হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ আব্দুস সালাম মোল্লা
শহীদ আব্দুস সালাম মোল্লা

শহীদ আব্দুস সালাম মোল্লা

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

২৭ ফেব্রুয়ারি'১৩ তারিখে তিনি সাতক্ষীরা শহরে আসেন কৃষিজমির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে। রাতে তিনি সাতক্ষীরায় নিজ বাসায় অবস্থান করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং আল্লামা সাঈদীর রায় হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সকাল থেকেই সারা দেশে হরতাল চলছিল। প্রাণের টানে শহীদ হাজী আব্দুস সালাম মোল্লা সকাল থেকেই নেমে পড়েন হরতালের পিকেটিংয়ে। সকাল ৬.৩০ টায় হরতালের পিকেটিং এর জন্য বের হন। যাওয়ার সময় স্ত্রীকে বলেছিলেন, মমতাজ, গোসল করে পাক-সাফ হয়ে যাচ্ছি, আমি যদি শহীদ হই আমাকে গোসল করাইওনা। হজ্জের সময় আনা কাফনের কাপড়তো হারিয়ে গেছে। বাজার থেকে কাপড় কিনে টাউনের দিকেই আমাকে দাফন দিও। স্ত্রী রাগারাগি করে এই বলে বাধা দেয় যে, 'তোমার শহীদ হওয়ার সময় হয়নি। তুমি মারা গেলে বাচ্চা-সংসার কে দেখবে? ওদের বিয়ে-শাদি, ওদের লেখাপড়ার কী হবে? আমি ওদের মা এবং তোমার স্ত্রী হিসেবে বলছি..।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

"স্ত্রীকে বলেছিলেন, মমতাজ, গোসল করে পাক-সাফ হয়ে যাচ্ছি, আমি যদি শহীদ হই আমাকে গোসল করাইয়ো না। হজ্জ থেকে আনা কাফনের কাপড়তো হারিয়ে গেছে। বাজার থেকে কাপড় কিনে টাউনের দিকেই আমাকে দাফন দিও। স্ত্রী রাগ করে বাধা দেয়, 'তোমার শহীদ হওয়ার সময় হয়নি। তুমি মারা গেলে ছেলেমেয়ে-সংসার কে দেখবে? আমি একজন মা এবং স্ত্রী হিসেবে বলছি..। তখন তিনি বলেছিলেন, তুমি না রোকন। তুমি বোঝ না আমার শহীদি মৃত্যুর কামনা।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ আব্দুস সালাম মোল্লা সাতক্ষীরা আশাশুনি উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের তুয়ারডাঙ্গা গ্রামে ১৯৫২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম শাহাবুদ্দিন মোল্লা ও মাতা মরহুমা আনোয়ারা বেগমের ১৩ ছেলেমেয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। জনাব আব্দুস সালাম দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের গুদাম রক্ষকের দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন। ঘুষ লেনদেনের জন্য তাকে বারবার চাপসৃষ্টি এবং এতে তীব্র অস্বীকৃতি জানানোর কারণে তাকে ১৪/১৫ বার ট্রান্সফার করা হয়। অবশেষে ১৯৯২ সালে তিনি স্ব-উদ্যোগে চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি তার গ্রামের বাড়িতে একটি পাঞ্জেগানা মসজিদ গড়ে তুলেছেন। সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আজান দেয়ার দায়িত্ব নিয়ে ছিলেন। প্রতিদিন ফজরের নামাযের আগে তিনি মুসল্লিদের ডেকে দিতেন। তার বিরুদ্ধে কোথাও কোন অভিযোগ ছিল না। তিনি সদা অন্যের উপকার করতে তৎপর ছিলেন। দাওয়াতে দ্বীনের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। যে কোন ধরনের কাজে সর্বদা এগিয়ে আসতেন। তাঁর স্ত্রী জীবিত। তিনি ২ ছেলে ও ৩ কন্যার পিতা ছিলেন। গোটা পরিবার একমাত্র তার আয়ের ওপরই নির্ভরশীল ছিল।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৭ ফেব্রুয়ারি'১৩ তারিখে তিনি সাতক্ষীরা শহরে আসেন কৃষিজমির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে। রাতে তিনি সাতক্ষীরায় নিজ বাসায় অবস্থান করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং আল্লামা সাঈদীর রায় হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সকাল থেকেই সারা দেশে হরতাল চলছিল। প্রাণের টানে শহীদ হাজী আব্দুস সালাম মোল্লা সকাল থেকেই নেমে পড়েন হরতালের পিকেটিংয়ে। সকাল ৬.৩০ টায় হরতালের পিকেটিং এর জন্য বের হন। যাওয়ার সময় স্ত্রীকে বলেছিলেন, মমতাজ, গোসল করে পাক-সাফ হয়ে যাচ্ছি, আমি যদি শহীদ হই আমাকে গোসল করাইওনা। হজ্জের সময় আনা কাফনের কাপড়তো হারিয়ে গেছে। বাজার থেকে কাপড় কিনে টাউনের দিকেই আমাকে দাফন দিও। স্ত্রী রাগারাগি করে এই বলে বাধা দেয় যে, 'তোমার শহীদ হওয়ার সময় হয়নি। তুমি মারা গেলে বাচ্চা-সংসার কে দেখবে? ওদের বিয়ে-শাদি, ওদের লেখাপড়ার কী হবে? আমি ওদের মা এবং তোমার স্ত্রী হিসেবে বলছি..। তখন তিনি বলেছিলেন, তুমি না রোকন। তুমি বোঝ না আমার শহীদি মৃত্যুর কামনা। তিনি তাহাজ্জুদ গুজার ছিলেন, রাতের আঁধারে আল্লাহর দরবারে গভীর আকুতি নিয়ে কেঁদে কেঁদে নিজামী সাহেব ও সাঈদী সাহেবসহ সকল নেতৃবৃন্দের মুক্তির জন্য দোয়া করতেন আর শহীদি মর্যাদা কামনা করতেন।
সকালে পিকেটিংয়ের এক পর্যায়ে ঘোষণা আসলো যে কোন মুহূর্তে সাঈদীর রায় ঘোষণা হবে। টিভি দেখতে ছুটে আসেন বাড়িতে। কিন্তু বাসায় বিদ্যৎ না থাকায় বিভিন্ন জায়গায় মোবাইল করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির রায় শুনে জোরে জোরে কাঁদতে থাকেন। এ যেন আপনজন হারানো কান্না। আর বলতে থাকেন, আল্লাহ মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির রায় কার্যকরের আগে আল্লাহ যেন আমাকে তুলে নেন। নিজ চোখে সাঈদীর ফাঁসি দেখার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল। রায় ঘোষণার প্রতিবাদে বিকাল ৪টায় শহরের কদমতলা বাজারে সাতক্ষীরা জামায়াতের নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। কর্মসূচি শুরু হওয়ার আধাঘন্টা আগেই তিনি ঘটনাস্থলে চলে যান। যথাসময়ে প্রোগ্রাম শুরু হয়। লাখো সাঈদী প্রেমিকের জনস্রোত সমাবেশস্থল ছাপিয়ে সার্কিট হাউজ মোড় পর্যন্ত চলে যায়। বেলা ৫টার দিকে শুরু হয় সাঈদী প্রেমিক জনতার ওপর পুলিশ, বিজিবি ও সরকারদলীয় ক্যাডারদের মুহুর্মুহু গুলি বর্ষণ। লুটিয়ে পড়ে কয়েকজন। এসময় তিনি এগিয়ে গেলে তরুণরা বলেছিল, চাচা আপনি বুড়ো মানুষ পেছনে থাকেন। শহীদ আব্দুস সালাম মোল্লা বলেন কেন? আমি কি পারবো না? তিনি নিহত আহতদের সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি বুকে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় পার্শ্ববর্তী ডাঃ আজিজুর রহমানের ক্লিনিকের সামনে গেলে স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করে। এ সময় সরকারদলীয় ক্যাডাররা তাকে ভ্যান থেকে নামিয়ে লাঠি ও রড দিয়ে পিটাতে থাকে। তার হাত ও পা ভেঙে দেয় তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, এ সময় তিনি পানি চাইলে তার মুখে সন্ত্রাসীরা থু-থু দেয়। তিনি বার বার আল্লাহ আল্লাহ শব্দ করতে থাকেন। মৃত্যু নিশ্চিত করে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পার্শ্ববর্তী অনেকে এ ঘটনা মোবাইলে ধারণ করে। রাত ৮টার দিকে তাকে সদর হাসপাতালের মর্গে আনা হয়। এর মধ্যে সন্ত্রাসীরা তার লাশ ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে। পরের দিন ১ মার্চ সন্ধ্যায় তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রাতে শহরে একটি জানাযা হয় এবং ২ মার্চ '১৩ সকাল ১০টায় প্রায় ১০/১২ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে গ্রামের বাড়িতে জানাযা হয়। জানাযার ইমামতি করেন মাওলানা রওশন আলী।
আব্দুস সালামের নিহতের ঘটনা ইতিহাসে বিরল হয়ে থাকবে বলে সাতক্ষীরাবাসী মনে করেন। নিহতের জানাযার নামায পূর্ব সমাবেশে এক হৃদয়বিদারক অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ সময় সাঈদী প্রেমিক হাজারো জনতা বলেন, আল্লাহ আব্দুস সালামকে পছন্দ করেছেন। আমরাও আল্লাহর পছন্দের বান্দা হতে চাই। প্রয়োজনে মাওলানা সাঈদীর জীবন রক্ষার্থে আমরা লাখো সাঈদীপ্রেমিক জীবন দিব। তাকে মুক্ত না করে আমরা ঘরে ফিরে যাব না।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং আল্লামা সাঈদীর রায় হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সকাল থেকেই সারা দেশে হরতাল চলছিল। হাজার হাজার সাঈদী প্রেমিক জনতা সেদিন সাতক্ষীরা শহরের কদমতলায় জড়ো হয়। শহীদ হাজী আব্দুস সালাম মোল্লা সকাল থেকেই নেমে পড়েন হরতালের পিকেটিংয়ে। সকাল ৬.৩০ টায় হরতালের পিকেটিং এর জন্য বের হন। রায়ের পর বিকালে মিছিলে গুলি হলে তার শরীরে ৪টি গুলিবিদ্ধ হয়। তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় পার্শ্ববর্তী ডাঃ আজিজুর রহমানের ক্লিনিকের সামনে গেলে স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করে। এ সময় সরকারদলীয় ক্যাডাররা তাকে ভ্যান থেকে নামিয়ে লাঠি ও রড দিয়ে পেটাতে থাকে। তার হাত ও পা ভেঙে দেয় তারা। মৃত্যু নিশ্চিত করে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।
৪. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
পাকা একতলা বাড়ি ও টিনশেড ঘর, যা থেকে ৪৩০০ টাকা ভাড়া পাওয়া যায়। এ ছাড়া আয় করার মত আর কিছু নেই। গ্রামে ৮-১০ বিঘা জমি আছে যা প্রায় অর্ধেকের বেশি অন্যের নিকট বন্ধক দেয়া রয়েছে।
শহীদ আব্দুস সালাম মোল্লা সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। চাকরী ছেড়ে দেয়ার পর পেনশন পাওয়া টাকায় কেনা প্রায় সব জমিই বিক্রি করে দেন তাদের লেখাপড়ার জন্য। এখনও তাঁর তিনটি ছেলে-মেয়ে পড়ালেখা করছে। তাদের খরচ যোগানো এই পরিবারের সাধ্যের বাইরে। সাথে সাথে এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা কৃষি ব্যাংক ও গ্রামের বিভিন্ন মানুষ পায়।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ হাজী আব্দুস সালাম মোল্লা (০৫৯), পেশা: কৃষিকাজ।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১০/১১/১৯৫২ ইং, ৬১ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, চারটি গুলিবিদ্ধ হন।
শাহাদাতের তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বিকাল ৫টা। স্থান: সাতক্ষীরা শহরের কদমতলা এলাকা, হাসপাতালে নেয়ার পথে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পুনরায় হামলা চালালে সেখানেই শাহাদাত বরণ করেন। দাফন করা হয়: নিজ পারিবারিক কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: পুরাতন সাতক্ষীরা, ডাকঘর: সাতক্ষীরা, থানা ও জেলা: সাতক্ষীরা।
পিতা: মৃত হাজী শাহাবুদ্দিন মোল্লা।
মাতা: মৃত আনোয়ারা বেগম।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: জনাব আব্দুস সালাম দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের গুদাম রক্ষকের দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন। নিজ বাড়িতে সামান্য কৃষিজমি আছে তা দিয়েই সংসার চালাতেন।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: মমতাজ সালাম, সাংগঠনিক মান জামায়াতের রোকন, মেয়ে: সালেহা মাহবুবা, বিবাহিতা। সাবিহা মাহবুবা মুক্তা, বিবাহিতা। রাবেয়া মাহবুবা -বয়স-২১, সম্মান ২য় বর্ষ, লোকপ্রশাসন, জা.বি। ছেলে: মোন্তাজুল ইসলাম মুকুল-বয়স-২৪, মাস্টার্স শেষ পর্ব নৃ-তত্ত্ব, জা.বি। আসাদুল্লাহ আল গালিব-বয়স-১৮, এইচএসসি পরীক্ষার্থী, ২০১৪ ইং।
ভাই-বোনের বিবরণ: ভাই: মো: আব্দুস সালাম (শহীদ)। আ: সালেক, কৃষি। আব্দুল্লাহ, কৃষি। আবুল কালাম, কৃষি। ড. মোকাররম হোসেন, অধ্যাপক, সরকারি কলেজ। সাজেদুর রহমান, কৃষি। তালিম হোসেন, কৃষি। আঃ আলিম, কৃষি। সেলিম হোসেন, কৃষি। বোন: হাফিজা বেগম, বিবাহিতা। রাশিদা বেগম, বিবাহিতা। সাজিদা বেগম, বিবাহিতা। শাহিদা বেগম, বিবাহিতা।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍