শহীদ মোঃ এনামুল হক
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ এনামুল হক স্কুল জীবনের শুরু থেকেই ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৮৭সালে শিবিরের সাথী পদ লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে কোটচাঁদপুর সরকারি কলেজের শিবির সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৮৯-৯০ সালে কোটচাঁদপুর উপজেলা শিবির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে কোটচাঁদপুর সাথী শাখার আওতায় ছিল মহেশপুর উপজেলা শিবির সংগঠন। সে সময়ে শহীদ এনামুল হক মহেশপুর উপজেলা ছাত্র আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ মোঃ এনামুল হক ছিলেন আল্লাহর রাহে নিবেদিত প্রাণ। শহীদি জীবন জিন্দেগী লাভের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তিনি ১৯৬৮ সালের ৩রা জুন ঝিনাইদহ জেলার অন্তর্গত কোটচাঁদপুর থানার চাঁদপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জনাব আব্দুল মালেক বিশ্বাস। তাঁর পিতা একজন কৃষিজীবী। মাতা শুকুরুন্নেছা বেগম। তাদের তিন পুত্র ও চার কন্যার মধ্যে শহীদ এনামুল হক হলেন প্রথম পুত্র সন্তান।
শিক্ষা জীবন:
শহীদের শিক্ষা জীবন শুরু হয় চাঁদপাড়া গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রাম এলাঙ্গী প্রাইমারি স্কুলে। বাল্যকাল থেকে তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। তিনি ১৯৮৪ সালে এলাঙ্গী মফেজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি পাশ করেন। কোটচাঁদপুর সরকারি খোন্দকার মোশারফ হোসেন কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে এইচ.এস.সি পাশ করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৯০ সালে বি.এ পাশ করেন।
ছাত্র রাজনীতি:
শহীদ এনামুল হক স্কুল জীবনের শুরু থেকেই ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৮৭সালে শিবিরের সাথী পদ লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে কোটচাঁদপুর সরকারি কলেজের শিবির সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৮৯-৯০ সালে কোটচাঁদপুর উপজেলা শিবির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে কোটচাঁদপুর সাথী শাখার আওতায় ছিল মহেশপুর উপজেলা শিবির সংগঠন। সে সময়ে শহীদ এনামুল হক মহেশপুর উপজেলা ছাত্র আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিবাহ:
এনামুল হক ১৯৯৪ সালের ৩০শে জানুয়ারি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রীর নাম জেবুন্নেছা বেগম। তিনি এক মেয়ে ও দুই ছেলের জনক।
সন্তান-সন্ততির বর্তমান অবস্থা:
তাঁর একমাত্র কন্যা মাহমুদা হক মীম এম.বি.বি.এস শেষ বর্ষে ঢাকা ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত। জামাতা মোঃ শিহাব উদ্দিন ৩৯তম বি.সি.এস এ উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি নিয়োগের অপেক্ষায় একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। বড় ছেলে জুবায়ের হুসাইন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ বর্ষের ছাত্র। সর্বকনিষ্ঠ পুত্র কামরুল হাসান সরকারি খোন্দকার মোশাররফ হোসেন কলেজে এইচ.এস.সি বিজ্ঞান বিভাগের ১ম বর্ষের ছাত্র।
বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলন:
তিনি ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রুকন পদ লাভ করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর নিজের ইউনিয়ন ৫নং এলাঙ্গীর সভাপতি ছিলেন। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এলাঙ্গী ইউনিয়নের আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি কোটচাঁদপুর উপজেলা শাখার কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে থানা বাইতুল মাল সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। শাহাদতলাভের পূর্ব পর্যন্ত লিগ্যাল এইডসহ তিনি বাইতুলমালের দায়িত্ব পালন করেন।
পেশা:
পেশাগতভাবে নিজ থানা ও ইউনিয়নের মুরুটিয়া বলরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী জেবুন্নেছাও কালীগঞ্জ থানার শাহাপুর ঘিঘাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা হিসেবে বর্তমানে কর্মরত আছেন।
আদর্শ পরিবার গঠন:
সাংগঠনিক শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজ পরিবার গঠনে তিনি ছিলেন ইসলামের জীবন্ত অনুসারী। প্রতিদিন সুনির্দিষ্ট সময়ে তিনি নিজেই ছেলে-মেয়েদেরকে পড়াতেন। দু'টি ছেলেকে সাথে নিয়েই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে মসজিদে গিয়েই আদায় করতেন। পিতা হিসেবে স্বল্প পরিসরে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। একবার এনামুল হক ট্রেন যোগে ঢাকাতে যাবেন। ট্রেনের সময় প্রায় সমাগত। এমনি মুহূর্তে মসজিদের মিনার থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসে। আজানের শব্দ শুনে তিনি দ্রুত গতিতে এশার নামাজ পড়ার জন্য স্টেশন মসজিদে ঢুকে পড়েন। মসজিদ থেকে এসে দেখেন ট্রেন চলে গেছে দৃষ্টির আড়ালে। তিনি স্বভাবসুলভ হেসে। বলেন, 'ট্রেন চলে যাক। আমার জামায়াততো ফেল হয়নি।' একেই বলে জিন্দাদিল মু'মীন।
আমানতদারি:
শহীদের চাচাতো ভাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক মতিয়ার রহমান বলেন- শহীদ এনামুল হক ছিলেন আমানতদারিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যতটুকু মনে পড়ে ১৯৮৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি রাঙ্গীয়ারপোতা ভোট কেন্দ্রের নির্বাচনী দায়িত্ব পান। এক পর্যায়ে ব্যালোট বাক্স ছিনতাইকে কেন্দ্র করে মারামারি বেধে যায়। অবস্থার নাজুকতায় সকলেই ভোট কেন্দ্র ছেড়ে চলে গেলেও শহীদ এনামুল একাই ভোট বাক্সের উপর শুয়ে পড়ে প্রচুর মার খেয়েও ঐ বাক্সটি ছিনতাই করতে দেননি। অবশেষে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল- সে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গায়ে ব্যথা নিয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। কথা বলতেই বলে উঠলেন, 'মিয়া ভাই ওরা আমাকে প্রচুর মারধর করেছে। আমার গায়ে প্রবল জ্বর। ওরা মারে মারুক আমি তো সংগঠনের দেয়া দায়িত্ব পালন করেছি। জাযা আল্লাহ পাকের হাতেই।' আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এ ধরনের আমানতদারের। সে আমার ক্ষেত খামার পরিচর্যা ও তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই দশক যাবত যে আমানতদারীতার পরিচয় দিয়েছে তা কখনও ভুলবার নয়। গ্রামের মসজিদ, মাদ্রাসা বিনির্মাণে ও সম্পদ রক্ষায় তাঁর আমানতদারীতা অনস্বীকার্য। বায়তুল মাল সেক্রেটারি ছিলেন। হিসাব-নিকাশে তাঁর স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত অনুকরণীয়। এমনকি জেল খানার পি.সি থেকে বেঁচে যাওয়া ৪,০০০/- (চার হাজার) টাকা থানা বায়তুলমালে জমা দিয়ে দায়িত্বশীল হিসেবে আমানতদারীতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা কখনও ম্লান হবার নয়।
সংগঠনের প্রতি নিবেদিত প্রাণ:
অধ্যাপক মতিয়ার রহমান আরো বলেন- সংগঠনের প্রতি এমন দরদী মানুষ খুব কম দেখা যায়। কি করে সংগঠন মজবুত হবে, কি করলে সংগঠনের লোকেরা ভাল থাকবে এই চিন্তা তিনি এক মুহূর্তের জন্যও মাথা থেকে সরাননি। তিনি রাত-দিন সংগঠনের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আমি একদিন অনেক দূর থেকে সভা করে ফিরছি। সে সময়ে আমাদের চাঁদপাড়ার ঠাকুর বিলের ভিতরে দিনের বেলায়ও মানুষ ভয় পেতো। তখন রাত ১টা ৩০ মিনিটের সময় গভীর অন্ধকার আমার মোটরসাইকেলের লাইটে হঠাৎ দেখি দ্বীনের মহান ফেরীওয়ালা শহীদ এনামুল একা একা রাতের আঁধারের বুক চিরে দাওয়াতী কাজ সেরে বাইসাইকেল চালিয়ে নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরছেন। আমি এ অবস্থা দেখে ঈমানী আবেগে হতবিহ্বল হয়ে বলে উঠলাম 'হ্যাঁ এনামুল তুই মানুষ না জ্বীন? এত গভীর রাতে জন মানব শুন্য এ তেপান্তর বিলের মাঠের ভিতর দিয়ে কেন একা একা পথ চলো।' মনে মনে ভাবলাম দায়িত্বশীলরা যদি এমন নিবেদিতপ্রাণ হতো তাহলে কত ভাল হতো। যাহোক তিনি স্বভাব সুলভভাবে হেসে উঠে উত্তর দিলেন, 'মীয়া ভাই ফাজিলপুর গ্রামে ইউনিট বৈঠক ছিল। দাওয়াতী কাজ সেরে আসতে একটু রাত হয়ে গেছে।' তিনি সংগঠনের সাফল্য অর্জনে আবেগী হয়ে উঠতেন। নির্দ্বিধায় কোন সংকটাপন্ন পরিবেশে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার স্পষ্ট অবস্থান ছিল। তিনি ছিলেন সংগঠনের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ।
কারাবরণ:
শহীদ এনামুল ২০১৩ সালে একাধারে ০৩ মাস এবং ২০১৪ সালে ০১ মাস কারাবরণ করেন। তিনি কারাগারে থাকাকালে ভিতরের নেতাকর্মীদের সেবায় গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করতেন। এ সময়ে তাঁর স্ত্রী জেবুন্নেছাকে 'শাহাদত লাভ' তার জীবনের সবচেয়ে বড় কামনা ব্যক্ত করে শহীদি মৃত্যুর মর্যাদা সম্পর্কে চিঠি লিখেন। তিনি তাঁর ছেলে মেয়েদেরকেও শহীদের সন্তান হওয়া সবচেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় বলে অভিমত ব্যক্ত করে চিঠি লিখতেন।
শাহাদত লাভের পথে:
কারাগার থেকে বাহির হওয়ার পর তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তেও বাইতুলমালসহ মামলা বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠনের জনশক্তি ছিল তাঁর চোখের মণি। সর্বশেষ কারা মুক্তির কয়েক মাস পরই ২০১৪ সালের ২৫ শে জানুয়ারি দুপুর ২.০০ টার পর তিনি উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মাওলানা তাজুল ইসলামের নোমিনেশন পেপার জমা দেয়ার জন্য কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসে যান। অধ্যাপক মতিয়ার রহমান বলেন- এ সময়ে যাওয়ার পূর্বে তিনি আবেগ ভরা কন্ঠে বলেন, 'মিয়া ভাই আমার কিছু কথা আছে শুনেন।' আমি বললাম, তোমার না বোধক কোন কথা শুনার সময় আমার নেই। সংগঠনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক জামায়াত নির্বাচন করবে। নোমিনেশন পেপার জমা দিতেই হবে। তখন তিনি বললেন, 'মিয়া ভাই শুনেন। এই মাত্র ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে ট্রেজারী চালান কেটে আসলাম। মীমের মা বাপের বাড়ি। খুব ক্ষুধা লেগেছে। যাই শ্বশুরবাড়ি থেকে দু'মুঠো ভাত খেয়ে শহীদ হয়ে আসি। আমি নিজে প্রস্তাবক হয়েছি আর তরিকুলকে সমর্থক বানিয়েছি। আমি বললাম তুমি প্রস্তাবক হলে কেন? আর তোমার ভাইকেই বা কেন সমর্থক বানালে? কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত তো প্রার্থী মাওঃ তাজুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি থেকে একজন প্রস্তাবক হবে, আর শহরের বাড়ির একজন প্রতিবেশী সমর্থক হবে। তুমি নিজে কেন নোমিনেশন পেপার জমা দিতে যাবে? কোটচাঁদপুরের অবস্থা ভাল না। ঝিনাইদহ ডি.সি অফিসে গিয়ে নোমিনেশন পেপার সাবমিট করে এসো। সে উত্তর দিল 'না মীয়া ভাই ডি.সি অফিসে যাওয়ার সময় আর নেই। আমার কথা শুনেন, আমি আর টাকা কালেকশন করবো না। কারও কাছে আর ভোটও চাবো না। যাই শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে দু'মুঠো খেয়ে উপজেলাতে গিয়ে শহীদ হয়ে আসি।' আমাদের উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জনাব মোয়াবিয়া হুসাইন তাঁর হাত জড়িয়ে ধরেছেন, 'তোমাকে যেতে হবে না। অন্য কাউকে পাঠাও।" সে হাত কেড়ে নিয়ে বলেছে, "যাই শহীদ হয়ে আসি।' যার শাহাদত আল্লাহ পাক তাঁর আরশে আজীমে কবুল করেছেন। কে তাকে ঠেকাতে পারে? নোমিনেশন পেপার জমা দিয়ে ফেরার পথে গণতন্ত্রের রামাবালী গায়ে দেয়া সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা বিকাল ৪.০০ টার কাছাকাছি সময়ে উপজেলার গেট থেকে তাঁকে ধরে ফেলে। ধরা পড়ার সাথে সাথে সে আমাকে মোবাইলে বলেছিল, 'মিয়া ভাই পুলিশ আমাকে ধরে ফেলেছে।' এরপরে শত চেষ্টা করেও আমরা তাঁর সন্ধান আর মিলাতে পারিনি। শহীদ এনামুলের মেয়ে। ও তাঁর স্ত্রী বারবার সে সময়ের ও.সি শাহাজান সাহেবের নিকট ধর্ণা দিলেও কেউ তাঁর গ্রেফতারের দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেননি। অথচ শত শত লোকের উপস্থিতিতে পুলিশ তাঁকে ধরেছিল বলে আজও জনশ্রুতি আছে। যে এনামুল তাঁর সারা জীবন জুড়ে আইন শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, মিছিলের সামনে থেকে কড়া নজর রাখতেন যাতে করে কোন প্রকারের শান্তি ভঙ্গ না হয়। কেউ হাতে ব্যানার নিক তিনি তা পছন্দ করতেন না। এমন একজন শান্তিপ্রিয় সন্ত্রাসমুক্ত মানুষের হাতে রাতের আঁধারে ককটেল ও আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দিয়ে এনকাউন্টার দেখিয়ে গুলি করে হত্যা করার নির্মম ইতিহাস এ জাতি কখনও ভুলবে না। আগামীর ইতিহাসে নিশ্চয় প্রকৃত তথ্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উদ্ঘাটন করবেন। যা হোক ২০১৪ সালের ২৫ শে জানুয়ারি রাত ১.৩০ টার পর আমার ভাই শাহাদতের পেয়ালা পান করেন। তাঁর মৃত্যুতে যে সীমাহীন শোকের ছায়া নেমে আসে তা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
জানাজা:
২৬ শে জানুয়ারি সকাল ১০.০০ টায় কোটচাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে শহীদের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল নামে। প্রায় ২০ হাজারের মত মানুষ এই জানাজায় শরীক হয়। শহীদের সর্বকনিষ্ঠ ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া কামরুল হাসান সাকীবের মর্মস্পর্শী বক্তৃতায় হাজার হাজার মানুষ ডুকরিয়ে কেঁদে উঠেন। কান্নার রোল পড়ে যায়। সে কান্নার রোল আজও কর্ণকুহুরে প্রতিধ্বনিত হয়। শহীদ এনামুলের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় তাঁর নিজ গ্রাম চাঁদপাড়া প্রাইমারি স্কুল মাঠে। সেখানকার জানাজাও মাঠ-ঘাঠ ছাড়িয়ে জন সমুদ্রে রূপ নেয়। শহীদের সাথীদের কান্নার রোল ও গগন বিদারী শ্লোগানে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে, তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে। তাঁর এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে আমরা সত্যিই বিস্মিত, স্তম্ভিত এবং ধিক্কার জানানোর পাশাপাশি এর উপযুক্ত বিচারের জন্য আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাই।
এক নজরে শহীদ মোঃ এনামুল হক
নাম: মোঃ এনামুল হক
জন্ম তারিখ: ৩ জুন ১৯৬৮
পিতা: আব্দুল মালেক বিশ্বাস
মাতা: সুকজান নেছা
বয়স: সাতচল্লিশ বছর
ঠিকানা: চাঁদপাড়া, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ
ভাই-বোন: আট জনের মধ্যে ১ম
সন্তানাদি: এক মেয়ে ও দুই ছেলে
শিক্ষাগত যোগ্যতা: বি,এ বিএড
পেশা: শিক্ষক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়
শহীদের শখ: বই পড়া
সাংগঠনিক মান: রুকন
সর্বশেষ দায়িত্ব: কোটচাদপুর উপজেলা জামায়াতের বায়তুলমাল সম্পাদক
শাহাদাতের তারিখ।: ২৫ জানুয়ারি ২০১৪ দিবাগত রাত
শাহাদাতের স্থান: নওদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ
যেভাবে শহীদ হয়েছেন: কথিত বন্দুকযুদ্ধে
শহীদের কবর: পারিবারিক কবরস্থান
শিক্ষা জীবন:
শহীদের শিক্ষা জীবন শুরু হয় চাঁদপাড়া গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রাম এলাঙ্গী প্রাইমারি স্কুলে। বাল্যকাল থেকে তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। তিনি ১৯৮৪ সালে এলাঙ্গী মফেজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি পাশ করেন। কোটচাঁদপুর সরকারি খোন্দকার মোশারফ হোসেন কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে এইচ.এস.সি পাশ করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৯০ সালে বি.এ পাশ করেন।
ছাত্র রাজনীতি:
শহীদ এনামুল হক স্কুল জীবনের শুরু থেকেই ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৮৭সালে শিবিরের সাথী পদ লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে কোটচাঁদপুর সরকারি কলেজের শিবির সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৮৯-৯০ সালে কোটচাঁদপুর উপজেলা শিবির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে কোটচাঁদপুর সাথী শাখার আওতায় ছিল মহেশপুর উপজেলা শিবির সংগঠন। সে সময়ে শহীদ এনামুল হক মহেশপুর উপজেলা ছাত্র আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিবাহ:
এনামুল হক ১৯৯৪ সালের ৩০শে জানুয়ারি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রীর নাম জেবুন্নেছা বেগম। তিনি এক মেয়ে ও দুই ছেলের জনক।
সন্তান-সন্ততির বর্তমান অবস্থা:
তাঁর একমাত্র কন্যা মাহমুদা হক মীম এম.বি.বি.এস শেষ বর্ষে ঢাকা ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত। জামাতা মোঃ শিহাব উদ্দিন ৩৯তম বি.সি.এস এ উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি নিয়োগের অপেক্ষায় একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। বড় ছেলে জুবায়ের হুসাইন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ বর্ষের ছাত্র। সর্বকনিষ্ঠ পুত্র কামরুল হাসান সরকারি খোন্দকার মোশাররফ হোসেন কলেজে এইচ.এস.সি বিজ্ঞান বিভাগের ১ম বর্ষের ছাত্র।
বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলন:
তিনি ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রুকন পদ লাভ করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর নিজের ইউনিয়ন ৫নং এলাঙ্গীর সভাপতি ছিলেন। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এলাঙ্গী ইউনিয়নের আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি কোটচাঁদপুর উপজেলা শাখার কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে থানা বাইতুল মাল সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। শাহাদতলাভের পূর্ব পর্যন্ত লিগ্যাল এইডসহ তিনি বাইতুলমালের দায়িত্ব পালন করেন।
পেশা:
পেশাগতভাবে নিজ থানা ও ইউনিয়নের মুরুটিয়া বলরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী জেবুন্নেছাও কালীগঞ্জ থানার শাহাপুর ঘিঘাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা হিসেবে বর্তমানে কর্মরত আছেন।
আদর্শ পরিবার গঠন:
সাংগঠনিক শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজ পরিবার গঠনে তিনি ছিলেন ইসলামের জীবন্ত অনুসারী। প্রতিদিন সুনির্দিষ্ট সময়ে তিনি নিজেই ছেলে-মেয়েদেরকে পড়াতেন। দু'টি ছেলেকে সাথে নিয়েই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে মসজিদে গিয়েই আদায় করতেন। পিতা হিসেবে স্বল্প পরিসরে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। একবার এনামুল হক ট্রেন যোগে ঢাকাতে যাবেন। ট্রেনের সময় প্রায় সমাগত। এমনি মুহূর্তে মসজিদের মিনার থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসে। আজানের শব্দ শুনে তিনি দ্রুত গতিতে এশার নামাজ পড়ার জন্য স্টেশন মসজিদে ঢুকে পড়েন। মসজিদ থেকে এসে দেখেন ট্রেন চলে গেছে দৃষ্টির আড়ালে। তিনি স্বভাবসুলভ হেসে। বলেন, 'ট্রেন চলে যাক। আমার জামায়াততো ফেল হয়নি।' একেই বলে জিন্দাদিল মু'মীন।
আমানতদারি:
শহীদের চাচাতো ভাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক মতিয়ার রহমান বলেন- শহীদ এনামুল হক ছিলেন আমানতদারিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যতটুকু মনে পড়ে ১৯৮৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি রাঙ্গীয়ারপোতা ভোট কেন্দ্রের নির্বাচনী দায়িত্ব পান। এক পর্যায়ে ব্যালোট বাক্স ছিনতাইকে কেন্দ্র করে মারামারি বেধে যায়। অবস্থার নাজুকতায় সকলেই ভোট কেন্দ্র ছেড়ে চলে গেলেও শহীদ এনামুল একাই ভোট বাক্সের উপর শুয়ে পড়ে প্রচুর মার খেয়েও ঐ বাক্সটি ছিনতাই করতে দেননি। অবশেষে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল- সে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গায়ে ব্যথা নিয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। কথা বলতেই বলে উঠলেন, 'মিয়া ভাই ওরা আমাকে প্রচুর মারধর করেছে। আমার গায়ে প্রবল জ্বর। ওরা মারে মারুক আমি তো সংগঠনের দেয়া দায়িত্ব পালন করেছি। জাযা আল্লাহ পাকের হাতেই।' আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এ ধরনের আমানতদারের। সে আমার ক্ষেত খামার পরিচর্যা ও তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই দশক যাবত যে আমানতদারীতার পরিচয় দিয়েছে তা কখনও ভুলবার নয়। গ্রামের মসজিদ, মাদ্রাসা বিনির্মাণে ও সম্পদ রক্ষায় তাঁর আমানতদারীতা অনস্বীকার্য। বায়তুল মাল সেক্রেটারি ছিলেন। হিসাব-নিকাশে তাঁর স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত অনুকরণীয়। এমনকি জেল খানার পি.সি থেকে বেঁচে যাওয়া ৪,০০০/- (চার হাজার) টাকা থানা বায়তুলমালে জমা দিয়ে দায়িত্বশীল হিসেবে আমানতদারীতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা কখনও ম্লান হবার নয়।
সংগঠনের প্রতি নিবেদিত প্রাণ:
অধ্যাপক মতিয়ার রহমান আরো বলেন- সংগঠনের প্রতি এমন দরদী মানুষ খুব কম দেখা যায়। কি করে সংগঠন মজবুত হবে, কি করলে সংগঠনের লোকেরা ভাল থাকবে এই চিন্তা তিনি এক মুহূর্তের জন্যও মাথা থেকে সরাননি। তিনি রাত-দিন সংগঠনের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আমি একদিন অনেক দূর থেকে সভা করে ফিরছি। সে সময়ে আমাদের চাঁদপাড়ার ঠাকুর বিলের ভিতরে দিনের বেলায়ও মানুষ ভয় পেতো। তখন রাত ১টা ৩০ মিনিটের সময় গভীর অন্ধকার আমার মোটরসাইকেলের লাইটে হঠাৎ দেখি দ্বীনের মহান ফেরীওয়ালা শহীদ এনামুল একা একা রাতের আঁধারের বুক চিরে দাওয়াতী কাজ সেরে বাইসাইকেল চালিয়ে নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরছেন। আমি এ অবস্থা দেখে ঈমানী আবেগে হতবিহ্বল হয়ে বলে উঠলাম 'হ্যাঁ এনামুল তুই মানুষ না জ্বীন? এত গভীর রাতে জন মানব শুন্য এ তেপান্তর বিলের মাঠের ভিতর দিয়ে কেন একা একা পথ চলো।' মনে মনে ভাবলাম দায়িত্বশীলরা যদি এমন নিবেদিতপ্রাণ হতো তাহলে কত ভাল হতো। যাহোক তিনি স্বভাব সুলভভাবে হেসে উঠে উত্তর দিলেন, 'মীয়া ভাই ফাজিলপুর গ্রামে ইউনিট বৈঠক ছিল। দাওয়াতী কাজ সেরে আসতে একটু রাত হয়ে গেছে।' তিনি সংগঠনের সাফল্য অর্জনে আবেগী হয়ে উঠতেন। নির্দ্বিধায় কোন সংকটাপন্ন পরিবেশে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার স্পষ্ট অবস্থান ছিল। তিনি ছিলেন সংগঠনের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ।
কারাবরণ:
শহীদ এনামুল ২০১৩ সালে একাধারে ০৩ মাস এবং ২০১৪ সালে ০১ মাস কারাবরণ করেন। তিনি কারাগারে থাকাকালে ভিতরের নেতাকর্মীদের সেবায় গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করতেন। এ সময়ে তাঁর স্ত্রী জেবুন্নেছাকে 'শাহাদত লাভ' তার জীবনের সবচেয়ে বড় কামনা ব্যক্ত করে শহীদি মৃত্যুর মর্যাদা সম্পর্কে চিঠি লিখেন। তিনি তাঁর ছেলে মেয়েদেরকেও শহীদের সন্তান হওয়া সবচেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় বলে অভিমত ব্যক্ত করে চিঠি লিখতেন।
শাহাদত লাভের পথে:
কারাগার থেকে বাহির হওয়ার পর তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তেও বাইতুলমালসহ মামলা বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠনের জনশক্তি ছিল তাঁর চোখের মণি। সর্বশেষ কারা মুক্তির কয়েক মাস পরই ২০১৪ সালের ২৫ শে জানুয়ারি দুপুর ২.০০ টার পর তিনি উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মাওলানা তাজুল ইসলামের নোমিনেশন পেপার জমা দেয়ার জন্য কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসে যান। অধ্যাপক মতিয়ার রহমান বলেন- এ সময়ে যাওয়ার পূর্বে তিনি আবেগ ভরা কন্ঠে বলেন, 'মিয়া ভাই আমার কিছু কথা আছে শুনেন।' আমি বললাম, তোমার না বোধক কোন কথা শুনার সময় আমার নেই। সংগঠনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক জামায়াত নির্বাচন করবে। নোমিনেশন পেপার জমা দিতেই হবে। তখন তিনি বললেন, 'মিয়া ভাই শুনেন। এই মাত্র ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে ট্রেজারী চালান কেটে আসলাম। মীমের মা বাপের বাড়ি। খুব ক্ষুধা লেগেছে। যাই শ্বশুরবাড়ি থেকে দু'মুঠো ভাত খেয়ে শহীদ হয়ে আসি। আমি নিজে প্রস্তাবক হয়েছি আর তরিকুলকে সমর্থক বানিয়েছি। আমি বললাম তুমি প্রস্তাবক হলে কেন? আর তোমার ভাইকেই বা কেন সমর্থক বানালে? কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত তো প্রার্থী মাওঃ তাজুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি থেকে একজন প্রস্তাবক হবে, আর শহরের বাড়ির একজন প্রতিবেশী সমর্থক হবে। তুমি নিজে কেন নোমিনেশন পেপার জমা দিতে যাবে? কোটচাঁদপুরের অবস্থা ভাল না। ঝিনাইদহ ডি.সি অফিসে গিয়ে নোমিনেশন পেপার সাবমিট করে এসো। সে উত্তর দিল 'না মীয়া ভাই ডি.সি অফিসে যাওয়ার সময় আর নেই। আমার কথা শুনেন, আমি আর টাকা কালেকশন করবো না। কারও কাছে আর ভোটও চাবো না। যাই শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে দু'মুঠো খেয়ে উপজেলাতে গিয়ে শহীদ হয়ে আসি।' আমাদের উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জনাব মোয়াবিয়া হুসাইন তাঁর হাত জড়িয়ে ধরেছেন, 'তোমাকে যেতে হবে না। অন্য কাউকে পাঠাও।" সে হাত কেড়ে নিয়ে বলেছে, "যাই শহীদ হয়ে আসি।' যার শাহাদত আল্লাহ পাক তাঁর আরশে আজীমে কবুল করেছেন। কে তাকে ঠেকাতে পারে? নোমিনেশন পেপার জমা দিয়ে ফেরার পথে গণতন্ত্রের রামাবালী গায়ে দেয়া সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা বিকাল ৪.০০ টার কাছাকাছি সময়ে উপজেলার গেট থেকে তাঁকে ধরে ফেলে। ধরা পড়ার সাথে সাথে সে আমাকে মোবাইলে বলেছিল, 'মিয়া ভাই পুলিশ আমাকে ধরে ফেলেছে।' এরপরে শত চেষ্টা করেও আমরা তাঁর সন্ধান আর মিলাতে পারিনি। শহীদ এনামুলের মেয়ে। ও তাঁর স্ত্রী বারবার সে সময়ের ও.সি শাহাজান সাহেবের নিকট ধর্ণা দিলেও কেউ তাঁর গ্রেফতারের দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেননি। অথচ শত শত লোকের উপস্থিতিতে পুলিশ তাঁকে ধরেছিল বলে আজও জনশ্রুতি আছে। যে এনামুল তাঁর সারা জীবন জুড়ে আইন শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, মিছিলের সামনে থেকে কড়া নজর রাখতেন যাতে করে কোন প্রকারের শান্তি ভঙ্গ না হয়। কেউ হাতে ব্যানার নিক তিনি তা পছন্দ করতেন না। এমন একজন শান্তিপ্রিয় সন্ত্রাসমুক্ত মানুষের হাতে রাতের আঁধারে ককটেল ও আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দিয়ে এনকাউন্টার দেখিয়ে গুলি করে হত্যা করার নির্মম ইতিহাস এ জাতি কখনও ভুলবে না। আগামীর ইতিহাসে নিশ্চয় প্রকৃত তথ্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উদ্ঘাটন করবেন। যা হোক ২০১৪ সালের ২৫ শে জানুয়ারি রাত ১.৩০ টার পর আমার ভাই শাহাদতের পেয়ালা পান করেন। তাঁর মৃত্যুতে যে সীমাহীন শোকের ছায়া নেমে আসে তা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
জানাজা:
২৬ শে জানুয়ারি সকাল ১০.০০ টায় কোটচাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে শহীদের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল নামে। প্রায় ২০ হাজারের মত মানুষ এই জানাজায় শরীক হয়। শহীদের সর্বকনিষ্ঠ ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া কামরুল হাসান সাকীবের মর্মস্পর্শী বক্তৃতায় হাজার হাজার মানুষ ডুকরিয়ে কেঁদে উঠেন। কান্নার রোল পড়ে যায়। সে কান্নার রোল আজও কর্ণকুহুরে প্রতিধ্বনিত হয়। শহীদ এনামুলের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় তাঁর নিজ গ্রাম চাঁদপাড়া প্রাইমারি স্কুল মাঠে। সেখানকার জানাজাও মাঠ-ঘাঠ ছাড়িয়ে জন সমুদ্রে রূপ নেয়। শহীদের সাথীদের কান্নার রোল ও গগন বিদারী শ্লোগানে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে, তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে। তাঁর এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে আমরা সত্যিই বিস্মিত, স্তম্ভিত এবং ধিক্কার জানানোর পাশাপাশি এর উপযুক্ত বিচারের জন্য আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাই।
এক নজরে শহীদ মোঃ এনামুল হক
নাম: মোঃ এনামুল হক
জন্ম তারিখ: ৩ জুন ১৯৬৮
পিতা: আব্দুল মালেক বিশ্বাস
মাতা: সুকজান নেছা
বয়স: সাতচল্লিশ বছর
ঠিকানা: চাঁদপাড়া, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ
ভাই-বোন: আট জনের মধ্যে ১ম
সন্তানাদি: এক মেয়ে ও দুই ছেলে
শিক্ষাগত যোগ্যতা: বি,এ বিএড
পেশা: শিক্ষক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়
শহীদের শখ: বই পড়া
সাংগঠনিক মান: রুকন
সর্বশেষ দায়িত্ব: কোটচাদপুর উপজেলা জামায়াতের বায়তুলমাল সম্পাদক
শাহাদাতের তারিখ।: ২৫ জানুয়ারি ২০১৪ দিবাগত রাত
শাহাদাতের স্থান: নওদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ
যেভাবে শহীদ হয়েছেন: কথিত বন্দুকযুদ্ধে
শহীদের কবর: পারিবারিক কবরস্থান
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍