শহীদ মো: দুলাল ইসলাম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গড়েয়ার হাজার হাজার তৌহিদি জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মিছিল শুরু হলে পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে মিছিলে হামলা করে। তারা মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। মো: দুলাল ইসলাম হাতে ও পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হয় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আহত হওয়ায় পুলিশ তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ। হাসপাতালে নিয়ে যায়। অভিভাবকেরা হাসপাতাল থেকে তাকে প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই ১৪ মার্চ ২০১৩ ইং তারিখে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন দুলাল।
৪ মার্চ বাদ আসর বিকেল ৫ টায় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আবু সাঈদ। জানাযায় প্রায় ৫ হাজার লোক উপস্থিত হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গড়েয়ার হাজার হাজার তৌহিদি জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মিছিল শুরু হলে পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে মিছিলে হামলা করে। তারা মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। মো: দুলাল ইসলাম হাতে ও পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হয় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আহত হওয়ায় পুলিশ তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ। হাসপাতালে নিয়ে যায়। অভিভাবকেরা হাসপাতাল থেকে তাকে প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই ১৪ মার্চ ২০১৩ ইং তারিখে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন দুলাল।
৪ মার্চ বাদ আসর বিকেল ৫ টায় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আবু সাঈদ। জানাযায় প্রায় ৫ হাজার লোক উপস্থিত হয়।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"তার ক্ষতস্থান নানীর শাড়ি ছিড়ে বাঁধা হলো।... জ্ঞান আসে যায় এ অবস্থায় বারবার চোখ মেললেই শুধু বলে মা, 'মাই (আঞ্চলিক ভাষায় নিজের মেয়ে) কেমন আছে? ...মায়ের দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে থেকেই তার স্নেহের দুলাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: দুলাল ইসলাম ঠাকুরগাঁও জেলা সদরের চোঙ্গাখাতা গ্রামে ১৯৮৭ ইং সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতা রফিকুল ইসলাম ও মাতা রহিমা বেগমের চার ছেলে সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তান। দরিদ্র পরিবারের কারণে পড়ালেখার ভাল কোন ব্যবস্থা হয়নি। বড় হবার পর ক্ষেতে-খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। বিয়ে করেন মাত্র বছর দুয়েক আগে। শুরু করেন ভবিষ্যতের স্বপ্নের জাল বুনতে। মাত্র তিন মাস আগে তার একটি সুন্দর ফুটফুটে সন্তান সিনহাউদ্দৌলা জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু পুলিশ-বিজিবির বুলেটের আঘাতে মুহুর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় তার সে স্বপ্ন। সকলের মায়ার জাল ছিন্ন করে, সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে স্লোগানরত অবস্থায় মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে শহীদ মো: দুলাল ইসলাম পাড়ি জমান ওপারে।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গড়েয়ার হাজার হাজার তৌহিদি জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মিছিল শুরু হলে পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে মিছিলে হামলা করে। তারা মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। মো: দুলাল ইসলাম হাতে ও পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হয় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আহত হওয়ায় পুলিশ তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ। হাসপাতালে নিয়ে যায়। অভিভাবকেরা হাসপাতাল থেকে তাকে প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই ১৪ মার্চ ২০১৩ ইং তারিখে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন দুলাল।
৪ মার্চ বাদ আসর বিকেল ৫ টায় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আবু সাঈদ। জানাযায় প্রায় ৫ হাজার লোক উপস্থিত হয়।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে নয়া গড়েয়া হাটে ঠাকুরগাঁও উপজেলার জনসাধারণ বিক্ষোভ মিছিল বের করে।এদিকে গড়েয়া ইউনিয়নের স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি আশরাফুল আলম মানিক ও তার ছোট ভাই যুবলীগ নেতা যাদু মিয়া, পিতা: মৃত তাজিম উদ্দীন থানা পুলিশকে খবর দেয় যে, এলাকার জনসাধারণ হিন্দুদের বাসা-বাড়িতে, দোকান-ঘর ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করছে। এরূপ মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনতার ওপর এলোপাতাড়ি রাবার বুলেট ও গুলি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে পুলিশ বিজিবিকে খবর দেয়। পরবর্তীতে বিজিবি ও পুলিশের যৌথ গুলিতে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ জন, ১ ঘণ্টা পরে ১ জন, ০৪.০৩.২০১৩ তারিখে ১ জন এবং ১৪.০৩.২০১৩ তারিখে আরো ১ জন মারা যায়।
জাতীয় সংবাদমাধমে এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রতিবেদন আসে; যেমন, দৈনিক আমায় দেশ ১ মার্চ, ২০১৩ লিখে: ঠাকুরগাঁওয়ে নিহত ৭ ফাঁসির রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুরগাঁওয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালালে ৭ জন নিহত হয়েছেন। এতে মহিলাসহ গুলিবিদ্ধ হয় অন্তত ২০ জন। এছাড়াও আরও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই এলাকায় কয়েক হাজার সাঈদীভক্ত জড়ো হতে থাকেন। রায় ঘোষণার পর পরই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা গড়েয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা ব্যাপক বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে জনগণ আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ঘটনাস্থলে বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতার ওপর পুলিশ ও বিজিবি ব্রাশফায়ার শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই নিরঞ্জন (২০), রুবেল (১৮), দায়মুল (২১), সুমন (২০), ফিরোজ (১৯) নামে ৪ জন নিহত হয়। মনির (১৮) নামের অপর একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। সংঘর্ষে এ সময় মহিলাসহ আরও প্রায় ২৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়, আহত হয় আরও অর্ধশতাধিক। আহতদের অনেককেই ঠাকুরগাঁওসহ রংপুর ও দিনাজপুর মেডিক্যালে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে দুলাল ইসলামের (২০) অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের সার্জারি চিকিৎসক সুপেন্দ্রনাথ রায়। প্রায় ২ ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ ও বিজিবি পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে এলাকার বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা নিহতদের লাশ ও আহতদের উদ্ধার করে গ্রামবাসী। পুলিশের গুলিতে মহিলাসহ বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীও গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে। হঠাৎ এতগুলো তাজা প্রাণ বারে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতদের বাড়ি বাড়ি নেমে আসে কান্নার রোল।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩ জানাজার নামাজ নিয়ে একটি রিপোর্ট ছাপে। যার শিরোনাম
'ঠাকুরগাঁওয়ে নিহতদের জানাজায় জনতার ঢল'
ঠাকুরগাঁও: গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদদের জানাজায় মানুষের ঢল
মাওলানা সাঈদীকে ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে ঠাকুরগাঁওয়ে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে নিহতদের জানাজা নামাজে জনতার ঢল নামে। গত শুক্রবার বিকেলে নিহতদের ময়না তদন্ত শেষে লাশ এলাকায় পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিকেল ৫ টায় গড়েয়া কেন্দ্রীয় ঈদগা ময়দানে এক এক করে নিহতদের লাশ জানাজার জন্য আনা হয়। কিন্তু জনতা বাড়তে থাকলে সেখানে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে। সেখানে হাজার হাজার মুসল্লির অংশগ্রহণে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ৪. মাই কেমন আছে?
শহীদ দুলাল পিতার সাথে বর্গা চাষাবাদের কাজ করতেন। ঐদিন তারা বিছন উঠানোর কাজ করেছেন। কাজের লোকদের ভাত খাওয়ানোর জন্য বাড়ি এসেছিলেন। সাঈদী সাহেবের রায় নিয়ে মিছিলের আয়োজন দেখে সেখানেই চলে যান। তারপর গুলি। তার ক্ষতস্থান নানীর শাড়ি ছিঁড়ে বাঁধা হলো। হসপিটালে নিয়ে অক্সিজেন লাগানো হলো। জ্ঞান আসে-যায় এ অবস্থায় বারবার চোখ মেললেই শুধু বলেন মা, 'মাই (আঞ্চলিক ভাষায় আমার মেয়ে) কেমন আছে? আমার ভাইয়েরা কেমন আছে? তিনি মনে করেছিলেন ওরা মারা গেছে। ১৪ মার্চ ফজরের আজানের সময় মায়ের আঁচল দিয়ে মুখ মোছেন। কথা বলতে বলতেই নাক মুখ দিয়ে বলকিয়ে রক্ত বের হয়ে এলো। ডাক্তাররা দ্রুত অক্সিজেন-এর সংযোগ দিতে পারলেন না। মায়ের দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে থেকেই তার স্নেহের দুলাল শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
কিন্তু নববধূ হালিমা খাতুন ভবিষ্যৎ নিয়ে যে স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন তার কী হবে? কিছুদিন পর অবুঝ শিশু সিনহা যখন তার বাবাকে খুঁজে বেড়াবে, যখন পিতার আদর-ভালবাসা পেতে চাইবে, যখন প্রশ্ন করবে আমার বাবা কোথায়? কী হয়েছে আমার বাবার? কোন অপরাধে আমার বাবাকে খুন করা হলো? তখন কী জবাব দেবে এ অবুঝ শিশুর প্রশ্নের?
স্ত্রী স্বপ্নে দেখছে, 'সওয়াল জওয়াব দিছে-সাথে দায়মূল, দুলাল সাদা ধবধবে কাপড় পরা। ডাকাডাকি করলে বলে, কোনদিনই বাড়িতে যাব না।
৪. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
১টি আধা পাকা টিনের ঘর, ১টি টিনের ঘর ও ১টি রান্নাঘর। নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ দুলাল ইসলাম (০১৩)। পেশা: মাধ্যমিক অসমাপ্ত, দিনমজুর।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ২৫ জুন ১৯৮৭। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি'১৩।
শাহাদাতের তারিখ:১৪ মার্চ ২০১৩, স্থান: রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। দাফন করা হয়। ঈদগা সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: চোঙ্গাখাতা, ডাকঘর: নয়া গড়েয়া হাট, ইউনিয়ন: ১৩ নং গড়েয়া, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও, জেলা: ঠাকুরগাঁও।
পিতা: মোঃ রফিকুল ইসলাম, বয়স: ৫০ বছর, পেশা: কৃষি।
মাতা: মোছা: রহিমা বেগম, বয়স: ৩৮ বছর, গৃহিণী।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: হালিমা খাতুন, বয়স ২৫, গৃহিণী। মোছা: সিনহাউদ্দৌলা, ৩ মাস বয়সের ১টি মেয়ে শিশু।
ভাই-বোনের বিবরণ: শহীদ মো: দুলাল ইসলাম, মোঃ আলাল হোসেন, শ্রমিক, মোঃ হেলাল ইসলাম, ৯ম শ্রেণি, গড়েয়া উচ্চবিদ্যালয়, মোঃ আব্দুর রহিম, ৮ম শ্রেণি, গড়েয়া উচ্চবিদ্যালয়।
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: দুলাল ইসলাম ঠাকুরগাঁও জেলা সদরের চোঙ্গাখাতা গ্রামে ১৯৮৭ ইং সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতা রফিকুল ইসলাম ও মাতা রহিমা বেগমের চার ছেলে সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তান। দরিদ্র পরিবারের কারণে পড়ালেখার ভাল কোন ব্যবস্থা হয়নি। বড় হবার পর ক্ষেতে-খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। বিয়ে করেন মাত্র বছর দুয়েক আগে। শুরু করেন ভবিষ্যতের স্বপ্নের জাল বুনতে। মাত্র তিন মাস আগে তার একটি সুন্দর ফুটফুটে সন্তান সিনহাউদ্দৌলা জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু পুলিশ-বিজিবির বুলেটের আঘাতে মুহুর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় তার সে স্বপ্ন। সকলের মায়ার জাল ছিন্ন করে, সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে স্লোগানরত অবস্থায় মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে শহীদ মো: দুলাল ইসলাম পাড়ি জমান ওপারে।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গড়েয়ার হাজার হাজার তৌহিদি জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মিছিল শুরু হলে পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে মিছিলে হামলা করে। তারা মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। মো: দুলাল ইসলাম হাতে ও পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হয় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আহত হওয়ায় পুলিশ তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ। হাসপাতালে নিয়ে যায়। অভিভাবকেরা হাসপাতাল থেকে তাকে প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই ১৪ মার্চ ২০১৩ ইং তারিখে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন দুলাল।
৪ মার্চ বাদ আসর বিকেল ৫ টায় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আবু সাঈদ। জানাযায় প্রায় ৫ হাজার লোক উপস্থিত হয়।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে নয়া গড়েয়া হাটে ঠাকুরগাঁও উপজেলার জনসাধারণ বিক্ষোভ মিছিল বের করে।এদিকে গড়েয়া ইউনিয়নের স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি আশরাফুল আলম মানিক ও তার ছোট ভাই যুবলীগ নেতা যাদু মিয়া, পিতা: মৃত তাজিম উদ্দীন থানা পুলিশকে খবর দেয় যে, এলাকার জনসাধারণ হিন্দুদের বাসা-বাড়িতে, দোকান-ঘর ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করছে। এরূপ মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনতার ওপর এলোপাতাড়ি রাবার বুলেট ও গুলি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে পুলিশ বিজিবিকে খবর দেয়। পরবর্তীতে বিজিবি ও পুলিশের যৌথ গুলিতে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ জন, ১ ঘণ্টা পরে ১ জন, ০৪.০৩.২০১৩ তারিখে ১ জন এবং ১৪.০৩.২০১৩ তারিখে আরো ১ জন মারা যায়।
জাতীয় সংবাদমাধমে এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রতিবেদন আসে; যেমন, দৈনিক আমায় দেশ ১ মার্চ, ২০১৩ লিখে: ঠাকুরগাঁওয়ে নিহত ৭ ফাঁসির রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুরগাঁওয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালালে ৭ জন নিহত হয়েছেন। এতে মহিলাসহ গুলিবিদ্ধ হয় অন্তত ২০ জন। এছাড়াও আরও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই এলাকায় কয়েক হাজার সাঈদীভক্ত জড়ো হতে থাকেন। রায় ঘোষণার পর পরই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা গড়েয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা ব্যাপক বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে জনগণ আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ঘটনাস্থলে বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতার ওপর পুলিশ ও বিজিবি ব্রাশফায়ার শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই নিরঞ্জন (২০), রুবেল (১৮), দায়মুল (২১), সুমন (২০), ফিরোজ (১৯) নামে ৪ জন নিহত হয়। মনির (১৮) নামের অপর একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। সংঘর্ষে এ সময় মহিলাসহ আরও প্রায় ২৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়, আহত হয় আরও অর্ধশতাধিক। আহতদের অনেককেই ঠাকুরগাঁওসহ রংপুর ও দিনাজপুর মেডিক্যালে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে দুলাল ইসলামের (২০) অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের সার্জারি চিকিৎসক সুপেন্দ্রনাথ রায়। প্রায় ২ ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ ও বিজিবি পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে এলাকার বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা নিহতদের লাশ ও আহতদের উদ্ধার করে গ্রামবাসী। পুলিশের গুলিতে মহিলাসহ বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীও গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে। হঠাৎ এতগুলো তাজা প্রাণ বারে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতদের বাড়ি বাড়ি নেমে আসে কান্নার রোল।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩ জানাজার নামাজ নিয়ে একটি রিপোর্ট ছাপে। যার শিরোনাম
'ঠাকুরগাঁওয়ে নিহতদের জানাজায় জনতার ঢল'
ঠাকুরগাঁও: গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদদের জানাজায় মানুষের ঢল
মাওলানা সাঈদীকে ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে ঠাকুরগাঁওয়ে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে নিহতদের জানাজা নামাজে জনতার ঢল নামে। গত শুক্রবার বিকেলে নিহতদের ময়না তদন্ত শেষে লাশ এলাকায় পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিকেল ৫ টায় গড়েয়া কেন্দ্রীয় ঈদগা ময়দানে এক এক করে নিহতদের লাশ জানাজার জন্য আনা হয়। কিন্তু জনতা বাড়তে থাকলে সেখানে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে। সেখানে হাজার হাজার মুসল্লির অংশগ্রহণে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ৪. মাই কেমন আছে?
শহীদ দুলাল পিতার সাথে বর্গা চাষাবাদের কাজ করতেন। ঐদিন তারা বিছন উঠানোর কাজ করেছেন। কাজের লোকদের ভাত খাওয়ানোর জন্য বাড়ি এসেছিলেন। সাঈদী সাহেবের রায় নিয়ে মিছিলের আয়োজন দেখে সেখানেই চলে যান। তারপর গুলি। তার ক্ষতস্থান নানীর শাড়ি ছিঁড়ে বাঁধা হলো। হসপিটালে নিয়ে অক্সিজেন লাগানো হলো। জ্ঞান আসে-যায় এ অবস্থায় বারবার চোখ মেললেই শুধু বলেন মা, 'মাই (আঞ্চলিক ভাষায় আমার মেয়ে) কেমন আছে? আমার ভাইয়েরা কেমন আছে? তিনি মনে করেছিলেন ওরা মারা গেছে। ১৪ মার্চ ফজরের আজানের সময় মায়ের আঁচল দিয়ে মুখ মোছেন। কথা বলতে বলতেই নাক মুখ দিয়ে বলকিয়ে রক্ত বের হয়ে এলো। ডাক্তাররা দ্রুত অক্সিজেন-এর সংযোগ দিতে পারলেন না। মায়ের দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে থেকেই তার স্নেহের দুলাল শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
কিন্তু নববধূ হালিমা খাতুন ভবিষ্যৎ নিয়ে যে স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন তার কী হবে? কিছুদিন পর অবুঝ শিশু সিনহা যখন তার বাবাকে খুঁজে বেড়াবে, যখন পিতার আদর-ভালবাসা পেতে চাইবে, যখন প্রশ্ন করবে আমার বাবা কোথায়? কী হয়েছে আমার বাবার? কোন অপরাধে আমার বাবাকে খুন করা হলো? তখন কী জবাব দেবে এ অবুঝ শিশুর প্রশ্নের?
স্ত্রী স্বপ্নে দেখছে, 'সওয়াল জওয়াব দিছে-সাথে দায়মূল, দুলাল সাদা ধবধবে কাপড় পরা। ডাকাডাকি করলে বলে, কোনদিনই বাড়িতে যাব না।
৪. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
১টি আধা পাকা টিনের ঘর, ১টি টিনের ঘর ও ১টি রান্নাঘর। নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ দুলাল ইসলাম (০১৩)। পেশা: মাধ্যমিক অসমাপ্ত, দিনমজুর।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ২৫ জুন ১৯৮৭। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি'১৩।
শাহাদাতের তারিখ:১৪ মার্চ ২০১৩, স্থান: রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। দাফন করা হয়। ঈদগা সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: চোঙ্গাখাতা, ডাকঘর: নয়া গড়েয়া হাট, ইউনিয়ন: ১৩ নং গড়েয়া, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও, জেলা: ঠাকুরগাঁও।
পিতা: মোঃ রফিকুল ইসলাম, বয়স: ৫০ বছর, পেশা: কৃষি।
মাতা: মোছা: রহিমা বেগম, বয়স: ৩৮ বছর, গৃহিণী।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: হালিমা খাতুন, বয়স ২৫, গৃহিণী। মোছা: সিনহাউদ্দৌলা, ৩ মাস বয়সের ১টি মেয়ে শিশু।
ভাই-বোনের বিবরণ: শহীদ মো: দুলাল ইসলাম, মোঃ আলাল হোসেন, শ্রমিক, মোঃ হেলাল ইসলাম, ৯ম শ্রেণি, গড়েয়া উচ্চবিদ্যালয়, মোঃ আব্দুর রহিম, ৮ম শ্রেণি, গড়েয়া উচ্চবিদ্যালয়।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍