শহীদ রাশিদুর হক রান্টু
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ রাশিদুল হক রান্টু
পিতার নাম: মরহুম আমিনুল হক টুকু
মাতার নাম: রাশিদা, বয়স- ৫০, পেশা- গৃহিণী
ঠিকানা: ডাঁশমারি, মতিহার, রাজশাহী
সাংগঠনিক মান: সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির
সাংগঠনিক দায়িত্ব: অর্থ সম্পাদক, ২৯ নং ওয়ার্ড
শাহাদাতের তারিখ: ২৭ অক্টোবর ২০১৩, আসরের পর
শাহাদাতের ধরণ: মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ
পিতার নাম: মরহুম আমিনুল হক টুকু
মাতার নাম: রাশিদা, বয়স- ৫০, পেশা- গৃহিণী
ঠিকানা: ডাঁশমারি, মতিহার, রাজশাহী
সাংগঠনিক মান: সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির
সাংগঠনিক দায়িত্ব: অর্থ সম্পাদক, ২৯ নং ওয়ার্ড
শাহাদাতের তারিখ: ২৭ অক্টোবর ২০১৩, আসরের পর
শাহাদাতের ধরণ: মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
বাবা আমিনুল হক টুকু এবং মা রাশেদা বেগমের তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যকার সবার বড় এবং একমাত্র ছেলে রাশিদুল হক। তিনি ১৯৯২ সালের ৫ জানুয়ারি রাজশাহী জেলার মতিহার থানার ডাঁশমারী মধ্যপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে আব্বা-আম্মার যেমন আদরের ধন তেমনি ছোট দুই বোনেরও ছিল চোখের মণি। মান-অভিমান থেকে শুরু করে সকল আবদার ছিল ভাইয়ের কাছে। চাচা-চাচী, ফুফুসহ পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের কাছেও সে ছিলো অতীব আপনজন। নিজগ্রামের ডাঁশমারী স্কুল এবং বিনোদপুরের ইসলামিয়া কলেজের সকল শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারী এবং ছাত্রছাত্রীর প্রিয়মুখ ছিলো সে। শুধু প্রিয় হতে পারেনি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের কাছে। তাইতো রাজপথের মিছিলেই তাকে বিলিয়ে দিতে হলো বুকের তাজা খুন। যে কোন বিপদে তিনি সহপাঠি ও প্রতিবেশীদের পাশে এসে দাঁড়াতেন। ইসলামী আন্দোলনে নিবেদিত প্রাণ রান্টু দাওয়াতী কাজে এবং সাংগঠনিক সকল কাজে সবার আগে থাকতেন। শাহদাতকালে তিনি ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথী এবং মতিহার থানা শাখার বায়তুলমাল সম্পাদক ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান।
আওয়ামী জুলুম নির্যাতনের প্রতিবাদে ও নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ২৬ অক্টোবর ২০১৩ শনিবার জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোটের ডাকা হরতালের সমর্থনে নারায়ে তাকবির শ্লোগানে মুখরিত বিক্ষোভ মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় কাজলা গেটে পৌঁছলে পুলিশ-র্যাব ও সাদা পোশাকধারী আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ভারী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে নিরস্ত্র শিবির কর্মীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুহুর্মুহ গুলিবর্ষণ করে। এই মিছিলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে রাশিদুল হক রান্টু নিজের রক্তে রাঙ্গিয়ে দেন মতিহারের সবুজ চত্বর। আহত ও মুমুর্ষু অবস্থায় তাকে জরুরী ভাবে ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে ভর্তি করার কয়েক মিনিট পরেই তারুণ্যদীপ্ত প্রিয় সাথীদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যান, পান করেন শাহাদাতের অমিয় সুধা।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
রাশিদুল হক রান্টু সব সময় হাসিখুশি থাকতেন এবং বলতেন এটাই দাওয়াতী চরিত্র। সহপাঠিদের প্রিয় রান্টু বন্ধুদের মাঝে দাওয়াতী কাজের জন্য সব সময় পেরেশান থাকতেন। প্রতিবেশীদের বিপদ যেন ছিল তারই বিপদ, সবার আগে ছুটে যেতেন তিনি। "আল্লাহকে যারা বেসেছে ভালো দুঃখ কি আর তাদের থাকতে পারে"- এই গানটি যেন সব সময় তার মুখে লেগে থাকতো। আন্দোলনের কাজে কখনো পিছে পড়তেন না তিনি। প্রিয় সাথীদের কাছে সব সময় বলতেন আল্লাহ যেন আমাকে শহীদ হিসাবে কবুল করেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ।
ঘটনাটি ঘটে ২৬ অক্টোবর ২০১৩ রোজ শনিবার। ঐদিন বিকেল ৪.৩০ ঘটিকায় কেন্দ্রঘোষিত ১৮ দলীয় জোটের ডাকা হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ সমাবেশ ছিলো। সেই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কাজলা গেটে পৌঁছার আগেই পুলিশ-র্যাব-সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের ভারী আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে সে। জরুরিভাবে ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার কয়েক মিনিট পরেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শরীরে একে-৪৭রাইফেলের ২টি গুলি এবং শর্টগানের ৯টি গুলির চিহ্ন থেকে তখনও রক্ত ঝরছিলো।
সন্ধ্যা থেকে শহীদের সাথী এবং স্বজনদের আহাজারী আর কান্নার সুরে এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হলেও র্যাব ও পুলিশের সাজানো নাটকের মহড়া এগিয়ে যেতে থাকে। সন্ধ্যা ৭.৩০ টায় লাশ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। পথিমধ্যে পুলিশ লাশবাহী গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভারকেও মারধর করে।
সারা রাতের নাটক শেষে পরদিন সকালে পোস্টমর্টেমের আশ্বাস নিয়ে পরিজনেরা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসে। সকাল থেকে শুরু হয় নতুন নাটক। এই নির্মম হত্যাকান্ডের দায়ভার র্যাব-পুলিশ কেউ নিতে
রাজি নয়। হার্টএ্যাটাকে মারা গেছে বলে চালিয়ে দিতে ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারকে চাপ দেয় কর্তৃপক্ষ। দেহে গুলির দগদগে চিহ্ন সত্ত্বেও এমন রিপোর্ট দেয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক ভাবেননি ডাক্তার। তাই আরেক নাটক সাজানোর চেষ্টা চলে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ অস্ত্রের গুলিতে নিহত হয়েছে বলে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি কয়ে পোস্ট মর্টেম করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। ডাক্তার রাজি না হওয়ায় তার লাশ নিয়ে নাটক চলে ৪০ ঘণ্টা ধরে। অবশেষে সঠিক প্রোটকল ছাড়াই পোস্টমর্টেম শেষ করে শহীদের লাশ নিজ বাড়িতে পৌঁছায় বেলা ২টায়। বাদ আসর খোঁজাপুর গোরস্থান ময়দানে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় ১৫ হাজার মানুষের চলে জনসমুদ্রে পরিণত হয় জানাজাস্থল। মহানগর আমীর জননেতা আতাউর রহমানের ইমামতিতে হাজার হাজার মানুষ জানাজায় শামিল হয়ে চোখের পানি ফেলে দোয়া করেন শহীদের জন্য। গণমানুষের ঢল দেখে বারবার মনে হচ্ছিল, শহীদের রক্তের সিঁড়ি বেয়েই ইসলামের বিজয় সূচিত হবে ইনশাআল্লাহ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক মোঃ আফজাল হোসেন লিখেছেন-
"জোহরের নামাজ শেষ করে সকলে সামান্য কিছু খাওয়া দাওয়া শেষ করে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বাসা থেকে বের হয়ে খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে আমরা ধরমপুর মতিহার থানার আমজাদের মোড়ে এসে জড় হই। বেলা ৩টায় গোটা মোড় জনশক্তিতে ভরে যায়। চারিদিকে শুধু নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার, একদফা একদাবি শেখ হাসিনা কবে যাবি, এই মুহূর্তে দরকার কেয়ারটেকার সরকার ইত্যাদি শ্লোগানে মুখরিত। চারদিক থেকে মিছিল আসছে। শুনলাম, ছাত্রশিবির ডাঁশমারী অঞ্চল থেকে একটা বিশাল মিছিলের বহর আসছে। অপেক্ষা করতে থাকলাম, মিছিলকে অভিনন্দন জানানোর জন্য।
কিছুক্ষণ পর মিছিলটি আমজাদের মোড়ে এসে পৌঁছে। আমি ঠিক সামনে থেকে খেয়াল করলাম রাশেদুল ইসলাম রাষ্ট্রকে। সে মিছিলের সামনে ডান পাশে ব্যানারের এক প্রান্ত ধরে খুব আবেগতাড়িতকণ্ঠে জোরে জোরে শ্লোগান দিচ্ছিলো। রাষ্ট্র ছিল সুঠাম দেহের অধিকারী এবং সেদিন তাকে দেখতে অনেক সুন্দর লাগছিল। পরণে একটি ট্রাউজার, গায়ে আকাশি ও সাদা রঙের টানা টানা দাগওয়ালা গেঞ্জি। মিছিলটি যখন আমাদের সাথে এসে যুক্ত হয়, তখন আমরা প্রায় ২০০০ জনশক্তি নিয়ে আমজাদের মোড় থেকে কেডি ক্লাবের দিকে মিছিল নিয়ে এগোতে থাকি। সবার কণ্ঠে প্রতিবাদের শ্লোগান। মিছিল যখন কাজলা পানির ট্যাংকি বিশ্বরোডের কাছে পৌঁছায় তখন ঠিক বিকেল ৪টা বাজে।
হঠাৎ করে দেখি রোডের ডান দিক থেকে অর্থাৎ বিনোদপুরের দিক থেকে র্যাবের অনেক গাড়ি আসছে। গাড়িগুলো আসতে দেখে আমি জনশক্তিদের আটকিয়ে রাখলাম। রাস্তায় উঠতে দিলাম না। আমি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে গাড়িগুলোকে সাইড দিচ্ছিলাম। একে একে ৬টা গাড়ি আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। যেতে যেতে হঠাৎ করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই র্যাবের গাড়িগুলোর দরজা খুলেই এলোপাতাড়ি লাঠি পেটা শুরু করে। কী ব্যাপার? আমাদের এ কর্মসূচিতে তো প্রশাসন অনুমতি দিয়েছে তারপরও কেন এই লাঠিপেটা? কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অনুমতি থাকায় এখানে ছোট-বড় আবাল-বৃদ্ধ সবাই এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। হামলার প্রেক্ষিতে সেখানে হাজার হাজার জনশক্তি সবাই এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। র্যাবের পাশাপাশি দেখা যায় অনেক সাদা পোশাকে আওয়ামী সন্ত্রাসী যাদের সবার হাতে একে-৪৭সহ ভারী ভারী অস্ত্র। তারা যৌথভাবে আমাদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। চারিদিক মুহুর্মুহু গুলির শব্দ।
আমি সকল জনশক্তিকে নিয়ে কেডি ক্লাবের দিকে সরে যেতে লাগলাম। এরই ভেতরে দেখি অনেকে আমার সামনে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। আমি বারবার জনশক্তিকে পিছু হটতে বলেছিলাম। কারণ র্যাব ও সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে একে-৪৭সহ অত্যাধুনিক অস্ত্র, সেই অস্ত্রের সাথে আমরা কিছুতেই মোকাবেলা করতে পারবো না।
এরপর আমি বেশ কিছু জনশক্তিকে সাথে নিয়ে কাজলার কেডি ক্লাবের পূর্ব দিক দিয়ে আমজাদের মোড়ের দিকে যাওয়া শুরু করলাম। যাওয়ার কিছু সময় পর ভাঁশমারীর তৎকালীন সভাপতি আলম আমাকে ক্রন্দনরত কন্ঠে ফোন দিয়ে বললেন, "ভাই রান্টু গুলিবিদ্ধ হয়েছে।" এই কথা শুনে আমার বুকের ভেতরে হৃদপিন্ডটা কেঁপে উঠল। আমি বললাম কোথায়? তিনি বললেন, রেডিও সেন্টারের ভেতরে বরই বাগানে। আমি বললাম, তাকে উদ্ধার করে আমজাদের মোড় দিয়ে নিয়ে আসতে। আমি ভেবেছিলাম হয়তো রাবার বুলেট লেগেছে। এরপর আমি দ্রুত রাস্তায় উঠলাম। এর কিছুক্ষণ পর যখন রাষ্ট্রকে রিকশায় করে আমার কাছে নিয়ে এলো তখন আমি দেখলাম, তার বুকের ওপর বাম পাশে ফুসফুস বরাবর পেটের একটু ওপরে সামান্য ফুটো। আমার ডান হাতের আঙুলটা তার বুকের সেই গুলিবিদ্ধ ফুটো স্থানে দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম।
তখন সে খুব আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল এবং তার মুখের ডান দিক থেকে সাদা সাদা ফেনা বের হচ্ছিল। এবার দেখি আমার আঙুল তার সেই গুলিবিদ্ধ স্থান দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। আমি আর আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। মনে মনে ভাবলাম, হে আল্লাহ, তুমি পিতার একমাত্র সন্তানকে তোমার দ্বীনের জন্য কবুল করলে। কারণ তার যে স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়েছে তাতে করে আল্লাহর রহমত ছাড়া তার বাঁচা কোনোভাবে সম্ভব নয়। আমার দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। এরপর আমি তাকে দুই হাত দিয়ে আমার বুকে টেনে নিলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মোটরসাইকেল তুলে দিলাম তাকে হসপিটালে নেয়ার জন্য। কিন্তু সে আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছিলো যেন সে আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে। সে যে আর বাঁচবে না, আল্লাহ যে তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করবেন হয়তো সেটাই বারবার আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল। তার নিস্তেজ দেহটা আমার বুকের সাথে যেন লেগে গেছে। তার মাথাটা আমার কাঁধে ঝুলে আছে।
আমি ও তাজমিনুর তারই মামাতো ভাই দুইজন মিলে তাকে মোটরসাইকেলের পেছনে তুলে দিলাম এবং পেছনে একজনকে তাকে ধরে রাখার জন্য দিলাম। তার পা দুটো মোটরসাইকেলের দুই পাশে ঝুলতে থাকে আর পেছন থেকে তাকে একজন চেপে ধরে মেডিকেলে নিয়ে যায়। তাকে আমার বুক থেকে নামানোর পর দেখি আমার গেঞ্জিটা রক্তে ভিজে গেছে। রাষ্ট্রকে হসপিটালে পাঠিয়ে দিয়ে আমরা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলাম।
এদিকে আসরের নামাজের সময় প্রায় শেষ হয়ে আসছিলো। এমন সময় ফোন এলো আমার মোবাইলে, "ভাই রান্টু আর বেঁচে নেই"। আমি ফোন পেয়ে কাউকে কিছু বললাম না। এই মুহূর্তে তাদের কথাটা বললে তারা সবাই ভেঙে পড়বে। আমি কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারবো না। কিন্তু কেন যেন আমার চোখের পানিকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। বারবার মনে পড়ছিল শহীদ শাহাদাতের বাসায় ঈদের দিনে রান্টুর সেই কান্নার দৃশ্য। শহীদ শাহাদাতের মা যখন শাহাদাতের মৃত্যুর কথা বর্ণনা করছিলেন তখন রান্টুর অনেক জোরে জোরে কান্নার শব্দ শুনে আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম। কিছুতেই তার কান্না থামছিল না। এর কিছুদিন পরই এই ঘটনা। আমার দু'চোখ দিয়ে পানি ঝরা দেখে জনশক্তিদের আর বুঝতে কষ্ট হলো না যে শহীদ রাশিদুল হক রান্টু আর বেঁচে নেই।
২৭ অক্টোবর সকালে পোস্টমর্টেমের আশ্বাস নিয়ে পরিজনেরা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দায়ভার র্যাব-পুলিশ কেউ নিতে রাজি হয় না। প্রথমে হার্টএ্যাটাকে মারা গেছে বলে চালিয়ে দিতে ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারকে চাপ দেয়। পরে নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গুলিতে নিহত হয়েছে বলে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে পোস্ট মর্টেম করতে নির্দেশ দেয়। ডাক্তার রাজি না হলে তাকে ঘুরতে হয় ৪০ ঘণ্টা। প্রথমে রামেক অধ্যক্ষ, পরে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, তারপর জেলা প্রশাসক সব শেষে পুলিশ কমিশনার। সঠিক প্রোটকল ছাড়াই পোস্টমর্টেম। পোস্টমর্টেম শেষ করে শহীদের লাশ নিজ বাড়ীতে পৌছায় বেলা ২টায়। খোঁজাপুর গোরস্থান ময়দানে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক হাজার জনতা জানাজায় শামিল হয়ে শহীদের জন্য দোয়া করেন।
আপনজনদের কথা
সিতা: "ইসলামী আন্দোলনের জন্য আমি আমার সন্তানকে হারিয়েছি, আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে সবর করছি।"
মাতা। "খাতকরা আমার কলিজার টুকরা সন্তানকে হত্যা করেছে, আমার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে, হত্যাকারীদের বিচারের ভার আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম। হে আল্লাহ! তুমি আমার রান্টুকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নাও।"
ছোট বোন: "আমার ভাইয়া ইসলামী আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে তারা যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়"
আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী। "রাশিদুল হক রান্টু অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ছিল, সে সব সময় আমাদের সম্মানের চোখে দেখতো এবং আমরাও তাকে খুব স্নেহ করতাম, তাকে হারিয়ে আমরা মর্মাহত"
শাহাদাতের পূর্বের ঘটনা।
"আল্লাহকে যারা বেসেছে ভালো দুঃখ কি আর তাদের থাকতে পারে" গানটি যেন সব সময় তার মুখে লেগেই থাকতো..
এক নজরে শহীদ রাশিদুল হক রাষ্ট্র
নাম: রাশিদুল হক রান্টু
পিতার নাম: মরহুম আমিনুল হক টুকু
মাতার নাম: রাশিদা, বয়স- ৫০, পেশা- গৃহিণী
ঠিকানা: ডাঁশমারি, মতিহার, রাজশাহী
সাংগঠনিক মান: সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির
সাংগঠনিক দায়িত্ব: অর্থ সম্পাদক, ২৯ নং ওয়ার্ড
শাহাদাতের তারিখ: ২৭ অক্টোবর ২০১৩, আসরের পর
শাহাদাতের ধরণ: মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান।
আওয়ামী জুলুম নির্যাতনের প্রতিবাদে ও নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ২৬ অক্টোবর ২০১৩ শনিবার জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোটের ডাকা হরতালের সমর্থনে নারায়ে তাকবির শ্লোগানে মুখরিত বিক্ষোভ মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় কাজলা গেটে পৌঁছলে পুলিশ-র্যাব ও সাদা পোশাকধারী আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ভারী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে নিরস্ত্র শিবির কর্মীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুহুর্মুহ গুলিবর্ষণ করে। এই মিছিলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে রাশিদুল হক রান্টু নিজের রক্তে রাঙ্গিয়ে দেন মতিহারের সবুজ চত্বর। আহত ও মুমুর্ষু অবস্থায় তাকে জরুরী ভাবে ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে ভর্তি করার কয়েক মিনিট পরেই তারুণ্যদীপ্ত প্রিয় সাথীদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যান, পান করেন শাহাদাতের অমিয় সুধা।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
রাশিদুল হক রান্টু সব সময় হাসিখুশি থাকতেন এবং বলতেন এটাই দাওয়াতী চরিত্র। সহপাঠিদের প্রিয় রান্টু বন্ধুদের মাঝে দাওয়াতী কাজের জন্য সব সময় পেরেশান থাকতেন। প্রতিবেশীদের বিপদ যেন ছিল তারই বিপদ, সবার আগে ছুটে যেতেন তিনি। "আল্লাহকে যারা বেসেছে ভালো দুঃখ কি আর তাদের থাকতে পারে"- এই গানটি যেন সব সময় তার মুখে লেগে থাকতো। আন্দোলনের কাজে কখনো পিছে পড়তেন না তিনি। প্রিয় সাথীদের কাছে সব সময় বলতেন আল্লাহ যেন আমাকে শহীদ হিসাবে কবুল করেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ।
ঘটনাটি ঘটে ২৬ অক্টোবর ২০১৩ রোজ শনিবার। ঐদিন বিকেল ৪.৩০ ঘটিকায় কেন্দ্রঘোষিত ১৮ দলীয় জোটের ডাকা হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ সমাবেশ ছিলো। সেই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কাজলা গেটে পৌঁছার আগেই পুলিশ-র্যাব-সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের ভারী আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে সে। জরুরিভাবে ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার কয়েক মিনিট পরেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শরীরে একে-৪৭রাইফেলের ২টি গুলি এবং শর্টগানের ৯টি গুলির চিহ্ন থেকে তখনও রক্ত ঝরছিলো।
সন্ধ্যা থেকে শহীদের সাথী এবং স্বজনদের আহাজারী আর কান্নার সুরে এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হলেও র্যাব ও পুলিশের সাজানো নাটকের মহড়া এগিয়ে যেতে থাকে। সন্ধ্যা ৭.৩০ টায় লাশ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। পথিমধ্যে পুলিশ লাশবাহী গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভারকেও মারধর করে।
সারা রাতের নাটক শেষে পরদিন সকালে পোস্টমর্টেমের আশ্বাস নিয়ে পরিজনেরা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসে। সকাল থেকে শুরু হয় নতুন নাটক। এই নির্মম হত্যাকান্ডের দায়ভার র্যাব-পুলিশ কেউ নিতে
রাজি নয়। হার্টএ্যাটাকে মারা গেছে বলে চালিয়ে দিতে ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারকে চাপ দেয় কর্তৃপক্ষ। দেহে গুলির দগদগে চিহ্ন সত্ত্বেও এমন রিপোর্ট দেয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক ভাবেননি ডাক্তার। তাই আরেক নাটক সাজানোর চেষ্টা চলে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ অস্ত্রের গুলিতে নিহত হয়েছে বলে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি কয়ে পোস্ট মর্টেম করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। ডাক্তার রাজি না হওয়ায় তার লাশ নিয়ে নাটক চলে ৪০ ঘণ্টা ধরে। অবশেষে সঠিক প্রোটকল ছাড়াই পোস্টমর্টেম শেষ করে শহীদের লাশ নিজ বাড়িতে পৌঁছায় বেলা ২টায়। বাদ আসর খোঁজাপুর গোরস্থান ময়দানে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় ১৫ হাজার মানুষের চলে জনসমুদ্রে পরিণত হয় জানাজাস্থল। মহানগর আমীর জননেতা আতাউর রহমানের ইমামতিতে হাজার হাজার মানুষ জানাজায় শামিল হয়ে চোখের পানি ফেলে দোয়া করেন শহীদের জন্য। গণমানুষের ঢল দেখে বারবার মনে হচ্ছিল, শহীদের রক্তের সিঁড়ি বেয়েই ইসলামের বিজয় সূচিত হবে ইনশাআল্লাহ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক মোঃ আফজাল হোসেন লিখেছেন-
"জোহরের নামাজ শেষ করে সকলে সামান্য কিছু খাওয়া দাওয়া শেষ করে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বাসা থেকে বের হয়ে খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে আমরা ধরমপুর মতিহার থানার আমজাদের মোড়ে এসে জড় হই। বেলা ৩টায় গোটা মোড় জনশক্তিতে ভরে যায়। চারিদিকে শুধু নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার, একদফা একদাবি শেখ হাসিনা কবে যাবি, এই মুহূর্তে দরকার কেয়ারটেকার সরকার ইত্যাদি শ্লোগানে মুখরিত। চারদিক থেকে মিছিল আসছে। শুনলাম, ছাত্রশিবির ডাঁশমারী অঞ্চল থেকে একটা বিশাল মিছিলের বহর আসছে। অপেক্ষা করতে থাকলাম, মিছিলকে অভিনন্দন জানানোর জন্য।
কিছুক্ষণ পর মিছিলটি আমজাদের মোড়ে এসে পৌঁছে। আমি ঠিক সামনে থেকে খেয়াল করলাম রাশেদুল ইসলাম রাষ্ট্রকে। সে মিছিলের সামনে ডান পাশে ব্যানারের এক প্রান্ত ধরে খুব আবেগতাড়িতকণ্ঠে জোরে জোরে শ্লোগান দিচ্ছিলো। রাষ্ট্র ছিল সুঠাম দেহের অধিকারী এবং সেদিন তাকে দেখতে অনেক সুন্দর লাগছিল। পরণে একটি ট্রাউজার, গায়ে আকাশি ও সাদা রঙের টানা টানা দাগওয়ালা গেঞ্জি। মিছিলটি যখন আমাদের সাথে এসে যুক্ত হয়, তখন আমরা প্রায় ২০০০ জনশক্তি নিয়ে আমজাদের মোড় থেকে কেডি ক্লাবের দিকে মিছিল নিয়ে এগোতে থাকি। সবার কণ্ঠে প্রতিবাদের শ্লোগান। মিছিল যখন কাজলা পানির ট্যাংকি বিশ্বরোডের কাছে পৌঁছায় তখন ঠিক বিকেল ৪টা বাজে।
হঠাৎ করে দেখি রোডের ডান দিক থেকে অর্থাৎ বিনোদপুরের দিক থেকে র্যাবের অনেক গাড়ি আসছে। গাড়িগুলো আসতে দেখে আমি জনশক্তিদের আটকিয়ে রাখলাম। রাস্তায় উঠতে দিলাম না। আমি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে গাড়িগুলোকে সাইড দিচ্ছিলাম। একে একে ৬টা গাড়ি আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। যেতে যেতে হঠাৎ করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই র্যাবের গাড়িগুলোর দরজা খুলেই এলোপাতাড়ি লাঠি পেটা শুরু করে। কী ব্যাপার? আমাদের এ কর্মসূচিতে তো প্রশাসন অনুমতি দিয়েছে তারপরও কেন এই লাঠিপেটা? কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অনুমতি থাকায় এখানে ছোট-বড় আবাল-বৃদ্ধ সবাই এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। হামলার প্রেক্ষিতে সেখানে হাজার হাজার জনশক্তি সবাই এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। র্যাবের পাশাপাশি দেখা যায় অনেক সাদা পোশাকে আওয়ামী সন্ত্রাসী যাদের সবার হাতে একে-৪৭সহ ভারী ভারী অস্ত্র। তারা যৌথভাবে আমাদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। চারিদিক মুহুর্মুহু গুলির শব্দ।
আমি সকল জনশক্তিকে নিয়ে কেডি ক্লাবের দিকে সরে যেতে লাগলাম। এরই ভেতরে দেখি অনেকে আমার সামনে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। আমি বারবার জনশক্তিকে পিছু হটতে বলেছিলাম। কারণ র্যাব ও সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে একে-৪৭সহ অত্যাধুনিক অস্ত্র, সেই অস্ত্রের সাথে আমরা কিছুতেই মোকাবেলা করতে পারবো না।
এরপর আমি বেশ কিছু জনশক্তিকে সাথে নিয়ে কাজলার কেডি ক্লাবের পূর্ব দিক দিয়ে আমজাদের মোড়ের দিকে যাওয়া শুরু করলাম। যাওয়ার কিছু সময় পর ভাঁশমারীর তৎকালীন সভাপতি আলম আমাকে ক্রন্দনরত কন্ঠে ফোন দিয়ে বললেন, "ভাই রান্টু গুলিবিদ্ধ হয়েছে।" এই কথা শুনে আমার বুকের ভেতরে হৃদপিন্ডটা কেঁপে উঠল। আমি বললাম কোথায়? তিনি বললেন, রেডিও সেন্টারের ভেতরে বরই বাগানে। আমি বললাম, তাকে উদ্ধার করে আমজাদের মোড় দিয়ে নিয়ে আসতে। আমি ভেবেছিলাম হয়তো রাবার বুলেট লেগেছে। এরপর আমি দ্রুত রাস্তায় উঠলাম। এর কিছুক্ষণ পর যখন রাষ্ট্রকে রিকশায় করে আমার কাছে নিয়ে এলো তখন আমি দেখলাম, তার বুকের ওপর বাম পাশে ফুসফুস বরাবর পেটের একটু ওপরে সামান্য ফুটো। আমার ডান হাতের আঙুলটা তার বুকের সেই গুলিবিদ্ধ ফুটো স্থানে দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম।
তখন সে খুব আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল এবং তার মুখের ডান দিক থেকে সাদা সাদা ফেনা বের হচ্ছিল। এবার দেখি আমার আঙুল তার সেই গুলিবিদ্ধ স্থান দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। আমি আর আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। মনে মনে ভাবলাম, হে আল্লাহ, তুমি পিতার একমাত্র সন্তানকে তোমার দ্বীনের জন্য কবুল করলে। কারণ তার যে স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়েছে তাতে করে আল্লাহর রহমত ছাড়া তার বাঁচা কোনোভাবে সম্ভব নয়। আমার দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। এরপর আমি তাকে দুই হাত দিয়ে আমার বুকে টেনে নিলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মোটরসাইকেল তুলে দিলাম তাকে হসপিটালে নেয়ার জন্য। কিন্তু সে আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছিলো যেন সে আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে। সে যে আর বাঁচবে না, আল্লাহ যে তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করবেন হয়তো সেটাই বারবার আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল। তার নিস্তেজ দেহটা আমার বুকের সাথে যেন লেগে গেছে। তার মাথাটা আমার কাঁধে ঝুলে আছে।
আমি ও তাজমিনুর তারই মামাতো ভাই দুইজন মিলে তাকে মোটরসাইকেলের পেছনে তুলে দিলাম এবং পেছনে একজনকে তাকে ধরে রাখার জন্য দিলাম। তার পা দুটো মোটরসাইকেলের দুই পাশে ঝুলতে থাকে আর পেছন থেকে তাকে একজন চেপে ধরে মেডিকেলে নিয়ে যায়। তাকে আমার বুক থেকে নামানোর পর দেখি আমার গেঞ্জিটা রক্তে ভিজে গেছে। রাষ্ট্রকে হসপিটালে পাঠিয়ে দিয়ে আমরা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলাম।
এদিকে আসরের নামাজের সময় প্রায় শেষ হয়ে আসছিলো। এমন সময় ফোন এলো আমার মোবাইলে, "ভাই রান্টু আর বেঁচে নেই"। আমি ফোন পেয়ে কাউকে কিছু বললাম না। এই মুহূর্তে তাদের কথাটা বললে তারা সবাই ভেঙে পড়বে। আমি কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারবো না। কিন্তু কেন যেন আমার চোখের পানিকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। বারবার মনে পড়ছিল শহীদ শাহাদাতের বাসায় ঈদের দিনে রান্টুর সেই কান্নার দৃশ্য। শহীদ শাহাদাতের মা যখন শাহাদাতের মৃত্যুর কথা বর্ণনা করছিলেন তখন রান্টুর অনেক জোরে জোরে কান্নার শব্দ শুনে আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম। কিছুতেই তার কান্না থামছিল না। এর কিছুদিন পরই এই ঘটনা। আমার দু'চোখ দিয়ে পানি ঝরা দেখে জনশক্তিদের আর বুঝতে কষ্ট হলো না যে শহীদ রাশিদুল হক রান্টু আর বেঁচে নেই।
২৭ অক্টোবর সকালে পোস্টমর্টেমের আশ্বাস নিয়ে পরিজনেরা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দায়ভার র্যাব-পুলিশ কেউ নিতে রাজি হয় না। প্রথমে হার্টএ্যাটাকে মারা গেছে বলে চালিয়ে দিতে ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারকে চাপ দেয়। পরে নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গুলিতে নিহত হয়েছে বলে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে পোস্ট মর্টেম করতে নির্দেশ দেয়। ডাক্তার রাজি না হলে তাকে ঘুরতে হয় ৪০ ঘণ্টা। প্রথমে রামেক অধ্যক্ষ, পরে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, তারপর জেলা প্রশাসক সব শেষে পুলিশ কমিশনার। সঠিক প্রোটকল ছাড়াই পোস্টমর্টেম। পোস্টমর্টেম শেষ করে শহীদের লাশ নিজ বাড়ীতে পৌছায় বেলা ২টায়। খোঁজাপুর গোরস্থান ময়দানে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক হাজার জনতা জানাজায় শামিল হয়ে শহীদের জন্য দোয়া করেন।
আপনজনদের কথা
সিতা: "ইসলামী আন্দোলনের জন্য আমি আমার সন্তানকে হারিয়েছি, আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে সবর করছি।"
মাতা। "খাতকরা আমার কলিজার টুকরা সন্তানকে হত্যা করেছে, আমার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে, হত্যাকারীদের বিচারের ভার আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম। হে আল্লাহ! তুমি আমার রান্টুকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নাও।"
ছোট বোন: "আমার ভাইয়া ইসলামী আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে তারা যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়"
আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী। "রাশিদুল হক রান্টু অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ছিল, সে সব সময় আমাদের সম্মানের চোখে দেখতো এবং আমরাও তাকে খুব স্নেহ করতাম, তাকে হারিয়ে আমরা মর্মাহত"
শাহাদাতের পূর্বের ঘটনা।
"আল্লাহকে যারা বেসেছে ভালো দুঃখ কি আর তাদের থাকতে পারে" গানটি যেন সব সময় তার মুখে লেগেই থাকতো..
এক নজরে শহীদ রাশিদুল হক রাষ্ট্র
নাম: রাশিদুল হক রান্টু
পিতার নাম: মরহুম আমিনুল হক টুকু
মাতার নাম: রাশিদা, বয়স- ৫০, পেশা- গৃহিণী
ঠিকানা: ডাঁশমারি, মতিহার, রাজশাহী
সাংগঠনিক মান: সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির
সাংগঠনিক দায়িত্ব: অর্থ সম্পাদক, ২৯ নং ওয়ার্ড
শাহাদাতের তারিখ: ২৭ অক্টোবর ২০১৩, আসরের পর
শাহাদাতের ধরণ: মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍