হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মোঃ আলমগীর হোসেন
শহীদ মোঃ আলমগীর হোসেন

শহীদ মোঃ আলমগীর হোসেন

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মোঃ আলমগীর হোসেন, ১৯৭৩ সালে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের গোবিন্দল গ্রামে জন্ম নেওয়া এক অক্লান্ত পরিশ্রমী কৃষক। যিনি জীবনভর পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন নীরবে। অভাব–অনটনের মাঝেও ভাইবোনদের শিক্ষায় আগলে রাখা আর নিজের সন্তানের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নই ছিল তাঁর প্রেরণা। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ নবী (সা.) কে অবমাননার প্রতিবাদে ডাকা কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে তিনি শহীদের মর্যাদা লাভ করেন। সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল অবস্থান তাঁকে সাধারণ এক দিনমজুর থেকে পরিণত করেছে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর অকালপ্রয়াণ আজও পরিবার ও স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে এক গভীর শূন্যতার মতো থেকে গেছে।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মো: আলমগীর হোসেন
মানিকগঞ্জ-২
১. পরিচিতি
শহীদ মো: আলমগীর হোসেন মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার গোবিন্দল গ্রামে ১৯৭৩ইং সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়। অভাব-অনটনের সংসার হওয়ায় দরিদ্র পিতামাতা তাকে লেখাপড়া করাতে পারেননি। অল্প বয়েসেই শহীদ মো: আলমগীর হোসেনকে পিতার সাথে ধরতে হয়েছিল পরিবারের হাল। কিন্তু ছোট ভাইবোনদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। ফেরদাউস আক্তার আখি নামে তাদের একটি বাক প্রতিবন্দী কন্যা এবং মুহাম্মদ উল্লাহ রাশেদ নামে একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। শহীদ আলমগীরের শাহাদাতের ২৪ দিন পর পুত্রের জন্ম হয়। শহীদের পিতা তাঁর সমস্ত জমি-জমা অন্য ছেলেদের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে আলমগীরের স্ত্রী ও সন্তানদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। দুই সন্তান নিয়ে শহীদের স্ত্রী এখন তার বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন।
কিন্তু ঘাতক বুলেট তার সে স্বপ্নকে ভেঙে খান খান করে দেয়। বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তানের মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে শহীদ মো: আলমগীর হোসাইন সত্য ও ন্যায়ের চেতনায় উদ্দীপ্ত থেকে চলে গেলেন মহান রবের দরবারে।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
দিনটি ছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। সেদিন ছিল ইসলাম ও রাসূলকে (সা:) নিয়ে কটূক্তি ও অবমাননা করার প্রতিবাদে ইসলামী দলসমূহের ডাকে সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। হরতালের সমর্থনে সারাদেশের মত মানিকগঞ্জের গোবিন্দল বাজারের সিঙ্গাইর নামক স্থানে ব্যাপক মিছিল ও পিকেটিং হয়। এলাকার হাজার হাজার তৌহিদী জনতা মিছিল ও পিকেটিং এ অংশগ্রহণ করেন। শহীদ মো: আলমগীর হোসেন একজন কৃষক হিসেবে পিতার সাথে জমিতে কাজ করছিলেন। কাজ করা অবস্থায় শুনতে পেলেন যে, আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ) কে অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে হরতাল এবং বিক্ষোভ মিছিল হবে। তিনি ঈমানী দায়িত্ব হিসেবে এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে পিতার সাথে পরামর্শ করেন। বাবা তাকে বোঝান, আমরা গরিব মানুষ আমাদের এসব ঝামেলায় না গেলেই ভাল। নিজ হাতে ক্ষেত থেকে সরিষার বোঝাটি ছেলের মাথায় তুলে দেন ৬৫ বছর বয়সী পিতা আব্দুর রাজ্জাক। আর বোঝা মাথায় গমনরত ছেলের দিকে তৃপ্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবেন-ওর মাথায় সংসারের বোঝাটি চাপিয়ে তিনি হয়তো স্বস্তির সাথে বিদায় নিতে পারবেন। কিন্তু ওকী। মাত্র ২০০/২৫০ গজ যাওয়ার পরই বোঝা নিয়ে কাঁত হয়ে পড়ে যায় ছেলেটি। দৌড়ে যান পিতা-ওর বাম পাঁজরে একটি গর্ত। গলগল করে ঝরে লাল টকটকে রক্ত ওর জামা-লুঙ্গি আর চোখ ধাঁধানো হলুদ সরিষা ক্ষেত মুহূর্তেই বিবর্ণ করে তুললো। জনগণকে রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলিতে যেন ঝরে পড়লো একটি সামান্য পাখি। এতে কার কী আসে যায়? ওদিকে রাজনৈতিক ঝামেলামুক্ত এক বয়োবৃদ্ধ কৃষক পিতা নীরব-নিরাপদ। সবুজ ক্ষেতে টগবগে সন্তানের লাশ কোলে পাথরের মূর্তির মতোই বসে আছেন। কোন শক্তিতে এই বৃদ্ধ তাদের হতদরিদ্র সংসারের কান্ডারি, দুনিয়ার সবচেয়ে ভারী বোঝা সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে ওর জনম দুঃখিনী মা তার স্ত্রী হনুফা খাতুনের সামনে দাঁড়াবেন?
মো: আলমগীর হোসেন এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হলে অতঃপর তাকে মারাত্মকভাবে আহতাবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। এ ঘটনায় ৪ জন শাহাদাত বরণ করেন এবং শত শত লোক গুলিবিদ্ধ হন।
তার জানাযার নামাজে ইমামতি করেন তারই প্রেরণায় শিক্ষিত হওয়া ছোটভাই মাওলানা আবু হানিফ।
জানাযায় প্রায় ৫ হাজার লোক উপস্থিত ছিলেন। পিতাকে জিজ্ঞেস করলে শুধু আর্তনাদ করে কাঁদেন, মা কাছে আসেন না বারান্দায় নিশ্চল থামের মতোই বসে থাকেন। সদ্যবিধবা হওয়া অল্পবয়স্কা স্ত্রী কোলে দু সন্তানকে নিয়ে আজ যেন অতল সাগরে। ছোট ছেলে রাশেদের জন্ম পিতার শাহাদাতের ২৪ দিন পর। সে যখন বড় হবে তখন হয়তো পিতার কবরের সব সতেজতার চিহ্ন মুছে যাবে। কিন্তু তার জন্মগত বিকলাঙ্গ হাত তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে এই সুন্দর বসুধায় ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই সে একটি সার্টিফিকেট পেয়ে গেছে। সে এতিম।
ওর বোনটি আখি ওর বয়সওতো মাত্র দেড় বছর। ওরা সব কিছু বুঝার আগেই তাদের পৃথিবী একটি সাইক্লোনে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। কথা ফুটলে মাকে হয়তো জিজ্ঞেস করবে- "মা আমাদের বাবা কোথায়? সবারইতো বাবা আছে; তারা কতকিছু নিয়ে আসে। মাগো, আমাদের বাবা কেন আসে না? হয়তো বিধবা মা পাথর হয়ে যাবেন: কিন্তু সেই পাথরের চোখ থেকে অঝোর ধারায় ঝর্ণা বইবে। ছোট বাচ্চারা কিছু বুঝবে, কিছু বুঝবে না। কিন্তু মা, মেয়ে ও ছেলের ছয়টি চোখ থেকে ছটি লোনা পানির নদী মিলে হয়েতো একটি সাগরে একাকার হবে। সেই সাগরে কচি বুকের আকুতি আর ছোট্ট হাতগুলি দিয়ে হাতাপাতা করে তাদের বাবাকে খুঁজবে কিন্তু কোন দিন তার সন্ধান তারা পাবে কি?
৩. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ আলমগীর হোসেন (০৫৫),
পেশা। দিনমজুর।
জন্য তারিখ ও বয়স: ৩১.১০.১৯৭৩, ৪০ বছর,
আহত হওয়ার তারিখ: ২৪.০২.২০১৩,
শাহাদাতের তারিখ: ২৪.০২.২০১৩, সকাল ১১টা,
স্থান: গোবিন্দল, দাফন করা হয়। বাড়ীর পাশের কবর স্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: গোবিন্দল, ইউনিয়ন: সিঙ্গাইর, উপজেলা: সিঙ্গাইর, জেলা। মানিকগঞ্জ।
পিতার নাম, বয়স ও পেশা: মো: আব্দুর রাজ্জাক। ৬৫ বছর। দিনমজুর ও কৃষি কাজ।
মায়ের নাম ও ব্যাস: হনুফা খাতুন, ৫০ বছর।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: পাটশোলার বেড়া দিয়ে টিনের একচালা একটি ছোট ছাপরা ঘর, ঘরের ভিতরে একটি চকি ৪/৭ ফুট। এছাড়া কোন জায়গা-জমি নেই।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: মোছা: রাশেদা খাতুন স্ত্রী, গৃহিণী, মেয়ে: আঁখি আক্তার-দেড় বছরের শিশু, ছেলে: মুহাম্মদ উল্লাহ রাশেদ- পিতার শাহাদাতের ২৪ দিন পর জন্ম।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: হানিফ (২৩)- মাদরাসা ছাত্র। সবুজ (২০)- দিনমজুর।
মোসা: জাহানারা বেগম (১৮)-গৃহিণী। শাহনাজ (১৬)- গৃহিণী। সম্পা (১২)- ৭ম শ্রেণী সিংগাইর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍