শহীদ আলী আসগর খান রাহাত
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ আলী আসগর খান রাহাত, সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কায়েস্থরাইল গ্রামে জন্ম নেওয়া এক মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের তরুণ। যিনি ছাত্রজীবনে সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। মদন মোহন কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অনার্স শিক্ষার্থী রাহাত ধর্মীয় মূল্যবোধ, ন্যায়বোধ ও দায়িত্ববোধকে জীবনপথের মূল শক্তি মনে করতেন। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় আকস্মিক গুলিবর্ষণে গুরুতর আহত হয়ে তিনি দীর্ঘ নয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আদর্শিক বিশ্বাসে অটল থাকা এই তরুণের অকালপ্রয়াণ তার পরিবার, সহপাঠী ও এলাকাবাসীর হৃদয়ে গভীর শোকের দাগ রেখে গেছে। তাঁর জীবন তরুণ প্রজন্মকে ন্যায়, দায়িত্ব ও মানবিকতার প্রতি দৃঢ় থাকার অনুপ্রেরণা দেয়।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ আলী আসগর খান রাহাত
সিলেট মহানগরী
"গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুক স্ট্যাটাসে রাহাত খান লিখেছেন, 'আজ সারা বাংলাদেশে শহীদ হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে.... হে আল্লাহ তোমার অতি নগণ্য বান্দা হিসেবে আমায় তুমি কবুল কর। এই স্ট্যাটাস দেয়ার প্রায় ২১ ঘণ্টা পর ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় পুলিশের ছোড়া একটি গুলি আলী আজগর খান রাহাতের বুকের বাম পাশে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়। 'শহীদি মরণের স্বপ্নে বিভোর যুবক দীর্ঘ ৯ দিন মৃত্যুশয্যায় থাকার পর তার প্রতিদিনকার স্বপ্ন-কামনা-চাওয়ার কাঙ্ক্ষিত পথে পা বাড়ান (ইন্না---রাজিউন)। উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন একটাই কামনা.../একটাই স্বপ্ন../একটাই চাওয়া... একটাই মুক্তির পথ.../শহিদী মরণ....। ১২ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, আল্লাহ তুমি আমাকে তোমার দ্বীনের পথে শহীদ হওয়ার তওফিক দাও..... আমিন।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ আলী আসগর খান রাহাত সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কায়েস্থরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আমেরিকা প্রবাসী পিতা সুলেমান খান ও মাতা নুরজাহান বেগমের সন্তান শহীদ আলী আসগর খান রাহাত। তিনি ৩ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে সবার ছোট মাত্র ২২ বছরের এক তরতাজা তরুণ। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই সেলিম খান সরকারি কর্মকর্তা, ২য় ভাই শাকিল মা-বাবার সাথে আমেরিকা থাকেন। মেধাবী রাহাত ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য এবং মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সিলেট মহানগর ছাত্রশিবিরের সহ-সমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।
নগরীর দক্ষিণ সুরমার ২৫ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলী আসগর খান রাহাত ২০০৪ সালে কায়েস্থরাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এ বছরেই তিনি একই কলেজে অনার্স (ব্যবস্থাপনা) এ ভর্তি হন। ২০১২ সালে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন তিনি। এই অল্প বয়সে তার এই নির্মম মৃত্যুতে মদন মোহন কলেজের সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকমন্ডলী এবং এলাকার জনগণ শোকাহত। তারা রাহাত হত্যাকারী দোষী সেই সমস্ত পুলিশ সদস্যদের বিচার দাবি করেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই নামে-বেনামে তথাকথিত ট্রাইব্যুনাল সাজিয়ে আন্তর্জাতিক প্রহসনের বিচার মঞ্চস্থ করছে সরকার। সর্বশেষ বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে তারা অন্যায়ভাবে বিচারের নামে আন্তর্জাতিক নাটক মঞ্চস্থ করতে চলেছে। এই অন্যায়ের প্রতিবাদে গোটা বিশ্ববাসী আজ প্রতিবাদমুখর। এরই অংশ হিসেবে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার কক্সবাজারে আয়োজিত
মিছিলে গুলি করে শিবিরের ৩ নেতাসহ মোট ৬ জনকে খুন করে এই স্বৈরাচারী সরকার। এর প্রতিবাদে পরের দিন শনিবার দুপুরে আয়োজিত সিলেট ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে নগরীর নয়াসড়ক-মিরবক্সটুলা সড়কে পুলিশ পেছন দিক থেকে সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই শিবির নেতা রাহাত খানসহ আরও ১০-১২ নেতাকর্মী রাজপথে লুটিয়ে পড়েন। প্রথমে তাদেরকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আলী আসগর রাহাত খানের অবস্থার অবনতি হলে তাকে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স যোগে ঢাকায় পাঠিয়ে এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ও লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। এরপর তার শরীরে দুই দফা অস্ত্রোপচার করা হয়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখ শনিবার রাতে তৃতীয় দফা তার ফুসফুসে অস্ত্রোপচার করেন হাসপাতালের ডাক্তাররা। এরপর থেকে তার আর জ্ঞান ফেরেনি। ২৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার সকাল ১০টা থেকে তার রেসপিরেটরি সিস্টেম (শ্বাসক্রিয়া) পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর ১টার দিকে ডাক্তাররা তার লাইফ সাপোর্ট মেশিন খুলে নেন। ঠিক ১টা ৫ মিনিটেই তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
৩. তার শাহাদাতের বিস্তারিত বিবরণ
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার কক্সবাজারে আয়োজিত মিছিলে গুলি করে শিবিরের ৩ নেতাসহ মোট ৬ জনকে খুন করে এই স্বৈরাচারী সরকার। এর প্রতিবাদে পরের দিন শনিবার দুপুরে আয়োজিত সিলেট ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে নগরীর নয়াসড়ক-মিরবক্সটুলা সড়কে পুলিশ পেছন দিক থেকে সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই শিবির নেতা রাহাত খানসহ আরও ১০-১২ নেতাকর্মী রাজপথে লুটিয়ে পড়েন। জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক সমূহে এ বিষয়ে বিস্তর নিউজ আসে যার কিঞ্চিৎ এখানে দেওয়া হলো।
দৈনিক সংগ্রাম, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
সিলেটে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পেছন থেকে পুলিশের গুলি। গুলিবিদ্ধ ৫ আহত ২০। আজ অর্ধদিবস হরতাল
গুলিবিদ্ধ মহানগর শিবির নেতা রাহাত খান সংকটজনক অবস্থায়
সিলেট ব্যুরো: কক্সবাজারে সাঈদী মুক্তি পরিষদের মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে ৩ জন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট মহানগরের উদ্যোগে শান্তিপূর্ণ মিছিলে সিলেট কোতোয়ালি থানা পুলিশ নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। কোতোয়ালি থানার অতিউৎসাহী অফিসার ইনচার্জ আতাউর রহমান বাবুলের নির্দেশে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পিছন থেকে পুলিশ গুলি চালায়। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর চৌহাট্টাস্থ আরএন টাওয়ারের সামনে থেকে শুরু হওয়া মিছিলে পুলিশ কমপক্ষে ৫০ রাউন্ড শটগানের গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে মহানগর শিবির নেতা রাহাত খান ও ছাদিক আহমদসহ ৫ জন গুলিবিদ্ধ হন। রাহাতের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় এয়ার এম্যুলেন্সযোগে পাঠানো হয়েছে। অন্য ৪ জন গুলিবিদ্ধ শিবিরকর্মীকে স্থানীয় হাসপাতালে এবং আহতদের নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শিবির সন্দেহে নগরীর বিভিন্ন জায়গা থেকে পুলিশ কমপক্ষে ২০ জনকে আটক করেছে।
দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
এলাকায় শোকের ছায়া। ঢাকা থেকে লাশ আসার পর জানাযা
রোজাদার অবস্থায় সিলেটে পুলিশের গুলিতে আহত শিবির নেতা রাহাত ঢাকায় মারা গেছেন
কবির আহমদ, সিলেট: গত ১৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকাল সাড়ে
শহীদ আলী আসগর খান রাহাত
১০টায় সিলেট নগরীর নয়াসড়ক এলাকায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলিতে রোজাদার অবস্থায় আহত শিবির নেতা আলী আজগর খান রাহাত গত রোববার দুপুর দেড়টায় ঢাকা মহানগরীর এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ২৩ বছর। আজ মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাহাতের ময়নাতদন্ত শেষে সিলেটে লাশ আসার পর তার জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হবে। লাশ আসার ওপর নির্ভর করছে রাহাতের জানাযার নামাযের সময়সূচি। আমেরিকা প্রবাসী সোলেমান খান ও মিসেস খানের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র রাহাত খান ছিলেন একজন নির্বিবাদী তরুণ সমাজসেবী। এলাকার আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত-জাতীয় পার্টিসহ গোটা এলাকাবাসী শোকে নিথর হয়ে আছেন। বিচার দিলাম সকল বিচারকের শ্রেষ্ঠ বিচারক মহান রাববুল আলামিনের কাছে। এলাকায় যেন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কায়েস্তরাইল গ্রামের যুবলীগ নেতা সাহেদ আহমদ জানান, রাহাত খানকে আমরা আমাদের পরিবারের সদস্য মনে করতাম। যদিও দুই জন দুই রাজনৈতিক দল করি এবং আমার বয়সে অনেক ছোট কিন্তু সে ছিলো আমার আপন ভাইয়ের মতো। কায়েস্তরাইল গ্রামসহ গোটা এলাকাবাসী একজন মেধাবী ও নির্বিবাদী তরুণ সমাজসেবীকে হারিয়েছে। এই ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার কথা নয়। নগরীর দক্ষিণ সুরমার ২৫ নং ওয়ার্ডের কায়েস্তরাইল গ্রামের বাসিন্দা রাহাত খান ২০০৪ সালে কায়েস্তরাইল উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে একই কলেজে ম্যানেজমেন্ট (অনার্স) ১ম বর্ষে ভর্তি হন। ২০১২ সালে মেধাবী রাহাত ম্যানেজম্যান্ট অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ফলাফল প্রকাশ হওয়ার আগেই সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। কায়েস্তরাইল গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবী শহীদ রাহাত খানের গর্বিত পিতা সোলেমান খান সস্ত্রীক আমেরিকায় থাকেন। গতকাল সোমবার তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। রাহাত ৪ বোন ও ৩ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। বোন ৪ জনেরই বিবাহ হয়ে গিয়েছে। ৩ ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই সেলিম খান সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও), মেজ ভাই শাকিল খান আমেরিকায় বসবাস করেন। রাহাতও কিছু দিনের মধ্যে আমেরিকায় চলে যাওয়ার কথা। মেধাবী রাহাত খান ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নগর শিবিরের সহসমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। পুলিশের সাথে সংঘর্ষের দিন রাহাত নফল রোজা রেখে ছিলেন। প্রায়ই তিনি নফল রোজা রাখতেন।
পুলিশকে আর খুঁজতে হবে না রাহাতের বাসা
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নগরীর কোথাও শিবিরের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হলে রাতের বেলা পুলিশের রেডি থাকা এস্টল মামলায় রাহাতকে আসামি করা হত। সে ঢাকায় থাকলেও পুলিশ এই মামলায় তার নাম ঢুকিয়ে দিত। পুলিশের তৎকালীন দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি আবু শামা ইকবাল হায়াত রাহাতকে ধরার জন্য প্রতি রাতেই কায়েস্তরাইল গ্রামে আসতেন। সোর্সতো লাগানো থাকতোই। ২০১১ সালে রাহাত পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর সম্পূর্ণ একটি মিথ্যা মামলায় রাহাতকে রিমান্ডে নেন কোতোয়ালি থানার এসআই ও বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বাদল। প্রায়ই রাতে এসে দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশ রাহাত বাসায় এসেছে কি না খোঁজখবর নিত। রাহাত শাহাদত বরণ করায় দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশের দায়িত্ব কমে গেলো। এখন আর পুলিশকে খুঁজতে হবে না রাহাত খানের বাসা। তার মৃত্যুতে মদন মোহন কলেজের সকল ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকমন্ডলী শোকাহত। রাহাত হত্যাকারী দোষী সেই সমস্ত পুলিশ সদস্যদের বিচার দাবি করেন তারা।
দৈনিক মানবজমিন, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সিলেটে গুলিবিদ্ধ রাহাত ও সুহিনের মৃত্যু
মঙ্গলবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
সিলেট অফিস:
সিলেটে গুলিবিদ্ধ রাহাত ও সুহিন মারা গেছে। রাহাত মারা গেছে ঢাকার এ্যাপোলো
হাসপাতালে, সুহিন সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি হরতাল চলাকালে নগরীর নয়াসড়ক এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। এ সময় শিবির নেতা রাসেলও গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রাহাতকে প্রথমে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গুলির আঘাতে তার লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবস্থার অবনতি হলে ওই দিন বিকালে এয়ার এম্বুলেন্সযোগে তাকে ঢাকা এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার শরীরে কয়েক দফা অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও গত ২-৩ দিন ধরে আবার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনি মারা যান। নিহত রাহাত দক্ষিণ সুরমার কায়েস্থরাইল গ্রামের আমেরিকা প্রবাসী সোলেমান খানের ছেলে। ৪ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে রাহাত সবার ছোট। সে মদনমোহন কলেজের অনার্স ৪র্থ বর্ষের ছাত্র।
দৈনিক সংগ্রাম, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩।
স্বপ্নই ছিলো শাহাদতবরণের। 'হে আল্লাহ নগণ্য বান্দা হিসেবে আমাকে কবুল কর আজ শিবির নেতা রাহাতের জানাযার নামায সিলেট আলিয়া মাদরাসা ময়দানে
কবির আহমদ, সিলেট: সিলেট মদন মোহন কলেজের ব্যবস্থাপনা অনার্স চূড়ান্ত পর্বের ফলপ্রার্থী মেধাবী ছাত্র ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট মহানগর এর সদস্য ও সহসমাজসেবা সম্পাদক আলী আজগর খান রাহাত এর লাশ গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টায় সিলেট এসে পৌঁছার কথা। গতকাল বেলা আড়াইটায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের সদস্যরা তার লাশ নিয়ে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, লাশ সিলেট পৌঁছার পর পরিবারের সদস্য আত্মত্মীয়স্বজন তার বন্ধু বান্ধব শিক্ষকমন্ডলী তাকে শেষ বারের মতো দেখবেন। এর পর তার লাশ সিলেটের যে কোন হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হবে। আজ বুধবার মেধাবী শিবির নেতা দক্ষিণ সুরমার কায়েস্তরাইল গ্রামের নির্বিবাদী এই যুবকের ২টি জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হবে। ১ম জানাযার নামায সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা ময়দানে সকাল ১১টায় এবং ২য় জানাযার নামায দক্ষিণ সুরমাস্থ কায়েস্তরাইল শাহীঈদগাহ সংলগ্ন ময়দানে বাদ জোহর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাযা শেষে তাদের পারিবারিক গোরস্থানে তাকে চিরনিন্দ্রায় শায়িত করা হবে।
স্বপ্নই ছিলো শাহাদতবরণের
শাহাদতবরণের জন্য শিবির নেতা রাহাত খান মহান আল্লাহর দরবারে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করতেন। তার সকল সহপাঠীকে প্রায়ই তিনি জানাতেন শাহাদতের মৃত্যুর চেয়ে আর উত্তম মৃত্যু হয় না। শাহাদতের পেয়ালা পানের জন্য এই তরুণ বিভোর ছিলেন। এই ধরনের প্রার্থনা করার পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২১ ঘণ্টা পর পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন ইসলামী আন্দোলনের এই মর্দে মুজাহিদ এবং ৯দিন ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে গত সোমবার তিনি তার মহান রবের দরবারে চলে যান।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুক স্ট্যাটাসে রাহাত খান লিখেছেন, 'আজ সারা বাংলাদেশে শহীদ হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে.... হে আল্লাহ তোমার অতি নগণ্য বান্দা হিসেবে আমায় তুমি কবুল কর।'
এই স্ট্যাটাস দেয়ার প্রায় ২১ ঘণ্টা পর ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর চৌহাট্টায় 'আরএন' টাওয়ারের সামনে থেকে কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে ৩ জন নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভমিছিল বের করে সিলেট মহানগর শিবিরের নেতা-কর্মীরা। মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কমপক্ষে ৫০ রাউন্ড শটগানের গুলি, টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে।
পুলিশের ছোড়া একটি গুলি আলী আজগর খান রাহাতের বুকের বাম পাশে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে রাহাতের অবস্থার অবনতি হলে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স করে ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে নেয়া হয়। 'শহীদি মরণের' স্বপ্নে বিভোর যুবক দীর্ঘ ৯ দিন মৃত্যুশয্যায় থাকার পর গত সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় তার প্রতিদিনকার স্বপ্ন-কামনা-চাওয়ার কাঙ্ক্ষিত পথে পা বাড়ান (ইন্না---রাজিউন)। হযরত শাহজালালের পুণ্যভূমির রক্ত ভেজা ময়দান আবারও রাহাতের রক্তে লাল হয়ে রেখে গেল ইতিহাস-এমনটাই মনে করেন তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা।
উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন "একটাই কামনা.../একটাই স্বপ্ন../ একটাই চাওয়া.../ একটাই মুক্তির পথ..../ শহীদি মরণ....। ১২ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, আল্লাহ তুমি আমাকে তোমার দ্বীনের পথে শহীদ হওয়ার তওফিক দাও..... আমিন। ১৩ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, এসো এসো এসো বন্ধু কুরআনের পথে করি সংগ্রাম। বাতিলের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলি। উড্ডীন করি- আল্লাহর নাম।"
দৈনিক সংগ্রাম, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩।
সিলেট সরকারি আলীয়া মাদরাসা ময়দানে জানাযায় লাখো মানুষের ঢল
চোখের পানি ও হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসায় সিক্ত হয়ে চিরন্দ্রিায় শায়িত হলেন শহীদ রাহাত
ছবি: গতকাল বুধবার নগরীর ঐতিহাসিক আলিয়া মাদরাসা ময়দানে অনুষ্ঠিত মহানগর শিবির নেতা শহীদ আলী আজগর খান রাহাত-এর বিশাল জানাযার নামাযের একাংশ (ইনসেটে শহীদ রাহাত)
কবির আহমদ, সিলেট। লাখো মানুষের অজস্র চোখের পানি ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সিলেট মহানগর শিবিরের সহ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক শহীদ আলী আজগর খান রাহাত। মাত্র কদিন আগে যে মাঠে দাঁড়িয়ে তাফসির মাহফিলে 'নারায়ে তাকবির" এর স্লোগান তুলেছিলেন, ঠিক সেই জায়গায় লাখো জনতা অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে চিরবিদায় দিলেন রাহাতকে।
সিলেটের ঐতিহাসিক আলীয়া মাদরাসা মাঠে লাখো কুরআনপ্রেমিক জনতার বুকফাটা আর্তনাদ, হৃদয়বিদারী কান্না আর চোখের পানিতে শিবির নেতা শহীদ আলী আজগর খান রাহাতকে চিরবিদায় জানালো সিলেটবাসী। জানাযাপূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং ১৮ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে ডুকরে কেঁদে ওঠেন উপস্থিত লাখো মানুষ। এসময় সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। শহীদের পরিবারের সদস্য, সংগঠনের দায়িত্বশীল, আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধুদেরকে। নির্বাক করে দিয়ে দ্বীনের পথে শাহাদাতবরণ করে মহান রবের কাছে চলে গেলেন শহীদ রাহাত। অনার্স চূড়ান্ত বর্ষের ফলপ্রার্থী রাহাতকে শহীদ করার মাধ্যমে কুঁড়ি থেকে ফুল হওয়ার আগেই একটি সম্ভাবনাকে। দুনিয়া থেকে বিদায় করা হল। খুনিদের নির্মমতার জন্য আল্লাহর কাছে বিচার চাইলেন লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি। রাহাতের রেখে যাওয়া কাজ সম্পাদন করে বাংলার সবুজ ভূখন্ডে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করার মাধ্যমেই শহীদের রক্তের বদলা নেয়ার শপথ নেন তার সাথীরা।
গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় নগরী ঐতিহাসিক আলীয়া মাদরাসা ময়দানে মহানগর শিবির নেতা আলী আজগর খান রাহাতের বিশাল ১ম জানাযা লক্ষাধিক জনতার উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় শহীদের কফিন মাঠে উপস্থিত হলে লাশ দেখে হাউমাউ করে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদের সাথীরা। জানাযার পূর্বে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের আয়োজন করে সিলেট মহানগর জামায়াত। জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমীর এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সভাপতিত্বে ও মহানগর সেক্রেটারি সিরাজুল ইসলাম শাহীনের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শহীদ রাহাতের গর্বিত পিতা আমেরিকা প্রবাসী সুলেমান খান ও মেজো ভাই শাকিল খান। বিশাল জানাযায় ইমামতি করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সাবেক এমপি অধ্যক্ষ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট বিভাগীয় আঞ্চলিক দায়িত্বশীল অধ্যাপক ফজলুর রহমান, সিলেট জেলা দক্ষিণের আমীর মাওলানা হাবীবুর রহমান, সিলেট জেলা উত্তরের আমীর হাফিজ মাওলানা আনোয়ার হোসাইন খান, সুনামগঞ্জ জেলা আমীর হাতীমুর রহমান, মৌলভীবাজার জেলা আমীর আব্দুল মান্নান, শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সেক্রেটারি জেনারেলের প্রেরিত প্রতিনিধি কেন্দ্রীয় এইচআরডি সম্পাদক বদিউল আলম, ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট মহানগর সভাপতি আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপু, বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মাওলানা আব্দুল ওয়াহীদ চৌধুরী, সিলেট মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি নাসিম হোসাইন, ইসলামী ঐক্যজোট মহানগর সভাপতি মুফতী ফয়জুল হক জালালাবাদী, খেলাফত মজলিশ মহানগর সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান তাপাদার, লেবার পার্টি মহানগর সভাপতি মাহবুবুর রহমান খালেদ, বিশিষ্ট মুরব্বী ডা. নুরুল হক, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ, দোয়ারাবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান ডা. আব্দুল কুদ্দুস, জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল্লাহ আল হোসাইন, জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জালাল আহমদ প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, বর্তমান সরকার ইসলামের অবমাননাকারীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে কুরআনের পক্ষের ধর্মপ্রাণ মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছে। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শিবির নেতা শহীদ রাহাত। সারা বাংলাদেশে আজ লাশের স্তূপ। অবিলম্বে নির্মম হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করুন। পুলিশ নিরীহ জনতার ওপর গুলি চালাতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু কতিপয় অতিউৎসাহী পুলিশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে নিরীহ মানুষকে নৃশংসভাবে গুলি চালিয়ে এবং চোখ উপড়ে হত্যা করছে। অবিলম্বে রাহাতসহ বিভিন্ন নেতা-কর্মীর খুনের সাথে জড়িত পুলিশ ও সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসুন। অন্যথায় জনতার আদালতে একদিন তাদের বিচার হবেই ইনশাআল্লাহ।
শহীদের গ্রামের বাড়ি কায়েস্তরাইল শাহিঈদগাহ ময়দানে ২য় জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়। নামাজের পূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ, শহীদ রাহাতের বড় ভাই সেলিম খান, ২৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল জলিল নজরুল, ২৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা আশিক আহমদ, শহীদ রাহাতের শিক্ষক সাংবাদিক কবির আহমদ, কায়েস্তরাইল সমাজ কল্যাণ সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আলমগীর, মহানগর বিএনপি নেতা হেলাল আহমদ, জামায়াত নেতা মাওলানা মুজিবুর রহমান, রেহান আহমদ হারিস প্রমুখ। নামাযে জানাযার ইমামতি করেন মাওলানা মাহবুব আহমদ নঈমী। জানাযা শেষে তাকে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
কায়েস্তরাইল সমাজ কল্যাণ সমিতির নিন্দা ও শোক
সিলেট মহানগরীর ২৫নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ সুরমাস্থ কায়েস্তরাইল সমাজ কল্যাণ সমিতির সদস্য মদন মোহন কলেজের মেধাবী ছাত্র ও উদীয়মান সমাজসেবক আলী আজগর খান রাহাতের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সমিতির নেতৃবৃন্দ।
এক বিবৃতিতে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি নগরীর মীরবক্সটুলায় পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে গত সোমবার ঢাকায় মৃত্যুবরণ করায় সমিতির পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আলমগীর ও সেক্রেটারি তারেক আহমদ বিবৃতিতে দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি জানান। পাশাপাশি রাহাত খানের পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, তার মৃত্যুতে মদন মোহন কলেজসহ গোটা সিলেটবাসী হারিয়েছে এক সম্ভাবনাময় মেধাবী শিক্ষার্থীকে। ভবিষ্যতে তিনি দেশের কর্ণধার হওয়ার কথা। আর কায়েস্তরাইল সমাজ কল্যাণ সমিতি হারিয়েছে তাদের একজন উদীয়মান নিবেদিতপ্রাণ নির্বিবাদী সদস্যকে। যা কোন দিন পূরণ হওয়ার নয়। মহান আল্লাহ রাববুল আলামীন যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।
৪. শাহাদাতের পূর্বের স্মৃতি
আহত হওয়ার দুই দিন পূর্বে আঞ্জুমানের তাফসির মাহফিলে ঐতিহাসিক আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে ছিলেন রাহাত। রাহাতের এক সহযোদ্ধা জানান, তাফসীর মাহফিলের অতিথি মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম যখন চারিত্রিক গুণাবলীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিত্ব প্রখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জন্য দোয়া করছিলেন তখন রাহাত হাউমাউ করে কেঁদে তার শাহাদাতের বাসনা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে পেশ করছিলেন। পরদিন শনিবার বাসা থেকে রোজাদার অবস্থায় তিনি বের হয়ে ছাত্রশিবিরের মিছিলে যোগ দেন। পরিবারের কাছ থেকে জানা গেছে, রাহাত প্রায়ই রোজা রাখতেন। সর্বশেষ রোজাদার অবস্থায়ই তিনি পুলিশের গুলিতে আহত হন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নগরীর কোথাও ছাত্রশিবিরের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হলে রাতের বেলা পুলিশের রেডি থাকা এস্টল মামলায় রাহাতকে আসামি করা হত। সে ঢাকায় থাকলেও পুলিশ এই মামলায় তার নাম ঢুকিয়ে দিত। পুলিশের তৎকালীন দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি আবু শামা ইকবাল হায়াত রাহাতকে ধরার জন্য প্রতি রাতেই কায়েস্থরাইল গ্রামে আসত। সোর্স তো লাগানো থাকতোই। ২০১১ সালে রাহাত পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি মামলায় রাহাতকে রিমান্ডে নেন কোতোয়ালি থানার এসআই ও বন্দর বাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বাদল। প্রায়ই রাতে এসে দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশ রাহাত বাসায় এসেছে কি না খোঁজ-খবর নিত। আর শহীদ রাহাত বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে খেয়ে না খেয়ে রাত কাটাতেন। কখনও বা এক বাড়ি থেকে ভাত আর অন্য বাড়ি থেকে তরকারি নিয়ে খেতেন। তিনি শাহাদত বরণ করায় দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশের দায়িত্ব কমে গেলো। এখন আর পুলিশকে খুঁজতে হবে না রাহাত খানের বাসা।
৫. শহীদ আলী আসগর রাহাতের ফেইসবুক থেকে
২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩: শহীদের মিছিলে নাম লিখাতে এসো মুসলিম ভাই।
৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩: শাহাদাত আমার অতীব তৃষার পানি, পেছনে ফেরার কোন পথ আমি খোলা রাখিনি।। ইয়া আল্লাহ তুমি কবুল করো।
৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩: 'মরতেই হবে যখন শহীদি মরণ দিও আমাকে'।
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩: 'দিন এলো আবার, রক্ত ঝরাবার। জীবন দিয়ে শহীদ হয়ে বিজয় নিশান ওড়াবার।
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ঃ একটাই কামনা, একটাই স্বপ্ন, একটাই চাওয়া, একটাই মুক্তির পথ শহীদি মরণ।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩:আল্লাহ তুমি আমাকে দ্বীনের পথে শহীদ হবার তৌফিক দাও। আমীন।
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩:আজ সারা বাংলাদেশে শহীদ হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। হে আল্লাহ, তোমার অতি নগণ্য একজন বান্দা হিসেবে আমায় তুমি কবুল করো।
৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ আলী আছগর খান রাহাত (০৮৯)।
পেশা: ছাত্র।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৯১ ইং, ২২ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বুকে গুলিবিদ্ধ।
শাহাদাতের তারিখ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, দুপুর ১টা ৫ মিনিট।
স্থান: এ্যাপোলো হাসপাতাল, ঢাকা। দাফন করা হয়। পারিবারিক কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: কায়েস্থরাইল, ২৫ নং ওয়ার্ড, ডাকঘর: দক্ষিণ সুরমা, থানা: সিলেট সদর, জেলা: সিলেট।
পিতা: সুলেমান খান, ৬৫ বছর, আমেরিকা প্রবাসী।
মাতা: নুরজাহান বেগম, ৫৫ বছর, আমেরিকা প্রবাসী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা সচ্ছল ও স্বাবলম্বী পরিবার। বর্তমানে প্রবাসী ছেলেদের উপার্জনে সংসার চলে।
ভাই-বোনের বিবরণ: সেলিম খান। শাকিল খান, আমেরিকা প্রবাসী।
আলী আসগর খান রাহাত, শহীদ।
সিলেট মহানগরী
"গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুক স্ট্যাটাসে রাহাত খান লিখেছেন, 'আজ সারা বাংলাদেশে শহীদ হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে.... হে আল্লাহ তোমার অতি নগণ্য বান্দা হিসেবে আমায় তুমি কবুল কর। এই স্ট্যাটাস দেয়ার প্রায় ২১ ঘণ্টা পর ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় পুলিশের ছোড়া একটি গুলি আলী আজগর খান রাহাতের বুকের বাম পাশে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়। 'শহীদি মরণের স্বপ্নে বিভোর যুবক দীর্ঘ ৯ দিন মৃত্যুশয্যায় থাকার পর তার প্রতিদিনকার স্বপ্ন-কামনা-চাওয়ার কাঙ্ক্ষিত পথে পা বাড়ান (ইন্না---রাজিউন)। উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন একটাই কামনা.../একটাই স্বপ্ন../একটাই চাওয়া... একটাই মুক্তির পথ.../শহিদী মরণ....। ১২ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, আল্লাহ তুমি আমাকে তোমার দ্বীনের পথে শহীদ হওয়ার তওফিক দাও..... আমিন।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ আলী আসগর খান রাহাত সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কায়েস্থরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আমেরিকা প্রবাসী পিতা সুলেমান খান ও মাতা নুরজাহান বেগমের সন্তান শহীদ আলী আসগর খান রাহাত। তিনি ৩ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে সবার ছোট মাত্র ২২ বছরের এক তরতাজা তরুণ। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই সেলিম খান সরকারি কর্মকর্তা, ২য় ভাই শাকিল মা-বাবার সাথে আমেরিকা থাকেন। মেধাবী রাহাত ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য এবং মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সিলেট মহানগর ছাত্রশিবিরের সহ-সমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।
নগরীর দক্ষিণ সুরমার ২৫ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলী আসগর খান রাহাত ২০০৪ সালে কায়েস্থরাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এ বছরেই তিনি একই কলেজে অনার্স (ব্যবস্থাপনা) এ ভর্তি হন। ২০১২ সালে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন তিনি। এই অল্প বয়সে তার এই নির্মম মৃত্যুতে মদন মোহন কলেজের সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকমন্ডলী এবং এলাকার জনগণ শোকাহত। তারা রাহাত হত্যাকারী দোষী সেই সমস্ত পুলিশ সদস্যদের বিচার দাবি করেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই নামে-বেনামে তথাকথিত ট্রাইব্যুনাল সাজিয়ে আন্তর্জাতিক প্রহসনের বিচার মঞ্চস্থ করছে সরকার। সর্বশেষ বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে তারা অন্যায়ভাবে বিচারের নামে আন্তর্জাতিক নাটক মঞ্চস্থ করতে চলেছে। এই অন্যায়ের প্রতিবাদে গোটা বিশ্ববাসী আজ প্রতিবাদমুখর। এরই অংশ হিসেবে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার কক্সবাজারে আয়োজিত
মিছিলে গুলি করে শিবিরের ৩ নেতাসহ মোট ৬ জনকে খুন করে এই স্বৈরাচারী সরকার। এর প্রতিবাদে পরের দিন শনিবার দুপুরে আয়োজিত সিলেট ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে নগরীর নয়াসড়ক-মিরবক্সটুলা সড়কে পুলিশ পেছন দিক থেকে সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই শিবির নেতা রাহাত খানসহ আরও ১০-১২ নেতাকর্মী রাজপথে লুটিয়ে পড়েন। প্রথমে তাদেরকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আলী আসগর রাহাত খানের অবস্থার অবনতি হলে তাকে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স যোগে ঢাকায় পাঠিয়ে এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ও লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। এরপর তার শরীরে দুই দফা অস্ত্রোপচার করা হয়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখ শনিবার রাতে তৃতীয় দফা তার ফুসফুসে অস্ত্রোপচার করেন হাসপাতালের ডাক্তাররা। এরপর থেকে তার আর জ্ঞান ফেরেনি। ২৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার সকাল ১০টা থেকে তার রেসপিরেটরি সিস্টেম (শ্বাসক্রিয়া) পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর ১টার দিকে ডাক্তাররা তার লাইফ সাপোর্ট মেশিন খুলে নেন। ঠিক ১টা ৫ মিনিটেই তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
৩. তার শাহাদাতের বিস্তারিত বিবরণ
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার কক্সবাজারে আয়োজিত মিছিলে গুলি করে শিবিরের ৩ নেতাসহ মোট ৬ জনকে খুন করে এই স্বৈরাচারী সরকার। এর প্রতিবাদে পরের দিন শনিবার দুপুরে আয়োজিত সিলেট ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে নগরীর নয়াসড়ক-মিরবক্সটুলা সড়কে পুলিশ পেছন দিক থেকে সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই শিবির নেতা রাহাত খানসহ আরও ১০-১২ নেতাকর্মী রাজপথে লুটিয়ে পড়েন। জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক সমূহে এ বিষয়ে বিস্তর নিউজ আসে যার কিঞ্চিৎ এখানে দেওয়া হলো।
দৈনিক সংগ্রাম, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
সিলেটে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পেছন থেকে পুলিশের গুলি। গুলিবিদ্ধ ৫ আহত ২০। আজ অর্ধদিবস হরতাল
গুলিবিদ্ধ মহানগর শিবির নেতা রাহাত খান সংকটজনক অবস্থায়
সিলেট ব্যুরো: কক্সবাজারে সাঈদী মুক্তি পরিষদের মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে ৩ জন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট মহানগরের উদ্যোগে শান্তিপূর্ণ মিছিলে সিলেট কোতোয়ালি থানা পুলিশ নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। কোতোয়ালি থানার অতিউৎসাহী অফিসার ইনচার্জ আতাউর রহমান বাবুলের নির্দেশে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পিছন থেকে পুলিশ গুলি চালায়। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর চৌহাট্টাস্থ আরএন টাওয়ারের সামনে থেকে শুরু হওয়া মিছিলে পুলিশ কমপক্ষে ৫০ রাউন্ড শটগানের গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে মহানগর শিবির নেতা রাহাত খান ও ছাদিক আহমদসহ ৫ জন গুলিবিদ্ধ হন। রাহাতের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় এয়ার এম্যুলেন্সযোগে পাঠানো হয়েছে। অন্য ৪ জন গুলিবিদ্ধ শিবিরকর্মীকে স্থানীয় হাসপাতালে এবং আহতদের নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শিবির সন্দেহে নগরীর বিভিন্ন জায়গা থেকে পুলিশ কমপক্ষে ২০ জনকে আটক করেছে।
দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
এলাকায় শোকের ছায়া। ঢাকা থেকে লাশ আসার পর জানাযা
রোজাদার অবস্থায় সিলেটে পুলিশের গুলিতে আহত শিবির নেতা রাহাত ঢাকায় মারা গেছেন
কবির আহমদ, সিলেট: গত ১৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকাল সাড়ে
শহীদ আলী আসগর খান রাহাত
১০টায় সিলেট নগরীর নয়াসড়ক এলাকায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলিতে রোজাদার অবস্থায় আহত শিবির নেতা আলী আজগর খান রাহাত গত রোববার দুপুর দেড়টায় ঢাকা মহানগরীর এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ২৩ বছর। আজ মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাহাতের ময়নাতদন্ত শেষে সিলেটে লাশ আসার পর তার জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হবে। লাশ আসার ওপর নির্ভর করছে রাহাতের জানাযার নামাযের সময়সূচি। আমেরিকা প্রবাসী সোলেমান খান ও মিসেস খানের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র রাহাত খান ছিলেন একজন নির্বিবাদী তরুণ সমাজসেবী। এলাকার আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত-জাতীয় পার্টিসহ গোটা এলাকাবাসী শোকে নিথর হয়ে আছেন। বিচার দিলাম সকল বিচারকের শ্রেষ্ঠ বিচারক মহান রাববুল আলামিনের কাছে। এলাকায় যেন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কায়েস্তরাইল গ্রামের যুবলীগ নেতা সাহেদ আহমদ জানান, রাহাত খানকে আমরা আমাদের পরিবারের সদস্য মনে করতাম। যদিও দুই জন দুই রাজনৈতিক দল করি এবং আমার বয়সে অনেক ছোট কিন্তু সে ছিলো আমার আপন ভাইয়ের মতো। কায়েস্তরাইল গ্রামসহ গোটা এলাকাবাসী একজন মেধাবী ও নির্বিবাদী তরুণ সমাজসেবীকে হারিয়েছে। এই ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার কথা নয়। নগরীর দক্ষিণ সুরমার ২৫ নং ওয়ার্ডের কায়েস্তরাইল গ্রামের বাসিন্দা রাহাত খান ২০০৪ সালে কায়েস্তরাইল উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে একই কলেজে ম্যানেজমেন্ট (অনার্স) ১ম বর্ষে ভর্তি হন। ২০১২ সালে মেধাবী রাহাত ম্যানেজম্যান্ট অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ফলাফল প্রকাশ হওয়ার আগেই সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। কায়েস্তরাইল গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবী শহীদ রাহাত খানের গর্বিত পিতা সোলেমান খান সস্ত্রীক আমেরিকায় থাকেন। গতকাল সোমবার তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। রাহাত ৪ বোন ও ৩ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। বোন ৪ জনেরই বিবাহ হয়ে গিয়েছে। ৩ ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই সেলিম খান সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও), মেজ ভাই শাকিল খান আমেরিকায় বসবাস করেন। রাহাতও কিছু দিনের মধ্যে আমেরিকায় চলে যাওয়ার কথা। মেধাবী রাহাত খান ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নগর শিবিরের সহসমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। পুলিশের সাথে সংঘর্ষের দিন রাহাত নফল রোজা রেখে ছিলেন। প্রায়ই তিনি নফল রোজা রাখতেন।
পুলিশকে আর খুঁজতে হবে না রাহাতের বাসা
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নগরীর কোথাও শিবিরের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হলে রাতের বেলা পুলিশের রেডি থাকা এস্টল মামলায় রাহাতকে আসামি করা হত। সে ঢাকায় থাকলেও পুলিশ এই মামলায় তার নাম ঢুকিয়ে দিত। পুলিশের তৎকালীন দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি আবু শামা ইকবাল হায়াত রাহাতকে ধরার জন্য প্রতি রাতেই কায়েস্তরাইল গ্রামে আসতেন। সোর্সতো লাগানো থাকতোই। ২০১১ সালে রাহাত পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর সম্পূর্ণ একটি মিথ্যা মামলায় রাহাতকে রিমান্ডে নেন কোতোয়ালি থানার এসআই ও বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বাদল। প্রায়ই রাতে এসে দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশ রাহাত বাসায় এসেছে কি না খোঁজখবর নিত। রাহাত শাহাদত বরণ করায় দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশের দায়িত্ব কমে গেলো। এখন আর পুলিশকে খুঁজতে হবে না রাহাত খানের বাসা। তার মৃত্যুতে মদন মোহন কলেজের সকল ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকমন্ডলী শোকাহত। রাহাত হত্যাকারী দোষী সেই সমস্ত পুলিশ সদস্যদের বিচার দাবি করেন তারা।
দৈনিক মানবজমিন, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সিলেটে গুলিবিদ্ধ রাহাত ও সুহিনের মৃত্যু
মঙ্গলবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
সিলেট অফিস:
সিলেটে গুলিবিদ্ধ রাহাত ও সুহিন মারা গেছে। রাহাত মারা গেছে ঢাকার এ্যাপোলো
হাসপাতালে, সুহিন সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি হরতাল চলাকালে নগরীর নয়াসড়ক এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। এ সময় শিবির নেতা রাসেলও গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রাহাতকে প্রথমে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গুলির আঘাতে তার লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবস্থার অবনতি হলে ওই দিন বিকালে এয়ার এম্বুলেন্সযোগে তাকে ঢাকা এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার শরীরে কয়েক দফা অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও গত ২-৩ দিন ধরে আবার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনি মারা যান। নিহত রাহাত দক্ষিণ সুরমার কায়েস্থরাইল গ্রামের আমেরিকা প্রবাসী সোলেমান খানের ছেলে। ৪ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে রাহাত সবার ছোট। সে মদনমোহন কলেজের অনার্স ৪র্থ বর্ষের ছাত্র।
দৈনিক সংগ্রাম, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩।
স্বপ্নই ছিলো শাহাদতবরণের। 'হে আল্লাহ নগণ্য বান্দা হিসেবে আমাকে কবুল কর আজ শিবির নেতা রাহাতের জানাযার নামায সিলেট আলিয়া মাদরাসা ময়দানে
কবির আহমদ, সিলেট: সিলেট মদন মোহন কলেজের ব্যবস্থাপনা অনার্স চূড়ান্ত পর্বের ফলপ্রার্থী মেধাবী ছাত্র ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট মহানগর এর সদস্য ও সহসমাজসেবা সম্পাদক আলী আজগর খান রাহাত এর লাশ গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টায় সিলেট এসে পৌঁছার কথা। গতকাল বেলা আড়াইটায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের সদস্যরা তার লাশ নিয়ে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, লাশ সিলেট পৌঁছার পর পরিবারের সদস্য আত্মত্মীয়স্বজন তার বন্ধু বান্ধব শিক্ষকমন্ডলী তাকে শেষ বারের মতো দেখবেন। এর পর তার লাশ সিলেটের যে কোন হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হবে। আজ বুধবার মেধাবী শিবির নেতা দক্ষিণ সুরমার কায়েস্তরাইল গ্রামের নির্বিবাদী এই যুবকের ২টি জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হবে। ১ম জানাযার নামায সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা ময়দানে সকাল ১১টায় এবং ২য় জানাযার নামায দক্ষিণ সুরমাস্থ কায়েস্তরাইল শাহীঈদগাহ সংলগ্ন ময়দানে বাদ জোহর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাযা শেষে তাদের পারিবারিক গোরস্থানে তাকে চিরনিন্দ্রায় শায়িত করা হবে।
স্বপ্নই ছিলো শাহাদতবরণের
শাহাদতবরণের জন্য শিবির নেতা রাহাত খান মহান আল্লাহর দরবারে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করতেন। তার সকল সহপাঠীকে প্রায়ই তিনি জানাতেন শাহাদতের মৃত্যুর চেয়ে আর উত্তম মৃত্যু হয় না। শাহাদতের পেয়ালা পানের জন্য এই তরুণ বিভোর ছিলেন। এই ধরনের প্রার্থনা করার পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২১ ঘণ্টা পর পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন ইসলামী আন্দোলনের এই মর্দে মুজাহিদ এবং ৯দিন ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে গত সোমবার তিনি তার মহান রবের দরবারে চলে যান।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুক স্ট্যাটাসে রাহাত খান লিখেছেন, 'আজ সারা বাংলাদেশে শহীদ হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে.... হে আল্লাহ তোমার অতি নগণ্য বান্দা হিসেবে আমায় তুমি কবুল কর।'
এই স্ট্যাটাস দেয়ার প্রায় ২১ ঘণ্টা পর ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর চৌহাট্টায় 'আরএন' টাওয়ারের সামনে থেকে কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে ৩ জন নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভমিছিল বের করে সিলেট মহানগর শিবিরের নেতা-কর্মীরা। মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কমপক্ষে ৫০ রাউন্ড শটগানের গুলি, টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে।
পুলিশের ছোড়া একটি গুলি আলী আজগর খান রাহাতের বুকের বাম পাশে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে রাহাতের অবস্থার অবনতি হলে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স করে ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে নেয়া হয়। 'শহীদি মরণের' স্বপ্নে বিভোর যুবক দীর্ঘ ৯ দিন মৃত্যুশয্যায় থাকার পর গত সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় তার প্রতিদিনকার স্বপ্ন-কামনা-চাওয়ার কাঙ্ক্ষিত পথে পা বাড়ান (ইন্না---রাজিউন)। হযরত শাহজালালের পুণ্যভূমির রক্ত ভেজা ময়দান আবারও রাহাতের রক্তে লাল হয়ে রেখে গেল ইতিহাস-এমনটাই মনে করেন তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা।
উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন "একটাই কামনা.../একটাই স্বপ্ন../ একটাই চাওয়া.../ একটাই মুক্তির পথ..../ শহীদি মরণ....। ১২ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, আল্লাহ তুমি আমাকে তোমার দ্বীনের পথে শহীদ হওয়ার তওফিক দাও..... আমিন। ১৩ ফেব্রুয়ারি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, এসো এসো এসো বন্ধু কুরআনের পথে করি সংগ্রাম। বাতিলের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলি। উড্ডীন করি- আল্লাহর নাম।"
দৈনিক সংগ্রাম, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩।
সিলেট সরকারি আলীয়া মাদরাসা ময়দানে জানাযায় লাখো মানুষের ঢল
চোখের পানি ও হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসায় সিক্ত হয়ে চিরন্দ্রিায় শায়িত হলেন শহীদ রাহাত
ছবি: গতকাল বুধবার নগরীর ঐতিহাসিক আলিয়া মাদরাসা ময়দানে অনুষ্ঠিত মহানগর শিবির নেতা শহীদ আলী আজগর খান রাহাত-এর বিশাল জানাযার নামাযের একাংশ (ইনসেটে শহীদ রাহাত)
কবির আহমদ, সিলেট। লাখো মানুষের অজস্র চোখের পানি ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সিলেট মহানগর শিবিরের সহ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক শহীদ আলী আজগর খান রাহাত। মাত্র কদিন আগে যে মাঠে দাঁড়িয়ে তাফসির মাহফিলে 'নারায়ে তাকবির" এর স্লোগান তুলেছিলেন, ঠিক সেই জায়গায় লাখো জনতা অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে চিরবিদায় দিলেন রাহাতকে।
সিলেটের ঐতিহাসিক আলীয়া মাদরাসা মাঠে লাখো কুরআনপ্রেমিক জনতার বুকফাটা আর্তনাদ, হৃদয়বিদারী কান্না আর চোখের পানিতে শিবির নেতা শহীদ আলী আজগর খান রাহাতকে চিরবিদায় জানালো সিলেটবাসী। জানাযাপূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং ১৮ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে ডুকরে কেঁদে ওঠেন উপস্থিত লাখো মানুষ। এসময় সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। শহীদের পরিবারের সদস্য, সংগঠনের দায়িত্বশীল, আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধুদেরকে। নির্বাক করে দিয়ে দ্বীনের পথে শাহাদাতবরণ করে মহান রবের কাছে চলে গেলেন শহীদ রাহাত। অনার্স চূড়ান্ত বর্ষের ফলপ্রার্থী রাহাতকে শহীদ করার মাধ্যমে কুঁড়ি থেকে ফুল হওয়ার আগেই একটি সম্ভাবনাকে। দুনিয়া থেকে বিদায় করা হল। খুনিদের নির্মমতার জন্য আল্লাহর কাছে বিচার চাইলেন লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি। রাহাতের রেখে যাওয়া কাজ সম্পাদন করে বাংলার সবুজ ভূখন্ডে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করার মাধ্যমেই শহীদের রক্তের বদলা নেয়ার শপথ নেন তার সাথীরা।
গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় নগরী ঐতিহাসিক আলীয়া মাদরাসা ময়দানে মহানগর শিবির নেতা আলী আজগর খান রাহাতের বিশাল ১ম জানাযা লক্ষাধিক জনতার উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় শহীদের কফিন মাঠে উপস্থিত হলে লাশ দেখে হাউমাউ করে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদের সাথীরা। জানাযার পূর্বে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের আয়োজন করে সিলেট মহানগর জামায়াত। জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমীর এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সভাপতিত্বে ও মহানগর সেক্রেটারি সিরাজুল ইসলাম শাহীনের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শহীদ রাহাতের গর্বিত পিতা আমেরিকা প্রবাসী সুলেমান খান ও মেজো ভাই শাকিল খান। বিশাল জানাযায় ইমামতি করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সাবেক এমপি অধ্যক্ষ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট বিভাগীয় আঞ্চলিক দায়িত্বশীল অধ্যাপক ফজলুর রহমান, সিলেট জেলা দক্ষিণের আমীর মাওলানা হাবীবুর রহমান, সিলেট জেলা উত্তরের আমীর হাফিজ মাওলানা আনোয়ার হোসাইন খান, সুনামগঞ্জ জেলা আমীর হাতীমুর রহমান, মৌলভীবাজার জেলা আমীর আব্দুল মান্নান, শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সেক্রেটারি জেনারেলের প্রেরিত প্রতিনিধি কেন্দ্রীয় এইচআরডি সম্পাদক বদিউল আলম, ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট মহানগর সভাপতি আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপু, বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মাওলানা আব্দুল ওয়াহীদ চৌধুরী, সিলেট মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি নাসিম হোসাইন, ইসলামী ঐক্যজোট মহানগর সভাপতি মুফতী ফয়জুল হক জালালাবাদী, খেলাফত মজলিশ মহানগর সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান তাপাদার, লেবার পার্টি মহানগর সভাপতি মাহবুবুর রহমান খালেদ, বিশিষ্ট মুরব্বী ডা. নুরুল হক, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ, দোয়ারাবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান ডা. আব্দুল কুদ্দুস, জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল্লাহ আল হোসাইন, জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জালাল আহমদ প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, বর্তমান সরকার ইসলামের অবমাননাকারীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে কুরআনের পক্ষের ধর্মপ্রাণ মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছে। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শিবির নেতা শহীদ রাহাত। সারা বাংলাদেশে আজ লাশের স্তূপ। অবিলম্বে নির্মম হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করুন। পুলিশ নিরীহ জনতার ওপর গুলি চালাতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু কতিপয় অতিউৎসাহী পুলিশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে নিরীহ মানুষকে নৃশংসভাবে গুলি চালিয়ে এবং চোখ উপড়ে হত্যা করছে। অবিলম্বে রাহাতসহ বিভিন্ন নেতা-কর্মীর খুনের সাথে জড়িত পুলিশ ও সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসুন। অন্যথায় জনতার আদালতে একদিন তাদের বিচার হবেই ইনশাআল্লাহ।
শহীদের গ্রামের বাড়ি কায়েস্তরাইল শাহিঈদগাহ ময়দানে ২য় জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়। নামাজের পূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ, শহীদ রাহাতের বড় ভাই সেলিম খান, ২৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল জলিল নজরুল, ২৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা আশিক আহমদ, শহীদ রাহাতের শিক্ষক সাংবাদিক কবির আহমদ, কায়েস্তরাইল সমাজ কল্যাণ সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আলমগীর, মহানগর বিএনপি নেতা হেলাল আহমদ, জামায়াত নেতা মাওলানা মুজিবুর রহমান, রেহান আহমদ হারিস প্রমুখ। নামাযে জানাযার ইমামতি করেন মাওলানা মাহবুব আহমদ নঈমী। জানাযা শেষে তাকে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
কায়েস্তরাইল সমাজ কল্যাণ সমিতির নিন্দা ও শোক
সিলেট মহানগরীর ২৫নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ সুরমাস্থ কায়েস্তরাইল সমাজ কল্যাণ সমিতির সদস্য মদন মোহন কলেজের মেধাবী ছাত্র ও উদীয়মান সমাজসেবক আলী আজগর খান রাহাতের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সমিতির নেতৃবৃন্দ।
এক বিবৃতিতে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি নগরীর মীরবক্সটুলায় পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে গত সোমবার ঢাকায় মৃত্যুবরণ করায় সমিতির পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আলমগীর ও সেক্রেটারি তারেক আহমদ বিবৃতিতে দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি জানান। পাশাপাশি রাহাত খানের পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, তার মৃত্যুতে মদন মোহন কলেজসহ গোটা সিলেটবাসী হারিয়েছে এক সম্ভাবনাময় মেধাবী শিক্ষার্থীকে। ভবিষ্যতে তিনি দেশের কর্ণধার হওয়ার কথা। আর কায়েস্তরাইল সমাজ কল্যাণ সমিতি হারিয়েছে তাদের একজন উদীয়মান নিবেদিতপ্রাণ নির্বিবাদী সদস্যকে। যা কোন দিন পূরণ হওয়ার নয়। মহান আল্লাহ রাববুল আলামীন যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।
৪. শাহাদাতের পূর্বের স্মৃতি
আহত হওয়ার দুই দিন পূর্বে আঞ্জুমানের তাফসির মাহফিলে ঐতিহাসিক আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে ছিলেন রাহাত। রাহাতের এক সহযোদ্ধা জানান, তাফসীর মাহফিলের অতিথি মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম যখন চারিত্রিক গুণাবলীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিত্ব প্রখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জন্য দোয়া করছিলেন তখন রাহাত হাউমাউ করে কেঁদে তার শাহাদাতের বাসনা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে পেশ করছিলেন। পরদিন শনিবার বাসা থেকে রোজাদার অবস্থায় তিনি বের হয়ে ছাত্রশিবিরের মিছিলে যোগ দেন। পরিবারের কাছ থেকে জানা গেছে, রাহাত প্রায়ই রোজা রাখতেন। সর্বশেষ রোজাদার অবস্থায়ই তিনি পুলিশের গুলিতে আহত হন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নগরীর কোথাও ছাত্রশিবিরের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হলে রাতের বেলা পুলিশের রেডি থাকা এস্টল মামলায় রাহাতকে আসামি করা হত। সে ঢাকায় থাকলেও পুলিশ এই মামলায় তার নাম ঢুকিয়ে দিত। পুলিশের তৎকালীন দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি আবু শামা ইকবাল হায়াত রাহাতকে ধরার জন্য প্রতি রাতেই কায়েস্থরাইল গ্রামে আসত। সোর্স তো লাগানো থাকতোই। ২০১১ সালে রাহাত পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি মামলায় রাহাতকে রিমান্ডে নেন কোতোয়ালি থানার এসআই ও বন্দর বাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বাদল। প্রায়ই রাতে এসে দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশ রাহাত বাসায় এসেছে কি না খোঁজ-খবর নিত। আর শহীদ রাহাত বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে খেয়ে না খেয়ে রাত কাটাতেন। কখনও বা এক বাড়ি থেকে ভাত আর অন্য বাড়ি থেকে তরকারি নিয়ে খেতেন। তিনি শাহাদত বরণ করায় দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশের দায়িত্ব কমে গেলো। এখন আর পুলিশকে খুঁজতে হবে না রাহাত খানের বাসা।
৫. শহীদ আলী আসগর রাহাতের ফেইসবুক থেকে
২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩: শহীদের মিছিলে নাম লিখাতে এসো মুসলিম ভাই।
৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩: শাহাদাত আমার অতীব তৃষার পানি, পেছনে ফেরার কোন পথ আমি খোলা রাখিনি।। ইয়া আল্লাহ তুমি কবুল করো।
৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩: 'মরতেই হবে যখন শহীদি মরণ দিও আমাকে'।
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩: 'দিন এলো আবার, রক্ত ঝরাবার। জীবন দিয়ে শহীদ হয়ে বিজয় নিশান ওড়াবার।
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ঃ একটাই কামনা, একটাই স্বপ্ন, একটাই চাওয়া, একটাই মুক্তির পথ শহীদি মরণ।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩:আল্লাহ তুমি আমাকে দ্বীনের পথে শহীদ হবার তৌফিক দাও। আমীন।
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩:আজ সারা বাংলাদেশে শহীদ হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। হে আল্লাহ, তোমার অতি নগণ্য একজন বান্দা হিসেবে আমায় তুমি কবুল করো।
৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ আলী আছগর খান রাহাত (০৮৯)।
পেশা: ছাত্র।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৯১ ইং, ২২ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বুকে গুলিবিদ্ধ।
শাহাদাতের তারিখ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, দুপুর ১টা ৫ মিনিট।
স্থান: এ্যাপোলো হাসপাতাল, ঢাকা। দাফন করা হয়। পারিবারিক কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: কায়েস্থরাইল, ২৫ নং ওয়ার্ড, ডাকঘর: দক্ষিণ সুরমা, থানা: সিলেট সদর, জেলা: সিলেট।
পিতা: সুলেমান খান, ৬৫ বছর, আমেরিকা প্রবাসী।
মাতা: নুরজাহান বেগম, ৫৫ বছর, আমেরিকা প্রবাসী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা সচ্ছল ও স্বাবলম্বী পরিবার। বর্তমানে প্রবাসী ছেলেদের উপার্জনে সংসার চলে।
ভাই-বোনের বিবরণ: সেলিম খান। শাকিল খান, আমেরিকা প্রবাসী।
আলী আসগর খান রাহাত, শহীদ।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍