শহীদ মোঃ ইসরাইল হোসেন
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শাহাদাতের আগের দিন তিনি পিতার ব্যবসার কাজে সাতক্ষীরা গিয়েছিলেন, সেখান থেকে অবরোধের কর্মসূচির এবং মিছিল ও সমাবেশের সংবাদ পান। এ খবর পেয়ে পিতাকে বলেন আগামীকাল আমার পরীক্ষা আছে, এ পরীক্ষায় আমাকে অংশগ্রহণ করতেই হবে। ভোর রাতেই তিনি সাতক্ষীরা থেকে বাড়িতে আসেন এবং সকাল ৮ টার সময় মিছিলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে যান। পথিমধ্যে ভায়ের ছেলে আরিফ কে বলেন "আমি মিছিলে যাচ্ছি, দোয়া কর আমি যেন শহীদ হতে পারি, তুমি আমার কাজগুলো দেখাশোনা করবে।" যাওয়ার সময় মা চাচীদের কাছ থেকে দোয়া চেয়ে বেরিয়ে যান। ফিরে আসেন শহীদী মৃত্যুর জীবন্ত সাক্ষী হয়ে।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"আমি মিছিলে যাচ্ছি, দোয়া কর আমি যেন শহীদ হতে পারি, তুমি আমার কাজগুলো দেখাশোনা করবে।"
জন্য: ১০ ডিসেম্বর ১৯৯২, শাহাদাতবরণ। ৩০ নভেম্বর ২০১৩
শহীদের পরিচিতি
মোঃ ইসরাইল হোসেন ১০.১২.১৯৯২ তারিখ ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার হরিণদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
দেশব্যাপি আওয়ামী জুলুম নির্যাতনের প্রতিবাদে ও নির্দলীয় সরকারের দাবিতে জামায়াত সহ ১৮ দল অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা করে। ৩০/১১/২০১৩ ইং তারিখ অবরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোটচাঁদপুর বাসস্ট্যান্ডে জামায়াত, শিবির ও ১৮ দলের কর্মীরা সমাবেত হয়। সকাল ৮ টায় মিছিল শুরু হলে সশস্ত্র পুলিশ এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সন্ত্রাসীরা অতর্কিত ভাবে মিছিলে হামলা চালায়। পুলিশ বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ করতে থাকে ফলে মিছিলটি ছত্র ভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় একটি গুলি ইসরাইলের ভাইয়ের কানের পাশে বিদ্ধ হয়ে এপার ওপার বেরিয়ে যায়। তিনি আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েন। তাকে দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেয়া হয় কিন্তু সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
শাহাদাতের আগের দিন তিনি পিতার ব্যবসার কাজে সাতক্ষীরা গিয়েছিলেন, সেখান থেকে অবরোধের কর্মসূচির এবং মিছিল ও সমাবেশের সংবাদ পান। এ খবর পেয়ে পিতাকে বলেন আগামীকাল আমার পরীক্ষা আছে, এ পরীক্ষায় আমাকে অংশগ্রহণ করতেই হবে। ভোর রাতেই তিনি সাতক্ষীরা থেকে বাড়িতে আসেন এবং সকাল ৮ টার সময় মিছিলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে যান। পথিমধ্যে ভায়ের ছেলে আরিফ কে বলেন "আমি মিছিলে যাচ্ছি, দোয়া কর আমি যেন শহীদ হতে পারি, তুমি আমার কাজগুলো দেখাশোনা করবে।" যাওয়ার সময় মা চাচীদের কাছ থেকে দোয়া চেয়ে বেরিয়ে যান। ফিরে আসেন শহীদী মৃত্যুর জীবন্ত সাক্ষী হয়ে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২৯ নভেম্বর ২০১৩ শুক্রবার বিকেলে শহীদ ইসরাইল সাতক্ষীরার উদ্দেশ্যে বের হয় বাবার কাঁচামালের ব্যবসার কাজে এবং রাত ১০টার সময় তাঁর বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারে আগামীকাল বিক্ষোভ। সে খবর পেয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করে ভোর ৫টায় এসে পৌঁছায়। এরপর ফজরের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে পাড়ায় পাড়ায় বিক্ষোভ মিছিলের দাওয়াতি কাজ করে। সকালের যৎসামান্য খাবার খেয়ে বের হয়ে যায়। শাহাদাতের তৃষ্ণা রয়েছে যার, তার কি পেটের ক্ষুধার অনুভূতি থাকে? মা এবং বড় ভাইয়ের ছেলে আরিফসহ
অন্যদের কাছে দোয়া চেয়েছে- আমি যেন শহীদ হতে পারি। শহীদি তামান্না নিয়েই বাড়ি থেকে বের হন শহীদ ইসরাইল।
নছিমনে করে কোটচাঁদপুর মেইন বাসস্ট্যান্ড পৌঁছায় কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। ১৮ দলীয় নেতাকর্মী জড়ো
হয়, অবরোধ সফল করার উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষ অবস্থান নেয়। আকস্মিকভাবে ৯টা বাজতে না বাজতেই
কোটচাঁদপুর বাসস্ট্যান্ডে মিছিল ও পিকেটিং করার সময় সশস্ত্র পুলিশ এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সন্ত্রাসীরা অস্ত্র,
রামদা, হকিস্টিক ও লাঠিসোটা নিয়ে মিছিলে হামলা চালায়। পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করলে মিছিলটি
ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় ইসরাইল হোসেন সবাইকে বলতে থাকেন- 'আসুন আমরা আমাদের জীবন দিয়ে
বাতিলকে মোকাবেলা করি, প্রয়োজনে আমরা শহীদ হবো কিন্তু বাতিলের কাছে মাথা নত করবো না।' তিনি
তাঁর সহকর্মীদের সংগঠিত করে হামলা প্রতিহত করতে থাকেন। এ সময় একটি গুলি ইসরাইল হোসেনের
কানের পাশে বিদ্ধ হয়। মারাত্মক আহত অবস্থায় শহীদের সাথীরা দ্রুত তাঁকে ধরে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা
করে। তৎক্ষণাৎ কাছে পাওয়া রিকশা করে নেয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্সে, কিন্তু চিকিৎসা শুরুর মুহূর্তে
তিনি প্রিয় সাথীদের শোকসাগরে ভাসিয়ে শাহাদাত বরণ করেন। শুরু হলো হৃদয়বিদারক আর্তচিৎকার। শহীদের সাথী আতিকুর রহমান বলেন- একজন মিছিলের সাথী হারানো যে কত কষ্টের সেদিন বুঝেছিলাম। দেখেছিলাম সন্তানহারা মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ। পিতার বাকহীন নির্বাক চাহনি। ভাই হারানো বোনের মলিন মুখের প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যখন পরিবারকে ময়নাতদন্তের কথা বলা হয়- এ কথা শুনার পর শহীদ ইসরাইলের নিকটতম বড় ওয়াসিম ভাইয়ের সেই আকাশ ভারি করা আওয়াজ এখনো কানে ভাসলে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। মাটি আছড়িয়ে ও বুক থাবড়িয়ে বলছিলেন, 'আমার ভাইকে আর কাটতে দিব না।' এবার শুরু হলো জানাজা নামাজের প্রস্তুতি। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় কোটচাঁদপুর কামিল মাদরাসা প্রাঙ্গণে শহীদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এটুকু জানতে পেরে মাদরাসা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক জড়ো হতে থাকে এবং এটা দেখে প্রশাসন ও আওয়ামী গুরুরা ভয়ে ভীত হয়ে ঘোষণা করে শহরের মধ্যে জানাজা করা যাবে না। সাধারণ মানুষ উৎকণ্ঠায়- কোথায় হবে জানাজা? এবার একটি স্থান নির্ধারণ করা হয় আল আমিন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে কিন্তু' সন্ধ্যা না হতেই সে মাঠ মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তারপর বিদ্যালয়ের পাশে খালি একটি মাঠে শহীদের প্রথম জানাজা নামাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই মাঠ সাধারণ মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং জানাজা-পূর্ব মুহূর্তে অনেকে আলোচনা করেন এবং সবার কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। শহীদের পিতার দাবিতে প্রথম নামাজের জানাজার ইমামতি করেন অধ্যাপক মতিয়ার রহমান এবং দ্বিতীয় জানাজা শহীদের নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হরিন্দিয়া আলিম মাদরাসা প্রাঙ্গণে তৎকালীন জেলা জামায়াতের আমীর ড. মোজাম্মেল হক এর ইমামতিতে অনুষ্ঠিত হয়। শহীদ ইসরাইলের পিতার দাবির প্রেক্ষিতে বাড়ির সামনে মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। এবার শুরু হয় প্রশাসনের মামলা প্রক্রিয়া- এক নম্বর আসামি করা হয় শহীদ ইসরাইলের শ্রদ্ধেয় পিতাকে, দুই নম্বর আসামি করা হয় তার ভাইকে, এরপর যারা জানাজা নামাজের পূর্বে আলোচনা করেছেন তাদেরকে আসামি করে মামলা দায়ের করে আওয়ামী প্রশাসন। সেই মামলায় জেল খাটেন শহীদের পিতা। শহীদ ইসরাইল ভাইয়ের পিতা-মাতা প্রতি মুহূর্তে দোয়া করেন, 'হে আল্লাহ আমার ছেলে হত্যার বিচার তুমি এই জমিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কর।' একজন পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ কত যে ভারী যে সন্তান হারায়নি কখনো তাকে বুঝানো যাবে না। প্রিয় সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর একজন শোকাহত পিতাকে জেলখানায় বন্দীর মাধ্যমে মানবতা নামক শব্দটি কলঙ্কিত করেছে আওয়ামী প্রশাসন। এভাবেই প্রতিদিন সত্য পথের পথিকদেরকে নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের মাধ্যমে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের পথে না থাকার ব্যাপারে জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির নজির আজ নতুন কোনো ঘটনা নয়। বরং এসকল কঠিন মুহূর্ত টপকিয়ে আল্লাহর জিন্দাদিল মুজাহিদরা এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। প্রয়োজনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে কিন্তু বাতিলের কাছে কখনো বশ্যতা স্বীকার করেনি। যে রক্তের স্রোত আজো বহমান। আর এ রক্তের সিঁড়ি বেয়েই একদিন এদেশে কালিমার পতাকা উড়বেই ইনশাআল্লাহ। কবি মতিউর রহমান মল্লিক বলেছেন- আল কুরআনকে ভালবেসে প্রাণ দিয়েছিল যারা / আজকে দেখ রক্তমাখা শহীদ বেশে / ফের দাঁড়িয়েছে তারা।
সত্যিই আমাদের চলার প্রতিটি মুহূর্তে শহীদেরা আমাদেরকে অনুপ্রেরণা জোগায়। শহীদেরা আমাদের সাথেই আছেন। আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে শহীদদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজের আঞ্জাম দিই প্রতিদিন। আল্লাহ তায়ালা শহীদ ইসরাইল ভাইসহ সকল শহীদদের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন
শহীদের আপন জনদের কথা
পিতা: আমার সবগুলো ছেলে মেয়ের ভিতরে সে সবচেয়ে ভালো ছিলো। ছেলেরা আলাদা হলেও সে আমার সাথে ছিলো। সে প্রায় বলতো আমি শহিদের ছেলে শহীদ হব (ইসরাইল ভায়ের পিতার নামে শহিদুল ইসলাম)। সে মিছিলে যাওয়ার সময় বলত আমি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। সে ক্লাসের পরীক্ষার চেয়ে আন্দোলনের কর্মসূচিকে বড় পরীক্ষা মনে করতো। শাহাদাতের দিন যখন বিদায়ী নিয়ে বাড়ী থেকে যায় আমাকে বলে গেল "আব্বা আমি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি দোয়া কর আমি যেন পাশ করি।" আমার ছেলে পাশ করেছে সে জান্নাতে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে।
মাতা: আপনারা আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তাকে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমীন।
এক নজরে শহীদ ইসরাইল হোসেন
নাম: ইসরাইল হোসেন
জন্ম তারিখ: ১০-১২-১৯৯২
পিতার নাম: মোঃ শহিদুল ইসলাম
মাতার নাম: মোছাঃ মাজেদা বেগম
ভাইবোন: তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে প্রথম
পিতার পেশা: ব্যবসায়ী
মাতার পেশা: গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: হরিন্দিয়া ঝামাঘাট পাড়া, ওয়ার্ড-৯, ৩ নং কুশনা ইউনিয়ন, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ
বর্তমান ঠিকানা ঐ
সর্বশেষ লেখাপড়া: ডিগ্রি ২য় বর্ষ
সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: সরকারি কে.এম.এইচ, ডিগ্রি কলেজ, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
সর্বশেষ দায়িত্ব: উপশাখা সভাপতি
পেশাগত লক্ষ্য: চাকুরি
আঘাতের স্থান: কোটচাঁদপুর মেইন বাসস্ট্যান্ড মসজিদ সংলগ্ন তালসার রোড।
শাহাদাতের তারিখ: ৩০-১২-২০১৩
যাদের আঘাতে শহীদ: পুলিশের গুলিতে
জন্য: ১০ ডিসেম্বর ১৯৯২, শাহাদাতবরণ। ৩০ নভেম্বর ২০১৩
শহীদের পরিচিতি
মোঃ ইসরাইল হোসেন ১০.১২.১৯৯২ তারিখ ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার হরিণদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
দেশব্যাপি আওয়ামী জুলুম নির্যাতনের প্রতিবাদে ও নির্দলীয় সরকারের দাবিতে জামায়াত সহ ১৮ দল অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা করে। ৩০/১১/২০১৩ ইং তারিখ অবরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোটচাঁদপুর বাসস্ট্যান্ডে জামায়াত, শিবির ও ১৮ দলের কর্মীরা সমাবেত হয়। সকাল ৮ টায় মিছিল শুরু হলে সশস্ত্র পুলিশ এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সন্ত্রাসীরা অতর্কিত ভাবে মিছিলে হামলা চালায়। পুলিশ বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ করতে থাকে ফলে মিছিলটি ছত্র ভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় একটি গুলি ইসরাইলের ভাইয়ের কানের পাশে বিদ্ধ হয়ে এপার ওপার বেরিয়ে যায়। তিনি আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েন। তাকে দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেয়া হয় কিন্তু সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
শাহাদাতের আগের দিন তিনি পিতার ব্যবসার কাজে সাতক্ষীরা গিয়েছিলেন, সেখান থেকে অবরোধের কর্মসূচির এবং মিছিল ও সমাবেশের সংবাদ পান। এ খবর পেয়ে পিতাকে বলেন আগামীকাল আমার পরীক্ষা আছে, এ পরীক্ষায় আমাকে অংশগ্রহণ করতেই হবে। ভোর রাতেই তিনি সাতক্ষীরা থেকে বাড়িতে আসেন এবং সকাল ৮ টার সময় মিছিলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে যান। পথিমধ্যে ভায়ের ছেলে আরিফ কে বলেন "আমি মিছিলে যাচ্ছি, দোয়া কর আমি যেন শহীদ হতে পারি, তুমি আমার কাজগুলো দেখাশোনা করবে।" যাওয়ার সময় মা চাচীদের কাছ থেকে দোয়া চেয়ে বেরিয়ে যান। ফিরে আসেন শহীদী মৃত্যুর জীবন্ত সাক্ষী হয়ে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২৯ নভেম্বর ২০১৩ শুক্রবার বিকেলে শহীদ ইসরাইল সাতক্ষীরার উদ্দেশ্যে বের হয় বাবার কাঁচামালের ব্যবসার কাজে এবং রাত ১০টার সময় তাঁর বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারে আগামীকাল বিক্ষোভ। সে খবর পেয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করে ভোর ৫টায় এসে পৌঁছায়। এরপর ফজরের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে পাড়ায় পাড়ায় বিক্ষোভ মিছিলের দাওয়াতি কাজ করে। সকালের যৎসামান্য খাবার খেয়ে বের হয়ে যায়। শাহাদাতের তৃষ্ণা রয়েছে যার, তার কি পেটের ক্ষুধার অনুভূতি থাকে? মা এবং বড় ভাইয়ের ছেলে আরিফসহ
অন্যদের কাছে দোয়া চেয়েছে- আমি যেন শহীদ হতে পারি। শহীদি তামান্না নিয়েই বাড়ি থেকে বের হন শহীদ ইসরাইল।
নছিমনে করে কোটচাঁদপুর মেইন বাসস্ট্যান্ড পৌঁছায় কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। ১৮ দলীয় নেতাকর্মী জড়ো
হয়, অবরোধ সফল করার উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষ অবস্থান নেয়। আকস্মিকভাবে ৯টা বাজতে না বাজতেই
কোটচাঁদপুর বাসস্ট্যান্ডে মিছিল ও পিকেটিং করার সময় সশস্ত্র পুলিশ এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সন্ত্রাসীরা অস্ত্র,
রামদা, হকিস্টিক ও লাঠিসোটা নিয়ে মিছিলে হামলা চালায়। পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করলে মিছিলটি
ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় ইসরাইল হোসেন সবাইকে বলতে থাকেন- 'আসুন আমরা আমাদের জীবন দিয়ে
বাতিলকে মোকাবেলা করি, প্রয়োজনে আমরা শহীদ হবো কিন্তু বাতিলের কাছে মাথা নত করবো না।' তিনি
তাঁর সহকর্মীদের সংগঠিত করে হামলা প্রতিহত করতে থাকেন। এ সময় একটি গুলি ইসরাইল হোসেনের
কানের পাশে বিদ্ধ হয়। মারাত্মক আহত অবস্থায় শহীদের সাথীরা দ্রুত তাঁকে ধরে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা
করে। তৎক্ষণাৎ কাছে পাওয়া রিকশা করে নেয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্সে, কিন্তু চিকিৎসা শুরুর মুহূর্তে
তিনি প্রিয় সাথীদের শোকসাগরে ভাসিয়ে শাহাদাত বরণ করেন। শুরু হলো হৃদয়বিদারক আর্তচিৎকার। শহীদের সাথী আতিকুর রহমান বলেন- একজন মিছিলের সাথী হারানো যে কত কষ্টের সেদিন বুঝেছিলাম। দেখেছিলাম সন্তানহারা মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ। পিতার বাকহীন নির্বাক চাহনি। ভাই হারানো বোনের মলিন মুখের প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যখন পরিবারকে ময়নাতদন্তের কথা বলা হয়- এ কথা শুনার পর শহীদ ইসরাইলের নিকটতম বড় ওয়াসিম ভাইয়ের সেই আকাশ ভারি করা আওয়াজ এখনো কানে ভাসলে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। মাটি আছড়িয়ে ও বুক থাবড়িয়ে বলছিলেন, 'আমার ভাইকে আর কাটতে দিব না।' এবার শুরু হলো জানাজা নামাজের প্রস্তুতি। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় কোটচাঁদপুর কামিল মাদরাসা প্রাঙ্গণে শহীদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এটুকু জানতে পেরে মাদরাসা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক জড়ো হতে থাকে এবং এটা দেখে প্রশাসন ও আওয়ামী গুরুরা ভয়ে ভীত হয়ে ঘোষণা করে শহরের মধ্যে জানাজা করা যাবে না। সাধারণ মানুষ উৎকণ্ঠায়- কোথায় হবে জানাজা? এবার একটি স্থান নির্ধারণ করা হয় আল আমিন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে কিন্তু' সন্ধ্যা না হতেই সে মাঠ মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তারপর বিদ্যালয়ের পাশে খালি একটি মাঠে শহীদের প্রথম জানাজা নামাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই মাঠ সাধারণ মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং জানাজা-পূর্ব মুহূর্তে অনেকে আলোচনা করেন এবং সবার কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। শহীদের পিতার দাবিতে প্রথম নামাজের জানাজার ইমামতি করেন অধ্যাপক মতিয়ার রহমান এবং দ্বিতীয় জানাজা শহীদের নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হরিন্দিয়া আলিম মাদরাসা প্রাঙ্গণে তৎকালীন জেলা জামায়াতের আমীর ড. মোজাম্মেল হক এর ইমামতিতে অনুষ্ঠিত হয়। শহীদ ইসরাইলের পিতার দাবির প্রেক্ষিতে বাড়ির সামনে মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। এবার শুরু হয় প্রশাসনের মামলা প্রক্রিয়া- এক নম্বর আসামি করা হয় শহীদ ইসরাইলের শ্রদ্ধেয় পিতাকে, দুই নম্বর আসামি করা হয় তার ভাইকে, এরপর যারা জানাজা নামাজের পূর্বে আলোচনা করেছেন তাদেরকে আসামি করে মামলা দায়ের করে আওয়ামী প্রশাসন। সেই মামলায় জেল খাটেন শহীদের পিতা। শহীদ ইসরাইল ভাইয়ের পিতা-মাতা প্রতি মুহূর্তে দোয়া করেন, 'হে আল্লাহ আমার ছেলে হত্যার বিচার তুমি এই জমিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কর।' একজন পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ কত যে ভারী যে সন্তান হারায়নি কখনো তাকে বুঝানো যাবে না। প্রিয় সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর একজন শোকাহত পিতাকে জেলখানায় বন্দীর মাধ্যমে মানবতা নামক শব্দটি কলঙ্কিত করেছে আওয়ামী প্রশাসন। এভাবেই প্রতিদিন সত্য পথের পথিকদেরকে নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের মাধ্যমে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের পথে না থাকার ব্যাপারে জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির নজির আজ নতুন কোনো ঘটনা নয়। বরং এসকল কঠিন মুহূর্ত টপকিয়ে আল্লাহর জিন্দাদিল মুজাহিদরা এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। প্রয়োজনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে কিন্তু বাতিলের কাছে কখনো বশ্যতা স্বীকার করেনি। যে রক্তের স্রোত আজো বহমান। আর এ রক্তের সিঁড়ি বেয়েই একদিন এদেশে কালিমার পতাকা উড়বেই ইনশাআল্লাহ। কবি মতিউর রহমান মল্লিক বলেছেন- আল কুরআনকে ভালবেসে প্রাণ দিয়েছিল যারা / আজকে দেখ রক্তমাখা শহীদ বেশে / ফের দাঁড়িয়েছে তারা।
সত্যিই আমাদের চলার প্রতিটি মুহূর্তে শহীদেরা আমাদেরকে অনুপ্রেরণা জোগায়। শহীদেরা আমাদের সাথেই আছেন। আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে শহীদদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজের আঞ্জাম দিই প্রতিদিন। আল্লাহ তায়ালা শহীদ ইসরাইল ভাইসহ সকল শহীদদের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন
শহীদের আপন জনদের কথা
পিতা: আমার সবগুলো ছেলে মেয়ের ভিতরে সে সবচেয়ে ভালো ছিলো। ছেলেরা আলাদা হলেও সে আমার সাথে ছিলো। সে প্রায় বলতো আমি শহিদের ছেলে শহীদ হব (ইসরাইল ভায়ের পিতার নামে শহিদুল ইসলাম)। সে মিছিলে যাওয়ার সময় বলত আমি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। সে ক্লাসের পরীক্ষার চেয়ে আন্দোলনের কর্মসূচিকে বড় পরীক্ষা মনে করতো। শাহাদাতের দিন যখন বিদায়ী নিয়ে বাড়ী থেকে যায় আমাকে বলে গেল "আব্বা আমি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি দোয়া কর আমি যেন পাশ করি।" আমার ছেলে পাশ করেছে সে জান্নাতে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে।
মাতা: আপনারা আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তাকে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমীন।
এক নজরে শহীদ ইসরাইল হোসেন
নাম: ইসরাইল হোসেন
জন্ম তারিখ: ১০-১২-১৯৯২
পিতার নাম: মোঃ শহিদুল ইসলাম
মাতার নাম: মোছাঃ মাজেদা বেগম
ভাইবোন: তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে প্রথম
পিতার পেশা: ব্যবসায়ী
মাতার পেশা: গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: হরিন্দিয়া ঝামাঘাট পাড়া, ওয়ার্ড-৯, ৩ নং কুশনা ইউনিয়ন, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ
বর্তমান ঠিকানা ঐ
সর্বশেষ লেখাপড়া: ডিগ্রি ২য় বর্ষ
সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: সরকারি কে.এম.এইচ, ডিগ্রি কলেজ, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
সর্বশেষ দায়িত্ব: উপশাখা সভাপতি
পেশাগত লক্ষ্য: চাকুরি
আঘাতের স্থান: কোটচাঁদপুর মেইন বাসস্ট্যান্ড মসজিদ সংলগ্ন তালসার রোড।
শাহাদাতের তারিখ: ৩০-১২-২০১৩
যাদের আঘাতে শহীদ: পুলিশের গুলিতে
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍