হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ আমিনুর রহমান
শহীদ আমিনুর রহমান

শহীদ আমিনুর রহমান

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ আমিনুর রহমানের শাহাদাতের সেই দিনের বর্ণনা করতে গিয়ে মোঃ হাবিবুর রহমান লিখেছেন- ২৭এপ্রিল '১৪ আনুমানিক ৪টা ১০ মিনিটের সময় একটি ফোন পেলাম- কামালনগরে মুহুর্মুহু গুলি চলছে। পুরো এলাকা নাকি রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। তখন ভাবলাম আমাদের মেসে কিছু হলো নাতো। প্রথমে আমিনুর ভাইয়ের মোবাইলে কল দিলাম, এরপর আবু তালেব ভাই, পরে ফারাজি ভাইকেও কল দিলাম কিন্তু কেউই রিসিভ করলেন না। তখন সন্দেহ আরো ঘনীভূত হলো। পরে স্থানীয়দের কাছে ফোনে জানতে পারলাম খুলনা মহানগর সভাপতি আজিজুল ইসলাম ফারাজি ও শহর সভাপতি আবু তালেব ভাইসহ সাতজন গুলিবিদ্ধ এবং শহীদের মিছিলে যোগ দিলেন প্রিয় আমিনুর রহমান। সংগঠনের প্রতিটি কর্মসূচি আন্তরিকতা, সাহসিকতা ও নিষ্ঠার সাথেই পালন করেছেন। ইসলামী আন্দোলনে এই সক্রিয় ভূমিকা পালনই কাল হয়ে দাঁড়ালো। হায়েনাদের নজরে পড়ে যান তিনি। তাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে তারা। অবশেষে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে যায়।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহিদী কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাতক্ষীরা শহর শাখার সেক্রেটারী শহীদ আমিনুর রহমান ১৯৮৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানাধীন রঘুনাথপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মফিজউদ্দীন সরদার ও মাতা রহিমা খাতুনের বারো সন্তানের মধ্যে শহীদ আমিনুর রহমান এগারোতম। বাংলায় মাস্টার্স শেষ করে সাতক্ষীরা ল' কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন শহীদ আমিনুর রহমান।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
২৭.৪.২০১৪ তারিখ সাতক্ষীরা শহরের কামালনগর কবরস্থানের উত্তরপাশে মুকুলের বাড়ির ছাত্রাবাসে শহীদ আমিনুরসহ ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা দুপুরের খাবার গ্রহণ করছিলেন। হঠাৎ করে দুপুর ৩টার দিকে সাতক্ষীরা সদর থানা ও গোয়েন্দা শাখার পুলিশের একাধিক টিম উক্ত ছাত্রাবাসের চারপাশ ঘিরে ফেলে এবং ছাত্রবাসকে লক্ষ্য করে মুর্তুর্মুহু গুলি চালায়। এ সময় পুলিশ শহীদ আমিনুরকে দেখে সরাসরি পিঠে গুলি করলে তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
লেখাপড়া আর ইসলামী ছাত্র শিবির- এ দুটি নিয়েই শহীদ আমিনুর সব সময় ব্যস্ত থাকতেন। সংগঠনের সকল কাজে তিনি ছিলেন অগ্রগামী। বন্ধু ও নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি নিজের শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষার কথা বলতেন। আওয়ামী সরকারের দুঃশাসনের ভয়াল জনপদ সাতক্ষীরায় সংগঠন পরিচালনায় যে কোন পরিস্থিতিতে তিনি নেতা-কর্মীদের হাসিমুখে উজ্জীবিত করতেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
বাংলাদেশের দক্ষিণের জনপদ সাতক্ষীরা। তৌহিদী জনতার আবেগ-অনুভূতির সাথে গভীরভাবে মিশে আছে এ জেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ ইসলামকে ভালোবাসে বলেই আশা-আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্নের যেন শেষ নেই। সুন্দরবনের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা এ জনপদকে নিয়ে বাতিলের ষড়যন্ত্রও যেন নির্ভেদ্য। তথাকথিত প্রগতিশীল ও আওয়ামী হায়েনাদের নখরাঘাতে এ জনপদ রক্তাক্ত হয়েছে বারবার। কালিগঞ্জে শহীদ আলী মোস্তফার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে ১৯৯৯ সালের ২৫ নভেম্বর এ জনপদে শহীদি মিছিলের যাত্রা শুরু হয়। একে একে এ মিছিলে নাম লিখিয়েছেন শহীদ শেখ রহমত আলী, রফিকুল ইসলাম, আমানউল্লাহ আমান, শামসুজ্জামান খান রেজা, শেখ মোস্তফা আরিফুজ্জামান, হোসেন আলী, আরিজুল ইসলাম, আবুল কালাম, আলী মোস্তফা, ইকবাল হাসান তুহিন, আবু হানিফ ছোটনসহ আরো অনেকে।
২৭ এপ্রিল ২০১৪, দুপুর তিনটা। সাতক্ষীরা শহরের কামালনগর কবরস্থানের উত্তর পাশে মুকুলের বাড়ির ছাত্রাবাসে ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা দুপুরের খাওয়া দাওয়া করছিল। কেউ কেউ ঘুমাচ্ছিল। এ সময় হঠাৎ করে সদর থানা ও গোয়েন্দা শাখার পুলিশের একাধিক টিম উক্ত ছাত্রাবাসের চারপাশ ঘিরে ফেলে এবং ভেতরে ঢুকে সাতক্ষীরা শহর ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি আমিনুর রহমানকে ধরে পিঠে গুলি করে। এতে তার কলিজা বুক দিয়ে গুলির সাথে বের হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। এ সময় তারা মোঃ আবু তালেব (৩০), মোঃ আজিজুল ইসলাম (৩০), শেখ আব্দুল গফুর (২৩), নূর মোহাম্মাদ (১৮), আব্দুস সবুর (১৮), মোঃ ইমরান হোসেন (২৬), মোঃ আক্তার হোসেনকে (২৫) ধরে চোখ বেঁধে একে একে গুলি করে। শাহাদাতের পরদিন ২৮ এপ্রিল দুপুর দুইটায় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল থেকে লাশ গ্রহণ করেন শহীদের ছোট ভাই, ছোট বোন, স্থানীয় মেম্বার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয় ৩/৪ জন মিলে জানাজা পড়ে ফেলতে, লোকজন সমাগমের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। কিন্তু বিকেল তিনটায় দক্ষিণ বিলে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিত হয় জানাজার উদ্দেশ্যে। দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষ জানাজায় উপস্থিত হন। জানাজায় ইমামতি করেন শহিদের ভাই রেজাউল করিম।
শহীদের আপনজনদের কথা:
শহীদের বৃদ্ধ পিতা: পুলিশের গুলিতে আমিনুর রহমানের শাহাদ বরণের খবর তার গ্রামের বাড়ি কালিগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর গ্রামে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। তার বৃদ্ধ পিতা মফিজউদ্দিন সরদার ও তার মাতা ছবিরন নেছা অপর ছেলে-মেয়েদের গলা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। তারা বুক চাপড়াচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে, "হে আল্লাহ আমার বাবার কি অপরাধ ছিল। সে তো মানুষদের কুরআনের পথে, হাদিসের পথে ও ইসলামের পথে দাওয়াত দিতো। তার তো আর কোনো অপরাধ ছিলো না। এই অপরাধে পুলিশ যদি আমার বাবাকে মেরে থাকে তাহলে কুরআনের কথা অনুযায়ী বাবার সঙ্গে জান্নাতে দেখা হবে।"
এলাকাবাসী: একটি ছাত্রাবাসে ছাত্ররা যখন দুপুরের খাবার খাচ্ছিল তখনই তাদের গুলি করে হত্যা করা হল। এ ঘটনায় আমরা হতবিহবল হয়ে পড়েছি। এভাবে মেধাবী ছাত্রদের হত্যা করে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
সংগঠনের দায়িত্বশীলের বক্তব্য
শহীদ আমিনুর রহমানের শাহাদাতের সেই দিনের বর্ণনা করতে গিয়ে মোঃ হাবিবুর রহমান লিখেছেন- ২৭এপ্রিল '১৪ আনুমানিক ৪টা ১০ মিনিটের সময় একটি ফোন পেলাম- কামালনগরে মুহুর্মুহু গুলি চলছে। পুরো এলাকা নাকি রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। তখন ভাবলাম আমাদের মেসে কিছু হলো নাতো। প্রথমে আমিনুর ভাইয়ের মোবাইলে কল দিলাম, এরপর আবু তালেব ভাই, পরে ফারাজি ভাইকেও কল দিলাম কিন্তু কেউই রিসিভ করলেন না। তখন সন্দেহ আরো ঘনীভূত হলো। পরে স্থানীয়দের কাছে ফোনে জানতে পারলাম খুলনা মহানগর সভাপতি আজিজুল ইসলাম ফারাজি ও শহর সভাপতি আবু তালেব ভাইসহ সাতজন গুলিবিদ্ধ এবং শহীদের মিছিলে যোগ দিলেন প্রিয় আমিনুর রহমান। সংগঠনের প্রতিটি কর্মসূচি আন্তরিকতা, সাহসিকতা ও নিষ্ঠার সাথেই পালন করেছেন। ইসলামী আন্দোলনে এই সক্রিয় ভূমিকা পালনই কাল হয়ে দাঁড়ালো। হায়েনাদের নজরে পড়ে যান তিনি। তাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে তারা। অবশেষে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে যায়।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক জনাব রুহুল আমিন বলেন- আমি দেখেছি শহীদ আমিনুর রহমান ভাইকে আন্দোলনের কাজে কষ্টের সাগর হাসিমুখে পাড়ি দিতে। জুলুমবাজ সরকার যখন ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান, সাঁড়াশি অভিযান, দেখামাত্র গুলি করার ঘোষণা দিলো তখন কিছুদিন আমিনুর রহমান ভাই আর আমি রাতের বেলা একই এলাকায় থাকতাম, আহ প্রচন্ড শীতে নিজের চাদর সাথীদের দিয়ে কত কষ্টে রাতের পর রাত কাটিয়েছে, সেই সময়গুলি আমাদের জন্য ছিলো এক অন্যরকম বেদনা-বিধুর, একদিন রাত বারটার পর হঠাৎ আমার মোবাইল বেজে উঠলো। রিসিভ করে শুনি আমার একজন দায়িত্বশীল কান্না জড়িত কণ্ঠে বলছে ভাই আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি বললাম কি হয়েছে, এত রাত্রে কাঁদছেন? আমাকে বললেন, ভাই অনেক দিন ধরে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি রাতের বেলা থাকতাম, কিন্তু পুলিশের ভয়ে আজ কেউ জায়গা দিলো না, তাই বাড়িতে শুয়েছিলাম কিন্তু সেটাও হলো না। আমার জন্মদাতা পিতা-মাতা আমার হাত ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে বলেছে- বাবা তুই অন্য কোথাও যেয়ে থাক নইলে বাড়িতে পুলিশ আসবে। তাই কোথাও জায়গা না পেয়ে নির্জন মাঠে গাছের নিচে বসে রাত কাটাচ্ছি। ভাই আমাদের কী অপরাধ? জেলা সভাপতি হিসাবে সেদিন আমি কোন উত্তর দিতে পারেনি। শুধু বলেছিলাম আমাদের অপরাধ একটাই- আমরা মানুষদেরকে আল্লাহর পথে ডাকি।
মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন- "শহীদ আমিনুর ভাই আমাদের মাঝে নেই ভাবতেই পারি না। চোখের সামনে যেন সব সময় তাকে দেখছি। সেই সুন্দর হাসি, সেই নিষ্পাপ চাহনি, সেই পবিত্র মুখাবয়ব কী প্রাণবন্ত, কী মায়াবী! সব সময় যেন বুকের ভেতর যন্ত্রণায় হাহাকার আর নেই, নেই শব্দের মিছিল। আমার হৃদয়পটে যে ক্ষত রেখে গেছে তা আমৃত্যু আমাকে তাড়া করে বেড়াবে। একজন চৌকস, দূরদর্শী, বুদ্ধিমান, অসাধারণ মেধাবী সেনাপতির নাম শহীদ আমিনুর রহমান। তিনি ছিলেন আমার দীর্ঘ সাংগঠনিক জীবনের সহপাঠী। আমিনুর ভাই শহর শাখার সেক্রেটারি তখন আমি জেলা শাখার সেক্রেটারি। কত পরিকল্পনা, কত স্বপ্নের কথা শুনেছিলাম তাঁর কাছ থেকে! সেই স্বপ্নের কথাগুলো আজও আমার কানে ধ্বনিত হয়। অপার সম্ভাবনাময় এই মেধাবী ছাত্রনেতা ছিলেন দেশ ও জাতির সম্পদ। ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের একজন দক্ষ কারিগর। অনেক বার আমি শহীদ আমিনুর ভাইকে নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছি, কিন্তু স্বাভাবিক থাকতে পারিনি। চোখের পানিতে বুক ভেসে গেছে। অবশেষে বিবেকের তাড়নায় আজ লিখতে বসলাম। একজন ক্ষণজন্মা প্রবাদপুরুষ, স্মৃতির আকাশে সদা বিরাজমান ফুটন্ত গোলাপ শহীদ আমিনুর রহমান। একজন মানুষ একই সাথে এতগুলো গুণের অধিকারী হতে পারে এখনও আমার কাছে তা অবিশ্বাস্য মনে হয়। আজ খুব বেশি মনে পড়ছে, সুন্দরবন বেড়াতে যাওয়ার সেই হিরন্ময় সব স্মৃতিগুলো। এক সাথে নৌকায় বৈঠা বেয়েছি, হেঁটেছি, গাছে উঠেছি। দুপুরবেলা সবাই মিলে সাঁতার কেটেছি সেই মধুময় ক্ষণ সত্যিই ভুলবার নয়। আমার জীবনের ভালো লাগা ভ্রমণগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি স্মৃতিময় হয়ে আছে। তার সাথে প্রথম পরিচয় ২০০৪ সালে সাথী শিক্ষা শিবিরে। এরপর এক সাথে থানা সেক্রেটারি, থানা সভাপতি থেকে শুরু করে শাখা সেক্রেটারি পর্যন্ত তাকে নিয়ে এত বেশি উল্লেখ করার মতো ঘটনা রয়েছে, যা ক্ষুদ্র পরিসরে লিখে শেষ করা যাবে না। নেতৃবৃন্দের মুক্তি, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ইসলাম রক্ষার আন্দোলনে যে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন তা পরবর্তী দায়িত্বশীলদের জন্য প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ২৮ ফেব্রুয়ারি '১৩ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী হুজুরকে ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির রায়ের পর সারা দেশের মতো সাতক্ষীরাতেও ইসলামপ্রিয় জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আনুমানিক বেলা আড়াইটায় কদমতলা বাজারে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। সেখানে কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক কামরুজ্জামান সোহেল ভাই উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমিনুর ভাই ও আমাকে বললেন, আপনারা দুই সেক্রেটারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। জনতার মাঝে গিয়েও তাদের স্বাভাবিক করতে পারলাম না। তারা যেন বিক্ষোভে পাগলপারা। এক পর্যায়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই একের পর এক গুলিবিদ্ধ ভাইদের মিছিল।
পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মুহুর্মুহু গুলির শব্দে পরস্পরের কথা শোনা যাচ্ছিল না। তখন আমরা দু'জন একটি উঁচু স্থানে উঠে সবাইকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলাম। সেই রণক্ষেত্রে তার সাহসী ভূমিকায় আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমার বলতে দ্বিধা নেই, সে সময় অনেকেই যখন কিছুটা হতবিহ্বল, বিমর্ষ তখন তার মনোবল, কর্মদীপ্ততা এবং ধৈর্যশীলতা আজো আমাদের অনুপ্রেরণা। আন্দোলন সংগ্রামে মিছিল-পরবর্তী পথসভায় বক্তব্য দেয়ার কারণে রক্তপিপাসুদের চোখের কাঁটা হয়ে দাঁড়ান। একদিন তথ্য পেলাম পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। পরদিন তাকে সাবধান করার জন্য বললাম, ভাই পুলিশ আপনাকে খুঁজছে, আপনি একটু সাবধানে থাকবেন। আমাকে বললেন, হাবিবুর ভাই, জীবন-মৃত্যুর ফায়সালা আল্লাহর হাতে, তাছাড়া আমার সারা জীবনের কামনা-বাসনাই তো শহীদি মৃত্যু। অবশেষে মহান রাব্বুল আলামিন তার সে স্বপ্ন পূরণ করে প্রিয় বান্দাদের কাতারে তাকে শামিল করলেন।"
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক জনাব রুহুল আমিন বলেন- আমার সাথে প্রথম পরিচয় শ্যামনগর সরকারী কলেজে, আমি তখন শ্যামনগর উপজেলা সভাপতি আর আমিনুর ভাই কালিগঞ্জ কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন সভাপতি। প্রথম সাক্ষাতে যে আপন হয়ে গিয়েছিল জীবনের শেষ পর্যন্ত তা আর ভোলার নয়। আমি দেখেছি সংগঠনের প্রতি তার ভালোবাসা আর আনুগত্য। আমিনুর ভাই আমাকে বলেছিল ভাই আমার কালিগঞ্জ অনেক পথ যেতে কষ্ট হয়, আমাকে শ্যামনগর শাখায় নিন, আমি তৎকালীন থানা সভাপতি আব্দুর রব ভাইয়ের সাথে কথা বলে তাকে আমাদের শাখায় নিতে চাইলে তিনি রাজি হননি, এ খবর জানার পর আমিনুর ভাই আর কোন কথা না বলে আনুগত্যের যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন সত্যি তা অনুসরণীয়।
এরপর সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমিনুর ভাইয়ের দায়িত্ব আসলো আশাশুনি উপজেলায়, আমি তখন জেলা অফিস সম্পাদক আমিনুর ভাইকে আমি কালিগঞ্জ থেকে মটর সাইকেলে করে আশাশুনি নিয়ে গিয়েছিলাম, সেদিন দেখেছিলাম আমিনুর ভাইয়ের অশ্রুসিক্ত দু-নয়ন অঝোরে পানি ঝরেছিলো কিন্তু তার জীবনের চেয়ে বেশি প্রিয় এ কাফেলার আনুগত্য করতে দেরি করেননি জান্নাতের এই ফুটন্ত গোলাপটি।
শহীদের চাচাতো ভাই সাইদুজ্জামান বলেন- আমাদের এলাকায় যত ছেলে আছে সবার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন আমিনুর রহমান। সদালাপী, ধৈর্যশীল, হাঁটুর উপরে কোনদিন কাপড় উঠতে দেখিনি। বাড়ি আসলে যার সাথেই দেখা হতো তার খোঁজ খবর নিতেন।
এক নজরে শহীদ আমিনুর রহমান
পুরোনাম: শহীদ আমিনুর রহমান
পিতার নাম: মফিজউদ্দীন সরদার
মাতার নাম: রহিমা খাতুন
জন্ম তারিখ: সেপ্টেম্বর ১২, ১৯৮৭
ভাই বোন: ১২ ভাই বোনের মধ্যে ১১ তম।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রামঃ রহমতপুর, থানাঃ কালিগঞ্জ, জেলাঃ সাতক্ষীরা।
সাংগঠনিক মান: সদস্য, সাতক্ষীরা শহর শাখার সেক্রেটারী
সর্বশেষ পড়ালেখা: মাস্টার্স (বাংলা), সাতক্ষীরা ল' কলেজ।
শাহাদাতের স্থান: কামালনগর সরকারী কবরস্থানের পাশে ছাত্রাবাসে গুলি করে হত্যা।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍