শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
১৫ মার্চ ২০১৪ উপজেলা পরিষদের নির্বাচন ছিল। নির্বাচনকে ঘিরে সব জায়গায় ছিল আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র মহড়া। বাগেরহাটের সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী বাহিনী ভোট সেন্টার দখলের জন্য সকাল থেকে বিভিন্ন পয়েন্টে বাধা প্রদান করছিল। তারই ধারাবাহিকতায় মেগনিতলায় সকাল ৮.৩০ এর দিকে ভোটারদের বাধা প্রদান করে এবং একপর্যায়ে মহিলাসহ কিছু ভোটারকে মারধর করে। এ সংবাদ পৌছলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কিছু লোকজন জেলা সেক্রেটারীর নেতৃত্বে ভোটারদেরকে উদ্ধার করার জন্য যায় এবং আওয়ামী বাহিনীর সাথে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে শিবির কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরই মধ্যে মানজারুল ইসলাম রাস্তায় পড়ে গেলে আওয়ামী সন্ত্রসীরা মাথার পিছনে রাম দা দিয়ে কোপ মারে এবং ইট দিয়ে থেতলে মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়। এলাকার লোকজনের মাধ্যমে শিবিরের নেতা-কর্মীরা জানতে পারেন যে মানজারুল ইসলাম রাস্তায় পড়ে আছে। তখন তাকে উদ্ধার করার জন্য লোকজন ছুটে গিয়ে প্রথমে মটর সাইকেল এবং পরে অটো রিক্সায় উঠিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।
এক নজরে শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
নাম: শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
পিতার নাম: শেখ আফজাল হোসেন
মাতার নাম: আনোয়ারা বেগম
জন্ম তারিখ: ১০ জানুয়ারী ১৯৯৪
ঠিকানা: গ্রাম- টেংরাখালী, পোঃ- টেংরাখালী, থানা- কচুয়া, জেলা- বাগেরহাট।
ভাই বোন: চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বড়।
পড়াশুনা: বাগেরহাট সরকারী পি সি কলেজ অনার্স ২য় বর্ষ অর্থনীতি বিভাগ।
সাংগঠনিক মান: সাথী
দায়িত্ব: পি সি কলেজ শাখার ম্যাস পরিচালক।
আহত হওয়ার তারিখ: ১৫ মার্চ, ২০১৪ ইং
আহতের ধরণ ও পরবর্তী অবস্থামাথায় চাইনিজ কুড়াল, দা এবং শাবল দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপানো হয়। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়।
শাহাদাতের তারিখ ও সময়: ১৫ মার্চ ২০১৪ সকাল ৮.৩০ মিনিট।
শাহাদাতের স্থান: বাগেরহাট, মেঘনিতলা।
এক নজরে শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
নাম: শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
পিতার নাম: শেখ আফজাল হোসেন
মাতার নাম: আনোয়ারা বেগম
জন্ম তারিখ: ১০ জানুয়ারী ১৯৯৪
ঠিকানা: গ্রাম- টেংরাখালী, পোঃ- টেংরাখালী, থানা- কচুয়া, জেলা- বাগেরহাট।
ভাই বোন: চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বড়।
পড়াশুনা: বাগেরহাট সরকারী পি সি কলেজ অনার্স ২য় বর্ষ অর্থনীতি বিভাগ।
সাংগঠনিক মান: সাথী
দায়িত্ব: পি সি কলেজ শাখার ম্যাস পরিচালক।
আহত হওয়ার তারিখ: ১৫ মার্চ, ২০১৪ ইং
আহতের ধরণ ও পরবর্তী অবস্থামাথায় চাইনিজ কুড়াল, দা এবং শাবল দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপানো হয়। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়।
শাহাদাতের তারিখ ও সময়: ১৫ মার্চ ২০১৪ সকাল ৮.৩০ মিনিট।
শাহাদাতের স্থান: বাগেরহাট, মেঘনিতলা।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"মা তোমরা যাই বলো না কেন ওরা যদি আমাকে মেরেও ফেলে তারপরও আমি এই ইসলামী আন্দোলনের পথ থেকে ফিরে আসবো না আমি যদি মারা যাই তোমরা আমার লাশ আনতে না গেলেও সমস্যা নেই"
-শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
শহীদের পরিচিতি
শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় ১৯৯৪ সালের ১০ জানুয়ারী জন্মগ্রহণ করেন। চর টেংরাখালী গ্রামের দিনমজুর পিতা শেখ আফজাল হোসেন ও মাতা আনোয়ারা বেগমের ছয় সন্তানের মধ্যে মানজারুল ইসলাম সবার বড়। তিনি সরকারি পিসি কলেজের অর্থনীতি (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের পিসি কলেজ শাখার প্রচার সম্পাদক মানজারুল ইসলাম তুহিন সাংগঠনিক মানে শহিদী কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথী ছিলেন। এ ছাড়া নিয়মিত গল্প-কবিতা লেখতেন শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
১৫ মার্চ ২০১৪ উপজেলা পরিষদের নির্বাচন ছিল। নির্বাচনকে ঘিরে সব জায়গায় ছিল আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র মহড়া। বাগেরহাটের সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী বাহিনী ভোট সেন্টার দখলের জন্য সকাল থেকে বিভিন্ন পয়েন্টে বাধা প্রদান করছিল। তারই ধারাবাহিকতায় মেগনিতলায় সকাল ৮.৩০ এর দিকে ভোটারদের বাধা প্রদান করে এবং একপর্যায়ে মহিলাসহ কিছু ভোটারকে মারধর করে। এ সংবাদ পৌছলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কিছু লোকজন জেলা সেক্রেটারীর নেতৃত্বে ভোটারদেরকে উদ্ধার করার জন্য যায় এবং আওয়ামী বাহিনীর সাথে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে শিবির কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরই মধ্যে মানজারুল ইসলাম রাস্তায় পড়ে গেলে আওয়ামী সন্ত্রসীরা মাথার পিছনে রাম দা দিয়ে কোপ মারে এবং ইট দিয়ে থেতলে মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়। এলাকার লোকজনের মাধ্যমে শিবিরের নেতা-কর্মীরা জানতে পারেন যে মানজারুল ইসলাম রাস্তায় পড়ে আছে। তখন তাকে উদ্ধার করার জন্য লোকজন ছুটে গিয়ে প্রথমে মটর সাইকেল এবং পরে অটো রিক্সায় উঠিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
শহীদের ছোট ভাই নাইমুল ইসলাম বলেন- ভাই কিছুদিন আগে বাড়ি এসেছিল। আমরা যখন সবাই খেতে বসেছি তখন ভাইয়া একটা কথা বলেছিল, সাইকেল যোগে বাড়ি আসার পথে দড়াটানা ব্রিজের উপর আসার পর একজন মানসিক ভারস্যামহীন ব্যক্তি ভাইয়ার কাছে খাবার চেয়েছিল। ভাইয়ার পকেটে তখন মাত্র ৫০/৬০ টাকা ছিল। ভাইয়া উপায়ন্তর না পেয়ে পুরো টাকাটাই সেই মানসিক ভারসাম্যহীন ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে দিয়ে দিয়েছিলেন।
শাহাদাতের কিছুদিন আগে যখন বাড়িতে এসেছিলেন তখন পাশের বাড়িতে ২ বছর বয়সী একটি মেয়ে পুকুরে পড়ে যায়। শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন তখন লাফিয়ে পড়ে পুকুর থেকে সেই মেয়েটিকে উদ্ধার করেছিলেন। এ ঘটনায় তার চশমা ও মোবাইল ফোন নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো উল্লেখ করে শহীদের মা বলেন-জীবনে কোনদিন ওয়াদা ভঙ্গ করেনি তুহিন। যাওয়ার সময় বলেছিল শুক্রবারে বাড়ি আসতে। ওয়াদা মাফিক বাড়ি আসার পথে নানাবাড়ি গিয়েছিল। সেখান থেকে সংগঠনের দায়িত্বশীলদের ডাকে আবার ফিরে গেছে। জীবনে এই একবারই তুহিন আমার সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করেছে- তাও সংগঠনের জন্য।
ঘটনার সামগ্রিক বিবরণ
১৫ ই মার্চ রোজ শনিবার ২০১৪ ইং। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ৩য় ধাপ। মানজারুল ইসলাম (তুহিন) অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের সমাপনী পরিক্ষার্থী ছিলেন। অতি ভোরে ফজরের নামাজ আদায় করত, কুরআন তেলাওয়াত ও হাদীস অধ্যয়ন করে নির্বাচনী কাজে সাথী ভাইদের সাথে বাইরে বেরিয়ে যায়। সকাল ৮টার সময় ম্যাসে ফিরে সভাপতি শেখ মোঃ মনিরুজ্জামান (আমার)-এর কাছে জানতে পারে যে কাড়াপাড়া ইউনিয়ন কাউন্সিলের সেন্টারে আওয়ামীলীগের লোকজন জামায়াতের ভোটারদেরকে বাধাদান ও মারধর করছে। মহিলা জামায়াতের ভোটারদেরকেও বাধা প্রদান করে অপমান ও অপদস্ত করছে। মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়া এমনকি তাদেরকে আঘাত করতেও পিছ পা হয়নি আওয়ামী লীগের এই সন্ত্রসীরা। যাই হোক এই খবর পেয়ে শিবিরের জেলা সেক্রেটারীর নেতৃত্বে পৌর সেক্রেটারী আঃ রহমান রনি, মানজারুল ভাই সহ ১৩-১৪ জনের একটা গ্রুপ সেখানে যান। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আওয়ামীলীগের সন্ত্রসীরা গতি রোধ করে। রামদা চাইনিজ কুড়াল, হকিস্টিক, রড, হাতুড়ি, বাঁশের লাঠি ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতর্কিত হামলা চালায় এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। তাদেরকে প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করি এবং পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপের এক পর্যায় আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই। কিন্তু আমাদের অজান্তেই ওরা মানজারুল ভাইকে ধরে ফেলে লোহার রড, হাতুড়ি, হকিস্টিক দিয়ে এলোপাথাড়ি আঘাত করে এক পর্যায়ে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে মাথায় কোপ দিলে রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে যায় এবং সাথে সবুর নামের এক আওয়ামী কর্মী ইট দিয়ে মাথা থেতলে দেয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে আমরা স্থানীয় এক ভাইয়ের কাছে শুনতে পেলাম যে আমাদের এক ভাই ওখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
এ খবর শুনে আমরা আবার সংঘবদ্ধ হয়ে মানজারুল ভাইয়ের রক্তাক্ত, ক্ষত, বিক্ষত দেহ উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাই। কিন্তু পথেই মানজারুল ভাই মৃত্যুবরণ করেন (শহীদ হন)।
সবাইকে শোকের পাথারে ভাসিয়ে মানজারুল ভাই চলে গেলেন আল্লাহর কাছে। না ফেরার দেশে। হাসপাতালের ময়না তদন্ত, পোস্টমর্টেম এবং সুরাত হাল রিপোর্ট করার পর আমরা রাত ৮.০০ টায় শহীদের লাশ গ্রহণ করি এবং লাশ গোসলের পর প্রথম জানাজা শুরু হয় জেলা জামায়াত অফিসের সামনে।শাহাদাতের ঠিক ৫-৬ মিনিট আগে যেখান থেকে তিনি সর্বশেষ পবিত্রতা অর্জন করেছিলেন সেই পুকুরের পানি দিয়ে তাকে গোসল করানো হয়। জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয় রাত ১০.৩০ মিঃ প্রায় ৭০০ লোকের উপস্থিতিতে প্রথম জানাজা পড়ান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাগেরহাট জেলা শাখার সম্মানিত আমীর জনাব মাওঃ মশিউর রহমান। রাত ১২ টায় শহীদের কফিন গ্রামের বাড়িতে পৌছায় এবং স্থানীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গনে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ইমামতি করেন স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মিজানুর রহমান।
সাংগঠনিক মান
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী এবং সরকারী পি. সি. কলেজ শাখার মেস ওয়ার্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
শহীদের আপনজনদের কথা
আব্বা
মানজারুল ইসলামের প্রতিবন্ধি পিতা অতি কষ্টে তাকে বড় করে তুলেছেন শাহাদাতের ঘটনা কানে পৌঁছতেই সে অজ্ঞান হয়ে যায় এবং বলেন আমি আজকে এত অপরিচিত লোক দেখতেছি কিন্তু আমার চিরচেনা মানজারুলকে দেখি না। আমি নিরিহ গরীব মানুষ। আমি আল্লাহর কাছে আমার কলিজার টুকরা মানজারুল হত্যার বিচার চাই আমি কোন মামলা করব না। তোমরা আমার তুহিনকে ফিরিয়ে দাও আমার আব্বুকে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও।
মা
মা আনোয়ারা বেগম শোকের মাতমে হতবিহবল হয়ে দুপুর থেকেই পড়ে আছেন বিছানায় তার কোন কথা নেই যেন সে বাক প্রতিবন্ধি। লাশ রাত ১২ টায় গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতেই মানজারুল ইসলামের মা বলেন-"আল্লাহ তুমি আমার সামনে দিয়া আমার কলিজা ছিনিয়ে নিলা। আমি কি নিয়া বাঁচবো!" তিনি আরো বলেন-"মানুষের কিডনি না থাকলেও মানুষ বাঁচতে পারে কিন্তু কলিজা না থাকলে মানুষ কিভাবে বাঁচে? আমার তুহিন আমার কলিজা, আমার আর বাঁচার ইচ্ছা নেই। তোমরা আমার কলিজার টুকরা ফিরিয়ে দাও।
শহীদের ভাই
শহীদ মানজারুল ইসলামের একমাত্র ছোট ভাই নাঈমুল ইসলাম কচুয়া সি. এস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে পড়াশুনা করে। শহীদ মানজারুল ইসলাম বাগেরহাট শহরে ম্যাসে থেকে কোচিং এ ক্লাশ করিয়ে এবং টিউশনি করে নিজের ও ছোট ভাইয়ের পড়াশুনার খরচ সরবরাহ করতো।
টেংরাখালী কচুয়া উপজেলা চেয়ারম্যান
উপজেলা চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান (বাং-আঃ লীগ), আমি মানজারুলকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি। সে অত্র এলাকার মধ্যে একটা নম্র, ভদ্র ও মিষ্টভাষী এবং সদালাপি ছেলে। কারো সাথে তার শত্রুতা হয়েছে বা কাউকে সে মন্দ বলেছে এরকম আমি কক্ষনো শুনিনি। মানজারুলের শিবির করা সম্পর্কে তিনি বলেন, মানজারুলের আচার-আচরণে চলাফেরায় একজন অতি সাধারণ ছেলে বলেই মনে হত। সে যে পি.সি কলেজের ছাত্রনেতা একটা ওয়ার্ডের সভাপতি সেটা আমি কখনো বুঝতে পারিনি। সে নিজে দরিদ্র হলেও এলাকার দরিদ্র মেধাবীদের জন্য বন্ধু ছাত্র কল্যাণ তহবিল গঠন করে অত্র এলাকায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করুন।শাহাদাতের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে দোয়া মাহফিল
২১ মার্চ ২০১৪ ইং তারিখে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক নাভিদ আনোয়ারের পরিচালনায় দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সেক্রেটারী জেনারেল আতিকুর রহমান। দোয়া পূর্ব আলোচনা সভায় শিবির সেক্রেটারী জেনারেল বলেন, অবৈধ আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে নিরাপরাধ মানুষদের খুনের পথ বেছে নিয়েছে। ভোটারবিহীন জাতীয় নির্বাচনের পর প্রথম ও দ্বিতীয় দফা উপজেলা নির্বাচনে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত ও ধিকৃত হয়ে আওয়ামীলীগ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। আর তাই তৃতীয় দফা উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের পক্ষে রাখতে নিরাপরাধ মানুষের উপর তাদের ক্যাডার বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে। বাগেরহাট জেলায় শিবির নেতা মানজারুল ইসলামকে তারা নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে। তারা মনে করেছে হত্যা এবং খুনের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের বিজয়কে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু সম্প্রতি উপজেলা নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে শহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি। শাহাদাতের সিঁড়ি যত দীর্ঘ হবে ইসলামী আন্দোলনের বিজয় ততই তরান্বিত হবে। শহীদ মানজারুল ইসলামের রক্ত এদেশের মাটিকে ইসলামী আন্দোলনের জন্য আরো উর্বর ভূমিতে পরিণত করেছে। অতঃপর শহীদের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনায় আল্লাহর দরবারে দোয়া করা হয়।
মানজারুল ইসলাম তুহিনের শাহাদাতে দোয়া অনুষ্ঠান করে ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগরী পূর্ব শাখা। ২০ মার্চ ২০১৪ বিকাল ৩টায় রাজধানীর এক মিলনায়তনে দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক মুহসিনুল কবির। এসময় শাখা সেক্রেটারি এম শামিম, বায়তুলমাল সম্পাদক তুজাম্মেল হক, অফিস সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক শফিকুল ইসলামসহ শাখার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
মানজারুল ইসলাম তুহিনের শাহাদাতে দোয়া অনুষ্ঠান করেছে ছাত্রশিবির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। ২০ মার্চ ২০১৪ রোজ বৃহস্পতিবার বিকালে স্থানীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই দোয়া মাহফিলে দোয়া পরিচালনা করেন ছাত্রশিবিরের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সেক্রেটারি মু. দাইয়ান সালেহিন। উপস্থিত ছিলেন শাখার ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক নূর মোহাম্মদ, দফতর সম্পাদক আতিকুর রহমান, এইচআরডি সম্পাদক শাহীন হাসান প্রধান, সাহিত্য সম্পাদক মুজাহিদ বিল্লাহ, বিতর্ক সম্পাদক জয়নুল আবেদীন প্রমুখ।
শহীদ মানজারুল ইসলামের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনায় রাজধানীতে দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছাত্রশিবির প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। ২০ মার্চ ২০১৪ বিকাল ৩টায় রাজধানীর একটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাখা সেক্রেটারি তারেক আব্দুল্লাহ। এসময় শাখার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
শহীদ মানজারুল ইসলামের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনায় দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছাত্রশিবির সিলেট মহানগরী শাখা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সাবেক কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক মু. ফখরুল ইসলাম। নগর সভাপতি আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপুর সভাপতিত্বে এসময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক নগর সভাপতি মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার, সেক্রেটারী আব্দুর রাজ্জাক, সাংগঠনিক সম্পাদক মাশুক আহমদ, এইচ.আর.ডি সম্পাদক জোবায়ের আহমদ, ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক ফয়জুল ইসলাম জায়গীরদার, শিক্ষা সম্পাদক হাফেজ আব্দুল আজিজ, এমসি কলেজ সভাপতি নজরুল ইসলাম, নগর প্রচার সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল, কোতয়ালী পূর্ব থানা সভাপতি শামসুর রহমান জাবাল।
১৫ মার্চ বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাচন চলাকালে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নৃশংসতায় শহীদ মানজারুল ইসলামের রুহের মাগফিরাত কামনায় সকাল ৯টায় খুলনা মহানগরী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মহানগরী সভাপতি আজিজুল ইসলাম ফারাজীর সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি মিম মিরাজ হোসাইনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন, হাদিসুর রহমান, স.ম.মহিউল ইসলাম মাহি, একেএম তানজিল, এম.ও. রহমান, এস.এম. আব্দুল্লাহ মনা, রেদওয়ানুল হক প্রমুখ। আওয়ামী হামলায় বাগেরহাটে শাহাদাত বরণকারী শিবির নেতা মানজারুল ইসলাম তুহিনের রুহের মাগফেরাত কামনায় আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে ছাত্রশিবির বগুড়া শহর শাখা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রআন্দলন সম্পাদক জাকির হোসেন সেলিম। শাখার সভাপতি আলাউদ্দিন সোহেলসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সাতকানিয়া শহর শিবিরের উদ্যোগে শহীদ মনজুরুল ইসলামের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনায় দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সভাপতি মুহাম্মদ তারেক হোছাঈন। সাতকানিয়া শহর সাথী শাখার সভাপতি তৌফিক ইলাহীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মহানগরী দক্ষিণের ছাত্রনেতা হামিদ হোছাইন, মুহাম্মদ জাকারিয়া ও কাজী বোরহান উদ্দীন প্রমুখ।
শহীদ মানজারুল ইসলাম স্মরণে ও রুহের মাগফেরাত কামনায় লালমনিরহাট জেলা শিবির দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জেলা স্কুল সম্পাদক রেজাউল করীম ও দোয়া পরিচালনা করেন জেলা সভাপতি মোঃ সিরাজুল ইসলাম। এ ছাড়াও সকল থানায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
শহীদের পরিবার
শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিনের ছোট বোন উম্মে সুমাইয়া দুই বছর বয়সেই মারা যান। তারপর তুহিনের ভাই নাইমুল ইসলাম। নাইমুল ইসলাম বর্তমানে বেলায়েত হোসেন ডিগ্রি কলেজে অনার্স ১ম বর্ষে অধ্যায়নরত এবং শহীদি কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মী। নাইমুল ইসলামের পর তাঁদের পরিবারে আসে দুই জমজ ভাই। কিন্তু জন্মের মাত্র ঘন্টা খানেক পরে তারা দুইজনই মৃত্যুবরণ করেন।
এক নজরে শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
নাম: শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
পিতার নাম: শেখ আফজাল হোসেন
মাতার নাম: আনোয়ারা বেগম
জন্ম তারিখ: ১০ জানুয়ারী ১৯৯৪
ঠিকানা: গ্রাম- টেংরাখালী, পোঃ- টেংরাখালী, থানা- কচুয়া, জেলা- বাগেরহাট।
ভাই বোন: চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বড়।
পড়াশুনা: বাগেরহাট সরকারী পি সি কলেজ অনার্স ২য় বর্ষ অর্থনীতি বিভাগ।
সাংগঠনিক মান: সাথী
দায়িত্ব: পি সি কলেজ শাখার ম্যাস পরিচালক।
আহত হওয়ার তারিখ: ১৫ মার্চ, ২০১৪ ইং
আহতের ধরণ ও পরবর্তী অবস্থামাথায় চাইনিজ কুড়াল, দা এবং শাবল দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপানো হয়। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়।
শাহাদাতের তারিখ ও সময়: ১৫ মার্চ ২০১৪ সকাল ৮.৩০ মিনিট।
শাহাদাতের স্থান: বাগেরহাট, মেঘনিতলা।
-শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
শহীদের পরিচিতি
শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় ১৯৯৪ সালের ১০ জানুয়ারী জন্মগ্রহণ করেন। চর টেংরাখালী গ্রামের দিনমজুর পিতা শেখ আফজাল হোসেন ও মাতা আনোয়ারা বেগমের ছয় সন্তানের মধ্যে মানজারুল ইসলাম সবার বড়। তিনি সরকারি পিসি কলেজের অর্থনীতি (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের পিসি কলেজ শাখার প্রচার সম্পাদক মানজারুল ইসলাম তুহিন সাংগঠনিক মানে শহিদী কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথী ছিলেন। এ ছাড়া নিয়মিত গল্প-কবিতা লেখতেন শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
১৫ মার্চ ২০১৪ উপজেলা পরিষদের নির্বাচন ছিল। নির্বাচনকে ঘিরে সব জায়গায় ছিল আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র মহড়া। বাগেরহাটের সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী বাহিনী ভোট সেন্টার দখলের জন্য সকাল থেকে বিভিন্ন পয়েন্টে বাধা প্রদান করছিল। তারই ধারাবাহিকতায় মেগনিতলায় সকাল ৮.৩০ এর দিকে ভোটারদের বাধা প্রদান করে এবং একপর্যায়ে মহিলাসহ কিছু ভোটারকে মারধর করে। এ সংবাদ পৌছলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কিছু লোকজন জেলা সেক্রেটারীর নেতৃত্বে ভোটারদেরকে উদ্ধার করার জন্য যায় এবং আওয়ামী বাহিনীর সাথে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে শিবির কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরই মধ্যে মানজারুল ইসলাম রাস্তায় পড়ে গেলে আওয়ামী সন্ত্রসীরা মাথার পিছনে রাম দা দিয়ে কোপ মারে এবং ইট দিয়ে থেতলে মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়। এলাকার লোকজনের মাধ্যমে শিবিরের নেতা-কর্মীরা জানতে পারেন যে মানজারুল ইসলাম রাস্তায় পড়ে আছে। তখন তাকে উদ্ধার করার জন্য লোকজন ছুটে গিয়ে প্রথমে মটর সাইকেল এবং পরে অটো রিক্সায় উঠিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
শহীদের ছোট ভাই নাইমুল ইসলাম বলেন- ভাই কিছুদিন আগে বাড়ি এসেছিল। আমরা যখন সবাই খেতে বসেছি তখন ভাইয়া একটা কথা বলেছিল, সাইকেল যোগে বাড়ি আসার পথে দড়াটানা ব্রিজের উপর আসার পর একজন মানসিক ভারস্যামহীন ব্যক্তি ভাইয়ার কাছে খাবার চেয়েছিল। ভাইয়ার পকেটে তখন মাত্র ৫০/৬০ টাকা ছিল। ভাইয়া উপায়ন্তর না পেয়ে পুরো টাকাটাই সেই মানসিক ভারসাম্যহীন ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে দিয়ে দিয়েছিলেন।
শাহাদাতের কিছুদিন আগে যখন বাড়িতে এসেছিলেন তখন পাশের বাড়িতে ২ বছর বয়সী একটি মেয়ে পুকুরে পড়ে যায়। শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন তখন লাফিয়ে পড়ে পুকুর থেকে সেই মেয়েটিকে উদ্ধার করেছিলেন। এ ঘটনায় তার চশমা ও মোবাইল ফোন নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো উল্লেখ করে শহীদের মা বলেন-জীবনে কোনদিন ওয়াদা ভঙ্গ করেনি তুহিন। যাওয়ার সময় বলেছিল শুক্রবারে বাড়ি আসতে। ওয়াদা মাফিক বাড়ি আসার পথে নানাবাড়ি গিয়েছিল। সেখান থেকে সংগঠনের দায়িত্বশীলদের ডাকে আবার ফিরে গেছে। জীবনে এই একবারই তুহিন আমার সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করেছে- তাও সংগঠনের জন্য।
ঘটনার সামগ্রিক বিবরণ
১৫ ই মার্চ রোজ শনিবার ২০১৪ ইং। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ৩য় ধাপ। মানজারুল ইসলাম (তুহিন) অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের সমাপনী পরিক্ষার্থী ছিলেন। অতি ভোরে ফজরের নামাজ আদায় করত, কুরআন তেলাওয়াত ও হাদীস অধ্যয়ন করে নির্বাচনী কাজে সাথী ভাইদের সাথে বাইরে বেরিয়ে যায়। সকাল ৮টার সময় ম্যাসে ফিরে সভাপতি শেখ মোঃ মনিরুজ্জামান (আমার)-এর কাছে জানতে পারে যে কাড়াপাড়া ইউনিয়ন কাউন্সিলের সেন্টারে আওয়ামীলীগের লোকজন জামায়াতের ভোটারদেরকে বাধাদান ও মারধর করছে। মহিলা জামায়াতের ভোটারদেরকেও বাধা প্রদান করে অপমান ও অপদস্ত করছে। মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়া এমনকি তাদেরকে আঘাত করতেও পিছ পা হয়নি আওয়ামী লীগের এই সন্ত্রসীরা। যাই হোক এই খবর পেয়ে শিবিরের জেলা সেক্রেটারীর নেতৃত্বে পৌর সেক্রেটারী আঃ রহমান রনি, মানজারুল ভাই সহ ১৩-১৪ জনের একটা গ্রুপ সেখানে যান। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আওয়ামীলীগের সন্ত্রসীরা গতি রোধ করে। রামদা চাইনিজ কুড়াল, হকিস্টিক, রড, হাতুড়ি, বাঁশের লাঠি ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতর্কিত হামলা চালায় এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। তাদেরকে প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করি এবং পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপের এক পর্যায় আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই। কিন্তু আমাদের অজান্তেই ওরা মানজারুল ভাইকে ধরে ফেলে লোহার রড, হাতুড়ি, হকিস্টিক দিয়ে এলোপাথাড়ি আঘাত করে এক পর্যায়ে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে মাথায় কোপ দিলে রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে যায় এবং সাথে সবুর নামের এক আওয়ামী কর্মী ইট দিয়ে মাথা থেতলে দেয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে আমরা স্থানীয় এক ভাইয়ের কাছে শুনতে পেলাম যে আমাদের এক ভাই ওখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
এ খবর শুনে আমরা আবার সংঘবদ্ধ হয়ে মানজারুল ভাইয়ের রক্তাক্ত, ক্ষত, বিক্ষত দেহ উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাই। কিন্তু পথেই মানজারুল ভাই মৃত্যুবরণ করেন (শহীদ হন)।
সবাইকে শোকের পাথারে ভাসিয়ে মানজারুল ভাই চলে গেলেন আল্লাহর কাছে। না ফেরার দেশে। হাসপাতালের ময়না তদন্ত, পোস্টমর্টেম এবং সুরাত হাল রিপোর্ট করার পর আমরা রাত ৮.০০ টায় শহীদের লাশ গ্রহণ করি এবং লাশ গোসলের পর প্রথম জানাজা শুরু হয় জেলা জামায়াত অফিসের সামনে।শাহাদাতের ঠিক ৫-৬ মিনিট আগে যেখান থেকে তিনি সর্বশেষ পবিত্রতা অর্জন করেছিলেন সেই পুকুরের পানি দিয়ে তাকে গোসল করানো হয়। জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয় রাত ১০.৩০ মিঃ প্রায় ৭০০ লোকের উপস্থিতিতে প্রথম জানাজা পড়ান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাগেরহাট জেলা শাখার সম্মানিত আমীর জনাব মাওঃ মশিউর রহমান। রাত ১২ টায় শহীদের কফিন গ্রামের বাড়িতে পৌছায় এবং স্থানীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গনে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ইমামতি করেন স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মিজানুর রহমান।
সাংগঠনিক মান
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী এবং সরকারী পি. সি. কলেজ শাখার মেস ওয়ার্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
শহীদের আপনজনদের কথা
আব্বা
মানজারুল ইসলামের প্রতিবন্ধি পিতা অতি কষ্টে তাকে বড় করে তুলেছেন শাহাদাতের ঘটনা কানে পৌঁছতেই সে অজ্ঞান হয়ে যায় এবং বলেন আমি আজকে এত অপরিচিত লোক দেখতেছি কিন্তু আমার চিরচেনা মানজারুলকে দেখি না। আমি নিরিহ গরীব মানুষ। আমি আল্লাহর কাছে আমার কলিজার টুকরা মানজারুল হত্যার বিচার চাই আমি কোন মামলা করব না। তোমরা আমার তুহিনকে ফিরিয়ে দাও আমার আব্বুকে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও।
মা
মা আনোয়ারা বেগম শোকের মাতমে হতবিহবল হয়ে দুপুর থেকেই পড়ে আছেন বিছানায় তার কোন কথা নেই যেন সে বাক প্রতিবন্ধি। লাশ রাত ১২ টায় গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতেই মানজারুল ইসলামের মা বলেন-"আল্লাহ তুমি আমার সামনে দিয়া আমার কলিজা ছিনিয়ে নিলা। আমি কি নিয়া বাঁচবো!" তিনি আরো বলেন-"মানুষের কিডনি না থাকলেও মানুষ বাঁচতে পারে কিন্তু কলিজা না থাকলে মানুষ কিভাবে বাঁচে? আমার তুহিন আমার কলিজা, আমার আর বাঁচার ইচ্ছা নেই। তোমরা আমার কলিজার টুকরা ফিরিয়ে দাও।
শহীদের ভাই
শহীদ মানজারুল ইসলামের একমাত্র ছোট ভাই নাঈমুল ইসলাম কচুয়া সি. এস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে পড়াশুনা করে। শহীদ মানজারুল ইসলাম বাগেরহাট শহরে ম্যাসে থেকে কোচিং এ ক্লাশ করিয়ে এবং টিউশনি করে নিজের ও ছোট ভাইয়ের পড়াশুনার খরচ সরবরাহ করতো।
টেংরাখালী কচুয়া উপজেলা চেয়ারম্যান
উপজেলা চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান (বাং-আঃ লীগ), আমি মানজারুলকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি। সে অত্র এলাকার মধ্যে একটা নম্র, ভদ্র ও মিষ্টভাষী এবং সদালাপি ছেলে। কারো সাথে তার শত্রুতা হয়েছে বা কাউকে সে মন্দ বলেছে এরকম আমি কক্ষনো শুনিনি। মানজারুলের শিবির করা সম্পর্কে তিনি বলেন, মানজারুলের আচার-আচরণে চলাফেরায় একজন অতি সাধারণ ছেলে বলেই মনে হত। সে যে পি.সি কলেজের ছাত্রনেতা একটা ওয়ার্ডের সভাপতি সেটা আমি কখনো বুঝতে পারিনি। সে নিজে দরিদ্র হলেও এলাকার দরিদ্র মেধাবীদের জন্য বন্ধু ছাত্র কল্যাণ তহবিল গঠন করে অত্র এলাকায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করুন।শাহাদাতের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে দোয়া মাহফিল
২১ মার্চ ২০১৪ ইং তারিখে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক নাভিদ আনোয়ারের পরিচালনায় দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সেক্রেটারী জেনারেল আতিকুর রহমান। দোয়া পূর্ব আলোচনা সভায় শিবির সেক্রেটারী জেনারেল বলেন, অবৈধ আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে নিরাপরাধ মানুষদের খুনের পথ বেছে নিয়েছে। ভোটারবিহীন জাতীয় নির্বাচনের পর প্রথম ও দ্বিতীয় দফা উপজেলা নির্বাচনে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত ও ধিকৃত হয়ে আওয়ামীলীগ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। আর তাই তৃতীয় দফা উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের পক্ষে রাখতে নিরাপরাধ মানুষের উপর তাদের ক্যাডার বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে। বাগেরহাট জেলায় শিবির নেতা মানজারুল ইসলামকে তারা নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে। তারা মনে করেছে হত্যা এবং খুনের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের বিজয়কে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু সম্প্রতি উপজেলা নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে শহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি। শাহাদাতের সিঁড়ি যত দীর্ঘ হবে ইসলামী আন্দোলনের বিজয় ততই তরান্বিত হবে। শহীদ মানজারুল ইসলামের রক্ত এদেশের মাটিকে ইসলামী আন্দোলনের জন্য আরো উর্বর ভূমিতে পরিণত করেছে। অতঃপর শহীদের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনায় আল্লাহর দরবারে দোয়া করা হয়।
মানজারুল ইসলাম তুহিনের শাহাদাতে দোয়া অনুষ্ঠান করে ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগরী পূর্ব শাখা। ২০ মার্চ ২০১৪ বিকাল ৩টায় রাজধানীর এক মিলনায়তনে দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক মুহসিনুল কবির। এসময় শাখা সেক্রেটারি এম শামিম, বায়তুলমাল সম্পাদক তুজাম্মেল হক, অফিস সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক শফিকুল ইসলামসহ শাখার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
মানজারুল ইসলাম তুহিনের শাহাদাতে দোয়া অনুষ্ঠান করেছে ছাত্রশিবির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। ২০ মার্চ ২০১৪ রোজ বৃহস্পতিবার বিকালে স্থানীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই দোয়া মাহফিলে দোয়া পরিচালনা করেন ছাত্রশিবিরের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সেক্রেটারি মু. দাইয়ান সালেহিন। উপস্থিত ছিলেন শাখার ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক নূর মোহাম্মদ, দফতর সম্পাদক আতিকুর রহমান, এইচআরডি সম্পাদক শাহীন হাসান প্রধান, সাহিত্য সম্পাদক মুজাহিদ বিল্লাহ, বিতর্ক সম্পাদক জয়নুল আবেদীন প্রমুখ।
শহীদ মানজারুল ইসলামের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনায় রাজধানীতে দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছাত্রশিবির প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। ২০ মার্চ ২০১৪ বিকাল ৩টায় রাজধানীর একটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাখা সেক্রেটারি তারেক আব্দুল্লাহ। এসময় শাখার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
শহীদ মানজারুল ইসলামের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনায় দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছাত্রশিবির সিলেট মহানগরী শাখা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সাবেক কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক মু. ফখরুল ইসলাম। নগর সভাপতি আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপুর সভাপতিত্বে এসময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক নগর সভাপতি মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার, সেক্রেটারী আব্দুর রাজ্জাক, সাংগঠনিক সম্পাদক মাশুক আহমদ, এইচ.আর.ডি সম্পাদক জোবায়ের আহমদ, ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক ফয়জুল ইসলাম জায়গীরদার, শিক্ষা সম্পাদক হাফেজ আব্দুল আজিজ, এমসি কলেজ সভাপতি নজরুল ইসলাম, নগর প্রচার সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল, কোতয়ালী পূর্ব থানা সভাপতি শামসুর রহমান জাবাল।
১৫ মার্চ বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাচন চলাকালে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নৃশংসতায় শহীদ মানজারুল ইসলামের রুহের মাগফিরাত কামনায় সকাল ৯টায় খুলনা মহানগরী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মহানগরী সভাপতি আজিজুল ইসলাম ফারাজীর সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি মিম মিরাজ হোসাইনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন, হাদিসুর রহমান, স.ম.মহিউল ইসলাম মাহি, একেএম তানজিল, এম.ও. রহমান, এস.এম. আব্দুল্লাহ মনা, রেদওয়ানুল হক প্রমুখ। আওয়ামী হামলায় বাগেরহাটে শাহাদাত বরণকারী শিবির নেতা মানজারুল ইসলাম তুহিনের রুহের মাগফেরাত কামনায় আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে ছাত্রশিবির বগুড়া শহর শাখা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রআন্দলন সম্পাদক জাকির হোসেন সেলিম। শাখার সভাপতি আলাউদ্দিন সোহেলসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সাতকানিয়া শহর শিবিরের উদ্যোগে শহীদ মনজুরুল ইসলামের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনায় দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সভাপতি মুহাম্মদ তারেক হোছাঈন। সাতকানিয়া শহর সাথী শাখার সভাপতি তৌফিক ইলাহীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মহানগরী দক্ষিণের ছাত্রনেতা হামিদ হোছাইন, মুহাম্মদ জাকারিয়া ও কাজী বোরহান উদ্দীন প্রমুখ।
শহীদ মানজারুল ইসলাম স্মরণে ও রুহের মাগফেরাত কামনায় লালমনিরহাট জেলা শিবির দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জেলা স্কুল সম্পাদক রেজাউল করীম ও দোয়া পরিচালনা করেন জেলা সভাপতি মোঃ সিরাজুল ইসলাম। এ ছাড়াও সকল থানায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
শহীদের পরিবার
শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিনের ছোট বোন উম্মে সুমাইয়া দুই বছর বয়সেই মারা যান। তারপর তুহিনের ভাই নাইমুল ইসলাম। নাইমুল ইসলাম বর্তমানে বেলায়েত হোসেন ডিগ্রি কলেজে অনার্স ১ম বর্ষে অধ্যায়নরত এবং শহীদি কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মী। নাইমুল ইসলামের পর তাঁদের পরিবারে আসে দুই জমজ ভাই। কিন্তু জন্মের মাত্র ঘন্টা খানেক পরে তারা দুইজনই মৃত্যুবরণ করেন।
এক নজরে শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
নাম: শহীদ মানজারুল ইসলাম তুহিন
পিতার নাম: শেখ আফজাল হোসেন
মাতার নাম: আনোয়ারা বেগম
জন্ম তারিখ: ১০ জানুয়ারী ১৯৯৪
ঠিকানা: গ্রাম- টেংরাখালী, পোঃ- টেংরাখালী, থানা- কচুয়া, জেলা- বাগেরহাট।
ভাই বোন: চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বড়।
পড়াশুনা: বাগেরহাট সরকারী পি সি কলেজ অনার্স ২য় বর্ষ অর্থনীতি বিভাগ।
সাংগঠনিক মান: সাথী
দায়িত্ব: পি সি কলেজ শাখার ম্যাস পরিচালক।
আহত হওয়ার তারিখ: ১৫ মার্চ, ২০১৪ ইং
আহতের ধরণ ও পরবর্তী অবস্থামাথায় চাইনিজ কুড়াল, দা এবং শাবল দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপানো হয়। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়।
শাহাদাতের তারিখ ও সময়: ১৫ মার্চ ২০১৪ সকাল ৮.৩০ মিনিট।
শাহাদাতের স্থান: বাগেরহাট, মেঘনিতলা।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍