শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ছিলেন ইসলামী চিন্তা, সামাজিক সেবা ও সাংগঠনিক দৃঢ়তার এক প্রতীকী নাম; ছাত্রজীবন থেকেই নেতৃত্ব ও আদর্শিক সংগ্রামে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে দেশব্যাপী শিক্ষা, মসজিদ-মাদরাসা ও মানবকল্যাণে রেখে গেছেন সুস্পষ্ট ও স্থায়ী ছাপ। লেখক, সংগঠক ও ভ্রমণপিপাসু এই নেতা সমাজের সাধারণ মানুষের উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজীবন নিষ্ঠাবান ছিলেন। মৃত্যুর পূর্বে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অটল অবস্থান ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা তাঁকে এক অবিচল বিশ্বাসীর মর্যাদায় অমর করে রেখেছে। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম বহু মানুষের কাছে আজও প্রেরণার বাতিঘর।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ মুজাহিদ: ইসলামী রাজনীতির এক কালজয়ী কবি
শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একজন কবি। অমর কবি। কালজয়ী কবি। লিখে গিয়েছেন তিনি সাবলীল ভঙ্গীতে রাজনীতির কবিতা, বিপ্লবের কবিতা। একটি আন্দোলন, একটি সংগঠন, একটি ইতিহাস, একটি আপসহীন সংগ্রামের কবিতা। এই ভূখণ্ডে বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম, জাতির উত্থান-পতন, প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামে জনাব মুজাহিদ একটি অকুতোভয় নাম। তিনি আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনার বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। বাংলার জমিনে নাস্তিকতাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের রক্তচক্ষু মোকাবেলা করে তৃণমূল থেকে গড়ে উঠে আসা একজন সংগ্রামী প্রাণপুরুষ। বর্তমান কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার শুধুমাত্র আদর্শিক কারণেই ইসলামী আন্দোলনের এই জনপ্রিয় নেতাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু শহীদদের দুনিয়া থেকে সরানো যায় না। তাঁরা জীবিত। তাদের মৃত্যু নেই। মানুষকে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা দেবার জন্যই জন্ম। ব্যক্তি জীবনে অল্পে তুষ্ট, নির্লোভ, পরোপকারী, দৃঢ়চেতা, সংগ্রামী জননেতা মোহাম্মদ মুজাহিদ খুব অল্প সময়ে ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই জনপদের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। নিজের কর্মতৎপরতায় সদা তৎপর তিনি। তিনি মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার রায় শুনে আইনজীবীদের কাছে বললেন- 'সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শান্তির জন্য আমি মোটেই বিচলিত নই। আমি পত্রিকার মাধ্যমে অবহিত হয়েছি যে, আপিল বিভাগে আমার পক্ষে আইনজীবীরা যথেষ্ট বলিষ্ঠভাবে এবং দৃঢ়তার সাথে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ঐসব মিথ্যা অভিযোগে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করার কোন সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপক্ষ আমার বিরুদ্ধে আনীত কোন অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি। এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালে জেরার সময় স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের কোথাও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত কোন অপরাধের সাথে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। এমনকি আমি আদৌ আল বদর, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল শামস বা এই ধরনের কোন সহযোগী বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম এমন কোন তথ্য তিনি তার তদন্তকালে পাননি। এরপরও আমার মত্যুদণ্ড বহাল। আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি।
আমি আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে বলছি, আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ শতভাগ মিথ্যা ও বানোয়াট। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন সময়ে কোন ধরনের অপরাধের সাথে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধে এত বছর পরে আমার বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অভিযোগ সাজানো হয়েছে।
প্রতিদিন বাংলাদেশে শত শত লোক স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। এসব মত্যুর সাথে ফাঁসির আদেশের কোন সম্পর্ক নেই। কখন, কার, কিভাবে মৃত্যু হবে সেটা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করেন। আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোন সাধ্য কারো নেই। সুতরাং ফাঁসির আদেশে কিছু যায় আসে না। আমি মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার ঘোষণায় উদ্বিগ্ন নই। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল। সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে যে শাস্তির ব্যবস্থা করেছে তার জন্য আমি মোটেই বিচলিত নই।আমি আল্লাহর দ্বীনের উদ্দেশ্যে আমার জীবন কুরবান করার জন্য সব সময় প্রস্তুত আছি।'
জন্ম ও শিক্ষা:
আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। তিনি তার পিতা, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুল আলীর কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। একজন ধর্মীয় নেতা ও আধ্যাত্মিক পুরুষ হিসেবে মাওলানা আব্দুল আলীকে আজও ফরিদপুরসহ গোটা অঞ্চলের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তিনি শুধু ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না বরং জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৬২-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যও (এমপিএ) নির্বাচিত হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে জনাব আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ফরিদপুর ময়জুদ্দিন স্কুলে ভর্তি হন। এরপর তিনি ফরিদপুর জেলা স্কুলে অধ্যয়ন করেন। মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়ালেখা সুসম্পন্ন করার পর তিনি ফরিদপুরে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক ডিগ্রী শেষ করার পর তিনি ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় আগমন করেন। জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাত্র দুই-আড়াই মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ক্লাস করার পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় জনাব মুজাহিদ আর সেখানে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন।
ছাত্র রাজনীতি:
ছাত্রজীবন থেকেই জনাব মুজাহিদ রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। শুরুতে রাজেন্দ্র কলেজে কিছুদিন এনএসএফ এ কাজ করার পর তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে যুক্ত হন। ১৯৭০ এর ডিসেম্বরে তিনি ফরিদপুর থেকে ঢাকায় আগমন করেন। তখন তিনি ফরিদপুর জেলায় ছাত্রসংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। ঢাকায় এসে তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা জেলার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে তিনি ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক সেক্রেটারি (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) মনোনীত হন এবং এর মাত্র দুই মাস পর অক্টোবরে তিনি ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক সভাপতি নির্বাচিত হন।
জামায়াতে যোগদান:
ছাত্রজীবন শেষ করার পরপরই আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮২-১৯৮৯ পর্যন্ত ঢাকা মহানগরী জামায়াতের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন এবং শাহাদাতের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
প্রাথমিক কর্মজীবন:
জনাব আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ তার পেশাগত জীবন শুরু করেন নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে। এর আগে ১৯৭৩-১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই আদর্শ স্কুল প্রতিষ্ঠায় তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। স্কুলের জন্য আর্থিক সংস্থান ও ছাত্র সংগ্রহে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তার ঐকান্তিক চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের কারণে আদর্শ স্কুল আজও নারায়ণগঞ্জ জেলায় সর্বশ্রেষ্ঠ স্কুল হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি নারায়ণগঞ্জের আদর্শ স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে সাংগঠনিক প্রয়োজনে তিনি ঢাকায় স্থানান্তরিত হন। গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দৈনিক সংগ্রামের চেয়ারম্যান এবং সাপ্তাহিক সোনার বাংলার পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গ্রেফতার হওয়ার কিছু দিন পূর্বে তিনি 'রাইজিং সান' নামক একটি ইংরেজি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। পত্রিকাটির ডামি ভার্সন তখন প্রকাশিত হচ্ছিল কিন্তু জনাব মুজাহিদ গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় পত্রিকাটি আজও আলোর মুখ দেখেনি।
জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা:
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বরাবরই দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্র আন্দোলন, ১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে, ১৯৯৪-১৯৯৬ কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, ২০০০ সালে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার আন্দোলন এবং ২০০৭ সালে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর পাশাপাশি, জনগণের মৌলিক সমস্যা ও জাতীয় সমস্যা নিরসনেও তিনি সক্রিয় অবদান রাখেন।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন:
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে ৫ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করেন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালীন তিনি নিন্মোক্ত সরকারি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কমিটিগুলো হচ্ছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, নির্বাহী কমিটি-জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক), জাতীয় নারী উন্নয়ন কাউন্সিল, অর্থনীতি সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি, নারী উন্নয়ন এবং নারী অধিকার বিষয়ক জাতীয় কমিটি, কারা সংস্কার কমিটি, এসিড ও মাদক নিয়ন্ত্রন জাতীয় কমিটি, ক্ষুদ্র ঋণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি, বয়স্ক ভাতা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং কিশোর অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি। সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালীন সময়ে তিনি মাদারীপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সামাজিক কার্যক্রম:
নিঃস্বার্থ একজন সমাজসেবক হিসেবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ব্যাপক সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দেশজুড়ে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং মসজিদ ও এতিমখানা বিনির্মাণে তার সক্রিয় ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তার নিজ জেলা ফরিদপুরে তিনি ৫০ টিরও বেশি মসজিদ নির্মাণে ভূমিকা পালন করেন। দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি এই ব্যাপক সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। মাদরাসা ছাত্রদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণে ২০০২ সালে তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকার ফাজিলকে বিএ সমমানের এবং কামিলকে মাস্টার্স মানে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন ধরনের আর্থ-সামাজিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণেও তার ভূমিকা সক্রিয় ছিল। তার প্রচেষ্টা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে ফরিদপুর ও মাদারীপুরের মত অবহেলিত জেলা দুটিতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। অগণিত রাস্তা, সড়ক ও মহাসড়ক, মাদরাসা, ব্রীজ, কালভার্ট ও মসজিদ সে সময় এই এলাকাগুলোতে নির্মিত হয়। তিনি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় বিভাগীয় সমাজসেবা কেন্দ্র এবং হাজী শরীয়তউল্লাহ ব্রীজ উদ্বোধন করেন।
মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে জনাব মুজাহিদ দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি নিয়মিতভাবেই তার মন্ত্রণালয়ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সারপ্রাইজ ভিজিটে যেতেন। এর মাধ্যমে তিনি মন্ত্রণালয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি কমানোর চেষ্টা করেছেন ও তাতে তিনি অনেকটা সফলও হয়েছেন। তার মেয়াদে তিনি বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলায় ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শিশু সদন (সরকারি এতিমখানা) নির্মাণ করেন, যা সমাজের ভাগ্যাহত ও অনগ্রসর কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করে।
২০০১ সালে যখন জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন সেটি একটি দুর্বল বা লো প্রোফাইল মিনিস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু তার ৫ বছর মেয়াদের শেষে এটি হাই প্রোফাইল তথা আলোচিত মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়। মন্ত্রণালয়ের বাজেট মাত্র ৫ বছরে ৫ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। এগুলো সবই হয় মন্ত্রী হিসেবে তার একনিষ্ঠ ও সফলতার কারণে।
তিনি তার মন্ত্রিত্বের ৫ বছরে ছোট খাট নানা অনুষ্ঠান ছাড়াও ৪০টিরও বেশি আলোচিত প্রোগ্রাম করেন, যেখানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যোগ দেন। তার নেতৃত্বে ২০০৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম প্রতিবন্ধী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি 'মুক্তা' নামক একটি মিনারেল ওয়াটারেরও প্রবর্তন করেন। যা প্রতিবন্ধীদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত এবং বাজারজাতকৃত। তার এই উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশের নাম তখন বিশ্ব দরবারে ভিন্নভাবে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়। তার সময় প্রতিবন্ধী অলিম্পিকেও বাংলাদেশ সফলতা অর্জন করে। এছাড়া তার সময়ে সুদমুক্ত ঋণ ও এসিডদগ্ধদের মধ্যে ব্যপকভাবে ভাতা প্রদান করা হয়। জনাব মুজাহিদ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে ঘুরে নিজে এই ভাতা বিতরণ করতেন। তাই তার সময়ে গ্রামের অভাবী মানুষ সুদখোর মহাজন এবং বেসরকারি সংস্থার হাত থেকে মুক্ত হয়ে সরকারের কাছ থেকে বিশেষত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে ঋণ নিতে শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে এই উন্নয়নমূলক কার্যক্রমগুলো বন্ধ হয়ে যায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে।
প্রকাশনাঃ
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একজন জনপ্রিয় এবং স্বনামধন্য লেখক। তার ৩টি বই ভীষণভাবে পাঠক মহলে সমাদৃত হয়। বইগুলো হলো, আজকের মুসলমান: ইসলামের দাবী, বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতে ইসলামী এবং তুরস্ক সফর। জনাব মুজাহিদ ইসলামী শিক্ষা, আর্থ সামাজিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুর উপরও নিয়মিতভাবে লেখালেখি করেছেন।
ভ্রমণ: জনাব মুজাহিদ ২০টিরও বেশি দেশে ভ্রমণ করেছেন। এই সব দেশে তিনি গণ্যমান্য, প্রভাবশালী এবং ইসলামী নেতৃবৃন্দের সাথেও সাক্ষাৎ করেন। তার ভ্রমণকৃত উল্লেখযোগ্য দেশের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমীরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, জাপান, থাইল্যান্ড এবং তুরস্ক।
বৈবাহিক অবস্থা:
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবর বেগম তামান্না-ই-জাহানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তামান্না-ই-জাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মহানগরী মহিলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তামান্না-ই-জাহান একজন গৃহিণী এবং পড়ুয়া মানসিকতার একজন নারী যিনি নিয়মিতভাবে পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করেন।
জনাব মুজাহিদ ৩ পুত্র ও এক মেয়ে সন্তানের জনক।
শহীদ মুজাহিদের শেষ কথাঃ
আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া। জেল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে তারা এই সাক্ষাতের সুযোগ করে দিয়েছেন। জেল কর্তৃপক্ষ আসলে অসহায়। তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই পর্যন্ত আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন এবং আমার সাথে ভাল ব্যবহার করেছেন। তারা আমাকে একটি লিখিত আবেদনের জন্য যথেষ্ট পীড়াপীড়ি করেন
এবং বলেন এটা না হলে তাদের অসুবিধা হয়ে যাবে। এক পর্যায়ে তারা বলেন, আপনার যা বক্তব্য আছে তাই লিখে দেন। আর সেই কারণেই এটা বলার পর আমি কনসিকুয়েন্স বুঝেও আমি তাদের সুবিধার জন্য একটি লিখিত আবেদন দিয়েছি।
আমি রাষ্ট্রপতিকে লিখেছি, আইসিটি এ্যাক্ট, যদিও এটা অবৈধ ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তারপরেও এই বিচারের সময় আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সীমিত সুযোগ দেয়া হয়েছে। আমার ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইন, সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য ছিল না। সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
আমাকে ট্রাইবুনাল ৬ নং চার্জে মৃত্যুদণ্ড দেয়নি। তারা চার্জ ১ কে চার্জ ৬ এর সাথে মিলিয়ে চার্জ ৬ এ মত্যুদণ্ড দিয়েছে। আপীল বিভাগ আমাকে চার্জ ১ থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। চার্জ ৬ এ তারা আমার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে। অথচ ট্রাইবুনাল শুধু চার্জ ৬ এর জন্য আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়নি।
এই চার্জে স্বাক্ষী মাত্র একজন। সে বলেনি, যে কোন বুদ্ধিজীবিকে আমি হত্যা করেছি। কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারের সন্তানও এসে বলতে পারেনি যে আমি কোন বুদ্ধিজীবিকে মেরেছি। এবং কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারও আমার রায়ের পরও দাবী করেনি যে তারা তার পিতা হত্যার বিচার পেয়েছেন। আমার অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে যে আমি নাকি আর্মী অফিসারদের সাথে বসে পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু যে স্বাক্ষী এসেছে সেও বলেনি যে আমি কবে কোন আর্মি অফিসারের সাথে কোথায় বসে এই পরামর্শ করলাম?
সাক্ষী বলেছে আমাকে, নিজামী সাহেব ও অধ্যাপক গোলাম আযমকে দেখেছে। সে আমাদের চিনতো না। পরে আমাদের নাম শুনেছে। অথচ এই অভিযোগটি গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনাই হয়নি। নিজামী ভাইকে যাবজ্জীবন দিয়ে শুধু আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে আমার মত্যুদণ্ডের রায় কনফার্ম করে। তারপর আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে প্রহসন শুরু করা হয়েছে।
আমাকে আমার পরিবার, সংগঠন ও দেশবাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য, কাপুরুষ প্রমাণ করার জন্য দিনভর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মিথ্যাচারের নাটক করা হয়েছে। এই জালিম সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। আমি নির্দোষ, নির্দোষ এবং নির্দোষ। আমাদের আজ তারা অন্যায়ভাবে হত্যা করতে যাচ্ছে।
কত বড় স্পর্ধা তাদের যে তারা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার দাবী করে। অথচ তাদের নিজেদের ভেতর মানবতা নেই। তারা ঘুমন্ত অবস্থায় একজন মানুষকে মধ্যরাতে তুলে তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে বলে এই তাদের শেষ সাক্ষাত এবং এরপরও তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হবে।
তোমরা শুনে রাখো, আজ যদি আমার ফাঁসি কার্যকর করা হয়, তাহলে তা হবে ঠান্ডা মাথায় একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা। তোমরা প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ো না। তোমাদের কিছুই করতে হবেনা। আজ আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর এই অন্যায় বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকের বিচার আল্লাহর দরবারে শুরু হয়ে যাবে, বিচার শুরু হয়ে গেছে। তোমাদের কারও কিছু করতে হবে না।
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মত এত বড় নেয়ামত দুনিয়াতে আর একটিও নেই। আমার জানামতে এই সংগঠন দুটি পৃথিবীর মধ্যে সেরা সংগঠন। এই সংগঠনের ব্যাপারে আমি সন্তুষ্ট। গত কয়েক বছরে অনেক নেতাকর্মী শহীদ হয়েছে, হাজার হাজার নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, আমার মত জেলখানায় আছে কয়েক হাজার মানুষ। বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবির বিগত ৫ বছরে যে ভূমিকা রেখেছে, যে স্যাক্রিফাইস করেছে তা অতুলনীয়। আমার শাহাদাত এই দেশে ইসলামী আন্দোলনকে সহস্রগুণ বেগবান করবে এবং এর মাধ্যমে জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যারা স্বাক্ষী দিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুইজন ছাড়া বাকি সবাই দরিদ্র। তারা মূলত অভাবের তাড়নায় এবং বিপদে পড়ে মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য হয়েছেন। আমি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলাম, তোমরাও কোন ক্ষোভ রাখবা না।
পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন- তোমরা নামাজের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস থাকবা। তোমরা সব সময় হালাল রুজির উপর থাকবা। কষ্ট হলেও হালাল রুজির উপর থাকবা। আমি ৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম, ফুল কেবিনেট মন্ত্রী ছিলাম। আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে আমি সেখানে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে, পরিশ্রম করে আমার দায়িত্ব পালন করেছি। কেউ আমার ব্যাপারে বলতে পারবে না যে আমি অন্যায় করেছি। অনেক দুর্নীতির মধ্যে থেকেও আমার এই পেটে (নিজের শরীরের দিকে ইংগিত করে) এক টাকার হারামও যায়নি। তোমরাও হালাল পথে থাকবা। তাতে একটু কষ্ট হলেও আল্লাহ বরকত দিবেন।
আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক 'সিলাই রেহীমি'। আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে মিলে মিশে চলবে।
আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই নামাজ পড়বে, অনেকেই কম। কেউ কেউ হালাল উপার্জনের ব্যপারে অত্যধিক কড়া হবে, আবার কেউ কেউ একটু দুর্বল থাকবে। শরীয়তে দুই রকম। আজিমাত এবং রুকসাত। আজিমাত হলো খুবই কড়া, কোন অবস্থাতেই সে হারামের কাছে যাবেনা। আর রুকসাত হলো পরিবেশ ও পরিস্থিতির জন্য একটু ঢিল দেবে। তাই আত্মীয়দের মধ্যে কারও আয়-রোজগারে সমস্যা থাকবে, কারও নামাজে দুবর্লতা থাকবে। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো তাদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য সবার সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে মিলে মিশে চলা। আমি সব সময় এভাবে চলেছি এবং তাতে ভাল ফল পেয়েছি। হাদীসে আছে, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
প্রতিবেশীর হক আদায় করবে। আমার ঢাকার বাসা, ফরিদপুরের বাড়ীর প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে। আমার উত্তরার বাসার ব্যাপারে তো আমি আগেই লিখে দিয়েছি। মৌলিক কোন চেঞ্জ দরকার নেই। শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী মূল ভিত্তি ঠিক রেখে তোমরা সুবিধা মতো এদিক ওদিক চেঞ্জ করে নিও। ফরিদপুরের বাড়ী নিয়েও যেভাবে বলে দিয়েছি, সেভাবেই তোমরা কাজ করবে। আমরা ভাই ভাইদের মধ্যে কোন স স্পত্তি নিয়ে কখনো ঝামেলা হয় নাই। তোমরাও মিলেমিশে থাকবে। এসব নিয়ে কোন সমস্যা করবানা। শান্তির জন্য কাউকে যদি এক হাত ছাড়তেও হয়, তাও কোন ঝামেলা করবেনা, মেনে নিবে।
বেশী বেশী করে রাসূল (সা) এর জীবনী ও সাহাবীদের জীবনী পড়বে। আমি জানি তোমরা পড়েছো, কিন্তু তাও বার বার পড়বে। বিশেষ করে পয়গম্বর-এ-মোহাম্মাদী, মানবতার বন্ধু হযরত মোহাম্মাদ (সা:), সীরাতে সারওয়ারে আলম, সীরাতুন্নবী, সীরাতে ইবনে হিশাম, রাসূলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন। আর সাহাবীদের জীবনীর উপরও ভাল বই আছে। আগে পড়েছো জানি, তাও তোমরা পড়ে নিও। আমি আমার সন্তানদের উপর সন্তুষ্ট। তোমাদের ভূমিকার ব্যাপারে সন্তুষ্ট।
আইনজীবীদেরকে আমার ধন্যবাদ ও দোয়া দেবে। তারা অনেক পরিশ্রম করেছেন। তাদের ভূমিকার ব্যাপারে আমি সন্তুষ্ট। আইনজীবীরা যেভাবে পরিশ্রম করেছে, অবিশ্বাস্য। ওনারা যদি টাকা নিতো তাহলে ৫-১০ কোটি টাকার কম হতো না। কিন্তু তারা অলমোস্ট বিনা পয়সায় সাহসিকতার সাথে এই আইনী লড়াই চালিয়ে গেছেন।
আমার জানামতে শহীদের মৃত্যু কষ্টের হয় না। তোমরা দোয়া করবে যাতে আমার মৃত্যু আহসানের সাথে
হয়। আমাকে যেন আল্লাহর ফেরেশতারা পাহারা দিয়ে নিয়ে যান।
মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করতে লর্ড কারলাইলের আহবান
বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করার আহবান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডস এর সদস্য লর্ড কারলাইল। শুক্রবার দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি পুরো বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন, যে বিষয়ে উদ্বেগ দিনের পর দিন বেড়েই চলছে।
মুজাহিদ'র মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের আহ্বান।। অস্বচ্ছ বিচারে প্রকৃত ন্যায়বিচার হয় না-এইচআর ডব্লিউ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড অবিলম্বে স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি এই দু'জনের মামলার 'স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনারও' দাবি জানিয়েছে।
এই মামলায় মৃত্যুদণ্ড আরোপ সমর্থনযোগ্য নয় -স্টিফেন র্যাপ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এ্যাম্বাসেডর এট লার্জ (যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক দূত) স্টিফেন জে র্যাপ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মত্যুদণ্ডের শাস্তি কমাতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ না হওয়া পর্যন্ত অবিলম্বে দণ্ড কার্যকর স্থগিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের বিচার প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কথা তুলে ধরে এক বিবৃতিতে সরকারের প্রতি তিনি এ আহ্বান জানান।
মাথা উঁচু করে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হলেন
শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ
বিশ্বের অগণিত মানুষের বুক ফাটা আর্তনাদ, কান্না ও চোখের পানিতে বুক সিক্ত করার মধ্য দিয়ে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে পাড়ি জমালেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক মন্ত্রী বিশ্বনন্দিত নেতা জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদে আম শহীদ হাসানুল বান্নার পর এমন উঁচু পর্যায়ের নেতা পৃথিবীর আর কোথাও রাষ্ট্রযন্ত্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে শাহাদাতবরণ করেননি। জনাব মুজাহিদ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম নেতা। তাঁর রক্তে রঞ্জিত হল বাংলাদেশের সবুজ জমিন। মহান আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী বান্দা হিসেবে মাথা উঁচু করে তিনি তাঁর রবের একত্ববাদের ঘোষণা দিতে দিতে এ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে ২২ নভেম্বরের সূচনায় ৫৫ মিনিটে জান্নাতের পথে যাত্রা শুরু করেন।
প্রায় ৫ বছর ৫ মাসের বন্দী জীবনে তিনি পরিবার, দল ও সাধারণ মানুষ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। ছিলেন। এ পরিস্থিতিতে তার সান্নিধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ এক মহা সৌভাগ্যের বিষয়। আল্লাহ তায়ালা আমাকে সেই সৌভাগ্য দান করেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক তাঁর আপীল খারিজ হয়ে যাওয়ার পরে এবং পূর্বে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে গিয়েছেন। মামলা পরিচালনার সুবাদে দেশের রাজনীতি, সামাজিক অবস্থা, তিনি যে দল করতেন সে দলের সাংগঠনিক অবস্থা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে সব কথা বার্তা বলেছেন তা এ দেশের মানুষের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। অত্যন্ত স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন চিন্তা এবং অনাড়ম্বর জীবনের অধিকারী মুজাহিদ ভাই সবসময় নিজের মত করেই সবকিছু দেখতে অভ্যস্থ ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইতিবাচক। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আশাবাদী একজন মানুষ। দুশমন ক্ষতি করতে পারে এ ভাবনা কখনো তাঁর মনে ছিল না। মানবিকতা সবসময় তার অন্তরকে তাড়িত করতো। তিনি নেতিবাচক চিন্তাকে কখনো পাত্তা দিতেন না। সবসময় কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কোথাও কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে তা শক্তভাবে ধরতেন। আর এ জন্য অনেকের কাছেই তিনি একজন কঠোর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন সরল মনের অধিকারী।
জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বদাই এক আলোচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে তাঁর নাম কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মানবতার মুক্তি আন্দোলনে তিনি আপোষহীন ভূমিকা পালন করেছেন। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের স্বার্থের চাইতে দল এবং দেশের স্বার্থই ছিল তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরো স্মরণীয় হয়ে থাকবেন- তার বিরুদ্ধে। সরকারি ষড়যন্ত্র ও তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার কারণে। তাঁর বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল তা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ নেই। বিনা অভিযোগে একজন মানুষকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা ইতিহাসে নজিরবিহীন। জনাব মুজাহিদ সরকারি ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত এবং প্রতিহিংসার নির্মম শিকার হয়ে তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি কত বড় মজলুম। বাংলাদেশের জনগণের মনের মণিকোঠায় তিনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন। রাষ্ট্রীয় অবিচারের ঘটনা অবহিত হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর প্রতি আরো শ্রদ্ধাশীল হবে। আর ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যার পরিকল্পনাকারীদেরকে ধিক্কার এবং নিন্দা জানাবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁকে মত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে তিনি মহামান্য সুপ্রীম কোর্টে আপীল করেছিলেন। তাঁর আপীল খারিজ হয়ে যাবার পর তিনি রায়ের গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটিসমূহ উল্লেখ করে রিভিউ পিটিশন দায়ের করেছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত জনাব মুজাহিদের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন। এ আদেশের পর রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেল গণমাধ্যমে প্রদত্ত বক্তব্যে স্বীকার করেছেন, জনাব মুজাহিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ নেই। এটর্নি জেনারেলের বক্তব্য থেকে আরো স্পষ্ট হয় যে, শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হওয়ার কারণেই জনাব মুজাহিদকে এ শাস্তি দেয়া হয়েছে। আইনী বিবেচনায় তিনি নির্দোষ।
রিভিউ খারিজের সংবাদ দ্রুততার সাথে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ইসলামপ্রিয় জনতার মাঝে ব্যাপক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। দেশ-বিদেশ থেকে অবিরতভাবে টেলিফোন আসতে থাকে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীগণ বেদনাহত হয়ে পড়েন।
পবিত্র মক্কা নগরী থেকে কয়েক জন টেলিফোন করলেন। তারা জানালেন এ মুহূর্তে তারা খানায়ে কা'বায় তাওয়াফরত অবস্থায় আছেন এবং জনাব মুজাহিদের জন্য কাবা শরীফের গেলাফ ধরে বিশ্ব প্রভুর দরবারে দোয়া করছেন। আরেকজন জানালেন মাকামে সাইয়েদুল ইবরাহীমের পাশে বসে তিনি জনাব মুজাহিদের জন্য সেজদায় পড়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করছেন। কেউবা ওমরা পালন করছেন এবং তার জন্য দোয়া করছেন। পবিত্র মদীনা নগরী থেকে একজন ফোন করে বললেন, তিনি এখন মসজিদুন নববীতে। রিয়াজুল জান্নাহ নামক স্থানে বসে তিনি আল্লাহর কাছে দু'হাত তুলে জনাব মুজাহিদের জন্য কান্নাকাটি করছেন। আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতারসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের বুক ফাটা আর্তনাদ ও হাহাকারের খবর আসছে। এ প্রিয় মানুষটিকে হত্যা করে সরকার মূলত প্রতিটি মানুষের কলিজায় আঘাত করেছে।
জনাব মুজাহিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলাটি বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর নিকট একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকারি ষড়যন্ত্র ফাঁস হওয়ায় দিশেহারা হয়ে সরকার তাঁর মত্যুদণ্ড দ্রুত কার্যকরের জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। ফেইসবুকসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক মিডিয়া বন্ধ করে দেয়। যাতে মানুষ সরকারের কুকর্ম জানতে না পারে। সারা দেশে চলতে থাকে ব্যাপক ধরপাকড়। পরিবারের সদস্যগণ এ পরিস্থিতিতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জনাব মুজাহিদের সাথে সাক্ষাতের জন্য ছুটে যান। কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পরিবারের সদস্যগণ তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সাক্ষাৎকালে ও মত্যুদন্ড কার্যকরের পূর্বে পরিবারের সাথে শেষ সাক্ষাতে জনাব মুজাহিদ যে সব কথা বলেছেন তা যুগ যুগ ধরে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে অনুপ্রাণিত করবে। নিম্নে তার বক্তব্যের কতিপয় দিক তুলে ধরা হলো-
প্রাণভিক্ষার প্রশ্নই আসে না:
জনাব মুজাহিদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন এ জালেম সরকারের নিকট ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। প্রাণের মালিক আল্লাহ। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে আত্মসমর্পণ ও ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া আমি কোন দোষ করিনি। সরকার বিনা দোষে আমাকে ফাঁসি দিচ্ছে। আমি এর বিচারের ভার মহান আল্লাহর ওপর অর্পণ করলাম। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক।
আমি বেঈমান নই-
জনাব মুজাহিদ তার পরিবারের সদস্যদেরকে বলেন, আমি বেঈমান নই। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসী একজন অনুগত বান্দা। আমি দল এবং দেশের প্রতি কখনো বেঈমানী করিনি। আমার ওপর দল যখন যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে আমি তা নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি। আমার দায়িত্ব পালনে কখনো গাফিলতি ছিল না। দলের স্বার্থে যখন যা উত্তম বলে মনে করেছি নির্দ্বিধায় তাই করেছি।
রাষ্ট্র আমার ওপর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করেছিল। আমি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে সে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। কোন ধরনের অসৎ ও অসাধুতা আমার নিকট প্রশ্রয় পায়নি। আমি কোন ধরনের নৈতিকতা বিরোধী কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করিনি। আমার বিরুদ্ধে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দূরবীন দিয়ে তালাশ করেও দুর্নীতির কোন প্রমাণ পেশ করতে পারেনি।
আমার মাথা উঁচুই থাকবে-
পরিবারের সদস্যদের নিকট জনাব মুজাহিদ বলেন, আমি অন্যায়, অসত্য, মিথ্যার নিকট কখনো মাথা নত করিনি। এখনও করব না। আমি মাথা উঁচু করেই মহান রবের দরবারে গিয়ে উপস্থিত হব, ইনশাআল্লাহ।
একটি বিশেষ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ:
জনাব মুজাহিদ বলেন, রাষ্ট্রপতির নিকট প্রাণভিক্ষা চাওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। তবে আমি মনে করি রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক। সেই হিসেবে তিনি আমারও অভিভাবক। আমার ওপর বিগত সাড়ে ৫ বছর যাবত যে সরকারি জুলুম-নির্যাতন এবং অবিচার করা হয়েছে ও বিনা অপরাধে আমাকে সরকারি পরিকল্পনায় যেভাবে ফাঁসানো হয়েছে তার প্রতিকারের জন্য আমি মহামান্য রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ক্ষমা চাওয়ার অপপ্রচার পরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্র:
পরিবারের সদস্যগণ কারা কর্তৃপক্ষের আহবানে জনাব মুজাহিদের সাথে শেষ সাক্ষাতের জন্য গেলে তিনি পরিবারের সদস্যদেরকে জানান আমি রেডিওর খবরের মাধ্যমে অবহিত হয়েছি যে, আমি রাষ্ট্রপতির নিকট ক্ষমা চেয়েছি মর্মে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আমি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করতে চাই, আমি রাষ্ট্রপতির নিকট ক্ষমা চাইনি। জালেম সরকারের নিকট ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমার ওপর অবিচারের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করাটা ক্ষমা চাওয়া হিসেবে যারা প্রচার করেন তারা জঘন্য মিথ্যাচারে নিয়োজিত। এ সরকার বিগত সাড়ে ৫ বছর যাবত আমি ও আমার দলের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালিয়েছে এটা তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। তারা আমাকে আমার দেশের জনগণ ও বিশ্ববাসীর নিকট অসম্মানিত করার জন্য ও আমার দলকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এ অপপ্রচার চালিয়েছে। এটা তাদের রাজনৈতিক দেওলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। এ অপপ্রচারে জনগণ বিভ্রান্ত হবে না। আমার শাহাদাতের পর অপপ্রচারের জন্য জনগণ সরকারকে ধিক্কার জানাবে।
আমি শহীদী মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাই:
শাহাদাত এক মহাসৌভাগ্যের বিষয়। আল্লাহ তায়ালা যাকে পছন্দ করেন তাকেই শহীদী মৃত্যু দেন। সবার ভাগ্যে শাহাদাতের মৃত্যু জোটে না। আল্লাহ তায়ালা যদি আমাকে পছন্দ করেন এবং শহীদী মৃত্যু দেন সে মৃত্যু আলিঙ্গনের জন্য আমি প্রস্তুত আছি। শহীদী মৃত্যু পরকালে আমার জন্য মহাসৌভাগ্য ও মহাপুরস্কারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
আমার রক্ত ইসলামী আন্দোলনকে বেগবান করবে:
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণেই সরকার আমার বিরুদ্ধে এ ষড়যন্ত্র করেছে। আমি ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করার কারণে আমাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যই আমাকে সরকার হত্যা করছে। ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস সাক্ষী শহীদী রক্ত আল্লাহর দীনকে আরো বেগবান করে। আমি বিশ্বাস করি আমার রক্ত এ জমিনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরো মজবুত এবং বেগবান করবে ও ষড়যন্ত্রকারীদের সকল চক্রান্ত বানচাল হয়ে যাবে এবং চক্রান্তকারীরা নির্মূল হয়ে যাবে। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে আল্লাহর দীন বিজয় লাভ করবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ জমিনকে তাঁর দ্বীনের জন্য কবুল করে নিয়েছেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের রক্ত বৃথা যাবে না:
জনাব মুজাহিদ আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে পরিবারের সদস্যদেরকে বলেন, জামায়াত ও ছাত্রশিবির এ জমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত। এত বড় নেয়ামত কখনো হাতছাড়া করা উচিত নয়। তোমরা সবসময়ই এ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে। তিনি আরো বলেন, ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা বিগত ৬ বছর যাবত যে জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তার বদলা আল্লাহ তায়ালা একদিন দিবেন। এই কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় শত শত তরুণ এবং যুবকদেরকে জুলুমের শিকার হতে দেখে আমার মনে এই আশার সৃষ্টি হয়েছে যে, এ জমিনে একদিন এ তরুণদের নেতৃত্বে আল্লাহর দীন বিজয় লাভ করবে, ইনশাআল্লাহ। এতটুকু আশা নিয়ে আমি দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারছি। এ জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া।
আমি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ:
আমি জালেম সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কারারুদ্ধ হওয়ার পর দেশের জনগণ, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের জনতা আমার মুক্তি আন্দোলনে যে ভূমিকা রেখেছেন ও আমার জন্য যে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সে জন্য আমি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সর্বোত্তম বদলা দান করুন। দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন দেশ ও রাষ্ট্র এবং প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিকগণ আমার প্রতি যে সহানভূতি প্রদর্শন করেছেন এবং মামলা পরিচালনায় বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন আমি তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার আইনজীবীগণ রাত-দিন পরিশ্রম করে মামলা মোকাবেলায় যে ভূমিকা পালন করেছেন তাদের সকলের প্রচেষ্টাকে আল্লাহ কবুল করুন এবং সর্বোত্তম বদলা দান করুন।
দেখা হবে জান্নাতে:
জনাব মুজাহিদ বলেন, মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমান ও দৃঢ় এবং অবিচল অবস্থায় আমি যেন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে পারি আমি দেশবাসীর কাছে সে দোয়া চাই। দলীয় ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে আমার আচরণে ও কোন কথায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তা ক্ষমা করে দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আমি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থাশীল হয়ে যেন পরিতৃপ্ত আত্মা নিয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে পারি সে জন্য দেশবাসীর দোয়া চাই। এ জালেম সরকার আমাকে আমার প্রিয় ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। আমি আশা করি কিয়ামতের ময়দানে সকলের সাথে সাক্ষাৎ হবে।
জনাব মুজাহিদ দেশবাসীর প্রতি সালাম জানান ও দোয়া করতে বলেন।
শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একজন কবি। অমর কবি। কালজয়ী কবি। লিখে গিয়েছেন তিনি সাবলীল ভঙ্গীতে রাজনীতির কবিতা, বিপ্লবের কবিতা। একটি আন্দোলন, একটি সংগঠন, একটি ইতিহাস, একটি আপসহীন সংগ্রামের কবিতা। এই ভূখণ্ডে বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম, জাতির উত্থান-পতন, প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামে জনাব মুজাহিদ একটি অকুতোভয় নাম। তিনি আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনার বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। বাংলার জমিনে নাস্তিকতাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের রক্তচক্ষু মোকাবেলা করে তৃণমূল থেকে গড়ে উঠে আসা একজন সংগ্রামী প্রাণপুরুষ। বর্তমান কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার শুধুমাত্র আদর্শিক কারণেই ইসলামী আন্দোলনের এই জনপ্রিয় নেতাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু শহীদদের দুনিয়া থেকে সরানো যায় না। তাঁরা জীবিত। তাদের মৃত্যু নেই। মানুষকে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা দেবার জন্যই জন্ম। ব্যক্তি জীবনে অল্পে তুষ্ট, নির্লোভ, পরোপকারী, দৃঢ়চেতা, সংগ্রামী জননেতা মোহাম্মদ মুজাহিদ খুব অল্প সময়ে ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই জনপদের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। নিজের কর্মতৎপরতায় সদা তৎপর তিনি। তিনি মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার রায় শুনে আইনজীবীদের কাছে বললেন- 'সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শান্তির জন্য আমি মোটেই বিচলিত নই। আমি পত্রিকার মাধ্যমে অবহিত হয়েছি যে, আপিল বিভাগে আমার পক্ষে আইনজীবীরা যথেষ্ট বলিষ্ঠভাবে এবং দৃঢ়তার সাথে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ঐসব মিথ্যা অভিযোগে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করার কোন সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপক্ষ আমার বিরুদ্ধে আনীত কোন অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি। এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালে জেরার সময় স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের কোথাও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত কোন অপরাধের সাথে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। এমনকি আমি আদৌ আল বদর, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল শামস বা এই ধরনের কোন সহযোগী বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম এমন কোন তথ্য তিনি তার তদন্তকালে পাননি। এরপরও আমার মত্যুদণ্ড বহাল। আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি।
আমি আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে বলছি, আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ শতভাগ মিথ্যা ও বানোয়াট। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন সময়ে কোন ধরনের অপরাধের সাথে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধে এত বছর পরে আমার বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অভিযোগ সাজানো হয়েছে।
প্রতিদিন বাংলাদেশে শত শত লোক স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। এসব মত্যুর সাথে ফাঁসির আদেশের কোন সম্পর্ক নেই। কখন, কার, কিভাবে মৃত্যু হবে সেটা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করেন। আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোন সাধ্য কারো নেই। সুতরাং ফাঁসির আদেশে কিছু যায় আসে না। আমি মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার ঘোষণায় উদ্বিগ্ন নই। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল। সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে যে শাস্তির ব্যবস্থা করেছে তার জন্য আমি মোটেই বিচলিত নই।আমি আল্লাহর দ্বীনের উদ্দেশ্যে আমার জীবন কুরবান করার জন্য সব সময় প্রস্তুত আছি।'
জন্ম ও শিক্ষা:
আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। তিনি তার পিতা, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুল আলীর কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। একজন ধর্মীয় নেতা ও আধ্যাত্মিক পুরুষ হিসেবে মাওলানা আব্দুল আলীকে আজও ফরিদপুরসহ গোটা অঞ্চলের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তিনি শুধু ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না বরং জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৬২-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যও (এমপিএ) নির্বাচিত হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে জনাব আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ফরিদপুর ময়জুদ্দিন স্কুলে ভর্তি হন। এরপর তিনি ফরিদপুর জেলা স্কুলে অধ্যয়ন করেন। মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়ালেখা সুসম্পন্ন করার পর তিনি ফরিদপুরে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক ডিগ্রী শেষ করার পর তিনি ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় আগমন করেন। জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাত্র দুই-আড়াই মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ক্লাস করার পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় জনাব মুজাহিদ আর সেখানে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন।
ছাত্র রাজনীতি:
ছাত্রজীবন থেকেই জনাব মুজাহিদ রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। শুরুতে রাজেন্দ্র কলেজে কিছুদিন এনএসএফ এ কাজ করার পর তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে যুক্ত হন। ১৯৭০ এর ডিসেম্বরে তিনি ফরিদপুর থেকে ঢাকায় আগমন করেন। তখন তিনি ফরিদপুর জেলায় ছাত্রসংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। ঢাকায় এসে তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা জেলার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে তিনি ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক সেক্রেটারি (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) মনোনীত হন এবং এর মাত্র দুই মাস পর অক্টোবরে তিনি ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক সভাপতি নির্বাচিত হন।
জামায়াতে যোগদান:
ছাত্রজীবন শেষ করার পরপরই আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮২-১৯৮৯ পর্যন্ত ঢাকা মহানগরী জামায়াতের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন এবং শাহাদাতের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
প্রাথমিক কর্মজীবন:
জনাব আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ তার পেশাগত জীবন শুরু করেন নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে। এর আগে ১৯৭৩-১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই আদর্শ স্কুল প্রতিষ্ঠায় তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। স্কুলের জন্য আর্থিক সংস্থান ও ছাত্র সংগ্রহে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তার ঐকান্তিক চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের কারণে আদর্শ স্কুল আজও নারায়ণগঞ্জ জেলায় সর্বশ্রেষ্ঠ স্কুল হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি নারায়ণগঞ্জের আদর্শ স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে সাংগঠনিক প্রয়োজনে তিনি ঢাকায় স্থানান্তরিত হন। গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দৈনিক সংগ্রামের চেয়ারম্যান এবং সাপ্তাহিক সোনার বাংলার পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গ্রেফতার হওয়ার কিছু দিন পূর্বে তিনি 'রাইজিং সান' নামক একটি ইংরেজি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। পত্রিকাটির ডামি ভার্সন তখন প্রকাশিত হচ্ছিল কিন্তু জনাব মুজাহিদ গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় পত্রিকাটি আজও আলোর মুখ দেখেনি।
জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা:
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বরাবরই দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্র আন্দোলন, ১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে, ১৯৯৪-১৯৯৬ কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, ২০০০ সালে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার আন্দোলন এবং ২০০৭ সালে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর পাশাপাশি, জনগণের মৌলিক সমস্যা ও জাতীয় সমস্যা নিরসনেও তিনি সক্রিয় অবদান রাখেন।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন:
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে ৫ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করেন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালীন তিনি নিন্মোক্ত সরকারি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কমিটিগুলো হচ্ছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, নির্বাহী কমিটি-জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক), জাতীয় নারী উন্নয়ন কাউন্সিল, অর্থনীতি সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি, নারী উন্নয়ন এবং নারী অধিকার বিষয়ক জাতীয় কমিটি, কারা সংস্কার কমিটি, এসিড ও মাদক নিয়ন্ত্রন জাতীয় কমিটি, ক্ষুদ্র ঋণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি, বয়স্ক ভাতা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং কিশোর অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি। সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালীন সময়ে তিনি মাদারীপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সামাজিক কার্যক্রম:
নিঃস্বার্থ একজন সমাজসেবক হিসেবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ব্যাপক সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দেশজুড়ে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং মসজিদ ও এতিমখানা বিনির্মাণে তার সক্রিয় ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তার নিজ জেলা ফরিদপুরে তিনি ৫০ টিরও বেশি মসজিদ নির্মাণে ভূমিকা পালন করেন। দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি এই ব্যাপক সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। মাদরাসা ছাত্রদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণে ২০০২ সালে তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকার ফাজিলকে বিএ সমমানের এবং কামিলকে মাস্টার্স মানে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন ধরনের আর্থ-সামাজিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণেও তার ভূমিকা সক্রিয় ছিল। তার প্রচেষ্টা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে ফরিদপুর ও মাদারীপুরের মত অবহেলিত জেলা দুটিতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। অগণিত রাস্তা, সড়ক ও মহাসড়ক, মাদরাসা, ব্রীজ, কালভার্ট ও মসজিদ সে সময় এই এলাকাগুলোতে নির্মিত হয়। তিনি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় বিভাগীয় সমাজসেবা কেন্দ্র এবং হাজী শরীয়তউল্লাহ ব্রীজ উদ্বোধন করেন।
মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে জনাব মুজাহিদ দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি নিয়মিতভাবেই তার মন্ত্রণালয়ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সারপ্রাইজ ভিজিটে যেতেন। এর মাধ্যমে তিনি মন্ত্রণালয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি কমানোর চেষ্টা করেছেন ও তাতে তিনি অনেকটা সফলও হয়েছেন। তার মেয়াদে তিনি বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলায় ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শিশু সদন (সরকারি এতিমখানা) নির্মাণ করেন, যা সমাজের ভাগ্যাহত ও অনগ্রসর কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করে।
২০০১ সালে যখন জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন সেটি একটি দুর্বল বা লো প্রোফাইল মিনিস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু তার ৫ বছর মেয়াদের শেষে এটি হাই প্রোফাইল তথা আলোচিত মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়। মন্ত্রণালয়ের বাজেট মাত্র ৫ বছরে ৫ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। এগুলো সবই হয় মন্ত্রী হিসেবে তার একনিষ্ঠ ও সফলতার কারণে।
তিনি তার মন্ত্রিত্বের ৫ বছরে ছোট খাট নানা অনুষ্ঠান ছাড়াও ৪০টিরও বেশি আলোচিত প্রোগ্রাম করেন, যেখানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যোগ দেন। তার নেতৃত্বে ২০০৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম প্রতিবন্ধী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি 'মুক্তা' নামক একটি মিনারেল ওয়াটারেরও প্রবর্তন করেন। যা প্রতিবন্ধীদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত এবং বাজারজাতকৃত। তার এই উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশের নাম তখন বিশ্ব দরবারে ভিন্নভাবে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়। তার সময় প্রতিবন্ধী অলিম্পিকেও বাংলাদেশ সফলতা অর্জন করে। এছাড়া তার সময়ে সুদমুক্ত ঋণ ও এসিডদগ্ধদের মধ্যে ব্যপকভাবে ভাতা প্রদান করা হয়। জনাব মুজাহিদ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে ঘুরে নিজে এই ভাতা বিতরণ করতেন। তাই তার সময়ে গ্রামের অভাবী মানুষ সুদখোর মহাজন এবং বেসরকারি সংস্থার হাত থেকে মুক্ত হয়ে সরকারের কাছ থেকে বিশেষত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে ঋণ নিতে শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে এই উন্নয়নমূলক কার্যক্রমগুলো বন্ধ হয়ে যায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে।
প্রকাশনাঃ
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একজন জনপ্রিয় এবং স্বনামধন্য লেখক। তার ৩টি বই ভীষণভাবে পাঠক মহলে সমাদৃত হয়। বইগুলো হলো, আজকের মুসলমান: ইসলামের দাবী, বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতে ইসলামী এবং তুরস্ক সফর। জনাব মুজাহিদ ইসলামী শিক্ষা, আর্থ সামাজিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুর উপরও নিয়মিতভাবে লেখালেখি করেছেন।
ভ্রমণ: জনাব মুজাহিদ ২০টিরও বেশি দেশে ভ্রমণ করেছেন। এই সব দেশে তিনি গণ্যমান্য, প্রভাবশালী এবং ইসলামী নেতৃবৃন্দের সাথেও সাক্ষাৎ করেন। তার ভ্রমণকৃত উল্লেখযোগ্য দেশের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমীরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, জাপান, থাইল্যান্ড এবং তুরস্ক।
বৈবাহিক অবস্থা:
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবর বেগম তামান্না-ই-জাহানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তামান্না-ই-জাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মহানগরী মহিলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তামান্না-ই-জাহান একজন গৃহিণী এবং পড়ুয়া মানসিকতার একজন নারী যিনি নিয়মিতভাবে পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করেন।
জনাব মুজাহিদ ৩ পুত্র ও এক মেয়ে সন্তানের জনক।
শহীদ মুজাহিদের শেষ কথাঃ
আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া। জেল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে তারা এই সাক্ষাতের সুযোগ করে দিয়েছেন। জেল কর্তৃপক্ষ আসলে অসহায়। তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই পর্যন্ত আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন এবং আমার সাথে ভাল ব্যবহার করেছেন। তারা আমাকে একটি লিখিত আবেদনের জন্য যথেষ্ট পীড়াপীড়ি করেন
এবং বলেন এটা না হলে তাদের অসুবিধা হয়ে যাবে। এক পর্যায়ে তারা বলেন, আপনার যা বক্তব্য আছে তাই লিখে দেন। আর সেই কারণেই এটা বলার পর আমি কনসিকুয়েন্স বুঝেও আমি তাদের সুবিধার জন্য একটি লিখিত আবেদন দিয়েছি।
আমি রাষ্ট্রপতিকে লিখেছি, আইসিটি এ্যাক্ট, যদিও এটা অবৈধ ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তারপরেও এই বিচারের সময় আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সীমিত সুযোগ দেয়া হয়েছে। আমার ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইন, সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য ছিল না। সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
আমাকে ট্রাইবুনাল ৬ নং চার্জে মৃত্যুদণ্ড দেয়নি। তারা চার্জ ১ কে চার্জ ৬ এর সাথে মিলিয়ে চার্জ ৬ এ মত্যুদণ্ড দিয়েছে। আপীল বিভাগ আমাকে চার্জ ১ থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। চার্জ ৬ এ তারা আমার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে। অথচ ট্রাইবুনাল শুধু চার্জ ৬ এর জন্য আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়নি।
এই চার্জে স্বাক্ষী মাত্র একজন। সে বলেনি, যে কোন বুদ্ধিজীবিকে আমি হত্যা করেছি। কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারের সন্তানও এসে বলতে পারেনি যে আমি কোন বুদ্ধিজীবিকে মেরেছি। এবং কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারও আমার রায়ের পরও দাবী করেনি যে তারা তার পিতা হত্যার বিচার পেয়েছেন। আমার অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে যে আমি নাকি আর্মী অফিসারদের সাথে বসে পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু যে স্বাক্ষী এসেছে সেও বলেনি যে আমি কবে কোন আর্মি অফিসারের সাথে কোথায় বসে এই পরামর্শ করলাম?
সাক্ষী বলেছে আমাকে, নিজামী সাহেব ও অধ্যাপক গোলাম আযমকে দেখেছে। সে আমাদের চিনতো না। পরে আমাদের নাম শুনেছে। অথচ এই অভিযোগটি গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনাই হয়নি। নিজামী ভাইকে যাবজ্জীবন দিয়ে শুধু আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে আমার মত্যুদণ্ডের রায় কনফার্ম করে। তারপর আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে প্রহসন শুরু করা হয়েছে।
আমাকে আমার পরিবার, সংগঠন ও দেশবাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য, কাপুরুষ প্রমাণ করার জন্য দিনভর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মিথ্যাচারের নাটক করা হয়েছে। এই জালিম সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। আমি নির্দোষ, নির্দোষ এবং নির্দোষ। আমাদের আজ তারা অন্যায়ভাবে হত্যা করতে যাচ্ছে।
কত বড় স্পর্ধা তাদের যে তারা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার দাবী করে। অথচ তাদের নিজেদের ভেতর মানবতা নেই। তারা ঘুমন্ত অবস্থায় একজন মানুষকে মধ্যরাতে তুলে তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে বলে এই তাদের শেষ সাক্ষাত এবং এরপরও তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হবে।
তোমরা শুনে রাখো, আজ যদি আমার ফাঁসি কার্যকর করা হয়, তাহলে তা হবে ঠান্ডা মাথায় একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা। তোমরা প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ো না। তোমাদের কিছুই করতে হবেনা। আজ আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর এই অন্যায় বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকের বিচার আল্লাহর দরবারে শুরু হয়ে যাবে, বিচার শুরু হয়ে গেছে। তোমাদের কারও কিছু করতে হবে না।
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মত এত বড় নেয়ামত দুনিয়াতে আর একটিও নেই। আমার জানামতে এই সংগঠন দুটি পৃথিবীর মধ্যে সেরা সংগঠন। এই সংগঠনের ব্যাপারে আমি সন্তুষ্ট। গত কয়েক বছরে অনেক নেতাকর্মী শহীদ হয়েছে, হাজার হাজার নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, আমার মত জেলখানায় আছে কয়েক হাজার মানুষ। বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবির বিগত ৫ বছরে যে ভূমিকা রেখেছে, যে স্যাক্রিফাইস করেছে তা অতুলনীয়। আমার শাহাদাত এই দেশে ইসলামী আন্দোলনকে সহস্রগুণ বেগবান করবে এবং এর মাধ্যমে জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যারা স্বাক্ষী দিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুইজন ছাড়া বাকি সবাই দরিদ্র। তারা মূলত অভাবের তাড়নায় এবং বিপদে পড়ে মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য হয়েছেন। আমি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলাম, তোমরাও কোন ক্ষোভ রাখবা না।
পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন- তোমরা নামাজের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস থাকবা। তোমরা সব সময় হালাল রুজির উপর থাকবা। কষ্ট হলেও হালাল রুজির উপর থাকবা। আমি ৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম, ফুল কেবিনেট মন্ত্রী ছিলাম। আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে আমি সেখানে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে, পরিশ্রম করে আমার দায়িত্ব পালন করেছি। কেউ আমার ব্যাপারে বলতে পারবে না যে আমি অন্যায় করেছি। অনেক দুর্নীতির মধ্যে থেকেও আমার এই পেটে (নিজের শরীরের দিকে ইংগিত করে) এক টাকার হারামও যায়নি। তোমরাও হালাল পথে থাকবা। তাতে একটু কষ্ট হলেও আল্লাহ বরকত দিবেন।
আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক 'সিলাই রেহীমি'। আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে মিলে মিশে চলবে।
আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই নামাজ পড়বে, অনেকেই কম। কেউ কেউ হালাল উপার্জনের ব্যপারে অত্যধিক কড়া হবে, আবার কেউ কেউ একটু দুর্বল থাকবে। শরীয়তে দুই রকম। আজিমাত এবং রুকসাত। আজিমাত হলো খুবই কড়া, কোন অবস্থাতেই সে হারামের কাছে যাবেনা। আর রুকসাত হলো পরিবেশ ও পরিস্থিতির জন্য একটু ঢিল দেবে। তাই আত্মীয়দের মধ্যে কারও আয়-রোজগারে সমস্যা থাকবে, কারও নামাজে দুবর্লতা থাকবে। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো তাদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য সবার সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে মিলে মিশে চলা। আমি সব সময় এভাবে চলেছি এবং তাতে ভাল ফল পেয়েছি। হাদীসে আছে, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
প্রতিবেশীর হক আদায় করবে। আমার ঢাকার বাসা, ফরিদপুরের বাড়ীর প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে। আমার উত্তরার বাসার ব্যাপারে তো আমি আগেই লিখে দিয়েছি। মৌলিক কোন চেঞ্জ দরকার নেই। শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী মূল ভিত্তি ঠিক রেখে তোমরা সুবিধা মতো এদিক ওদিক চেঞ্জ করে নিও। ফরিদপুরের বাড়ী নিয়েও যেভাবে বলে দিয়েছি, সেভাবেই তোমরা কাজ করবে। আমরা ভাই ভাইদের মধ্যে কোন স স্পত্তি নিয়ে কখনো ঝামেলা হয় নাই। তোমরাও মিলেমিশে থাকবে। এসব নিয়ে কোন সমস্যা করবানা। শান্তির জন্য কাউকে যদি এক হাত ছাড়তেও হয়, তাও কোন ঝামেলা করবেনা, মেনে নিবে।
বেশী বেশী করে রাসূল (সা) এর জীবনী ও সাহাবীদের জীবনী পড়বে। আমি জানি তোমরা পড়েছো, কিন্তু তাও বার বার পড়বে। বিশেষ করে পয়গম্বর-এ-মোহাম্মাদী, মানবতার বন্ধু হযরত মোহাম্মাদ (সা:), সীরাতে সারওয়ারে আলম, সীরাতুন্নবী, সীরাতে ইবনে হিশাম, রাসূলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন। আর সাহাবীদের জীবনীর উপরও ভাল বই আছে। আগে পড়েছো জানি, তাও তোমরা পড়ে নিও। আমি আমার সন্তানদের উপর সন্তুষ্ট। তোমাদের ভূমিকার ব্যাপারে সন্তুষ্ট।
আইনজীবীদেরকে আমার ধন্যবাদ ও দোয়া দেবে। তারা অনেক পরিশ্রম করেছেন। তাদের ভূমিকার ব্যাপারে আমি সন্তুষ্ট। আইনজীবীরা যেভাবে পরিশ্রম করেছে, অবিশ্বাস্য। ওনারা যদি টাকা নিতো তাহলে ৫-১০ কোটি টাকার কম হতো না। কিন্তু তারা অলমোস্ট বিনা পয়সায় সাহসিকতার সাথে এই আইনী লড়াই চালিয়ে গেছেন।
আমার জানামতে শহীদের মৃত্যু কষ্টের হয় না। তোমরা দোয়া করবে যাতে আমার মৃত্যু আহসানের সাথে
হয়। আমাকে যেন আল্লাহর ফেরেশতারা পাহারা দিয়ে নিয়ে যান।
মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করতে লর্ড কারলাইলের আহবান
বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করার আহবান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডস এর সদস্য লর্ড কারলাইল। শুক্রবার দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি পুরো বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন, যে বিষয়ে উদ্বেগ দিনের পর দিন বেড়েই চলছে।
মুজাহিদ'র মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের আহ্বান।। অস্বচ্ছ বিচারে প্রকৃত ন্যায়বিচার হয় না-এইচআর ডব্লিউ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড অবিলম্বে স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি এই দু'জনের মামলার 'স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনারও' দাবি জানিয়েছে।
এই মামলায় মৃত্যুদণ্ড আরোপ সমর্থনযোগ্য নয় -স্টিফেন র্যাপ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এ্যাম্বাসেডর এট লার্জ (যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক দূত) স্টিফেন জে র্যাপ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মত্যুদণ্ডের শাস্তি কমাতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ না হওয়া পর্যন্ত অবিলম্বে দণ্ড কার্যকর স্থগিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের বিচার প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কথা তুলে ধরে এক বিবৃতিতে সরকারের প্রতি তিনি এ আহ্বান জানান।
মাথা উঁচু করে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হলেন
শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ
বিশ্বের অগণিত মানুষের বুক ফাটা আর্তনাদ, কান্না ও চোখের পানিতে বুক সিক্ত করার মধ্য দিয়ে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে পাড়ি জমালেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক মন্ত্রী বিশ্বনন্দিত নেতা জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদে আম শহীদ হাসানুল বান্নার পর এমন উঁচু পর্যায়ের নেতা পৃথিবীর আর কোথাও রাষ্ট্রযন্ত্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে শাহাদাতবরণ করেননি। জনাব মুজাহিদ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম নেতা। তাঁর রক্তে রঞ্জিত হল বাংলাদেশের সবুজ জমিন। মহান আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী বান্দা হিসেবে মাথা উঁচু করে তিনি তাঁর রবের একত্ববাদের ঘোষণা দিতে দিতে এ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে ২২ নভেম্বরের সূচনায় ৫৫ মিনিটে জান্নাতের পথে যাত্রা শুরু করেন।
প্রায় ৫ বছর ৫ মাসের বন্দী জীবনে তিনি পরিবার, দল ও সাধারণ মানুষ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। ছিলেন। এ পরিস্থিতিতে তার সান্নিধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ এক মহা সৌভাগ্যের বিষয়। আল্লাহ তায়ালা আমাকে সেই সৌভাগ্য দান করেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক তাঁর আপীল খারিজ হয়ে যাওয়ার পরে এবং পূর্বে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে গিয়েছেন। মামলা পরিচালনার সুবাদে দেশের রাজনীতি, সামাজিক অবস্থা, তিনি যে দল করতেন সে দলের সাংগঠনিক অবস্থা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে সব কথা বার্তা বলেছেন তা এ দেশের মানুষের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। অত্যন্ত স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন চিন্তা এবং অনাড়ম্বর জীবনের অধিকারী মুজাহিদ ভাই সবসময় নিজের মত করেই সবকিছু দেখতে অভ্যস্থ ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইতিবাচক। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আশাবাদী একজন মানুষ। দুশমন ক্ষতি করতে পারে এ ভাবনা কখনো তাঁর মনে ছিল না। মানবিকতা সবসময় তার অন্তরকে তাড়িত করতো। তিনি নেতিবাচক চিন্তাকে কখনো পাত্তা দিতেন না। সবসময় কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কোথাও কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে তা শক্তভাবে ধরতেন। আর এ জন্য অনেকের কাছেই তিনি একজন কঠোর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন সরল মনের অধিকারী।
জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বদাই এক আলোচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে তাঁর নাম কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মানবতার মুক্তি আন্দোলনে তিনি আপোষহীন ভূমিকা পালন করেছেন। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের স্বার্থের চাইতে দল এবং দেশের স্বার্থই ছিল তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরো স্মরণীয় হয়ে থাকবেন- তার বিরুদ্ধে। সরকারি ষড়যন্ত্র ও তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার কারণে। তাঁর বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল তা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ নেই। বিনা অভিযোগে একজন মানুষকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা ইতিহাসে নজিরবিহীন। জনাব মুজাহিদ সরকারি ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত এবং প্রতিহিংসার নির্মম শিকার হয়ে তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি কত বড় মজলুম। বাংলাদেশের জনগণের মনের মণিকোঠায় তিনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন। রাষ্ট্রীয় অবিচারের ঘটনা অবহিত হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর প্রতি আরো শ্রদ্ধাশীল হবে। আর ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যার পরিকল্পনাকারীদেরকে ধিক্কার এবং নিন্দা জানাবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁকে মত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে তিনি মহামান্য সুপ্রীম কোর্টে আপীল করেছিলেন। তাঁর আপীল খারিজ হয়ে যাবার পর তিনি রায়ের গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটিসমূহ উল্লেখ করে রিভিউ পিটিশন দায়ের করেছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত জনাব মুজাহিদের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন। এ আদেশের পর রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেল গণমাধ্যমে প্রদত্ত বক্তব্যে স্বীকার করেছেন, জনাব মুজাহিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ নেই। এটর্নি জেনারেলের বক্তব্য থেকে আরো স্পষ্ট হয় যে, শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হওয়ার কারণেই জনাব মুজাহিদকে এ শাস্তি দেয়া হয়েছে। আইনী বিবেচনায় তিনি নির্দোষ।
রিভিউ খারিজের সংবাদ দ্রুততার সাথে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ইসলামপ্রিয় জনতার মাঝে ব্যাপক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। দেশ-বিদেশ থেকে অবিরতভাবে টেলিফোন আসতে থাকে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীগণ বেদনাহত হয়ে পড়েন।
পবিত্র মক্কা নগরী থেকে কয়েক জন টেলিফোন করলেন। তারা জানালেন এ মুহূর্তে তারা খানায়ে কা'বায় তাওয়াফরত অবস্থায় আছেন এবং জনাব মুজাহিদের জন্য কাবা শরীফের গেলাফ ধরে বিশ্ব প্রভুর দরবারে দোয়া করছেন। আরেকজন জানালেন মাকামে সাইয়েদুল ইবরাহীমের পাশে বসে তিনি জনাব মুজাহিদের জন্য সেজদায় পড়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করছেন। কেউবা ওমরা পালন করছেন এবং তার জন্য দোয়া করছেন। পবিত্র মদীনা নগরী থেকে একজন ফোন করে বললেন, তিনি এখন মসজিদুন নববীতে। রিয়াজুল জান্নাহ নামক স্থানে বসে তিনি আল্লাহর কাছে দু'হাত তুলে জনাব মুজাহিদের জন্য কান্নাকাটি করছেন। আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতারসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের বুক ফাটা আর্তনাদ ও হাহাকারের খবর আসছে। এ প্রিয় মানুষটিকে হত্যা করে সরকার মূলত প্রতিটি মানুষের কলিজায় আঘাত করেছে।
জনাব মুজাহিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলাটি বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর নিকট একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকারি ষড়যন্ত্র ফাঁস হওয়ায় দিশেহারা হয়ে সরকার তাঁর মত্যুদণ্ড দ্রুত কার্যকরের জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। ফেইসবুকসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক মিডিয়া বন্ধ করে দেয়। যাতে মানুষ সরকারের কুকর্ম জানতে না পারে। সারা দেশে চলতে থাকে ব্যাপক ধরপাকড়। পরিবারের সদস্যগণ এ পরিস্থিতিতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জনাব মুজাহিদের সাথে সাক্ষাতের জন্য ছুটে যান। কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পরিবারের সদস্যগণ তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সাক্ষাৎকালে ও মত্যুদন্ড কার্যকরের পূর্বে পরিবারের সাথে শেষ সাক্ষাতে জনাব মুজাহিদ যে সব কথা বলেছেন তা যুগ যুগ ধরে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে অনুপ্রাণিত করবে। নিম্নে তার বক্তব্যের কতিপয় দিক তুলে ধরা হলো-
প্রাণভিক্ষার প্রশ্নই আসে না:
জনাব মুজাহিদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন এ জালেম সরকারের নিকট ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। প্রাণের মালিক আল্লাহ। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে আত্মসমর্পণ ও ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া আমি কোন দোষ করিনি। সরকার বিনা দোষে আমাকে ফাঁসি দিচ্ছে। আমি এর বিচারের ভার মহান আল্লাহর ওপর অর্পণ করলাম। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক।
আমি বেঈমান নই-
জনাব মুজাহিদ তার পরিবারের সদস্যদেরকে বলেন, আমি বেঈমান নই। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসী একজন অনুগত বান্দা। আমি দল এবং দেশের প্রতি কখনো বেঈমানী করিনি। আমার ওপর দল যখন যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে আমি তা নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি। আমার দায়িত্ব পালনে কখনো গাফিলতি ছিল না। দলের স্বার্থে যখন যা উত্তম বলে মনে করেছি নির্দ্বিধায় তাই করেছি।
রাষ্ট্র আমার ওপর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করেছিল। আমি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে সে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। কোন ধরনের অসৎ ও অসাধুতা আমার নিকট প্রশ্রয় পায়নি। আমি কোন ধরনের নৈতিকতা বিরোধী কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করিনি। আমার বিরুদ্ধে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দূরবীন দিয়ে তালাশ করেও দুর্নীতির কোন প্রমাণ পেশ করতে পারেনি।
আমার মাথা উঁচুই থাকবে-
পরিবারের সদস্যদের নিকট জনাব মুজাহিদ বলেন, আমি অন্যায়, অসত্য, মিথ্যার নিকট কখনো মাথা নত করিনি। এখনও করব না। আমি মাথা উঁচু করেই মহান রবের দরবারে গিয়ে উপস্থিত হব, ইনশাআল্লাহ।
একটি বিশেষ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ:
জনাব মুজাহিদ বলেন, রাষ্ট্রপতির নিকট প্রাণভিক্ষা চাওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। তবে আমি মনে করি রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক। সেই হিসেবে তিনি আমারও অভিভাবক। আমার ওপর বিগত সাড়ে ৫ বছর যাবত যে সরকারি জুলুম-নির্যাতন এবং অবিচার করা হয়েছে ও বিনা অপরাধে আমাকে সরকারি পরিকল্পনায় যেভাবে ফাঁসানো হয়েছে তার প্রতিকারের জন্য আমি মহামান্য রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ক্ষমা চাওয়ার অপপ্রচার পরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্র:
পরিবারের সদস্যগণ কারা কর্তৃপক্ষের আহবানে জনাব মুজাহিদের সাথে শেষ সাক্ষাতের জন্য গেলে তিনি পরিবারের সদস্যদেরকে জানান আমি রেডিওর খবরের মাধ্যমে অবহিত হয়েছি যে, আমি রাষ্ট্রপতির নিকট ক্ষমা চেয়েছি মর্মে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আমি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করতে চাই, আমি রাষ্ট্রপতির নিকট ক্ষমা চাইনি। জালেম সরকারের নিকট ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমার ওপর অবিচারের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করাটা ক্ষমা চাওয়া হিসেবে যারা প্রচার করেন তারা জঘন্য মিথ্যাচারে নিয়োজিত। এ সরকার বিগত সাড়ে ৫ বছর যাবত আমি ও আমার দলের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালিয়েছে এটা তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। তারা আমাকে আমার দেশের জনগণ ও বিশ্ববাসীর নিকট অসম্মানিত করার জন্য ও আমার দলকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এ অপপ্রচার চালিয়েছে। এটা তাদের রাজনৈতিক দেওলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। এ অপপ্রচারে জনগণ বিভ্রান্ত হবে না। আমার শাহাদাতের পর অপপ্রচারের জন্য জনগণ সরকারকে ধিক্কার জানাবে।
আমি শহীদী মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাই:
শাহাদাত এক মহাসৌভাগ্যের বিষয়। আল্লাহ তায়ালা যাকে পছন্দ করেন তাকেই শহীদী মৃত্যু দেন। সবার ভাগ্যে শাহাদাতের মৃত্যু জোটে না। আল্লাহ তায়ালা যদি আমাকে পছন্দ করেন এবং শহীদী মৃত্যু দেন সে মৃত্যু আলিঙ্গনের জন্য আমি প্রস্তুত আছি। শহীদী মৃত্যু পরকালে আমার জন্য মহাসৌভাগ্য ও মহাপুরস্কারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
আমার রক্ত ইসলামী আন্দোলনকে বেগবান করবে:
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণেই সরকার আমার বিরুদ্ধে এ ষড়যন্ত্র করেছে। আমি ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করার কারণে আমাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যই আমাকে সরকার হত্যা করছে। ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস সাক্ষী শহীদী রক্ত আল্লাহর দীনকে আরো বেগবান করে। আমি বিশ্বাস করি আমার রক্ত এ জমিনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরো মজবুত এবং বেগবান করবে ও ষড়যন্ত্রকারীদের সকল চক্রান্ত বানচাল হয়ে যাবে এবং চক্রান্তকারীরা নির্মূল হয়ে যাবে। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে আল্লাহর দীন বিজয় লাভ করবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ জমিনকে তাঁর দ্বীনের জন্য কবুল করে নিয়েছেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের রক্ত বৃথা যাবে না:
জনাব মুজাহিদ আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে পরিবারের সদস্যদেরকে বলেন, জামায়াত ও ছাত্রশিবির এ জমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত। এত বড় নেয়ামত কখনো হাতছাড়া করা উচিত নয়। তোমরা সবসময়ই এ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে। তিনি আরো বলেন, ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা বিগত ৬ বছর যাবত যে জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তার বদলা আল্লাহ তায়ালা একদিন দিবেন। এই কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় শত শত তরুণ এবং যুবকদেরকে জুলুমের শিকার হতে দেখে আমার মনে এই আশার সৃষ্টি হয়েছে যে, এ জমিনে একদিন এ তরুণদের নেতৃত্বে আল্লাহর দীন বিজয় লাভ করবে, ইনশাআল্লাহ। এতটুকু আশা নিয়ে আমি দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারছি। এ জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া।
আমি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ:
আমি জালেম সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কারারুদ্ধ হওয়ার পর দেশের জনগণ, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের জনতা আমার মুক্তি আন্দোলনে যে ভূমিকা রেখেছেন ও আমার জন্য যে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সে জন্য আমি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সর্বোত্তম বদলা দান করুন। দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন দেশ ও রাষ্ট্র এবং প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিকগণ আমার প্রতি যে সহানভূতি প্রদর্শন করেছেন এবং মামলা পরিচালনায় বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন আমি তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার আইনজীবীগণ রাত-দিন পরিশ্রম করে মামলা মোকাবেলায় যে ভূমিকা পালন করেছেন তাদের সকলের প্রচেষ্টাকে আল্লাহ কবুল করুন এবং সর্বোত্তম বদলা দান করুন।
দেখা হবে জান্নাতে:
জনাব মুজাহিদ বলেন, মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমান ও দৃঢ় এবং অবিচল অবস্থায় আমি যেন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে পারি আমি দেশবাসীর কাছে সে দোয়া চাই। দলীয় ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে আমার আচরণে ও কোন কথায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তা ক্ষমা করে দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আমি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থাশীল হয়ে যেন পরিতৃপ্ত আত্মা নিয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে পারি সে জন্য দেশবাসীর দোয়া চাই। এ জালেম সরকার আমাকে আমার প্রিয় ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। আমি আশা করি কিয়ামতের ময়দানে সকলের সাথে সাক্ষাৎ হবে।
জনাব মুজাহিদ দেশবাসীর প্রতি সালাম জানান ও দোয়া করতে বলেন।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍