শহীদা মোছা: মুনজিলা বেগম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদা মোছা: মুনজিলা বেগম (০২৬)। পেশা: গৃহিণী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১২ আগস্ট ১৯৬৯ইং, ৪৩ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৬.৩০মি.।
শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৬.৩০মি. স্থান: বগুড়া শাহজাহানপুরের রাস্তায়। দাফন করা হয়। এলাকার বড় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: নতুন মন্ডল পাড়া, ডোমনপুকুর, ডাকঘর: মাঝিরা, থানা: শাহজাহানপুর, জেলা: বগুড়া।
স্বামী: মো: হযরত আলী তোতা, ৫০ বছর, কাঠমিস্ত্রি (এখন পঙ্গু) অসুস্থতার কারণে পা কেটে ফেলতে হয়েছে। পিতা: মৃত আহমদ আলী
মাতার নাম: মোছা: রহিমা বেগম, ৭০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: খাস জায়গার ওপর মাটির ঘরের ওপর টিনের চাল, যৌথ পরিবার। নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই। ছেলেদের সহযোগিতায় সংসার চলে।
স্বামী ও সন্তানদের বিবরণ: স্বামী: মো: হযরত আলী তোতা ১ম ছেলে: মো: ইউনুছ আলী (২৭), গাড়ির হেল্পারি করে, মেয়ে: মোছা: হাজেরা বেগম (২৪), বিবাহিতা-স্বামী কৃষক, ২য় ছেলে: মো: ইসমাইল (১৯), দিনমজুর।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১২ আগস্ট ১৯৬৯ইং, ৪৩ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৬.৩০মি.।
শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৬.৩০মি. স্থান: বগুড়া শাহজাহানপুরের রাস্তায়। দাফন করা হয়। এলাকার বড় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: নতুন মন্ডল পাড়া, ডোমনপুকুর, ডাকঘর: মাঝিরা, থানা: শাহজাহানপুর, জেলা: বগুড়া।
স্বামী: মো: হযরত আলী তোতা, ৫০ বছর, কাঠমিস্ত্রি (এখন পঙ্গু) অসুস্থতার কারণে পা কেটে ফেলতে হয়েছে। পিতা: মৃত আহমদ আলী
মাতার নাম: মোছা: রহিমা বেগম, ৭০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: খাস জায়গার ওপর মাটির ঘরের ওপর টিনের চাল, যৌথ পরিবার। নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই। ছেলেদের সহযোগিতায় সংসার চলে।
স্বামী ও সন্তানদের বিবরণ: স্বামী: মো: হযরত আলী তোতা ১ম ছেলে: মো: ইউনুছ আলী (২৭), গাড়ির হেল্পারি করে, মেয়ে: মোছা: হাজেরা বেগম (২৪), বিবাহিতা-স্বামী কৃষক, ২য় ছেলে: মো: ইসমাইল (১৯), দিনমজুর।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
" আমি স্ত্রী মুনজিলাকে বললাম, 'আজ এদের কোন লোক যদি মারা যায়, নিশ্চয়ই সে শহীদ হবে। এরপর আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কয়েক ঘণ্টা পরে ছেলে শাহজাহানপুর হতে ফোন করে বলে, বাবা, মা নেই।"
১. শহীদার পরিচিতি
শহীদা মোছা: মুনজিলা বেগম ১৯৬৯ সালে বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর থানার বনভিটি গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম আহমদ আলী ও মাতা মোছা: রহিমা বেগম (৭০)। তিনি ১৯৮২ সালে মো: হযরত আলী তোতার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের জননী। বড় ছেলে মো: ইউছুফ আলী (২৭) গাড়ির হেলপার, ২য় ছেলে মো: ইসমাইল (১৯) দিনমজুরের কাজ করেন। মেয়ে হাজেরা বেগম (২৪) বিবাহিতা। তার স্বামী হযরত আলী তোতা কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। রোগের কারণে ১৯৯৬ ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলায় বর্তমানে তিনি বেকার। ছেলেদের সামান্য আয়ের ওপর ভিত্তি করে চলে এই সংসার। শহীদা মুনজিলা বেগম এ সংসারের ঘানি টানতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাপড় বিক্রি করতেন। এরপরও তিনি ইসলামের সকল হুকুম আহকাম মেনে চলতেন। স্থানীয় মহিলাদের তালিমে নিয়মিত অংশ নিতেন। ইসলাম ও আলেমদের অনেক ভালবাসতেন। তাই আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা রায় দেয়ার পর আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। রাস্তায় এসে প্রতিবাদ জানান এবং পুলিশের গুলিতে শাহাদাৎ বরণ করেন। শাহদাতের সময় তিনি পঙ্গু স্বামী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে যান।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
বিশ্ববিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে মৃত্যুদন্ড দেয়ার পর তৌহিদি জনতা এই রায়কে প্রত্যাখ্যান করে ৩ ও ৪ মার্চ হরতাল ও প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। শহীদা মোছা: মুনজিলা বেগম ৩ মার্চ ফজরের নামাজের পূর্ব থেকে শাহজাহানপুরের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম দেখেন। অন্যায়ের প্রতিবাদে তৌহিদি জনতার এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেখে তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারলেন না, নেমে আসেন তৌহিদি জনতার কাতারে। আন্দোলনকারীরা শাহজাহানপুর থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে। কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারীরা বাসায় ফিরে যাচ্ছিল। এমন সময় পুলিশ-বিজিবি পেছন থেকে অতর্কিতভাবে গুলি বর্ষণ করতে থাকে। এতে শহীদা মোছা: মুনজিলা বেগমের মাথার পেছন দিয়ে গুলি ঢুকে সামনের ডান চোখের ওপর দিয়ে বের হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই শহাদাৎ বরণ করেন।ডোমন পুকুর আমিনিয়া কামিল মাদ্রাসা মাঠে শহীদার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন আমিনিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আনিসুর রহমান। জানাযায় ৪ হাজারের অধিক লোক উপস্থিত ছিলেন।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
বিশ্ববরেণ্য মুফাসসিরে কুরআন ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে বগুড়ার সর্বস্তরের জনতা। অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমে আসে লাখ লাখ মানুষ। ঘোরতর সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত স্থানীয় প্রভাবশালী দৈনিক সাতমাথা রিপোর্ট করে কিভাবে চাঁদে সাঈদী সাহেবকে দেখার বিষয়টি প্রচারিত হয় এবং এতে কোন সংগঠনের ইন্ধন ছিল না। এটি ছিল সাধারণ মানুষের ভালবাসা ও আবেগের অভিব্যক্তি। ৪ মার্চ ২০১৩, "বগুড়ায় গুলিতে নিহত ১২” শিরোনামে সাতমাথার রিপোর্ট; "গত শুক্রবার শেষ রাতে আকাশে চাঁদের গায়ে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি দেখা গেছে' এমন একটি গুজব রটে যায় শনিবার সকালে। বাতাসের বেগে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। শনিবার দিবাগত রাতে আবারও দৃশ্যটি দেখার আগ্রহ জাগে অনেকেরই। ফলে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন অসংখ্য মানুষ। অবশেষে রাত দুইটার দিকে অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়। চাঁদের গায়ে থাকা ছায়া দেখে সেটি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বলে অনেকে বিশ্বাস করতে থাকেন। ওই ছায়ার মানুষটিই আল্লামা সাঈদীর এই বিশ্বাস গেঁথে যায় অনেকের মনে। মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল ফোন, ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পাড়া মহল্লায় শুরু হয় মিছিল। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে ফজরের নামাজের পূর্বেই হাজার হাজার মানুষ মহাসড়কের ওপর অবস্থান নেয়। তারা গাছের গুঁড়ি এবং বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে বগুড়া-ঢাকা, বগুড়া-নাটোর, বগুড়া-জয়পুরহাট, বগুড়া-রংপুর এবং বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়ক অবরোধ করে। ফজরের নামাজ শেষে লোকজন স্রোতের মত রাজপথে নামতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে জেলার প্রতিটি সড়ক, মহাসড়ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। জামায়াত-শিবির নেতা কর্মীরা আসা জনতা হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে।"
শুধু শাহজাহানপুর থানার ঘটনাস্থলেই মহিলাসহ ৩ জন এবং বগুড়া সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো এক মহিলাসহ ২ জন নিহত হন। আহত হয় ৩ পুলিশসহ প্রায় ২০ জন। আহতদের মধ্যে অনেকে বগুড়া সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। নিহতরা হলেন উপজেলার সাজাপুর পশ্চিমপাড়ার মেহরাজের স্ত্রী আরজিনা বেগম (৪৫), ডোমনপুকুর গ্রামের তোতা মিয়ার স্ত্রী মুনজিলা বেগম (৩৮), ডোমনপুকুর নতুনপাড়ার মৃত মনছের আলীর স্ত্রী আকলিমা বেগম (৫০), আমরচল গ্রামের জাফর আলীর ছেলে আব্দুল কাছির (৪০) এবং ডোমনপুকুর নয়াপাড়ার রকিবের ছেলে আব্দুর রহমান (৬০)। এ ঘটনার পর সকাল সোয়া ৮টার দিকে দুই প্লাটুন সেনা সদস্য ঘটনাস্থলে এসে পুলিশকে রক্ষা ও পরিবেশ শান্ত রাখতে থানার দু'পাশে মহাসড়কে অবস্থান নেয়। এদিকে, দুপুর দেড়টা থেকে উপজেলা সদর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এই আদেশ পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এইচ এম নুরুল ইসলাম জানান, সেনা মোতায়েন নয়, থানা পুলিশকে রক্ষা করতেই সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন।
মহিলাদের যাওয়াটা কারো ধারণার মধ্যে ছিল না। এমনকি মহিলাদের কোলে তাদের অবুঝ শিশুরাও ছিল। যাদের পায়ে একটি ছোট্ট কাঁটা ফুটুক এটা বাবা-মা কখনও চান না। তাদেরও কেন নিয়ে গেল? রাজধানীর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে অলস সময়ে বসে এর অনেক সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করা যাবে। যুক্তির বন্যা বহিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু সেই সব হতদরিদ্র-নিঃস্ব মানুষদের অবেগকে বিশ্লেষণ করা যাবে না। আর তাদের ওপর হামলার বিষয়টি কারো কল্পনার মধ্যেও ছিল না। স্থানীয় একটি পত্রিকা ৩ জন মহিলার জানাজার ছবিসহ নিউজ করে "দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন একজন মা; আর একজন মা হয়ে তিনি কিভাবে পারলেন শত শত মা কে গুলির নির্দেশ দিয়ে তাদের সন্তানদের মা হারা করতে।"
৪. স্বামীর অভিব্যক্তি
পঞ্চাশোর্ধ্ব স্বামী হযরত আলী তোতা ত্রিশ বছর আগে নিজ বাড়ি থেকে ৫ কিঃ দূরে বনভিটি গ্রামে বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রী, সন্তানাদি নিয়ে তার সুখেই কাটছিল। একসময় কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। কুনি রোগের কারণে প্রথমে পরপর দুটি আঙুল অতঃপর ১৯৯৬ ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়। একসময় একই রোগে ডান হাতের মধ্যমা আঙুলটিও কাটতে হয়। বর্তমানে তিনি বেকার। স্ত্রী মুনজিলা ছিলেন এই দরিদ্র ও পঙ্গু পরিবারের একমাত্র সহায় আলোকবর্তিকা।
কয়েকদিন যাবৎই স্বামী-স্ত্রী দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতেন। ঘটনার দিন ভোর হতেই হাজার হাজার মানুষ মিছিলে যাচ্ছে। 'আমি স্ত্রী মুনজিলাকে বললাম, 'আজ এদের কোন লোক যদি মারা যায়, নিশ্চয়ই সে শহীদ হবে। এরপর আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কয়েক ঘণ্টা পরে ছেলে শাহজাহানপুর হতে ফোন করে বলে, 'বাবা, মা নেই।'
মনে হয় আমি ঘুমিয়ে পড়ার পর সে যথারীতি ফজর নামাজ পড়ে, আমার সেই কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হাজারো মানুষ, নারী, শিশুর সাথে চলে যায় বিক্ষোভে অংশ নিতে।
পঙ্গু, বয়স্ক স্বামী হযরত আলী শিশুর মতো কেঁদে ওঠেন, বলেন তার দেখা স্বপ্নের কথা। আমি দেখলাম, মুনজিলা বাসায় এসেছে বেশ হাসি খুশি আমি বললাম, তুমি না মারা গেছ? তোমার না গুলি লেগেছে, উত্তরে হেসে মুনজিলা বলছে, কই আমি তো বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমার কাপড় কই? ভাবলাম ওর বিক্রির কাপড়ের কথা বলছে-বললাম, সেটি আছে। এরপর ঘুম ভেঙে যায়।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদা মোছা: মুনজিলা বেগম (০২৬)। পেশা: গৃহিণী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১২ আগস্ট ১৯৬৯ইং, ৪৩ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৬.৩০মি.।
শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৬.৩০মি. স্থান: বগুড়া শাহজাহানপুরের রাস্তায়। দাফন করা হয়। এলাকার বড় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: নতুন মন্ডল পাড়া, ডোমনপুকুর, ডাকঘর: মাঝিরা, থানা: শাহজাহানপুর, জেলা: বগুড়া।
স্বামী: মো: হযরত আলী তোতা, ৫০ বছর, কাঠমিস্ত্রি (এখন পঙ্গু) অসুস্থতার কারণে পা কেটে ফেলতে হয়েছে। পিতা: মৃত আহমদ আলী
মাতার নাম: মোছা: রহিমা বেগম, ৭০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: খাস জায়গার ওপর মাটির ঘরের ওপর টিনের চাল, যৌথ পরিবার। নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই। ছেলেদের সহযোগিতায় সংসার চলে।
স্বামী ও সন্তানদের বিবরণ: স্বামী: মো: হযরত আলী তোতা ১ম ছেলে: মো: ইউনুছ আলী (২৭), গাড়ির হেল্পারি করে, মেয়ে: মোছা: হাজেরা বেগম (২৪), বিবাহিতা-স্বামী কৃষক, ২য় ছেলে: মো: ইসমাইল (১৯), দিনমজুর।
১. শহীদার পরিচিতি
শহীদা মোছা: মুনজিলা বেগম ১৯৬৯ সালে বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর থানার বনভিটি গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম আহমদ আলী ও মাতা মোছা: রহিমা বেগম (৭০)। তিনি ১৯৮২ সালে মো: হযরত আলী তোতার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের জননী। বড় ছেলে মো: ইউছুফ আলী (২৭) গাড়ির হেলপার, ২য় ছেলে মো: ইসমাইল (১৯) দিনমজুরের কাজ করেন। মেয়ে হাজেরা বেগম (২৪) বিবাহিতা। তার স্বামী হযরত আলী তোতা কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। রোগের কারণে ১৯৯৬ ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলায় বর্তমানে তিনি বেকার। ছেলেদের সামান্য আয়ের ওপর ভিত্তি করে চলে এই সংসার। শহীদা মুনজিলা বেগম এ সংসারের ঘানি টানতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাপড় বিক্রি করতেন। এরপরও তিনি ইসলামের সকল হুকুম আহকাম মেনে চলতেন। স্থানীয় মহিলাদের তালিমে নিয়মিত অংশ নিতেন। ইসলাম ও আলেমদের অনেক ভালবাসতেন। তাই আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা রায় দেয়ার পর আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। রাস্তায় এসে প্রতিবাদ জানান এবং পুলিশের গুলিতে শাহাদাৎ বরণ করেন। শাহদাতের সময় তিনি পঙ্গু স্বামী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে যান।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
বিশ্ববিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে মৃত্যুদন্ড দেয়ার পর তৌহিদি জনতা এই রায়কে প্রত্যাখ্যান করে ৩ ও ৪ মার্চ হরতাল ও প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। শহীদা মোছা: মুনজিলা বেগম ৩ মার্চ ফজরের নামাজের পূর্ব থেকে শাহজাহানপুরের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম দেখেন। অন্যায়ের প্রতিবাদে তৌহিদি জনতার এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেখে তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারলেন না, নেমে আসেন তৌহিদি জনতার কাতারে। আন্দোলনকারীরা শাহজাহানপুর থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে। কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারীরা বাসায় ফিরে যাচ্ছিল। এমন সময় পুলিশ-বিজিবি পেছন থেকে অতর্কিতভাবে গুলি বর্ষণ করতে থাকে। এতে শহীদা মোছা: মুনজিলা বেগমের মাথার পেছন দিয়ে গুলি ঢুকে সামনের ডান চোখের ওপর দিয়ে বের হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই শহাদাৎ বরণ করেন।ডোমন পুকুর আমিনিয়া কামিল মাদ্রাসা মাঠে শহীদার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন আমিনিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আনিসুর রহমান। জানাযায় ৪ হাজারের অধিক লোক উপস্থিত ছিলেন।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
বিশ্ববরেণ্য মুফাসসিরে কুরআন ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে বগুড়ার সর্বস্তরের জনতা। অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমে আসে লাখ লাখ মানুষ। ঘোরতর সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত স্থানীয় প্রভাবশালী দৈনিক সাতমাথা রিপোর্ট করে কিভাবে চাঁদে সাঈদী সাহেবকে দেখার বিষয়টি প্রচারিত হয় এবং এতে কোন সংগঠনের ইন্ধন ছিল না। এটি ছিল সাধারণ মানুষের ভালবাসা ও আবেগের অভিব্যক্তি। ৪ মার্চ ২০১৩, "বগুড়ায় গুলিতে নিহত ১২” শিরোনামে সাতমাথার রিপোর্ট; "গত শুক্রবার শেষ রাতে আকাশে চাঁদের গায়ে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি দেখা গেছে' এমন একটি গুজব রটে যায় শনিবার সকালে। বাতাসের বেগে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। শনিবার দিবাগত রাতে আবারও দৃশ্যটি দেখার আগ্রহ জাগে অনেকেরই। ফলে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন অসংখ্য মানুষ। অবশেষে রাত দুইটার দিকে অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়। চাঁদের গায়ে থাকা ছায়া দেখে সেটি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বলে অনেকে বিশ্বাস করতে থাকেন। ওই ছায়ার মানুষটিই আল্লামা সাঈদীর এই বিশ্বাস গেঁথে যায় অনেকের মনে। মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল ফোন, ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পাড়া মহল্লায় শুরু হয় মিছিল। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে ফজরের নামাজের পূর্বেই হাজার হাজার মানুষ মহাসড়কের ওপর অবস্থান নেয়। তারা গাছের গুঁড়ি এবং বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে বগুড়া-ঢাকা, বগুড়া-নাটোর, বগুড়া-জয়পুরহাট, বগুড়া-রংপুর এবং বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়ক অবরোধ করে। ফজরের নামাজ শেষে লোকজন স্রোতের মত রাজপথে নামতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে জেলার প্রতিটি সড়ক, মহাসড়ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। জামায়াত-শিবির নেতা কর্মীরা আসা জনতা হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে।"
শুধু শাহজাহানপুর থানার ঘটনাস্থলেই মহিলাসহ ৩ জন এবং বগুড়া সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো এক মহিলাসহ ২ জন নিহত হন। আহত হয় ৩ পুলিশসহ প্রায় ২০ জন। আহতদের মধ্যে অনেকে বগুড়া সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। নিহতরা হলেন উপজেলার সাজাপুর পশ্চিমপাড়ার মেহরাজের স্ত্রী আরজিনা বেগম (৪৫), ডোমনপুকুর গ্রামের তোতা মিয়ার স্ত্রী মুনজিলা বেগম (৩৮), ডোমনপুকুর নতুনপাড়ার মৃত মনছের আলীর স্ত্রী আকলিমা বেগম (৫০), আমরচল গ্রামের জাফর আলীর ছেলে আব্দুল কাছির (৪০) এবং ডোমনপুকুর নয়াপাড়ার রকিবের ছেলে আব্দুর রহমান (৬০)। এ ঘটনার পর সকাল সোয়া ৮টার দিকে দুই প্লাটুন সেনা সদস্য ঘটনাস্থলে এসে পুলিশকে রক্ষা ও পরিবেশ শান্ত রাখতে থানার দু'পাশে মহাসড়কে অবস্থান নেয়। এদিকে, দুপুর দেড়টা থেকে উপজেলা সদর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এই আদেশ পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এইচ এম নুরুল ইসলাম জানান, সেনা মোতায়েন নয়, থানা পুলিশকে রক্ষা করতেই সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন।
মহিলাদের যাওয়াটা কারো ধারণার মধ্যে ছিল না। এমনকি মহিলাদের কোলে তাদের অবুঝ শিশুরাও ছিল। যাদের পায়ে একটি ছোট্ট কাঁটা ফুটুক এটা বাবা-মা কখনও চান না। তাদেরও কেন নিয়ে গেল? রাজধানীর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে অলস সময়ে বসে এর অনেক সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করা যাবে। যুক্তির বন্যা বহিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু সেই সব হতদরিদ্র-নিঃস্ব মানুষদের অবেগকে বিশ্লেষণ করা যাবে না। আর তাদের ওপর হামলার বিষয়টি কারো কল্পনার মধ্যেও ছিল না। স্থানীয় একটি পত্রিকা ৩ জন মহিলার জানাজার ছবিসহ নিউজ করে "দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন একজন মা; আর একজন মা হয়ে তিনি কিভাবে পারলেন শত শত মা কে গুলির নির্দেশ দিয়ে তাদের সন্তানদের মা হারা করতে।"
৪. স্বামীর অভিব্যক্তি
পঞ্চাশোর্ধ্ব স্বামী হযরত আলী তোতা ত্রিশ বছর আগে নিজ বাড়ি থেকে ৫ কিঃ দূরে বনভিটি গ্রামে বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রী, সন্তানাদি নিয়ে তার সুখেই কাটছিল। একসময় কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। কুনি রোগের কারণে প্রথমে পরপর দুটি আঙুল অতঃপর ১৯৯৬ ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়। একসময় একই রোগে ডান হাতের মধ্যমা আঙুলটিও কাটতে হয়। বর্তমানে তিনি বেকার। স্ত্রী মুনজিলা ছিলেন এই দরিদ্র ও পঙ্গু পরিবারের একমাত্র সহায় আলোকবর্তিকা।
কয়েকদিন যাবৎই স্বামী-স্ত্রী দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতেন। ঘটনার দিন ভোর হতেই হাজার হাজার মানুষ মিছিলে যাচ্ছে। 'আমি স্ত্রী মুনজিলাকে বললাম, 'আজ এদের কোন লোক যদি মারা যায়, নিশ্চয়ই সে শহীদ হবে। এরপর আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কয়েক ঘণ্টা পরে ছেলে শাহজাহানপুর হতে ফোন করে বলে, 'বাবা, মা নেই।'
মনে হয় আমি ঘুমিয়ে পড়ার পর সে যথারীতি ফজর নামাজ পড়ে, আমার সেই কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হাজারো মানুষ, নারী, শিশুর সাথে চলে যায় বিক্ষোভে অংশ নিতে।
পঙ্গু, বয়স্ক স্বামী হযরত আলী শিশুর মতো কেঁদে ওঠেন, বলেন তার দেখা স্বপ্নের কথা। আমি দেখলাম, মুনজিলা বাসায় এসেছে বেশ হাসি খুশি আমি বললাম, তুমি না মারা গেছ? তোমার না গুলি লেগেছে, উত্তরে হেসে মুনজিলা বলছে, কই আমি তো বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমার কাপড় কই? ভাবলাম ওর বিক্রির কাপড়ের কথা বলছে-বললাম, সেটি আছে। এরপর ঘুম ভেঙে যায়।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদা মোছা: মুনজিলা বেগম (০২৬)। পেশা: গৃহিণী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১২ আগস্ট ১৯৬৯ইং, ৪৩ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৬.৩০মি.।
শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৬.৩০মি. স্থান: বগুড়া শাহজাহানপুরের রাস্তায়। দাফন করা হয়। এলাকার বড় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: নতুন মন্ডল পাড়া, ডোমনপুকুর, ডাকঘর: মাঝিরা, থানা: শাহজাহানপুর, জেলা: বগুড়া।
স্বামী: মো: হযরত আলী তোতা, ৫০ বছর, কাঠমিস্ত্রি (এখন পঙ্গু) অসুস্থতার কারণে পা কেটে ফেলতে হয়েছে। পিতা: মৃত আহমদ আলী
মাতার নাম: মোছা: রহিমা বেগম, ৭০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: খাস জায়গার ওপর মাটির ঘরের ওপর টিনের চাল, যৌথ পরিবার। নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই। ছেলেদের সহযোগিতায় সংসার চলে।
স্বামী ও সন্তানদের বিবরণ: স্বামী: মো: হযরত আলী তোতা ১ম ছেলে: মো: ইউনুছ আলী (২৭), গাড়ির হেল্পারি করে, মেয়ে: মোছা: হাজেরা বেগম (২৪), বিবাহিতা-স্বামী কৃষক, ২য় ছেলে: মো: ইসমাইল (১৯), দিনমজুর।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍