হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদমোঃ আবু হানিফ ছোটন
শহীদমোঃ আবু হানিফ ছোটন

শহীদমোঃ আবু হানিফ ছোটন

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

১৮ ফেব্রুয়ারি-২০১৪, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে হাড়তদহমুখী ঘেরের পাশ থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পদ্মশাকরা গ্রামের বাসিন্দা শহর আলী গাজীর ছেলে মোঃ আবু হানিফ ছোটনকে গ্রেফতার করে মাথায় কালোটুপি পরিয়ে গাড়িতে তোলে। এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে পুষ্পকাটি পুরাতন ইটভাটায় নিয়ে যায়। সেখানে রেখে তাঁকে ব্যাপক নির্যাতন করে। একপর্যায়ে শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে যৌথবাহিনীর সদস্যরা হানিফকে পূর্ব ভোমরাবন্দর লাভলু স্কেলের সামনে নিয়ে তাকে লক্ষ্য করে পর পর ৮/১০ রাউন্ড গুলি করে। তাদের এই গুলির শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভয়ে কেউ ঘটনাস্থলে যেতে পারেনি। হানিফকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদের পরিচিতি
শহীদ আবু হানিফ ছোটন ২০০০ সালের ৫ জানুয়ারী সাতক্ষীরার সদর উপজেলার পদ্মশাখারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আট ভাই-বোনের মধ্যে সপ্তম এবং ভাইদের মধ্যে ছোট। এজন্য পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনরা আদর করে তাকে 'ছোটন' বলে ডাকতো। মূলত সে থেকেই তাঁর নাম ছোটন হয়েছে। শহীদ আবু হানিফ ছোটন ভোমরা দাখিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মী ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
১৮ ফেব্রুয়ারি-২০১৪, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে হাড়তদহমুখী ঘেরের পাশ থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পদ্মশাকরা গ্রামের বাসিন্দা শহর আলী গাজীর ছেলে মোঃ আবু হানিফ ছোটনকে গ্রেফতার করে মাথায় কালোটুপি পরিয়ে গাড়িতে তোলে। এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে পুষ্পকাটি পুরাতন ইটভাটায় নিয়ে যায়। সেখানে রেখে তাঁকে ব্যাপক নির্যাতন করে। একপর্যায়ে শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে যৌথবাহিনীর সদস্যরা হানিফকে পূর্ব ভোমরাবন্দর লাভলু স্কেলের সামনে নিয়ে তাকে লক্ষ্য করে পর পর ৮/১০ রাউন্ড গুলি করে। তাদের এই গুলির শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভয়ে কেউ ঘটনাস্থলে যেতে পারেনি। হানিফকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের প্রতিবাদে শাহাদাত বরণকারী শিবিরের সাথী প্রার্থী শহীদ আলি মোস্তফার গুলিবিদ্ধ দেহ রাস্তায় পড়ে ছিল। তিনি আলী মোস্তফার নিথর দেহটা কাঁধে করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। এতে তাঁর সমস্ত জামা-কাপড় রক্তে ভিজে গিয়েছিল। আবু হানিফ ছোটন আলী মোস্তফার শহীদ হওয়ার আগে মামলা থাকার কারণে বোনের বাড়িতে থাকতেন। কিন্তু শহীদ হওয়ার আগের দিন তাঁর সকল জিনিস-পত্র নিয়ে বাড়ি চলে আসেন। বন্ধুরা তাঁকে বাড়ি আসতে নিষেধ করছিলেন। মাদরাসার ক্লাস শুরু, নতুন বই নেওয়া হয়নি এবং তিনি মাদরাসা যাবেন বলে বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়ি এসে তিনি মাদরাসা যাওয়ার জন্য দর্জির দোকান থেকে নতুন পাঞ্জাবীও নিয়ে আসেন।সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
বাংলাদেশের দক্ষিণের জনপদ সাতক্ষীরা। ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ৩৭ জন শাহাদাত এবং অসংখ্য পঙ্গুত্ববরণের মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরা "শহীদী জনপদ" হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ১ জানুয়ারি ২০১৪ যৌথ বাহিনীর অভিযানে আবু হানিফ ছোটনের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয় এলাকাজুড়ে।
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে হাড়তদহমুখী ঘেরের বাসা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পদ্মশাকরা গ্রামের বাসিন্দা শহর আলী গাজীর ছেলে মোঃ আবু হানিফ ছোটনকে গ্রেফতার করে মাথায় কালোটুপি পরিয়ে গাড়িতে তোলে। এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে পুষ্পকাটি পুরাতন ইটভাটায় নিয়ে যায়। এখানে রেখে তাকে ব্যাপক নির্যাতন করে। এক পর্যায়ে শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে যৌথবাহিনীর সদস্যরা হানিফকে পূর্ব ভোমরা বন্দর লাভলু স্কেলের সামনে নিয়ে পর পর ৮/১০ রাউন্ড গুলি করে। গুলির শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভয়ে কেউ ঘটনাস্থলে যেতে পারেনি। আবু হানিফকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে আবু হানিফের কোন খোঁজ-খবর না পেয়ে তার পরিবার পাগলপ্রায় হয়ে যায়। শনিবার ভোর রাতে গুলির খবর পেয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ-খবর নিতে থাকে। এর মধ্যে টিভিতে দ্যাখে সাতক্ষীরার ভোমরায় 'ছোটন' নামের একজন যৌথবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে। পরবর্তীতে পুলিশের কাছে খবর নিয়ে জানতে পারে আবু হানিফকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর বুকে, পিঠে গুলির চিহ্ন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শহীদ মোঃ আবু হানিফ ছোটন ভোমরা দাখিল মাদরাসার নবম শ্রেণীর ছাত্র।
শহীদের আপনজনদের কথা:
শহীদ সম্পর্কে পিতার অভিব্যক্তি আমার সন্তান শহীদ হওয়ার আমার কোন আক্ষেপ নেই, আমার ছেলে শহীদ হওয়ায় যদি বাংলার জমিনে আল্লাহর দিন কায়েম হয় তাতেই আমি খুশি। দ্বীন কায়েমের পথে যদি আমার বাকি ছেলেরাও শহীদ হয়ে যায়, আমার কোন আফসোস থাকবে না।
মায়ের অভিব্যক্তি: আমার ছেলে আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে এতেই আমি সৌভাগ্যবান। আমার এক ছোটন চলে গেছে, অনেক ছোটন তো আমাকে মা বলে ডাকছে। আমি আগে এক ছোটনের মা ডাক শুনতাম, এখন অনেক ছোটন আমাকে মা বলে ডাকবে। আমার কোন দুঃখ নেই।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আল্লামা সাঈদীর রায়ের প্রতিবাদে শাহাদাত বরণকারী শিবিরের সাথী প্রার্থী শহীদ আলি মোস্তফার গুলিবিদ্ধ দেহ রাস্তায় পড়ে ছিল। আবু হানিফ ছোটন আলী মোস্তফার নিথর দেহটা কাঁধে তুলে হাসপাতালে নিয়েছিল এবং তার সমস্ত শরীর রক্তে ভিজে গিয়েছিল। বাসায় ফেরার পর আমি তাকে জিজ্ঞাস করি- বাবা তোমার সমস্ত জামাকাপড়ে রক্ত কেন? সেদিন সে বলেছিল- মা আমার এক ভাই পুলিশের গুলিতে শাহাদাতবরণ করেছে, ওনাকে হাসপাতালে নিয়েছিলাম তো তাই। সেদিন সে বলেছিলো- "মা। আমি যদি শহীদ হই তবে তুমি কাঁদবে নাতো? আমি সেদিন না বুঝে, ছোট ছেলে ভুল বকছে এই ভেবে বলেছিলাম-"না! আমি কাঁদবো না।" শহীদ আবু হানিফ ছোটনের মা মোসাঃ হাসিনা খাতুন এ ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে জ্ঞান হারান।
আমার সাড়ে তেরো বছরের মাছুম বাচ্চাকে গুলি করে ওরা হত্যা করেছে। গুলি করার আগে তারা সারারাত ধরে আমার বাচ্চার ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে। তাঁর সারা শরীর আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। সে তো একজন মাদরাসার ছাত্র। তালিবে এলেম। কুরআন-হাদিস পড়াই ছিল তার কাজ। আর সেই কুরআন-হাদিস পড়ার কারণেই কি তাকে এভাবেই জীবন দিতে হলো বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। আবার চোখ মুছতে মুছতে বলে উঠলেন, "এই দুনিয়ায় আমার বাচ্চার হত্যার বিচার চাই না। আর বর্তমান সরকারের কাছে তো না-ই। এরা তো সরকার না এরা আজরাঈল। তারা প্রতিদিনই কোন না কোন মা-বাপের কোল খালি করছে।
আমার বাচ্চারে যারা খুন করেছে তাদের কোলও একদিন আল্লাহ তায়ালা খালি করবে। এ জন্য এর বিচার আল্লাহ তায়ালার কাছেই দিলাম।" এই বলতে বলতে মুর্ছা যান। এভাবেই শহীদ মোঃ আবু হানিফ ছোটনের বৃদ্ধ পিতা মোঃ শহর আলী। এ সময় ঘরের মধ্যে শহীদ আবু হানিফের মা হাসিনা খাতুন অজ্ঞান অবস্থায় পড়েছিল। আর তার বড় ভাই-বোনেরা বুক চাপড়াতে চাপড়াতে একবার রাস্তায় আর একবার বারান্দায় এসে হাউমাউ করছে আর বলছে, কোন দেশে বাস করছি আমরা। ছোট ভাই কুরআন-হাদিস পড়ে বড় মাওলানা হবে এ আশায় আট ভাই-বোনের মধ্যে ছোট (সাত নম্বর) এই ভাইকে ভোমরা দাখিল মাদরাসায় পড়াচ্ছিলাম। কিন্তু সরকার সেই আশা পূরণ করতে দিলো না। আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত উঁচু করে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে ভাই হত্যার বিচার তার কাছে তুলে দিয়ে ছোট ভাইয়ের লাশের অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। যৌথবাহিনীর ভয়ে কেউ আবার হাসপাতালে লাশও আনতে যেতে পারেনি। পুলিশ দুপুরে আবু হানিফের লাশ হস্তান্তর করলে দূর সম্পর্কের লোকজন হানিফের রক্তমাখা লাশ বাড়িতে নিয়ে আসে। এ সময় তার মাতা-পিতা, ভাই-বোনসহ আত্মীয়-স্বজনের আহাজারীতে পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। যোহর বাদ স্বল্প পরিসরে জানাযা শেষ করে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাদা-দাদির কবরের পাশে দাফন করা হয়। আবু হানিফের পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে কেউ উচ্চ শিক্ষিত না হলেও তার স্বপ্ন ছিল সে লেখাপড়া করে বড় হয়ে মাতা-পিতার মুখ উজ্জ্বল করবে আর সকলের মাঝে কুরআন-হাদিসের জ্ঞান ছড়িয়ে দেবে। তার এ আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে দিল না এই সরকার- এ কথা বলতে বলতে সহপাঠিরাও হাউমাউ করে কেদে ওঠে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা উৎসুক লোকজনও চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারেনি। সকলেই যেন একাকার হয়ে গেল এই শোকাহত পরিবারের সদস্যদের আহাজারীর সাথে।
দায়িত্বশীলদের কথা:
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাতক্ষীরা জেলার সাবেক সভাপতি আবু তালেব আবু হানিফ ছোটনের শাহাদাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন- ১৭ জানুয়ারি ২০১৪ বিকাল ৫টা হঠাৎ সদর দক্ষিণ সভাপতি হাফেজ মনির ভাইয়ের ফোন। ভাই আমার এক কর্মী আবু হানিফ ছোটনকে ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে। সদর থানার ওসি এনামুল হকের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে উনি কিছুই জানেন না বললেন। ডিবির ওসি আব্দুল হান্নানের কাছে জানতে চাইলে উনিও বিষয়টা অস্বীকার করেন। কেন্দ্র, স্থানীয় দায়িত্বশীলদের বিষয়টা অবহিত করি। আমিনুর ভাইকে (পরবর্তীতে শহীদ) ডিবি অফিস ও থানায় সাংবাদিক পাঠিয়ে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করতে বলি। রাত যত গভীর হচ্ছে অজানা আশঙ্কা ভর করছে। রাত্র ১২.৩০ পর্যন্ত আমিনুর ভাই, আমি, স্থানীয় মুরব্বী ও সাংবাদিকসহ সকল প্রকার সোর্স এর মাধ্যমে গ্রেফতারের বিষয়টা নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম। সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। অবশেষে সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল মহান প্রভুর সান্নিধ্যে আমার প্রিয় ভাইয়ের জন্য দোয়া করলাম।
আল্লাহ যাকে পছন্দ করেছেন, কোনো বাঁধন তাকে আটকাতে পারে না। ফজরের আজানের শব্দের সাথে সাথে ভোমরা স্থল বন্দর, রাসেল স্কোয়ারের নিকট গুলির শব্দ হয়। আজানের পরেই মনির ভাইয়ের ফোন! অজানা আশঙ্কায় ফোন রিসিভ করলাম। অপর প্রান্ত থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালো পুলিশের গুলিতে ছোটন ভাই শাহাদাত বরণ করেছে। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। আমিনুর ভাইসহ স্থানীয় মুরব্বী ও কেন্দ্রকে জানালাম। আমিনুর ভাইকে, ছোটন ভাইয়ের বাড়িতে পাঠালাম। হাসপাতালে নিকটতম আত্মীয়দের পাঠাতে বললাম। দুপুরে শহীদ ছোটন ভাইয়ের বাড়িতে পৌঁছাই। নিজেকে খুব বেশি অপরাধী মনে হচ্ছিল। মাকে কী দিয়ে সান্ত্বনা দেব। ক্রন্দনরত মায়ের প্রশ্নের কী জবাব দেব। অজানা ভাবনায় নিজেকে আবিষ্কার করি গন্তব্যহীন পথিক হিসেবে। একসময় মায়ের সামনে হাজির। একটু পূর্বে-ই যে মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার বিভিন্ন ভাষা আবিষ্কার করার চেষ্টায় নিজেকে অন্য ভুবনের মানুষ মনে হয়েছিল। মা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, বাবা আমি তো গর্বিত আমার ছেলে শাহাদাত বরণ করেছে।
আল্লাহ আমাকে শহীদের মা হওয়ার সৌভাগ্য দিয়েছেন। আমার এক ছোটন শহীদ হয়েছে তাতে কি হয়েছে, তোমরা 'অনেক ছোটন' তো আমার পাশে অপেক্ষমাণ। আমাকে দেখ! আমি তো কাঁদছি না। তোমরা কেন কাঁদছো? আমার ছোটন যে এত ভাল ও সুন্দর ছেলেদের সাথে মিশত তা যদি আগে জানতে পারতাম তাহলে আল্লাহর কাছে অনেক আগেই তার শাহাদাতের জন্য দোয়া করতাম। যাতে তোমাদের মতো জান্নাতী মানুষদের সাথে আরো অনেক আগে দেখা হত।
এলাকার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, নারী-পুরুষ ও শিশু সকলে এই প্রিয় মুখটি একপলক দেখার জন্য সকাল থেকে প্রহর গুনছে। হাজার হাজার মানুষের ভিড়। মাগরিবের পরে শহীদের কফিন আমাদের কাছে পৌঁছাল পুলিশের প্রহরায়। সমগ্র এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এল। মা তার প্রিয় সন্তানের মুখটা দেখার জন্য ছুটে এলো। মা মনে করেছিলো, শিশু (ছোটন) তার উপর রাগ করে চলে যাওয়ার ভান করে ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। যদিও অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে সে প্রতি মুহূর্ত মায়ের আদুরে ডাক আসা করছে। স্নেহময়ী মায়ের কাছ থেকে সে ডাক আসবে। অবাধ্য শিশুটি আরো উৎসাহ নিয়ে স্নেহময়ী মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু মা ডাকলো ঠিকই! তার কলিজার টুকরার সে অভিমান আর ভাঙল না।
সকলে প্রিয় মুখটিকে একপলক দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে যায়। নিষ্ঠুরতার একি নির্মম পর্যায়। প্রিয় মুখটি সকলের দেখা হলো না। খুব অল্প সময়ে জানাজা ও দাফন সমাপ্ত করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হলো। শহীদ আবু হানিফ ছোটন ৯ম শ্রেণীর একজন ছাত্র। এত অল্প বয়সে কী অপরাধ করেছিল? সরকার উৎখাতের জন্য কী ষড়যন্ত্রই করেছিল? অথবা সরকার ধ্বংসের কী পরিকল্পনার কথা তার জানা ছিল? তাকে গ্রেফতার করে রাতভর অত্যাচার ও নির্যাতন করা হয়। এমন কী তথ্য তার কাছে জানতে চেয়েছিল? এমন কোন তথ্য জানতে চেয়েছিল, যে তথ্যের জন্য হয়ত সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। সে তথ্য না দেওয়াতে তাকে রাতভর সমস্ত শরীরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়েছে এবং বিভিন্নভাবে নির্যাতন করেছে। বাস্তব সাক্ষী তার ক্ষত-বিক্ষত দেহখানা। এতেও তারা ক্ষান্ত হয়নি, যেখানে একজন মানুষ মারার জন্য একটা বুলেট ই যথেষ্ট, সেখানে ঐ ছোট্ট দেহে ৭ টি বুলেট মেরে ঝাঁঝরা করে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, হজরত খোবায়েব (রা.) কে শুলে চড়ানোর পূর্বে বলা হয়েছিল, তোমার এই স্থানে যদি মোহাম্মদকে নিয়ে আসা হয়? মৃত্যুর পথযাত্রী খোবায়েব সেদিন বলেছিল-আমার শরীরে একফোটা রক্ত থাকতে আমার প্রিয় রাসূল (সা.)-এর কোন ক্ষতি হতে দেব না এবং সহ্যও করবো না। ঠিক তেমনি, সদ্য ৮ম শ্রেণী সমাপ্ত কৈশোর আবু হানিফ ছোটন কিবা অপরাধ ছিল তার? যে জন্য তাকে এই কৈশোর বয়সে মহান স্রষ্টার কাছে চলে যেতে হলো। তারও তো বেঁচে থাকার অনেক সাধ ছিল, বড় হওয়ার অনেক স্বপ্ন ছিল? কি অপরাধ? তার অপরাধ একটাই "আল্লাহর জমিনে, আল্লাহর দেওয়া বিধান প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালোনো।"
স্থানীয় সকলে বললো, জানাজা সংক্ষিপ্ত করার জন্য। আমি ও আমিনুর ভাই সিদ্ধান্ত নিলাম। আল্লাহ তায়ালা যাকে সম্মান দিয়েছেন, আমরা সেই ভাইকে এভাবে বিদায় দিতে পারি না। আমিনুর ভাই ঘোষণা দিলেন, জানাজার পূর্বে সমাবেশ হবে, পরে দাফন করা হবে। সেদিন আমিনুর ভাইয়ের সাহসী ভূমিকায় আমাদের প্রিয় ভাইকে একটু হলেও তৃপ্তি সহকারে বিদায় দিতে পেরেছিলাম। সমাবেশে আমিনুর ভাই অশ্রুসিক্ত নয়নে শহীদ আবু হানিফ ছোটন ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করলেন। কে জানতো মহান প্রভু এই ভাইকে ৩ মাস পরেই স্মৃতিচারণের পাত্র হিসেবে কবুল করবেন। শহীদের কফিন এত ভারী, কষ্ট ও বেদনায় সেদিনের আগে কোনদিন কল্পনার তুলিতে ছবিও আঁকতে পারিনি। আমিনুর ভাই আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় ফেরার পরামর্শ দিলেন। মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলে মা বললো! আমার ছোটন বলতো, "মা আমি যদি কোনদিন শহীদ হই তুমি কাঁদবে না। তোমরা দেখ। আমি কিন্তু কাঁদছি না। আমার ছোটনের কাছে দেওয়া কথা আমি রেখেছি। মাকে বললাম, মা আজ থেকে আমি তোমার "ছোটন"। তুমি আমাকে ছোটন বলেই ডাকবে।
মা! আকাশের বিশালতায় চাঁদের জ্যোতির যে হাসি, তোমার ছোটন এমন-ই এক জ্যোতি হিসেবে তোমার বংশের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে এসেছিল। তোমার ভাগ্যাকাশে এমন নক্ষত্রের উদয় আল্লাহর দয়ার-ই প্রমাণ। আল্লাহ তোমার ছোটনকে তোমার কাছে ১৪ বছরের অধিক আমানাত হিসেবে বুকে জড়িয়ে আদর করার ও ভালোবাসার সুযোগ দিয়েছেন। এখন, মালিক তোমার কাছ থেকে ছোটনকে মালিকের হেফাজাতে নিয়ে গেছেন। তবে আমার বিশ্বাস, তোমার থেকেও আমার মালিক আমাদের প্রিয় ভাইকে অধিক যত্ন ও মর্যাদায় রাখবেন। কেননা তিনি তো আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন বাস্তবায়নের জন্য রক্ত দিয়েছেন।
প্রতিবাদে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা:
ভোমরা দাখিল মাদরাসার নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া আবু হানিফ ছোটনকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে সাতক্ষীরায় জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবির শনিবার বিকেলে শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। এখান থেকে সাতক্ষীরা জেলা আমীর সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল খালেক ও সেক্রেটারি শেখ নুরুল হুদা, ছাত্রশিবিরের শহর সভাপতি মোঃ আবু তালেব ও জেলা সভাপতি মোঃ রুহুল আমিন এক যৌথ বিবৃতিতে ২১ জানুয়ারি মঙ্গলবার জেলাব্যাপী বিক্ষোভ, ২২ ও ২৩ জানুয়ারি সকল স্তরে গণযোগাযোগ ও ২৪ জানুয়ারি শুক্রবার দোয়া দিবসের ঘোষণা দেন। নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে বলেন, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ডিবি পুলিশের একটি দল 'ভোমরা দাখিল মাদরাসার' নবম শ্রেণীর ছাত্র আবু হানিফ ছোটনকে এলাকার লোকজনের সামনে একটি কালো মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায়। অনেক খোঁজ-খবর নেয়ার পর জানা যায়, তাকে যৌথবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরের দিন শনিবার সকালে যৌথবাহিনী ভোমরা পোর্টের নিকটস্থ মেইন রোডের ওপর তাকে গুলি করে হত্যা করে। নেতৃবৃন্দ বলেন, আবু হানিফ ছোটন নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া একটি নিষ্পাপ কিশোর। তার পিতা শহর আলী জামায়াতের পদ্মশাখরা ওয়ার্ড সেক্রেটারি। কিছুদিন আগে যৌথবাহিনী তার বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। আর সর্বশেষ আজ তার কলিজার টুকরো সন্তানকে গুলি করে হত্যা করল। সে কি বাংলাদেশের নাগরিক নয়? তার কি বাংলাদেশের কোন প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার অধিকার নেই? তাকে হত্যা করে যৌথবাহিনী স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারকে হত্যা করেছে। নেতৃবৃন্দ এই জঘন্য, বর্বর, ঘৃণ্য এবং আইন ও গণতন্ত্র বহির্ভূত হত্যার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
এক নজরে শহীদ আবু হানিফ ছোটন
শহীদের নাম: মোঃ আবু হানিফ ছোটন
পিতার নাম।: মোঃ শহর আলী গাজী
মাতার নাম: হাসিনা খাতুন
ঠিকানা: বর্তমান:
গ্রাম: পদ্মশাখরা
ডাকঘর: সাকরা কোমরপুর
উপজেলা: সাতক্ষীরা সদর
জেলা: সাতক্ষীরা
শহীদের তারিখ: ১৮/০১/২০১৪
স্থান ভোমরা স্থল বন্দর
ভাইবোন কতজন: মোট ৮ জন। বোন ৩ জন, ভাই ৫ জন
ভাই-বোনদের মধ্যে অবস্থান: ৭ম
শিক্ষাগত যোগ্যতা: নবম শ্রেণী অধ্যয়নরত
সর্বশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: ভোমরা ইউনিয়ন দাখিল মাদ্রাসা
বিভাগ: মানবিক
জন্ম তারিখ: ০৫/০১/২০০০.
সাংগঠনিক মান: কর্মী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍