শহীদ মহিউদ্দিন সোহান
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শুম থাকা অবস্থায় গোপনে চিরকুটের মাধ্যমে নিচের চিঠিটি পাঠিয়েছিলো সোহান।
"মা আমার সালাম নিবে। আমি চলে গেলাম, যদি কখনো বেঁচে থাকি তাহলে আবার দেখা হবে আর যদি না ফিরে আসি, তাহলে দেখা হবে জান্নাতের সিঁড়িতে মা। তুমি গর্ব করতে পারো কারণ এমন সন্তান খুব কম মায়ের পেটে জন্ম নেয় যে দ্বীনের জন্য নিজের জান কুরবান দেয়। আমি গেলাম, প্রভুর সান্নিধ্য পেতে। তুমি আমার জন্য দোয়া কর। আমি যেখানেই থাকি না কেন তোমাদের জন্য দোয়া করব। পারলে ক্ষমা করো মা। আমি জিহাদে গেছি, একথা কাউকে বলো না। তাহলে পরিবারের সমস্যা হবে।
আমার সালাম নেবে, ইতি সোহান।"
"মা আমার সালাম নিবে। আমি চলে গেলাম, যদি কখনো বেঁচে থাকি তাহলে আবার দেখা হবে আর যদি না ফিরে আসি, তাহলে দেখা হবে জান্নাতের সিঁড়িতে মা। তুমি গর্ব করতে পারো কারণ এমন সন্তান খুব কম মায়ের পেটে জন্ম নেয় যে দ্বীনের জন্য নিজের জান কুরবান দেয়। আমি গেলাম, প্রভুর সান্নিধ্য পেতে। তুমি আমার জন্য দোয়া কর। আমি যেখানেই থাকি না কেন তোমাদের জন্য দোয়া করব। পারলে ক্ষমা করো মা। আমি জিহাদে গেছি, একথা কাউকে বলো না। তাহলে পরিবারের সমস্যা হবে।
আমার সালাম নেবে, ইতি সোহান।"
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
'যখন পৃথিবীর সব পানি শুকিয়ে যাবে তখন আমার রক্ত দিয়ে তোমার নাম লেখবো। হে আল্লাহ! আমাকে শক্তি দাওঃ সাহস দাও সেই সব সাহাবীর মত যারা রসুল (সা.) কে ঘিরে ইসলামকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তাঁদের কলিজাকে কাফেরের হাতে বিলায়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি সেই ঈমান আমায় দাও। হে আল্লাহ। আমাকে সেই শক্তি দাও। যতক্ষণ এই শরীরে রক্ত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি যেন কঠোরতা দেখাতে পারি।' শহীদ মহিউদ্দীন সোহান।
ব্যক্তিগত পরিচয়:
মহিউদ্দিন সোহান, ১৯৯৫ সালের ১০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষে পড়া মাতৃভক্ত এক মুজাহিদের নাম। হাস্যোজ্জ্বল, মিষ্টভাষী, খুব সহজেই নিজের ভেতরের কথাগুলো দ্বিধাহীনভাবে বলে দেওয়া লাজুক সুন্দর চরিত্রের ছেলেটি বাবা মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে আদরের বড় সন্তান। ছোট থেকে তাঁর বেড়ে ওঠা ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার ছায়াঢাকা ঈশ্বরবা গ্রামে। গ্রামের স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে দাখিল পাস করে।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
চিকিৎসা গ্রহণ শেষে ঢাকা থেকে আগত মায়ের জন্য কালীগঞ্জ পৌরসভার ঈশ্বরবা জামতলা নামক স্থানে অপেক্ষমান ছিল সোহান ও তার ছোট ভাই মাসুদ। এ সময় কালীগঞ্জ থেকে একটি ইজিবাইকে চারজন লোক এসে নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে সোহানকে তুলে নিয়ে যায়। উপস্থিত লোকেরা বাধা দিতে গেলে, তাদের অস্ত্র উঁচিয়ে ভয় দেখায়। অজ্ঞাত স্থান থেকে সোহানের লেখা একটি চিরকুট সোহানের মায়ের কাছে পৌঁছায়। তাতে লেখা ছিলো কলেজের স্যারদের জানাতে এবং এমপির সুপারিশ দিতে। এমপির সুপারিশ চাইতে গেলে তিনি প্রত্যাখান করেন। দীর্ঘ ১০ দিন গুম থাকার পর ২১ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে চুয়াডাঙ্গা জেলার খাড়াগুদা ফাঁড়ি থেকে ৫০০ গজ উত্তরে সোহানের গুলিবিদ্ধ দেহ পড়ে ছিল।
চিরকুট:
শুম থাকা অবস্থায় গোপনে চিরকুটের মাধ্যমে নিচের চিঠিটি পাঠিয়েছিলো সোহান।
"মা আমার সালাম নিবে। আমি চলে গেলাম, যদি কখনো বেঁচে থাকি তাহলে আবার দেখা হবে আর যদি না ফিরে আসি, তাহলে দেখা হবে জান্নাতের সিঁড়িতে মা। তুমি গর্ব করতে পারো কারণ এমন সন্তান খুব কম মায়ের পেটে জন্ম নেয় যে দ্বীনের জন্য নিজের জান কুরবান দেয়। আমি গেলাম, প্রভুর সান্নিধ্য পেতে। তুমি আমার জন্য দোয়া কর। আমি যেখানেই থাকি না কেন তোমাদের জন্য দোয়া করব। পারলে ক্ষমা করো মা। আমি জিহাদে গেছি, একথা কাউকে বলো না। তাহলে পরিবারের সমস্যা হবে।
আমার সালাম নেবে, ইতি সোহান।"
সামগ্রিক বিবরণ
চিকিৎসা গ্রহণ শেষে ঢাকা থেকে আগত মায়ের জন্য কালীগঞ্জ পৌরসভার ঈশ্বরবা জামতলা নামক স্থানে অপেক্ষমান ছিল সোহান ও তার ছোট ভাই মাসুদ। এ সময় কালীগঞ্জ থেকে একটি ইজিবাইকে চারজন লোক এসে নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে সোহানকে তুলে নিয়ে যায়। উপস্থিত লোকেরা বাধা দিতে গেলে, তাদের অস্ত্র উঁচিয়ে ভয় দেখায়। অজ্ঞাত স্থান থেকে সোহানের লেখা একটি চিরকুট সোহানের মায়ের কাছে পৌঁছায়। তাতে লেখা ছিলো কলেজের স্যারদের জানাতে এবং এমপির সুপারিশ দিতে। এমপির সুপারিশ চাইতে গেলে তিনি প্রত্যাখান করেন। দীর্ঘ ১০ দিন গুম থাকার পর ২১ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে চুয়াডাঙ্গা জেলার খাড়াগুদা ফাঁড়ি থেকে ৫০০ গজ উত্তরে সোহানের গুলিবিদ্ধ দেহ পড়ে ছিল। আপনজনদের কথা:
দেখতে দেখতে আমার সোহান কিভাবে যেন বড় হয়ে গেল। আমি ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। ওযে কেমন গুণে গুণান্বিত ছিলো তা তোমাদের বলে বুঝানো যাবে না। সমাজটাকে কিভাবে ভালো করা যায়। এই চিন্তাটাই সবসময় ওঁর মাথায় ঘুরপাক খেত। বিশেষ করে নামাজের দাওয়াতের ব্যাপারে ও খুব আগ্রহী ছিল। ছোট বড় সবাইকে নামাজের দাওয়াত দিত। কোন নামাজিকে মসজিদে না পেলে তার বাড়িতে চলে যেত। আমাদের পাড়ার সাইফুল কয়েক ওয়াক্ত মসজিদে যায় না। যথারীতি সোহান ওর বাড়িতে চলে যায়। দেখে সাইফুলের জ্বর, উঠতে পারছে না গরীব মানুষ ঔষধ কেনার টাকা নাই। সোহানের কাছে ২০০ টাকা ছিল। ও টাকাটা সাইফুলের স্ত্রীর কাছে দিয়ে ঔষধ কিনতে বলে। এরপর সাইফুল সুস্থ হয়ে গেলে টাকাটা সোহানকে ফেরত দিতে গেছে। সোহান টাকাটা ফেরত নেয়নি বরং সাইফুলকে বলেছে ভাই আপনার মত কোন অসহায় মানুষকে টাকাটা দিয়ে দিবেন।সোহান শাহাদাত বরণ করার পর সাইফুল কাঁদতে কাঁদতে এই ঘটনা আমাদেরকে বলেছে।
গ্রামের এক ব্যক্তি পাকা ধান কাটার জন্য কামলা পাচ্ছে না। এই দিকে ধানও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সোহান এটা শোনার পর ঐ ব্যক্তিকে বলেছে চাচা বাড়িতে যান আমি এটা দেখছি। ঐদিন রাতেই ওরা ৪-৫জন বন্ধুকে বলে রাজি করেছে। পরদিন সকাল ৮টার সময় ঐ ব্যক্তি তার ক্ষেতে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক। তার দেড় বিঘা জমির ধান কাটা শেষ।
একবার ঝড়ের দিনে এক আর্মি সদস্যের মাথায় গাছ পড়লে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। গাছটি ঐ আর্মি সদস্যের গায়ের উপরেই ছিল।
সোহান ঐ সময় বাড়িতে ফিরছিলো, লোকটার ঐ অবস্থা দেখে ও একাকী গাছ সরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক লোকটাকে কাঁধে করে গ্রাম্য ডাক্তার আরবের বাড়িতে নিয়ে যায়। এরপর প্রাথমিক সেবা শুশ্রুষা দেওয়ার পর লোকটার জ্ঞান ফেরে। রাস্তা থেকে ডাক্তার বাড়িতে আসার পর এই ঘটনা শুনে উনি সোহানের জন্য দোয়া করেছিলেন। রমজান মাসে সোহানের কোন ক্লান্তি থাকতো না। সাহরি খাওয়ার জন্য কোনদিনও ডাকা লাগেনি। পরপর তিনবার এতেকাফে ছিল। রমজানের আগে থেকেই ও রোজা রাখা শুরু করত।
একবার মসজিদে তাবলীগের কিছু লোকজন আসলো তাদের মধ্যে একজন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো। তাবলীগে আসা অন্যান্য সদস্যরা দাওয়াতী কাজে বা অন্যান্য কাজে ব্যস্ত। অসুস্থ ছেলেটার দিকে কারও খেয়াল নাই। সোহান নামাজে গিয়ে সেবা শুশ্রুষা করে ছেলেটাকে সুস্থ করে তুললো।
এক শীতে সোহানের খুব পছন্দীয় নতুন একটি সোয়েটার একটা ছেলেকে দিয়ে দিল। আমি রাগ করলে বলতো- আম্মা আমার তো আরও আছে। ওদের তো মোটেই নেই। ওর মামা অসুস্থ হয়ে যশোরের একটি হাসপাতালে ভর্তি হলো। হঠাৎ দেখি সোহান হাসপাতালে নাই। হাসপাতালের নিচে এসে দেখি একজন অসুস্থ ভিক্ষুক যার গায়ে পোকামাকড়-দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। সোহান ঐ ভিক্ষুককে পাউরুটি আর কলা হাতে তুলে খাওয়াচ্ছে আর কাঁদছে। সোহানের হাতের খাবার খেয়ে ঐ ভিক্ষুক মহিলাটি মারা যায়। মৃত্যুর একদিন আগে মাসুদ (সোহানের একমাত্র ছোটভাই) এশার নামাজের সময় ঘুমিয়ে পড়েছে। মাসুদ তখন অনেক ছোট।
সোহান ওকে ডেকে তুলতে না পেরে ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে করে মসজিদে নিয়ে গেল। আমি এবং ওর দাদি সোহানকে বকা দিলাম।
কিন্তু সোহান কিছুই কানে তুললো না। নামাজ শেষে মাসুদকে বোঝালো ভাইয়া কখনও নামাজ ছাড়ব না। তাঁর পরের দিনই আমার মানিকটা হারিয়ে গেল।
মসজিদে নামাজ শেষে প্রতিনিয়ত ও তাফহীমুল কুরআন থেকে পড়ে শোনাত। মসজিদের ইমাম সাহেবকে বলতো সত্য বলতে কখনো ভয় পাবেন না।
সোহান তার খাতায় লিখেছে।
'পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়,
মরণ একদিন মুছে দেবে,
আমার সকল রঙিন পরিচয়'
কিন্তু মৃত্যু সোহানের পরিচয় মুছে দিতে পারেনি বরং সোহান এখন আরও উজ্জ্বল আরও শক্তিশালী।
খাতায় লেখা প্রিয় কিছু গানের কলি
আমাকে শহীদ করে সেই মিছিলে শামিল করে নিও যে মিছিলের নেতা আমীর হামযা।। আর কত চাও শহীদ খোদা রক্তে রঞ্জিত ক্ষত বিক্ষত প্রিয় জনের মুখ যায় না চেনা জীবন প্রদীপ আজ নিভিয়ে দিলো গণধিকৃত বর্বর হায়েনা।এ চোখের এক ফোটা অশ্রু যদি তোমার কাছে হয় প্রিয়, শত ফোটা অশ্রু দিলাম মালিক আজ শুধু ক্ষমা করে দিও। শিউলির মত জানি রাতের শেষে সেজদা করিনি হায় আরব দেশে।
হে আমার খোদা কোথায় আছো তুমি আমাদের চেয়ে দেখ না, তোমারই পানে উঠিয়েছি হাত চাই যে তোমার করুণা।।
এক নজরে শহীদ মহিউদ্দিন সোহান
নাম: মহিউদ্দিন সোহান
জন্ম তারিখ: ১০-০৭-১৯৯৫
পিতা: মোঃ মহাসিন মিয়া
মাতা: মোছাঃ শাহানাজ পারভিন
ভাইবোন: তিন ভাই-বোনের মধ্যে বড়
পিতার পেশা: ব্যবসা
মাতার পেশা: গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: আম-ঈশ্বরবা, ওয়ার্ড-৭, পৌরসভা, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
বর্তমান ঠিকানা: ঐ
সর্বশেষ লেখাপড়া: এইচ.এস.সি ১ম বর্ষ, শহীদ নুর আলী কলেজ
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
সর্বশেষ দায়িত্ব: উপশাখা সভাপতি
পেশাগত লক্ষ্য: ইঞ্জিনিয়ার
শাহাদাতের স্থান: চুয়াডাঙ্গা জেলার খাড়াগুদা পুলিশ ফাঁড়ির ৫০০গজ উত্তরে
শাহাদাতের তারিখ: ২১-০৪-২০১৬
আঘাতের ধরন: বামচোখে গুলি যা পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে
যাদের আঘাতে শহীদ: পুলিশ
ব্যক্তিগত পরিচয়:
মহিউদ্দিন সোহান, ১৯৯৫ সালের ১০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষে পড়া মাতৃভক্ত এক মুজাহিদের নাম। হাস্যোজ্জ্বল, মিষ্টভাষী, খুব সহজেই নিজের ভেতরের কথাগুলো দ্বিধাহীনভাবে বলে দেওয়া লাজুক সুন্দর চরিত্রের ছেলেটি বাবা মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে আদরের বড় সন্তান। ছোট থেকে তাঁর বেড়ে ওঠা ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার ছায়াঢাকা ঈশ্বরবা গ্রামে। গ্রামের স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে দাখিল পাস করে।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
চিকিৎসা গ্রহণ শেষে ঢাকা থেকে আগত মায়ের জন্য কালীগঞ্জ পৌরসভার ঈশ্বরবা জামতলা নামক স্থানে অপেক্ষমান ছিল সোহান ও তার ছোট ভাই মাসুদ। এ সময় কালীগঞ্জ থেকে একটি ইজিবাইকে চারজন লোক এসে নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে সোহানকে তুলে নিয়ে যায়। উপস্থিত লোকেরা বাধা দিতে গেলে, তাদের অস্ত্র উঁচিয়ে ভয় দেখায়। অজ্ঞাত স্থান থেকে সোহানের লেখা একটি চিরকুট সোহানের মায়ের কাছে পৌঁছায়। তাতে লেখা ছিলো কলেজের স্যারদের জানাতে এবং এমপির সুপারিশ দিতে। এমপির সুপারিশ চাইতে গেলে তিনি প্রত্যাখান করেন। দীর্ঘ ১০ দিন গুম থাকার পর ২১ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে চুয়াডাঙ্গা জেলার খাড়াগুদা ফাঁড়ি থেকে ৫০০ গজ উত্তরে সোহানের গুলিবিদ্ধ দেহ পড়ে ছিল।
চিরকুট:
শুম থাকা অবস্থায় গোপনে চিরকুটের মাধ্যমে নিচের চিঠিটি পাঠিয়েছিলো সোহান।
"মা আমার সালাম নিবে। আমি চলে গেলাম, যদি কখনো বেঁচে থাকি তাহলে আবার দেখা হবে আর যদি না ফিরে আসি, তাহলে দেখা হবে জান্নাতের সিঁড়িতে মা। তুমি গর্ব করতে পারো কারণ এমন সন্তান খুব কম মায়ের পেটে জন্ম নেয় যে দ্বীনের জন্য নিজের জান কুরবান দেয়। আমি গেলাম, প্রভুর সান্নিধ্য পেতে। তুমি আমার জন্য দোয়া কর। আমি যেখানেই থাকি না কেন তোমাদের জন্য দোয়া করব। পারলে ক্ষমা করো মা। আমি জিহাদে গেছি, একথা কাউকে বলো না। তাহলে পরিবারের সমস্যা হবে।
আমার সালাম নেবে, ইতি সোহান।"
সামগ্রিক বিবরণ
চিকিৎসা গ্রহণ শেষে ঢাকা থেকে আগত মায়ের জন্য কালীগঞ্জ পৌরসভার ঈশ্বরবা জামতলা নামক স্থানে অপেক্ষমান ছিল সোহান ও তার ছোট ভাই মাসুদ। এ সময় কালীগঞ্জ থেকে একটি ইজিবাইকে চারজন লোক এসে নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে সোহানকে তুলে নিয়ে যায়। উপস্থিত লোকেরা বাধা দিতে গেলে, তাদের অস্ত্র উঁচিয়ে ভয় দেখায়। অজ্ঞাত স্থান থেকে সোহানের লেখা একটি চিরকুট সোহানের মায়ের কাছে পৌঁছায়। তাতে লেখা ছিলো কলেজের স্যারদের জানাতে এবং এমপির সুপারিশ দিতে। এমপির সুপারিশ চাইতে গেলে তিনি প্রত্যাখান করেন। দীর্ঘ ১০ দিন গুম থাকার পর ২১ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে চুয়াডাঙ্গা জেলার খাড়াগুদা ফাঁড়ি থেকে ৫০০ গজ উত্তরে সোহানের গুলিবিদ্ধ দেহ পড়ে ছিল। আপনজনদের কথা:
দেখতে দেখতে আমার সোহান কিভাবে যেন বড় হয়ে গেল। আমি ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। ওযে কেমন গুণে গুণান্বিত ছিলো তা তোমাদের বলে বুঝানো যাবে না। সমাজটাকে কিভাবে ভালো করা যায়। এই চিন্তাটাই সবসময় ওঁর মাথায় ঘুরপাক খেত। বিশেষ করে নামাজের দাওয়াতের ব্যাপারে ও খুব আগ্রহী ছিল। ছোট বড় সবাইকে নামাজের দাওয়াত দিত। কোন নামাজিকে মসজিদে না পেলে তার বাড়িতে চলে যেত। আমাদের পাড়ার সাইফুল কয়েক ওয়াক্ত মসজিদে যায় না। যথারীতি সোহান ওর বাড়িতে চলে যায়। দেখে সাইফুলের জ্বর, উঠতে পারছে না গরীব মানুষ ঔষধ কেনার টাকা নাই। সোহানের কাছে ২০০ টাকা ছিল। ও টাকাটা সাইফুলের স্ত্রীর কাছে দিয়ে ঔষধ কিনতে বলে। এরপর সাইফুল সুস্থ হয়ে গেলে টাকাটা সোহানকে ফেরত দিতে গেছে। সোহান টাকাটা ফেরত নেয়নি বরং সাইফুলকে বলেছে ভাই আপনার মত কোন অসহায় মানুষকে টাকাটা দিয়ে দিবেন।সোহান শাহাদাত বরণ করার পর সাইফুল কাঁদতে কাঁদতে এই ঘটনা আমাদেরকে বলেছে।
গ্রামের এক ব্যক্তি পাকা ধান কাটার জন্য কামলা পাচ্ছে না। এই দিকে ধানও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সোহান এটা শোনার পর ঐ ব্যক্তিকে বলেছে চাচা বাড়িতে যান আমি এটা দেখছি। ঐদিন রাতেই ওরা ৪-৫জন বন্ধুকে বলে রাজি করেছে। পরদিন সকাল ৮টার সময় ঐ ব্যক্তি তার ক্ষেতে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক। তার দেড় বিঘা জমির ধান কাটা শেষ।
একবার ঝড়ের দিনে এক আর্মি সদস্যের মাথায় গাছ পড়লে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। গাছটি ঐ আর্মি সদস্যের গায়ের উপরেই ছিল।
সোহান ঐ সময় বাড়িতে ফিরছিলো, লোকটার ঐ অবস্থা দেখে ও একাকী গাছ সরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক লোকটাকে কাঁধে করে গ্রাম্য ডাক্তার আরবের বাড়িতে নিয়ে যায়। এরপর প্রাথমিক সেবা শুশ্রুষা দেওয়ার পর লোকটার জ্ঞান ফেরে। রাস্তা থেকে ডাক্তার বাড়িতে আসার পর এই ঘটনা শুনে উনি সোহানের জন্য দোয়া করেছিলেন। রমজান মাসে সোহানের কোন ক্লান্তি থাকতো না। সাহরি খাওয়ার জন্য কোনদিনও ডাকা লাগেনি। পরপর তিনবার এতেকাফে ছিল। রমজানের আগে থেকেই ও রোজা রাখা শুরু করত।
একবার মসজিদে তাবলীগের কিছু লোকজন আসলো তাদের মধ্যে একজন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো। তাবলীগে আসা অন্যান্য সদস্যরা দাওয়াতী কাজে বা অন্যান্য কাজে ব্যস্ত। অসুস্থ ছেলেটার দিকে কারও খেয়াল নাই। সোহান নামাজে গিয়ে সেবা শুশ্রুষা করে ছেলেটাকে সুস্থ করে তুললো।
এক শীতে সোহানের খুব পছন্দীয় নতুন একটি সোয়েটার একটা ছেলেকে দিয়ে দিল। আমি রাগ করলে বলতো- আম্মা আমার তো আরও আছে। ওদের তো মোটেই নেই। ওর মামা অসুস্থ হয়ে যশোরের একটি হাসপাতালে ভর্তি হলো। হঠাৎ দেখি সোহান হাসপাতালে নাই। হাসপাতালের নিচে এসে দেখি একজন অসুস্থ ভিক্ষুক যার গায়ে পোকামাকড়-দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। সোহান ঐ ভিক্ষুককে পাউরুটি আর কলা হাতে তুলে খাওয়াচ্ছে আর কাঁদছে। সোহানের হাতের খাবার খেয়ে ঐ ভিক্ষুক মহিলাটি মারা যায়। মৃত্যুর একদিন আগে মাসুদ (সোহানের একমাত্র ছোটভাই) এশার নামাজের সময় ঘুমিয়ে পড়েছে। মাসুদ তখন অনেক ছোট।
সোহান ওকে ডেকে তুলতে না পেরে ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে করে মসজিদে নিয়ে গেল। আমি এবং ওর দাদি সোহানকে বকা দিলাম।
কিন্তু সোহান কিছুই কানে তুললো না। নামাজ শেষে মাসুদকে বোঝালো ভাইয়া কখনও নামাজ ছাড়ব না। তাঁর পরের দিনই আমার মানিকটা হারিয়ে গেল।
মসজিদে নামাজ শেষে প্রতিনিয়ত ও তাফহীমুল কুরআন থেকে পড়ে শোনাত। মসজিদের ইমাম সাহেবকে বলতো সত্য বলতে কখনো ভয় পাবেন না।
সোহান তার খাতায় লিখেছে।
'পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়,
মরণ একদিন মুছে দেবে,
আমার সকল রঙিন পরিচয়'
কিন্তু মৃত্যু সোহানের পরিচয় মুছে দিতে পারেনি বরং সোহান এখন আরও উজ্জ্বল আরও শক্তিশালী।
খাতায় লেখা প্রিয় কিছু গানের কলি
আমাকে শহীদ করে সেই মিছিলে শামিল করে নিও যে মিছিলের নেতা আমীর হামযা।। আর কত চাও শহীদ খোদা রক্তে রঞ্জিত ক্ষত বিক্ষত প্রিয় জনের মুখ যায় না চেনা জীবন প্রদীপ আজ নিভিয়ে দিলো গণধিকৃত বর্বর হায়েনা।এ চোখের এক ফোটা অশ্রু যদি তোমার কাছে হয় প্রিয়, শত ফোটা অশ্রু দিলাম মালিক আজ শুধু ক্ষমা করে দিও। শিউলির মত জানি রাতের শেষে সেজদা করিনি হায় আরব দেশে।
হে আমার খোদা কোথায় আছো তুমি আমাদের চেয়ে দেখ না, তোমারই পানে উঠিয়েছি হাত চাই যে তোমার করুণা।।
এক নজরে শহীদ মহিউদ্দিন সোহান
নাম: মহিউদ্দিন সোহান
জন্ম তারিখ: ১০-০৭-১৯৯৫
পিতা: মোঃ মহাসিন মিয়া
মাতা: মোছাঃ শাহানাজ পারভিন
ভাইবোন: তিন ভাই-বোনের মধ্যে বড়
পিতার পেশা: ব্যবসা
মাতার পেশা: গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: আম-ঈশ্বরবা, ওয়ার্ড-৭, পৌরসভা, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
বর্তমান ঠিকানা: ঐ
সর্বশেষ লেখাপড়া: এইচ.এস.সি ১ম বর্ষ, শহীদ নুর আলী কলেজ
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
সর্বশেষ দায়িত্ব: উপশাখা সভাপতি
পেশাগত লক্ষ্য: ইঞ্জিনিয়ার
শাহাদাতের স্থান: চুয়াডাঙ্গা জেলার খাড়াগুদা পুলিশ ফাঁড়ির ৫০০গজ উত্তরে
শাহাদাতের তারিখ: ২১-০৪-২০১৬
আঘাতের ধরন: বামচোখে গুলি যা পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে
যাদের আঘাতে শহীদ: পুলিশ