শহীদ মো: জাহাঙ্গীর আলম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
একজন সাধারণ মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে শহীদ জাহাঙ্গীর সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন। সংসারের ঘানি টানতেই তার দিন শেষ হতো। শাহাদাতের আগে মাঝে-মাঝে বলতেন "সাঈদী সাহেব কুরআনের তাফসীর করেন, এটাই তার দোষ। আরতো কোন দোষ দেখি না। তার খারাপ কিছু হলে আমরা বসে থাকবো না।" ২৮ ফেব্রুয়ারি আল্লামা সাঈদী সাহেবের রায়কে কেন্দ্র করে সমগ্র এলাকায় তখন সাজ সাজ রব। মিছিলের খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত লোক দলবেঁধে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে, কেউ রিক্সা কেউ বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল আবার কেউবা নসিমনে করে ঘটনাস্থলে যাচ্ছে। সাধারণত তিনি ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় প্রোগ্রামাদিতে যেতে পারতেন না। সেদিন অবাক ব্যাপার, প্রোগ্রামে যাওয়ার ব্যাপারে অস্থির হয়ে যান। বড় ছেলে ১৫ বছরের রিপন বায়না ধরে সেও মিছিলে যাবে। সকালে তাকে আর ঘুম থেকে জাগালেন না। অতঃপর বিদায়বেলায় কী হলো একান্ত চেনা স্ত্রীর দিকে এবং ঘুমন্ত সন্তানদের প্রতি তাকিয়ে আছেন আর চোখ দিয়ে তপ্ত পানির বান ঝরছে। স্ত্রীকে বুঝতে না দিয়ে সে কান্না লুকানোর চেষ্টা করলেন। চেয়ে চেয়ে সবচেয়ে ভাল পোশাকটি পরলেন, যেন ঈ'দগাতে যাচ্ছেন। বাবা নেই মায়ের দোয়া নেয়া দরকার ছিল কিন্তু সেওতো নানা বাড়িতে। তাই সে সুযোগ আর হলো না। অবশেষে সবাইকে সান্তনা দিতে পান চিবুতে চিবুতে হাসিমুখে সকাল ৭.৩০ টার দিকে নিজ বাইসাইকেলে চেপে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মিঠাপুকুর যান। সেখানে প্রায় ৫০ হাজার এলাকাবাসীর সাথে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি কি আন্দাজ করেছিলেন জীবনের এই প্রথম প্রোগ্রামই তার সর্বশেষ প্রোগ্রাম? তিনি কি আশা করেছিলেন তিনি ঈ'দগাহতে যাবেন; যার নাম শহীদি ঈদগাহ?
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"আরে না, আমিতো শহীদ হয়েছি।"
১. শহীদের পরিচিতি
রংপুর মিঠাপুকুরের প্রত্যন্ত গ্রাম রূপসী উত্তরপাড়ার দরিদ্র পিতামাতার আট সন্তানের মধ্যে ৭ম সন্তান শহীদ মো. জাহাঙ্গীর আলম ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ভাই ২ বোনের সংসারে দরিদ্র পিতামাতা কোন রকম সন্তানদের মুখে দু'মুঠো আহার যোগাতেই গলদঘর্ম হতেন। ইচ্ছে থাকলেও পারেননি তাদের কোন পড়ালেখার সুব্যবস্থা করতে। ২০০০ সালে কৃষক পিতা আবেদ আলী ইন্তেকাল করেন। তারুণ্যেই পিতাকে হারিয়ে মাঝ দরিয়ায় পড়ে যান জাহাঙ্গীর। তবু হাল ছাড়েননি, অন্য ভাইদের মতো ক্ষেতে-খামারে কাজ করাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। চার সন্তানের পিতা শহীদ জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন থেকে গ্রামের বাজারে মাছ ব্যবসা করে মাসে প্রায় ৪-৫ হাজার টাকা আয় করতেন। এ দিয়ে বহু কসরৎ করে তার সংসার চলতো। পরিবারের অন্য ভাইয়েরা জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও তিনি শুরুতে জাতীয় পার্টির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। মাত্র ৩ বছর আগে তিনি পরিবারের সকল সদস্যের সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামী আন্দোলনে শামিল হন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন
একজন সাধারণ মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে শহীদ জাহাঙ্গীর সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন। সংসারের ঘানি টানতেই তার দিন শেষ হতো। শাহাদাতের আগে মাঝে-মাঝে বলতেন "সাঈদী সাহেব কুরআনের তাফসীর করেন, এটাই তার দোষ। আরতো কোন দোষ দেখি না। তার খারাপ কিছু হলে আমরা বসে থাকবো না।" ২৮ ফেব্রুয়ারি আল্লামা সাঈদী সাহেবের রায়কে কেন্দ্র করে সমগ্র এলাকায় তখন সাজ সাজ রব। মিছিলের খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত লোক দলবেঁধে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে, কেউ রিক্সা কেউ বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল আবার কেউবা নসিমনে করে ঘটনাস্থলে যাচ্ছে। সাধারণত তিনি ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় প্রোগ্রামাদিতে যেতে পারতেন না। সেদিন অবাক ব্যাপার, প্রোগ্রামে যাওয়ার ব্যাপারে অস্থির হয়ে যান। বড় ছেলে ১৫ বছরের রিপন বায়না ধরে সেও মিছিলে যাবে। সকালে তাকে আর ঘুম থেকে জাগালেন না। অতঃপর বিদায়বেলায় কী হলো একান্ত চেনা স্ত্রীর দিকে এবং ঘুমন্ত সন্তানদের প্রতি তাকিয়ে আছেন আর চোখ দিয়ে তপ্ত পানির বান ঝরছে। স্ত্রীকে বুঝতে না দিয়ে সে কান্না লুকানোর চেষ্টা করলেন। চেয়ে চেয়ে সবচেয়ে ভাল পোশাকটি পরলেন, যেন ঈ'দগাতে যাচ্ছেন। বাবা নেই মায়ের দোয়া নেয়া দরকার ছিল কিন্তু সেওতো নানা বাড়িতে। তাই সে সুযোগ আর হলো না। অবশেষে সবাইকে সান্তনা দিতে পান চিবুতে চিবুতে হাসিমুখে সকাল ৭.৩০ টার দিকে নিজ বাইসাইকেলে চেপে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মিঠাপুকুর যান। সেখানে প্রায় ৫০ হাজার এলাকাবাসীর সাথে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি কি আন্দাজ করেছিলেন জীবনের এই প্রথম প্রোগ্রামই তার সর্বশেষ প্রোগ্রাম? তিনি কি আশা করেছিলেন তিনি ঈ'দগাহতে যাবেন; যার নাম শহীদি ঈদগাহ?
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২৮শে ফ্রেব্রুয়ারি ২০১৩। এর কয়েক দিন আগে থেকে মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় হবার ঘোষণায় এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জরণ চলছে। সেদিন সকাল হতে না হতেই রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানা সদরে ১৭টি ইউনিয়নের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ সমবেত হতে থাকে। সালাতুজ জোহরের প্রায় আধাঘণ্টা পরে হাজার হাজার জনতার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ, বিজিবি নির্বিচারে শত-শত রাউন্ড টিয়ার শেল ও গুলি বর্ষণ করতে থাকে। সাথে সরকারি দলের লোকেরাও উসকানি দিতে থাকে। ঘটনাস্থলেই ৫ জন শহীদ হন। জাহাঙ্গীর আলম মারাত্মক আহত হয়ে ৩দিন পর শহীদ হন এবং প্রায় ৩৫-৪০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হয়। বিকাল ৩টায় ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন নিজেদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করে।
বেলা ২.৩০ মিনিটে গুলিবিদ্ধ হবার পর পুলিশ অমানবিকভাবে টেনেহিঁচড়ে ভ্যানে করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হসপিটালে নিয়ে যায়। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে ২ দিন পরে তার অভিভাবকরা তাকে প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করেন। তিনি মানুষের খুব ভালবাসার পাত্র ছিলেন। তার আহতের খবর শুনে এলাকাবাসী এবং বিভিন্ন লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার টাকার ব্যবস্থা করেন। চাঁদা কালেকশন, ধান, আলু, সবজি, গরু বিক্রি করে চিকিৎসা চালিয়ে যান। চিকিৎসা বাবদ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ দিন পর ৩ মার্চ '২০১৩ তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ইন্না লিল্লাহ ...রাজেউন। ৩ মার্চ বাদ আসর বিকেল ৫টায় রূপসী চেতনাগঞ্জ মাঠে শহীদের জানাজা নামাজ পড়ানো হয়। মাঠসংলগ্ন দাখিল মাদ্রাসার পাশে শহীদ মোঃ জাহাঙ্গির আলমকে দাফন করা হয়।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের স্ত্রী: শহীদের স্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী উল্লেখিত কর্মসূচি সফল করার জন্য সকালের নাস্তা করে ধীরে সুস্থে তার বাইসাইকেলযোগে মিঠাপুকুরে চলে যান। অভাবের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির শাহাদাতে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। শহীদের স্ত্রী আল্লাহর কাছে তার স্বামীর জন্য শহীদি মর্যাদা এবং জান্নাত কামনা করেন। সন্তান সন্ততির লালন পালনের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করে আছেন এই শহীদ পরিবার।
শহীদের গর্বিত মা: শহীদের গর্বিত মা তার কলিজার টুকরোকে হারিয়ে মর্মাহত। আল্লাহর কাছে জান্নাত লাভের জন্য দোয়া করেন। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে শহীদের মামার ইন্তেকালে সেখান থেকে ফিরে তার কলিজার টুকরো ছেলেকে হারাবেন সে কল্পনাও তিনি করতে পারেননি।
শহীদের ভাই: শহীদের ভাই বলেছেন, আমি গর্বিত এ জন্য যে আমি এখন শহীদের ভাই। মহান আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়ায় আমার আফসোস নেই। আমার ভাই শহীদ হওয়ায় মানুষের কাছে বিচার চেয়ে লাভনেই। বরং আল্লাহর কাছে ভাই হত্যার বিচার চাই।
শহীদের বোনের স্বপ্ন: শহীদের বড় চাচাতো বোন জোসনা শাহাদাতের ২-৩ দিন পর স্বপ্ন দেখেছেন। এক বড় মাহফিলে বসে আছে তার ভাই জাহাঙ্গীর: কী আলো-ঝলমল চেহারা।, কী চমৎকার ঝকমকে পোশাক! প্রশ্ন করলেন,-ভাইরে, তুই না মারা গেছিস। হাসিমুখে শহীদ জাহাঙ্গীর উত্তর দিলেন-আরে না, আমিতো শহীদ হয়েছি। এ যেন মহামহিম আল্লাহর সেই শাশ্বতবাণী "যারা আল্লাহর পথে... তোমরা তা বুঝতে পার না" (আল-কুরআন)।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: ৫ শতকের ওপর একটি বসতবাড়ি, টিন ও বেড়ার তৈরি ২টি ঘর, ১টি নিজেদের থাকার অন্যটি রান্নাঘর। কোন কৃষিজমি নেই। ২টি গরু ও ১টি বাছুর আছে। মাছের ব্যবসা করে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আয় হত, তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলত।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: জাহাঙ্গীর আলম (০০১)। পেশা: দিনমজুর ও সাপ্তাহিক বাজারে মাছ ব্যবসায়ী।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৭৫ সাল, ৩৮ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি' ১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩, বিকাল ৩টা, স্থান: রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। জানাজা পড়ান জনাব গোলাম রব্বানী। দাফন করা হয়: এলাকার বড় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: রূপসী উত্তরপাড়া, ডাকঘর: লাল পুকুর, ইউনিয়ন: ১ নং খোড়াগাছ, উপজেলা: মিঠাপুকুর, জেলা: রংপুর।
পিতা: মরহুম মোঃ আবেদ আলী। ইন্তেকালের তারিখ: ২০০০ সাল।
মাতা: হাফেজী, বয়স ৮০ বছর, অধিকাংশ সময় রোগে ভোগেন। চিকিৎসার সামর্থ্য নেই।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: রওশন আরা বেগম, বয়স ২৮ বছর, গৃহিণী। ১ম ছেলে: মোঃ রিপন মিয়া। বয়স ১৫ বছর, ৭ম শ্রেণি, রূপসী উচ্চবিদ্যালয়। ২য় ছেলে: মোঃ লিটন মিয়া। বয়স ১২ বছর, ৩য় শ্রেণি, রূপসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৩য় ছেলে লিমন মিয়া, বয়স ৯ বছর, ২য় শ্রেণি, রুপসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৪র্থ সন্তান মেয়ে মোছাঃ জান্নাতী বেগম, বয়স- ৬ বছর, ১ম শ্রেণী, রুপসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: আফসার আলী, কৃষি, বয়স ৬৫, মোঃ লিয়াকত আলী, কৃষি, বয়স ৬০, মোঃ ওয়াহেদ আলী, ভ্যান চালক, বয়স ৫৫, মোকসেদা বেগম, গৃহিণী, বিবাহিতা, মোঃ আকতারুজ্জামান, ধান ব্যবসায়ী, বয়স-৫০-জামায়াতের-ইউপি প্রচার সম্পাদক, আলেয়া বেগম, বিবাহিত, শহীদ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, মোঃ আশরাফ আলী, রিক্সাচালক ও কৃষিজমি আবাদ, বয়স ৩০।
১. শহীদের পরিচিতি
রংপুর মিঠাপুকুরের প্রত্যন্ত গ্রাম রূপসী উত্তরপাড়ার দরিদ্র পিতামাতার আট সন্তানের মধ্যে ৭ম সন্তান শহীদ মো. জাহাঙ্গীর আলম ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ভাই ২ বোনের সংসারে দরিদ্র পিতামাতা কোন রকম সন্তানদের মুখে দু'মুঠো আহার যোগাতেই গলদঘর্ম হতেন। ইচ্ছে থাকলেও পারেননি তাদের কোন পড়ালেখার সুব্যবস্থা করতে। ২০০০ সালে কৃষক পিতা আবেদ আলী ইন্তেকাল করেন। তারুণ্যেই পিতাকে হারিয়ে মাঝ দরিয়ায় পড়ে যান জাহাঙ্গীর। তবু হাল ছাড়েননি, অন্য ভাইদের মতো ক্ষেতে-খামারে কাজ করাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। চার সন্তানের পিতা শহীদ জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন থেকে গ্রামের বাজারে মাছ ব্যবসা করে মাসে প্রায় ৪-৫ হাজার টাকা আয় করতেন। এ দিয়ে বহু কসরৎ করে তার সংসার চলতো। পরিবারের অন্য ভাইয়েরা জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও তিনি শুরুতে জাতীয় পার্টির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। মাত্র ৩ বছর আগে তিনি পরিবারের সকল সদস্যের সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামী আন্দোলনে শামিল হন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন
একজন সাধারণ মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে শহীদ জাহাঙ্গীর সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন। সংসারের ঘানি টানতেই তার দিন শেষ হতো। শাহাদাতের আগে মাঝে-মাঝে বলতেন "সাঈদী সাহেব কুরআনের তাফসীর করেন, এটাই তার দোষ। আরতো কোন দোষ দেখি না। তার খারাপ কিছু হলে আমরা বসে থাকবো না।" ২৮ ফেব্রুয়ারি আল্লামা সাঈদী সাহেবের রায়কে কেন্দ্র করে সমগ্র এলাকায় তখন সাজ সাজ রব। মিছিলের খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত লোক দলবেঁধে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে, কেউ রিক্সা কেউ বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল আবার কেউবা নসিমনে করে ঘটনাস্থলে যাচ্ছে। সাধারণত তিনি ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় প্রোগ্রামাদিতে যেতে পারতেন না। সেদিন অবাক ব্যাপার, প্রোগ্রামে যাওয়ার ব্যাপারে অস্থির হয়ে যান। বড় ছেলে ১৫ বছরের রিপন বায়না ধরে সেও মিছিলে যাবে। সকালে তাকে আর ঘুম থেকে জাগালেন না। অতঃপর বিদায়বেলায় কী হলো একান্ত চেনা স্ত্রীর দিকে এবং ঘুমন্ত সন্তানদের প্রতি তাকিয়ে আছেন আর চোখ দিয়ে তপ্ত পানির বান ঝরছে। স্ত্রীকে বুঝতে না দিয়ে সে কান্না লুকানোর চেষ্টা করলেন। চেয়ে চেয়ে সবচেয়ে ভাল পোশাকটি পরলেন, যেন ঈ'দগাতে যাচ্ছেন। বাবা নেই মায়ের দোয়া নেয়া দরকার ছিল কিন্তু সেওতো নানা বাড়িতে। তাই সে সুযোগ আর হলো না। অবশেষে সবাইকে সান্তনা দিতে পান চিবুতে চিবুতে হাসিমুখে সকাল ৭.৩০ টার দিকে নিজ বাইসাইকেলে চেপে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মিঠাপুকুর যান। সেখানে প্রায় ৫০ হাজার এলাকাবাসীর সাথে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি কি আন্দাজ করেছিলেন জীবনের এই প্রথম প্রোগ্রামই তার সর্বশেষ প্রোগ্রাম? তিনি কি আশা করেছিলেন তিনি ঈ'দগাহতে যাবেন; যার নাম শহীদি ঈদগাহ?
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২৮শে ফ্রেব্রুয়ারি ২০১৩। এর কয়েক দিন আগে থেকে মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় হবার ঘোষণায় এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জরণ চলছে। সেদিন সকাল হতে না হতেই রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানা সদরে ১৭টি ইউনিয়নের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ সমবেত হতে থাকে। সালাতুজ জোহরের প্রায় আধাঘণ্টা পরে হাজার হাজার জনতার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ, বিজিবি নির্বিচারে শত-শত রাউন্ড টিয়ার শেল ও গুলি বর্ষণ করতে থাকে। সাথে সরকারি দলের লোকেরাও উসকানি দিতে থাকে। ঘটনাস্থলেই ৫ জন শহীদ হন। জাহাঙ্গীর আলম মারাত্মক আহত হয়ে ৩দিন পর শহীদ হন এবং প্রায় ৩৫-৪০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হয়। বিকাল ৩টায় ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন নিজেদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করে।
বেলা ২.৩০ মিনিটে গুলিবিদ্ধ হবার পর পুলিশ অমানবিকভাবে টেনেহিঁচড়ে ভ্যানে করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হসপিটালে নিয়ে যায়। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে ২ দিন পরে তার অভিভাবকরা তাকে প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করেন। তিনি মানুষের খুব ভালবাসার পাত্র ছিলেন। তার আহতের খবর শুনে এলাকাবাসী এবং বিভিন্ন লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার টাকার ব্যবস্থা করেন। চাঁদা কালেকশন, ধান, আলু, সবজি, গরু বিক্রি করে চিকিৎসা চালিয়ে যান। চিকিৎসা বাবদ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ দিন পর ৩ মার্চ '২০১৩ তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ইন্না লিল্লাহ ...রাজেউন। ৩ মার্চ বাদ আসর বিকেল ৫টায় রূপসী চেতনাগঞ্জ মাঠে শহীদের জানাজা নামাজ পড়ানো হয়। মাঠসংলগ্ন দাখিল মাদ্রাসার পাশে শহীদ মোঃ জাহাঙ্গির আলমকে দাফন করা হয়।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের স্ত্রী: শহীদের স্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী উল্লেখিত কর্মসূচি সফল করার জন্য সকালের নাস্তা করে ধীরে সুস্থে তার বাইসাইকেলযোগে মিঠাপুকুরে চলে যান। অভাবের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির শাহাদাতে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। শহীদের স্ত্রী আল্লাহর কাছে তার স্বামীর জন্য শহীদি মর্যাদা এবং জান্নাত কামনা করেন। সন্তান সন্ততির লালন পালনের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করে আছেন এই শহীদ পরিবার।
শহীদের গর্বিত মা: শহীদের গর্বিত মা তার কলিজার টুকরোকে হারিয়ে মর্মাহত। আল্লাহর কাছে জান্নাত লাভের জন্য দোয়া করেন। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে শহীদের মামার ইন্তেকালে সেখান থেকে ফিরে তার কলিজার টুকরো ছেলেকে হারাবেন সে কল্পনাও তিনি করতে পারেননি।
শহীদের ভাই: শহীদের ভাই বলেছেন, আমি গর্বিত এ জন্য যে আমি এখন শহীদের ভাই। মহান আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়ায় আমার আফসোস নেই। আমার ভাই শহীদ হওয়ায় মানুষের কাছে বিচার চেয়ে লাভনেই। বরং আল্লাহর কাছে ভাই হত্যার বিচার চাই।
শহীদের বোনের স্বপ্ন: শহীদের বড় চাচাতো বোন জোসনা শাহাদাতের ২-৩ দিন পর স্বপ্ন দেখেছেন। এক বড় মাহফিলে বসে আছে তার ভাই জাহাঙ্গীর: কী আলো-ঝলমল চেহারা।, কী চমৎকার ঝকমকে পোশাক! প্রশ্ন করলেন,-ভাইরে, তুই না মারা গেছিস। হাসিমুখে শহীদ জাহাঙ্গীর উত্তর দিলেন-আরে না, আমিতো শহীদ হয়েছি। এ যেন মহামহিম আল্লাহর সেই শাশ্বতবাণী "যারা আল্লাহর পথে... তোমরা তা বুঝতে পার না" (আল-কুরআন)।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: ৫ শতকের ওপর একটি বসতবাড়ি, টিন ও বেড়ার তৈরি ২টি ঘর, ১টি নিজেদের থাকার অন্যটি রান্নাঘর। কোন কৃষিজমি নেই। ২টি গরু ও ১টি বাছুর আছে। মাছের ব্যবসা করে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আয় হত, তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলত।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: জাহাঙ্গীর আলম (০০১)। পেশা: দিনমজুর ও সাপ্তাহিক বাজারে মাছ ব্যবসায়ী।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৭৫ সাল, ৩৮ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি' ১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩, বিকাল ৩টা, স্থান: রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। জানাজা পড়ান জনাব গোলাম রব্বানী। দাফন করা হয়: এলাকার বড় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: রূপসী উত্তরপাড়া, ডাকঘর: লাল পুকুর, ইউনিয়ন: ১ নং খোড়াগাছ, উপজেলা: মিঠাপুকুর, জেলা: রংপুর।
পিতা: মরহুম মোঃ আবেদ আলী। ইন্তেকালের তারিখ: ২০০০ সাল।
মাতা: হাফেজী, বয়স ৮০ বছর, অধিকাংশ সময় রোগে ভোগেন। চিকিৎসার সামর্থ্য নেই।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: রওশন আরা বেগম, বয়স ২৮ বছর, গৃহিণী। ১ম ছেলে: মোঃ রিপন মিয়া। বয়স ১৫ বছর, ৭ম শ্রেণি, রূপসী উচ্চবিদ্যালয়। ২য় ছেলে: মোঃ লিটন মিয়া। বয়স ১২ বছর, ৩য় শ্রেণি, রূপসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৩য় ছেলে লিমন মিয়া, বয়স ৯ বছর, ২য় শ্রেণি, রুপসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৪র্থ সন্তান মেয়ে মোছাঃ জান্নাতী বেগম, বয়স- ৬ বছর, ১ম শ্রেণী, রুপসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: আফসার আলী, কৃষি, বয়স ৬৫, মোঃ লিয়াকত আলী, কৃষি, বয়স ৬০, মোঃ ওয়াহেদ আলী, ভ্যান চালক, বয়স ৫৫, মোকসেদা বেগম, গৃহিণী, বিবাহিতা, মোঃ আকতারুজ্জামান, ধান ব্যবসায়ী, বয়স-৫০-জামায়াতের-ইউপি প্রচার সম্পাদক, আলেয়া বেগম, বিবাহিত, শহীদ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, মোঃ আশরাফ আলী, রিক্সাচালক ও কৃষিজমি আবাদ, বয়স ৩০।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍