হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মাওলানা মো: নাসির উদ্দীন
শহীদ মাওলানা মো: নাসির উদ্দীন

শহীদ মাওলানা মো: নাসির উদ্দীন

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মাওলানা মো: নাসির উদ্দীন, ১৯৮৩ সালে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের গোবিন্দল গ্রামে জন্ম নেওয়া এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের প্রতিভাবান সন্তান। যিনি সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে আলেম হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেন। ভাই-বোনের বড় পরিবারে তিনি ছিলেন সবার ভরসা, এক অদম্য পরিশ্রমী ও মানবসেবায় নিবেদিত তরুণ আলেম। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার শান্তিপূর্ণ অবস্থানে আহত ভগ্নিপতির পাশে দাঁড়াতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর বিদায় দুঃখে স্তব্ধ করে দেয় মা, স্ত্রী ও তিন বছরের শিশুসহ পুরো গ্রামকে। আত্মত্যাগের গল্পে তিনি আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে আছেন।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মাওলানা মো: নাসির উদ্দীন
মানিকগঞ্জ-৩
১. পরিচিতি
শহীদ মাওলানা মো: নাসির উদ্দীন ১৯৮৩ইং সনে মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার স্বপ্ন ছিল তিনি ছেলেকে মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যমে আলেম বানাবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য কৈশোরেই তিনি পিতাকে হারান। অমানুষিক কষ্ট করেও তিনি পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছিলেন। ৪ ভাই ও ৬ বোনের বিশাল পরিবারে তিনি একমাত্র উচ্চশিক্ষিত। সবার স্বপ্ন ছিল তাকে ঘিরে। বোনেরা সবাই বিবাহিতা হলেও তিনি সবার খোঁজ রাখতেন। কৃষিজীবী ও প্রবাসী চার ভাইদের মধ্যে তৃতীয় হলেও তিনিই অভিভাবকসূলভ ভূমিকা রাখতেন।
একটি হৃতদরিদ্র গ্রামীণ কৃষক পরিবারের সন্তান হয়েও তার স্বপ্ন ছিল শিক্ষা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তার পরিবার ও তার সমাজকে উন্নত মডেল হিসেবে দাঁড় করানো। কিন্তু না, যে মাথায় তিনি কুরআন-হাদিসের শিক্ষা ধারণ করেছিলেন যেখানে পরিবার ও সমাজের উন্নয়নের জাল বুনতেন, একটি তপ্ত বুলেট সে স্বপ্নের ধারক তার মস্তিষ্ককেই ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
দিনটি ছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। সেদিন ছিল ইসলাম ও রাসূলকে (সাঃ) নিয়ে কটূক্তি করার প্রতিবাদে ইসলামী দলসমূহের ডাকে সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার গোবিন্দল এলাকার সড়কের ওপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চলছিল পুলিশ ও পিকেটারদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও গোলাগুলি। এলাকাবাসী জানান, গোবিন্দল গ্রামে আওয়ামী লীগের কোন ভোট নেই। এ কারণে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের সঙ্গে একজোট হয়ে নির্বিচারে গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালিয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। ঘরে ঘরে ঢুকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে লুটপাট করেছে। রাস্তার পাশেই খলিলুর রহমানের বাড়ি। তার মেয়ে হেলেনা গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেয়ে দৌড়ে ঘরের ভেতর চলে যায়। তখনই আওয়ামী লীগ ও পুলিশের লোকজন গুলি চালায়। গুলি তার মাথার ঠিক নিচে মুখে লাগে। হেলেনার মা রেহেনা বেগম জানান, তখনই মেয়ের চিৎকার শুনতে পাই। দেখি রক্তাক্ত হয়ে দাপাদাপি করছে। গত ২১শে ফেব্রুয়ারি, মাত্র ৩দিন আগে আমার মেয়ের সঙ্গে সৌদি প্রবাসী গোবিন্দল এলাকার শাহিনুর ইসলামের মোবাইল ফোনে বিয়ে হয়। মেয়ের জামাই আর কয়েকদিন পর অনুষ্ঠান করে তার মেয়ে ঘরে তুলবে। হেলেনা স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ছাত্রী। মেয়েকে নিয়ে যারা হাসপাতালে গিয়েছিল তাদেরকেও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।
নাসিরের ভগ্নিপতি ইসব বেপারি জানান, তার শ্যালকের বউ হেলেনা গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি ভ্যানে দ্রুত তাকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা দেন। নাসিরকে ফোন করে কিছু টাকা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বলেন। হাসপাতালে যাওয়ার সময় নাসিরকে গুলি করে ফেলে যায় পুলিশ। ইসব বেপারি বলেন, বিদেশে যাওয়ার জন্য জমানো টাকা থেকে নাসির পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে রওনা দিয়েছিল। ওই টাকাও পুলিশ নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার তিন বছর বয়সী ছেলে তামীম পিতার কথা জিজ্ঞেস করতেই ধানক্ষেতের দিকে ইশারা করে জানায়, ওইদিকে গেছে। ছেলেটির মা রুমানা বলেন, মোবাইল ফোনে গুলিবিদ্ধ হেলেনার খবর শুনে তার স্বামী বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে ধানক্ষেত দিয়ে দৌড়ে গিয়েছিলেন।
সকাল ১১টার দিকে আহতাবস্থায় মাওলানা মো: নাসির উদ্দীনকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ঢাকায় হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় ৪ জন শাহাদাত বরণ করেন এবং শত শত লোক গুলিবিদ্ধ হন।
এলাকাবাসী জানান, নাসির ছিলেন অতিশয় নম্র। কারও বিপদ হলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যেতেন। নিজের প্রবাসী ছোটভায়ের সদ্যবিবাহিতা গুলিবিদ্ধ বৌয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সে মানবসেবায় আত্মোৎসর্গতার সর্বোচ্চ প্রমাণ রেখে গেল। বড়বোন স্বপ্নে দেখে। ছোট ভাই শহীদ নাসির তাকে বলে" আমিতো মারা যাইনি। খুব সুখে আছি: ভাল আছি-মজাদার খাবার খাচ্ছি।" কিন্তু এ কথায়ও সে বাড়ির কান্না যেন থামে না। নাসিরের বোন ফিরোজা বলেন, কয়েকদিন পরেই তার বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল। তার আগেই লোকজন তাকে হত্যা করলো। ছেলেকে এতিম করলো। যেখানে নাসিরকে হত্যা করা হয়েছে সেখানেই তার কুড়া-ভুসির দোকান রয়েছে। এই ব্যবসা করেই সে মাসে ৩-৪ হাজার টাকা উপার্জন করে কায়কষ্টে সংসার চালাতো। ঘরে তার ৭০ বছরের বৃদ্ধা মা; শুধু কান্নাই যার আমৃত্যু সম্বল। মাত্র পাঁচ বছর আগে ছেলেকে বিয়ে করিয়েছিলেন। সদ্য বৈধব্যবরণকারী অল্পবয়স্কা স্ত্রী রোমানা: তিন বছর বয়সী তামিম নামের ফুটফুটে ছেলেটিকে কোলে নিয়ে ব্যাকুল দৃষ্টিতে আকাশ পানে তাকিয়ে থাকে। কী জানি, তাদের জীবনটাও শহীদ নাসিরের ঐ কুঁড়া-ভুসির দোকানের বিক্ষিপ্ত বস্তার মত অবহেলায় সময় ও সমাজের কারাল গ্রাসে একদিন হারিয়ে যাবে নাতো?
৩. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মাওলানা মো: নাসির উদ্দীন (০৫৬),
পেশা: দাওরায়ে হাদীস পাস।
বয়স: ৩০ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ২৪.০২.২০১৩,
শাহাদাতের তারিখ: ২৪.০২.২০১৩, সকাল ১১টা ৩০ মিনিট,
স্থান: সিঙ্গাইর, দাফন করা হয়। বাড়ীর পাশের কবর স্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: গোবিন্দল, ইউনিয়ন: সিঙ্গাইর পৌরসভা, উপজেলা: সিঙ্গাইর, জেলা: মানিকগঞ্জ।
পিতার নাম, বয়স ও পেশা: মো: ইউছুফ আলী বেপারী। মৃত-১৯৮৮ সাল। দিনমজুর ছিলেন।
মায়ের নাম, বয়স ও পেশা: মোসা: ফাতেমা বেগম, ৭০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: একটি টিনের ঘর, অল্প জমি-জমা আছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা।
স্ত্রীর নাম: রুমানা আক্তার রুমী (২৫)। ছেলের নাম মোঃ তাওহিদুল ইসলাম তামীম (৩ বছর)
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: ফরিদুদ্দীন (৫০)-প্রবাসী। শহীদুল ইসলাম (৩৫)-কৃষক। শাহিনুর (২৫)- প্রবাসী। বোন ৬ জন-বিবাহিতা।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍