হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মো: দায়মুল ইসলাম
শহীদ মো: দায়মুল ইসলাম

শহীদ মো: দায়মুল ইসলাম

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গড়েয়ার হাজার হাজার তৌহিদি জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। নয়া গড়েয়া হাটে সালাতুল জোহরের পর পর এ মিছিল চলতে থাকে। দায়মূল ইসলাম মিছিলের সাথে সাথে চলতে থাকেন। মিছিলের এক পর্যায় পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে হামলা করে এবং নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে মো: দায়মুল ইসলাম গুলিতে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েন। তার পেছন দিক হতে গুলি লেগে সামনে পেট দিয়ে বের হয়ে যায়। আহত অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ মার্চ ২০১৩ তারিখে বিকেল ৩টায় তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। ৫ মার্চ রাত ৯ টায় গড়েয়া ঈদগাহ মাঠে শহীদের জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আব্দুল হাকিম। জানাযায় ৩ হাজারের অধিক লোক উপস্থিত হয়।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

"আর্থিক সংকটে সবাই একঘরেই একাকার হয়ে থাকেন। এ যেন দরিদ্রতার কশাঘাতে দুমড়ে যাওয়া এক টুকরো বাংলাদেশ। সেদিন দায়মুল মিছিলের আওয়াজ শুনে যেন প্রাণের টানে দৌড়াতে থাকে। 'যাইন্ন্যা যাইল্ল্যা,-বাড়ি চলি আসিন' বলে দাদী এতিম ছেলেটির পেছন থেকে ডেকে মরছেন। কিন্তু দায়মুলের ছাফ জবাব, সাইদী বিনা দোষে মারা যাবে- আমরা কি বসে থাকবো? সেই মাটির ঘরে কিবা সম্বল একটি কড়াই, একটি পাতিল, একটি উল্টে পড়া জগ। আর একটি স্টিলের বাসন যাতে দায়মুলের সেদিনের খাবার আয়োজন করা হয়েছিল। যে বাসন তার স্পর্শে আর কখনও জীর্ণ হবে না।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: দায়মুল ইসলাম ঠাকুরগাঁও জেলা সদরের গড়েয়া গোপালপুর গ্রামে ১৯৯৬ ইং সালে জন্মগ্রহণ করেন। শহীদ মো: দায়মুল ইসলাম ছিলেন ইয়াতিম এবং দরিদ্র পিতা মরহুম মইনউদ্দিন ও মাতা জুলেখা বেগমের একমাত্র ছেলে সন্তান। এক ভাই ও দুই বোন মিলে ৪ সদস্যের সংসারে দরিদ্র ও অসহায় মা কোন রকমে সন্তানের মুখে দুটো খাবার তুলে দিতে ব্যস্ত ছিলেন। পারেননি পড়ালেখার ভাল কোন ব্যবস্থা করতে। শহীদ মো: দায়মুল ইসলাম গড়েয়া গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণী পড়ার পর আর পড়া-লেখা চালিয়ে যেতে পারেননি। এক বোনকে বহু কষ্টে বিয়ে দিতে পারলেও বড় বোন, মা, নানী ও দাদী তার দৈনিক ইনকামের ওপর ভিত্তি করেই মোটামুটি নির্ভরশীল ছিল। তার শাহাদাতে এখন তারা একেবারেই অসহায়। স্থানীয় বাজারে চা দোকানের বয় হিসাবে কাজ করতেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গড়েয়ার হাজার হাজার তৌহিদি জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। নয়া গড়েয়া হাটে সালাতুল জোহরের পর পর এ মিছিল চলতে থাকে। দায়মূল ইসলাম মিছিলের সাথে সাথে চলতে থাকেন। মিছিলের এক পর্যায় পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে হামলা করে এবং নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে মো: দায়মুল ইসলাম গুলিতে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েন। তার পেছন দিক হতে গুলি লেগে সামনে পেট দিয়ে বের হয়ে যায়। আহত অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ মার্চ ২০১৩ তারিখে বিকেল ৩টায় তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। ৫ মার্চ রাত ৯ টায় গড়েয়া ঈদগাহ মাঠে শহীদের জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আব্দুল হাকিম। জানাযায় ৩ হাজারের অধিক লোক উপস্থিত হয়।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে নয়া গড়েয়া হাটে ঠাকুরগাঁও উপজেলার জনসাধারণ বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এদিকে গড়েয়া ইউনিয়নের স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি আশরাফুল আলম মানিক ও তার ছোট ভাই যুবলীগ নেতা যাদু মিয়া, পিতা: মৃত তাজিম উদ্দীন থানা পুলিশকে খবর দেয় যে, এলাকার জনসাধারণ হিন্দুদের বাসা-বাড়িতে, দোকান-ঘর ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করছে। এরূপ মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনতার ওপর এলোপাথাড়ি রাবার বুলেট ও গুলি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে পুলিশ বিজিবিকে খবর দেয়। পরবর্তীতে বিজিবি ও পুলিশের যৌথ গুলিতে তাৎক্ষণিক ৬ জন লোক জীবন হারান।
জাতীয় সংবাদমাধমে এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রতিবেদন আসে; যেমন, দৈনিক আমার দেশ ১ মার্চ, ২০১৩ লিখে; ঠাকুরগাঁওয়ে নিহত ৭: ফাঁসির রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুরগাঁওয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালালে ৭ জন নিহত হয়েছেন। এতে মহিলাসহ গুলিবিদ্ধ হয় অন্তত ২০ জন। এছাড়াও আরও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই এলাকায় কয়েক হাজার সাঈদীভক্ত জড়ো হতে থাকেন। রায় ঘোষণার পর পরই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা গড়েয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা ব্যাপক বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে জনগণ আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ঘটনাস্থলে বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতার ওপর পুলিশ ও বিজিবি ব্রাশফায়ার শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই নিরঞ্জন (২০), রুবেল (১৮), দায়মুল (২১), সুমন (২০), ফিরোজ (১৯) নামে ৪ জন নিহত হয়। মনির (১৮) নামের অপর একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। সংঘর্ষে এ সময় মহিলাসহ আরও প্রায় ২৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়, আহত হয় আরও অর্ধশতাধিক। আহতদের অনেককেই ঠাকুরগাঁওসহ রংপুর ও দিনাজপুর মেডিক্যালে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে দুলাল ইসলামের (২০) অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের সার্জারি চিকিৎসক সুপেন্দ্রনাথ রায়। প্রায় ২ ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ ও বিজিবি পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে এলাকার বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা নিহতদের লাশ ও আহতদের উদ্ধার করে গ্রামবাসী। পুলিশের গুলিতে মহিলাসহ বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীও গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে। হঠাৎ এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতদের বাড়ি বাড়ি নেমে আসে কান্নার রোল।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩ জানাজার নামাজ নিয়ে একটি রিপোর্ট ছাপে। যার শিরোনাম 'ঠাকুরগাঁওয়ে নিহতদের জানাজায় জনতার ঢল'
ঠাকুরগাঁও গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে শহীদদের জানাজায় মানুষের ঢল
মাওলানা সাঈদীকে ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে ঠাকুরগাঁওয়ে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে নিহতদের জানাজা নামাজে জনতার ঢল নামে। গত শুক্রবার বিকেলে নিহতদের ময়না তদন্ত শেষে লাশ এলাকায় পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিকেল ৫ টায় গড়েয়া কেন্দ্রীয় ঈদগা ময়দানে এক এক করে নিহতদের লাশ জানাজার জন্য আনা হয়। কিন্তু জনত্য বাড়তে থাকলে সেখানে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে। সেখানে হাজার হাজার মুসল্লির অংশগ্রহণে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
৪. 'যাইন্ন্যা যাইন্ন্যা বাড়ি চলি আসিন'
দায়মুলের মালিক দোকানে নিয়মিত আল্লামা সাঈদীর ক্যাসেট বাজাতেন। এতে ১৭ বছরের ছেলেটি খুবই উদ্বুদ্ধ হতো। সে ছিল হোটেল মালিকের খুবই স্নেহভাজন। কিন্তু সেদিন কি হল মালিককে না বলেই চলে গেল। নানী জরিফা খাতুন বয়স আনুমানিক ৬৫ প্রতিদিন ৫০/৬০ টাকা মজুরিতে কুঁড়ার মিলে কাজ করেন। দাদী রমিসা বেগম বয়স আরো কিছুটা বেশি হবে। আর্থিক সংকটে সবাই এক ঘরেই একাকার হয়ে থাকেন। এ যেন দরিদ্রতার কশাঘাতে দুমড়ে যাওয়া এক টুকরো বাংলাদেশ। সেদিন দায়মুল সেই সকালে খেয়েছে, দুপুর গড়িয়ে যায় দাদী তার ভাত বেড়ে রেখেছেন। কিন্তু মিছিলের আওয়াজ শুনে যেন সে প্রাণের টানে দৌড়াতে থাকে। 'যাইন্ন্যা যাইন্ন্যা, বাড়ি চলি আসিন' বলে দাদী এতিম ছেলেটির পেছন থেকে ডেকে মরছেন। কিন্তু দায়মুলের ছাফ জবাব, 'সাইদী বিনা দোষে মারা যাবে-আমরা কি বসে থাকবো?' সেই মাটির ঘরে কিবা সম্বল একটি কড়াই, একটি পাতিল, একটি উল্টে পড়া জগ। আর একটি স্টিলের বাসন যাতে দায়মুলের সেদিনের খাবার আয়োজন করা হয়েছিল। যে বাসন তার স্পর্শে আর জীর্ণ হবে না। শোকাতুর মামা স্বপ্ন দেখেছে, ক্ষতস্থান পুরা হয়েছে। খালা দেখেছে, গুলির কোন চিহ্ন নেই।
৫. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
বাঁশের বেড়া ও টিনের চাল দিয়ে ১টি বসতঘর আছে। নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই। টিউবওয়েল ও টয়লেট নেই।
৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ দায়মুল ইসলাম। পেশা: হোটেল বয় হিসেবে প্রতিদিন ৫০/৬০ টাকা আয় হতো।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি'১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ৪ মার্চ ২০১৩, দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: চোঙ্গাখাতা, ডাকঘর: গড়েয়া, ইউনিয়ন: ১৩ নং গড়েয়া, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও।
পিতা: মো: মইন উদ্দিন ১০ বছর আগে মারা যান।
মাতা: মোছা: জুলেখা বেগম। (অন্যত্র বিয়ে হয়েছে), ৩৫ বছর, গৃহিণী।
ভাই-বোনের বিবরণ: শহীদ দায়মুল ইসলাম-বয়স ১৭, মোছা: ময়না বেগম-বয়স-১৫, ঢাকায় বাসায় কাজ করে, মোছা: মনিরা বেগম-বয়স ১৪, স্বামীর বাড়ি।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍