হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন
শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন

শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মোঃ হাফিজুর রহমান শাহীন
পিতার নাম: মোঃ আব্দুল মান্নান
সাংগঠনিক মান: সদস্য
সর্বশেষ দায়িত্ব: সহকারী সমাজসেবা সম্পাদক
সর্বশেষ পড়াশুনা: রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজশাহী কলেজ
শহীদ হওয়ার স্থান: শিবগঞ্জ, চৈতন্যপুর নামক গ্রামে।
যাদের আঘাতে শহীদ: পুলিশ এস. আই ইয়ামিন কর্তৃক গুলি
আঘাতের ধরণ: গলায় গুলিবিদ্ধ
শহীদ হওয়ার তারিখ: ১০/০২/২০১০ ইং ভোর রাতে
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম/মহল্লা- মেহেরচণ্ডী, মতিহার, রাজশাহী।
ভাই-বোন: তিনজন, দুই বোন এক ভাই।
ভাই-বোনদের মাঝে অবস্থান: সবার বড়

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শাহীনের মা বলেন, ডাকে কতো কষ্টে মানুষ করেছি। দুধ বেচে বাধার পড়াশুনার টাকা জমিয়েছি। বাধা বলেছিল, সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। টাকা লাগবে। এ জন্য টাকা জমানো শুরু করেছিলাম। এ টাকা এখন কে নিবে? কার জন্য জমালামঃ শাহীন বলতো, মা তোমাকে আর বেশি দিন কষ্ট করতে হবে না। আমার পড়াক্ষনাজো শেষ হয়ে এলো। বড় চাকরি নিবো। আর কষ্ট থাকবে না।
শহীদের পরিচিতি
শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন রাজশাহী জেলার বোয়ালিয়া খানার মেহেরচণ্ডী গ্রামে ২২ ডিসেম্বর ১৯৭৯ জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। সদা হাস্যোজ্জ্বল শাহীন প্রতিবেশি অসহায় মানুষদের নিয়ে সর্বদা চিন্তা করতেন। ইসলামী আন্দোলনের একজন দায়িত্বশীল হিসেবে নিজেকে তাঁর শপথের মর্যাদা রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগে কখনো পিছপা হতেন না। শাহাদাতকালে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ও রাবি শাখার সহকারী সমাজসেবা সম্পাদক ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান।
আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত প্রায় ১১ টায় নির্মমভাবে নিহত হয় গণিত বিভাগের সাধারণ ছাত্র ফারুক হোসেন। যার দায় ছাত্রশিবিরের মতো একটি আদর্শবাদী ছাত্রসংগঠনের উপর চাপিয়ে চিরুণী অভিযানের নামে গণগ্রেফতার শুরু করে সরকার। এই পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক, তখন চাপাইনবাবগঞ্জে বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াতে যাওয়া শাহীনকে ১০ ফেব্রুয়ারি বাত প্রায় ২টায় খুব কাছ থেকে কোন অভিযোগ ছাড়াই শিবগঞ্জ থানার পুলিশ অভিযানের নামে বন্দুক দ্বারা গুলি করে। ঘটনাস্থলেই শাহাদাতবরণ করেন শাহীন। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কোন প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে দেয়নি প্রশাসন। এমনকি তাঁর জানাযায় মানুষের ঢল নামলেও অধিকাংশকেই অংশ নিতে দেয়নি আওয়ামী পুলিশ।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
এলাকাবাসী ও প্রতিবেশীর সাথে আলাপকালে জানা গেছে, হাফিজুর রহমান শাহীন সব সময় মানুষের সুখে-দুঃখে সবার আগে এগিয়ে যেতো। বিপদে আপদে মানুষ তাঁকেই পাশে পেতো। লোকজন বলেছেন, এমন ছেলে হাজারে একটাও পাওয়া যায় না। তাঁর ব্যাপারে কোন দিন কোন অভিযোগও যায়নি তার পরিবারের কাছে। শাহীনের বড় বোন শিরিন বলেন, এর মতো ছেলে হয় না। ওর কোন শত্রু ছিল না। এলাকার কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কোনদিন কোন অভিযোগ নিয়ে আসেনি। এ রকম ছেলে চোখে পড়ে না। তিনি বলেন, গরীবদের সহযোগিতা করেছে। একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু তা শেষ করে যেতে পারেনি। তিনি বলেন, দাঁড়ি রাখা, নামাজ পড়া কী অপরাধ? নামাজ পড়লে, ভালো কাজ করলে, মানুষকে ভালো কাজের দিকে ডাকা কী অপরাধ? প্রতিবেশী মুকছেদ আলী বলেন, এমন ছেলে হাজারেও একজন পাওয়া যাবে না। দলমত নির্বিশেষে সবারই প্রিয় ছিল শাহীন। চাচা সোহেল বলেন, কারো সাথে কোন খারাপ আচরণ করেছে এমন অভিযোগ পাইনি। এইতো কয়েকদিন আগে রাতে আমাকে ধরে নিয়ে গেলো রক্ত দিতে। অথচ সে পরিবার আওয়ামী লীগ করে। এ ব্যাপারে ভাঁর মা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, মুচকি হেসে তাঁর জবাব-বিপদে মানুষইতো মানুষের জন্য এগিয়ে আসে। চাচা-ভাতিজ্য মিলে রক্ত দিয়ে এলাম। প্রতিবেশী মরিয়ম বেগম বলেন, এলাকার কেউ তাঁর ব্যাপারে খারাপ রিপোর্ট দিতে পারবে না। এমন কেউ নেই যে তার জন্য চোখের পানি ফেলেনি।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ।
৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনাকাংখিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার পুরো বাংলাদেশে চিরুনী অভিযানের নামে গ্রেফতার ও শারীরিক অত্যাচার করতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী সমাজকল্যাণ সম্পাদক মাহফুজের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চৈতন্যপুরে আশ্রয় নেয়াকালীন অবস্থায় ১০ তারিখ রাতে পুলিশ চাঁপাইনবাবগঞ্জে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। তিনি তাৎক্ষণিক শাহাদাত বরণ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক মোঃ আফজাল হোসেন লিখেছেন- মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর দাসত্ব, আনুগত্য ও তাঁর দেয়া বিধিবিধানকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। আর এই বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। সর্বশেষ নবী হিসেবে রাসুল (সা) পৃথিবীর বুকে আগমন করেন। আর নবী-রাসূলের রেখে যাওয়া কাজগুলো আল্লাহর জমিনে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব এখন মানুষের। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পৃথিবীতে অসংখ্য খোদার সৈনিককে জালেমদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন এমনই একজন খোদার পথের সৈনিক। নবী-রাসূলের রেখে যাওয়া পথকে জমিনে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে জালেমদের হাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
শহীদ নোমানীত বাসায় যাত্রা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক মোঃ আফজাল হোসেন লিখেছেন- ২৪ জানুয়ারি ২০১০। তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি শামসুল আলম গোলাপ ভাই, হাফিজুর রহমান শাহীন, সোহেল, ফারুক, আনিস, শেখ ফরিদ, ফাহিম ভাই, অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম সিদ্দিকী ও রাবির অন্যান্য দায়িত্বশীল ভাইসহ আমরা মোট ১১ জন শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী ভাইয়ের সেজ ভাই ড. মোঃ ফকরুজ্জামান ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য সকাল ৭টার দিকে তাঁর বাসার উদ্দেশে রওনা হই। আমরা দুপুরের দিকে সেখানকার একটা স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিই। সেখানে প্রথমে শহীদ নোমানীর পিতা ও পরে তাঁর আম্মার সাথে সাক্ষাৎ হয় আমাদের। আমাদের দেখে শহীদ নোমানীর মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। বার বার আমাদের প্রশ্ন করেন "কী অপরাধ ছিল আমার নোমানীর? কেন তারা আমার আদরের নোমানীকে হত্যা করল? আমি কবে আমার নোমানীর হত্যার বিচার পাবো? আমি জানি এই জালিম সরকারের আমলে বিচার পাবো না। আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি, তিনিই তাদের বিচার করবেন। আজ নোমানী বেঁচে থাকলে কত আনন্দ করত বিয়েতে, তোমাদের কত আদর যত্ন করত।" এই কথাগুলোর কোনো জবাব ছিল না আমাদের কাছে, শুধু দুই চোখের অশ্রু ঝরানো ছাড়া। গোলাপ ভাই, শাহীন ভাইসহ আমরা সবাই তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলাম। পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ ও সাঈদী ভাইয়ের বিদায়
মোঃ আফজাল হোসেন আরো বলেন- এর কিছুক্ষণ পর রাবির সাবেক সভাপতি ও তৎকালীন কেন্দ্রীয় দাওয়া সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ভাই এলেন। এরপর আমরা সকলেই দুপুরের খাবার একসাথে খেতে বসলাম। সাইদী ভাই শাহীন ভাইকে পাশে নিয়ে খেতে বসলেন, আমি তার পাশেই বসলাম। শাহীন ভাই ছিলেন সুঠাম দেহের অধিকারী। ভালো খেতেও পারতেন। খাওয়া শেষে সাঈদী ভাইসহ আমরা শহীদ নোমানী ভাইয়ের শ্রদ্ধেয় পিতা, বড় ভাই, বোনসহ পরিবারের সকল সদস্যের সাথে সাক্ষাৎ করলাম, কিছু ছবিও তুললাম। সাঈদী ভাইয়ের জরুরি কাজ থাকায় সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমাদের আগেই বের হলেন।
শহীদ নোমানীর কবর জিয়ারত
ক্রীড়া সম্পাদক বলেন- এরপর আমরা শহীদ নোমানী ভাইয়ের কবর জিয়ারত করার জন্য সেখান থেকে কবরস্থানের দিকে রওনা হলাম। কবরস্থানটা তার শহরের বাসা থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে অবস্থিত। সেখানে পৌঁছানোর পর তার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন দোয়া দুজদ শেষে মুনাজাত শুরু করলেন গোলাপ ভাই। তার মুনাজাতের মাধ্যমে শহীদ নোমানী ভাইয়ের জান্নাত লাওসহ আল্লাহ যেনো তাকে শহীদ হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন, তার শাহাদাতের মাধ্যমে যেন আল্লাহতালা বাংলাদেশকে ইসলামী আন্দোলনের দুর্গম ঘাঁটিতে পরিণত করেন এবং আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেন ইত্যাদি বলে তিনি প্রায় ৮-১০ মিনিট ধরে মুনাজাত করলেন। সে সময় দুই চোখের পানি অঝোরে ফেলে সকলকে কাঁদতে দেখলাম।
মুনাজাত শেষে সবাই চোখের পানি মুহি। কিন্তু আমরা অবাক চোখে দেখতে পাই শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন তখনও মুনাজাত শেষ করেননি। নোমানী ভাইয়ের কবর দুই হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে খুব উঁচুস্বরে কাঁদছেন আর বারবার বলছেন "আপনি আমাকে একা ফেলে কেন চলে গেলেন, আমাকে কেন আপনার সাথে নিয়ে গেলেন না, আমি আপনার সাথে যেতে চাই, আল্লাহ কেন আমাকে না নিয়ে আপনাকে নিয়ে গেলেন।" শাহীন ভাইয়ের আবেগটা আমরা বুঝছিলাম, কারণ শহীদ নোমানী ভাইয়ের শাহাদাতের আগে শাহীন ভাই তার পাশেই ছিলেন। অবশেষে আমি ও গোলাপ ভাই দুইজন তার দুই হাত ধরে কবর থেকে তুলে গোরস্থানের বাইরে নিয়ে আসি এবং তাকে শান্ত করি। এরপর সেখান থেকে নোমানী ভাইয়ের গ্রামের বাসায় যেয়ে সবার সাথে সাক্ষাৎ শেষে সন্ধ্যার দিকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা হই।
ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সাথে সংঘর্ষ
৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০। শহীদ নোমানীর হত্যাকারী আসাদ, যার চাপাতির আঘাতে শহীদ নোমানীর মাথা দ্বিখন্ডিত হয়েছিল। সেই খুনি শেখ মুজিবুর রহমান হলে শিবিরের এক কর্মীর সিট অবৈধভাবে দখল করতে এলে শিবিরের সাথে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ শুরু হয়। মুহূর্তে সেই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে গোটা ক্যাম্পাসে। ছাত্রলীগ ও পুলিশ যৌথভাবে শিবিরের ওপর আক্রমণ ও নির্যাতন চালানো শুরু করে হলগুলোতে। চারিদিকে শুধু মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। পুলিশ ও ছাত্রলীগের গোলাগুলিতে ভারী হয়ে ওঠে গোটা ক্যাম্পাসসহ তার আশপাশের অঞ্চলগুলো। প্রতিটা হলে যে সকল রুমগুলোতে আমাদের ভায়েরা থাকে সে সকল রুমসহ সাধারণ ছাত্রদের রুমগুলোতে দরজা ভেঙে ঢুকে তাদের নির্যাতন চালিয়ে রুমের সকল জিনিসপত্র লুটপাট করে নিয়ে যায়। এতে অনেক সাধারণ ছাত্রও হতাহত হয়। এত গোলাগুলির পরও আমরা সামান্য পিছপা হইনি, কিন্তু পুলিশের প্রচন্ড গুলাগুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে আশ্রয় নিই আমরা। তখন পর্যন্ত ক্যাম্পাসে আমরা হিলাম। কিন্তু সকালে ফজরের নামাজ শেষ করে আমরা যখন ক্যাম্পাসের গেটগুলোর পাশে অবস্থান করি ঠিক সেই সময় আমরা খবর পেলাম ফারুক হোসেন নামে এক ছাত্রলীগের কর্মীকে কে বা কারা হত্যা করে আমির আলী হলের ম্যানহোলে ফেলে রেখে যায়। এই খবর পেয়ে আমরা আঁতকে উঠলাম। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না কিভাবে এই ঘটনা ঘটলো। কারণ সারারাত তারা পুলিশকে সাথে নিয়ে ক্যাম্পাসে যে তাণ্ডব ও হলগুলোতে সাধারণ ছাত্রদের ওপর যে নির্যাতন ও লুটপাট চালিয়েছে এতে করে আমাদের পক্ষে কিছুতেই ক্যাম্পাসে অবস্থান করা সম্ভব ছিলো না। বুঝতে পারলাম এ নিশ্চয় শিবিরকে ক্যাম্পাস থেকে উৎখাতের জন্য ছাত্রলীগের কোনো পাতানো ফাঁদ ও খড়যন্ত্র। আমাদের আর বুঝতে বাকি রইল না ছাত্রশিবিরকে ক্যাম্পাস থেকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে তারা ফারুক হোসেন নামে এই নিরীহ ছাত্রকে হত্যা করে শিবিরের ওপরে দায় চাপাবে এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করবে। সুতরাং আমরা যে যেভাবে ছিলাম সেভাবেই নিরাপদ জায়গায় চলে গেলাম।
গ্রেফতার ও নির্যাতন
পরদিন থেকেই ফারুক হত্যার মিথ্যা সাজানো নাটক দিয়ে শুরু করে ছাত্রশিবিরের ওপরে জুলুম নির্যাতনের স্টিম রোলার। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের নির্দেশে সারা দেশে শুরু হয় চিরুনী অভিযান। হলগুলোতে চলে লুটপাট। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল, টাকা-পয়সা, নামিদামি আসবাবপত্রসহ যার যা ছিল সব লুটপাট করে নিয়ে যায় ছাত্রলীগ। এই সুযোগে প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা মূল্যের জিনিসপত্র লুট করে ছাত্রলীগ। অপর দিকে চিরুনি অভিযানের নামে রাবির সাধারণ ছাত্রসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও সারা বাংলাদেশে তাণ্ডব চালায় পুলিশ ও ছাত্রলীগ। সারাদেশে প্রায় পাঁচ হাজার জামাত-শিবিরের নেতাকর্মীকে ধরে রিমান্ডের নামে নির্যাতন চালিয়ে অনেককে পঙ্গু করে কারাগারে পাঠায়। সাধারণ ছাত্রদেরকে জিম্মি করে চাঁদা আদায় করে ছাত্রলীগ ও পুলিশ। তারা বলে চাঁদা নে তা না হলে মেয়ে হাত-পা ভেঙে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেবো। এভাবে অনেক বাড়িঘর ও অফিস ভাঙচুর করে তারা।
হাফিজুর রহমান পাইনের মৃত্যুর খবর
আফজাল হোসেন বলেন- ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ইংরেজি। ঘটনার ১ দিন পর। আমি ফজরের নামাজ শেষ করে কুরআন পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এমন সময় আমার মোবাইল বেজে উঠলো। এতো ভোরে ফোন বেজে ওঠা দেখে আঁতকে উঠলাম। কারণ চারিদিকে শুধু আটক, নির্যাতন ও ভাঙচুরের খবর। ভাবলাম নিশ্চয় কোনো দুঃসংবাদ। ফোন রিসিভ করলাম। ফোন রিসিভ করা মাত্রই যা ভেবেছিলাম তাই, তৎকালীন মহানগরীর শিবিরের সভাপতি তৌহিদুর রহমান সুইট ভাই আমাকে জানান মেহেরচন্ডীতে বাসা, হাফিজুর রহমান শাহীন নামে রাবির এক দায়িত্বশীল, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেছেন। রাত এটার দিকে তার গলার কাছে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে পুলিশ। এই সংবাদ পাওয়ার পর আমার দু'চোখ নিয়ে নিজের অজান্তে ঝরঝর করে পানি ঝরতে লাগলো। আমি কিছুতেই এই সংবাদটা মেনে নিতে পারছিলাম না। যে ছিল আমার সংগঠনের সহযোদ্ধা যার সাথে কিছুদিন আগেই আমি ময়মনসিংহে নোমানী ভাইয়ের বাসা থেকে ঘুরে এলাম। পিতা-মাতার একমাত্র ছেলে-সন্তান শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন ভাই। কে নেবে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার দায়িত্ব? নোমানীর কবর ছুঁয়ে যে শাহাদাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন শহীদ শাহীন, তাহলে কি আল্লাহতায়ালা সেই দিন তার দোয়া কবুল করেছিলেন?"
এরপর আমাদের মতিহার থানা আমীর অধ্যাপক আব্দুস সামাদ ভাইকে শাহীন ভায়ের শাহাদাতের খবরটা জানাই। সামাদ ভাই হাফিজুর রহমান শাহীনের বাসায় এই সংবাদ নিয়ে গেলে সেখানে শুরু হয় এক আবেগঘন মুহূর্ত। সংবাদ পেয়েই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তার মা, তার পিতা, বোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীসহ সকলের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গোটা মেহেরচন্ডী অঞ্চল।
হাফিজুর রহমান শাহীন ও নোমানী ভাইয়ের কিছু অলৌকিক মিল
শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানীর হাত ধরে এই সংগঠনে আসেন শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন। শহীদ নোমানীর হাতে গড়া কর্মী তিনি। নোমানী ভাই যখন মেহেরচন্ডী অঞ্চলের দায়িত্বশীল ছিলেন তখন তাঁর প্রচেষ্টায় তিনি কর্মী ও সাথী হন। নোমানী ভাইয়ের শাহাদাতের দুই দিন আগে অর্থাৎ ১১ মার্চ ২০০৯ ইংরেজি শহীদ দিবস উপলক্ষে আইয়ুব ভাইয়ের কবর জিয়ারত করতে চুয়াডাঙ্গায় গিয়েছিলেন তার বাসায়। তিনি সেখানে কবর জিয়ারতের সময় দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে শহীদ আয়ুব ভাইসহ যারা এই আন্দোলনের জন্য শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছেন তাদের মতো শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করেছিলেন তিনি। আল্লাহতালা তার দোয়া কবুল করেছিলেন। এর দুই দিন পর অর্থাৎ ১৩ মার্চ ২০০৯ নোমানী ভাই শাহাদাত বরণ করেন। একইভাবে শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন তাই ২৪ জানুয়ারি ২০১০ নোমানী ভাইয়ের কবর জিয়ারতের সময় আল্লাহর কাছে শহীদি মৃত্যু কামনা করেছিলেন। মাত্র ১৫ দিন পর আল্লাহ তায়ালা তারও দোয়া কবুল করেছিলেন। নোমানী ভাইয়ের শাহাদাতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত হাফিজুর রহমান শাহীন ভাই ঘটনাস্থলে ছিলেন। নোমানী ভাই শাহীন ভাইকে শেরেবাংলা হলের প্রাচীর পার করে দেয়ার পরপরই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তা না হলে হয়ত সেদিন দু'জনকেই শাহাদাত বরণ করতে হতো। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে নোমানী ভাই ও শাহীন ভাই একই গেঞ্জি পরে শাহাদাত বরণ করেন। মেহেরচন্ডীর মান্নান ভাই সৌদি আরব থেকে দুটো গেঞ্জি নিয়ে এসেছিলেন। এবং তার সব থেকে পছন্দের লোক নোমানী ভাই ও শাহীন ভাই দুইজনকে দুটো গেঞ্জি উপহার দিয়েছিলেন। তাদের শাহাদাতের সময় দুই জনের পরণেই সেই উপহারের গেঞ্জি ২টা ছিল।
শহীদের লাশ দাফন
সন্ধ্যার পরে শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন ভাইয়ের লাশ বাসায় নিয়ে আসা হয়। চারিদিকে শুধু কান্নার রোল, প্রিয় ব্যক্তিকে হারিয়ে সবাই যেন নির্বাক নিস্তব্ধ। গোটা এলাকা র‍্যাব, পুলিশসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা ঘিরে রাখে। লাশ দেখতে আসা ও জানাজা পড়তে আসা লোকদের বাধার সৃষ্টি করে তারা। খুব দ্রুত তার লাশকে দাফনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা সত্ত্বেও মানুষের স্রোতকে ঠেকাতে পারেনি তারা। অবশেষে এশার নামাজের পর হজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে জানাজার নামাজ শেষ হয়। দাফনের পরও দুই দিন ধরে র‍্যাব তার কবরকে পাহারা দিয়ে রাখে। এই দৃশ্য দেখে তার মা বলেছিলেন, "আমার শাহীনকে তোমরা এতই ভয় পাও যে তাকে দাফন করার পরও তার কবর পাহারা দিচ্ছ, প্রাণহীন শাহীন তোমাদের ক্ষতি করবে ভেবে?"
শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন। তিনি শুধু এই আন্দোলনের দায়িত্বশীলই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজসেবক ও জনদরদি, এলাকার প্রতিটা মানুষের দুঃখ-কষ্টের অংশীদার হিলেন তিনি। তার উদ্যোগেই গড়ে উঠেছিল মেহেরচন্ডী অঞ্চলে অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ইসলামিক পাঠাগার, মসজিদ নির্মাণ, স্বেচ্ছায় রক্তদান, গরিব অসহায় ছাত্রদের সহযোগিতা, খেলাধুলাসহ নানা ধরনের সামাজিক প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে হয়তো ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাকর্মী এই সংগঠনে আসবে কিন্তু শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন ভাইয়ের মতো এমন জনদরদি ও সমাজসেবক দায়িত্বশীল খুব কমই পাওয়া যাবে। আমরা আজও শহীদ শাহীন ভাইয়ের আম্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে কান্না ছাড়া তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না। তার ফটো, পোস্টার ও কাপড়গুলো বুকে চেপে ধরে সব সময় কাঁদেন। কাঁদতে কাঁদতে তার মা আর চোখে ঠিক মত দেখতে পান না। তার বাবা আজও বাকরুদ্ধ। বৃদ্ধ পিতা-মাতার একমাত্র ছেলে তিনি। কে নেবে তার পিতা-মাতার ভরণ পোষণের দায়িত্ব। একমাত্র ভাইকে হারিয়ে বোনেরা এখনও মর্মাহত। তার বাসায় গেলে তার ছোট বোনটি কাঁদে আর বলে কে আমাকে আমার ভাইয়ার মতো আদর করবে। তার সাথীরা কবর জিয়ারত করতে ছুটে আসে দূরদূরান্ত থেকে। তাদের আহাজারিতে এলাকা স্তম্ভিত হয়ে যায়। আমাদের মাঝ থেকে এক শাহীন চলে গেলে কী হবে, হাজারো শাহীন জন্ম নেবে তার আদর্শে, তুমি আমাদের আদর্শ, তুমি আমাদের প্রেরণা, তুমি আমাদের অহঙ্কার। আমরা মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি- আল্লাহ যেন তোমাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে জায়গা করে দেন। আমিন।" ব্রিশ্চিয়ান ডেজেলগমেন্ট অল্টারনেটিভ এর প্রতিবেদন।
সরকারের নির্মূল অভিযানের অংশ পুলিশ চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিহত রাজশাহী কলেজের মেধাবী ছাত্র হাফিজুর রহমান শাহীনকে পুলিশই সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে, মানবাধিকার সংস্থা খ্রিশ্চিয়ান ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (সিডিএ) এর সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনেও এ সত্য উঠে আসে। সরেজমিন ঘুরে এসে তৈরি করা প্রতিবেদনে তারা বলেন, হত্যাকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পুলিশ জড়িত। পুলিশ সুপারের নির্দেশে শিবগঞ্জ থানার এস.আই ইয়ামিন আলীয় নেতৃত্বে একদল পুলিশ রাতের আঁধারে হত্যা করে। তারা বিচারবহির্ভূত এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে জাতিসংঘের UN Special Rapportier on Extrajudicial and Summary Execution-এর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে।
জানা যায়, খ্রিশ্চিয়ান ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (সিডিএ)-এর নির্বাহী পরিচালক উইলিয়াম নিকলাস গমেজ স্বশরীরে ২০১১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানাস্থ চৈতনাপুর গ্রামে সরেজমিনে তদন্তের মাধ্যমে রাজশাহী কলেজের মেধাবী ছাত্র হাফিজুর রহমান শাহীনকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ কর্তৃক নির্মমভাবে হত্যার প্রাথমিক তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে সফল হয়েছেন।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক গত ২০১০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে ঘটনাস্থল চৈতন্যপুর গ্রামে মাহফুজ আলম পিতা- মফিজুল ইসলামের বাড়ি গেলে প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষীদের কাছে জানতে পারে যে, গত ১০ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক রাত ১টা ৩০ মিনিটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপারের নির্দেশে শিবগঞ্জ থানার (১) এস.আই ইয়ামিন আলীর নেতৃত্বে (২) এসআই ওয়াহিদুজ্জামান (৩) এ.এস.আই রাফায়েল (৪) এ.এস.আই জাহাঙ্গীর (৫) এ.এস.আই রেজাউল করিম (৬) এ.এস.আই আমিনুল ইসলাম (৭) কনস্টেবল নুরুন্নবী (৮) কনস্টেবল মোয়াজ্জেম হোসেন (৯) কনস্টেবল মাজহারুল ইসলাম (১০) কনস্টেবল আমজাদ হোসেন (১১) কনস্টেবল ও ড্রাইভার কাওছার জামান তথাকথিত গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মফিজুল ইসলামের বাড়িতে পরিকল্পিত হত্যা অভিযান পরিচালনা করে। ঐ হত্যা অভিযানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশের ১টি দলের নেতৃত্ব দেন শিবগঞ্জ থানার এস আই ইয়ামিন। উক্ত পুলিশ দলটি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে চৈতনাপুরে মফিজুল ইসলামের বাড়িতে অবস্থানরত রাজশাহী কলেজের মেধাবী ছাত্র হাফিজুর রহমান শাহীনকে হত্যার একটি পরিকল্পিত অভিযান চালায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই হত্যা অভিযানে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর মতে, কিছু পুলিশ মফিজুল ইসলামের প্রতিবেশী আজহারুল হকের বাড়ির দেয়াল টপকে প্রথমে মফিজুল ইসলামের বাড়িতে অবস্থান নেয় এবং ঐ বাড়িতে অবস্থানরত হাফিজুর রহমান শাহীনকে তার ঘর থেকে বাহির করে নিয়ে এসে ঐ বাড়ির পরিত্যক্ত স্টোর রুমে নিয়ে নির্যাতন চালাতে থাকে। ঐ সময় মফিজুল ইসলামের প্রতিবেশী ও ডাই আজহারুল হক ও চৈতন্যপুর গ্রামের চৌকিদার মোঃ আনারুলকে নিয়ে মো. আজহারুল হকের বাড়ির মধ্য দিয়ে মফিজুল ইসলামের বাড়িতে আরও কিছু পুলিশ প্রবেশ করে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আজহারুল হক তার ঘুমন্ত ভাই মফিজুল ইসলামকে পুলিশের নির্দেশে ডাকে। ইতোমধ্যে কিছু বস্তাবন্তির আওয়াজ শোনা যায় এবং মফিজুল ইসলামের বাড়ির স্টোর রুমের দিকে এগিয়ে গেলে দেখা যায় মেধাবী ছাত্র হাফিজুর রহমান শাহীনের উপর পুলিশ অস্ত্র তাক করে রেখেছে। পুলিশের অফিসারের নির্দেশে পূর্ব থেকে মেধাবী ছাত্র শাহীনের উপর তাক করা অস্ত্র হতে গুলি চালানো হয় এবং ঘটনাস্থলে পুলিশের গুলিতে হাফিজুর রহমান শাহীন মৃত্যুবরণ করেন।
মায়ের প্রতিক্রিয়া
আমার একমাত্র ছেলে বিনা দোষে অকালে ঝরে গেল। আমার বুক খালি হয়েছে আর যেন কোন মায়ের বুক খালি না হয়।
পিতার প্রতিক্রিয়া
আজ আমি আমার প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে নিজেকে অসহায় বোধ করছি। আবার গৌরববোধ করছি এ জন্য যে, আমি একজন শহীদের পিতা। আল্লাহ তা'য়ালা তাকে জান্নাতবাসী করুন এবং তার ওসিলায় আমাদেরকে তার সাথে জান্নাতে অবস্থান করার তৌফিক দান করুন।
ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ বলেন-
"শাহীন দুদিন আগেই বেড়াতে গিয়েছিলেন চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৈতন্যপুর গ্রামে বন্ধুর বাড়িতে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সাথে তাঁর দূরতম কোনো সম্পর্কও ছিলো না। অথচ তার অবস্থানের খোঁজ পেয়ে পুলিশের এস.আই ইয়ামিনের নেতৃত্বে সেখানেই অভিযান পরিচালিত হয় এবং গভীর রাতে ঘুম থেকে ডেকে তুলে নিজ হাতে কাছে থেকে গলায় গুলি করে হত্যা করেন পুলিশ নামের এ পিশাচ। গুলির শব্দে রাতের নীরবতা ভেঙ্গে খান খান হলেও একটুও টলেনি এ খুনি শিশাচের হাত। কোনো অভিযোগ ছাড়াই এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে হতবাক হয়ে পড়ে লাখো জনতা।
শাহীনের শাহাদাতের খবরে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। কিন্তু আওয়ামী সরকারের পেটুয়া বাহিনী তার নামাজে জানাজা এবং লাশটি দেখারও কোনো সুযোগ দেয়নি। তড়িঘড়ি করে নিজ দায়িত্বে সমাহিত করার প্রস্তুতি নিলেও হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। সকলের চোখের কোণায় পানি ধরছে, সকলের বুকে আহাজারির মাতম। এ অবস্থায় শহীদের মা সাহসের সাথে বলেছিলেন, আমার একমাত্র ছেলে বিনা দোষে অকালে ঝরে গেল। আমার বুক খালি হয়েছে আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়। শহীদের বাবাও বললেন একই ধরনের কথা, 'আজ আমি আমার প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে নিজেকে অসহায় বোধ করছি। আবার গৌরববোধ করছি এ জন্য যে, আমি একজন শহীদের পিতা। আল্লাহ তা'য়ালা তাকে জান্নাতবাসী করুন এবং তার ওসিলায় আমাদের তার সাথে জান্নাতে অবস্থান করার তৌফিক দান করুন।' আমাদেরও দৃঢ়বিশ্বাস, শাহীন জান্নাতের সবুজ পাখি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মনের আনন্দে। আল্লাহ আমাদের এ বিশ্বাসকে কবুল করুন। আমীন।"
পরিবারের লোকজন জানান, শাহীন মারা যাওয়ার পর থেকেই তাঁর মা আর স্বাভাবিক হতে পারেননি। সারাক্ষণই কান্নাকাটি করেন। ছেলের জন্য বিলাপ করেন। কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, লিখে কী হবে, বাবাকে পাবো? এলাকায় এমন কোন লোক পাওয়া যাবে না, যে তাকে খারাপ বলবে। সব সময় মানুষের উপকার করতো। ডেকে ডেকে মানুষকে মসজিদে নিয়ে যেতো। এটাই কী তার অপরাধ? তিনি বিলাশ করতে করতে বলেন, যে আমার বুক খালি করেছে, আল্লাহ্ যেন তার বুক খালি করে।
শহীদের বোনের মেয়ে জিনিয়া জাফরিন সিনাজ বলেন, মামা আর আসবে না। এটা ভাবতেই পারছি না। শাহীনের দাদী ভরিকা খাতুন বলেন, ছোটবেলা থেকেই কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি। ভালো মানুষের সব গুণ যে আল্লাহ তাকে দিয়েছিল। কোন দিন বেয়াদবী করেনি।
ফুফু হাসি বেগম বলেন, হাসিখুশি শাহীন কাউকে কোন দিন কষ্ট দিয়েছিলেন বলে আমি দেখিনি, শুনিওনি।
ময়ে গেলে পহীদ হবো।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, শাহীন মাকে অতভয় দিয়ে বলতো। তুমি আমার জন্য কোন চিন্তা করবা না। মরে গেলেতো শহীদ হবো। মরে যাওয়াকে কী কেউ ভয় করে?
মায়ের হাতে শেষ খাবার:
খাবার নিয়ে কোনদিন কোন আপত্তি জানায়নি শাহীন। তবে তার প্রিয় খাবারের মধ্যে ছিল গরুর গোশত ও ভাত। যাওয়ার বেলায় মায়ের হাতে সেই প্রিয় খাবারটিই তিনি খেয়েছিলেন। তার দাদী তাকে খাবার জন্য যা-ই দিতেন তা আনন্দচিত্তে খেয়ে নিতো। সে বলতো, দাদী যা খেতে দেয় তাই স্বাদ লাগে। মুখ বেচে পড়ার খরচ।
শাহীনের মা দুটি গাভী পালেন। এতে প্রতিদিন ১০/১২ কেজি করে দুধ আসে। তা নিয়ে যেতেন ঘোষ সন্তষ। তিনি বলেন, আমি দুধ নিয়ে যেতাম। তবে টাকা সাথে সাথে নিতো না। ছেলের লেখাপড়ার জন্য এক সাথে নিতো। এবার বেশি টাকা লাগবে বলে আমাকে জানিয়েছিল। শাহীনের মা বলেন, তাকে কতো কষ্টে মানুষ করেছি। মুখ বেচে বাবার পড়াশুনার টাকা জমিয়েছি। বাবা বলেছিল, সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। টাকা লাগবে। এ জন্য টাকা জমানো শুরু করেছিলাম। এ টাকা এখন কে নিবে? কার জন্য জামালাম? শাহীন বলতো, মা তোমাকে আর বেশি দিন কষ্ট করতে হবে না। আমার পড়াশুনাতো শেষ হয়ে এলো। বড় চাকরি নিবো। আর কষ্ট থাকবে না। যোন শিরিন বলেন, আমার ভাইয়ের বড় শখ ছিল, বিদেশে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে আসার। তা আর হলো না।
শাহাদাতের পূর্বের ঘটনা।
প্রতিবেশিরা যেন সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারে এই প্রত্যাশা করতেন সবসময়।
উক্তি। মরতেই হবে যখন, শহীদি মরণ দিও আমাকে।
এক নজরে শহীদের হাফিজুর রহমান শাহীন
নাম: মোঃ হাফিজুর রহমান শাহীন
পিতার নাম: মোঃ আব্দুল মান্নান
সাংগঠনিক মান: সদস্য
সর্বশেষ দায়িত্ব: সহকারী সমাজসেবা সম্পাদক
সর্বশেষ পড়াশুনা: রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজশাহী কলেজ
শহীদ হওয়ার স্থান: শিবগঞ্জ, চৈতন্যপুর নামক গ্রামে।
যাদের আঘাতে শহীদ: পুলিশ এস. আই ইয়ামিন কর্তৃক গুলি
আঘাতের ধরণ: গলায় গুলিবিদ্ধ
শহীদ হওয়ার তারিখ: ১০/০২/২০১০ ইং ভোর রাতে
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম/মহল্লা- মেহেরচণ্ডী, মতিহার, রাজশাহী।
ভাই-বোন: তিনজন, দুই বোন এক ভাই।
ভাই-বোনদের মাঝে অবস্থান: সবার বড়

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍