হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ হাফেজ মো: শহিদুল ইসলাম (শাহ আলম)
শহীদ হাফেজ মো: শহিদুল ইসলাম (শাহ আলম)

শহীদ হাফেজ মো: শহিদুল ইসলাম (শাহ আলম)

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ হাফেজ মো. শহিদুল ইসলাম (শাহ আলম) মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের জৈল্ল্যা গ্রামের অতি সাধারণ এক ঘর থেকে উঠে আসা অসাধারণ এক তরুণ। যিনি অল্প বয়সেই কোরআনের হাফেজ হয়ে মাতৃহৃদয়ের ভরসার বাতিঘর হয়ে উঠেছিলেন। শৈশবেই পিতৃহারা এই মেধাবী ছাত্র দাওরা হাদিস ও ইমামতির মাধ্যমে যেমন নিজের পবিত্র চরিত্র নির্মাণ করছিলেন, তেমনি দায়িত্ববোধে পরিবারের একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইসলাম ও রাসূল (সা.)-কে অবমাননার প্রতিবাদে আহুত কর্মসূচিতে যোগ দিতে পথে বের হয়ে পুলিশের গুলিতে তিনি শহীদের অমিয় সুধা পান করেন। মায়ের কাছে থাকা খড়ের মতোই একমাত্র সম্বল তাকে ছেড়ে গেলেও রেখে গেল অটল ঈমান, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক দীপ্ত প্রতিচ্ছবি, যা আজও হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ হাফেজ মো: শহিদুল ইসলাম (শাহ আলম)
মানিকগঞ্জ-১
১. পরিচিতি
পিতা-মাতার দুই সন্তানের মধ্যে প্রথম ও একমাত্র ছেলে সন্তান শহীদ হাফেজ মোঃ শহিদুল ইসলাম (শাহ আলম) ১৯৮৮ইং সনে মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের জৈল্ল্যা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রায় ১৮ বছর আগে একান্ত শৈশবে শহীদ হাফেজ মো: শাহ আলম এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় শ্রদ্ধেয় পিতাকে হারিয়ে চিরতরে পিতৃস্নেহ হতে বঞ্চিত হন। মা শহরবানু ইয়াতিম দুই শিশুকে নিয়ে মাটি কাটা ও বাড়িতে বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে ওদের বড় করেন। ২০ বছর বয়সী একমাত্র ছোট বোনটি সেও মানসিক প্রতিবন্ধী। অসুস্থ মা এখনও অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসারের ঘানি টানেন। বয়োবৃদ্ধ বিধবা এই মায়ের স্বপ্ন ছিল একমাত্র ছেলে শিক্ষিত হয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠে সংসারের হাল ধরবে। আর তিল তিল করে তার স্বামীর রেখে যাওয়া কাজ বাস্তবায়ন করবে। তাইতো তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে কোরআনের হাফেজ বানিয়েছিলেন। হাফেজী শেষে তিনি স্থানীয় কওমি মাদ্রাসায় দাওরা হাদিস পড়া চালিয়ে যান। পাশাপাশি মাতৃভক্ত সন্তান মাদ্রাসার পাশের মসজিদে ইমামতি করে সংসারে অর্থের যোগান দিতেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
দিনটি ছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। সেদিন ছিল ইসলাম ও রাসূলকে (সা:) নিয়ে কটূক্তি করার প্রতিবাদে ইসলামী দলসমূহের ডাকে সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। হরতালের সমর্থনে সারাদেশের মত মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার গোবিন্দল বাজারের ব্যাপক মিছিল ও পিকেটিং হয়। এলাকার হাজার হাজার তৌহিদী জনতা মিছিল ও পিকেটিং-এ অংশগ্রহণ করেন। পুলিশ তৌহিদী জনতার উপর ব্যাপক লাঠিচার্জ করে, টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে এবং নির্বিচারে গুলি চালায়। এমনকি পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনগণের উপর গুলি চালায়। ঘটনার দিন শাহ আলম ফোরকানিয়া (মক্তব) মাদরাসায় বাচ্চাদের পড়িয়ে সিংগাইর বাজারের উদ্দেশে রওনা হন। পথেই দাড়ি টুপি দেখে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি করেছে। শহীদ হাফেজ মো: শাহ আলম এ ঘটনায় পেটে গুলিবিদ্ধ হন। আহতাবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। এ ঘটনায় ৪ জন শাহাদাত বরণ করেন এবং শত শত লোক গুলিবিদ্ধ হন। মা স্বপ্নে দেখে-ও যেন একেবারে ছোট্টবেলার মতো হয়ে গেছে। আর খুব ভাল আছে। চাচা দেখে-'শহীদ শাহ আলম বলছে আমি যদি আরো পড়তাম, তবে আমার জান্নাত আরো সুন্দর হতো। 'আর ওকে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। তবুও মা-বোন, স্বজনদের মন ভরে না।
৩. খড়-উড়ে-স্বপ্ন-পুড়ে
শহীদ হাফেজ মোঃ শহিদুল ইসলাম (শাহ আলম) অল্পবয়সে বাবাকে হারালে দাদা তার নামে এক চিলতে জমি লিখে দেন: এটিই তাদের একমাত্র সম্বল। তার ভেতরই তাদের ছোট্ট টিনের ঘর। এর বারান্দার এক কোনায় পাটখড়ির বেড়া দিয়ে ৬/৭ ফিটের একটি খুপরি-যেটি মায়ের ভাষায় 'কেবিন'। এটিই ছিল শহীদের ঠিকানা। ঘটনার আগের দিন শনিবার দুপুরে শাহ আলম বাড়ি এসেছিল; প্রতিবন্ধী বোনটি আবদার করেছিল-ভাইয়া, দই মিষ্টি খাব। সেই ছোট্টবেলা হতেই বোনটি ভাত খায় না রুটি-মুড়ি খেয়েই কাটায়। তাই বোনকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিল,-আচ্ছা রোববার সিঙ্গাইর হাট থেকে এনে দিব। কিন্তু না ভাইয়াটি দই-মিষ্টিসহ এলো না; এলো খাটিয়ায় চড়ে লাশ হয়ে। পিতার কথা মনে পড়ে না প্রতিবন্ধী বোনটির। এক বছর হয় বিয়ে হয়েছে, স্বামী বিদেশে: শ্বশুর বাড়িতেই থাকে এখন। শুধু কাঁদে আর বলে-কে আমাকে দেখতে যাবে?
জনম দুঃখিনী মা, আগের দিন ছেলে বাড়ি এলেও তার সাথে দেখা হয়নি। তিনি ছিলেন পরের বাড়িতে, কাজে। ছেলেটা কখনই বেশি সময় থাকে না পড়ার চাপের কথা বলে তাড়াতাড়ি চলে যায়। সেদিনও তাই করেছিল মায়ের আদর মাখা ভাত তার খাওয়া হয়নি। মা পরের বাড়িতে ঘর নেগা, কৃষি কাজে সহযোগিতা এবং ধান উড়ানোর কাজ করেন। ১৮ বছর আগে স্বামী হারিয়ে যে সন্তানকে ঘিরে স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন, তার এমন মৃত্যুতে যেন সব আলো হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে যান। চোখ বেয়ে নেমে আসে আষাঢ়ের বর্ষণ। তবু তাকে কাজ করে যেতে হয়, বয়োবৃদ্ধ বিধবা মা এখনও অপরের গোলা ভরতে দুর্বল হাতে তার কুলা নাড়িয়ে চলেন। তার কুলা থেকে খড়গুলো যেন তার জীবনের স্বপ্নের মতোই এলোমেলো ভাবে ধূসর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।
৪. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ হাফেজ মো: শহিদুল ইসলাম (শাহ আলম) (০৫৪)।
পেশা: কওমি মাদ্রাসার ছাত্র।
আহত হওয়ার তারিখ: ২৪.০২.২০১৩,
শাহাদাতের তারিখ: ২৪.০২.২০১৩, সকাল ১১টা।
স্থায়ী ঠিকানা: বাড়ির নাম গ্রাম: ইউনিয়ন: জইল্লা, উপজেলা: সিঙ্গাইর, জেলা: মানিকগঞ্জ।
পিতার নাম: মো: নাজির উদ্দিন,
বয়স ও পেশা: মৃত-দিনমজুর ছিলেন।
মায়ের নাম: শহরভানু,
পেশা: মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: টিনের ছোট ১টি ঘর, খুবই দরিদ্র, নিজেদের কোন জমি-জমা নেই।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍