শহীদ মো: সাঈদ রুবেল
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গড়েয়ার তৌহিদি জনতার পাশাপাশি হাজার হাজার সাধারণ জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ মিছিলে যোগদান করেন। মিছিল শুরু হলে পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে মিছিলে হামলা করে। তারা মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে মো: সাঈদ রুবেল গুলিতে লুটিয়ে পড়েন এবং তার পিঠের পেছনে গুলি লেগে পেটের ডান পার্শ্ব দিয়ে বের হয়ে যায়। তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। ১ মার্চ বাদ আসর বিকেল ৫টায় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আবু সাঈদ। জানাযায় প্রায় ২০-২৫ হাজার লোক উপস্থিত হয়।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র রুবেলের পড়ার টেবিলটা তার জন্যের আগেই বাবা কবিরাজ হাট থেকে কিনেছিলেন। ১৪ বছর পরে সে টেবিলের দুটি পায়া ভেঙ্গে গেছে। অনেক যত্নে দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে তা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। ঘরে আর কোন আসবাবের বাহুল্য না থাকায় মায়ের পানের বাটা-চুনের কৌটাটাও টেবিলের এক কোণে ঠাঁই পেয়েছে। হাঁড়ি পাতিলের নিরাপদ আশ্রয় তার টেবিলের নিচেই। ছালার বস্তা দিয়ে চেয়ার বানিয়ে এই টেবিলের এক কোনায় পড়ালেখা করতো সাইদ রুবেল। অবশ্য টেবিলের সামনেই বাঁশের বেড়ায় আটকানো একটি ওয়ালমেট তার ঘরকে যেন আলোকিত করে রাখতো তাতে লেখা 'মা-বাবার দোয়া'। বাবা-মার করুণ কান্নার সুর যেন শেষ হয় না, 'তোর জন্য আমরা কি দোয়া করিছিলাম রে বাপ?"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: সাঈদ রুবেল ঠাকুরগাঁও জেলা সদরের চোঙ্গাখাতা গ্রামে ২০০০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতা রুহুল আমীন ও মাতা দেলোয়ারা বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট এবং একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন। বিশাল এই পৃথিবীতে তাদের এক চিলতে জমিও নেই। প্রতিবেশী শহীদুল ইসলাম দয়াপরবশ হয়ে আপাতত একটু থাকার জায়গা দিয়েছেন। সেখানেই গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তুলেছেন টিনের চালা আর বাঁশের বেড়ার দুটি ছাপরাঘর। পিতা তালাচাবি মেরামত ও দিনমুজরি করে দিনে যা ৫০/১০০ টাকা উপার্জন করেন তাই দিয়েই একান্ত কষ্টে সংসার চালান। তাই দরিদ্র পিতা-মাতা পারেননি পড়ালেখার ভাল কোন ব্যবস্থা করতে। বহুকষ্টে বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর গড়েয়া ফাজিল মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেধাবী ছাত্র একমাত্র ছেলে সন্তান মো: সাঈদ রুবেলকে নিয়ে ভবিষ্যৎ স্বপ্নের জাল বুনছিলেন। কিন্তু ঘাতকের বুলেটের আঘাতে মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় পিতা-মাতার সে স্বপ্ন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গড়েয়ার তৌহিদি জনতার পাশাপাশি হাজার হাজার সাধারণ জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ মিছিলে যোগদান করেন। মিছিল শুরু হলে পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে মিছিলে হামলা করে। তারা মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে মো: সাঈদ রুবেল গুলিতে লুটিয়ে পড়েন এবং তার পিঠের পেছনে গুলি লেগে পেটের ডান পার্শ্ব দিয়ে বের হয়ে যায়। তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। ১ মার্চ বাদ আসর বিকেল ৫টায় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আবু সাঈদ। জানাযায় প্রায় ২০-২৫ হাজার লোক উপস্থিত হয়।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে নয়া গড়েয়া হাটে ঠাকুরগাঁও উপজেলার জনসাধারণ বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এদিকে গড়েয়া ইউনিয়নের স্থানীয় ওয়ার্ড আওযামী লীগ সভাপতি আশরাফুল আলম মানিক ও তার ছোট ভাই যুবলীগ নেতা যাদু মিয়া, পিতা: মৃত তাজিম উদ্দীন, থানা পুলিশকে খবর দেয় যে, এলাকার জনসাধারণ হিন্দুদের বাসা-বাড়িতে, দোকান-ঘর ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করছে। এরূপ মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনতার ওপর এলোপাতাড়ি রাবার বুলেট ও গুলি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে পুলিশ বিজিবিকে খবর দেয়। পরবর্তীতে বিজিবি ও পুলিশের যৌথ গুলিতে মারা যায়:
১. তাৎক্ষণিক ৪ জন
২. ০৪.০৩.২০১৩ তারিখে ১ জন এবং
৩. ১৪.০৩.২০১৩ তারিখে আরো ১ জন
জাতীয় সংবাদমাধমে এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রতিবেদন আসে; যেমন, দৈনিক আমার দেশ ১ মার্চ, ২০১৩
লিখে, ঠাকুরগাঁওয়ে নিহত ৭ ফাঁসির রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুরগাঁওয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালালে ৭ জন নিহত হয়েছেন। এতে মহিলাসহ গুলিবিদ্ধ হয় অন্তত ২০ জন। এছাড়াও আরও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই এলাকায় কয়েক হাজার সাঈদীভক্ত জড়ো হতে থাকেন। রায় ঘোষণার পর পরই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা গড়েয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা ব্যাপক বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে জনগণ আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ঘটনাস্থলে বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতার ওপর পুলিশ ও বিজিবি ব্রাশফায়ার শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই নিরঞ্জন (২০) রুবেল (১৮), দায়মুল (২১), সুমন (২০), ফিরোজ (১৯) নামে ৪ জন নিহত হয়। মনির (১৮) নামের অপর একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। সংঘর্ষে এ সময় মহিলাসহ আরও প্রায় ২৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়, আহত হয় আরও অর্ধশতাধিক। আহতদের অনেককেই ঠাকুরগাঁওসহ রংপুর ও দিনাজপুর মেডিক্যালে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে দুলাল ইসলামের (২০) অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের সার্জারি চিকিৎসক সুপেন্দ্রনাথ রায়। প্রায় ২ ঘন্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ ও বিজিবি পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে এলাকার বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা নিহতদের লাশ ও আহতদের উদ্ধার করে গ্রামবাসী। পুলিশের গুলিতে মহিলাসহ বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীও গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে। হঠাৎ এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতদের বাড়ি বাড়ি নেমে আসে কান্নার রোল।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩ জানাজার নামাজ নিয়ে একটি রিপোর্ট ছাপে। যার শিরোনাম ছিল, 'ঠাকুরগাঁওয়ে নিহতদের জানাজায় জনতার ঢল'
ঠাকুরগাঁও: গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদদের জানাজায় মানুষের ঢল
মাওলানা সাঈদীকে ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে ঠাকুরগাঁওয়ে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে নিহতদের জানাজা নামাজে জনতার ঢল নামে। গত শুক্রবার বিকেলে নিহতদের ময়না তদন্ত শেষে লাশ এলাকায় পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিকেল ৫ টায় গড়েয়া কেন্দ্রীয় ঈদগা ময়দানে এক এক করে নিহতদের লাশ জানাজার জন্য আনা হয়। কিন্তু জনতা বাড়তে থাকলে সেখানে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে। সেখানে হাজার হাজার মুসল্লির অংশগ্রহণে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ৪. 'মা বাবার দোয়া'
তের বছরের সাঈদ রুবেল কেবল যোহরের নামাজ শেষ করেছে। মা একান্ত আদরের একমাত্র ছেলেটির জন্য ভাত বাড়ছেন। বাহিরে মিছিল আর শ্লোগানের ধ্বনি শোনা গেল, 'আম্মা এসে দুজনে একত্রে খাব' বলে ছুটে গেল ছেলেটি। বাবা দিনমজুর হিসেবে ভুট্টাক্ষেতে কাজ করছেন। তিনি এসেই গরুটাকে গোছল দিয়েছেন। মা ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'বাবুটা ঐদিক গেছে ডেকে নিয়ে এসো।' কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। স্থানীয় গফুর ডাক্তারের কাছে নেওয়া হয়েছিল। একটু পানি খাওয়ার চেষ্টা করেছিল; তারপর সবশেষ।
স্থানীয় মুরুব্বি আব্দুল মজিদ সাক্ষ্য দিলেন, ছেলেটির ভাষা খুবই মার্জিত ছিল। আর কেমন করে ওর ব্যবহার দ্বারা সবার মনে স্থান করে নিত। চাচা বলেন, ছেলেটি নিজেও নামাজে যেত আর সবাইকে ডাকাডাকি করতো। বাবার পেছন পেছন মাঠে কাজ করতো।
সপ্তম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র রুবেলের পড়ার টেবিলটা তার জন্মের আগেই বাবা কবিরাজ হাট থেকে। কিনেছিলেন। ১৪ বছর পরে সে টেবিলের দুটি পায়া ভেঙে গেছে। অনেক যত্নে দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে তা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। ঘরে আর কোন আসবাবের বাহুল্য না থাকায় মায়ের পানের বাটা-চুনের কৌটাটাও টেবিলের এক কোনো ঠাঁই পেয়েছে। হাঁড়ি পাতিলের নিরাপদ আশ্রয় তার টেবিলের নিচেই। ছালার বস্তা দিয়ে চেয়ার বানিয়ে এই টেবিলের এক কোনায় পড়ালেখা করতো সাইদ রুবেল। অবশ্য টেবিলের সামনেই বাঁশের বেড়ায় আটকানো একটি ওয়ালমেট তার ঘরকে যেন আলোকিত করে রাখতো তাতে লেখা 'মা-বাবার দোয়া'। বাবা-মার করুণ কান্নার সুর যেন শেষ হয় না, 'তোর জন্য আমরা কি দোয়া করিছিলাম রে বাপ?
৪. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
বাঁশের বেড়া ও টিনের চাল দিয়ে তৈরি দু'টি ছাপরাঘর। নিজেদের বসতবাড়ি নেই, অন্যের জমিতে ছাপরাঘর করে বসবাস করে। পৈত্বিকবাস এমনকি নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই। পিতা দিনমজুরি করে (তালাচাবি বানায়) দিন আনে দিন খায়। টিউবওয়েল ও টয়লেট নেই।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ সাঈদ রুবেল। মাদ্রাসায় ৭ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত ছিলেন।
ইসলমী ছাত্রশিবিরের সমর্থক ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ০৫ জানুয়ারি ২০০০। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি'১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি '১৩, স্থান: নয়া গড়েয়া হাট। দাফন করা হয় ঈদগাঁ সংলগ্ন কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: চোঙ্গাখাতা, ডাকঘর: নয়া গড়েয়া ইউনিয়ন: ১৩ নং গড়েয়া, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও।
পিতা: মোঃ রুহুল ইসলাম। বয়স: ৫০ বছর, পেশা: দিনমজুর
মাতা: দেলোয়ারা বেগম বয়স ৪০ বছর, গৃহিণী।
ভাই- বোনের বিবরণ: মোছা: নিলুফা ইয়াসমিন, বিবাহিতা, গৃহিণী, বয়স-২৪, মোছা: আক্তার বানু, বিবাহিতা, গৃহিণী, বয়স-২১, শহীদ মো: সাঈদ রুবেল।
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: সাঈদ রুবেল ঠাকুরগাঁও জেলা সদরের চোঙ্গাখাতা গ্রামে ২০০০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতা রুহুল আমীন ও মাতা দেলোয়ারা বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট এবং একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন। বিশাল এই পৃথিবীতে তাদের এক চিলতে জমিও নেই। প্রতিবেশী শহীদুল ইসলাম দয়াপরবশ হয়ে আপাতত একটু থাকার জায়গা দিয়েছেন। সেখানেই গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তুলেছেন টিনের চালা আর বাঁশের বেড়ার দুটি ছাপরাঘর। পিতা তালাচাবি মেরামত ও দিনমুজরি করে দিনে যা ৫০/১০০ টাকা উপার্জন করেন তাই দিয়েই একান্ত কষ্টে সংসার চালান। তাই দরিদ্র পিতা-মাতা পারেননি পড়ালেখার ভাল কোন ব্যবস্থা করতে। বহুকষ্টে বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর গড়েয়া ফাজিল মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেধাবী ছাত্র একমাত্র ছেলে সন্তান মো: সাঈদ রুবেলকে নিয়ে ভবিষ্যৎ স্বপ্নের জাল বুনছিলেন। কিন্তু ঘাতকের বুলেটের আঘাতে মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় পিতা-মাতার সে স্বপ্ন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গড়েয়ার তৌহিদি জনতার পাশাপাশি হাজার হাজার সাধারণ জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ মিছিলে যোগদান করেন। মিছিল শুরু হলে পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে মিছিলে হামলা করে। তারা মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে মো: সাঈদ রুবেল গুলিতে লুটিয়ে পড়েন এবং তার পিঠের পেছনে গুলি লেগে পেটের ডান পার্শ্ব দিয়ে বের হয়ে যায়। তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। ১ মার্চ বাদ আসর বিকেল ৫টায় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আবু সাঈদ। জানাযায় প্রায় ২০-২৫ হাজার লোক উপস্থিত হয়।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে নয়া গড়েয়া হাটে ঠাকুরগাঁও উপজেলার জনসাধারণ বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এদিকে গড়েয়া ইউনিয়নের স্থানীয় ওয়ার্ড আওযামী লীগ সভাপতি আশরাফুল আলম মানিক ও তার ছোট ভাই যুবলীগ নেতা যাদু মিয়া, পিতা: মৃত তাজিম উদ্দীন, থানা পুলিশকে খবর দেয় যে, এলাকার জনসাধারণ হিন্দুদের বাসা-বাড়িতে, দোকান-ঘর ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করছে। এরূপ মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনতার ওপর এলোপাতাড়ি রাবার বুলেট ও গুলি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে পুলিশ বিজিবিকে খবর দেয়। পরবর্তীতে বিজিবি ও পুলিশের যৌথ গুলিতে মারা যায়:
১. তাৎক্ষণিক ৪ জন
২. ০৪.০৩.২০১৩ তারিখে ১ জন এবং
৩. ১৪.০৩.২০১৩ তারিখে আরো ১ জন
জাতীয় সংবাদমাধমে এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রতিবেদন আসে; যেমন, দৈনিক আমার দেশ ১ মার্চ, ২০১৩
লিখে, ঠাকুরগাঁওয়ে নিহত ৭ ফাঁসির রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুরগাঁওয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালালে ৭ জন নিহত হয়েছেন। এতে মহিলাসহ গুলিবিদ্ধ হয় অন্তত ২০ জন। এছাড়াও আরও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই এলাকায় কয়েক হাজার সাঈদীভক্ত জড়ো হতে থাকেন। রায় ঘোষণার পর পরই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা গড়েয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা ব্যাপক বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে জনগণ আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ঘটনাস্থলে বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতার ওপর পুলিশ ও বিজিবি ব্রাশফায়ার শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই নিরঞ্জন (২০) রুবেল (১৮), দায়মুল (২১), সুমন (২০), ফিরোজ (১৯) নামে ৪ জন নিহত হয়। মনির (১৮) নামের অপর একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। সংঘর্ষে এ সময় মহিলাসহ আরও প্রায় ২৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়, আহত হয় আরও অর্ধশতাধিক। আহতদের অনেককেই ঠাকুরগাঁওসহ রংপুর ও দিনাজপুর মেডিক্যালে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে দুলাল ইসলামের (২০) অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের সার্জারি চিকিৎসক সুপেন্দ্রনাথ রায়। প্রায় ২ ঘন্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ ও বিজিবি পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে এলাকার বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা নিহতদের লাশ ও আহতদের উদ্ধার করে গ্রামবাসী। পুলিশের গুলিতে মহিলাসহ বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীও গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে। হঠাৎ এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতদের বাড়ি বাড়ি নেমে আসে কান্নার রোল।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩ জানাজার নামাজ নিয়ে একটি রিপোর্ট ছাপে। যার শিরোনাম ছিল, 'ঠাকুরগাঁওয়ে নিহতদের জানাজায় জনতার ঢল'
ঠাকুরগাঁও: গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদদের জানাজায় মানুষের ঢল
মাওলানা সাঈদীকে ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে ঠাকুরগাঁওয়ে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে নিহতদের জানাজা নামাজে জনতার ঢল নামে। গত শুক্রবার বিকেলে নিহতদের ময়না তদন্ত শেষে লাশ এলাকায় পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিকেল ৫ টায় গড়েয়া কেন্দ্রীয় ঈদগা ময়দানে এক এক করে নিহতদের লাশ জানাজার জন্য আনা হয়। কিন্তু জনতা বাড়তে থাকলে সেখানে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে। সেখানে হাজার হাজার মুসল্লির অংশগ্রহণে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ৪. 'মা বাবার দোয়া'
তের বছরের সাঈদ রুবেল কেবল যোহরের নামাজ শেষ করেছে। মা একান্ত আদরের একমাত্র ছেলেটির জন্য ভাত বাড়ছেন। বাহিরে মিছিল আর শ্লোগানের ধ্বনি শোনা গেল, 'আম্মা এসে দুজনে একত্রে খাব' বলে ছুটে গেল ছেলেটি। বাবা দিনমজুর হিসেবে ভুট্টাক্ষেতে কাজ করছেন। তিনি এসেই গরুটাকে গোছল দিয়েছেন। মা ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'বাবুটা ঐদিক গেছে ডেকে নিয়ে এসো।' কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। স্থানীয় গফুর ডাক্তারের কাছে নেওয়া হয়েছিল। একটু পানি খাওয়ার চেষ্টা করেছিল; তারপর সবশেষ।
স্থানীয় মুরুব্বি আব্দুল মজিদ সাক্ষ্য দিলেন, ছেলেটির ভাষা খুবই মার্জিত ছিল। আর কেমন করে ওর ব্যবহার দ্বারা সবার মনে স্থান করে নিত। চাচা বলেন, ছেলেটি নিজেও নামাজে যেত আর সবাইকে ডাকাডাকি করতো। বাবার পেছন পেছন মাঠে কাজ করতো।
সপ্তম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র রুবেলের পড়ার টেবিলটা তার জন্মের আগেই বাবা কবিরাজ হাট থেকে। কিনেছিলেন। ১৪ বছর পরে সে টেবিলের দুটি পায়া ভেঙে গেছে। অনেক যত্নে দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে তা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। ঘরে আর কোন আসবাবের বাহুল্য না থাকায় মায়ের পানের বাটা-চুনের কৌটাটাও টেবিলের এক কোনো ঠাঁই পেয়েছে। হাঁড়ি পাতিলের নিরাপদ আশ্রয় তার টেবিলের নিচেই। ছালার বস্তা দিয়ে চেয়ার বানিয়ে এই টেবিলের এক কোনায় পড়ালেখা করতো সাইদ রুবেল। অবশ্য টেবিলের সামনেই বাঁশের বেড়ায় আটকানো একটি ওয়ালমেট তার ঘরকে যেন আলোকিত করে রাখতো তাতে লেখা 'মা-বাবার দোয়া'। বাবা-মার করুণ কান্নার সুর যেন শেষ হয় না, 'তোর জন্য আমরা কি দোয়া করিছিলাম রে বাপ?
৪. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
বাঁশের বেড়া ও টিনের চাল দিয়ে তৈরি দু'টি ছাপরাঘর। নিজেদের বসতবাড়ি নেই, অন্যের জমিতে ছাপরাঘর করে বসবাস করে। পৈত্বিকবাস এমনকি নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই। পিতা দিনমজুরি করে (তালাচাবি বানায়) দিন আনে দিন খায়। টিউবওয়েল ও টয়লেট নেই।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ সাঈদ রুবেল। মাদ্রাসায় ৭ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত ছিলেন।
ইসলমী ছাত্রশিবিরের সমর্থক ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ০৫ জানুয়ারি ২০০০। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি'১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি '১৩, স্থান: নয়া গড়েয়া হাট। দাফন করা হয় ঈদগাঁ সংলগ্ন কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: চোঙ্গাখাতা, ডাকঘর: নয়া গড়েয়া ইউনিয়ন: ১৩ নং গড়েয়া, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও।
পিতা: মোঃ রুহুল ইসলাম। বয়স: ৫০ বছর, পেশা: দিনমজুর
মাতা: দেলোয়ারা বেগম বয়স ৪০ বছর, গৃহিণী।
ভাই- বোনের বিবরণ: মোছা: নিলুফা ইয়াসমিন, বিবাহিতা, গৃহিণী, বয়স-২৪, মোছা: আক্তার বানু, বিবাহিতা, গৃহিণী, বয়স-২১, শহীদ মো: সাঈদ রুবেল।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍