শহীদ মো: আব্দুল কাফী
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ মো: আব্দুল কাফী (০২৯), পেশা: দর্জি কাজ করতেন।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
জন্ম তারিখ ও বয়স: ০৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকালে, স্থান: শাহাজাহানপুর মেইন রাস্তা। দাফন করা হয়: এলাকার বড় কবরস্থান। জানাজা পড়ান তার ছেলে মো: আহসান হাবিব।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: গোবিন্দপুর, ডাকঘর: নগরহাট শাহজাহানপুর, জেলা: বগুড়া।
পিতা: মৃত আবু জাফর প্রামাণিক।
মাতা: ফজিতন্নেছা।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: মাসিক ২৫০০ টাকার একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। দর্জি কাজ মাসিক আয় ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: মোছা: শাহনাজ বেগম, বয়স ৩৫ বছর, সেলাই মেশিন চালান।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
জন্ম তারিখ ও বয়স: ০৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকালে, স্থান: শাহাজাহানপুর মেইন রাস্তা। দাফন করা হয়: এলাকার বড় কবরস্থান। জানাজা পড়ান তার ছেলে মো: আহসান হাবিব।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: গোবিন্দপুর, ডাকঘর: নগরহাট শাহজাহানপুর, জেলা: বগুড়া।
পিতা: মৃত আবু জাফর প্রামাণিক।
মাতা: ফজিতন্নেছা।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: মাসিক ২৫০০ টাকার একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। দর্জি কাজ মাসিক আয় ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: মোছা: শাহনাজ বেগম, বয়স ৩৫ বছর, সেলাই মেশিন চালান।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"জ্যোতির্ময় চেহারার শহীদ আব্দুল কাফী বলছেন, 'চাচা, আপনিতো মিছিলে এলেন না। দেখুন আমি কেমন চমৎকার বাগানে কত সুখে আছি।"
১. শহীদের পরিচিতি
বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে মো: আব্দুল কাফী ১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবু জাফর প্রামাণিক ও মা ইন্তেকাল করেছেন। শহীদ পরিবার নিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া ও উপার্জনের সুবিধার্থে গ্রামের বাড়ি থেকে প্রায় ৭-৮ কিঃ দূরে শাহাজাহানপুরে রহিমাবাদে বি ব্লকের একটি বাড়িতে মাসিক ২৫০০ টাকায় ভাড়া থাকতেন। প্রথম জীবনে চাকরি-সচ্ছল জীবন যাপন করলেও শেষ সময়ে দেলখোলা এই মানুষটি হযরত ওমরের নিরাম্বর জীবনকেই ভালবাসতেন। দুই সন্তানের জনক এই পিতা দর্জির কাজ করে মাসিক ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা উপার্জন করে কোনমতে জীবন যাপন করতেন। শহীদের স্ত্রী শাহানাজ বেগম তার কাজে সহযোগিতা করতেন। এত কষ্টকর জীবন যাপনের মধ্যেও তার দুই সন্তানের একজনকে মাদ্রাসায় উচ্চশিক্ষার জন্য ফাজিল ১ম শ্রেণীতে ভর্তি এবং তার মেয়েকে প্যারামেডিকেলে পড়াশুনার জন্য ভর্তি করান। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত পরহেজগার ও ধার্মিক ছিলেন তিনি।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
বিশ্ববিখ্যাত মুফাস্স্সির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর তৌহিদি জনতা এই রায়কে প্রত্যাখ্যান করে ৩ ও ৪ মার্চ হরতাল ও প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। ফজরের নামায পড়ে তৌহিদি জনতার এক বিশাল মিছিল যখন যাচ্ছিল তখন তিনি সঙ্গিদের বললেন, চলুন, জিহাদের ময়দানের ডাক এসেছে আমরা জিহাদের ময়দানে যাই। এরপর এলাকাবাসীর সাথে তিনি মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। আনুমানিক সকাল ৭.৩০ টার দিকে প্রচন্ড গোলাগুলির মধ্যে আব্দুল কাফী মাথার পেছনে বামদিকে গুলিবিদ্ধ হন এবং হাতে গুলি লেগে গোশত পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। পরে পুলিশ এসে লাশ থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ এসময় বিভিন্ন মামলা দিয়ে পুরা এলাকার জনসাধারণকে মারাত্মক হয়রানি করেছে। এমনকি কিছু মামলায় মৃত ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে। আহতরা ভালভাবে চিকিৎসা নিতে পারেননি। স্বজনরা তাদের সাথে দেখা করতে গেলেই গ্রেফতার করেছে। পুরো এলাকায় এখন গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করেছে। সকাল ৭.৩০ থেকে বিকেল ৩.৩০ পর্যন্ত শহীদের ছেলে ও তার স্বজনরা পাগলের মতো তন্ন তন্ন করে আব্দুল কাফীকে খুঁজে বেরিয়েছে। কিন্তু তার লাশতো দূরের কথা তার খবরটুকু পর্যন্ত পায়নি। এ থেকেই বুঝা যায় সেখানকার পরিস্থিতি কি ছিল। অবশেষে বিকাল ৫.০০ টার দিকে প্রশাসন লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। প্রথমে রহিমাবাদে গোসল করানো শেষে এলাকাবাসীর দাবির মুখে জানাজা পড়িয়ে রাতে গ্রামের বাড়ি গোবিন্দপুর নেয়া হয়। ওখানে পরের দিন সকাল ১০ টায় ঈদগাহ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বাবার শখ ছিল তিনি মারা গেলে ছেলেই তার নামাজে জানাজা পড়াবেন। তাই তিনি ছেলেকে আলেম হিসেবে গড়ে তোলেন। প্রায় ১২ হাজার লোকের অংশগ্রহণে উক্ত নামাযে ইমামতি করেন তার সেই ছেলে মো: আহসান হাবীব। মাত্র ২৭ দিন আগে শহীদের মা ইন্তেকাল করেছিলেন। তার কবরের পাশেই যেন মায়ের কোলেই শায়িত হলেন মাতৃভক্ত শহীদ আব্দুল কাফী।
৩. জাতীয় পত্রিকার ভাষ্য
৪ মার্চ জাতীয় পত্রপত্রিকায় এ বিষয়ে বিস্তর নিউজ আসে। দৈনিক সংগ্রামের নিউজ নিম্নরূপ;
বিশ্ববরেণ্য মুফাসসিরে কুরআন ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে বগুড়ার সর্বস্তরের জনতা। অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমে আসে লাখ লাখ মানুষ।
শুক্রবার শেষ রাতে আকাশে চাঁদের গায়ে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি দেখা গেছে এমন একটি খবর প্রকাশ হয়। বাতাসের বেগে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। গত শনিবার দিবাগত রাতে আবারও দৃশ্য দেখার আগ্রহ জাগে অনেকেরই। ফলে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন অসংখ্য মানুষ। অবশেষে রাত দুইটার দিকে অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়। ফুটফুটে চাঁদের গায়ে ভেসে ওঠে একটি ছায়া। ওই ছায়ার মানুষটিই আল্লামা সাঈদী এই বিশ্বাস গেঁথে যায় সবার মনে। মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল ফোন, ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মহিলা এবং বৃদ্ধরা। বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তরুণরা। মুহূর্তের মধ্যে পাড়ায়-মহল্লায় শুরু হয় মিছিল। ফজরের নামাযের পূর্বেই হাজার হাজার মানুষ মহাসড়কের ওপর অবস্থান নেয়। তারা গাছের গুঁড়ি এবং বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে বগুড়া-ঢাকা, বগুড়া-নাটোর, বগুড়া-জয়পুরহাট, বগুড়া-রংপুর এবং বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়ক অবরোধ করে। ফজরের নামায শেষে লোকজন স্রোতের মত রাজপথে নামতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে জেলার প্রতিটি সড়ক, মহাসড়ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ জনতা হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। ঘুম থেকে উঠে লুঙ্গি পরেই হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা পুলিশ ফাঁড়ি, শাজাহানপুর থানা, কাহালু থানা এবং বগুড়া শহরের ফুলবাড়ি, স্টেডিয়াম, কৈ গাড়ি, নারুলী ও উপশহর ফাঁড়ি, গাবতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় ও নন্দীগ্রাম উপজেলা পরিষদে হামলা চালায়। এ সময় পুলিশ নির্বিচার গুলি চালালে কমপক্ষে ১১ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক।
শুধু শাহজাহানপুর থানার ঘটনাস্থলেই মহিলাসহ ৩ জন এবং বগুড়া সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো এক মহিলাসহ ২ জন নিহত হন। আহত হয় ৩ পুলিশসহ প্রায় ২০ জন। আহতদের মধ্যে অনেকে বগুড়া সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। নিহতরা হলেন উপজেলার সাজাপুর পশ্চিমপাড়ার মেহরাজের স্ত্রী আরজেনা বেগম (৪৫), ডোমনপুকুর গ্রামের তোতা মিয়ার স্ত্রী মুনজিলা বেগম (৩৮), ডোমনপুকুর নতুনপাড়ার মৃত মনছের আলীর স্ত্রী আকলিমা বেগম (৫০), আমরুল গ্রামের জাফর আলীর ছেলে আব্দুল কাছির (৪০) এবং ডোমনপুকুর নয়াপাড়ার রকিবের ছেলে আব্দুর রহমান (৬০)। এ ঘটনার পর সকাল সোয়া ৮টার দিকে দুই প্লাটুন সেনা সদস্য ঘটনাস্থলে এসে পুলিশকে রক্ষা ও পরিবেশ শান্ত রাখতে থানার দু'পাশে মহাসড়কে অবস্থান নেয়। এদিকে, দুপুর দেড়টা থেকে উপজেলা সদর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এই আদেশ পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বলবত থাকবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এইচ এম নুরুল ইসলাম জানান, সেনা মোতায়েন নয়, থানা পুলিশকে রক্ষা করতেই সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। ৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের স্ত্রীর: শহীদের স্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী ভাত রান্না করতে বলে তিনি মিছিলে চলে যান। মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে তিনি আজ চলে গেছেন। আর এজন্য শহীদের স্ত্রী আল্লাহর কাছে তার স্বামীর জন্য শহীদি মর্যাদা এবং জান্নাত কামনা করেন। অভাবের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির শাহাদাতে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। শহীদের অনুপস্থিতিতে তাদের পারিবারিক আয় নেমে এসেছে অর্ধেকে। তবুও সন্তান সন্ততির লালন পালনের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছেন এই শহীদ পরিবার। স্ত্রীও স্বামীর মতো ইসলামের জন্য আত্মোৎসর্গী ছিলেন। স্বামীকে বলে রেখেছিলেন, 'আজকে মিছিল হলে যাওয়া লাগবে, আমাকেও নিয়ে যাবে।
শহীদের গর্বিত ছেলে: শহীদের গর্বিত ছেলে তার বাবাকে হারিয়ে শোকে পাথর। তিনি বলেন, আমার বাবা
অনেক ধার্মিক ছিলেন। সন্তানদেরকেও তিনি সেভাবে মানুষ করেছেন। তিনি আমাকে বলতেন-একটি জিনিস বেশি দরকার আর সেটা হলো নিজেকে সর্বদা সৎ রাখা। ছেলে আহসান হাবীব একটি স্মৃতি বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে। '৩ মার্চ ফজরের নামাজের পরে স্থানীয় মসজিদের লাশের খাটিয়া কেনার জন্য তিনি ২০০ টাকা দান করেন। বলেন, এটি সবারই লাগবে। আহা! কে জানতো, মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই তার জন্যই খাটিয়া সাজানো হবে।
শহীদের ভায়রা: তিনি খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। এলাকার সবার সাথে মিলে মিশে থাকতেন। আমরা
ছোট হলেও আমাদের সাথে খুব আন্তরিক ব্যবহার করতেন। নামাজ কালাম এক সাথেই পড়তাম। তিনি সবসময় বলতেন দুনিয়ার এসব একদিন-দুদিনের। পরকালের ডাক আসলে সবাইকে চলে যেতে হবে। সকালে যখন এক বিশাল মিছিল আসে তখন আমরা সকলেই ছুটে যাই। তখন তিনি বললেন চলো জিহাদের ময়দানের ডাক এসেছে আমরা জিহাদের ময়দানে যাই। অনেকক্ষণ পর তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। তখন প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। এরপর সেনাবাহিনী মোতায়েন করার পরে আমরা আর রাস্তায় যেতে পারিনি। দুপুরের পরে মেডিক্যাল থেকে খবর পাই ওখানে একটি লাশ আছে। পরে তাকে আমরা শনাক্ত করি।
শহীদ কাফী মিছিলে যাওয়ার সময় তার সে ভায়রার বাবাকে দেখতে পান, তাকে বলেন 'চলুন চাচা আজকের মিছিলে যাই। চাচা বললেন, 'বাবা আমার বয়স হয়েছে এতদূর যেতে পারবো না। শাহাদাতের পর সেই চাচা স্বপ্নে দেখেন আর কাঁদতে কাঁদতে সবাইকে বলেন, দেখলাম জ্যোতির্ময় চেহারার শহীদ আব্দুল কাফী বলছে, 'চাচা, আপনিতো মিছিলে এলেন না। দেখুন আমি কেমন চমৎকার বাগানে কত সুখে আছি।"
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: আব্দুল কাফী (০২৯), পেশা: দর্জি কাজ করতেন।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
জন্ম তারিখ ও বয়স: ০৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকালে, স্থান: শাহাজাহানপুর মেইন রাস্তা। দাফন করা হয়: এলাকার বড় কবরস্থান। জানাজা পড়ান তার ছেলে মো: আহসান হাবিব।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: গোবিন্দপুর, ডাকঘর: নগরহাট শাহজাহানপুর, জেলা: বগুড়া।
পিতা: মৃত আবু জাফর প্রামাণিক।
মাতা: ফজিতন্নেছা।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: মাসিক ২৫০০ টাকার একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। দর্জি কাজ মাসিক আয় ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: মোছা: শাহনাজ বেগম, বয়স ৩৫ বছর, সেলাই মেশিন চালান।
১. শহীদের পরিচিতি
বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে মো: আব্দুল কাফী ১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবু জাফর প্রামাণিক ও মা ইন্তেকাল করেছেন। শহীদ পরিবার নিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া ও উপার্জনের সুবিধার্থে গ্রামের বাড়ি থেকে প্রায় ৭-৮ কিঃ দূরে শাহাজাহানপুরে রহিমাবাদে বি ব্লকের একটি বাড়িতে মাসিক ২৫০০ টাকায় ভাড়া থাকতেন। প্রথম জীবনে চাকরি-সচ্ছল জীবন যাপন করলেও শেষ সময়ে দেলখোলা এই মানুষটি হযরত ওমরের নিরাম্বর জীবনকেই ভালবাসতেন। দুই সন্তানের জনক এই পিতা দর্জির কাজ করে মাসিক ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা উপার্জন করে কোনমতে জীবন যাপন করতেন। শহীদের স্ত্রী শাহানাজ বেগম তার কাজে সহযোগিতা করতেন। এত কষ্টকর জীবন যাপনের মধ্যেও তার দুই সন্তানের একজনকে মাদ্রাসায় উচ্চশিক্ষার জন্য ফাজিল ১ম শ্রেণীতে ভর্তি এবং তার মেয়েকে প্যারামেডিকেলে পড়াশুনার জন্য ভর্তি করান। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত পরহেজগার ও ধার্মিক ছিলেন তিনি।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
বিশ্ববিখ্যাত মুফাস্স্সির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর তৌহিদি জনতা এই রায়কে প্রত্যাখ্যান করে ৩ ও ৪ মার্চ হরতাল ও প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। ফজরের নামায পড়ে তৌহিদি জনতার এক বিশাল মিছিল যখন যাচ্ছিল তখন তিনি সঙ্গিদের বললেন, চলুন, জিহাদের ময়দানের ডাক এসেছে আমরা জিহাদের ময়দানে যাই। এরপর এলাকাবাসীর সাথে তিনি মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। আনুমানিক সকাল ৭.৩০ টার দিকে প্রচন্ড গোলাগুলির মধ্যে আব্দুল কাফী মাথার পেছনে বামদিকে গুলিবিদ্ধ হন এবং হাতে গুলি লেগে গোশত পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। পরে পুলিশ এসে লাশ থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ এসময় বিভিন্ন মামলা দিয়ে পুরা এলাকার জনসাধারণকে মারাত্মক হয়রানি করেছে। এমনকি কিছু মামলায় মৃত ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে। আহতরা ভালভাবে চিকিৎসা নিতে পারেননি। স্বজনরা তাদের সাথে দেখা করতে গেলেই গ্রেফতার করেছে। পুরো এলাকায় এখন গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করেছে। সকাল ৭.৩০ থেকে বিকেল ৩.৩০ পর্যন্ত শহীদের ছেলে ও তার স্বজনরা পাগলের মতো তন্ন তন্ন করে আব্দুল কাফীকে খুঁজে বেরিয়েছে। কিন্তু তার লাশতো দূরের কথা তার খবরটুকু পর্যন্ত পায়নি। এ থেকেই বুঝা যায় সেখানকার পরিস্থিতি কি ছিল। অবশেষে বিকাল ৫.০০ টার দিকে প্রশাসন লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। প্রথমে রহিমাবাদে গোসল করানো শেষে এলাকাবাসীর দাবির মুখে জানাজা পড়িয়ে রাতে গ্রামের বাড়ি গোবিন্দপুর নেয়া হয়। ওখানে পরের দিন সকাল ১০ টায় ঈদগাহ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বাবার শখ ছিল তিনি মারা গেলে ছেলেই তার নামাজে জানাজা পড়াবেন। তাই তিনি ছেলেকে আলেম হিসেবে গড়ে তোলেন। প্রায় ১২ হাজার লোকের অংশগ্রহণে উক্ত নামাযে ইমামতি করেন তার সেই ছেলে মো: আহসান হাবীব। মাত্র ২৭ দিন আগে শহীদের মা ইন্তেকাল করেছিলেন। তার কবরের পাশেই যেন মায়ের কোলেই শায়িত হলেন মাতৃভক্ত শহীদ আব্দুল কাফী।
৩. জাতীয় পত্রিকার ভাষ্য
৪ মার্চ জাতীয় পত্রপত্রিকায় এ বিষয়ে বিস্তর নিউজ আসে। দৈনিক সংগ্রামের নিউজ নিম্নরূপ;
বিশ্ববরেণ্য মুফাসসিরে কুরআন ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে বগুড়ার সর্বস্তরের জনতা। অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমে আসে লাখ লাখ মানুষ।
শুক্রবার শেষ রাতে আকাশে চাঁদের গায়ে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি দেখা গেছে এমন একটি খবর প্রকাশ হয়। বাতাসের বেগে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। গত শনিবার দিবাগত রাতে আবারও দৃশ্য দেখার আগ্রহ জাগে অনেকেরই। ফলে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন অসংখ্য মানুষ। অবশেষে রাত দুইটার দিকে অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়। ফুটফুটে চাঁদের গায়ে ভেসে ওঠে একটি ছায়া। ওই ছায়ার মানুষটিই আল্লামা সাঈদী এই বিশ্বাস গেঁথে যায় সবার মনে। মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল ফোন, ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মহিলা এবং বৃদ্ধরা। বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তরুণরা। মুহূর্তের মধ্যে পাড়ায়-মহল্লায় শুরু হয় মিছিল। ফজরের নামাযের পূর্বেই হাজার হাজার মানুষ মহাসড়কের ওপর অবস্থান নেয়। তারা গাছের গুঁড়ি এবং বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে বগুড়া-ঢাকা, বগুড়া-নাটোর, বগুড়া-জয়পুরহাট, বগুড়া-রংপুর এবং বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়ক অবরোধ করে। ফজরের নামায শেষে লোকজন স্রোতের মত রাজপথে নামতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে জেলার প্রতিটি সড়ক, মহাসড়ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ জনতা হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। ঘুম থেকে উঠে লুঙ্গি পরেই হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা পুলিশ ফাঁড়ি, শাজাহানপুর থানা, কাহালু থানা এবং বগুড়া শহরের ফুলবাড়ি, স্টেডিয়াম, কৈ গাড়ি, নারুলী ও উপশহর ফাঁড়ি, গাবতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় ও নন্দীগ্রাম উপজেলা পরিষদে হামলা চালায়। এ সময় পুলিশ নির্বিচার গুলি চালালে কমপক্ষে ১১ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক।
শুধু শাহজাহানপুর থানার ঘটনাস্থলেই মহিলাসহ ৩ জন এবং বগুড়া সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো এক মহিলাসহ ২ জন নিহত হন। আহত হয় ৩ পুলিশসহ প্রায় ২০ জন। আহতদের মধ্যে অনেকে বগুড়া সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। নিহতরা হলেন উপজেলার সাজাপুর পশ্চিমপাড়ার মেহরাজের স্ত্রী আরজেনা বেগম (৪৫), ডোমনপুকুর গ্রামের তোতা মিয়ার স্ত্রী মুনজিলা বেগম (৩৮), ডোমনপুকুর নতুনপাড়ার মৃত মনছের আলীর স্ত্রী আকলিমা বেগম (৫০), আমরুল গ্রামের জাফর আলীর ছেলে আব্দুল কাছির (৪০) এবং ডোমনপুকুর নয়াপাড়ার রকিবের ছেলে আব্দুর রহমান (৬০)। এ ঘটনার পর সকাল সোয়া ৮টার দিকে দুই প্লাটুন সেনা সদস্য ঘটনাস্থলে এসে পুলিশকে রক্ষা ও পরিবেশ শান্ত রাখতে থানার দু'পাশে মহাসড়কে অবস্থান নেয়। এদিকে, দুপুর দেড়টা থেকে উপজেলা সদর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এই আদেশ পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বলবত থাকবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এইচ এম নুরুল ইসলাম জানান, সেনা মোতায়েন নয়, থানা পুলিশকে রক্ষা করতেই সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। ৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের স্ত্রীর: শহীদের স্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী ভাত রান্না করতে বলে তিনি মিছিলে চলে যান। মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে তিনি আজ চলে গেছেন। আর এজন্য শহীদের স্ত্রী আল্লাহর কাছে তার স্বামীর জন্য শহীদি মর্যাদা এবং জান্নাত কামনা করেন। অভাবের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির শাহাদাতে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। শহীদের অনুপস্থিতিতে তাদের পারিবারিক আয় নেমে এসেছে অর্ধেকে। তবুও সন্তান সন্ততির লালন পালনের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছেন এই শহীদ পরিবার। স্ত্রীও স্বামীর মতো ইসলামের জন্য আত্মোৎসর্গী ছিলেন। স্বামীকে বলে রেখেছিলেন, 'আজকে মিছিল হলে যাওয়া লাগবে, আমাকেও নিয়ে যাবে।
শহীদের গর্বিত ছেলে: শহীদের গর্বিত ছেলে তার বাবাকে হারিয়ে শোকে পাথর। তিনি বলেন, আমার বাবা
অনেক ধার্মিক ছিলেন। সন্তানদেরকেও তিনি সেভাবে মানুষ করেছেন। তিনি আমাকে বলতেন-একটি জিনিস বেশি দরকার আর সেটা হলো নিজেকে সর্বদা সৎ রাখা। ছেলে আহসান হাবীব একটি স্মৃতি বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে। '৩ মার্চ ফজরের নামাজের পরে স্থানীয় মসজিদের লাশের খাটিয়া কেনার জন্য তিনি ২০০ টাকা দান করেন। বলেন, এটি সবারই লাগবে। আহা! কে জানতো, মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই তার জন্যই খাটিয়া সাজানো হবে।
শহীদের ভায়রা: তিনি খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। এলাকার সবার সাথে মিলে মিশে থাকতেন। আমরা
ছোট হলেও আমাদের সাথে খুব আন্তরিক ব্যবহার করতেন। নামাজ কালাম এক সাথেই পড়তাম। তিনি সবসময় বলতেন দুনিয়ার এসব একদিন-দুদিনের। পরকালের ডাক আসলে সবাইকে চলে যেতে হবে। সকালে যখন এক বিশাল মিছিল আসে তখন আমরা সকলেই ছুটে যাই। তখন তিনি বললেন চলো জিহাদের ময়দানের ডাক এসেছে আমরা জিহাদের ময়দানে যাই। অনেকক্ষণ পর তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। তখন প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। এরপর সেনাবাহিনী মোতায়েন করার পরে আমরা আর রাস্তায় যেতে পারিনি। দুপুরের পরে মেডিক্যাল থেকে খবর পাই ওখানে একটি লাশ আছে। পরে তাকে আমরা শনাক্ত করি।
শহীদ কাফী মিছিলে যাওয়ার সময় তার সে ভায়রার বাবাকে দেখতে পান, তাকে বলেন 'চলুন চাচা আজকের মিছিলে যাই। চাচা বললেন, 'বাবা আমার বয়স হয়েছে এতদূর যেতে পারবো না। শাহাদাতের পর সেই চাচা স্বপ্নে দেখেন আর কাঁদতে কাঁদতে সবাইকে বলেন, দেখলাম জ্যোতির্ময় চেহারার শহীদ আব্দুল কাফী বলছে, 'চাচা, আপনিতো মিছিলে এলেন না। দেখুন আমি কেমন চমৎকার বাগানে কত সুখে আছি।"
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: আব্দুল কাফী (০২৯), পেশা: দর্জি কাজ করতেন।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
জন্ম তারিখ ও বয়স: ০৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩ সকালে, স্থান: শাহাজাহানপুর মেইন রাস্তা। দাফন করা হয়: এলাকার বড় কবরস্থান। জানাজা পড়ান তার ছেলে মো: আহসান হাবিব।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: গোবিন্দপুর, ডাকঘর: নগরহাট শাহজাহানপুর, জেলা: বগুড়া।
পিতা: মৃত আবু জাফর প্রামাণিক।
মাতা: ফজিতন্নেছা।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: মাসিক ২৫০০ টাকার একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। দর্জি কাজ মাসিক আয় ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: মোছা: শাহনাজ বেগম, বয়স ৩৫ বছর, সেলাই মেশিন চালান।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍