হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ আনিচুর রহমান
শহীদ আনিচুর রহমান

শহীদ আনিচুর রহমান

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মনে পড়ে এক সাথে পথ চলার হাজার স্মৃতি। সেই মুহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, তাজমহল রোড, ঝিনাইদহের পবহাটি আর কাঞ্চন নগরে কত যে ঘুরে বেড়িয়েছি একসাথে। মনে পড়ে সেই একটি বিস্কুট আর এক কাপ চা খেয়ে দিন পার করার কথা। পকেটে টাকা না থাকায় মাইল কি মাইল পথ এক সাথে হাঁটা কত খুনসুটি, কত ভাল লাগা না লাগার কথা। যেদিন আপনি আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে, সে দিনের মত এত হাহাকার আর কখনো জন্মায়নি। জানেন আনিচ ভাই, আমি আজো কাঁদি অঝরে, নীরবে ও নিভৃতে। ভাল থাকেন ভাই ওপারে দোয়া করি।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

কুষ্টিয়া সদর জুগিয়া গ্রামে এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে শহীদ আনিচুর রহমান জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোঃ সাবদার রহমান এবং মা মোছাঃ জাহানারা খাতুন। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।
শিক্ষা জীবন:
শহীদ আনিচুর রহমানের শিক্ষা জীবন শুরু হয় জুগিয়া দক্ষিণ পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি পাশ করেন। ইঞ্জিঃ হয়ে পরিবার ও সমাজ থেকে বেকার ও দারিদ্রতা দূর করার জন্য প্রত্যয়দীপ্ত সাহস নিয়ে ভর্তি হন ২০১১ সালে ঝিনাইদহ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের কম্পিউটার সাইন্স ডিপার্টমেন্টে। ডিপ্লোমা শেষ করে বিএসসি ইঞ্জিঃ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ডুয়েটে ভর্তি হওয়ার জন্য যান। ভর্তি হন অপটিমাম কোচিং এন্ড গাইডে ২০১৬ সালে গ্যাজুয়েশন সম্পূর্ণ করার জন্য ভর্তি হয় ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। শাহাদাতের সময় তিনি এ ইউনিভার্সিটির ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন।
সাংগঠনিক জীবন
আল্লাহর ঘোষণা জান্নাতের বিনিময়ে আল্লাহ মুমিনদের জান ও মালকে খরিদ করে নিয়েছেন। এই ঘোষণা নত মস্তকে মেনে নিয়ে চূড়ান্ত শপথ নেওয়ার জন্য ছাত্রশিবিরের পতাকা তলে আসেন আনিচুর রহমান। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সাথে সাথে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন আদর্শ ছাত্র হিসেবে। তিনি নিজের মেধা মননশীলতা, সচ্চরিত্র অবলম্বন করে প্রাণপ্রিয় সংগঠনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের দৃঢ়সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যান। পর্যায়ক্রমে নিজেকে সংগঠনের সমর্থক, কর্মী, সাথী ও সদস্য মানে উন্নতি করেন। উপশাখা, ওয়ার্ডসহ সবশেষে ঝিনাইদহ পলিটেকনিকে বিপ্লবী সভাপতিদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন।
যেভাবে আল্লাহর ডাকে তিনি চলে গেলেন
১৬-০৬-১৬ পবিত্র মাহে রমজানের শেষ ১০ রমজান রাত আনুমানিক ২.৩০ টা। ঢাকার মোহাম্মাদপুর মোহাম্মাদীয়া হাউজিং সোসাইটির ৯নং রোডের ১১নং বাসার ৬ষ্ঠ তলা থেকে ঝিনাইদহের প্রশাসন স্থানীয় আদাবর থানার সহযোগিতায় ইবনুল ইসলাম পারভেজ, আনিসুর রহমান ও এনামুল হককে গ্রেফতার করে। তাদের পরিবার স্থানীয় থানা ও ঢাকা আদাবর থানা এবং ডিবি কার্যালয়ে খোঁজ নেন। আদাবর থানা বিষয়টি স্বীকার করলেও স্পষ্ট কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না- এ মর্মে থানায় পুলিশ জিডি গ্রহণ করেনি। ১৭ জুন ছাত্রশিবির তাদের সন্ধান দাবী করে বিবৃতি প্রদান করেন। একই দাবীতে ২১জুন সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করা হয়। পরিবার নিরূপায় হয়ে ছেলেকে ফিরে পেতে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। গত ১৩-০৬-২০১৬ শিবির নেতা শহিদ আল মাহমুদকে ঝিনাইদহ শহরের বদনপুর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তারের সময় উপস্থিত জনতা তাদের মধ্য থেকে এসআই আমিনুর ও এসআই উজ্জলকে চিনতে পারে। অন্যদিকে রাজধানীতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের মধ্যে 'এনামুল' হককে পুলিশ হাজির করে। পুলিশ তাঁদেরকে দীর্ঘদিন আটক রেখে নলডাঙ্গা সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাগুলীনন্দ (৭০) হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী আদায়ের জন্য নির্মম নির্যাতন চালায়। শত নির্যাতনের পরেও মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে অস্বীকার করেন। শহীদ আনিসুর রহমানকে পুলিশ ০১-০৭-২০১৬ ইং তারিখ রাতে ঝিনাইদহের তেতুল বাড়ীয়া নামক স্থানে কথিত বন্দুক যুদ্ধের নামে গুলি করে হত্যা করে।
অতুলনীয় দাওয়াতি চরিত্র:
আল্লাহর পথের তেজোদীপ্ত কাফেলার এই সৈনিক শহীদ মোঃ আনিচুর রহমান ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠনের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। শিশু কিশোর সমবয়সি যুবকদের আল্লাহর দিকে আহবানই ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। সদা বন্ধুসুলভ মিষ্টভাষী, বিনয়ী ও বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেটি রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা সত্ত্বেও সবার কাছে পরিচিত ও গ্রহণীয় ছিলেন। তাঁর সদা তৎপর চলাফেরা সাংস্কৃতিক কার্যাবলিতে সংশ্লিষ্টতা, খেলাধুলা এবং সহপাঠীর উপকার তার অকৃত্রিম উদ্যোগ তাকে ক্যাম্পাসে পরিচিত মুখদের শীর্ষে আসীন করেছিলেন।
শাহাদাতের ঘটনা:
পশ্চিমের সূর্যটা আকাশের সাথে মিশে দিনের আলো ম্রিয়মান। একটু পরেই আধার ঘনিয়ে আসবে শহীদ আনিচুর রহমান তখন ও ব্যস্ত সাংগঠনিক কাজে। সাথী-কর্মীসহ সারাদিন ব্যস্ততার পরে ইফতার শেষে তারাবির নামাজ পড়ে রুমে এসে বিশ্রাম নিবে। ঠিক ঐ সময়ই আওয়ামী সরকারের পুলিশ বাহিনী তাদেরকে ঢাকা মুহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে ধরে নিয়ে দীর্ঘ ১৫ দিন ধরে গুম রেখে অমানবিক নির্যাতন করে। এমন কোন নির্যাতন নেই যে গুলো তাঁর উপরে চালানো হয়নি। ঠিক এরই মাঝে সন্তানহারা পরিবারের সদস্যরা শত আকুতি মিনতি করেও তাঁর সন্ধান পায়নি। ঠিক কদরের (২৩শে রমযান ২০১৬) রাত্রে তার মা স্বপ্নে দেখে যে তার সন্তান তার বাড়িতে ফিরে এসেছে। কিন্তু ঐ দিনই আওয়ামী সরকারের পুলিশ বাহিনী ক্রসফায়ার নামক সাজানো নাটকে পরিবার, সমাজ ও দেশের সম্ভাবনাময় মেধাবী ছাত্র শহীদ আনিচুর রহমান শাহাদাতের সুপেয় পানি পান করে বাসায় ফিরে আসেন। জাগতিক অর্থে আনিচুর রহমান মারা গিয়েছিল কিন্তু প্রকৃত অর্থে তিনি জীবিত হয়েই তাঁর পরিবার বা মায়ের কাছে ফিরে এসেছিলেন। তার বন্ধুরা স্বপ্ন দেখেন যে আনিচুর রহমান এসে বলে সে এখনো বেঁচে আছে। সেটা যেন তাঁর মাকে বলা হয়।
জানাজা ও দাফন:
শহীদের লাশ ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল হতে আনার পর শাহাদাতের সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কুষ্টিয়া সদরের সর্বস্তরের জনতা কুরআনের জন্য জীবন দেয়া এই শহীদের জান্নাতি চেহারা এক নজর দেখতে ভিড় জমান। সহস্রাধিক ব্যক্তি নিয়ে জানাজা হয় জুগিয়া ঈদগাহ ময়দানে। জানাজা শেষে শহীদ শিমুল ভাইয়ের পাশে জুগিয়া কবর স্থানে তাকে দাফন করা হয়।
সন্তান হারা পিতামাতার অবস্থা:
শাহাদাতের পূর্বে তাঁর পিতা-মাতা দু'জনই সুস্থভাবে শান্তিতে জীবন যাপন করছিলেন। পুত্র শোককে ভুলতে না পেরে পরের বছরে অসুস্থ হয়ে শহীদের পিতা মোঃ সাবদার রহমান ইন্তেকাল করেন আর জনমদুঃখী মা মোছাঃ জাহানারা খাতুন সন্তানহারা ব্যথা নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।
শহীদের ভাই-বোন শিক্ষক ও প্রতিবেশির প্রতিক্রিয়া:
পরিবার বলেন, শহীদ আনিচের উত্তরসূরিদের কাছে আশা করে তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ তরান্বিত করবে। এভাবেই কুষ্টিয়াসহ সারাদেশে ইসলামের সুশীতল বাতাস বইবে। ভাইয়ের কথা মনে পড়লে ইসলামের পথে তিনি শহীদ হয়েছেন মনে করে নিজেকে সান্ত্বনা দেন। শহীদ আনিচের পলিটেকনিক প্রধান শিক্ষক বলেন, সে খুব ভাল ছিল। তাঁর আচার-আচরণ, শিক্ষকদের সাথে তাঁর ব্যবহার ছিল অতুলনীয়। জুনিয়র-সিনিয়র সবার সাথে তাঁর আচরণ ছিল অনুকরণীয়। শিক্ষক, ছাত্রদের যে কোন প্রয়োজনে ছিল শহীদ আনিচ ভূমিকা অতুলনীয়। আজ আমরা সেটা হারিয়ে ফেলেছি। প্রতিবেশি দাদি বলেন- সে খুব ভাল ছেলে ছিল। আচার-আচরণে মানুষের সাথে তাঁর ব্যবহার ছিল চমৎকার। বাড়িতে আসার সময় আমার জন্য পান, ঔষধ নিয়ে আসতো। যাওয়ার সময় সবার সাথে দেখা করে, আমাদের খোঁজখবর শেষে তাঁর জন্য দোয়া নিয়ে যেত। শহীদ আনিচের ভাই বোনসহ পাড়া প্রতিবেশীদের এটাই প্রত্যাশা শহীদ আনিচের উত্তরসূরীরা তাঁর রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ সাফল্যের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যেতে যথাযথ প্রচেষ্টা চালাবে।
শহীদ আনিচুর রহমান
সহপাঠিদের সাথে শহীদের স্মৃতি:
সাবেক পাঠাগার সম্পাদক নাসির ভাই যখন কারাগারে ছিলেন, তখন আনিচ ভাই তাকে জামিন করার জন্য খুব পেরেশানি হতেন। তখন আমি আনিচ ভাইকে বলতাম- এত তাড়াহুড়া করবেন না। তখন তিনি বলেন আপনাকে জেলে রেখে আমিতো ঘুমাতে পারি না। জেলে থাকা অবস্থায় প্রতিদিন একবার করে সাক্ষাৎ করতেন। হঠাৎ জেল কর্তৃপক্ষ চার দিন পর পর সাক্ষাৎ করার অনুমতি প্রদান করেন। সেই সময় আমার মিডটার্ম পরীক্ষা চলছিল। জেল গেটে ডিপুটি জেলারের রুমে পরীক্ষা দিতাম। শিক্ষক ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারতো না। পরের পরীক্ষার দিনে দেখি আনিচ ভাই পরীক্ষা নিতে এসেছেন। আমি ভাইকে বললাম কিভাবে সম্ভব। ভাই বলে, আমি আপনাকে চার দিন না দেখে ঘুমাতে পারি নাই। প্রধান শিক্ষককে বলে বুঝানোর পরে তিনি অন্য শিক্ষকের আইডি দিয়ে অনুমতির ব্যবস্থা করে দেন।
সহপাঠী মুন্না বলেন- মনে পড়ে এক সাথে পথ চলার হাজার স্মৃতি। সেই মুহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, তাজমহল রোড, ঝিনাইদহের পবহাটি আর কাঞ্চন নগরে কত যে ঘুরে বেড়িয়েছি একসাথে। মনে পড়ে সেই একটি বিস্কুট আর এক কাপ চা খেয়ে দিন পার করার কথা। পকেটে টাকা না থাকায় মাইল কি মাইল পথ এক সাথে হাঁটা কত খুনসুটি, কত ভাল লাগা না লাগার কথা। যেদিন আপনি আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে, সে দিনের মত এত হাহাকার আর কখনো জন্মায়নি। জানেন আনিচ ভাই, আমি আজো কাঁদি অঝরে, নীরবে ও নিভৃতে। ভাল থাকেন ভাই ওপারে দোয়া করি।
পলিটেকনিকের বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার আলাউদ্দিন, মোঃ জাহিদুল ইসলাম, মতিউর রহমান সহ অনেকেই বলেন আমাদের সেদিন তার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছে মোবাইলে। সে আমার নেওয়ার জন্য রাস্তায় চলে আসে এবং একটি মেসে নিয়ে যায় এবং বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা হয়। এটাই আমার প্রথম ও শেষ দেখা। সে অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মবিশ্বাসী, অতিথি পরায়ণ, মিষ্টভাষী মানুষ ছিলেন।
এক নজরে শহীদ আনিচুর রহমান
নাম : আনিচুর রহমান
জন্ম তারিখ: ১৭-০১-১৯৯৫
পিতা: সাবদার হোসন
মাতা: জাহানারা খাতুন
ভাই-বোন: তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ছোট
বর্তমান ঠিকানা : জুগিয়া ভাটাপাড়া, কুষ্টিয়া
স্থায়ী ঠিকানা : ঐ
লেখাপড়া: বি,এস,সি ইউনাইটেড ইনটারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
শাহাদতের তারিখ: ০১-০৭-২০১৬
শাহাদতের স্থান তেতুলতলা, ঝিনাইদহ
কবরস্থান: জুগিয়া ভাটাপাড়া কবরস্থান
সাংগঠনিক মান: সদস্য, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
সর্বশেষ দায়িত্ব: সাবেক ঝিনাইদহ পলিটেকনিক সভাপতি ও সংগঠনের সদস্য।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍