শহীদ শাহাব উদ্দিন রিপন
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ মো. শাহাব উদ্দিন রিপন
পূর্ণ নাম: মোঃ শাহাব উদ্দিন রিপন
পিতার নাম: মো. রফিকুল্লাহ, বয়স- ৬২, পেশা- কৃষি
মাতার নাম: সাবাজজান বেগম, বয়স- ৫৫, পেশা- গৃহিণী
ঠিকানা: গ্রাম+পোস্ট: ছাতনী, থানা+জেলা: নাটোর
সর্বশেষ পড়ালেখা: ক্রপ সায়েন্স (মাস্টার্স), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
দায়িত্ব: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সাংগঠনিক মান: সদস্য
গ্রেফতার: ০৫ জানুয়ারি ২০১৫
গ্রেফতারের স্থান: ইমাদপুর, কাটাখালি, রাজশাহী
শাহাদাতের তারিখ: ৬ জানুয়ারি ২০১৫
শাহাদাতের স্থান: অজ্ঞাত স্থান
লাশ হাসপাতালে হস্তান্তর: রাত ১.০০
পূর্ণ নাম: মোঃ শাহাব উদ্দিন রিপন
পিতার নাম: মো. রফিকুল্লাহ, বয়স- ৬২, পেশা- কৃষি
মাতার নাম: সাবাজজান বেগম, বয়স- ৫৫, পেশা- গৃহিণী
ঠিকানা: গ্রাম+পোস্ট: ছাতনী, থানা+জেলা: নাটোর
সর্বশেষ পড়ালেখা: ক্রপ সায়েন্স (মাস্টার্স), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
দায়িত্ব: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সাংগঠনিক মান: সদস্য
গ্রেফতার: ০৫ জানুয়ারি ২০১৫
গ্রেফতারের স্থান: ইমাদপুর, কাটাখালি, রাজশাহী
শাহাদাতের তারিখ: ৬ জানুয়ারি ২০১৫
শাহাদাতের স্থান: অজ্ঞাত স্থান
লাশ হাসপাতালে হস্তান্তর: রাত ১.০০
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সন্ধ্যা প্রায় ৭ টায় রাজশাহী কাটাখালি বাজারে মটর সাইকেলে থাকা অবস্থায় শাহাব উদ্দিনসহ রাবির ৩ জন ছাত্রনেতাকে মতিহার থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে.. পরে দু'পায়ের হাঁটুতে গুলি ও অমানবিক নির্যাতনে শাহাব উদ্দিন শাহাদাত বরণ করেন শহীদের লাশসহ অপর ২ জনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাত প্রায় ২ টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘাতক পুলিশ রেখে যায়..
শহীদের পরিচিতি
শহীদ শাহাব উদ্দিন নাটোর জেলার সদর থানার ছাতনী স্কুল পাড়া গ্রামের ২৯ আগস্ট, ১৯৯০ জন্ম গ্রহণ করেন। ৩ বোন ১ ভাইয়ের মধ্যে সে ছিলো পিতা-মাতার ৩য় সন্তান। সদা হাস্যোজ্জ্বল শহীদ শাহাব উদ্দিন ইসলামী আন্দোলনকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাই আন্দোলনের কাজে তাকে সদা তৎপর দেখা যেত। মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার, একজন ভাল ছাত্র এবং উত্তম চরিত্রের দিক থেকে শহীদ শাহাব উদ্দিন ছিলেন সবার নিকট অত্যন্ত অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। শাহাদাতের সময় তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার গবেষণা ও তথ্য সম্পাদক ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মোঃ শাহাব উদ্দিন, হবিবুর হল সভাপতি মোঃ হাবিবুর রহমান এবং বিনোদপুর আবাসিক সভাপতি মফিজুর রহমান বন্ধুর বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে মটর সাইকেলে চড়ে ফেরার পথে কাটাখালি পৌরসভার সামনে পুলিশ তাদের গতিরোধ করে গ্রেফতার করে। পরে পুলিশ শাহাব উদ্দিনকে অমানুষিক নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করে।
শাহাদাতের পূর্বের ঘটনা:
শহীদের সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস ছিল "আমরা নীরব হব না, নিস্তব্ধ হব না যত দিন না আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব"। মহান রবের দরবারে সবসময় শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করতেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রচলিত নির্বাচনী ব্যবস্থাকে তছনছ করে এক প্রহসনের মাধ্যমে দেশের জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে সম্পূর্ণ গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করে আওয়ামী লীগ। গত ৫ জানুয়ারি বিরোধী দলগুলো এটাকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস আখ্যায়িত করে সমাবেশের ঘোষণা দেয়। বালুর ট্রাক দিয়ে আটকে দেয়া হয় ২০ দলীয় জোটের নেত্রী খালেদা জিয়াকে। কিন্তু বালুর ট্রাক দিয়েতো আর সারা বাংলাদেশ আটকানো সম্ভব নয়। ফুঁসে ওঠে সাধারণ মানুষ। প্রতিবাদমুখর এই মানুষের ওপর শুরু হয় সন্ত্রাস দমনের নামে নিষ্ঠুর সরকারি দমনাভিযান যা সব পাষণ্ডতাকে হার মানিয়েছে। গুম, খুন, গণহত্যা, গণগ্রেফতার, রিমান্ড, কারানির্যাতন, বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, পেট্রোলবোমা সন্ত্রাস, মহিলা ও শিশুদের ওপর হামলা, ক্রসফায়ারের নামে মেধাবী ছাত্রহত্যার মাধ্যমে সারাদেশে সৃষ্টি হয়েছে এক মানবিক বিপর্যয়।
২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারির পর থেকে নতুন আকার ধারণ করে। মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে সারাদেশে শুরু হয় সাঁড়াশি গণগ্রেফতার। বাসা-বাড়ি, দোকান, অফিস, রাস্তা-ঘাট, যেখানেই পাওয়া যাচ্ছে গ্রেফতার করা হচ্ছে নির্বিচারে- শুধু তাই নয়, দেড় মাসে বিরোধী দলের প্রায় ২৫ হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর ৮ শতাধিক মিথ্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় ৮ লাখের অধিক নেতাকর্মীসহ নিরীহ মানুষকে। গ্রেফতার হয়েছে ২০ হাজারের বেশি, আর বাকিরা পলাতক অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কারাগারগুলোতে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন অনেকে। গ্রেফতারকৃত অনেককে আবার অত্যন্ত ভয়ঙ্করভাবে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করছে খোদ আইন শৃঙ্খলাবাহিনী।
এখন পাল্টে গেছে 'ক্রসফায়ার' ও 'বন্দুকযুদ্ধের' ধরন। আগে যেখানে পেশাদার সন্ত্রাসীরা নিহত হতো, এখন সেখানে নিহত হচ্ছেন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। এবং একই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকা রাজনৈতিক নেতাকর্মীর 'গাড়িচাপায়' নিহতের অবাস্তব দাবি করা হচ্ছে।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মোঃ শাহাব উদ্দিন, হবিবুর হল সভাপতি মোঃ হাবিবুর রহমান এবং বিনোদপুর আবাসিক সভাপতি মফিজুর রহমান বন্ধুর বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে মটর সাইকেল করে ফেরার পথে কাটাখালি পৌরসভার সামনে পুলিশ তাদের গতিরোধ করে গ্রেফতার করে। পরে পুলিশ শাহাব উদ্দিনকে অমানুষিক নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় অপর দুইজনকেও গুলিবিদ্ধ করে আহত করে।
পরিবারের একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে এখন প্রায় পাগল হয়ে গেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্সে মাস্টার্সে পড়ুয়া নিহত মেধাবী ছাত্রশিবির নেতা শাহাব উদ্দিনের বাবা, মা ও তিন বোন। ছেলের জানাযা পূর্ব সমাবেশে শাহাব উদ্দিনের পিতা রফিকুল্লাহ চিৎকার করতে করতে বলেছেন, ইয়া আল্লাহ! আমার ছেলে যদি কোন অপরাধ করে থাকে তুমি তার বিচার কর, আর যদি আমার ছেলে অপরাধ না করে থাকে তাহলে। নির্মমভাবে নির্যাতনের পর যারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে তাদের উপযুক্ত বিচার কর। আমি তোমার দরবারে এর ন্যায় বিচারের প্রার্থনা করছি। নাটোর সদর উপজেলার ছাতনী গ্রামের নিহত ছাত্রনেতা শাহাব উদ্দিনের বাড়ির পাশে অনুষ্ঠিত শনিবার রাতের বিশাল জানাযা পূর্ব সমাবেশে স্থানীয় জামায়াত ও ছাত্রশিবির নেতা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বক্তব্যের পর শাহাব উদ্দিনের বাবার এমন বক্তব্যে উপস্থিত সকলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। শনিবার দুপুরে তাদের বাড়ি গেলে তার পরিবারের সদস্যরা বলেন, তারা মনে করতেন আর কয়েকদিন পর শাহাব উদ্দিনের লেখাপড়া শেষ। পড়ালেখা শেষে দরিদ্র কৃষক বাবার একমাত্র ছেলে পরিবারের দায়িত্ব নিবে, ভালো কোন চাকরি করবে। সংসারের অভাব অনটন টানা পোড়েন দূর হবে। কিন্তু তাদের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫) রাতে রাজশাহীর কাটাখালি পৌরসভার সামনে থেকে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা শাহাব উদ্দিনকে তার দুই বন্ধুসহ আটক করে। পরে শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে তারা জানতে পারেন শাহাব উদ্দিনেরা তিন বন্ধুই গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে শাহাব উদ্দিন মারা গেছে বাকী দুজন আটক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পরে লাশ এনে দেখতে পান লাশের দুই পা একেবারে থেঁতলে মাংস খসে খসে পড়ছে, ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে দুই হাঁটু ও পায়ের গিড়া। নির্মম নির্যাতনের পর পা ও বুকে গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে।
আপনজনদের কথা
মা-বাবা: ইসলামী আন্দোলনের জন্যই আমি আমার সন্তানকে হারিয়েছি। আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে সবর করছি। আমরা আজ গর্বিত যে, আল্লাহ আমাদেরকে শহীদ পরিবার হিসাবে কবুল করেছেন। আপনাদের সার্বিক সহযোগিতা যেন থাকে আল্লাহর দরবারে সেই দোয়া করছি আমাদের ছেলে কোন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল না, সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো, কুরআন-হাদীস পড়তো, আল্লাহ যেন আমাদের আদরের নয়নমণিকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেন। যারা আমার একমাত্র সন্তানকে হত্যা করেছে তাদের বিচার চাই। শাহাব উদ্দিনের বাবা এ সময় জানতে চান আমার ছেলে কি অপরাধ করেছে বা দেশের কোন অপকর্মের সাথে জড়িত ছেলের হত্যাকারীদের তা প্রকাশ করার জন্যও তিনি দাবি জানান।
শাহাব উদ্দিনের তিন বোন রহিমা, রেবেকা ও রেহেনা খাতুন জানায়, তাদের একমাত্র ভাই ছিল বড় আদরের ধন। তাকে এই বয়সে এমন নির্মমভাবে পিটিয়ে থেঁতলে হত্যা করা হয়েছে- ভাবলে সকলে এক সাথে মরে যেতে ইচ্ছে করে। তারাও এর ন্যায় বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
শাহাব উদ্দিনের গ্রাম ছাতনীর বেশির ভাগ মানুষ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এ গ্রামের কোন মানুষের শাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। সে কোন খারাপ কাজের সাথে জড়িত থাকতে পারে গ্রামের মানুষ এমনটা বিশ্বাসও করে না। তবে তারা জানে শাহাব উদ্দীন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে হঠাৎ করে নামাজি হয়ে ওঠে। পরে তারা জানতে পারে সে ছাত্রশিবির করে।
অনলাইন এক্টিভিস্ট -Aman Abduhu লিখেছেন- "আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশের সাথে দুর্বৃত্তদের গুলিবিনিময়ের সময় ক্রসফায়ারে নিহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহাব উদ্দিনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহের ছবিটা বেশ কিছুক্ষণ দেখলাম।
মৃত্যুর আগে তার উপর পুলিশের চালানো নির্যাতনের বিষয়টা এ ছবি থেকে কিছুটা অনুমান করা যায়। মৃতদেহের কথা বলার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তার ছবি কথা বলছে। শিয়াল বা কুকুর যেভাবে মৃতদেহ খুবলে খায়, শাহাব উদ্দিনের শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ওভাবে চামড়া মাংস হাড্ডি পর্যন্ত খামচে আঁচিয়ে তুলে নেয়া হয়েছে। ট্রাকের নিচে পড়ে মারা যাওয়া মৃতদেহ দেখেছি। কিন্তু এতটা ভাঙ্গাচোরা হয়ে যায়নি সে মৃতদেহ তার উপর দিয়ে ভারী ট্রাক চলে যাওয়ার পরও।
শাহাব উদ্দিনের হাত পা বেঁকে অস্বাভাবিকভাবে সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে আছে। মানুষের শরীরের হাড়গুলো জোড়া থাকার কারণে দৈর্ঘ্যে প্রলম্বিত হয়ে থাকে। শাহাব উদ্দিনের শরীর যেন দুইদিকে ছড়িয়ে গেছে। মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে ঘিরে কৃষ্ণপদ রায় এবং উত্তম কুমারদের বিভৎস আনন্দ-উৎসব নিঃসন্দেহে বড় ভয়ঙ্ককর ছিলো। তার শরীরের হাড্ডিগুলো ভেঙ্গে ফেলে ইচ্ছামতো মেরে ভেঙ্গে শেষ পর্যন্ত মারা যাওয়ার পর চামড়ার আবরণে দলামোচড়া করে তারা ফেলে গেছে হাসপাতালের মর্গে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোতেও কি নাৎসিরা এতোটা নির্মম নির্যাতন করে মারতো? একাত্তর সালে পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতন কি এতোটা ভয়ঙ্ককর ছিলো? অথবা দুনিয়ার যত স্বৈরাচারের নাম শোনা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে, টর্চার ক্যাম্পগুলোতে এরকম বিভৎস নির্যাতন হয়? মোটরসাইকেল চালিয়ে যেতে থাকা সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষের শরীরকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে মাত্র কয়েক ঘন্টার ভেতরে এরকম বানিয়ে দেয়া যায়? কোন ছবিতে তো এমন আর দেখা যায়নি। বাংলাদেশের র্যাব পুলিশের গর্বিত সদস্যবৃন্দ কর্তৃক পৃথিবীর সব অমানবিক নির্যাতনের নজিরকে হারিয়ে দিয়ে বিজয়ী হওয়ার চ্যাম্পিয়নস ট্রফি শাহাব উদ্দিনের এই ভাঙাচোরা মৃতদেহের ছবি।
গুলি করে মেরে ফেললেই তো হতো। ইন-ফ্যাক্ট প্রতিদিন বহু মানুষকে গুলি করে মারা হচ্ছে। লাশের পরিচয়ও মিলছে না। বেওয়ারিশ। তার সাথে এই নির্যাতন যোগ করার কারণ কি? সম্ভবত তারা মনে করছে এই নির্যাতনের উদাহরণ দেখে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীরা, বিরোধী দলের কর্মীরা ভয়ে পিছু হটবে। আসলেই কি তাই? নির্যাতন চালিয়ে কি মানুষের স্বাধীনতার দাবীকে দমন করা যায়?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা র্যাব পুলিশকে বলেছিলেন যা প্রয়োজন তাই করতে, দায়িত্ব তার। শাহাব উদ্দিনের মৃতদেহ দেখে বুঝা যায় প্রয়োজনীয় কাজগুলো কি এবং কেমন। এই ভাঙাচোরা গুড়ো গুড়ো হয়ে যাওয়া এবং পশুর মতো শরীরের এখানে ওখানে খাবলে খেয়ে নেয়া বিকৃত মৃতদেহের দায়িত্ব নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। গতকাল এক মন্ত্রীর ফেইসবুক পেইজে তার স্নেহময়ী ছবি দেয়া হয়েছে, সাদা চামড়ার নাতিকে কোলে নিয়ে।
আশা করি শাহাব উদ্দিনের জননী নিজের ছেলের ভাঙাচোরা লাশের ছবিটা না দেখে বরং সেই ভাঙচুরের দায়িত্ব নেয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নাতি কোলে স্নেহময়ী ছবি দেখে শোক ভুলে আছেন।"
রাজশাহী নগরীর কাটাখালি পৌরসভার সামনে ৫ই ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত ৯ টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের তথ্য সম্পাদক শাহাব উদ্দিন, হবিবুর হল সভাপতি হাবিব ও বিনোদপুর মেস সভাপতি মফিজকে আটক করে মতিহার থানা ও ডিবি পুলিশ। এরপর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাত ২ টায় তাদেরকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত ডাক্তার শাহাব উদ্দিনকে মৃত ঘোষণা করে।
একজন দায়িত্বশীল বলেন, ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৫, রাত ১০ টার সময় যখন শুনলাম শাহাব উদ্দিন, হাবিব আর মফিজের গ্রেফতারের কথা, তখন মনে মনে শুধু একটা সন্দেহ দানা বাধছিল, হায় আল্লাহ তুমি তাদের মুক্ত করে দাও, না হলে তুলনামূলক ভালো কিছুর ব্যবস্থা কর। রাত ৩.৩০ টার সময় একটা ফোন আসলো গ্রেফতার হওয়া তিন ভাইয়ের মধ্যে একজন শাহাদাতবরণ করেছেন। খবরটা মোটেও বিশ্বাস হচ্ছিল না, তখন আমার পাশে থাকা ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম তথ্যসূত্রটা বিশ্বস্ত কিনা? তিনি বললেন, ধৈর্য ধরেন আর দোয়া করেন। ফজরের নামাজের সময় যখন উঠলাম তখন আমার পাশে ভাইটি হঠাৎ কেঁদে বললো, আমাদের মফিজ ভাই আর নেই!!! এ কথা শোনার পর বিভিন্ন জায়গায় ফোন দিয়ে কনফার্ম হলাম প্রিয় ভাই শাহাব উদ্দিন শাহাদাতবরণ করেছেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, দুপুরে শাহাব উদ্দিন ভাইয়ের সাথে কথা বললাম, ভাই আমার সদস্য সম্মেলনের টাকাটা পুরোপুরি দিতে পারছি না। উনি রাজি হলেন, আর আমাকে বললেন আপনাকে যে কাজটা দিয়েছিলাম তার কী অবস্থা, আমি বললাম ভাই আমি দ্রুত কাজটা করে ফেলব ইনশাআল্লাহ। কাজের জন্য তার দেয়া পেনড্রাইভটা এখন শুধুই স্মৃতি?? সেই কাজটা ছিল, ক্রসফায়ারে শহীদ নূরুল ইসলাম শাহীন ভাইয়ের নিহত হওয়ার পত্রিকা কাটিংগুলো স্ক্যান ইমেজ করে জাতির সামনে তুলে ধরা, আমার দায়িত্ব ছিল হারিয়ে যাওয়া স্ক্যান driver টা ম্যানেজ করে পেনড্রাইভে করে তাকে দিয়ে আসা। তা হয়ত আর তাকে দেয়া হবে না।
একনজরে শহীদ মো. শাহাব উদ্দিন রিপন
পূর্ণ নাম: মোঃ শাহাব উদ্দিন রিপন
পিতার নাম: মো. রফিকুল্লাহ, বয়স- ৬২, পেশা- কৃষি
মাতার নাম: সাবাজজান বেগম, বয়স- ৫৫, পেশা- গৃহিণী
ঠিকানা: গ্রাম+পোস্ট: ছাতনী, থানা+জেলা: নাটোর
সর্বশেষ পড়ালেখা: ক্রপ সায়েন্স (মাস্টার্স), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
দায়িত্ব: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সাংগঠনিক মান: সদস্য
গ্রেফতার: ০৫ জানুয়ারি ২০১৫
গ্রেফতারের স্থান: ইমাদপুর, কাটাখালি, রাজশাহী
শাহাদাতের তারিখ: ৬ জানুয়ারি ২০১৫
শাহাদাতের স্থান: অজ্ঞাত স্থান
লাশ হাসপাতালে হস্তান্তর: রাত ১.০০
শহীদের পরিচিতি
শহীদ শাহাব উদ্দিন নাটোর জেলার সদর থানার ছাতনী স্কুল পাড়া গ্রামের ২৯ আগস্ট, ১৯৯০ জন্ম গ্রহণ করেন। ৩ বোন ১ ভাইয়ের মধ্যে সে ছিলো পিতা-মাতার ৩য় সন্তান। সদা হাস্যোজ্জ্বল শহীদ শাহাব উদ্দিন ইসলামী আন্দোলনকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাই আন্দোলনের কাজে তাকে সদা তৎপর দেখা যেত। মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার, একজন ভাল ছাত্র এবং উত্তম চরিত্রের দিক থেকে শহীদ শাহাব উদ্দিন ছিলেন সবার নিকট অত্যন্ত অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। শাহাদাতের সময় তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার গবেষণা ও তথ্য সম্পাদক ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মোঃ শাহাব উদ্দিন, হবিবুর হল সভাপতি মোঃ হাবিবুর রহমান এবং বিনোদপুর আবাসিক সভাপতি মফিজুর রহমান বন্ধুর বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে মটর সাইকেলে চড়ে ফেরার পথে কাটাখালি পৌরসভার সামনে পুলিশ তাদের গতিরোধ করে গ্রেফতার করে। পরে পুলিশ শাহাব উদ্দিনকে অমানুষিক নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করে।
শাহাদাতের পূর্বের ঘটনা:
শহীদের সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস ছিল "আমরা নীরব হব না, নিস্তব্ধ হব না যত দিন না আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব"। মহান রবের দরবারে সবসময় শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করতেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রচলিত নির্বাচনী ব্যবস্থাকে তছনছ করে এক প্রহসনের মাধ্যমে দেশের জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে সম্পূর্ণ গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করে আওয়ামী লীগ। গত ৫ জানুয়ারি বিরোধী দলগুলো এটাকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস আখ্যায়িত করে সমাবেশের ঘোষণা দেয়। বালুর ট্রাক দিয়ে আটকে দেয়া হয় ২০ দলীয় জোটের নেত্রী খালেদা জিয়াকে। কিন্তু বালুর ট্রাক দিয়েতো আর সারা বাংলাদেশ আটকানো সম্ভব নয়। ফুঁসে ওঠে সাধারণ মানুষ। প্রতিবাদমুখর এই মানুষের ওপর শুরু হয় সন্ত্রাস দমনের নামে নিষ্ঠুর সরকারি দমনাভিযান যা সব পাষণ্ডতাকে হার মানিয়েছে। গুম, খুন, গণহত্যা, গণগ্রেফতার, রিমান্ড, কারানির্যাতন, বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, পেট্রোলবোমা সন্ত্রাস, মহিলা ও শিশুদের ওপর হামলা, ক্রসফায়ারের নামে মেধাবী ছাত্রহত্যার মাধ্যমে সারাদেশে সৃষ্টি হয়েছে এক মানবিক বিপর্যয়।
২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারির পর থেকে নতুন আকার ধারণ করে। মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে সারাদেশে শুরু হয় সাঁড়াশি গণগ্রেফতার। বাসা-বাড়ি, দোকান, অফিস, রাস্তা-ঘাট, যেখানেই পাওয়া যাচ্ছে গ্রেফতার করা হচ্ছে নির্বিচারে- শুধু তাই নয়, দেড় মাসে বিরোধী দলের প্রায় ২৫ হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর ৮ শতাধিক মিথ্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় ৮ লাখের অধিক নেতাকর্মীসহ নিরীহ মানুষকে। গ্রেফতার হয়েছে ২০ হাজারের বেশি, আর বাকিরা পলাতক অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কারাগারগুলোতে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন অনেকে। গ্রেফতারকৃত অনেককে আবার অত্যন্ত ভয়ঙ্করভাবে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করছে খোদ আইন শৃঙ্খলাবাহিনী।
এখন পাল্টে গেছে 'ক্রসফায়ার' ও 'বন্দুকযুদ্ধের' ধরন। আগে যেখানে পেশাদার সন্ত্রাসীরা নিহত হতো, এখন সেখানে নিহত হচ্ছেন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। এবং একই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকা রাজনৈতিক নেতাকর্মীর 'গাড়িচাপায়' নিহতের অবাস্তব দাবি করা হচ্ছে।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মোঃ শাহাব উদ্দিন, হবিবুর হল সভাপতি মোঃ হাবিবুর রহমান এবং বিনোদপুর আবাসিক সভাপতি মফিজুর রহমান বন্ধুর বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে মটর সাইকেল করে ফেরার পথে কাটাখালি পৌরসভার সামনে পুলিশ তাদের গতিরোধ করে গ্রেফতার করে। পরে পুলিশ শাহাব উদ্দিনকে অমানুষিক নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় অপর দুইজনকেও গুলিবিদ্ধ করে আহত করে।
পরিবারের একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে এখন প্রায় পাগল হয়ে গেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্সে মাস্টার্সে পড়ুয়া নিহত মেধাবী ছাত্রশিবির নেতা শাহাব উদ্দিনের বাবা, মা ও তিন বোন। ছেলের জানাযা পূর্ব সমাবেশে শাহাব উদ্দিনের পিতা রফিকুল্লাহ চিৎকার করতে করতে বলেছেন, ইয়া আল্লাহ! আমার ছেলে যদি কোন অপরাধ করে থাকে তুমি তার বিচার কর, আর যদি আমার ছেলে অপরাধ না করে থাকে তাহলে। নির্মমভাবে নির্যাতনের পর যারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে তাদের উপযুক্ত বিচার কর। আমি তোমার দরবারে এর ন্যায় বিচারের প্রার্থনা করছি। নাটোর সদর উপজেলার ছাতনী গ্রামের নিহত ছাত্রনেতা শাহাব উদ্দিনের বাড়ির পাশে অনুষ্ঠিত শনিবার রাতের বিশাল জানাযা পূর্ব সমাবেশে স্থানীয় জামায়াত ও ছাত্রশিবির নেতা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বক্তব্যের পর শাহাব উদ্দিনের বাবার এমন বক্তব্যে উপস্থিত সকলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। শনিবার দুপুরে তাদের বাড়ি গেলে তার পরিবারের সদস্যরা বলেন, তারা মনে করতেন আর কয়েকদিন পর শাহাব উদ্দিনের লেখাপড়া শেষ। পড়ালেখা শেষে দরিদ্র কৃষক বাবার একমাত্র ছেলে পরিবারের দায়িত্ব নিবে, ভালো কোন চাকরি করবে। সংসারের অভাব অনটন টানা পোড়েন দূর হবে। কিন্তু তাদের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫) রাতে রাজশাহীর কাটাখালি পৌরসভার সামনে থেকে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা শাহাব উদ্দিনকে তার দুই বন্ধুসহ আটক করে। পরে শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে তারা জানতে পারেন শাহাব উদ্দিনেরা তিন বন্ধুই গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে শাহাব উদ্দিন মারা গেছে বাকী দুজন আটক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পরে লাশ এনে দেখতে পান লাশের দুই পা একেবারে থেঁতলে মাংস খসে খসে পড়ছে, ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে দুই হাঁটু ও পায়ের গিড়া। নির্মম নির্যাতনের পর পা ও বুকে গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে।
আপনজনদের কথা
মা-বাবা: ইসলামী আন্দোলনের জন্যই আমি আমার সন্তানকে হারিয়েছি। আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে সবর করছি। আমরা আজ গর্বিত যে, আল্লাহ আমাদেরকে শহীদ পরিবার হিসাবে কবুল করেছেন। আপনাদের সার্বিক সহযোগিতা যেন থাকে আল্লাহর দরবারে সেই দোয়া করছি আমাদের ছেলে কোন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল না, সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো, কুরআন-হাদীস পড়তো, আল্লাহ যেন আমাদের আদরের নয়নমণিকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেন। যারা আমার একমাত্র সন্তানকে হত্যা করেছে তাদের বিচার চাই। শাহাব উদ্দিনের বাবা এ সময় জানতে চান আমার ছেলে কি অপরাধ করেছে বা দেশের কোন অপকর্মের সাথে জড়িত ছেলের হত্যাকারীদের তা প্রকাশ করার জন্যও তিনি দাবি জানান।
শাহাব উদ্দিনের তিন বোন রহিমা, রেবেকা ও রেহেনা খাতুন জানায়, তাদের একমাত্র ভাই ছিল বড় আদরের ধন। তাকে এই বয়সে এমন নির্মমভাবে পিটিয়ে থেঁতলে হত্যা করা হয়েছে- ভাবলে সকলে এক সাথে মরে যেতে ইচ্ছে করে। তারাও এর ন্যায় বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
শাহাব উদ্দিনের গ্রাম ছাতনীর বেশির ভাগ মানুষ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এ গ্রামের কোন মানুষের শাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। সে কোন খারাপ কাজের সাথে জড়িত থাকতে পারে গ্রামের মানুষ এমনটা বিশ্বাসও করে না। তবে তারা জানে শাহাব উদ্দীন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে হঠাৎ করে নামাজি হয়ে ওঠে। পরে তারা জানতে পারে সে ছাত্রশিবির করে।
অনলাইন এক্টিভিস্ট -Aman Abduhu লিখেছেন- "আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশের সাথে দুর্বৃত্তদের গুলিবিনিময়ের সময় ক্রসফায়ারে নিহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহাব উদ্দিনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহের ছবিটা বেশ কিছুক্ষণ দেখলাম।
মৃত্যুর আগে তার উপর পুলিশের চালানো নির্যাতনের বিষয়টা এ ছবি থেকে কিছুটা অনুমান করা যায়। মৃতদেহের কথা বলার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তার ছবি কথা বলছে। শিয়াল বা কুকুর যেভাবে মৃতদেহ খুবলে খায়, শাহাব উদ্দিনের শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ওভাবে চামড়া মাংস হাড্ডি পর্যন্ত খামচে আঁচিয়ে তুলে নেয়া হয়েছে। ট্রাকের নিচে পড়ে মারা যাওয়া মৃতদেহ দেখেছি। কিন্তু এতটা ভাঙ্গাচোরা হয়ে যায়নি সে মৃতদেহ তার উপর দিয়ে ভারী ট্রাক চলে যাওয়ার পরও।
শাহাব উদ্দিনের হাত পা বেঁকে অস্বাভাবিকভাবে সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে আছে। মানুষের শরীরের হাড়গুলো জোড়া থাকার কারণে দৈর্ঘ্যে প্রলম্বিত হয়ে থাকে। শাহাব উদ্দিনের শরীর যেন দুইদিকে ছড়িয়ে গেছে। মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে ঘিরে কৃষ্ণপদ রায় এবং উত্তম কুমারদের বিভৎস আনন্দ-উৎসব নিঃসন্দেহে বড় ভয়ঙ্ককর ছিলো। তার শরীরের হাড্ডিগুলো ভেঙ্গে ফেলে ইচ্ছামতো মেরে ভেঙ্গে শেষ পর্যন্ত মারা যাওয়ার পর চামড়ার আবরণে দলামোচড়া করে তারা ফেলে গেছে হাসপাতালের মর্গে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোতেও কি নাৎসিরা এতোটা নির্মম নির্যাতন করে মারতো? একাত্তর সালে পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতন কি এতোটা ভয়ঙ্ককর ছিলো? অথবা দুনিয়ার যত স্বৈরাচারের নাম শোনা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে, টর্চার ক্যাম্পগুলোতে এরকম বিভৎস নির্যাতন হয়? মোটরসাইকেল চালিয়ে যেতে থাকা সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষের শরীরকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে মাত্র কয়েক ঘন্টার ভেতরে এরকম বানিয়ে দেয়া যায়? কোন ছবিতে তো এমন আর দেখা যায়নি। বাংলাদেশের র্যাব পুলিশের গর্বিত সদস্যবৃন্দ কর্তৃক পৃথিবীর সব অমানবিক নির্যাতনের নজিরকে হারিয়ে দিয়ে বিজয়ী হওয়ার চ্যাম্পিয়নস ট্রফি শাহাব উদ্দিনের এই ভাঙাচোরা মৃতদেহের ছবি।
গুলি করে মেরে ফেললেই তো হতো। ইন-ফ্যাক্ট প্রতিদিন বহু মানুষকে গুলি করে মারা হচ্ছে। লাশের পরিচয়ও মিলছে না। বেওয়ারিশ। তার সাথে এই নির্যাতন যোগ করার কারণ কি? সম্ভবত তারা মনে করছে এই নির্যাতনের উদাহরণ দেখে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীরা, বিরোধী দলের কর্মীরা ভয়ে পিছু হটবে। আসলেই কি তাই? নির্যাতন চালিয়ে কি মানুষের স্বাধীনতার দাবীকে দমন করা যায়?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা র্যাব পুলিশকে বলেছিলেন যা প্রয়োজন তাই করতে, দায়িত্ব তার। শাহাব উদ্দিনের মৃতদেহ দেখে বুঝা যায় প্রয়োজনীয় কাজগুলো কি এবং কেমন। এই ভাঙাচোরা গুড়ো গুড়ো হয়ে যাওয়া এবং পশুর মতো শরীরের এখানে ওখানে খাবলে খেয়ে নেয়া বিকৃত মৃতদেহের দায়িত্ব নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। গতকাল এক মন্ত্রীর ফেইসবুক পেইজে তার স্নেহময়ী ছবি দেয়া হয়েছে, সাদা চামড়ার নাতিকে কোলে নিয়ে।
আশা করি শাহাব উদ্দিনের জননী নিজের ছেলের ভাঙাচোরা লাশের ছবিটা না দেখে বরং সেই ভাঙচুরের দায়িত্ব নেয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নাতি কোলে স্নেহময়ী ছবি দেখে শোক ভুলে আছেন।"
রাজশাহী নগরীর কাটাখালি পৌরসভার সামনে ৫ই ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত ৯ টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের তথ্য সম্পাদক শাহাব উদ্দিন, হবিবুর হল সভাপতি হাবিব ও বিনোদপুর মেস সভাপতি মফিজকে আটক করে মতিহার থানা ও ডিবি পুলিশ। এরপর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাত ২ টায় তাদেরকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত ডাক্তার শাহাব উদ্দিনকে মৃত ঘোষণা করে।
একজন দায়িত্বশীল বলেন, ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৫, রাত ১০ টার সময় যখন শুনলাম শাহাব উদ্দিন, হাবিব আর মফিজের গ্রেফতারের কথা, তখন মনে মনে শুধু একটা সন্দেহ দানা বাধছিল, হায় আল্লাহ তুমি তাদের মুক্ত করে দাও, না হলে তুলনামূলক ভালো কিছুর ব্যবস্থা কর। রাত ৩.৩০ টার সময় একটা ফোন আসলো গ্রেফতার হওয়া তিন ভাইয়ের মধ্যে একজন শাহাদাতবরণ করেছেন। খবরটা মোটেও বিশ্বাস হচ্ছিল না, তখন আমার পাশে থাকা ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম তথ্যসূত্রটা বিশ্বস্ত কিনা? তিনি বললেন, ধৈর্য ধরেন আর দোয়া করেন। ফজরের নামাজের সময় যখন উঠলাম তখন আমার পাশে ভাইটি হঠাৎ কেঁদে বললো, আমাদের মফিজ ভাই আর নেই!!! এ কথা শোনার পর বিভিন্ন জায়গায় ফোন দিয়ে কনফার্ম হলাম প্রিয় ভাই শাহাব উদ্দিন শাহাদাতবরণ করেছেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, দুপুরে শাহাব উদ্দিন ভাইয়ের সাথে কথা বললাম, ভাই আমার সদস্য সম্মেলনের টাকাটা পুরোপুরি দিতে পারছি না। উনি রাজি হলেন, আর আমাকে বললেন আপনাকে যে কাজটা দিয়েছিলাম তার কী অবস্থা, আমি বললাম ভাই আমি দ্রুত কাজটা করে ফেলব ইনশাআল্লাহ। কাজের জন্য তার দেয়া পেনড্রাইভটা এখন শুধুই স্মৃতি?? সেই কাজটা ছিল, ক্রসফায়ারে শহীদ নূরুল ইসলাম শাহীন ভাইয়ের নিহত হওয়ার পত্রিকা কাটিংগুলো স্ক্যান ইমেজ করে জাতির সামনে তুলে ধরা, আমার দায়িত্ব ছিল হারিয়ে যাওয়া স্ক্যান driver টা ম্যানেজ করে পেনড্রাইভে করে তাকে দিয়ে আসা। তা হয়ত আর তাকে দেয়া হবে না।
একনজরে শহীদ মো. শাহাব উদ্দিন রিপন
পূর্ণ নাম: মোঃ শাহাব উদ্দিন রিপন
পিতার নাম: মো. রফিকুল্লাহ, বয়স- ৬২, পেশা- কৃষি
মাতার নাম: সাবাজজান বেগম, বয়স- ৫৫, পেশা- গৃহিণী
ঠিকানা: গ্রাম+পোস্ট: ছাতনী, থানা+জেলা: নাটোর
সর্বশেষ পড়ালেখা: ক্রপ সায়েন্স (মাস্টার্স), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
দায়িত্ব: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সাংগঠনিক মান: সদস্য
গ্রেফতার: ০৫ জানুয়ারি ২০১৫
গ্রেফতারের স্থান: ইমাদপুর, কাটাখালি, রাজশাহী
শাহাদাতের তারিখ: ৬ জানুয়ারি ২০১৫
শাহাদাতের স্থান: অজ্ঞাত স্থান
লাশ হাসপাতালে হস্তান্তর: রাত ১.০০
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍