শহীদ হাফেজ মোঃ জসিম উদ্দীন জিহাদ
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদের পিতা বলেন- জসিম ছোটবেলা থেকে কখনও নামাজ কাযা করেনি। বিনয়, নম্র ও ভদ্রতায় ওঁর সমকক্ষ অত্র এলাকায় আমরা কাউকে দেখিনি। আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা সবাই ওঁকে ভালোবাসত, কতিপয় ইসলামের শত্রু ছাড়া। ওঁকে হাফেজ বানাবো বলে ছোটবেলায় হাফেজি মাদ্রাসায় ভর্তি করাই। সাফল্যের সাথে হাফেজি শেষ করে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। দাখিল পাশ করে ঝিনাইদহ আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। তখন থেকেহ সংগঠনেও সময় দেয়া শুরু করে। ঈদের সময় অত্র এলাকার গরীব অসহায় মানুষের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ করতো। ভাইঝিকে হাফেজ বানাবে এটা ও সবসময় বলত। ওর শাহাদাতের পর ওর ভাইঝিটিকে আমরা হাফেজী মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়েছি। পলাতক থাকার সময় ওর বোন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে মোবাইলে ওকে দাড়ি কেটে পাঞ্জাবি, পায়জামা ছেড়ে লেবাস পাল্টাতে বলে। এই কথা বলাতে জসিম রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যায়। মোবাইল বন্ধ করে রাখে। অনেকবার চেষ্টা করে মোবাইল রিসিভ করলে জিজ্ঞেস করে আপার কথায় রাগ করেছে কেন? জসিম ওর দুলাভাইকে জানায়, জীবন বাঁচানোর জন্য আমি আমার ইসলামী লেবাস পাল্টাবো না। সর্বশেষ বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার চৌদ্দদিন পর ওর মাকে ফোন দেয়। এটাই ছিলো ওর মায়ের সাথে শেষ কথা। গুম হয়ে যাওয়ার আগে আমাকে বলে, "আমি শহীদ হয়ে গেলে, আলহামদুলিল্লাহ বলবে, আর আমার জন্য দোয়া করবে। আমি যেন শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করি।" তোমরা আমার ছেলের মত। তোমরা কেউ আসলে জসিমকে হারানোর বেদনা আমাদের থাকে না। তোমরা চলে গেলে ফের শূন্যতা অনুভব করি। জসিমের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্যে তোমরা কাজ করে যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
জীবন বাঁচানোর জন্য আমি আমার ইসলামী লেবাস পাল্টাবো না। আমি শহীদ হয়ে গেলে, আলহামদুলিল্লাহ বলবে, আর আমার জন্য দোয়া করবে। আমি যেন শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করি।
ব্যক্তিগত পরিচয়
শহীদ হাফেজ মোঃ জসিম উদ্দীন জিহাদ ১৯৯২ সালে ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলাধীন কালুহাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শহীদ জসীম উদ্দীন ঝিনাইদহ কামিল মাদরাসা থেকে ফাজিল পাস করে কামিল ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথী এবং থানা সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।
জসিম উদ্দীনের পিতা খলিল মণ্ডল ও মাতা মোছাঃ রাবেয়া খাতুন। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয়। শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন কালুহাটি আফসার উদ্দিন হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে এবং কলোমন খালী মাদ্রাসা থেকে হিফজ শেষ করেন। সেখান থেকে এসে তিনি কুঠিদুর্গাপুর দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সাথে দাখিল পাশ করেন। তিনি ঝিনাইদহ সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করেন এবং ফাজিল ২য় বর্ষে অধ্যায়নরত ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সিলেট থেকে আসার পথে রাজবাড়ী এলে বাস থেকে নামিয়ে নেয়। গুম হওয়ার দীর্ঘ ২২ দিন পর ২০১৬ সালের ৪ই মার্চ ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুন্ডু উপজেলার রিশখালি হিঙ্গার পাড়ার এক ভুট্টাক্ষেতের পাশে শহীদ জসিমের লাশ পাওয়া যায়।
কেমন ছিলেন শহীদ হাফেজ মোঃ জসিম উদ্দীন জিহাদ
শহীদের পিতা বলেন- জসিম ছোটবেলা থেকে কখনও নামাজ কাযা করেনি। বিনয়, নম্র ও ভদ্রতায় ওঁর সমকক্ষ অত্র এলাকায় আমরা কাউকে দেখিনি। আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা সবাই ওঁকে ভালোবাসত, কতিপয় ইসলামের শত্রু ছাড়া। ওঁকে হাফেজ বানাবো বলে ছোটবেলায় হাফেজি মাদ্রাসায় ভর্তি করাই। সাফল্যের সাথে হাফেজি শেষ করে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। দাখিল পাশ করে ঝিনাইদহ আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। তখন থেকেহ সংগঠনেও সময় দেয়া শুরু করে। ঈদের সময় অত্র এলাকার গরীব অসহায় মানুষের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ করতো। ভাইঝিকে হাফেজ বানাবে এটা ও সবসময় বলত। ওর শাহাদাতের পর ওর ভাইঝিটিকে আমরা হাফেজী মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়েছি। পলাতক থাকার সময় ওর বোন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে মোবাইলে ওকে দাড়ি কেটে পাঞ্জাবি, পায়জামা ছেড়ে লেবাস পাল্টাতে বলে। এই কথা বলাতে জসিম রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যায়। মোবাইল বন্ধ করে রাখে। অনেকবার চেষ্টা করে মোবাইল রিসিভ করলে জিজ্ঞেস করে আপার কথায় রাগ করেছে কেন? জসিম ওর দুলাভাইকে জানায়, জীবন বাঁচানোর জন্য আমি আমার ইসলামী লেবাস পাল্টাবো না। সর্বশেষ বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার চৌদ্দদিন পর ওর মাকে ফোন দেয়। এটাই ছিলো ওর মায়ের সাথে শেষ কথা। গুম হয়ে যাওয়ার আগে আমাকে বলে, "আমি শহীদ হয়ে গেলে, আলহামদুলিল্লাহ বলবে, আর আমার জন্য দোয়া করবে। আমি যেন শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করি।" তোমরা আমার ছেলের মত। তোমরা কেউ আসলে জসিমকে হারানোর বেদনা আমাদের থাকে না। তোমরা চলে গেলে ফের শূন্যতা অনুভব করি। জসিমের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্যে তোমরা কাজ করে যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সামগ্রিক বিবরণ
১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি প্রাণপ্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি জড়বাদী ও বাতিল শক্তির সাথে আপোষহীণ সংগ্রাম চলছে-চলবেই অবিরাম। হক ও বাতিলের এই সংগ্রামে যে সকল অকুতোভয় বীর সৈনিক যোগদান করেছেন তাঁরা এদেশ-জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের মধ্যে যাঁরা শাহাদতবরণ করেছেন তাঁরা আরো বেশি সম্মানের। প্রভুর কাছে তারা সফল আর শহীদেরাই এ কাফেলার সব থেকে বড় সম্পদ। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয় বাকশালী, বর্বর, জালিম-অত্যাচারী ইসলাম ও মুসলমানের দুশমন আওয়ামী সরকার। ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে তাঁরা এদেশের বড় বড় আলেমদেরকে গণগ্রেফতার করতে শুরু করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মেধাবী ছাত্রকে হত্যা করার মাধ্যমে তাদের নীল নকশার বাস্তবায়ন শুরু করে। সেই নীল নকশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা গ্রেফতার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর সাবেক সফল শিল্প ও কৃষিমন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে। গ্রেফতার করা হয় সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী-আহসান মুহাম্মদ মোজাহিদসহ আব্দুল-কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান ও মীর কাশেম আলী মিন্টু ভাইকে। আরও গ্রেফতার করা হয় এদেশের ১৬ কোটি মানুষের নয়নের মণি বিশ্ববরেণ্য মুফাসসিরে কোরআন হযরত মাওলানা আল্লামা দেলাওয়ার হুসাইন সাঈদি সাহেবকে।
বৃহত্তম অভিভাবক সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সাধারণ ছাত্রদেরকে সাথে নিয়ে এক দুর্বার আন্দোলন। গড়ে তোলে। শান্তিপূর্ণ হরতাল, অবরোধে আমজনতা রাস্তায় নেমে আসে। এতো কিছুর পরেও সরকারের ঘাড়ে চেপে বসে বিদেশী ভূত। চিরুনী অভিযানের নামে গ্রেফতার করা হয় লক্ষ লক্ষ তরুণ মেধাবী ছাত্রদেরকে। পর্দানশীল মা-বোন, দুধের শিশুও গ্রেফতারের হাত থেকে বাদ পড়েনি। অনেকেই গ্রেফতার এড়াতে ঘরবাড়ি ছেড়ে মাঠে-ঘাটে, বনে-জঙ্গলে রাত্রি যাপন করতে থাকে। তবুও আন্দোলন থামেনি। এতোকিছুর পর ফ্যাসিবাদী-লুটেরা আওয়ামী সরকার শুরু করে নতুন খেলা। তারা একে একে কেন্দ্রীয় নেতাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে উল্লাস করতে থাকে। সরকারের এমন হীন আচরণে আপামর জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে।
এদিকে জালিম সরকার ক্ষমতায় থেকে তারা আবারও পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারিতে ২য় মেয়াদে ক্ষমতা দখল করে। এবার আরো বেশি ভয়ংকর রূপে আওয়ামীলীগ পেটুয়া বাহিনী দিয়ে রাজপথে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ড শুরু করে। শত শত নেতা কর্মীকে গুম করে। শুরু হয়। গুম-খুনের এক ভীতিকর পরিবেশ, করা হয় নির্বিচারে গণহত্যা, রচিত হয় ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।এমনি এক কঠিন পরিবেশে ২০১৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি সিলেট থেকে ঝিনাইদহ বাড়ি ফিরার পথে, গোয়ালন্দ ঘাট পার হওয়ার কিছুক্ষণপর ফরিদপুর হাইওয়ে থেকে সাদা পোশাকের পুলিশ জসিমকে বাস থেকে নামিয়ে নেয়। জসিম ভাই আগে থেকেই বেশ সতর্ক ছিল কারণ পুলিশ তাঁকে ফোন করে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীল হওয়ার কারণে। সেদিন জসিম ভাই সাদা পোশাকের পুলিশ দেখা মাত্রই তার দায়িত্বশীলদেরকে এস. এম.এসের মাধ্যমে বিষয়টা জানায়। এস.এম.এস পাওয়া মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই কল করা হয় কিন্তু ততক্ষণে পুলিশ ফোনটা হাত থেকে নিয়ে নেয় এবং সুইচ অফ করে দেয়। সেই থেকে ফোনটা আর খোলা হয়নি।
'প্রতিটি প্রতীক্ষীত প্রহর দু'টি চোখ ব্যথিত অন্তর।'
শুরু হল প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে থাকা। দিন যায় রাত আসে তবুও জসিম উদ্দীনের কোন খবর আসে না। পুলিশ গ্রেফতারের কথা অস্বীকার করে। থানায় জিডি গ্রহণ করে না। এদিকে জসিম ভায়ের মা কাঁদতে কাঁদতে পাগল প্রায়। অপেক্ষায় নির্ঘুম চোখ, কখন ফিরবে থোকা।
দীর্ঘ ২২ দিন গুম করে রাখার পর ২০১৬ সালের ৪ঠা মার্চ ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুন্ডু উপজেলার এক ভুট্টা ক্ষেতের পাশে নির্মমভাবে হত্যা করে ফেলে রেখে যায় পুলিশ। যে কণ্ঠে মধুর সুরে কোরআন তেলাওয়াত করতেন সে কন্ঠ আজ স্তব্ধ। যে মুখে শোভা পেতো কোরআনের বাণী সে মুখ পাষাণ্ডের দল গামছা দিয়ে বেঁধে রেখেছিল, না জানি কত কথা বলতে যেয়েও বলতে পারেনি। যে স্মৃতিতে কোরআন ছিল সে মাথা বুলেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। মুখভরা সুন্দর দাঁড়ি রক্তে পিচ্ছিল যেন যায় না চেনা প্রিয় মুখ। খবর ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে, কান্নায় ভেঙে পড়লেন শহীদ জননী। কাঁদছে ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, কাঁদছে প্রিয় সাথীরা। প্রিয়জন হারানো ব্যথায় আকাশ-বাতাসে শোকের ছায়া নেমে এলো ঘন মেঘ। ছেয়ে গেল যেন পৃথিবী। তখনও পাথরের মত অনড় একফোঁটা অশ্রু নাই শহীদের গর্বিত পিতার চোখে। আমি কাঁদছি, কাঁদছে আমার সাথে সাথীরা। শহীদের গর্বিত পিতা বললেন তোমরা কাঁদছো কেন? আমার জসিম তো শহীদ হয়েছে আর শহীদরা তো মরে না। আল্লাহ বলেন 'আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না। বরং তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝো না।' (২:১৫৪)
শহীদের পিতার অনুভূতি
তোমাদের জসিম ভাই অনেক আগেই আমাকে বলেছিল যে, বাবা আমি যদি শহীদ হয়ে যায় তুমি কাঁদবে না, কথা দাও। তোমার সাথে আমার জান্নাতে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। তাই আমি কাঁদছি না। শহীদের পিতারা যে সত্যই অনড় মনোবলের হয়, তা শহীদ জসিম উদ্দীনের পিতার কথায় প্রমাণিত হলো।
শহীদ জসিম ভায়ের মোনাজাত:
হাফেজ শহীদ জসিম উদ্দীন যখনই কোন মোনাজাত করতেন তখনই তিনি শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করতেন। তাঁর আচার-আচরণ চলা-ফেরায় একজন শহীদী মানুষের প্রতিচ্ছবি পরিলক্ষিত হত।
শহীদের স্বপ্ন:
জসিম উদ্দীন অনেকবার ঘুমের ঘরে স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি শহীদ হয়েছেন এবং জান্নাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর এই স্বপ্ন যে সত্যিই বাস্তবায়ন হবে তা কখনো ভাবতেই পারিনি। বুকে পাথর চেপে দাফন-কাফন সম্পন্ন করা হলো, বারবার সকলেই শেষ বারের মত দেখে নিলো। তাদের প্রিয় মুখ প্রিয় দায়িত্বশীল জসিম উদ্দীন সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে এতো জনপ্রিয় ছিলো।
এক নজরে শহীদ হাফেজ মোঃ জসিম উদ্দীন জিহাদ
নাম: হাফেজ মোঃ জসিম উদ্দীন জিহাদ
জন্ম তারিখ: ১৯৯২
পিতার: মোঃ খলিলুর রহমান
মাতা: রাবেয়া খাতুন
ভাইবোন: দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয়
পিতার পেশা: কৃষক
মাতার পেশা: গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: কালুহাটি, ঝিনাইদহ সদর, ঝিনাইদহ
বর্তমান ঠিকানা: ঐ
সর্বশেষ পড়ালেখা কামিল ভর্তির চেষ্টা
সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ঝিনাইদহ কামিল মাদ্রাসা
সাংগঠনিক মান: সাথী
সর্বশেষ দায়িত্ব: থানা সভাপতি
জীবনের লক্ষ্য: আলেম হওয়া
শাহাদাতের স্থান: বিশমাইল রিশখালী হিঙ্গারপাড়া, হরিনাকুন্ডু
শাহাদাতের তারিখ:৪-০৩-২০১৬
আঘাতের ধরন: গুলি
যাদের আঘাতে শহীদ: অজ্ঞাত সন্ত্রসীরা ২২ দিন গুম রাখার পর গুলি করে হত্যা করে।
ব্যক্তিগত পরিচয়
শহীদ হাফেজ মোঃ জসিম উদ্দীন জিহাদ ১৯৯২ সালে ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলাধীন কালুহাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শহীদ জসীম উদ্দীন ঝিনাইদহ কামিল মাদরাসা থেকে ফাজিল পাস করে কামিল ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথী এবং থানা সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।
জসিম উদ্দীনের পিতা খলিল মণ্ডল ও মাতা মোছাঃ রাবেয়া খাতুন। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয়। শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন কালুহাটি আফসার উদ্দিন হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে এবং কলোমন খালী মাদ্রাসা থেকে হিফজ শেষ করেন। সেখান থেকে এসে তিনি কুঠিদুর্গাপুর দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সাথে দাখিল পাশ করেন। তিনি ঝিনাইদহ সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করেন এবং ফাজিল ২য় বর্ষে অধ্যায়নরত ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সিলেট থেকে আসার পথে রাজবাড়ী এলে বাস থেকে নামিয়ে নেয়। গুম হওয়ার দীর্ঘ ২২ দিন পর ২০১৬ সালের ৪ই মার্চ ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুন্ডু উপজেলার রিশখালি হিঙ্গার পাড়ার এক ভুট্টাক্ষেতের পাশে শহীদ জসিমের লাশ পাওয়া যায়।
কেমন ছিলেন শহীদ হাফেজ মোঃ জসিম উদ্দীন জিহাদ
শহীদের পিতা বলেন- জসিম ছোটবেলা থেকে কখনও নামাজ কাযা করেনি। বিনয়, নম্র ও ভদ্রতায় ওঁর সমকক্ষ অত্র এলাকায় আমরা কাউকে দেখিনি। আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা সবাই ওঁকে ভালোবাসত, কতিপয় ইসলামের শত্রু ছাড়া। ওঁকে হাফেজ বানাবো বলে ছোটবেলায় হাফেজি মাদ্রাসায় ভর্তি করাই। সাফল্যের সাথে হাফেজি শেষ করে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। দাখিল পাশ করে ঝিনাইদহ আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। তখন থেকেহ সংগঠনেও সময় দেয়া শুরু করে। ঈদের সময় অত্র এলাকার গরীব অসহায় মানুষের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ করতো। ভাইঝিকে হাফেজ বানাবে এটা ও সবসময় বলত। ওর শাহাদাতের পর ওর ভাইঝিটিকে আমরা হাফেজী মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়েছি। পলাতক থাকার সময় ওর বোন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে মোবাইলে ওকে দাড়ি কেটে পাঞ্জাবি, পায়জামা ছেড়ে লেবাস পাল্টাতে বলে। এই কথা বলাতে জসিম রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যায়। মোবাইল বন্ধ করে রাখে। অনেকবার চেষ্টা করে মোবাইল রিসিভ করলে জিজ্ঞেস করে আপার কথায় রাগ করেছে কেন? জসিম ওর দুলাভাইকে জানায়, জীবন বাঁচানোর জন্য আমি আমার ইসলামী লেবাস পাল্টাবো না। সর্বশেষ বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার চৌদ্দদিন পর ওর মাকে ফোন দেয়। এটাই ছিলো ওর মায়ের সাথে শেষ কথা। গুম হয়ে যাওয়ার আগে আমাকে বলে, "আমি শহীদ হয়ে গেলে, আলহামদুলিল্লাহ বলবে, আর আমার জন্য দোয়া করবে। আমি যেন শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করি।" তোমরা আমার ছেলের মত। তোমরা কেউ আসলে জসিমকে হারানোর বেদনা আমাদের থাকে না। তোমরা চলে গেলে ফের শূন্যতা অনুভব করি। জসিমের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্যে তোমরা কাজ করে যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সামগ্রিক বিবরণ
১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি প্রাণপ্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি জড়বাদী ও বাতিল শক্তির সাথে আপোষহীণ সংগ্রাম চলছে-চলবেই অবিরাম। হক ও বাতিলের এই সংগ্রামে যে সকল অকুতোভয় বীর সৈনিক যোগদান করেছেন তাঁরা এদেশ-জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের মধ্যে যাঁরা শাহাদতবরণ করেছেন তাঁরা আরো বেশি সম্মানের। প্রভুর কাছে তারা সফল আর শহীদেরাই এ কাফেলার সব থেকে বড় সম্পদ। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয় বাকশালী, বর্বর, জালিম-অত্যাচারী ইসলাম ও মুসলমানের দুশমন আওয়ামী সরকার। ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে তাঁরা এদেশের বড় বড় আলেমদেরকে গণগ্রেফতার করতে শুরু করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মেধাবী ছাত্রকে হত্যা করার মাধ্যমে তাদের নীল নকশার বাস্তবায়ন শুরু করে। সেই নীল নকশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা গ্রেফতার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর সাবেক সফল শিল্প ও কৃষিমন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে। গ্রেফতার করা হয় সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী-আহসান মুহাম্মদ মোজাহিদসহ আব্দুল-কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান ও মীর কাশেম আলী মিন্টু ভাইকে। আরও গ্রেফতার করা হয় এদেশের ১৬ কোটি মানুষের নয়নের মণি বিশ্ববরেণ্য মুফাসসিরে কোরআন হযরত মাওলানা আল্লামা দেলাওয়ার হুসাইন সাঈদি সাহেবকে।
বৃহত্তম অভিভাবক সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সাধারণ ছাত্রদেরকে সাথে নিয়ে এক দুর্বার আন্দোলন। গড়ে তোলে। শান্তিপূর্ণ হরতাল, অবরোধে আমজনতা রাস্তায় নেমে আসে। এতো কিছুর পরেও সরকারের ঘাড়ে চেপে বসে বিদেশী ভূত। চিরুনী অভিযানের নামে গ্রেফতার করা হয় লক্ষ লক্ষ তরুণ মেধাবী ছাত্রদেরকে। পর্দানশীল মা-বোন, দুধের শিশুও গ্রেফতারের হাত থেকে বাদ পড়েনি। অনেকেই গ্রেফতার এড়াতে ঘরবাড়ি ছেড়ে মাঠে-ঘাটে, বনে-জঙ্গলে রাত্রি যাপন করতে থাকে। তবুও আন্দোলন থামেনি। এতোকিছুর পর ফ্যাসিবাদী-লুটেরা আওয়ামী সরকার শুরু করে নতুন খেলা। তারা একে একে কেন্দ্রীয় নেতাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে উল্লাস করতে থাকে। সরকারের এমন হীন আচরণে আপামর জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে।
এদিকে জালিম সরকার ক্ষমতায় থেকে তারা আবারও পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারিতে ২য় মেয়াদে ক্ষমতা দখল করে। এবার আরো বেশি ভয়ংকর রূপে আওয়ামীলীগ পেটুয়া বাহিনী দিয়ে রাজপথে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ড শুরু করে। শত শত নেতা কর্মীকে গুম করে। শুরু হয়। গুম-খুনের এক ভীতিকর পরিবেশ, করা হয় নির্বিচারে গণহত্যা, রচিত হয় ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।এমনি এক কঠিন পরিবেশে ২০১৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি সিলেট থেকে ঝিনাইদহ বাড়ি ফিরার পথে, গোয়ালন্দ ঘাট পার হওয়ার কিছুক্ষণপর ফরিদপুর হাইওয়ে থেকে সাদা পোশাকের পুলিশ জসিমকে বাস থেকে নামিয়ে নেয়। জসিম ভাই আগে থেকেই বেশ সতর্ক ছিল কারণ পুলিশ তাঁকে ফোন করে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীল হওয়ার কারণে। সেদিন জসিম ভাই সাদা পোশাকের পুলিশ দেখা মাত্রই তার দায়িত্বশীলদেরকে এস. এম.এসের মাধ্যমে বিষয়টা জানায়। এস.এম.এস পাওয়া মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই কল করা হয় কিন্তু ততক্ষণে পুলিশ ফোনটা হাত থেকে নিয়ে নেয় এবং সুইচ অফ করে দেয়। সেই থেকে ফোনটা আর খোলা হয়নি।
'প্রতিটি প্রতীক্ষীত প্রহর দু'টি চোখ ব্যথিত অন্তর।'
শুরু হল প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে থাকা। দিন যায় রাত আসে তবুও জসিম উদ্দীনের কোন খবর আসে না। পুলিশ গ্রেফতারের কথা অস্বীকার করে। থানায় জিডি গ্রহণ করে না। এদিকে জসিম ভায়ের মা কাঁদতে কাঁদতে পাগল প্রায়। অপেক্ষায় নির্ঘুম চোখ, কখন ফিরবে থোকা।
দীর্ঘ ২২ দিন গুম করে রাখার পর ২০১৬ সালের ৪ঠা মার্চ ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুন্ডু উপজেলার এক ভুট্টা ক্ষেতের পাশে নির্মমভাবে হত্যা করে ফেলে রেখে যায় পুলিশ। যে কণ্ঠে মধুর সুরে কোরআন তেলাওয়াত করতেন সে কন্ঠ আজ স্তব্ধ। যে মুখে শোভা পেতো কোরআনের বাণী সে মুখ পাষাণ্ডের দল গামছা দিয়ে বেঁধে রেখেছিল, না জানি কত কথা বলতে যেয়েও বলতে পারেনি। যে স্মৃতিতে কোরআন ছিল সে মাথা বুলেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। মুখভরা সুন্দর দাঁড়ি রক্তে পিচ্ছিল যেন যায় না চেনা প্রিয় মুখ। খবর ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে, কান্নায় ভেঙে পড়লেন শহীদ জননী। কাঁদছে ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, কাঁদছে প্রিয় সাথীরা। প্রিয়জন হারানো ব্যথায় আকাশ-বাতাসে শোকের ছায়া নেমে এলো ঘন মেঘ। ছেয়ে গেল যেন পৃথিবী। তখনও পাথরের মত অনড় একফোঁটা অশ্রু নাই শহীদের গর্বিত পিতার চোখে। আমি কাঁদছি, কাঁদছে আমার সাথে সাথীরা। শহীদের গর্বিত পিতা বললেন তোমরা কাঁদছো কেন? আমার জসিম তো শহীদ হয়েছে আর শহীদরা তো মরে না। আল্লাহ বলেন 'আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না। বরং তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝো না।' (২:১৫৪)
শহীদের পিতার অনুভূতি
তোমাদের জসিম ভাই অনেক আগেই আমাকে বলেছিল যে, বাবা আমি যদি শহীদ হয়ে যায় তুমি কাঁদবে না, কথা দাও। তোমার সাথে আমার জান্নাতে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। তাই আমি কাঁদছি না। শহীদের পিতারা যে সত্যই অনড় মনোবলের হয়, তা শহীদ জসিম উদ্দীনের পিতার কথায় প্রমাণিত হলো।
শহীদ জসিম ভায়ের মোনাজাত:
হাফেজ শহীদ জসিম উদ্দীন যখনই কোন মোনাজাত করতেন তখনই তিনি শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করতেন। তাঁর আচার-আচরণ চলা-ফেরায় একজন শহীদী মানুষের প্রতিচ্ছবি পরিলক্ষিত হত।
শহীদের স্বপ্ন:
জসিম উদ্দীন অনেকবার ঘুমের ঘরে স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি শহীদ হয়েছেন এবং জান্নাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর এই স্বপ্ন যে সত্যিই বাস্তবায়ন হবে তা কখনো ভাবতেই পারিনি। বুকে পাথর চেপে দাফন-কাফন সম্পন্ন করা হলো, বারবার সকলেই শেষ বারের মত দেখে নিলো। তাদের প্রিয় মুখ প্রিয় দায়িত্বশীল জসিম উদ্দীন সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে এতো জনপ্রিয় ছিলো।
এক নজরে শহীদ হাফেজ মোঃ জসিম উদ্দীন জিহাদ
নাম: হাফেজ মোঃ জসিম উদ্দীন জিহাদ
জন্ম তারিখ: ১৯৯২
পিতার: মোঃ খলিলুর রহমান
মাতা: রাবেয়া খাতুন
ভাইবোন: দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয়
পিতার পেশা: কৃষক
মাতার পেশা: গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: কালুহাটি, ঝিনাইদহ সদর, ঝিনাইদহ
বর্তমান ঠিকানা: ঐ
সর্বশেষ পড়ালেখা কামিল ভর্তির চেষ্টা
সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ঝিনাইদহ কামিল মাদ্রাসা
সাংগঠনিক মান: সাথী
সর্বশেষ দায়িত্ব: থানা সভাপতি
জীবনের লক্ষ্য: আলেম হওয়া
শাহাদাতের স্থান: বিশমাইল রিশখালী হিঙ্গারপাড়া, হরিনাকুন্ডু
শাহাদাতের তারিখ:৪-০৩-২০১৬
আঘাতের ধরন: গুলি
যাদের আঘাতে শহীদ: অজ্ঞাত সন্ত্রসীরা ২২ দিন গুম রাখার পর গুলি করে হত্যা করে।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍