হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদা মোছা: আরজেনা বেগম
শহীদা মোছা: আরজেনা বেগম

শহীদা মোছা: আরজেনা বেগম

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদা মোছা: আরজেনা বেগম (০২৮)। পেশা: গৃহিণী
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৭৫ সাল ৩৮ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৮:১৫মি.।
শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৮.১৫মি.। দাফন করা হয়: এলাকার বড় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: শাহজাহানপুর পশ্চিম পাড়া, ডাকঘর: মাঝিড়া, থানা: শাহজাহানপুর, জেলা: বগুড়া।
স্বামী: মো: মেহরাজ আলী, বয়স ৬০ বছর, অন্যের বাড়িতে কাজ করেন।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: টিনের একটি ঘর। তিন শতাংশ জমি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোন রকমে সংসার চলে।
স্বামী ও সন্তানদের বিবরণ: স্বামী: মো: মেহরাজ আলী, বয়স ৬০ বছর, অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। ছেলে: আনোয়ার হোসেন আনু, সিমেন্টের খুঁটির কারখানার কাজ করেন। মেয়ে: মাছা: মেরিনা খাতুন, বেলপুকুর হাই স্কুল, ৯ম শ্রেণি, মানবিক বিভাগ।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

"বিদায়বেলায় কি মনে হলো ভাইয়ের বৌকে ডেকে বললেন, 'ছেলেকে নিয়ে চললাম। যদি আমাদের কিছু হয়। এই মেয়েকে দেখে শুনে রেখ। ভালভাবে বিয়ে শাদি দিও।"
১. শহীদার পরিচিতি
বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর উপজেলার মাঝিড়া ইউনিয়নের শাহজাহানপুর পশ্চিম পাড়া গ্রামের দুই সন্তানের জননী ৪০ বছর বয়সী শহীদা আরজেনা। তাদের আদি নিবাস ছিল গাইবান্ধা সদরে। ২৩-২৪ বছর আগে নদী ভাঙার কারণে এখানে চলে আসেন। শুরুতে তাদেরকে মানুষের সাহায্য বা গাঁয়ে করে বেড়ানো করতে হয়েছে।
তার ৬০ বছর বয়সী স্বামী মেহরাজ আলী দিন মজুরির ভিত্তিতে কৃষি কাজ করেন। স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে অভাবের সংসারে কোনমতে দিন অতিবাহিত করে আসছেন। সন্তানদের মধ্যে বড় ছেলে সিমেন্টের খুঁটির কারখানায় কাজ করে ও মেয়ে বেলপুকুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণীর মানবিক বিভাগে পড়াশুনা করে আসছে।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৩ মার্চ ২০১৩। বিশ্ববরেণ্য নন্দিত আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়টি অনেকের মতোই কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি ৪০ বছর বয়সী এই মা। তার বুক ফাটা কষ্ট আর জমাট বাঁধা ক্ষোভ প্রকাশ করার ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছেন। তাই যখন জানতে পারলেন বিতর্কিত সেই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হচ্ছে এবং তারই এলাকার অসংখ্য নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে, তাই আর দেরি না করে সকাল ৭টার দিকে তিনি বেরিয়ে পড়েন বাড়ি থেকে। বিদায়বেলায় কি মনে হলো ভাইয়ের বৌকে ডেকে বললেন ছেলেকে নিয়ে চললাম। যদি আমাদের কিছু হয়; এই মেয়েকে দেখে শুনে রেখ। ভালভাবে বিয়ে শাদি দিও।
তখন ৮.১৫মি, চারিদিকে প্রতিবাদী হাজার হাজার নারী-পুরুষ। সকলের সমবেত কণ্ঠে শুধু একটাই দাবি মুক্তি দাও, ফিরিয়ে দাও আমাদের প্রাণের সাঈদীকে। অবৈধ ট্রাইব্যুনাল মানি না, বাতিল কর। সবার মতো এই নারীর শ্লোগান সাঈদীর মুক্তি চাই দিতে হবে দিতে হবে। পর্দানশিন এমন একজন নারীকে কুরআনের এক খাদেমের জন্য জীবনে এই প্রথম ময়দানে নেমে আসতে দেখেছে এলাকার মানুষেরা। এরা কোন রাজনীতির পক্ষপাতিত্বকে পরোয়া করে না, বুঝে না অন্যকোন নীতিও। মহান আল্লাহর কুরআনকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে হয় শুধু এটাই জানে। আর এটাই ভয় পাইয়ে দিয়েছিল বিরোধী শক্তির। তাই মানুষরূপী হায়েনারা পুলিশকে নির্দেশ দেয় গুলি চালাতে। আর অন্ধের মতো অনুসরণ করে সরকারি পুলিশ বাহিনী।ঠিক তখনই শুরু হয় প্রতিবাদ করতে আসা হাজার হাজার শান্তিপ্রিয় মানুষের ওপর নির্বিচারে বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ। এমনি একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় আরজেনা বেগমের ছিনায় এবং গলায়। সাথে সাথেই পড়ে যান, ততক্ষণে তিনি শাহাদাতের আহবানে সাড়া দিয়ে চলে যান মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে।
সকাল ৮.১৫ টায় গুলি লাগার পর ঘটনাস্থলেই শহীদ হন আরজেনা বেগম। এ সময় কাউকে আহতের কাছে পৌঁছতে দেয়নি সরকারি এ পাষণ্ড পুলিশ বাহিনী। ২.৩০ টায় পুলিশ এসে লাশ থানায় নিয়ে যায়। পরে বিকেল ৫ টার দিকে পুলিশ লাশ হস্তান্তর করে।
ডোমন পুকুর আমিনিয়া কামিল মাদ্রাসা মাঠে শহীদার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন আমিনিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আনিসুর রহমান। জানাযায় ৪ হাজারের অধিক লোক উপস্থিত ছিলেন।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
বিশ্ববরেণ্য মুফাসসিরে কুরআন ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে বগুড়ার সর্বস্তরের জনতা। অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমে আসে লাখ লাখ মানুষ।
ঘোরতর সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত স্থানীয় প্রভাবশালী দৈনিক সাতমাথা রিপোর্ট করে কিভাবে চাঁদে সাঈদী সাহেবকে দেখার বিষয়টি প্রচারিত হয় এবং এতে কোন সংগঠনের ইন্ধন ছিল না। এটি ছিল সাধারণ মানুষের ভালবাসা ও আবেগের অভিব্যক্তি। ৪ মার্চ ২০১৩, "বগুড়ায় গুলিতে নিহত ১২" শিরোনামে দৈনিক সাতমাথার রিপোর্ট; "গত শুক্রবার শেষ রাতে আকাশে চাঁদের গায়ে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি দেখা গেছে এমন একটি গুজব রটে যায় শনিবার সকালে। বাতাসের বেগে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। শনিবার দিবাগত রাতে আবারও দৃশ্যটি দেখার আগ্রহ জাগে অনেকেরই। ফলে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন অসংখ্য মানুষ। অবশেষে রাত দুইটার দিকে অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়। চাঁদের গায়ে থাকা ছায়া দেখে সেটি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বলে অনেকে বিশ্বাস করতে থাকেন। ওই ছায়ার মানুষটিই আল্লামা সাঈদীর এই বিশ্বাস গেঁথে যায় অনেকের মনে। মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল ফোন, ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পাড়া মহল্লায় শুরু হয় মিছিল। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে ফজরের নামাজের পূর্বেই হাজার হাজার মানুষ মহাসড়কের ওপর অবস্থান নেয়। তারা গাছের গুঁড়ি এবং বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে বগুড়া-ঢাকা, বগুড়া-নাটোর, বগুড়া-জয়পুরহাট, বগুড়া-রংপুর এবং বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়ক অবরোধ করে। ফজরের নামাজ শেষে লোকজন স্রোতের মত রাজপথে নামতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে জেলার প্রতিটি সড়ক, মহাসড়ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। জাময়াত-শিবির নেতা কর্মীরা আসা জনতা হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে।"
শুধু শাহজাহানপুর থানার ঘটনাস্থলেই মহিলাসহ ৩ জন এবং বগুড়া সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো এক মহিলাসহ ২ জন নিহত হন। আহত হয় ৩ পুলিশসহ প্রায় ২০ জন। আহতদের মধ্যে অনেকে বগুড়া সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। নিহতরা হলেন উপজেলার সাজাপুর পশ্চিমপাড়ার মেহরাজের স্ত্রী আরজেনা বেগম (৪৫), ডোমনপুকুর গ্রামের তোতা মিয়ার স্ত্রী মুনজিলা বেগম (৩৮), ডোমনপুকুর নতুনপাড়ার মৃত মনছের আলীর স্ত্রী আকলিমা বেগম (৫০), আমরুল গ্রামের জাফর আলীর ছেলে আব্দুল কাছির (৪০) এবং ডোমনপুকুর নয়াপাড়ার রকিবের ছেলে আব্দুর রহমান (৬০)। এ ঘটনার পর সকাল সোয়া ৮টার দিকে দুই প্লাটুন সেনা সদস্য ঘটনাস্থলে এসে পুলিশকে রক্ষা ও পরিবেশ শান্ত রাখতে থানার দু'পাশে মহাসড়কে অবস্থান নেয়। এদিকে, দুপুর দেড়টা থেকে উপজেলা সদর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এই আদেশ পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বলবত থাকবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এইচ এম নুরুল ইসলাম জানান, সেনা মোতায়েন নয়, থানা পুলিশকে রক্ষা করতেই সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন।
মহিলাদের যাওয়াটা কারো ধারণার মধ্যে ছিল না। এমনকি মহিলাদের কোলে তাদের অবুঝ শিশুরাও ছিল। যাদের পায়ে একটি ছোট্ট কাঁটা ফুটুক এটা বাবা-মা কখনও চান না। তাদেরও কেন নিয়ে গেল? রাজধানীর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে অলস সময়ে বসে এর অনেক সুবেগকে বিশ্লেষণ করা যাবে না। আর তাদের ওপর হামলার বিষয়টি কারো কল্পনার মধ্যেও ছিল না। স্থানীয় একটি পত্রিকা ৩ জন মহিলার জানাজার ছবিসহ নিউজ করে "দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন একজন মা; আর একজন মা হয়ে তিনি কিভাবে পারলেন শত শত মা কে গুলির নির্দেশ দিয়ে তাদের সন্তানদের মা হারা করতে।"
৪. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদা মোছা: আরজেনা বেগম (০২৮)। পেশা: গৃহিণী
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৭৫ সাল ৩৮ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৮:১৫মি.।
শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ০৮.১৫মি.। দাফন করা হয়: এলাকার বড় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: শাহজাহানপুর পশ্চিম পাড়া, ডাকঘর: মাঝিড়া, থানা: শাহজাহানপুর, জেলা: বগুড়া।
স্বামী: মো: মেহরাজ আলী, বয়স ৬০ বছর, অন্যের বাড়িতে কাজ করেন।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: টিনের একটি ঘর। তিন শতাংশ জমি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোন রকমে সংসার চলে।
স্বামী ও সন্তানদের বিবরণ: স্বামী: মো: মেহরাজ আলী, বয়স ৬০ বছর, অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। ছেলে: আনোয়ার হোসেন আনু, সিমেন্টের খুঁটির কারখানার কাজ করেন। মেয়ে: মাছা: মেরিনা খাতুন, বেলপুকুর হাই স্কুল, ৯ম শ্রেণি, মানবিক বিভাগ।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍