হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মো: মামুনুর রশীদ
শহীদ মো: মামুনুর রশীদ

শহীদ মো: মামুনুর রশীদ

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ঘটনাস্থল শহীদের নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। মিছিলের খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত লোক দলবেঁধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেউ রিক্সা কেউ বাইসাইকেল, মোটরবাইকে আবার কেউবা নসিমনে করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। শহীদ মামুনুর রশীদ তার নিজের বাইসাইকেলযোগে সকাল ৯ টার ভেতর মিঠাপুকুর পৌঁছেন। আর সেখানে প্রায় ৫০ হাজার এলাকাবাসীর সাথে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
শাহাদাতের দিন তার পকেটে ছিল মাত্র ২৫ টাকা। মিছিলে যাওয়ার সময় কী মনে হলো। কোন দিনতো দিতে পারেন না, তাই হৃদয়ের গভীরের সব পিতৃস্নেহ যেন আজ সাগরের ফেনার মতো উথলে উঠলো। আড়াই বছরের মেয়ে মরিয়মের হাতে ৫ টাকা গুঁজে দিয়ে, তাকে কিছু খেতে বললেন। বাকি ২০ টাকা নিয়ে দ্রুত মিছিলে ছুটলেন। আল্লাহর পথে কাজে লাগতেও পারে। শেষ সম্বল বলতে তার ছিল এটুকুই।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

"মরণ হয় হবে, মুই ওঠয় মরলে মোর বেহেশত হবে।"
১. শহীদের পরিচিতি
রংপুর মিঠাপুকুরের প্রত্যন্ত গ্রাম শিকারপুরের দরিদ্র পিতামাতার চার সন্তানের মধ্যে ২য় সন্তান শহীদ মো: মামুনুর রশীদ ১৯৭৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ৩ ভাই ১ বোনের সংসারে পিতামাতা কোন রকমে সন্তানদের বড় করে তোলেন। অর্থাভাবে পারেননি কোন পড়ালেখার ব্যবস্থা করতে। সামর্থ্যবান হওয়ার পর থেকে ক্ষেতে-খামারে মজুরির কাজ করাই ছিল তাদের পেশা। ৪ সন্তানের পিতা শহীদ মামুনুর রশীদ অন্যের জমিতে মজুরি করে সংসার চালাতেন। প্রতিবেশী মির্জা মেছের আলীর মৌখিকভাবে বলে দেয়া মাটিতেই ১২ হাত X ০৮ হাত ছনের চালার একটি মাটির ঘরই তাদের ঠিকানা। মাটির কূপ থেকে বালতি দিয়ে পানি তুলে ব্যবহার করেন। টয়লেটে শুধু একটি প্যান লাগানো আছে চারদিকে সুপারিপাতার বেড়া। থাকার জন্য ১টি চৌকিই তাদের একমাত্র আসবাব। এই বিশাল পৃথিবীর কোন প্রান্তে তাদের এক চিলতে জমিও নাই।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
ঘটনাস্থল শহীদের নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। মিছিলের খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত লোক দলবেঁধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেউ রিক্সা কেউ বাইসাইকেল, মোটরবাইকে আবার কেউবা নসিমনে করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। শহীদ মামুনুর রশীদ তার নিজের বাইসাইকেলযোগে সকাল ৯ টার ভেতর মিঠাপুকুর পৌঁছেন। আর সেখানে প্রায় ৫০ হাজার এলাকাবাসীর সাথে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
শাহাদাতের দিন তার পকেটে ছিল মাত্র ২৫ টাকা। মিছিলে যাওয়ার সময় কী মনে হলো। কোন দিনতো দিতে পারেন না, তাই হৃদয়ের গভীরের সব পিতৃস্নেহ যেন আজ সাগরের ফেনার মতো উথলে উঠলো। আড়াই বছরের মেয়ে মরিয়মের হাতে ৫ টাকা গুঁজে দিয়ে, তাকে কিছু খেতে বললেন। বাকি ২০ টাকা নিয়ে দ্রুত মিছিলে ছুটলেন। আল্লাহর পথে কাজে লাগতেও পারে। শেষ সম্বল বলতে তার ছিল এটুকুই।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২৮শে ফেব্রুয়ারি' ২০১৩! সকাল হতে না হতেই রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানা সদরে ১৭টি ইউনিয়নের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ আসতে থাকে। তাদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ-বিজিবি নির্বিচারে শত-শত রাউন্ড টিয়ার শেল ও গুলি বর্ষণ করতে থাকে। সাথে সরকারি দলের লোকেরাও উসকানি দিতে থাকে। প্রায় ৩৫-৪০জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হয়। ঘটনাস্থলেই ৫ জন শহীদ হন। শহীদ মামুন ছিলেন সামনের সারিতে। তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং সাথে সাথেই ঘটনাস্থলে শাহাদৎ বরণ করেন। কিন্তু তার নিষ্প্রাণদেহকেও পুলিশ ছেড়ে দেয়নি। নির্মমভাবে তার রক্তাক্ত লাশ টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় এবং রংপুর মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। সেখান থেকে ১ মার্চ ২০১৩ তারিখ সালাতুল আসরের একটু আগে লাশ ফেরত দিলে বাড়ির পাশে প্রতিবেশীর জমিতে দাফন করা হয়।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
প্রতিবেশী: হাফিজুর রহমান, আশরাফুল ইসলাম, ফুল বাবু মন্ডল বলেন, শহীদ নিজে খুবই সৎ লোক ছিলেন। নিজের টাকা খরচ করে প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। তিনি নিয়মিত ওয়াজ মাহফিলে অংশগ্রহণ করতেন। তার শাহাদাতে আমরা শোকাহত।
শহীদের বাবার কথাঃ আঃ হাই মিয়া। যেন ৯০ বছরের ঝড়ে ভাঙা এক বটগাছ। মুখে অসহনীয় কষ্ট, দরিদ্রতা আর বার্ধক্যের কঠিন কামড়। পায়ে বিশাল টিউমার, নড়াচড়া করা কঠিন। তারপরও পাহাড়ের মতো ধৈর্যের প্রতীক সেজে বললেন-"খুবই কষ্ট পেয়েছি। সবকিছু মাফ করে দিয়েছি। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাত নসিব করেন।"
শহীদের মায়ের কথা: ৬৫ বছরের রওশন আরা। বাড়ি বাড়ি পান-সুপারি বিক্রি করে দুই বুড়াবুড়ির সংসার চালান। ছেলের শাহাদাতে যেন বজ্রাহত হয়েছেন। তারপরও অস্ফুট কণ্ঠে বললেন "আমার খুব খারাপ লাগছে। কান্না বিজড়িত হয়ে মা জননী বলেন, "ওর জান্নাত লাভের জন্য দোয়া করি।"
শহীদের স্ত্রী বলেন: তার মোবাইলে মাওলানা সাঈদীর ওয়াজ ছিল। অবসরে তা শুনতেন। ঘটনার দিন মোবাইল হারিয়ে যায়। কয়েকদিন হতেই তিনি বলতেন,-আমি মিছিলে যাব। যাবার সময় বলেছেন, আমি স্বেচ্ছায় যাচ্ছি। স্ত্রী হিসেবে আমি কিছুটা আপত্তি করলে বলেন "মোর মরণ হয় হবে। মুই যদি ওঠো যাইয়া মরং, কাকো দোষারোপ করে না। মুই ওঠো মরলে মোর বেহেশত হবে।"
শহীদ দিন এনে দিন খেতেন। শাহাদাতের দিনও আকমল হোসেন নামক এক গেরস্থের জমিতে ভুট্টা লাগানোর কাজ ছিল। সেদিন ২০০ টাকা পেতেন। এটা তার জন্য অনেক টাকা। কিন্তু না, সব ফেলে তিনি চলে গেলেন সবচেয়ে দামি কাজে। সবচেয়ে বেশি মজুরিদাতা তার মহান প্রভুর দরবারে।
সর্বশেষ দিন তার কাজ ছিল ভুট্টাক্ষেতে। শাহাদাতের পর তার মহান প্রভুর ইচ্ছায় তার কবরও হলো সেই ভুট্টাক্ষেতেই। ৬ মার্চ ২০১৩: শহীদ হবার মাত্র ৬ দিন পর জন্মে তার কনিষ্ঠা কন্যা। শহীদ তার সন্তানের চাঁদমুখটি দেখে যেতে পারেননি।
অধিক শোকে পাথর, যারা শুধু বাগধারায় পড়েছেন তারা এর মর্ম বুঝবেন কি? পিতার শাহাদাতের ছয়দিন পর যে কন্যার জন্ম: জন্মের ৯ম দিবসেও সে একটি নাম পায়নি। কারণ সবাই 'শোকে পাথর'। একটি প্রতিনিধিদল গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে শিশুটির নাম রাখে ও আকিকার ব্যবস্থা করে। সুমাইয়া বিনতে মামুন। নিজেদের পরিবারে এমন ব্যথাতুর ঘটনার কল্পনা কি আমরা করতে পারি? আর এ সন্তানও বড় হবে আর জানবে সারা দুনিয়ার বিনিময়েও সে একটি নিরাপদ ভালোবাসার আশ্রয় আর কোনদিন পাবে না। আর সবার মত হৃদয়ের অতল থেকে একটি ডাক সে কোনদিন দিতে পারবে না। পৃথিবীর মধুময় একটি ডাক। সেটি হচ্ছে 'আব্বু'।
৫. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
১টি মাটির ঘর, ছনের চাল। ১২ হাত/ ৮ হাত। নিজেদের এক টুকরা মাটিও নেই। প্রতিবেশী মির্জা মেছের আলীর মৌখিকভাবে বলে দেয়া মাটিতেই এ ঘরটি তৈরি করে থাকে। মাটির কূপ থেকে বালতি দিয়ে পানি তোলে ব্যবহার করে। টয়লেটে শুধু একটি প্যান লাগানো আছে। টয়লেট নেই। থাকার জন্য ১টি চকি ছাড়া উল্লেখ করার মত তেমন কোন আসবাবপত্র নেই। চাষাবাদেরও কোন জমি নেই।
৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ মামুনুর রশীদ (০০২)। পেশা: দিনমজুর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৭ মার্চ ১৯৭৪। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি '১৩।
আহতের ধরন ও পরবর্তী অবস্থা: পেটে গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। পুলিশ পরে পা ধরে টেনে নিয়ে যায়।
শাহাদাতের তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি '১৩। জানাজা পড়ান জনাব গোলাম রব্বানী। দাফন করা হয়: রাস্তার পাশে প্রতিবেশীর জমিতে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: শিকারপুর, ডাকঘর: কদমতলা, ইউনিয়ন: ৯ নং ময়নপুর উপজেলা: মিঠাপুকুর, জেলা: রংপুর।
পিতা: মোঃ আব্দুল হাই মিয়া। ৯০ বছর বয়স্ক। দিনমজুরি করে সংসার চলতো। এখন অক্ষম। বৃদ্ধা মা পান-সুপারি বিক্রি করে দু'জনের সংসার চলে। পিতার ঘরটিও পাশাপাশি এবং একই অবস্থা।
মাতা: মোছা: রওশন আরা গৃহিণী।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণঃ স্ত্রী:...। ১ম ছেলে: আব্দুর রহীম, ১০ বছর, ৩য় শ্রেণী, মাদ্রাসা ছাত্র, ২য় মেয়ে: মল্লিকা, ৭ বছর ২য় শ্রেণী, ৩য় মেয়ে: মরিয়ম, ২ বছর ৬ মাস, ৪র্থ মেয়ে। সুমাইয়া বিনতে মামুন, ৬ মার্চ ২০১৩ শহীদ হবার ৬ দিন পর জন্ম।
ভাই-বোনের বিবরণ: মোঃ রফিকুল ইসলাম, ৫০ বছর, দিনমজুর। শহীদ মোঃ মামুনুর রশীদ। হাবিবা বিবাহিতা, মোঃ রশিদুল ইসলাম ২৫ বছর কাঠমিস্ত্রি।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍