শহীদ আল মাহমুদ
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির, ঝিনাইদহ শহর শাখার সাবেক সভাপতি সুলতান আল-এহসান বলেন-"প্রিয় শহীদ ভায়ের সম্মানিত বাবা-মা এখনো তাদের প্রিয় সন্তানের স্মৃতি আগলিয়ে অশ্রু বিসর্জন দেন। প্রিয় ভাইটির থাকার সেই ঘর, বই-পুস্তক, কাপড়, জায়নামাজ, প্রিয় বাই-সাইকেলটি ঠিক আগের জায়গায় আছে, নেই শহীদ আল মাহমুদ।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদের পরিচিতি
শহীদ আল মাহমুদ ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বদনপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এক মুজাহিদের নাম। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখে মোঃ রজব আলী মোল্লা ও মোছাঃ জোসনা খাতুনের ঘরে অন্ধকার দূর করে আলোকিত ফুটফুটে সন্তান শহীদ আল মাহমুদের জন্ম। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে শহীদ আল মাহমুদ ছিলেন সবার ছোট ও আদরের।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
শহীদ আল মাহমুদকে গত ১৩জুন১৬, ঝিনাইদহ শহরের বদনপুর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তারের সময় উপস্থিত জনতা তাদের মধ্য থেকে এসআই আমিনুর ও এসআই উজ্জ্বলকে চিনতে পারেন। এরপর থেকে আল মাহমুদ ১৭দিন নিখোঁজ ছিল। পরিবার নিরূপায় হয়ে ছেলেকে ফিরে পেতে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। পুলিশ ০১-০৭-২০১৬ইং তারিখ রাতে ঝিনাইদহের তেতুল বাড়ীয়া নামক স্থানে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে গুলি করে হত্যা করে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
১ জুলাই ২০১৬। দিনটি ছিলো শুক্রবার। প্রিয় ভাই চলে গেলেন জান্নাতে তাঁর প্রভুর সন্নিকটে। জীবন-মৃত্যুর মালিক হলেন আল্লাহ, মৃত্যুর ফয়সালা আসমানে হয় জমিনে নয়।
১৩ জুন ২০১৬ ঝিনাইদহ শহরের বদনপুর নিজ গ্রাম থেকে রাতে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ ১৭ দিন গুম করে রেখে নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে আওয়ামী পুলিশ বাহিনী রাতের আঁধারে ঝিনাইদহের তেঁতুলবাড়ীয়া নামক স্থানে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। কি ছিল তাঁর অপরাধ? কুরআন-হাদীসের কথা বলা, মানুষকে সত্য-ন্যায়ের প্রতি আহবান করা, মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা ও ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখা; মূলত এগুলোই ছিল তার অপরাধ। খুনীরা মনে করেছে শহীদ আল মাহমুদের মত দ্বীনের জন্য বলিষ্ঠ একজন ছাত্রনেতাকে হত্যা করে ঝিনাইদহে দ্বীন কায়েমের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দিবে। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল ছিলো। শহীদ আল মাহমুদের রক্ত ঝিনাইদহের ময়দানকে শহীদের ময়দান হিসেবে পবিত্র করেছে এবং সারাদেশের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাছে তাঁর শাহাদত ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে প্রেরণা হয়ে থাকবে।
কেমন ছিলেন শহীদ আল মাহমুদ
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির, ঝিনাইদহ শহর শাখার সাবেক সভাপতি সুলতান আল-এহসান বলেন-"প্রিয় শহীদ ভায়ের সম্মানিত বাবা-মা এখনো তাদের প্রিয় সন্তানের স্মৃতি আগলিয়ে অশ্রু বিসর্জন দেন। প্রিয় ভাইটির থাকার সেই ঘর, বই-পুস্তক, কাপড়, জায়নামাজ, প্রিয় বাই-সাইকেলটি ঠিক আগের জায়গায় আছে, নেই শহীদ আল মাহমুদ। এইতো সর্বশেষ রমযান মাসে শহর সেক্রেটারি নিয়ে গিয়েছিলেন ভায়ের প্রিয় আব্বা-আম্মার সাথে দেখা করাতে। ইফতার শেষে নামাজ আদায় করে যখন বিদায় নিয়ে বের হবো তখন শহীদের আম্মা অশ্রুসজল চোখে ভারী কন্ঠে বললেন- "তোমরা এসেছো আমার মণি কই? মণি থাকলে তোমরা আসলে কত যত্ন করতো, কত কিছুর আয়োজন করতো, আমি কিছুই তোমাদের খেতে দিতে পারলাম না বাবা। তোমরা দুটো ডালভাত খেয়ে যাও।" শহীদ ভাইয়ের প্রিয় আম্মার দু'চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগলো নিজেরাও সামাল দিতে পারিনি। প্রিয় মা আমাদের নিজ হাতে প্লেটে তরকারি উঠিয়ে দিল আর বলতে লাগলো, মনি আমার আদরের টুকরা আজ কোথায় হারিয়ে গেল আর আসলো না।
যে বাবা-মা তাঁর প্রিয় সন্তানকে হারিয়েছেন তাদের সান্ত্বনা দেয়ার মত ভাষা আমাদের জানা নেই। বাবা-মা তাদের সন্তানকে হারিয়ে আজ নির্বাক। এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হবে সেটা পুরা এলাকাবাসীর কেউই মেনে নিতে পারেনি। রাত নাই, দিন নাই, যে কোন সময় এলাকার যে কোন প্রয়োজনে শহীদ আল মাহমুদ ভাই ছিলেন সর্বদা আন্তরিক। বিশেষ করে কোন ভাই বিপদে পড়লে, রক্ত লাগলে, অসুস্থ হলে সাহায্যের জন্য সর্বদা এগিয়ে যেতেন। এতো ভাল একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলে এলাকাবাসী নির্বাক।
শহীদ আল মাহমুদ ভাই ছিলেন সংগঠনের সাথী এবং ঝিনাইদহ শহর শাখার ছাত্রকল্যাণ ও আইন বিভাগের সদস্য। আমি প্রিয় ভাইটিকে যখনই কোন কাজে ডেকেছি কখনো না করেনি। সেই দূর থেকে ছুটে চলে আসতো হাসিমুখে। শহীদ আল মাহমুদ ভাই সব সময় হাস্যোজ্জ্বল থাকতেন। কখনো আমি তাঁর চেহারায় কোন কাজে বিরক্তি ভাব পায়নি। অথচ সেই হাসিমাখা মুখ প্রিয় ভাইটিকে সংগঠনের বিরুদ্ধে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ১৭ দিন ধরে কতই না নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে।
হাত-পা সহ সারা শরীরের এমন কোন জায়গা নেই যে, তাঁরা আঘাত করে নি, আঘাত করেই খুনীরা ক্ষান্ত হয়নি, তাঁকে কপালে মাথায় বুকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। পুলিশ ও তাগুতি শক্তির এ অত্যাচার ও জুলুমের শেষ কবে হবে তা জানি না...। কিন্তু একদিন এ হত্যাকাণ্ডের চরম জবাব তাদের সবাইকে দিতে হবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরে ঝিনাইদহ শহর শাখার সাবেক সভাপতি জাফর আহমেদ বলেন- শহরের দায়িত্বশীল হওয়ার কারণে তাঁর সাথে ভালভাবে মেশার সুযোগ হয়েছে। আমি তাঁকে কখনো দেখেছি শহীদী গান শুনতে। কখনো দেখেছি মসজিদের নামাজের ইমামতি করতে। সে ইসলামী আন্দোলন বুঝেছিল খুব সুন্দরভাবে। আল্লাহ বলেন: তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যই থাকতে হবে, যারা (মানুষেদের) কল্যাণের দিকে আহবান জানাবে, ভালো কাজের নির্দেশ দেবে ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে, এরাই হচ্ছে সত্যিকারের সফল। (সুরা আল ইমরান-১০৪)
এ অন্দোলনের কাজের আনজাম দিতেই ক্রমান্বয়ে ২০০৭ সালে আন্দোলনে শরীক হন। সংগঠনের সমর্থক থেকে কর্মী, কর্মী থেকে সাথী শপথ নিয়েছিলেন। সংগঠনের কাজে অন্যদের থেকে বেশি অগ্রগামী ছিলেন। আমি কখনো দেখেছি মিছিলে নারায়ে তাকবীর ধ্বনি দিতে, আবার কখনো দেখেছি রক্তদান কর্মসূচীতে নেতৃত্ব দিতে এবং রক্ত দিতে। কেউ যদি কোনো সমস্যায় পড়ত সবার আগে শহীদ আল মাহমুদ ভাই হাজির হতেন,
নিয়োজিত থাকতেন কল্যাণের কাজে। হাসপাতালের সেবায় প্রায়ই নিয়োজিত থাকতেন। দাওয়াতে ইলাল্লাহর পথে সবচেয়ে বেশি সমর্থক ও কর্মী বৃদ্ধির কাজে বেশিরভাগ সময় নিমগ্ন থাকতেন।
২০০৯ সালে বয়ড়াতলা দাখিল মাদরাসা থেকে শহীদ আল মাহমুদ কৃতিত্বের সাথে দাখিল পাশ করেন। ঝিনাইদহ সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসা থেকে ২০১১ ও ২০১৪ সালে যথাক্রমে আলিম ও ফাজিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং শাহাদাতকালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে অধ্যয়নরত ছিলেন।
শহর শাখার দায়িত্বশীল হওয়ার কারণে আমি ভাইয়ের মাধ্যমে কোর্টের কাজ পরিচালনা করতাম। সে ছিল অত্যন্ত চৌকস ও কৌশলী। পরিকল্পনা মাফিক সকল কাজ সম্পাদন করতেন। নিরপরাধ গ্রেপ্তারকৃত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। পরিকল্পনা হলো কাজের অর্ধেক।
ঝিনাইদহে তাঁর কাজের ধরণ দেখে আমি বারবার অনুপ্রাণিত হতাম। ইসলামের পথে থাকলে যে নানাভাবে পরীক্ষা আসবে শহীদ আল মাহমুদ ভাই তা ভালভাবে অনুধাবন করেছিলেন। যখন ইসলামী আন্দোলনের সমস্ত কাজ বন্ধ করার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিচারিক হত্যাকাণ্ড কার্যকর শুরু হয় তখন তিনি পিতা-মাতাকে কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াত শুনিয়েছিলেন। আওয়ামীলীগ সরকার, ছাত্রলীগ ও তাদের পেটুয়া প্রশাসন একের পর এক ষড়যন্ত্র করতে থাকে। সারা দেশের নেতৃবৃন্দকে হত্যার জন্য নীল নকশা তৈরি করে। তারই এজেণ্ডা হিসেবে ঝিনাইদহে একের পর এক কুরআনের সৈনিকদেরকে হত্যা করতে থাকে। নাস্তিক্যবাদী সরকারের দালাল পুলিশ বাহিনী সাদা পোশাকে ২০১৬ সালের ১৩ই জুন রাতে সন্ত্রাসীর মত করে শহীদ মাহমুদ ভাইয়ের বাসায় আক্রমণ চালিয়ে তাকে নির্যাতন করতে করতে তুলে নিয়ে যায়।
আমি সকালবেলা খালাম্মা ও খালুর সাথে দেখা করি। তখন খালা আমাকে বলেছিলেন তুমি আমার ছেলেকে ফিরিয়ে আনবে। আমি কথা দিয়েছিলাম কিন্তু সেই কথা রাখতে পারিনি। ১৭ দিন একটানা নির্মম নির্যাতনের পর আওয়ামী সন্ত্রাসী প্রশাসন নমরুদ, ফেরাউন ও এজিদের প্রেতাত্মা ১ জুলাই ২০১৬ তারিখে শহীদ আল মাহমুদকে তেঁতুলবাড়িয়া মাঠে গুলি করে সত্যি সত্যি শহীদ করে দেয়। একই সাথে শহীদ আনিচুর রহমানকে গুলি করে শহীদ করা হয়।
যারা আল্লাহর পথে জীবন দেন তারা মৃত নয় বরং জীবিত। এ সম্পর্কে আল্লাহ সূরা আল ইমরান বলেন-আয়াত: ১৬৯-১৭০ 'আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন।'- সূরা তওবা: ১১১ 'যারা আল্লাহর পথে জীবন দান করেন মৃত্যুর পর আল্লাহ তাদের রিজিকের ব্যবস্থা করেন'- সূরা আল হাজ্জঃ ৫৮-৫৯
শহীদী মৃত্যু মুমিনের জীবনের কামনা। শহীদ আল মাহমুদ ভাইয়ের জীবনের অন্যতম ইচ্ছা ছিল শহীদী মৃত্যু। আল্লাহ সেটা কবুল করেছেন।
শহীদ আল মাহমুদ ভাইয়ের পিতামাতার আহাজারি কখনও শেষ হবে না। আমি যতবার খালা আম্মা ও খালুর সাথে দেখা করেছি তিনবার, তাদের চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে দেখেছি। আমাকে খালা আম্মা ও খালু শহীদ আল মাহমুদ বলে সম্বোধন করেন কিন্তু তাদের হৃদয়ের হাহাকার কখনো কমতে দেখেনি। আর কোনোদিন শহীদ আল মাহমুদ ভাইকে আমি কোর্টে খুঁজে পাবো না, কোনোদিন কুরআন ক্লাসে দেখতে পাবো না, কোনদিন আর আমাদের মাঝে হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে ফিরে আসবে না।
এক নজরে শহীদ আল- মাহমুদ
নাম: শহীদ আল- মাহমুদ
জন্ম তারিখ: ৪-১২-১৯৯৪
পিতা: রজব আলী
মাতা: জোসনা বেগম
বর্তমান ঠিকানা: বদনপুর, কালীচরনপুর, ঝিনাইদহ সদর, ঝিনাইদহ
স্থায়ী ঠিকানা ঐ
লেখাপড়া: কামিল ১ম বর্ষ
শাহাদতের তারিখ: ০১-০৭-২০১৬
শাহাদতের স্থান: তেঁতুলতলা, ঝিনাইদহ
কবরস্থান: পারিবারিক কবরস্থান, বদনপুর, ঝিনাইদহ
সাংগঠনিক মান: সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
শহীদ আল মাহমুদ ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বদনপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এক মুজাহিদের নাম। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখে মোঃ রজব আলী মোল্লা ও মোছাঃ জোসনা খাতুনের ঘরে অন্ধকার দূর করে আলোকিত ফুটফুটে সন্তান শহীদ আল মাহমুদের জন্ম। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে শহীদ আল মাহমুদ ছিলেন সবার ছোট ও আদরের।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
শহীদ আল মাহমুদকে গত ১৩জুন১৬, ঝিনাইদহ শহরের বদনপুর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তারের সময় উপস্থিত জনতা তাদের মধ্য থেকে এসআই আমিনুর ও এসআই উজ্জ্বলকে চিনতে পারেন। এরপর থেকে আল মাহমুদ ১৭দিন নিখোঁজ ছিল। পরিবার নিরূপায় হয়ে ছেলেকে ফিরে পেতে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। পুলিশ ০১-০৭-২০১৬ইং তারিখ রাতে ঝিনাইদহের তেতুল বাড়ীয়া নামক স্থানে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে গুলি করে হত্যা করে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
১ জুলাই ২০১৬। দিনটি ছিলো শুক্রবার। প্রিয় ভাই চলে গেলেন জান্নাতে তাঁর প্রভুর সন্নিকটে। জীবন-মৃত্যুর মালিক হলেন আল্লাহ, মৃত্যুর ফয়সালা আসমানে হয় জমিনে নয়।
১৩ জুন ২০১৬ ঝিনাইদহ শহরের বদনপুর নিজ গ্রাম থেকে রাতে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ ১৭ দিন গুম করে রেখে নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে আওয়ামী পুলিশ বাহিনী রাতের আঁধারে ঝিনাইদহের তেঁতুলবাড়ীয়া নামক স্থানে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। কি ছিল তাঁর অপরাধ? কুরআন-হাদীসের কথা বলা, মানুষকে সত্য-ন্যায়ের প্রতি আহবান করা, মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা ও ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখা; মূলত এগুলোই ছিল তার অপরাধ। খুনীরা মনে করেছে শহীদ আল মাহমুদের মত দ্বীনের জন্য বলিষ্ঠ একজন ছাত্রনেতাকে হত্যা করে ঝিনাইদহে দ্বীন কায়েমের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দিবে। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল ছিলো। শহীদ আল মাহমুদের রক্ত ঝিনাইদহের ময়দানকে শহীদের ময়দান হিসেবে পবিত্র করেছে এবং সারাদেশের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাছে তাঁর শাহাদত ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে প্রেরণা হয়ে থাকবে।
কেমন ছিলেন শহীদ আল মাহমুদ
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির, ঝিনাইদহ শহর শাখার সাবেক সভাপতি সুলতান আল-এহসান বলেন-"প্রিয় শহীদ ভায়ের সম্মানিত বাবা-মা এখনো তাদের প্রিয় সন্তানের স্মৃতি আগলিয়ে অশ্রু বিসর্জন দেন। প্রিয় ভাইটির থাকার সেই ঘর, বই-পুস্তক, কাপড়, জায়নামাজ, প্রিয় বাই-সাইকেলটি ঠিক আগের জায়গায় আছে, নেই শহীদ আল মাহমুদ। এইতো সর্বশেষ রমযান মাসে শহর সেক্রেটারি নিয়ে গিয়েছিলেন ভায়ের প্রিয় আব্বা-আম্মার সাথে দেখা করাতে। ইফতার শেষে নামাজ আদায় করে যখন বিদায় নিয়ে বের হবো তখন শহীদের আম্মা অশ্রুসজল চোখে ভারী কন্ঠে বললেন- "তোমরা এসেছো আমার মণি কই? মণি থাকলে তোমরা আসলে কত যত্ন করতো, কত কিছুর আয়োজন করতো, আমি কিছুই তোমাদের খেতে দিতে পারলাম না বাবা। তোমরা দুটো ডালভাত খেয়ে যাও।" শহীদ ভাইয়ের প্রিয় আম্মার দু'চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগলো নিজেরাও সামাল দিতে পারিনি। প্রিয় মা আমাদের নিজ হাতে প্লেটে তরকারি উঠিয়ে দিল আর বলতে লাগলো, মনি আমার আদরের টুকরা আজ কোথায় হারিয়ে গেল আর আসলো না।
যে বাবা-মা তাঁর প্রিয় সন্তানকে হারিয়েছেন তাদের সান্ত্বনা দেয়ার মত ভাষা আমাদের জানা নেই। বাবা-মা তাদের সন্তানকে হারিয়ে আজ নির্বাক। এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হবে সেটা পুরা এলাকাবাসীর কেউই মেনে নিতে পারেনি। রাত নাই, দিন নাই, যে কোন সময় এলাকার যে কোন প্রয়োজনে শহীদ আল মাহমুদ ভাই ছিলেন সর্বদা আন্তরিক। বিশেষ করে কোন ভাই বিপদে পড়লে, রক্ত লাগলে, অসুস্থ হলে সাহায্যের জন্য সর্বদা এগিয়ে যেতেন। এতো ভাল একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলে এলাকাবাসী নির্বাক।
শহীদ আল মাহমুদ ভাই ছিলেন সংগঠনের সাথী এবং ঝিনাইদহ শহর শাখার ছাত্রকল্যাণ ও আইন বিভাগের সদস্য। আমি প্রিয় ভাইটিকে যখনই কোন কাজে ডেকেছি কখনো না করেনি। সেই দূর থেকে ছুটে চলে আসতো হাসিমুখে। শহীদ আল মাহমুদ ভাই সব সময় হাস্যোজ্জ্বল থাকতেন। কখনো আমি তাঁর চেহারায় কোন কাজে বিরক্তি ভাব পায়নি। অথচ সেই হাসিমাখা মুখ প্রিয় ভাইটিকে সংগঠনের বিরুদ্ধে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ১৭ দিন ধরে কতই না নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে।
হাত-পা সহ সারা শরীরের এমন কোন জায়গা নেই যে, তাঁরা আঘাত করে নি, আঘাত করেই খুনীরা ক্ষান্ত হয়নি, তাঁকে কপালে মাথায় বুকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। পুলিশ ও তাগুতি শক্তির এ অত্যাচার ও জুলুমের শেষ কবে হবে তা জানি না...। কিন্তু একদিন এ হত্যাকাণ্ডের চরম জবাব তাদের সবাইকে দিতে হবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরে ঝিনাইদহ শহর শাখার সাবেক সভাপতি জাফর আহমেদ বলেন- শহরের দায়িত্বশীল হওয়ার কারণে তাঁর সাথে ভালভাবে মেশার সুযোগ হয়েছে। আমি তাঁকে কখনো দেখেছি শহীদী গান শুনতে। কখনো দেখেছি মসজিদের নামাজের ইমামতি করতে। সে ইসলামী আন্দোলন বুঝেছিল খুব সুন্দরভাবে। আল্লাহ বলেন: তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যই থাকতে হবে, যারা (মানুষেদের) কল্যাণের দিকে আহবান জানাবে, ভালো কাজের নির্দেশ দেবে ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে, এরাই হচ্ছে সত্যিকারের সফল। (সুরা আল ইমরান-১০৪)
এ অন্দোলনের কাজের আনজাম দিতেই ক্রমান্বয়ে ২০০৭ সালে আন্দোলনে শরীক হন। সংগঠনের সমর্থক থেকে কর্মী, কর্মী থেকে সাথী শপথ নিয়েছিলেন। সংগঠনের কাজে অন্যদের থেকে বেশি অগ্রগামী ছিলেন। আমি কখনো দেখেছি মিছিলে নারায়ে তাকবীর ধ্বনি দিতে, আবার কখনো দেখেছি রক্তদান কর্মসূচীতে নেতৃত্ব দিতে এবং রক্ত দিতে। কেউ যদি কোনো সমস্যায় পড়ত সবার আগে শহীদ আল মাহমুদ ভাই হাজির হতেন,
নিয়োজিত থাকতেন কল্যাণের কাজে। হাসপাতালের সেবায় প্রায়ই নিয়োজিত থাকতেন। দাওয়াতে ইলাল্লাহর পথে সবচেয়ে বেশি সমর্থক ও কর্মী বৃদ্ধির কাজে বেশিরভাগ সময় নিমগ্ন থাকতেন।
২০০৯ সালে বয়ড়াতলা দাখিল মাদরাসা থেকে শহীদ আল মাহমুদ কৃতিত্বের সাথে দাখিল পাশ করেন। ঝিনাইদহ সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসা থেকে ২০১১ ও ২০১৪ সালে যথাক্রমে আলিম ও ফাজিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং শাহাদাতকালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে অধ্যয়নরত ছিলেন।
শহর শাখার দায়িত্বশীল হওয়ার কারণে আমি ভাইয়ের মাধ্যমে কোর্টের কাজ পরিচালনা করতাম। সে ছিল অত্যন্ত চৌকস ও কৌশলী। পরিকল্পনা মাফিক সকল কাজ সম্পাদন করতেন। নিরপরাধ গ্রেপ্তারকৃত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। পরিকল্পনা হলো কাজের অর্ধেক।
ঝিনাইদহে তাঁর কাজের ধরণ দেখে আমি বারবার অনুপ্রাণিত হতাম। ইসলামের পথে থাকলে যে নানাভাবে পরীক্ষা আসবে শহীদ আল মাহমুদ ভাই তা ভালভাবে অনুধাবন করেছিলেন। যখন ইসলামী আন্দোলনের সমস্ত কাজ বন্ধ করার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিচারিক হত্যাকাণ্ড কার্যকর শুরু হয় তখন তিনি পিতা-মাতাকে কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াত শুনিয়েছিলেন। আওয়ামীলীগ সরকার, ছাত্রলীগ ও তাদের পেটুয়া প্রশাসন একের পর এক ষড়যন্ত্র করতে থাকে। সারা দেশের নেতৃবৃন্দকে হত্যার জন্য নীল নকশা তৈরি করে। তারই এজেণ্ডা হিসেবে ঝিনাইদহে একের পর এক কুরআনের সৈনিকদেরকে হত্যা করতে থাকে। নাস্তিক্যবাদী সরকারের দালাল পুলিশ বাহিনী সাদা পোশাকে ২০১৬ সালের ১৩ই জুন রাতে সন্ত্রাসীর মত করে শহীদ মাহমুদ ভাইয়ের বাসায় আক্রমণ চালিয়ে তাকে নির্যাতন করতে করতে তুলে নিয়ে যায়।
আমি সকালবেলা খালাম্মা ও খালুর সাথে দেখা করি। তখন খালা আমাকে বলেছিলেন তুমি আমার ছেলেকে ফিরিয়ে আনবে। আমি কথা দিয়েছিলাম কিন্তু সেই কথা রাখতে পারিনি। ১৭ দিন একটানা নির্মম নির্যাতনের পর আওয়ামী সন্ত্রাসী প্রশাসন নমরুদ, ফেরাউন ও এজিদের প্রেতাত্মা ১ জুলাই ২০১৬ তারিখে শহীদ আল মাহমুদকে তেঁতুলবাড়িয়া মাঠে গুলি করে সত্যি সত্যি শহীদ করে দেয়। একই সাথে শহীদ আনিচুর রহমানকে গুলি করে শহীদ করা হয়।
যারা আল্লাহর পথে জীবন দেন তারা মৃত নয় বরং জীবিত। এ সম্পর্কে আল্লাহ সূরা আল ইমরান বলেন-আয়াত: ১৬৯-১৭০ 'আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন।'- সূরা তওবা: ১১১ 'যারা আল্লাহর পথে জীবন দান করেন মৃত্যুর পর আল্লাহ তাদের রিজিকের ব্যবস্থা করেন'- সূরা আল হাজ্জঃ ৫৮-৫৯
শহীদী মৃত্যু মুমিনের জীবনের কামনা। শহীদ আল মাহমুদ ভাইয়ের জীবনের অন্যতম ইচ্ছা ছিল শহীদী মৃত্যু। আল্লাহ সেটা কবুল করেছেন।
শহীদ আল মাহমুদ ভাইয়ের পিতামাতার আহাজারি কখনও শেষ হবে না। আমি যতবার খালা আম্মা ও খালুর সাথে দেখা করেছি তিনবার, তাদের চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে দেখেছি। আমাকে খালা আম্মা ও খালু শহীদ আল মাহমুদ বলে সম্বোধন করেন কিন্তু তাদের হৃদয়ের হাহাকার কখনো কমতে দেখেনি। আর কোনোদিন শহীদ আল মাহমুদ ভাইকে আমি কোর্টে খুঁজে পাবো না, কোনোদিন কুরআন ক্লাসে দেখতে পাবো না, কোনদিন আর আমাদের মাঝে হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে ফিরে আসবে না।
এক নজরে শহীদ আল- মাহমুদ
নাম: শহীদ আল- মাহমুদ
জন্ম তারিখ: ৪-১২-১৯৯৪
পিতা: রজব আলী
মাতা: জোসনা বেগম
বর্তমান ঠিকানা: বদনপুর, কালীচরনপুর, ঝিনাইদহ সদর, ঝিনাইদহ
স্থায়ী ঠিকানা ঐ
লেখাপড়া: কামিল ১ম বর্ষ
শাহাদতের তারিখ: ০১-০৭-২০১৬
শাহাদতের স্থান: তেঁতুলতলা, ঝিনাইদহ
কবরস্থান: পারিবারিক কবরস্থান, বদনপুর, ঝিনাইদহ
সাংগঠনিক মান: সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍