শহীদ মো: আবু রুহানী
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
নাম: শহীদ মো: আবু রুহানী (০১৭)।
পেশা: সরকারি আযিযুল হক কলেজ বগুড়ায়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ২০.১২.১৯৯১ সাল ২১ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ৩১ জানুয়ারি ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, দুপুর ২টা-৩টা, স্থান: শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়া।
দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থানে।স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: এরুলিয়া (মন্ডলপাড়া)।
ডাকঘর: এরুলিয়া, বগুড়া সদর, বগুড়া।
পিতা: মো: আবু বকর, বয়স: ৫৩ বছর, মক্তব পড়ান।
মাতা: মোছা: রেহেনা বেগম, ৪৬ বছর, গৃহিণী।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: রফিকুল ইসলাম, মেসেঞ্জার কাম গার্ড, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, বগুড়া, বয়স ৩০ বছর। মোসা: ফাতেমা, বিবাহিতা, স্বামী-ফার্নিচার-এর ব্যবসা করেন। মোসাঃ রোকেয়া, বিবাহিতা, স্বামী-ঔষধের দোকান আছে। মোঃ আশরাফ আলী, সরকারি আযিযুল হক কলেজ বগুড়া, তৃতীয় বর্ষ-সমাজবিজ্ঞান বিভাগ। নামুযা ফাযিল মাদরাসা হতে ফাযিল (বি.এ) এ গ্রেড বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। মোসা: জয়নব, মোস্তফা আলিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, ফাজিল প্রথম বর্ষ।
পেশা: সরকারি আযিযুল হক কলেজ বগুড়ায়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ২০.১২.১৯৯১ সাল ২১ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ৩১ জানুয়ারি ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, দুপুর ২টা-৩টা, স্থান: শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়া।
দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থানে।স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: এরুলিয়া (মন্ডলপাড়া)।
ডাকঘর: এরুলিয়া, বগুড়া সদর, বগুড়া।
পিতা: মো: আবু বকর, বয়স: ৫৩ বছর, মক্তব পড়ান।
মাতা: মোছা: রেহেনা বেগম, ৪৬ বছর, গৃহিণী।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: রফিকুল ইসলাম, মেসেঞ্জার কাম গার্ড, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, বগুড়া, বয়স ৩০ বছর। মোসা: ফাতেমা, বিবাহিতা, স্বামী-ফার্নিচার-এর ব্যবসা করেন। মোসাঃ রোকেয়া, বিবাহিতা, স্বামী-ঔষধের দোকান আছে। মোঃ আশরাফ আলী, সরকারি আযিযুল হক কলেজ বগুড়া, তৃতীয় বর্ষ-সমাজবিজ্ঞান বিভাগ। নামুযা ফাযিল মাদরাসা হতে ফাযিল (বি.এ) এ গ্রেড বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। মোসা: জয়নব, মোস্তফা আলিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, ফাজিল প্রথম বর্ষ।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"মাগো মনে ইচ্ছে জাগে মালেক হওয়ার মাগো মনে ইচ্ছে জাগে শহীদ হওয়ার। মা আমায় দিও না বাধা যেতে; শহীদের দলে, ওমা শহীদের দলে।" (আবু রুহানী মণ্ডল, স্বাক্ষর করা ২০০৪ সালের তার ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে)
১. শহীদের পরিচিতি
প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জেলা বগুড়ার শহরতলির এরুলিয়া মণ্ডলপাড়ায় এক দরিদ্র পরিবারে ২০ ডিসেম্বর, ১৯৯১ সালে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ মো: আবু রুহানী। সে ছিল পিতা-মাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ। ২ ভাই ৩ বোনের সংসারে দরিদ্র পিতা-মাতা অনেক কষ্টে সন্তানদের পড়ালেখা করার ব্যবস্থা করেছিলেন। বড় ছেলে মো: রফিকুল ইসলাম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ এ মেসেঞ্জার কাম গার্ড হিসেবে কর্মরত আছেন। বড় দুই বোনের বিয়ে দেয়া হয়েছে। অভাবের সংসারে আবু রুহানী পড়ালেখার পাশাপাশি ক্ষেতে-খামারে কৃষিকাজে বাবাকে সহযোগিতা করে পরিবারের খরচ জোগান দিতেন। শহীদ মো: আবু রুহানী শাহাদাতের সময় সরকারি আযিযুল হক কলেজ বগুড়ায়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি এ গ্রেড নিয়ে শিকারপুর ডিইউ, আলিম মাদ্রাসা, বগুড়া সদর, থেকে দাখিল এবং আলিম পাস করেন। নামুযা ফাযিল মাদরাসা হতে ফাযিল (এ-) গ্রেডে উত্তীর্ণ হন। শাহাদাতের ১২ দিন পর তার এই ফলাফল বের হয়। স্বপ্নযোগে শহীদ রুহানী প্রিন্সিপালকে বলেছেন স্যার, আমিতো ভাল আছি এবং পাস করেছি আমার কাগজপত্রগুলি দিয়ে দেবেন। তার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এক অব্যক্ত অস্থিরতায় আছেন কিভাবে তার কাছে কাগজ পৌঁছাবেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর আহবানে সাড়া দিলেন
৩১ জানুয়ারি ২০১৩। ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে এবং অবৈধ ট্রাইব্যুনাল বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকে সারা দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ছিল। সারা দেশের মতো বগুড়াতেও হরতালের সমর্থনে মিছিল হয়। এ মিছিলে প্রায় সাত হাজার লোক উপস্থিত হয়। মিছিল শেষে আবু রুহানী সঙ্গীদেরসহ নিজ ছাত্রাবাসে ফিরছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হরতাল চলাকালে ৩১ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া বারোটার দিকে শহরের ফুলবাড়িতে সরকারি মজিবুর রহমান মহিলা কলেজের সামনে বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আলরাজী জুয়েলের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একদল অস্ত্রধারী ক্যাডার অর্ধ শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এসময় ছাত্রলীগ ক্যাডারদের ছুরিকাঘাতে শিবিরের ৪ নেতা-কর্মী আহত হয়।
আহতরা হলো সাব্বির প্রামাণিক (২২), আদনান রফিক (২২), শাহীন মিয়া (৩০) ও আবু রুহানী (২৩)। আহতদের শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর আবু রুহানী মারা যায়। নিহত রুহানী সরকারি আযিযুল হক কলেজ শাখা (পুরাতন ভবন) শিবিরের সভাপতি। সে বগুড়া শহরতলির এরুলিয়া মন্ডলপাড়ার আবু বকর ছিদ্দিকের ছেলে এবং সরকারি আযিযুল হক কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র। জাময়াত-শিবির তথা ইসলামপন্থীদের মোকাবেলায় ঘোরতর সরকার সমর্থক দৈনিক প্রথম আলো পর্যন্ত ছাত্রলীগের বর্বরতার বিষয়ে ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ "বগুড়ায় ১৫ মিনিটে দুজন নিহত:" শিরোনামে রিপোর্ট করে; "প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বগুড়া শহরের ফুলবাড়ি মহিলা কলেজের সামনে ছাত্রলীগের সঙ্গে শিবিরের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। শিবিরের নেতা আবু রুহানীকে ছাত্রলীগের কর্মীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন। তাঁকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। ওই সংঘর্ষে আহত হন শিবিরের আরও তিন কর্মী। রুহানী বগুড়া সদরের এরুলিয়া মণ্ডলপাড়া গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে ও সরকারি আজিজুল হক কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।
পুলিশ জানায়, ওই ঘটনার ১৫ মিনিট পর বেলা পৌনে একটার দিকে শহরের সাবগ্রামে দ্বিতীয় বাইপাসে ছাত্রলীগের সঙ্গে শিবিরের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। তখন ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় ব্যবসায়ী মিজানুরকে কুপিয়ে জখম করা হয়। তাঁকে জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা
মৃত ঘোষণা করেন।"
আবু রুহানীর ঘটনায় সবিস্তারে যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়; হায়েনার দল চাপাতি ও রামদা দিয়ে তাকে নির্মমভাবে কোপাতে থাকে। গোটা শরীর রক্তে ভিজে যায়। ঘটনাস্থলে তার দেহটি যখন পড়ে কাতরাতে থাকে তখন স্থানীয় জনসাধারণ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে মানুষরূপী ছাত্রলীগের হায়েনাগুলি বাধা দেয় এবং অনেকক্ষণ পর্যন্ত আটকে রাখে। পরে অনেক কৌশলে একটি ভ্যানে করে ইসলামী হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা তাকে দ্রুত শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যালে ভর্তি করার জন্য বলেন। সেখানে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে জানা যায় তার শরীরে ১৬টির মত ধারালো অস্ত্রের আঘাত দেখা যায়। কোপগুলি এতটাই গভীর ছিল যে, যে কেউ দেখলেই শিউরে উঠবে; প্রত্যক্ষদর্শী সাধারণ মানুষ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি।
শহীদ আবু রুহানীর জানাযার নামায প্রথমে অনুষ্ঠিত হয় বগুড়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে। দ্বিতীয় জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয় এরুলিয়া হাইস্কুল মাঠে। এ জানাযার নামাজে ইমামতি করেন শহীদের গর্বিত পিতা মো: আবু বকর। প্রায় ৩০ হাজার লোক জানাযার নামাজে অংশগ্রহণ করেন। বয়স্ক লোকেরা বলেন যে, তাদের ৮০-৯০ বছর বয়সে এতবড় জানাজার নামাজ আর দেখেননি। জানাজা শেষে বাসার কাছেই স্থানীয় গোরস্থানে তাকে কবর দেওয়া হয়।
কিছু স্মৃতি অনেক ব্যথা
শহীদ মো: আবু রুহানীর বাড়িতে তার থাকার রুমে সাজানো ছিল অনেক সুন্দর সুন্দর দেয়ালিকা। তার নিজের হাতে লেখা একটি দেয়ালিকায় লেখা ছিল যেমন “ঈমান বৃদ্ধি করার কিছু উপায়", "দুর্বল ঈমানের কিছু লক্ষণ" এ সকল হেডলাইনের নিচে অনেক সুন্দর সুন্দর পয়েন্ট লেখা।
আরেকটি দেয়ালিকায় ছিল "হাশরের ময়দানে যে সাত শ্রেণীর মানুষকে আল্লাহ তায়ালা তার আরশের নিচে ছায়া দেবেন" সে সংক্রান্ত হাদিস। শহীদের গর্বিত পিতা: ৫৩ বছর বয়েসী শহীদ মো: আবু রুহানীর গর্বিত পিতা মো: আবু বকর বলেন,
রুহানী নামটিই ছিল আনকমন নাম। সবাই ওর জন্য কাঁদে। মক্তব চালিয়ে মাসে মাত্র ২০০০ টাকা পাওয়া পিতা তবু ভেঙে যাননি। বলেন, 'আল্লাহর মেহেরবানিতে সে একজন আনুগত্যশীল সংগঠক ছিল এবং একজন ভালো কৃষকও ছিল। অনেক সময় কৃষিকাজ করে গোসল করেনি এমনকি খাওয়া-দাওয়া করেনি কিন্তু সংগঠনের ডাক পড়েছে, তখন বাইসাইকেল নিয়ে চলে গেছে। আমার দ্বারা সে কখনও বাধাগ্রস্ত হয়নি। নিয়মিত মসজিদের মুসল্লি পিতা স্মরণ করেন আগের দিন যোহর নামাজ একত্রে বাপ-বেটা পড়েছেন, যে মসজিদে রুহানী নিয়মিত এতেকাফ করতো।
ঘটনার পরপরই বড় জামাই ফোন করে বাবাকে খবর দেয় রুহানী আহত, ওকে রক্ত দেওয়া লাগবে। পিতা খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়েই চলে যান। বগুড়া মেডিক্যালে ২.৩০ দিকে পৌঁছলে দেখেন রুহানী জরুরি বিভাগে আছে। একজন পুলিশ বলে ১/১.৩০ ঘণ্টা আগে সে মারা গেছে। এমন বেদনাবিধুর পরিবেশেও পিতা তার কলিজার টুকরা সন্তানের লাশ দাফনের সুযোগ পাননি। যেন নিহত আবু রুহানীই তার হত্যার প্রধান আসামি: তাই তাকে গ্রেফতার করেছে, দায়িত্বশীল প্রশাসন। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা লাশের পাশে পিতা ও স্বজনদের অপেক্ষা, এটি কতটা কষ্টের একমাত্র ভুক্তভোগীই জানেন। পরদিন জুমার আগে সন্তানের লাশ পেলেন। রুহানীর পিতা জামায়াত কর্মী আবুবকর বলেন," আমার নিয়তই ছিল আল্লাহ চাইলে সে শহীদ হবে।" আমার ছেলের ভেতরও ইচ্ছা ছিল সে একজন শহীদ হবে। সে সব সময় শহীদি গান গাইতো এবং তার কম্পিউটার শহীদি গানে ভরা ছিল। তার মনের মধ্যে সব সময় শহীদ হওয়ার ব্যাকুলতা থাকতো এবং আমিও দোয়া করতাম আল্লাহ যাতে আমাকে শহীদের পিতা হিসেবে কবুল করেন। আল্লাহ তাদের সে দোয়া কবুল করেছেন।
শহীদের মা: শহীদের গর্বিত মা আজকে শুধুই কেঁদে কেঁদে তার স্মৃতির সাগর হাতরে বেড়ান। দুঃখিনী মা কষ্টের স্মৃতি স্মরণ করেন শাহাদাতের একদিন আগে ৩০ জানুয়ারি, ছেলেটি বাসায় এসেছিল। মা-বোনের সাথে পাল্লা দিয়ে পিঠে ভাজে এর মাঝে বারবার তার মোবাইলে কল আসে আর সে দৌড় মারে। মা-বোনকে পিঠে খাওয়ায়, যেটি সে সব সময় করতো।
রুহানী মায়ের কাছে বলেছিল ৩১ জানুয়ারি আমি মেস পাল্টাবো। পরদিন বাড়ি এসে নতুন কাপড় নিয়ে যাবে, বড় দুলাভাইয়ের তৈরি খাট নিয়ে যাবে। চির ওয়াদা পালনকারী আবু রুহানী মায়ের সাথে তার কথাটি ঠিক ঠিক রেখেছে। হ্যাঁ, ১ ফেব্রুয়ারি সে ঠিকই বাসায় এসেছে কিন্তু নিষ্প্রাণ দেহে। নতুন কাপড় সে পরেছে সেটি কাফনের কাপড়। নতুন খাটেও সে উঠেছে যে খাটের গন্তব্য কবরস্থান। সে ঠিকই মেস পাল্টালো, চলে গেল আল্লাহর শাশ্বত মেসে।
শহীদের চাচাঃ শহীদের চাচা মোফাজ্জল হোসেন মন্ডল বলেছেন, রুহানী খুবই ভালো ছেলে ছিল। সকলের সাথে সুন্দর ব্যবহার করতো এমনকি প্রতি রমজান মাসে ই'তেকাফ করতো।
ভাই-বোনদের কথা: নিজের একমাত্র ছোট ভাইয়ের ব্যাপারে বলতে গিয়ে বড় ভাই একদিকে সীমাহীন কষ্ট, অপরদিকে স্মৃতির সাগরে হাজারো ঢেউয়ের তোড়ে যেন হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তবু বললেন, রুহানী ছিল খুবই সাদাসিধে মানুষ। নরম স্বভাবের। ও অনেক কষ্টে মানুষ হয়েছে। আমার পুরনো শার্ট, প্যান্ট, কোটই ছিল তার জৌলুস। তিনি ওর পুরনো ডায়েরি ঘেঁটে পান ২০০৪/০৫ সালের দিকে লেখা শহীদ রুহানীর কিছু ছন্দময় অভিব্যক্তি। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা,
"আমিও শহীদ হবো কবুল করো খোদা,
কবুল কর ওগো রহমান।
রক্ত রাঙা এ কঠিন পথে,
সামনে এগিয়ে আমি যাব। তোমার দ্বীনের পথে, জীবন বিলিয়ে আমি দেব।
(আবু রুহানী মন্ডল, ২০০৪) আরেক পাতায় লিখেন;
"মাগো মনে ইচ্ছে জাগে মালেক হওয়ার মাগো মনে ইচ্ছে জাগে শহীদ হওয়ার।
মা আমায় দিও না বাধা যেতে। শহীদের দলে, ওমা শহীদের দলে।"
১৬ লাইন এই কবিতাটি স্মরণ করিয়ে দেয় ৪৪ বছর আগে লেখা এই বগুড়ারই কৃর্তী শহীদ আব্দুল মালেকের মায়ের কাছে লেখা চিঠির কথা। স্থানীয় সমন্বয় শিল্পীগোষ্ঠী এটি নিয়েছে গান রচনার জন্য। আবু রুহানীর গান, গজলের খুব ঝোঁক ছিল। সে উচ্চারণ শিল্পীগোষ্ঠী নামে একটি গোষ্ঠী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। আজ সে নেই, শহীদের স্বজন এবং সুহৃদরা এটা করবে।
ব্যথাতুর বড় ভাই রফিককে স্বপ্নের ভেতর আবু রুহানী সান্ত্বনা দেন ভাই চিন্তা করবেন না ওদের একজন গ্রেফতার হবে। ২দিন পর ঠিকই একজন গ্রেফতার হয়।
ছোট বোন জয়নব স্বপ্ন দেখে, আবু রুহানী বলছে, "শহীদ হওয়া মাত্রই জান্নাতে চলে এসেছি। আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। মা-বাবা, ছোটদের দেখে রেখ।"
দ্বিতীয় বোন রোকেয়া স্বপ্ন দেখে আবু রুহানী তার বাড়িতে গেলে ফল খেতে দিয়েছেন। আবু রুহানী বলে, 'এগুলি লাগবে না। আমি এর চেয়ে অনেক ভাল ভাল ফলমূল খাচ্ছি।'
৩. এলাকাবাসীর কান্না
এলাকার প্রতিটি লোক তার জন্য কান্নাকাটি করেছে আর আফসোস করে বলেছে, কী কারণে তাকে এমন পৈশাচিকভাবে ভাবে হত্যা করা হলো? এরুলিয়ার বড়-ছোট সবাই আবু রুহানীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো। তাকে ইউপি চেয়ারম্যান বানানোর পরিকল্পনা ছিল সবার। এলাকার ছাত্র দায়িত্বশীলদের রুহানী স্বপ্নে বলে: আমিতো নেই... তুমি পোস্টার লাগাও। এভাবে স্বপ্ন দেখিয়ে সে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে সবাইকে তাকিদ দিচ্ছে। বাতিল শক্তি শত ষড়যন্ত্র করে কোন বুলেট চাপাতি দিয়ে কিভাবে এ প্রেরণার বাতিঘরকে নিভিয়ে দেবে? তার জানাজায় অর্ধলক্ষাধিক ইসলাম দরদির উপস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয় বাতিল কিভাবে তার নির্বুদ্ধিতায় হেরে যায়।
৪. বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা
৫ শতকের ওপর একটি বসতবাড়ি। টিনশেড ৩টি রুম। নিজেদের সামান্য কৃষিজমি আছে। বড় ভাই ইসলামী ব্যাংকে ছোট একটি চাকুরী করেন তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: আবু রুহানী (০১৭)। পেশা: সরকারি আযিযুল হক কলেজ বগুড়ায়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ২০.১২.১৯৯১ সাল ২১ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ৩১ জানুয়ারি ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, দুপুর ২টা-৩টা, স্থান: শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়া। দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থানে।স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: এরুলিয়া (মন্ডলপাড়া)।
ডাকঘর: এরুলিয়া, বগুড়া সদর, বগুড়া।
পিতা: মো: আবু বকর, বয়স: ৫৩ বছর, মক্তব পড়ান।
মাতা: মোছা: রেহেনা বেগম, ৪৬ বছর, গৃহিণী।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: রফিকুল ইসলাম, মেসেঞ্জার কাম গার্ড, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, বগুড়া, বয়স ৩০ বছর। মোসা: ফাতেমা, বিবাহিতা, স্বামী-ফার্নিচার-এর ব্যবসা করেন। মোসাঃ রোকেয়া, বিবাহিতা, স্বামী-ঔষধের দোকান আছে। মোঃ আশরাফ আলী, সরকারি আযিযুল হক কলেজ বগুড়া, তৃতীয় বর্ষ-সমাজবিজ্ঞান বিভাগ। নামুযা ফাযিল মাদরাসা হতে ফাযিল (বি.এ) এ গ্রেড বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। মোসা: জয়নব, মোস্তফা আলিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, ফাজিল প্রথম বর্ষ।
১. শহীদের পরিচিতি
প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জেলা বগুড়ার শহরতলির এরুলিয়া মণ্ডলপাড়ায় এক দরিদ্র পরিবারে ২০ ডিসেম্বর, ১৯৯১ সালে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ মো: আবু রুহানী। সে ছিল পিতা-মাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ। ২ ভাই ৩ বোনের সংসারে দরিদ্র পিতা-মাতা অনেক কষ্টে সন্তানদের পড়ালেখা করার ব্যবস্থা করেছিলেন। বড় ছেলে মো: রফিকুল ইসলাম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ এ মেসেঞ্জার কাম গার্ড হিসেবে কর্মরত আছেন। বড় দুই বোনের বিয়ে দেয়া হয়েছে। অভাবের সংসারে আবু রুহানী পড়ালেখার পাশাপাশি ক্ষেতে-খামারে কৃষিকাজে বাবাকে সহযোগিতা করে পরিবারের খরচ জোগান দিতেন। শহীদ মো: আবু রুহানী শাহাদাতের সময় সরকারি আযিযুল হক কলেজ বগুড়ায়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি এ গ্রেড নিয়ে শিকারপুর ডিইউ, আলিম মাদ্রাসা, বগুড়া সদর, থেকে দাখিল এবং আলিম পাস করেন। নামুযা ফাযিল মাদরাসা হতে ফাযিল (এ-) গ্রেডে উত্তীর্ণ হন। শাহাদাতের ১২ দিন পর তার এই ফলাফল বের হয়। স্বপ্নযোগে শহীদ রুহানী প্রিন্সিপালকে বলেছেন স্যার, আমিতো ভাল আছি এবং পাস করেছি আমার কাগজপত্রগুলি দিয়ে দেবেন। তার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এক অব্যক্ত অস্থিরতায় আছেন কিভাবে তার কাছে কাগজ পৌঁছাবেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর আহবানে সাড়া দিলেন
৩১ জানুয়ারি ২০১৩। ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে এবং অবৈধ ট্রাইব্যুনাল বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকে সারা দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ছিল। সারা দেশের মতো বগুড়াতেও হরতালের সমর্থনে মিছিল হয়। এ মিছিলে প্রায় সাত হাজার লোক উপস্থিত হয়। মিছিল শেষে আবু রুহানী সঙ্গীদেরসহ নিজ ছাত্রাবাসে ফিরছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হরতাল চলাকালে ৩১ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া বারোটার দিকে শহরের ফুলবাড়িতে সরকারি মজিবুর রহমান মহিলা কলেজের সামনে বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আলরাজী জুয়েলের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একদল অস্ত্রধারী ক্যাডার অর্ধ শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এসময় ছাত্রলীগ ক্যাডারদের ছুরিকাঘাতে শিবিরের ৪ নেতা-কর্মী আহত হয়।
আহতরা হলো সাব্বির প্রামাণিক (২২), আদনান রফিক (২২), শাহীন মিয়া (৩০) ও আবু রুহানী (২৩)। আহতদের শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর আবু রুহানী মারা যায়। নিহত রুহানী সরকারি আযিযুল হক কলেজ শাখা (পুরাতন ভবন) শিবিরের সভাপতি। সে বগুড়া শহরতলির এরুলিয়া মন্ডলপাড়ার আবু বকর ছিদ্দিকের ছেলে এবং সরকারি আযিযুল হক কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র। জাময়াত-শিবির তথা ইসলামপন্থীদের মোকাবেলায় ঘোরতর সরকার সমর্থক দৈনিক প্রথম আলো পর্যন্ত ছাত্রলীগের বর্বরতার বিষয়ে ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ "বগুড়ায় ১৫ মিনিটে দুজন নিহত:" শিরোনামে রিপোর্ট করে; "প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বগুড়া শহরের ফুলবাড়ি মহিলা কলেজের সামনে ছাত্রলীগের সঙ্গে শিবিরের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। শিবিরের নেতা আবু রুহানীকে ছাত্রলীগের কর্মীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন। তাঁকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। ওই সংঘর্ষে আহত হন শিবিরের আরও তিন কর্মী। রুহানী বগুড়া সদরের এরুলিয়া মণ্ডলপাড়া গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে ও সরকারি আজিজুল হক কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।
পুলিশ জানায়, ওই ঘটনার ১৫ মিনিট পর বেলা পৌনে একটার দিকে শহরের সাবগ্রামে দ্বিতীয় বাইপাসে ছাত্রলীগের সঙ্গে শিবিরের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। তখন ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় ব্যবসায়ী মিজানুরকে কুপিয়ে জখম করা হয়। তাঁকে জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা
মৃত ঘোষণা করেন।"
আবু রুহানীর ঘটনায় সবিস্তারে যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়; হায়েনার দল চাপাতি ও রামদা দিয়ে তাকে নির্মমভাবে কোপাতে থাকে। গোটা শরীর রক্তে ভিজে যায়। ঘটনাস্থলে তার দেহটি যখন পড়ে কাতরাতে থাকে তখন স্থানীয় জনসাধারণ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে মানুষরূপী ছাত্রলীগের হায়েনাগুলি বাধা দেয় এবং অনেকক্ষণ পর্যন্ত আটকে রাখে। পরে অনেক কৌশলে একটি ভ্যানে করে ইসলামী হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা তাকে দ্রুত শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যালে ভর্তি করার জন্য বলেন। সেখানে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে জানা যায় তার শরীরে ১৬টির মত ধারালো অস্ত্রের আঘাত দেখা যায়। কোপগুলি এতটাই গভীর ছিল যে, যে কেউ দেখলেই শিউরে উঠবে; প্রত্যক্ষদর্শী সাধারণ মানুষ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি।
শহীদ আবু রুহানীর জানাযার নামায প্রথমে অনুষ্ঠিত হয় বগুড়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে। দ্বিতীয় জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয় এরুলিয়া হাইস্কুল মাঠে। এ জানাযার নামাজে ইমামতি করেন শহীদের গর্বিত পিতা মো: আবু বকর। প্রায় ৩০ হাজার লোক জানাযার নামাজে অংশগ্রহণ করেন। বয়স্ক লোকেরা বলেন যে, তাদের ৮০-৯০ বছর বয়সে এতবড় জানাজার নামাজ আর দেখেননি। জানাজা শেষে বাসার কাছেই স্থানীয় গোরস্থানে তাকে কবর দেওয়া হয়।
কিছু স্মৃতি অনেক ব্যথা
শহীদ মো: আবু রুহানীর বাড়িতে তার থাকার রুমে সাজানো ছিল অনেক সুন্দর সুন্দর দেয়ালিকা। তার নিজের হাতে লেখা একটি দেয়ালিকায় লেখা ছিল যেমন “ঈমান বৃদ্ধি করার কিছু উপায়", "দুর্বল ঈমানের কিছু লক্ষণ" এ সকল হেডলাইনের নিচে অনেক সুন্দর সুন্দর পয়েন্ট লেখা।
আরেকটি দেয়ালিকায় ছিল "হাশরের ময়দানে যে সাত শ্রেণীর মানুষকে আল্লাহ তায়ালা তার আরশের নিচে ছায়া দেবেন" সে সংক্রান্ত হাদিস। শহীদের গর্বিত পিতা: ৫৩ বছর বয়েসী শহীদ মো: আবু রুহানীর গর্বিত পিতা মো: আবু বকর বলেন,
রুহানী নামটিই ছিল আনকমন নাম। সবাই ওর জন্য কাঁদে। মক্তব চালিয়ে মাসে মাত্র ২০০০ টাকা পাওয়া পিতা তবু ভেঙে যাননি। বলেন, 'আল্লাহর মেহেরবানিতে সে একজন আনুগত্যশীল সংগঠক ছিল এবং একজন ভালো কৃষকও ছিল। অনেক সময় কৃষিকাজ করে গোসল করেনি এমনকি খাওয়া-দাওয়া করেনি কিন্তু সংগঠনের ডাক পড়েছে, তখন বাইসাইকেল নিয়ে চলে গেছে। আমার দ্বারা সে কখনও বাধাগ্রস্ত হয়নি। নিয়মিত মসজিদের মুসল্লি পিতা স্মরণ করেন আগের দিন যোহর নামাজ একত্রে বাপ-বেটা পড়েছেন, যে মসজিদে রুহানী নিয়মিত এতেকাফ করতো।
ঘটনার পরপরই বড় জামাই ফোন করে বাবাকে খবর দেয় রুহানী আহত, ওকে রক্ত দেওয়া লাগবে। পিতা খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়েই চলে যান। বগুড়া মেডিক্যালে ২.৩০ দিকে পৌঁছলে দেখেন রুহানী জরুরি বিভাগে আছে। একজন পুলিশ বলে ১/১.৩০ ঘণ্টা আগে সে মারা গেছে। এমন বেদনাবিধুর পরিবেশেও পিতা তার কলিজার টুকরা সন্তানের লাশ দাফনের সুযোগ পাননি। যেন নিহত আবু রুহানীই তার হত্যার প্রধান আসামি: তাই তাকে গ্রেফতার করেছে, দায়িত্বশীল প্রশাসন। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা লাশের পাশে পিতা ও স্বজনদের অপেক্ষা, এটি কতটা কষ্টের একমাত্র ভুক্তভোগীই জানেন। পরদিন জুমার আগে সন্তানের লাশ পেলেন। রুহানীর পিতা জামায়াত কর্মী আবুবকর বলেন," আমার নিয়তই ছিল আল্লাহ চাইলে সে শহীদ হবে।" আমার ছেলের ভেতরও ইচ্ছা ছিল সে একজন শহীদ হবে। সে সব সময় শহীদি গান গাইতো এবং তার কম্পিউটার শহীদি গানে ভরা ছিল। তার মনের মধ্যে সব সময় শহীদ হওয়ার ব্যাকুলতা থাকতো এবং আমিও দোয়া করতাম আল্লাহ যাতে আমাকে শহীদের পিতা হিসেবে কবুল করেন। আল্লাহ তাদের সে দোয়া কবুল করেছেন।
শহীদের মা: শহীদের গর্বিত মা আজকে শুধুই কেঁদে কেঁদে তার স্মৃতির সাগর হাতরে বেড়ান। দুঃখিনী মা কষ্টের স্মৃতি স্মরণ করেন শাহাদাতের একদিন আগে ৩০ জানুয়ারি, ছেলেটি বাসায় এসেছিল। মা-বোনের সাথে পাল্লা দিয়ে পিঠে ভাজে এর মাঝে বারবার তার মোবাইলে কল আসে আর সে দৌড় মারে। মা-বোনকে পিঠে খাওয়ায়, যেটি সে সব সময় করতো।
রুহানী মায়ের কাছে বলেছিল ৩১ জানুয়ারি আমি মেস পাল্টাবো। পরদিন বাড়ি এসে নতুন কাপড় নিয়ে যাবে, বড় দুলাভাইয়ের তৈরি খাট নিয়ে যাবে। চির ওয়াদা পালনকারী আবু রুহানী মায়ের সাথে তার কথাটি ঠিক ঠিক রেখেছে। হ্যাঁ, ১ ফেব্রুয়ারি সে ঠিকই বাসায় এসেছে কিন্তু নিষ্প্রাণ দেহে। নতুন কাপড় সে পরেছে সেটি কাফনের কাপড়। নতুন খাটেও সে উঠেছে যে খাটের গন্তব্য কবরস্থান। সে ঠিকই মেস পাল্টালো, চলে গেল আল্লাহর শাশ্বত মেসে।
শহীদের চাচাঃ শহীদের চাচা মোফাজ্জল হোসেন মন্ডল বলেছেন, রুহানী খুবই ভালো ছেলে ছিল। সকলের সাথে সুন্দর ব্যবহার করতো এমনকি প্রতি রমজান মাসে ই'তেকাফ করতো।
ভাই-বোনদের কথা: নিজের একমাত্র ছোট ভাইয়ের ব্যাপারে বলতে গিয়ে বড় ভাই একদিকে সীমাহীন কষ্ট, অপরদিকে স্মৃতির সাগরে হাজারো ঢেউয়ের তোড়ে যেন হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তবু বললেন, রুহানী ছিল খুবই সাদাসিধে মানুষ। নরম স্বভাবের। ও অনেক কষ্টে মানুষ হয়েছে। আমার পুরনো শার্ট, প্যান্ট, কোটই ছিল তার জৌলুস। তিনি ওর পুরনো ডায়েরি ঘেঁটে পান ২০০৪/০৫ সালের দিকে লেখা শহীদ রুহানীর কিছু ছন্দময় অভিব্যক্তি। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা,
"আমিও শহীদ হবো কবুল করো খোদা,
কবুল কর ওগো রহমান।
রক্ত রাঙা এ কঠিন পথে,
সামনে এগিয়ে আমি যাব। তোমার দ্বীনের পথে, জীবন বিলিয়ে আমি দেব।
(আবু রুহানী মন্ডল, ২০০৪) আরেক পাতায় লিখেন;
"মাগো মনে ইচ্ছে জাগে মালেক হওয়ার মাগো মনে ইচ্ছে জাগে শহীদ হওয়ার।
মা আমায় দিও না বাধা যেতে। শহীদের দলে, ওমা শহীদের দলে।"
১৬ লাইন এই কবিতাটি স্মরণ করিয়ে দেয় ৪৪ বছর আগে লেখা এই বগুড়ারই কৃর্তী শহীদ আব্দুল মালেকের মায়ের কাছে লেখা চিঠির কথা। স্থানীয় সমন্বয় শিল্পীগোষ্ঠী এটি নিয়েছে গান রচনার জন্য। আবু রুহানীর গান, গজলের খুব ঝোঁক ছিল। সে উচ্চারণ শিল্পীগোষ্ঠী নামে একটি গোষ্ঠী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। আজ সে নেই, শহীদের স্বজন এবং সুহৃদরা এটা করবে।
ব্যথাতুর বড় ভাই রফিককে স্বপ্নের ভেতর আবু রুহানী সান্ত্বনা দেন ভাই চিন্তা করবেন না ওদের একজন গ্রেফতার হবে। ২দিন পর ঠিকই একজন গ্রেফতার হয়।
ছোট বোন জয়নব স্বপ্ন দেখে, আবু রুহানী বলছে, "শহীদ হওয়া মাত্রই জান্নাতে চলে এসেছি। আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। মা-বাবা, ছোটদের দেখে রেখ।"
দ্বিতীয় বোন রোকেয়া স্বপ্ন দেখে আবু রুহানী তার বাড়িতে গেলে ফল খেতে দিয়েছেন। আবু রুহানী বলে, 'এগুলি লাগবে না। আমি এর চেয়ে অনেক ভাল ভাল ফলমূল খাচ্ছি।'
৩. এলাকাবাসীর কান্না
এলাকার প্রতিটি লোক তার জন্য কান্নাকাটি করেছে আর আফসোস করে বলেছে, কী কারণে তাকে এমন পৈশাচিকভাবে ভাবে হত্যা করা হলো? এরুলিয়ার বড়-ছোট সবাই আবু রুহানীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো। তাকে ইউপি চেয়ারম্যান বানানোর পরিকল্পনা ছিল সবার। এলাকার ছাত্র দায়িত্বশীলদের রুহানী স্বপ্নে বলে: আমিতো নেই... তুমি পোস্টার লাগাও। এভাবে স্বপ্ন দেখিয়ে সে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে সবাইকে তাকিদ দিচ্ছে। বাতিল শক্তি শত ষড়যন্ত্র করে কোন বুলেট চাপাতি দিয়ে কিভাবে এ প্রেরণার বাতিঘরকে নিভিয়ে দেবে? তার জানাজায় অর্ধলক্ষাধিক ইসলাম দরদির উপস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয় বাতিল কিভাবে তার নির্বুদ্ধিতায় হেরে যায়।
৪. বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা
৫ শতকের ওপর একটি বসতবাড়ি। টিনশেড ৩টি রুম। নিজেদের সামান্য কৃষিজমি আছে। বড় ভাই ইসলামী ব্যাংকে ছোট একটি চাকুরী করেন তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: আবু রুহানী (০১৭)। পেশা: সরকারি আযিযুল হক কলেজ বগুড়ায়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ২০.১২.১৯৯১ সাল ২১ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ৩১ জানুয়ারি ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, দুপুর ২টা-৩টা, স্থান: শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়া। দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থানে।স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: এরুলিয়া (মন্ডলপাড়া)।
ডাকঘর: এরুলিয়া, বগুড়া সদর, বগুড়া।
পিতা: মো: আবু বকর, বয়স: ৫৩ বছর, মক্তব পড়ান।
মাতা: মোছা: রেহেনা বেগম, ৪৬ বছর, গৃহিণী।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: রফিকুল ইসলাম, মেসেঞ্জার কাম গার্ড, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, বগুড়া, বয়স ৩০ বছর। মোসা: ফাতেমা, বিবাহিতা, স্বামী-ফার্নিচার-এর ব্যবসা করেন। মোসাঃ রোকেয়া, বিবাহিতা, স্বামী-ঔষধের দোকান আছে। মোঃ আশরাফ আলী, সরকারি আযিযুল হক কলেজ বগুড়া, তৃতীয় বর্ষ-সমাজবিজ্ঞান বিভাগ। নামুযা ফাযিল মাদরাসা হতে ফাযিল (বি.এ) এ গ্রেড বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। মোসা: জয়নব, মোস্তফা আলিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, ফাজিল প্রথম বর্ষ।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍