হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মো: রফিকুল ইসলাম
শহীদ মো: রফিকুল ইসলাম

শহীদ মো: রফিকুল ইসলাম

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মো: রফিকুল ইসলাম (০৫১)। পেশা: ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্রশিবিরের কর্মী ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৫.০৩.১৯৯৯ ইং ১৪ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩.০৩.২০১৩ সকাল ১০টা
শাহাদাতের তারিখ: ০৩.০৩.২০১৩, সকাল ৯.৩০ মিঃ শহীদ মো: রফিকুল ইসলাম বুকের বাম পার্শ্বে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন, স্থান: গোদাগাড়ীতে শাহাদাৎ বরণ করেন। শহীদের জানাজা পড়ান জনাব আঃ রাজ্জাক। প্রায় ৬ হাজার লোক উপস্থিত ছিল।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: জোতগোসাইদাস, ডাকঘর: শ্রীমন্তপুর, ইউনিয়ন: গোদাগাড়ী পৌরসভা, উপজেলা: গোদাগাড়ি, জেলা: রাজশাহী।
পিতা। গোলাম মোস্তফা, বয়স প্রায় ৫৫ বছর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন।
মাতা: মাসতারা বেগম, বয়স প্রায় ৪৫ বছর, গৃহিণী।
ভাই-বোনের বিবরণ: ১ম ছেলে। শহিদ মো: রফিকুল ইসলাম, দাখিল ৯ম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন, ২য় ছেলে: ফারুক, দিনমজুর, ৩য় ছেলে। রবিউল ইসলাম, দিন মজুর, ১ম মেয়ে: মোসা: রোজলি বেগম, গৃহিণী। ২য় মেয়ে। শিউলী বেগম, গৃহিণী। ৩য় মেয়ে: মেরিনা, গৃহিণী, ৪র্থ মেয়ে। মোতাহারা, গৃহিণী।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

"আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় রফিকুল কোন ডায়েরি কিনতে পারেনি। কিন্তু তাতে কী, ২০ টাকা মূল্যের চন্দ্রা ডিমাই খাতাতেই সে লিখেছে মানব জীবনের অনেক বড় বড় বাণী। যেমন, জীবনে সফলতা বা সুখ পেতে হলে দুঃখের জ্বালা সহ্য করতে হবে। কথাটি হয়তো খুবই ছোট মাত্র এক বাক্যে, এগারটি শব্দেই শেষ। ফুটপাথেই এমন হাজারো বাণী সম্বলিত বই অহরহ পাওয়া যায়। কিন্তু সাত ভাইবোনের সবার ছোট, অতি আনন্দের সোনালি জীবনের প্রাতে ১৪তম জন্মদিনের মাত্র ১২ দিন আগে এই বাক্যের প্রতি বিশ্বাসের দৃঢ়তায় বলে কয়ে নিজের কলিজা বিলিয়ে দেয়া কি অতই সহজ?"
১. শহীদের পরিচিতি
রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার জোতগোসাইদাস গ্রামে শহীদ মো: রফিকুল ইসলাম ১৯৯৯ইং সনে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা গোলাম মোস্তফা ও মাতা মাসতারা বেগমের তিন ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট এবং খুব আদরের। পিতা ভূসি, গম ইত্যাদির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। অভাবের সংসারে দরিদ্র পিতা-মাতা অর্থাভাবে ছেলেমেয়েদের জন্য পড়ালেখার ভাল কোন ব্যবস্থা করতে পারেননি। বহু কষ্টে চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। যাদের একজন আবার স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্তা। বড় দুই ছেলেকে শত ইচ্ছা সত্ত্বেও পড়াশুনা শেষ করাতে পারেননি। শুধুমাত্র ছোট ছেলে শহীদ মো। রফিকুল ইসলাম লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সবার ছোট এবং পড়ালেখা করছে সব মিলিয়ে তাকে নিয়ে ছিল পিতা-মাতা, ভাইবোনদের অনেক বড় স্বপ্ন। রফিকুলের নিজেরও স্বপ্ন ছিল আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে পিতা-মাতা, সংসার এবং দেশ ও জাতির জন্য অনেক কিছু করবেন। কিন্তু স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের ঘাতক বুলেট তাদের সকলের স্বপ্নকে এক নিমেষেই নিভিয়ে দেয়।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
দিনটি ছিল ৩ মার্চ ২০১৩। সেদিন ছিল আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকে সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। সারাদেশের মত রাজশাহীর গোদাগাড়ীতেও হরতাল সফল করার লক্ষ্যে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও পিকেটিং হয়। তৌহিদি জনতা হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করলে পুলিশ তাতে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে এবং প্রচুর পরিমাণে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এভাবেও তৌহিদী জনতাকে রাস্তা থেকে সরাতে না পেরে পুলিশ নিজেই পিছু হটে। একপর্যায়ে পুলিশের সাথে বিজিবি যোগ দিলে সংঘর্ষে নতুনমাত্রা যোগ হয়। এতে পুলিশ-বিজিবি যৌথভাবে জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এতে শত শত লোক গুলিবিদ্ধ হন। সকাল ৯.৩০ মিঃ শহীদ মো: রফিকুল ইসলাম বুকের বাম পার্শ্বে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন।
তার জানাযার নামাজে ইমামতি করেন মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক। জানাযায় প্রায় ৬ হাজার লোক উপস্থিত ছিলেন। জানাযা পরবর্তী সময়ে বিক্ষুব্ধ জনতা মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিলেও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারির কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
দিনটি ছিল ৩ মার্চ ২০১৩। সেদিন ছিল আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকে সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। সারাদেশের মত রাজশাহীর গোদাগাড়ীতেও হরতাল সফল করার লক্ষ্যে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও পিকেটিং হয়। জাতীয় পত্রিকাতে এ সম্পর্কিত বিস্তারিত খবর প্রকাশিত হয়। দৈনিক আমার দেশ, ৪ মার্চ ২০১৩, নির্বিচার গুলিতে গোদাগাড়ী রণক্ষেত্র, নিহত ২' শিরোনামে নিউজ করে।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে হরতাল সমর্থক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ-বিজিবির নির্বিচার গুলিতে এক শিশুসহ দুইজন নিহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে ১৫ জন। আহত হযেছে শতাধিক ব্যক্তি। গুলিবিদ্ধ চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। অন্যদিকে পুলিশের ৬ জন সদস্য আহত হয়েছেন বলে গোদাগাড়ী থানা পুলিশ দাবি করেছে। জামায়াতের ডাকা হরতাল চলাকালে সকাল ৯টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে গোদাগাড়ী বালিয়াঘাটা থেকে রাজাবাড়ি পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করলে পৌরসভা এলাকার ডাইংপাড়া সিনেমা হলের মোড়ে নির্বিচারে পুলিশ-বিজিবি গুলি চালালে হতাহতের এ ঘটনা ঘটে। এ সময় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
পুলিশ-বিজিবির গুলিতে নিহতরা হলেন গোদাগাড়ীর মহিষালবাড়ি হাট জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম (৪৮) ও সরাংপুর দাখিল মাদরাসার নবম শ্রেণীর ছাত্রশিবির কর্মী রফিকুল ইসলাম (১৪)। নিহত জামায়াতকর্মী মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম মহিয়ালবাড়ি গ্রামের মৃত সিদ্দিক মোল্লার ছেলে ও রফিকুল ইসলাম ভগবন্তপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে। বিকালে মহিষালবাড়ি ডিগ্রি কলেজ মাঠে নিহত মোয়াজ্জিন মুজাহিদুল ইসলামের জানাজা শেষে মহিষালবাড়ি গোরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
৪. শহীদের স্বজনদের কথা
শহীদের বাবা। আমি তাকে বলতাম যে, তোমাকে সাঈদীর মত বড় হতে হবে। আমার ছেলে মারা গেছে তাতে দুঃখ আছে কিন্তু কষ্ট নেই। কারণ আল্লামা সাঈদীর মুক্তির জন্য আমার ছেলের মত আমার পরিবারের সবাইকে যদি মরতে হয় তবু যেন তাঁর মুক্তি হয়। কিন্তু তবুওতো বাবা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন আর বলেন, আহা। প্রতিদিন ফজরের পর ও কুরআন পড়তো। ছাত্রশিবিরের মাত্র কর্মী হলে কি হবে, ৬ বছর বয়েস থেকেই কখনই ওর নামাজ কাজা হয়নি। চাঁদের মাস হিসাব করে রোজা রাখতো। আমি একটি স্থানীয় মসজিদের ইমাম। আমি না থাকলে সেই ইমামতি করতো। হায়। মাত্র ১৪ বছরের এতটুকু ছেলে শুধু মিছিল করার জন্য ওকে হত্যা করা হলো। ঘাতক বুলেট ওর বুকের বাম পার্শ্বে লেগে পিছন দিক দিয়ে কলিজাসহ বেরিয়ে যায়। হায়রে, বাতিল শক্তি কত বোকা। তারা বুঝে না ওর শাহাদাতের পর এখানে ইসলামের জাগরণ আরো বেড়ে গেছে। মসজিদের মুসল্লি সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে।
শহীদের গর্বিত মা
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় হওয়ার পর থেকেই পড়া-লেখায় সে মন বসাতে পারেনি। ছোট মানুষ তবুও কষ্টের কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছে, 'মা, লেখাপড়া করে কি হবে সাঈদী সাহেবের জন্য প্রয়োজনে আমি শহীদ হয়ে যাব। হরতালের দিন বাসিভাত খেয়ে এ কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছে যে, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মত এত বড় আলেমকে ফাঁসি দেয়ার পর আমি আর ঘরে বসে থাকতে পারছি না। তাই আমি প্রতিবাদ মিছিলে যাচ্ছি। মিছিলে যাবার আগে বলেছে, আমাকে ভাল-মন্দ খেতে দাও, আমি আল্লাহর পথে শহীদ হবো। এছাড়াও বলেছে তার জমি সব ভাই-বোনকে ভাগ করে দিতে।
আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় রফিকুল কোন ডায়েরি কিনতে পারেনি। কিন্তু তাতে কি, ২০ টাকা মূল্যের চন্দ্রা ডিমাই খাতাতেই সে লিখেছে মানব জীবনের অনেক বড় বড় বাণী। যেমন, "জীবনে সফলতা বা সুখ পেতে হলে দুঃখের জ্বালা সহ্য করতে হবে।" কথাটি হয়তো খুবই ছোট মাত্র এক বাক্যে, এগারটি শব্দেই শেষ। ফুটপাথেই এমন হাজারো বাণী সম্বলিত বই অহরহ পাওয়া যায়। কিন্তু সাত ভাইবোনের সবার ছোট, অতি আনন্দের সোনালি জীবনের প্রাতে ১৪তম জন্মদিনের মাত্র ১২ দিন আগে এই বাক্যের প্রতি বিশ্বাসের দৃঢ়তায় বলে কয়ে নিজের কলিজা বিলিয়ে দেয়া কি অতই সহজ?
৫. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
আধা পাকা ৩ রুমের একটি টিনের ঘর এবং অল্প জমি-জমা আছে।
৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: রফিকুল ইসলাম (০৫১)। পেশা: ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্রশিবিরের কর্মী ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৫.০৩.১৯৯৯ ইং ১৪ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩.০৩.২০১৩ সকাল ১০টা
শাহাদাতের তারিখ: ০৩.০৩.২০১৩, সকাল ৯.৩০ মিঃ শহীদ মো: রফিকুল ইসলাম বুকের বাম পার্শ্বে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন, স্থান: গোদাগাড়ীতে শাহাদাৎ বরণ করেন। শহীদের জানাজা পড়ান জনাব আঃ রাজ্জাক। প্রায় ৬ হাজার লোক উপস্থিত ছিল।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: জোতগোসাইদাস, ডাকঘর: শ্রীমন্তপুর, ইউনিয়ন: গোদাগাড়ী পৌরসভা, উপজেলা: গোদাগাড়ি, জেলা: রাজশাহী।
পিতা। গোলাম মোস্তফা, বয়স প্রায় ৫৫ বছর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন।
মাতা: মাসতারা বেগম, বয়স প্রায় ৪৫ বছর, গৃহিণী।
ভাই-বোনের বিবরণ: ১ম ছেলে। শহিদ মো: রফিকুল ইসলাম, দাখিল ৯ম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন, ২য় ছেলে: ফারুক, দিনমজুর, ৩য় ছেলে। রবিউল ইসলাম, দিন মজুর, ১ম মেয়ে: মোসা: রোজলি বেগম, গৃহিণী। ২য় মেয়ে। শিউলী বেগম, গৃহিণী। ৩য় মেয়ে: মেরিনা, গৃহিণী, ৪র্থ মেয়ে। মোতাহারা, গৃহিণী।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍