হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম
শহীদ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম

শহীদ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

০৬.০৫.২০১৪ তারিখ মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২ টার দিকে কালিগঞ্জ থানা পুলিশ ঠেকড়া সাদপুর দাখিল মাদাসার সুপার জামায়াত কর্মী মাওলানা আশরাফুল ইসলামের বাড়ি ঘিরে ফেলে। পুলিশ ঘরে ঢুকে তাকে গ্রেফতার করে টেনে হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসে। পরে তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়, জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং মারধর করে। রাত দেড়টার দিকে পার্শ্ববর্তী ভদ্রখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়ে যায়। তাকে চোখ, মুখ এবং হাত-পা বেঁধে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিঁড়ির উপরে রেখে বুকে গুলি করে। গুলির শব্দে গ্রামের লোকজন বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাদেরকেও লক্ষ্য করে ১৫/১৬ রাউন্ড গুলি চালায়। ভয়ে আর কেউ সামনে এগিয়ে আসেনি। পরে তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পুলিশ কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসক মফিজুর রহমান জানান, রাত দুইটার দিকে আশরাফুল ইসলামকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। তার বুকে গুলিবিদ্ধ ছিল।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম ১৯৭৯ সালের পহেলা জানুয়ারি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানাধীন ঠেকরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৃত আদম আলী ও মাতা মোছাম্মত আয়শা খাতুনের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি একমাত্র ছেলে সন্তান। তিনি জামায়াতের স্থানীয় ওয়ার্ড সেক্রেটারি। এর আগে তিনি কুশুলিয়া ইউনিয়ন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছাত্রজীবনে কালিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও সাতক্ষীরা জেলার অফিস সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। এছাড়া তিনি উপজেলা বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
০৬.০৫.২০১৪ তারিখ মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২ টার দিকে কালিগঞ্জ থানা পুলিশ ঠেকড়া সাদপুর দাখিল মাদাসার সুপার জামায়াত কর্মী মাওলানা আশরাফুল ইসলামের বাড়ি ঘিরে ফেলে। পুলিশ ঘরে ঢুকে তাকে গ্রেফতার করে টেনে হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসে। পরে তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়, জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং মারধর করে। রাত দেড়টার দিকে পার্শ্ববর্তী ভদ্রখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়ে যায়। তাকে চোখ, মুখ এবং হাত-পা বেঁধে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিঁড়ির উপরে রেখে বুকে গুলি করে। গুলির শব্দে গ্রামের লোকজন বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাদেরকেও লক্ষ্য করে ১৫/১৬ রাউন্ড গুলি চালায়। ভয়ে আর কেউ সামনে এগিয়ে আসেনি। পরে তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পুলিশ কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসক মফিজুর রহমান জানান, রাত দুইটার দিকে আশরাফুল ইসলামকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। তার বুকে গুলিবিদ্ধ ছিল।
সামগ্রীক ঘটনার বিবরণ:
বাংলাদেশের দক্ষিণের জনপদ সাতক্ষীরা। তৌহিদী জনতার আবেগ-অনুভূতির সাথে গভীরভাবে মিশে আছে এ জেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ ইসলামকে ভালোবাসে বলেই আশা-আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্নের যেন শেষ নেই। সুন্দরবনের পাশ ঘেঁষে অবস্থিত এ জনপদকে নিয়ে বাতিলের ষড়যন্ত্রও যেন নির্ভেদ্য। তথাকথিত প্রগতিশীল ও আওয়ামী হায়েনাদের নখরাঘাতে রক্তাক্ত হয়েছে বারবার। কালিগঞ্জে শহীদ আলী মোস্তফার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে ১৯৯৯ সালের ২৫ নভেম্বর এ জনপদের শহীদি মিছিলের যাত্রা শুরু হয়। একে একে এ মিছিলে নাম লিখিয়েছেন শহীদ সিরাজুল ইসলাম, শামসুল হক, শামসুর রহমান, রুহুল আমিন মোড়ল, শেখ রহমত আলী, রফিকুল ইসলাম, আমানউল্লাহ আমান, শামসুজ্জামান খান রেজা, শেখ মোস্তফা আরিফুজ্জামান, হোসেন আলী, আরিজুল ইসলাম, আবুল কালাম, আলী মোস্তফা, ইকবাল হাসান তুহিন, আবু হানিফ ছোটনসহ আরো অনেকে।
২০১৩ সাল থেকে পুরো বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মুফাসসিরে কোরআন আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবীতে উত্তাল ছিল। মিছিল, হরতাল, অবরোধ সহ নানা রকম কর্মসূচীতে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাঈদীর মুক্তির দাবীতে আপামর জনতা রাস্তায় নেমে স্বৈরাচারের প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদ করে অবৈধ সরকারের অন্যায্য বিচারেরও। এই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ থেকে বাদ যায়নি দক্ষিণের জনপদ সাতক্ষীরাও। এই আন্দোলন-বিক্ষোভ দমনের লক্ষ্যে প্রতিদিন রাতে সাতক্ষীরার বিভিন্ন জনপদে রাতের অন্ধকারে হানাদার বাহিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়তো পুলিশ-বিজিবি ও স্থানীয় আওয়ামী-যুবলীগের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী। স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের বাড়িতে হামলা করে ভাঙচুর-লুটপাট ছাড়া নারীদের নির্যাতন ও জামায়াত শিবির কর্মীদের ধরে নিয়ে নির্বিচারে হত্যা করা ছিল তখনকার প্রতিদিনের সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম। যদিও জাহেলী মিডিয়া সংবাদ পাল্টে দিয়ে এসব ঘটনায় বরাবর ভিলেন হিসেবে উপস্থিত করতো জামায়াত-শিবিরকেই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সারা দেশে অভিযান চালায় পুলিশ। তারই অংশ হিসেবে সাতক্ষীরায় পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। এসময় পুলিশ আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে অভিযানের নামে জামায়াত-শিবিরের জনপ্রিয় নেতাকর্মীদের টার্গেট করে গ্রেফতার করে এবং বন্দুকযুদ্ধের নামে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় পুলিশ অনেককে হত্যা, গুম ও পঙ্গু করেছে।
২০১৪ সালের পাঁচই মে। দীর্ঘদিন ভারতে আত্মগোপন করে থাকার পর রাত দশটার দিকে বাড়ি আসেন শহীদ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম। রাত বারোটার দিকে তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলে কালিগঞ্জ থানা পুলিশ। তারপর ঘরে ঢুকে তাকে গ্রেফতার করে টেনে হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসে। পরে তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়, জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং মারধর করে। রাত দেড়টার দিকে পার্শ্ববর্তী গ্রাম ভদ্রখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়ে যায়। তাকে প্রথমে চোখ, মুখ বাঁধে এবং হাত-পা বেঁধে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিঁড়ির উপরে রেখে বুকে গুলি করে। গুলির শব্দে গ্রামের লোকজন বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাদেরকে লক্ষ্য করে ১৫/১৬ রাউন্ড গুলি চালায়। ভয়ে আর কেউ সামনে এগিয়ে আসেনি। পরে তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসক মফিজুর রহমান জানান, রাত দুইটার দিকে আশরাফুল ইসলামকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। তার বুকে গুলিবিদ্ধ ছিল। বুধবার সকাল ৮টার দিকে পুলিশের একটি ভ্যানে করে নিহতের লাশের ময়না তদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়।
এলাকাবাসী বলছে, পুলিশ বাড়ি থেকে একজন হুজুরকে ধরে নিয়ে স্কুলের মতো একটি পবিত্র স্থানে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে আবার তা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে বলে প্রচার করে স্কুলকে কলঙ্কিত করেছে।
লাশের ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পর। সাতক্ষীরা থেকে কালিগঞ্জ ঠেকড়া গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এসময় সেখানে তার বৃদ্ধা মা, ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন ও সহপাঠী-সহকর্মীদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এর মধ্যে আবার পুলিশ জানিয়ে দেয়, ২০মিনিটের মধ্যে জানাযা-দাফন শেষ করতে হবে। তবে পুলিশের এই ঘোষণা উপেক্ষা করে শত শত মুসল্লীর উপস্থিতিতে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার পিতা আদম আলী মোড়লের কবরের পাশে দাফন করা হয়। শহীদের আপনজনদের কথা:
আশি বছর বয়স্ক বৃদ্ধা মা আয়েশা খাতুন চোখ মুছতে মুছতে বলেন, আমার বাবারে ওরা ঘর থেকে ধরে স্কুল নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। আল্লাহ ওদের বিচার করবে। আমার একমাত্র পুত্র সন্তান এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তাকে পুলিশ হত্যা করলো। এখন আমরা কিভাবে চলবো বুঝতে পারছি না।
আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম তিনিই সব দেখবেন। তিনি বড় নিঃশ্বাস তুলে বললেন, আমাদের এই ভিটেটাই সব। আমাদের কোন কৃষি জমি নাই। খুব কষ্টে আমাদের দিন পার হতো। এখন কিভাবে দিন যাবে আল্লাহই ভালো জানেন। আমার এতিম সব নাতি-নাতনিরা বাবার আদর কোথায় পাবে। তাদের কি বুঝ দেব আমি। পাশে অজ্ঞান অবস্থায় ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী পাপিয়া সুলতানা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সাংবাদিকদের বলেন, আমার এতিম শিশু বাচ্চারা এখন কোথায় যাবে। তাদেরতো আব্বু বলার সুযোগটুকু থাকলো না। হে আল্লাহ তুমি এর বিচার করো। আর কত মা তার সন্তান হারাবে, আর কত স্ত্রী তার স্বামী হারাবে, আর কত ভাই তার ভাইকে হারাবে। আমি এখন কি করে এই গরীবের সংসার চালাবো। আর শিশু এতিম বাচ্চাদের মানুষ করবো। এ কথা বলতে বলতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
পাশে নয় বছরের ছেলে সাদ বিন আশরাফ, পাঁচ বছরের মেয়ে সাবিহা ও এক বছরের দুই মাস বয়সী শিশুপুত্র তাহমিদ আগত মানুষের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আর পিতার সেই চাঁদমাখা মুখখানি খুঁজছে।
বড় ছেলে সা'দ বিন আশরাফ প্রশ্ন রেখে বলেন, আমার আব্বু তো কুরআন হাদিস পড়াতো। তিনি তো মাদরাসার একজন হুজুর। তাকে কেন পুলিশ এভাবে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মারলো। আর এ নিয়ে টিভিতে নাকি দিচ্ছে, বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে! হে আল্লাহ তুমি এর বিচার করো।
গণমাধ্যমে শাহাদাতের খবর
০৮ মে ২০১৪, "সাতক্ষীরায় পুলিশ মাওলানা আশরাফুলকে গুলি করে হত্যা" শিরোনামে দৈনিক সংগ্রাম নিম্নোক্ত সংবাদ প্রচার করে-
সাতক্ষীরায় এবার পুলিশ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে সাদপুর দাখিল মাদরাসার সুপারিন্টেন্ডেন্ট মাওলানা আশরাফুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করেছে। বাড়ির পার্শ্ববর্তী গ্রামের ভদ্রখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিঁড়ির উপরে ফেলে নির্মমভাবে বুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মঙ্গলবার গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ মিডিয়ায় ফোন করে জানিয়ে দেয়, কালিগঞ্জে বন্দুকযুদ্ধে এক জামায়াত নেতা নিহত হয়েছে। এ সময় পুলিশ কনস্টেবল কামাল, শরিফুল, আব্দুল জব্বার ও আসাদ আহত হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। তবে যেসব পুলিশ আহত হয়েছে বলে প্রচার করা হয়েছে তারা পায়ে হেঁটে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে এসেছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। সূত্র বলছে, পুলিশ সদস্যরা কোন আহতই হয়নি। শুধুমাত্র নাটক সাজানোর জন্য এমন করেছেন। এলাকাবাসী বলছে, পুলিশ বাড়ি থেকে একজন হুজুরকে ধরে নিয়ে স্কুলের মতো একটি পবিত্র স্থানে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে আবার তা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে বলে প্রচার করে স্কুলকে কলঙ্কিত করেছে।
এলাকাবাসী ও পরিবার সূত্র জানায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২ টার দিকে কালিগঞ্জ থানা পুলিশ থেকড়া গ্রামের মৃত আদম আলী মোড়লের ছেলে সাদপুর দাখিল মাদাসার সুপার মাওলানা আশরাফুল ইসলামের বাড়ি ঘিরে ফেলে। এ সময় পুলিশ ঘরে ঢুকে তাকে গ্রেফতার করে টেনে হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসে। পরে তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়, জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং মারধর করে। রাত দেড়টার দিকে পার্শ্ববর্তী গ্রাম ভদ্রখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়ে যায়। প্রথমে তাঁর চোখ, মুখ বাঁধে এবং হাত-পা বেঁধে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিঁড়ির উপরে রেখে বুকে গুলি করে। গুলির শব্দে গ্রামের লোকজন বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাদেরকে লক্ষ্য করে ১৫/১৬ রাউন্ড গুলি চালায়। ভয়ে আর কেউ সামনে এগিয়ে আসেনি। পরে তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসক মফিজুর রহমান জানান, রাত দুইটার দিকে আশরাফুল ইসলামকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। তার বুকে গুলিবিদ্ধ ছিল। বুধবার (৭ মে) সকাল ৮টার দিকে পুলিশের একটি ভ্যানে নিহতের লাশের ময়না তদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়।
কালীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমীর মোঃ মোসলেম উদ্দিন বলেন, মাওলানা আশরাফুল ইসলামকে পুলিশ মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার থেকড়া গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ভদ্রখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিঁড়ির উপর বসিয়ে মুখ ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করে। এ নিয়ে সাতক্ষীরায় ৩২ জন নিহত হলো। অসংখ্য নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ ও পঙ্গুত্ববরণ করেছে। আর মিথ্যা মামলা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার নেতাকর্মী। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, সরকার যেভাবে মানুষ খুন করছে তাতে বাংলাদেশটাকে একটি মৃত্যুপরীতে পরিণত করেছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা জেলার ধর্মভীরু মানুষ এখন আওয়ামী লীগ ও পুলিশের কাছে পণবন্দী হয়ে পড়েছে। তারা যাকে পাচ্ছে তাকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করছে আর বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজাচ্ছে। তিনি এ সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান। তিনি বলেন, লাশের ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পর সাতক্ষীরা থেকে কালিগঞ্জ থেকড়া গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এ সময় সেখানে তার বৃদ্ধা মা, ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন ও সহপাঠী-সহকর্মীদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এর মধ্যে আবার পুলিশ জানিয়ে দেয়, ২০ মিনিটের মধ্যে জানাযা-দাফন শেষ করতে হবে। তবে পুলিশের এই ঘোষণা উপেক্ষা করে শত শত মুসল্লীর উপস্থিতিতে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার পিতা আদম আলী মোড়লের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রহমান জানান, ভদ্রখালী হাইস্কুল মাঠে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে জামায়াত নেতা আশরাফুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হয়। এ সময় চার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে।
পুলিশ আত্মরক্ষার্থে ১৯ রাউন্ড গুলি করে। পরে আশরাফুল ইসলামকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে একখানা রাম দা ও দু'টি বোমা উদ্ধার করা হয়। তবে অভিযানে অংশ নেয়া একাধিক পুলিশ সদস্য বুধবারের রাতকে এক ভয়াবহ রাত উল্লেখ করে বলেন, ওই রাতের ভয়াবহ দৃশ্যের কথা বলা যায় না। এভাবে একজন জলজ্যান্ত মানুষকে গুলি করে হত্যা করা যায়? এদেশে সবই সম্ভব বলে আর কোন মন্তব্য করতে চাননি।
নিহতের বৃদ্ধা মা আয়েশা খাতুন চোখ মুছতে মুছতে বলেন, আমার বাবারে ওরা ঘর থেকে ধরে স্কুল নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। আল্লাহ ওদের বিচার করবে। আমার একমাত্র পুত্র সন্তান এবং পরিবারের একমাত্র
উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তাকে পুলিশ হত্যা করলো। এখন আমরা কিভাবে চলবো বুঝতে পারছি না। আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম তিনিই সব দেখবেন। তিনি বড় নিঃশ্বাস তুলে বললেন, আমাদের এই ভিটেটাই সব। আমাদের কোন কৃষি জমি নাই। খুব কষ্টে আমাদের দিন পার হতো। এখন কিভাবে দিন যাবে আল্লাহই ভালো জানেন। আমার এতিম সব নাতি-নাতনিরা বাবার আদর কোথায় পাবে। তাদের কি বুঝ দেব আমি! পাশে অজ্ঞান অবস্থায় ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী পাপিয়া সুলতানা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সাংবাদিকদের বলেন, আমার এতিম শিশু বাচ্চারা এখন কোথায় যাবে। তাদেরতো আব্বু বলার ডাকটুকু থাকলো না। হে আলাহ তুমি এর বিচার করো। আর কত মা তার সন্তান হারাবে, আর কত স্ত্রী তার স্বামী হারাবে, আর কত ভাই তার ভাইকে হারাবে। আমি এখন কি করে এই গরীবের সংসার চালাবো। আর শিশু এতিম বাচ্চাদের মানুষ করবো। এ কথা বলতে বলতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
পাশে নয় বছরের ছেলে সাদ বিন আশরাফ, পাঁচ বছরের মেয়ে সাবিহা ও এক বছর দুই মাস বয়সী শিশুপুত্র তাহমিদ আগত মানুষের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আর পিতার সেই চাঁদমাখা মুখখানি খুঁজছে। বড় ছেলে সা'দ বিন আশরাফ সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, আমার আব্বু তো কুরআন হাদিস পড়াতো। তিনি তো মাদরাসার একজন হুজুর। তাকে কেন পুলিশ এভাবে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মারলো। আর এ নিয়ে টিভিতে নাকি দিচ্ছে, বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। হে আলাহ তুমি এর বিচার করো।
নিহত আশরাফুল ইসলাম কুশুলিয়া ইউনিয়নের ভদ্রখালি গ্রামের মৃত আদম আলী মোড়লের ছেলে। তিনি জামায়াতের স্থানীয় ওয়ার্ড সেক্রেটারি। এর আগে তিনি কুশুলিয়া ইউনিয়ন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছাত্রজীবনে কালিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও সাতক্ষীরা জেলার অফিস সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। এছাড়া তিনি উপজেলা বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন।
এক নজরে শহীদ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম
নাম: মাওলানা মোঃ আশরাফুল ইসলাম
পিতার নাম: মৃত আদম আলী
মাতার নাম: মোছাঃ আয়শা খাতুন, বয়স ৮০ বছর
মাতার পেশা: বয়স জনিত কারণে অক্ষম, শুয়ে শুয়ে খেতে হয়
স্ত্রীর নাম: পাপিয়া খাতুন, বয়স: ৩২, পেশা: গৃহিণী
ঠিকানা: গ্রাম- ঠেকরা (মসজিদের উত্তর পাশে), ঠেকরা ওবায়দুর নগর কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা- ৯৪৪০
ভাই বোন: পাঁচ বোনের একমাত্র ভাই, ভাই বোনদের মধ্যে পঞ্চম
সন্তান: দুই ছেলে এক মেয়ে
সাংগঠনিক মান: রুকন, ওয়ার্ড সেক্রেটারী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
শাহাদাতের তারিখ: ৮ মে ২০১৪, বাসা থেকে ধরে নিয়ে ভদ্রখালি প্রাথমিক স্কুল মাঠে গুলি করে হত্যা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍