শহীদ মাওলানা সাইদুর রহমান
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে পুলিশের তিনজন সদস্য মাওলানা সাইদুর রহমানকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। স্থানীয় এক ডাক্তার তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু চিকিৎসা না দিয়ে তাকে সাতক্ষীরা সদর থানা হাজতে রাখা হয়। এ সময় তাকে নির্মমভাবে মারপিট করে পুলিশ। শুক্রবার সারাদিন থানায় আটকে রেখে তাকে নির্যাতন করার পর তাকে আদালতে তুললে আদালত তাকে চিকিৎসা করানোর নির্দেশ দেয়। পরে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি করালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ মাওলানা সাইদুর রহমান সাতক্ষীরা সদরের কাথনডা গ্রামের মৃত জিল্লার রহমানের ছেলে। স্থানীয় কাথনডা ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রোকনপ্রার্থী ছিলেন। তিনি স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও কলারোয়া হঠাৎগঞ্জ দাখিল মাদরাসার সুপার ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে পুলিশের তিনজন সদস্য মাওলানা সাইদুর রহমানকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। স্থানীয় এক ডাক্তার তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু চিকিৎসা না দিয়ে তাকে সাতক্ষীরা সদর থানা হাজতে রাখা হয়। এ সময় তাকে নির্মমভাবে মারপিট করে পুলিশ। শুক্রবার সারাদিন থানায় আটকে রেখে তাকে নির্যাতন করার পর তাকে আদালতে তুললে আদালত তাকে চিকিৎসা করানোর নির্দেশ দেয়। পরে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি করালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
বাংলাদেশের দক্ষিণের জনপদ সাতক্ষীরা। তৌহিদী জনতার আবেগ-অনুভূতির সাথে গভীরভাবে মিশে আছে এ জেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ ইসলামকে ভালোবাসে বলেই আশা-আকাংক্ষা আর স্বপ্নের যেন শেষ নেই। সুন্দরবনের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা এ জনপদকে নিয়ে বাতিলের ষড়যন্ত্রও যেন নির্ভেদ্য। তথাকথিত প্রগতিশীল ও আওয়ামী হায়েনাদের নখরাঘাতে রক্তাক্ত হয়েছে বারবার। কালিগঞ্জে শহীদ আলী মোস্তফার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে ১৯৯৯ সালের ২৫ নভেম্বর এ জনপদের শহীদি মিছিলের যাত্রা শুরু হয়। একে একে এ মিছিলে নাম লিখিয়েছেন শহীদ সিরাজুল ইসলাম, শামসুল হক, শামসুর রহমান, রুহুল আমিন মোড়ল, শেখ রহমত আলী, রফিকুল ইসলাম, আমানউল্লাহ আমান, শামসুজ্জামান খান রেজা, শেখ মোস্তফা আরিফুজ্জামান, হোসেন আলী, আরিজুল ইসলাম, আবুল কালাম, আলী মোস্তফা, ইকবাল হাসান তুহিন, আবু হানিফ ছোটনসহ আরো অনেকে।
২০১৩ সাল থেকে পুরো বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মুফাসসিরে কোরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবীতে উত্তাল ছিল। মিছিল, হরতাল, অবরোধ সহ নানা রকম কর্মসূচীতে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাঈদীর মুক্তির দাবীতে আপামর জনতা রাস্তায় নেমে স্বৈরাচারের প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদ করে অবৈধ সরকারের অন্যায্য বিচারেরও। এই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ থেকে বাদ যায়নি দক্ষিণের জনপদ সাতক্ষীরাও। এই আন্দোলন-বিক্ষোভ দমনের লক্ষ্যে প্রতিদিন রাতে সাতক্ষীরার বিভিন্ন জনপদে রাতের অন্ধকারে হানাদার বাহিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়তো পুলিশ-বিজিবি ও স্থানীয় আওয়ামী-যুবলীগের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী। স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের বাড়িতে হামলা করে ভাঙচুর-লুটপাট ছাড়া নারীদের নির্যাতন ও জামায়াত শিবির কর্মীদের ধরে নিয়ে নির্বিচারে হত্যা করা ছিল তখনকার প্রতিদিনের সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম। যদিও জাহেলী মিডিয়া সংবাদ পাল্টে দিয়ে এসব ঘটনায় বরাবর ভিলেন হিসেবে উপস্থিত করতো জামায়াত-শিবিরকেই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সারা দেশে অভিযান চালায় পুলিশ। তারই অংশ হিসেবে সাতক্ষীরায় পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। এসময় পুলিশ আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে অভিযানের নামে জামায়াত-শিবিরের জনপ্রিয় নেতাকর্মীদের টার্গেট করে গ্রেফতার করে এবং বন্দুকযুদ্ধের নামে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় পুলিশ অনেককে হত্যা, গুম ও পঙ্গু করেছে।
শহীদ মাওলানা সাইদুর রহমানের স্ত্রী সাজেদা খাতুন ময়না জানান, ২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে পুলিশের তিনজন সদস্য তাদের বাড়িতে এসে তার স্বামীকে গ্রেফতারের কথা বলে। কোন কারণে তাকে গ্রেফতার করা হবে জানতে চাইলে পুলিশ জানায় তার বিরুদ্ধে মামলা আছে। এ সময় তার স্ত্রী গ্রেফতারি পরওয়ানা দেখতে চাইলে পুলিশ দুর্ব্যবহার করে। মাওলানা সাইদুর রহমান পুলিশকে জানান, তিনি অসুস্থ রোগী। প্রতিদিন তাকে ওষুধ খেতে হয়। তাকে ধরে নিয়ে গেলে সে বাঁচবে না বলে পুলিশের কাছে কান্নাকাটি করেন। দীর্ঘ এক ঘণ্টা ধরে কান্নাকাটির পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে তাকে নিয়ে স্থানীয় এক ডাক্তারের কাছে যান। ডাক্তার তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু চিকিৎসা না দিয়ে তাকে সাতক্ষীরা সদর থানা হাজতে রাখা হয়।
গ্রেফতারের পর মওলানা সাঈদুর রহমানকে কাথনডা বাজারে নিয়ে আসা হয়। এ সময় তাকে নির্মমভাবে মারপিট করে পুলিশ। তার অবস্থা খারাপ হতে থাকায় তাকে সেখানকার পল্লী চিকিৎসক আবদুল্লাহর চেম্বারে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়ায় পুলিশ। এ সময় তার ভাতিজা মুত্তাসিমবিল্লাহ ৫০০০ টাকা এনে চাচাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। কিন্তু পুলিশ তার কাছে দাবি করে এক লাখ টাকা। এ টাকা দিতে না পারায় মাদরাসা শিক্ষককে নিয়ে আসা হয় সাতক্ষীরা থানায়। সেখানেও তাকে নৃশংসভাবে নির্যাতন করতে থাকে পুলিশ।
পরবর্তীতে মাওলানা সাইদুর রহমানকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালত তাকে চিকিৎসার নির্দেশ দেন। পরে তাকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর শুক্রবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
নিহতের ভাই রফিকুল ইসলাম ও ভাতিজা মুত্তাসিম বিলাহ অভিযোগ করে বলেন, শুক্রবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দিনভর পুলিশ হেফাজতে রেখে তার ওপর দফায় দফায় নির্যাতন করা হলে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। পরে তাকে আদালতে নেওয়া হলে কর্তৃপক্ষ অসুস্থতা বিবেচনা করে সাইদুর রহমানকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে পুলিশ তাকে ফের নিয়ে যায় সাতক্ষীরা হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা দিয়ে কিছুটা সুস্থ করার পর বিকাল ৫টায় মওলানা সাইদুরকে পুলিশ ফের আদালতে নিয়ে যায়। বিকেলে মওলানা সাইদুরকে আদালত সাতক্ষীরা কারাগারে পাঠায়।
১৬ সেপ্টেম্বর শনিবার সকালে শহীদের স্ত্রী সাজেদা খাতুন ময়না জানতে পারেন তার স্বামী সাতক্ষীরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। নিহতের ভাই রফিকুল ইসলাম জানান, শুক্রবার দিনভর পুলিশ হেফাজতে রেখে তার ওপর দফায় দফায় নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে শনিবার রাতে পুলিশ প্রহরায় নিহত মাওলানা সাইদুর রহমানের জানাযা নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাযা নামাজে ইমামতি করেন নিহতের ভাই মাওলানা শফিকুল ইসলাম।
এসময় এক হৃদয় বিদারক অবস্থার সৃষ্টি হয়। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মরহুমের আত্মীয় স্বজনেরা।
জানা যায়, এসআই আসাদ মামলার ভয় দেখিয়ে মাওলানা সাইদুর রহমানের কাছ থেকে দু'দফায় লক্ষাধিক টাকা নিয়েছে। বৃহস্পতিবার আরো এক লক্ষ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করায় পুলিশ তাকে ব্যাপক মারপিট করে। এদিকে মাওলানা সাইদুর রহমানকে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনায় জেলাব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য গণমাধ্যমে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার, চাঁদা দাবিসহ ব্যাপক মারপিটের কারণে ঐ মাদরাসা সুপার নিহত হয়েছে বলে শতাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে নড়েচড়ে বসে পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সাতক্ষীরা কারাগারে ৪৪৯০/১৭ নং হাজতী মোঃ সাইদুর রহমানের মৃত্যু হয় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে। এ ঘটনায় ৮৪/১৭ নং এ একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে সদর থানা পুলিশ। বিবৃত্তিতে আরো বলা হয়, মৃত সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ৬১/১৭ ও ৮০/১৭ নং দুটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
প্রকৃত ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নিহতের ভাই মাওলানা শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার ভায়ের নামে কোন মামলা ছিল না। তাকে আটকের পর দুটি অজ্ঞাত মামলায় আসামী করে কোর্টে চালান দেয়। যার জিআর নং ১৮১/১৭৩৫৪৮/১৭। এসব মামলায় তার ভাই এজাহারভুক্ত আসামী ছিল না। যদি তার নামে মামলা থাকত তাহলে পুলিশ কেন অজ্ঞাত মামলায় তাকে চালান দিল বলে পুলিশের প্রতি তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।
সাতক্ষীরা কারাগারের ডেপুটি জেল সুপার আবু জাহেদ জানান, রাত ১টার দিকে অসুস্থ বোধ করলে মাওলানা সাইদুর রহমানকে সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোররাতে তার মৃত্যু হয়। এদিকে, ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ফরহাদ জামিল মাদরাসা সুপার সাইদুর রহমানকে দুদফায় হাসপাতালে আনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এক নজরে শহীদ মাওলানা সাইদুর রহমান
নাম: মাওলানা সাইদুর রহমান
পিতার নাম: মৃত আলহাজ্ব দিলদার রহমান
মাতার নাম: মৃত রাহেলা বেগম
স্ত্রীর নাম: সাজেদা খাতুন ময়না, বয়স: ৩৬, পেশা- গৃহিণী
ঠিকানা: গ্রাম- কাথনডা, ইউপি- বৈকারী, থানা- সদর, সাতক্ষীরা
সন্তান: এক ছেলে, বয়স বাইশ বছর, এক মেয়ে বিবাহিত
সাংগঠনিক মান: রুকনপ্রার্থী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
গ্রেফতারের তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বাড়ি থেকে
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, কারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান:
২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে পুলিশের তিনজন সদস্য মাওলানা সাইদুর রহমানকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। স্থানীয় এক ডাক্তার তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু চিকিৎসা না দিয়ে তাকে সাতক্ষীরা সদর থানা হাজতে রাখা হয়। এ সময় তাকে নির্মমভাবে মারপিট করে পুলিশ। শুক্রবার সারাদিন থানায় আটকে রেখে তাকে নির্যাতন করার পর তাকে আদালতে তুললে আদালত তাকে চিকিৎসা করানোর নির্দেশ দেয়। পরে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি করালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
বাংলাদেশের দক্ষিণের জনপদ সাতক্ষীরা। তৌহিদী জনতার আবেগ-অনুভূতির সাথে গভীরভাবে মিশে আছে এ জেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ ইসলামকে ভালোবাসে বলেই আশা-আকাংক্ষা আর স্বপ্নের যেন শেষ নেই। সুন্দরবনের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা এ জনপদকে নিয়ে বাতিলের ষড়যন্ত্রও যেন নির্ভেদ্য। তথাকথিত প্রগতিশীল ও আওয়ামী হায়েনাদের নখরাঘাতে রক্তাক্ত হয়েছে বারবার। কালিগঞ্জে শহীদ আলী মোস্তফার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে ১৯৯৯ সালের ২৫ নভেম্বর এ জনপদের শহীদি মিছিলের যাত্রা শুরু হয়। একে একে এ মিছিলে নাম লিখিয়েছেন শহীদ সিরাজুল ইসলাম, শামসুল হক, শামসুর রহমান, রুহুল আমিন মোড়ল, শেখ রহমত আলী, রফিকুল ইসলাম, আমানউল্লাহ আমান, শামসুজ্জামান খান রেজা, শেখ মোস্তফা আরিফুজ্জামান, হোসেন আলী, আরিজুল ইসলাম, আবুল কালাম, আলী মোস্তফা, ইকবাল হাসান তুহিন, আবু হানিফ ছোটনসহ আরো অনেকে।
২০১৩ সাল থেকে পুরো বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মুফাসসিরে কোরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবীতে উত্তাল ছিল। মিছিল, হরতাল, অবরোধ সহ নানা রকম কর্মসূচীতে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাঈদীর মুক্তির দাবীতে আপামর জনতা রাস্তায় নেমে স্বৈরাচারের প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদ করে অবৈধ সরকারের অন্যায্য বিচারেরও। এই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ থেকে বাদ যায়নি দক্ষিণের জনপদ সাতক্ষীরাও। এই আন্দোলন-বিক্ষোভ দমনের লক্ষ্যে প্রতিদিন রাতে সাতক্ষীরার বিভিন্ন জনপদে রাতের অন্ধকারে হানাদার বাহিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়তো পুলিশ-বিজিবি ও স্থানীয় আওয়ামী-যুবলীগের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী। স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের বাড়িতে হামলা করে ভাঙচুর-লুটপাট ছাড়া নারীদের নির্যাতন ও জামায়াত শিবির কর্মীদের ধরে নিয়ে নির্বিচারে হত্যা করা ছিল তখনকার প্রতিদিনের সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম। যদিও জাহেলী মিডিয়া সংবাদ পাল্টে দিয়ে এসব ঘটনায় বরাবর ভিলেন হিসেবে উপস্থিত করতো জামায়াত-শিবিরকেই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সারা দেশে অভিযান চালায় পুলিশ। তারই অংশ হিসেবে সাতক্ষীরায় পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। এসময় পুলিশ আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে অভিযানের নামে জামায়াত-শিবিরের জনপ্রিয় নেতাকর্মীদের টার্গেট করে গ্রেফতার করে এবং বন্দুকযুদ্ধের নামে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় পুলিশ অনেককে হত্যা, গুম ও পঙ্গু করেছে।
শহীদ মাওলানা সাইদুর রহমানের স্ত্রী সাজেদা খাতুন ময়না জানান, ২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে পুলিশের তিনজন সদস্য তাদের বাড়িতে এসে তার স্বামীকে গ্রেফতারের কথা বলে। কোন কারণে তাকে গ্রেফতার করা হবে জানতে চাইলে পুলিশ জানায় তার বিরুদ্ধে মামলা আছে। এ সময় তার স্ত্রী গ্রেফতারি পরওয়ানা দেখতে চাইলে পুলিশ দুর্ব্যবহার করে। মাওলানা সাইদুর রহমান পুলিশকে জানান, তিনি অসুস্থ রোগী। প্রতিদিন তাকে ওষুধ খেতে হয়। তাকে ধরে নিয়ে গেলে সে বাঁচবে না বলে পুলিশের কাছে কান্নাকাটি করেন। দীর্ঘ এক ঘণ্টা ধরে কান্নাকাটির পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে তাকে নিয়ে স্থানীয় এক ডাক্তারের কাছে যান। ডাক্তার তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু চিকিৎসা না দিয়ে তাকে সাতক্ষীরা সদর থানা হাজতে রাখা হয়।
গ্রেফতারের পর মওলানা সাঈদুর রহমানকে কাথনডা বাজারে নিয়ে আসা হয়। এ সময় তাকে নির্মমভাবে মারপিট করে পুলিশ। তার অবস্থা খারাপ হতে থাকায় তাকে সেখানকার পল্লী চিকিৎসক আবদুল্লাহর চেম্বারে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়ায় পুলিশ। এ সময় তার ভাতিজা মুত্তাসিমবিল্লাহ ৫০০০ টাকা এনে চাচাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। কিন্তু পুলিশ তার কাছে দাবি করে এক লাখ টাকা। এ টাকা দিতে না পারায় মাদরাসা শিক্ষককে নিয়ে আসা হয় সাতক্ষীরা থানায়। সেখানেও তাকে নৃশংসভাবে নির্যাতন করতে থাকে পুলিশ।
পরবর্তীতে মাওলানা সাইদুর রহমানকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালত তাকে চিকিৎসার নির্দেশ দেন। পরে তাকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর শুক্রবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
নিহতের ভাই রফিকুল ইসলাম ও ভাতিজা মুত্তাসিম বিলাহ অভিযোগ করে বলেন, শুক্রবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দিনভর পুলিশ হেফাজতে রেখে তার ওপর দফায় দফায় নির্যাতন করা হলে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। পরে তাকে আদালতে নেওয়া হলে কর্তৃপক্ষ অসুস্থতা বিবেচনা করে সাইদুর রহমানকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে পুলিশ তাকে ফের নিয়ে যায় সাতক্ষীরা হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা দিয়ে কিছুটা সুস্থ করার পর বিকাল ৫টায় মওলানা সাইদুরকে পুলিশ ফের আদালতে নিয়ে যায়। বিকেলে মওলানা সাইদুরকে আদালত সাতক্ষীরা কারাগারে পাঠায়।
১৬ সেপ্টেম্বর শনিবার সকালে শহীদের স্ত্রী সাজেদা খাতুন ময়না জানতে পারেন তার স্বামী সাতক্ষীরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। নিহতের ভাই রফিকুল ইসলাম জানান, শুক্রবার দিনভর পুলিশ হেফাজতে রেখে তার ওপর দফায় দফায় নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে শনিবার রাতে পুলিশ প্রহরায় নিহত মাওলানা সাইদুর রহমানের জানাযা নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাযা নামাজে ইমামতি করেন নিহতের ভাই মাওলানা শফিকুল ইসলাম।
এসময় এক হৃদয় বিদারক অবস্থার সৃষ্টি হয়। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মরহুমের আত্মীয় স্বজনেরা।
জানা যায়, এসআই আসাদ মামলার ভয় দেখিয়ে মাওলানা সাইদুর রহমানের কাছ থেকে দু'দফায় লক্ষাধিক টাকা নিয়েছে। বৃহস্পতিবার আরো এক লক্ষ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করায় পুলিশ তাকে ব্যাপক মারপিট করে। এদিকে মাওলানা সাইদুর রহমানকে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনায় জেলাব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য গণমাধ্যমে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার, চাঁদা দাবিসহ ব্যাপক মারপিটের কারণে ঐ মাদরাসা সুপার নিহত হয়েছে বলে শতাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে নড়েচড়ে বসে পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সাতক্ষীরা কারাগারে ৪৪৯০/১৭ নং হাজতী মোঃ সাইদুর রহমানের মৃত্যু হয় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে। এ ঘটনায় ৮৪/১৭ নং এ একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে সদর থানা পুলিশ। বিবৃত্তিতে আরো বলা হয়, মৃত সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ৬১/১৭ ও ৮০/১৭ নং দুটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
প্রকৃত ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নিহতের ভাই মাওলানা শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার ভায়ের নামে কোন মামলা ছিল না। তাকে আটকের পর দুটি অজ্ঞাত মামলায় আসামী করে কোর্টে চালান দেয়। যার জিআর নং ১৮১/১৭৩৫৪৮/১৭। এসব মামলায় তার ভাই এজাহারভুক্ত আসামী ছিল না। যদি তার নামে মামলা থাকত তাহলে পুলিশ কেন অজ্ঞাত মামলায় তাকে চালান দিল বলে পুলিশের প্রতি তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।
সাতক্ষীরা কারাগারের ডেপুটি জেল সুপার আবু জাহেদ জানান, রাত ১টার দিকে অসুস্থ বোধ করলে মাওলানা সাইদুর রহমানকে সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোররাতে তার মৃত্যু হয়। এদিকে, ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ফরহাদ জামিল মাদরাসা সুপার সাইদুর রহমানকে দুদফায় হাসপাতালে আনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এক নজরে শহীদ মাওলানা সাইদুর রহমান
নাম: মাওলানা সাইদুর রহমান
পিতার নাম: মৃত আলহাজ্ব দিলদার রহমান
মাতার নাম: মৃত রাহেলা বেগম
স্ত্রীর নাম: সাজেদা খাতুন ময়না, বয়স: ৩৬, পেশা- গৃহিণী
ঠিকানা: গ্রাম- কাথনডা, ইউপি- বৈকারী, থানা- সদর, সাতক্ষীরা
সন্তান: এক ছেলে, বয়স বাইশ বছর, এক মেয়ে বিবাহিত
সাংগঠনিক মান: রুকনপ্রার্থী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
গ্রেফতারের তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বাড়ি থেকে
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, কারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍