছেলেকে নিয়ে গেছে। ২৫ দিন পর গত ১৩ এপ্রিল বুধবার তার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। এদিকে ২৪ মার্চ বিকেলে একই উপজেলার বাকুলিয়া গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজের অনার্সের ছাত্র ও শিবির নেতা শামীম হোসেনকে একইভাবে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯ দিন পর তার লাশও আবুজর গিফারীর সঙ্গে পাওয়া যায়।
এ নিয়ে শিবির ও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে এবং বিবৃতির মাধ্যমে দুই নেতার সন্ধান দাবি করা হলেও বিষয়টি পুলিশ আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ করেছিল ছাত্রশিবির। গণমাধ্যমে পাঠানো ছাত্রশিবির ও নিহত দুইজনের পরিবারের পক্ষ থেকে একাধিক বিবৃতির মাধ্যমে দুই জনের জীবন নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল। অবশেষে গত ১৩ এপ্রিল বুধবার যশোরে তাদের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া গেছে। যশোর কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইলিয়াস হোসেন দুই যুবকের লাশ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চত করে জানান, বুধবার সকালে যশোরের হৈবতপুর মৌজার বিরামপুর শ্মশান এলাকায় অজ্ঞাত দুই যুবককে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। লাশ দুইটি উদ্ধারের পর যশোর মর্গে এসে নিহতদের স্বজনরা লাশ দুইটি আবুজর গিফারী ও শামীম হোসেনের বলে শনাক্ত করেন। তিনি আরো জানান, নিহতরা শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে পুলিশ পরিচয়ে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে জানান। এদিকে কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, আমি শুনেছি কালীগঞ্জ থেকে নিখোঁজ হওয়া দুই যুবকের লাশ যশোরে পাওয়া গেছে। তিনি আরো জানান, আমার থানার কোনো পুলিশ এ ঘটনার সাথে কোনভাবেই জড়িত ছিল না।
ঝিনাইদহে নিহতদের পরিবারে শোকের ছায়া, শঙ্কায় সোহানুরের পরিবার
ঝিনাইদহের কালিগঞ্জে দুই শিবির নেতা আবুজর গিফারী ও শামীমের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়ার পর তাদের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ছেলেকে হারিয়ে দুই পরিবারের সদস্য বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন। চাপালী গ্রামের সেলুনকর্মী নূর ইসলামের স্ত্রী কুলসুম বেগম তাদের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন। কালীগঞ্জের বাকুলিয়া গ্রামের নিহত শামীম হোসেনের পরিবারটিও শোকে পাথর হয়ে গেছে। তার বাবা রুহুল। আমিন জানান, কী কারণে তার কলেজ পড়ুয়া নিরাপরাধ ছেলেকে হত্যা করা হলো তা জানা হলো না। নিখোঁজের পর দুই কলেজ ছাত্রের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের পর উপজেলার ইশ্বররা গ্রামের মহসিন আলীর পরিবারের লোকজন দিন কাটাচ্ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর শঙ্কার মধ্যে। ১০ এপ্রিল রোববার মহাসিন আলীর ছেলে ও স্থানীয় শহীদ নূর আলী কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র সোহানুর রহমানকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর এখনো নিখোঁজ রয়েছে। সোহানুর রহমানের মা পারভীনা বেগম জানান, তার ছেলে কোনো রাজনীতি করে না। সে পড়ালেখা করে। তিনি ছেলেকে ফেরতের দাবি জানান।
ভাই-বোনদের বিবরণ
একমাত্র বোন: ফারজানা খাতুন (অর্নাসে অধ্যয়নরত)
এক নজরে শহীদ আবুজর গিফারী
নাম: শহীদ আবুজর গিফারী
পিতা: নূর ইসলাম, সেলুন কর্মী

মাতা: কুলসুম খাতুন
জন্ম: ১৬ এপ্রিল, ১৯৯৫
ঠিকানা: গ্রাম- চাপলী, থানা- কালীগঞ্জ, জেলা-ঝিনাইদহ
সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: সরকারি এমএম কলেজ, বাংলা (অনার্স), তৃতীয় বর্ষ
ভাই-বোনের সংখ্যা: দুই ভাই-বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই
সাংগঠনিক মান: সদস্য
কিভাবে শহীদ হলেন: ১৮ মার্চ জুমার নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার সময় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মোটরসাইকেলে উঠিয়ে নিয়ে যায়
শাহাদাতের তারিখ: ১৩ এপ্রিল'১৬ বুধবার যশোরে তাদের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍