শহীদ মো: মতিউর রহমান
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ মোঃ মতিউর রহমান (০৯৭)। পেশা। দিনমজুর ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স। ১২,০২,১৯৬৮, ৪৭ বছর। আহত হওয়ার তারিখ। ২৯,০৩,২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ। ২৯.০৩.২০১৩, বিকাল ৩টা, স্থান। রাজশাহীতে নেওয়ার পথে ১.৩০ ঘন্টা পর তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। জানাজা নামাজ পড়ান জনাব নজরুল ইসলাম। দাফন করা হয়। বাড়ির পাশে কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। গোপান নগর, ডাকঘর। ভবানীপুর, ইউনিয়ন। শ্যামপুর, উপজেলা। শিবগঞ্জ,
জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
পিতা। মৃত জিল্লুর রহমান-৮৮ সালে।
মাতা। মৃত কায়েমা বেগম-২০০৩ সালে।।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ। স্ত্রী। সাবিনা ইয়াসমিন, গৃহিণী, ১ম ছেলে। মো। জামাল। বয়স ১৬ বছর, দিনমজুর, ধান কাটে। মেয়ে। হাজেরা খাতুন, বয়স ১৪ বছর, ১ম শ্রেণী। মেয়ে। আসমা খাতুন, বয়স ৮ বছর, ১ম শ্রেণীতে পড়ে।
ভাই-বোনের বিবরণ। রংফুল, বিবাহিত। রুহুল আমিন, শ্রমজীবী, ১৯৯৮ সালে মারা যায়। রুহিতন, বিবাহিতা। মুস্তারা, বিবাহিতা। শহীদ মতিউর রহমান।
জন্ম তারিখ ও বয়স। ১২,০২,১৯৬৮, ৪৭ বছর। আহত হওয়ার তারিখ। ২৯,০৩,২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ। ২৯.০৩.২০১৩, বিকাল ৩টা, স্থান। রাজশাহীতে নেওয়ার পথে ১.৩০ ঘন্টা পর তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। জানাজা নামাজ পড়ান জনাব নজরুল ইসলাম। দাফন করা হয়। বাড়ির পাশে কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। গোপান নগর, ডাকঘর। ভবানীপুর, ইউনিয়ন। শ্যামপুর, উপজেলা। শিবগঞ্জ,
জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
পিতা। মৃত জিল্লুর রহমান-৮৮ সালে।
মাতা। মৃত কায়েমা বেগম-২০০৩ সালে।।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ। স্ত্রী। সাবিনা ইয়াসমিন, গৃহিণী, ১ম ছেলে। মো। জামাল। বয়স ১৬ বছর, দিনমজুর, ধান কাটে। মেয়ে। হাজেরা খাতুন, বয়স ১৪ বছর, ১ম শ্রেণী। মেয়ে। আসমা খাতুন, বয়স ৮ বছর, ১ম শ্রেণীতে পড়ে।
ভাই-বোনের বিবরণ। রংফুল, বিবাহিত। রুহুল আমিন, শ্রমজীবী, ১৯৯৮ সালে মারা যায়। রুহিতন, বিবাহিতা। মুস্তারা, বিবাহিতা। শহীদ মতিউর রহমান।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"দাদা, দাদী, চাচা শব্দগুলির সত্যিকার মানে ঠিক মতো বুঝে না প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আট বছরের আসমা। তার জন্মের ১৭ বছর আগেই নাকি দাদা, ৭ বছর আগে একমাত্র চাচা আর দুই বছর আগেই গল্পবলার দাদু মারা গেছেন। আকছুই ছিল তার সমগ্র পৃথিবী, সেও চলে গেল দাদা-দাদুর পাশের কবরে। একমাত্র ভাইয়াটা তাকে খুব আদর করে, ১৬ বছরের সেই জামাল কাস্তে নিয়ে যাচ্ছে সংসারের প্রয়োজনে পরের ক্ষেতে কাজে। আসমা তার ছবির বইটা ঠেলে পান্ডুর মুখে মায়ের পাশে বসে ভাবে, জীবন কতই না কষ্টের।"
১. শহীদের পরিচিতি
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার গোপালনগর গ্রামে শহীদ মোঃ মতিউর রহমান ১৯৬৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম জিল্লুর রহমান এবং মাতা কায়েমা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা বলতে তিনি ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন এরপর সংসারে হাল ধরেছেন। পারিবারিক জীবনে তিনি বিবাহিত ছিলেন। তার ৩ মেয়ে ও ১ ছেলে সন্তান রয়েছে। তিনি ধানকাটা, আমবিক্রি কিংবা দিনমজুরি করে মাসে হাজার পাঁচেক টাকা পেতেন তাই দিয়ে কায়কষ্টে সংসার চালাতেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৯ মার্চ ২০১৩ তারিখে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পুলিশ ও বিজিবিকে সাথে নিয়ে তাদের এলাকার নিরীহ মানুষদের ওপর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালায়। শহীদ মোঃ মতিউর রহমান গ্রামবাসীর সাথে এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। পুলিশ ও বিজিবিসহ আওয়ামী বাহিনী গ্রামবাসীর প্রতিরোধে লুটপাট করতে না পেরে অতর্কিত শত শত রাউন্ড গুলি করে। নির্বিচার গুলিতে অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন। শহীদ মতিউর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হন। জুলুম কত প্রকার হতে পারে? চাঁপাইনবাবগঞ্জে চিকিৎসারত অবস্থায় আহত ব্যক্তি এবং তার সাহায্যকারীদের অতীতে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমতাবস্থায় তাকে চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে নেওয়ার পথে ১.৩০ ঘন্টা পর তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন।
শাহাদাতের পরেও পুলিশ নিষ্প্রাণ লাশটাও দেয় না। এটা কি তাদের লাশের ওপরই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, নাকি মানুষের গণবিক্ষোভের কয়? কিন্তু ছাই দিয়ে কি আগুন চেপে রাখা যায়, নাকি বালির বাঁধ দিয়ে স্রোতস্বিনীর ধারা। পুলিশ লাশ না দেওয়ায় প্রায় ৩৬ ঘন্টা পর শ্যামপুর ইউসি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তিনজনের গায়েবানা জানাযা একসাথে অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় ইমামতি করেন অধ্যাপক রকিবুল ইসলাম। এতে প্রায় ৩০ হাজারের অধিক লোক উপস্থিত ছিলেন। ৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২৯ মার্চ ২০১৩ তারিখে রাত ২:৩০ টায় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পুলিশ র্যাব ও বিজিবিসহ প্রায় তিনশতাধিক প্রশাসনিক লোককে সাথে নিয়ে শ্যামপুর ইউনিয়নে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালায়।
তারা আক্রমণ চালালে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রায় চার ঘন্টা যাবৎ অভিযান চালিয়ে তারা গ্রামে প্রবেশ করতে না পেরে বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণ করে। এতে শহীদ মতিউর রহমানসহ তিনজন ঘটনাস্থলেই শাহাদাৎ বরণ করেন। জাতীয় গণমাধ্যমে এ ব্যাপারে ৪ মার্চ ২০১৩ ব্যাপক নিউজ হয় দৈনিক সংগ্রাম লিখেঃ "চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিবগঞ্জ উপজেলায় আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা নিহত হবার পর গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রিতে উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রশাসন পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি'র হাজার হাজার সদস্যসহ এক সাঁড়াশি অভিযান চালায়। গ্রামবাসী উপায়ান্তর না দেখে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এতে ব্যাপক সংঘর্ষ বেধে গেলে পুলিশের গুলিতে ওজন নিহত ও অন্তত ১০০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে গ্রামবাসী জানিয়েছে। নিহতরা হচ্ছেন, শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের ওমরপুর গ্রামের ভুদর ছেলে রবিউল ইসলাম (২৪), গোপালনগর গ্রামের জিল্লুর রহমানের ছেলে মতিউর রহমান (৪৫) ও শরৎনগর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে অলিউল্লাহ (১৬)। সোনামসজিদ মহাসড়কের রসুলপুর, ইসরাইল মোড়, বেকির মোড়, কানসাট গোপালনগর মোড়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের উপ-রাজারামপুর, শিবতলা মোড়সহ বিভিন্ন পয়েন্টে কাঠের গুঁড়ি ও বিদ্যুতের পোল দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক অবরোধ করে মানুষ। সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে।
জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোট আহত এক সাংবাদিক সম্মেলনে জোটের সমন্বয়ক জেলা বিএনপি'র সভাপতি অধ্যাপক শাহজাহান মিঞা লিখিত বক্তব্যে, শিবগঞ্জের শ্যামপুরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিরস্ত্র ৩জন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে শনিবার জেলায় বিক্ষোভ মিছিল ও গায়েবানা জানাজা এবং আগামী রোববার জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালের আহবান করেন। তিনি আরো বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস পরিদর্শনে এসে পুলিশকে জনতার প্রতি গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেয়ার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে। তিনি পল্লী বিদ্যুতের ঘটনার দায় ১৮ দলীয় জোটের নেতা কর্মীদের ওপর চাপাতে চাইছেন কিন্তু আমি পরিষ্কার বলতে চাই ঐ ঘটনার দিন দুটি সাদা মাইক্রোবাসে কারা এসেছিল তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ মিছিল ঐ এলাকায় পৌঁছানোর পূর্বেই পল্লী বিদ্যুৎ ভবন জ্বলতে দেখা গেছে যা স্থানীয় জনতা সকলেই প্রত্যক্ষ করেছে। সাংবাদিক সম্মেলনে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক লতিফুর রহমান নিহত ৩জনকে তাদের সমর্থক বলে দাবি করেন।"
শনিবার ৩০ মার্চ ২০১৩, দৈনিক আমার দেশ লিখে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট ও কামাল হোসেন জানান,
বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটার দিকে হরতালের সময় সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি গ্রেফতারের নামে শিবগঞ্জের শ্যামপুর ইউনিয়নের গোপালনগর এলাকায় অভিযানে নামে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর সদস্যরা। তাদের সঙ্গে একজন ম্যাজিস্ট্রেটও ছিল। তারা গ্রামের নিরীহ কিছু লোককে আটকের চেষ্টা করলে বিক্ষুদ্ধ গ্রামবাসী তাদের অবরুদ্ধ করে। অবরুদ্ধ থাকার একপর্যায়ে রাত ৩টার দিকে পুলিশ ও বিজিবি নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে রাতেই তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায়। নিহতরা হলেন উমরপুর গ্রামের আবদুল হাকিমের ছেলে স্থানীয় স্বরূপনগর দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণীর ছাত্রশিবির কর্মী অলিউল্লাহ (১৭), শ্যামপুর গ্রামের তদু বিশ্বাসের ছেলে রবিউল ইসলাম রবু (২৫) ও শ্যামপুর চামাবাজার এলাকার জিল্লুর রহমানের ছেলে মতিউর রহমান (২৫)। নিহত মতিউর ও রবিউল পেশায় কৃষক বলে জানিয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্য। এছাড়াও আরও অন্তত ৬০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যার জন্যই ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে অভিযানে নেমেছে। সহিংসতায় জড়িত ছিল না এমন ব্যক্তিদেরকেও আটকের চেষ্টা করে পুলিশ। ফলে বিক্ষুদ্ধ গ্রামবাসী তাদের প্রতিরোধ করে। এ ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। খবর পেয়ে ভোরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে কানসাটে নিয়ে যান। গতকাল সকাল ১১টার দিকে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা আবারও শ্যামপুরে অভিযানে নামে। অভিযানের আগেই একরকম পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে এলাকা। গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে কমপক্ষে ২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গতকাল শ্যামপুর এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে পুলিশের নির্মমতার চিহ্ন। গ্রামের অনেক লোক কুড়িয়ে পাওয়া গুলির খোসা, গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি সাংবাদিকদের দেখান। নিহতদের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। নিহত মাদরাসা ছাত্র ওয়ালিউল্লাহর বাড়িতে গিয়ে তার মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনদের বুকফাটা আহাজারি করতে দেখা যায়। তাদের সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা কারও ছিল না। উপস্থিত সবাই ওয়ালিউল্লাহর জন্য ফেলেছেন চোখের পানি। ওয়ালিউল্লাহর বাবা আবদুল হাকিম জানান, রাত আড়াইটার দিকে হঠাৎ গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে তার। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুলেটের শব্দে আশপাশের লোকজনের সঙ্গে সে ও তার ছেলে বাড়ির বাইরে বের হয়। সামনে এগুতেই একটি গুলি ওয়ালিউল্লাহর ভান চোয়ালে ঢুকে বাঁদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ছটফট করতে করতে ইন্তেকাল করেন ওয়ালিউল্লাহ। তাকে হাসপাতালেও নেয়ার সময় পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, নিহত ও আহত অধিকাংশই আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একই অবস্থা বিরাজ করছে নিহত মতিউর ও রবিউলের বাড়িতে। রবিউলের বৃদ্ধ বাবা ভদু বিশ্বাস ছেলের শোকে বাকরুদ্ধ। রবিউলের চাচাতো ভাই মনিরুজ্জামান মনির জানান, কেন তাদের গ্রামে পুলিশ গুলি ছুড়ল তা তারা জানেন না। তিনি বলেন, পুলিশের গুলির শব্দে এলাকাবাসীর ঘুম ভেঙেছে। ওই সময় পরিস্থিতি বোঝার জন্য বাড়ির বাইরে যাওয়ামাত্র অনেকের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হন রবিউল।
নিহত ওয়ালিউল্লাহর চাচা স্থানীয় মাদরাসার সুপার আবদুল মালেক বলেন, পুলিশের সঙ্গে ওই অভিযানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ক্যাডাররাও অংশ নেয়। তিনি বলেন, এমন বিভীষিকাময় রাত তারা জীবনে কখনও দেখেননি। গুলির সময় নারী-পুরুষের চিৎকার আর আহাজারিতে পুরো এলাকায় তখন ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আর বিদ্যুৎ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়ী করে বলেন, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এলাকা পরিদর্শন করে যাওয়ার পরই পুলিশ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এদিকে দুপুর ১২টার দিকে শহরের পাঠানপাড়া বিএনপি কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই গণহত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান ১৮ দলের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে ১৮ দলীয় জোটের জেলা সমন্বয়কারী ও জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া অভিযোগ করেন, আসামি ধরার নামে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সদস্যরা শ্যামপুর গ্রামে গিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে। শতাধিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এর প্রতিবাদে আগামী রোববার চাঁপাইনবাবগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করবে ১৮ দল। এছাড়া শনিবার বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি, গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, জেলা জামায়াতের সাবেক আমির রফিকুল ইসলাম, জামায়াতের সাবেক এমপি লতিফুর রহমানসহ জোটের স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার বশির আহম্মেদ সাংবাদিকদের জানান, আসামি ধরার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ বাহিনীর সদস্যরা শ্যামপুর এলাকায় যায়। এ সময় আসামিপক্ষের লোকজন যৌথ বাহিনীকে অবরুদ্ধ এবং তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। একপর্যায়ে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেটসহ যৌথ বাহিনীর ১২ সদস্য আহত হয় বলে দাবি করেন তিনি। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক ড. শাহ আলম জানান, কানসাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের ধরতে গেলে গ্রামবাসীর হামলার মখে পড়ে পলিশ। ৪. স্বজনদের কা
বাগহারা ভাতিজা শফিকুলের সাথে তিনি সাঈদী সাহেবের রায়ের পর বিক্ষোভ নিয়ে আলাপ করতেন। শফিকুল আঁতকে উঠে বলতো, ওখানে গেলে গুলি করবো। মতিউর হেসে বলতেন, গুলি খেয়ে মরলে শহীদ হয়ে যাব।
মতিউর মাত্র ২১ বছর বয়সে বাবাকে হারান। একমাত্র ভাই সেও মারা যায় ১৫ বছর হলো। স্নেহময়ী মা চলে গেছেন ১০ বছর আগে। ৪৬ বছর বয়সে তার জীবনটাও দিতে হলো। পাঁচ ভাই বোনের বিশাল সংসারে তিনিই ছিলেন মূলত অভিভাবক। হয়তো তাই আল্লাহর ইচ্ছায় শহীদ হয়েও স্বপ্নযোগে স্বজনদের সান্ত্বনা দেন। ১৪ বছরের মেয়ে হাজেরা দেখে, বাড়ির পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তার বাবা। হাজেরা হাত ধরে বলে, 'চলো আব্দু বাড়ি যাই, বড় মেয়ে সাবিনা দেখে। বাবা কবরের উপড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, কি চমৎকার। পাজামা-পাঞ্জাবি পরা। বলছে, তোমরা কেমন আছ। কান্দিও না। আমি ভাল আছি। সবই শুনে ১৬ বছরের ছেলে জামাল। কিন্তু বসে থাকলেতো পেট চলবে না তাই এবারই প্রথম কাঁচি নিয়ে বের হয়েছে অন্যের ধান কাটতে। তাতে কিছু পেলে সংসারটা চলবে। সবার ছোট ৮ বছরের আসমা সে শুধু শুনে আর দেখে।
দাদা, দানী, চাচা শব্দগুলির সত্যিকার মানে ঠিক মতো বুঝে না প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আট বছরের আসমা। তার জন্মের ১৭ বছর আগেই নাকি দাদা, ৭ বছর আগে একমাত্র চাচা আর দুই বছর আগেই গল্পবলার দাদু মারা গেছেন। আব্বুই ছিল তার সমগ্র পৃথিবী, সেও চলে গেল সাদা-দাদুর পাশের কবরে। একমাত্র ভাইয়াটা তাকে খুব আদর করে, ১৬ বছরের সেই জামাল কাস্তে নিয়ে যাচ্ছে সংসারের প্রয়োজনে পরের ক্ষেতে কাজে। আসমা তার ছবির বইটা ঠেলে পান্ডুর মুখে মায়ের পাশে বসে ভাবে, জীবন কতই না কষ্টের।
৫. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
মধ্যম মানের ঘরবাড়ি। দিনমজুরি করে পরিবার চলে।
৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ মতিউর রহমান (০৯৭)। পেশা। দিনমজুর ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স। ১২,০২,১৯৬৮, ৪৭ বছর। আহত হওয়ার তারিখ। ২৯,০৩,২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ। ২৯.০৩.২০১৩, বিকাল ৩টা, স্থান। রাজশাহীতে নেওয়ার পথে ১.৩০ ঘন্টা পর তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। জানাজা নামাজ পড়ান জনাব নজরুল ইসলাম। দাফন করা হয়। বাড়ির পাশে কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। গোপান নগর, ডাকঘর। ভবানীপুর, ইউনিয়ন। শ্যামপুর, উপজেলা। শিবগঞ্জ,
জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
পিতা। মৃত জিল্লুর রহমান-৮৮ সালে।
মাতা। মৃত কায়েমা বেগম-২০০৩ সালে।।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ। স্ত্রী। সাবিনা ইয়াসমিন, গৃহিণী, ১ম ছেলে। মো। জামাল। বয়স ১৬ বছর, দিনমজুর, ধান কাটে। মেয়ে। হাজেরা খাতুন, বয়স ১৪ বছর, ১ম শ্রেণী। মেয়ে। আসমা খাতুন, বয়স ৮ বছর, ১ম শ্রেণীতে পড়ে।
ভাই-বোনের বিবরণ। রংফুল, বিবাহিত। রুহুল আমিন, শ্রমজীবী, ১৯৯৮ সালে মারা যায়। রুহিতন, বিবাহিতা। মুস্তারা, বিবাহিতা। শহীদ মতিউর রহমান।
১. শহীদের পরিচিতি
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার গোপালনগর গ্রামে শহীদ মোঃ মতিউর রহমান ১৯৬৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম জিল্লুর রহমান এবং মাতা কায়েমা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা বলতে তিনি ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন এরপর সংসারে হাল ধরেছেন। পারিবারিক জীবনে তিনি বিবাহিত ছিলেন। তার ৩ মেয়ে ও ১ ছেলে সন্তান রয়েছে। তিনি ধানকাটা, আমবিক্রি কিংবা দিনমজুরি করে মাসে হাজার পাঁচেক টাকা পেতেন তাই দিয়ে কায়কষ্টে সংসার চালাতেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৯ মার্চ ২০১৩ তারিখে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পুলিশ ও বিজিবিকে সাথে নিয়ে তাদের এলাকার নিরীহ মানুষদের ওপর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালায়। শহীদ মোঃ মতিউর রহমান গ্রামবাসীর সাথে এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। পুলিশ ও বিজিবিসহ আওয়ামী বাহিনী গ্রামবাসীর প্রতিরোধে লুটপাট করতে না পেরে অতর্কিত শত শত রাউন্ড গুলি করে। নির্বিচার গুলিতে অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন। শহীদ মতিউর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হন। জুলুম কত প্রকার হতে পারে? চাঁপাইনবাবগঞ্জে চিকিৎসারত অবস্থায় আহত ব্যক্তি এবং তার সাহায্যকারীদের অতীতে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমতাবস্থায় তাকে চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে নেওয়ার পথে ১.৩০ ঘন্টা পর তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন।
শাহাদাতের পরেও পুলিশ নিষ্প্রাণ লাশটাও দেয় না। এটা কি তাদের লাশের ওপরই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, নাকি মানুষের গণবিক্ষোভের কয়? কিন্তু ছাই দিয়ে কি আগুন চেপে রাখা যায়, নাকি বালির বাঁধ দিয়ে স্রোতস্বিনীর ধারা। পুলিশ লাশ না দেওয়ায় প্রায় ৩৬ ঘন্টা পর শ্যামপুর ইউসি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তিনজনের গায়েবানা জানাযা একসাথে অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় ইমামতি করেন অধ্যাপক রকিবুল ইসলাম। এতে প্রায় ৩০ হাজারের অধিক লোক উপস্থিত ছিলেন। ৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২৯ মার্চ ২০১৩ তারিখে রাত ২:৩০ টায় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পুলিশ র্যাব ও বিজিবিসহ প্রায় তিনশতাধিক প্রশাসনিক লোককে সাথে নিয়ে শ্যামপুর ইউনিয়নে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালায়।
তারা আক্রমণ চালালে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রায় চার ঘন্টা যাবৎ অভিযান চালিয়ে তারা গ্রামে প্রবেশ করতে না পেরে বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণ করে। এতে শহীদ মতিউর রহমানসহ তিনজন ঘটনাস্থলেই শাহাদাৎ বরণ করেন। জাতীয় গণমাধ্যমে এ ব্যাপারে ৪ মার্চ ২০১৩ ব্যাপক নিউজ হয় দৈনিক সংগ্রাম লিখেঃ "চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিবগঞ্জ উপজেলায় আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা নিহত হবার পর গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রিতে উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রশাসন পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি'র হাজার হাজার সদস্যসহ এক সাঁড়াশি অভিযান চালায়। গ্রামবাসী উপায়ান্তর না দেখে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এতে ব্যাপক সংঘর্ষ বেধে গেলে পুলিশের গুলিতে ওজন নিহত ও অন্তত ১০০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে গ্রামবাসী জানিয়েছে। নিহতরা হচ্ছেন, শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের ওমরপুর গ্রামের ভুদর ছেলে রবিউল ইসলাম (২৪), গোপালনগর গ্রামের জিল্লুর রহমানের ছেলে মতিউর রহমান (৪৫) ও শরৎনগর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে অলিউল্লাহ (১৬)। সোনামসজিদ মহাসড়কের রসুলপুর, ইসরাইল মোড়, বেকির মোড়, কানসাট গোপালনগর মোড়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের উপ-রাজারামপুর, শিবতলা মোড়সহ বিভিন্ন পয়েন্টে কাঠের গুঁড়ি ও বিদ্যুতের পোল দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক অবরোধ করে মানুষ। সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে।
জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোট আহত এক সাংবাদিক সম্মেলনে জোটের সমন্বয়ক জেলা বিএনপি'র সভাপতি অধ্যাপক শাহজাহান মিঞা লিখিত বক্তব্যে, শিবগঞ্জের শ্যামপুরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিরস্ত্র ৩জন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে শনিবার জেলায় বিক্ষোভ মিছিল ও গায়েবানা জানাজা এবং আগামী রোববার জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালের আহবান করেন। তিনি আরো বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস পরিদর্শনে এসে পুলিশকে জনতার প্রতি গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেয়ার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে। তিনি পল্লী বিদ্যুতের ঘটনার দায় ১৮ দলীয় জোটের নেতা কর্মীদের ওপর চাপাতে চাইছেন কিন্তু আমি পরিষ্কার বলতে চাই ঐ ঘটনার দিন দুটি সাদা মাইক্রোবাসে কারা এসেছিল তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ মিছিল ঐ এলাকায় পৌঁছানোর পূর্বেই পল্লী বিদ্যুৎ ভবন জ্বলতে দেখা গেছে যা স্থানীয় জনতা সকলেই প্রত্যক্ষ করেছে। সাংবাদিক সম্মেলনে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক লতিফুর রহমান নিহত ৩জনকে তাদের সমর্থক বলে দাবি করেন।"
শনিবার ৩০ মার্চ ২০১৩, দৈনিক আমার দেশ লিখে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট ও কামাল হোসেন জানান,
বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটার দিকে হরতালের সময় সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি গ্রেফতারের নামে শিবগঞ্জের শ্যামপুর ইউনিয়নের গোপালনগর এলাকায় অভিযানে নামে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর সদস্যরা। তাদের সঙ্গে একজন ম্যাজিস্ট্রেটও ছিল। তারা গ্রামের নিরীহ কিছু লোককে আটকের চেষ্টা করলে বিক্ষুদ্ধ গ্রামবাসী তাদের অবরুদ্ধ করে। অবরুদ্ধ থাকার একপর্যায়ে রাত ৩টার দিকে পুলিশ ও বিজিবি নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে রাতেই তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায়। নিহতরা হলেন উমরপুর গ্রামের আবদুল হাকিমের ছেলে স্থানীয় স্বরূপনগর দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণীর ছাত্রশিবির কর্মী অলিউল্লাহ (১৭), শ্যামপুর গ্রামের তদু বিশ্বাসের ছেলে রবিউল ইসলাম রবু (২৫) ও শ্যামপুর চামাবাজার এলাকার জিল্লুর রহমানের ছেলে মতিউর রহমান (২৫)। নিহত মতিউর ও রবিউল পেশায় কৃষক বলে জানিয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্য। এছাড়াও আরও অন্তত ৬০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যার জন্যই ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে অভিযানে নেমেছে। সহিংসতায় জড়িত ছিল না এমন ব্যক্তিদেরকেও আটকের চেষ্টা করে পুলিশ। ফলে বিক্ষুদ্ধ গ্রামবাসী তাদের প্রতিরোধ করে। এ ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। খবর পেয়ে ভোরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে কানসাটে নিয়ে যান। গতকাল সকাল ১১টার দিকে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা আবারও শ্যামপুরে অভিযানে নামে। অভিযানের আগেই একরকম পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে এলাকা। গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে কমপক্ষে ২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গতকাল শ্যামপুর এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে পুলিশের নির্মমতার চিহ্ন। গ্রামের অনেক লোক কুড়িয়ে পাওয়া গুলির খোসা, গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি সাংবাদিকদের দেখান। নিহতদের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। নিহত মাদরাসা ছাত্র ওয়ালিউল্লাহর বাড়িতে গিয়ে তার মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনদের বুকফাটা আহাজারি করতে দেখা যায়। তাদের সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা কারও ছিল না। উপস্থিত সবাই ওয়ালিউল্লাহর জন্য ফেলেছেন চোখের পানি। ওয়ালিউল্লাহর বাবা আবদুল হাকিম জানান, রাত আড়াইটার দিকে হঠাৎ গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে তার। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুলেটের শব্দে আশপাশের লোকজনের সঙ্গে সে ও তার ছেলে বাড়ির বাইরে বের হয়। সামনে এগুতেই একটি গুলি ওয়ালিউল্লাহর ভান চোয়ালে ঢুকে বাঁদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ছটফট করতে করতে ইন্তেকাল করেন ওয়ালিউল্লাহ। তাকে হাসপাতালেও নেয়ার সময় পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, নিহত ও আহত অধিকাংশই আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একই অবস্থা বিরাজ করছে নিহত মতিউর ও রবিউলের বাড়িতে। রবিউলের বৃদ্ধ বাবা ভদু বিশ্বাস ছেলের শোকে বাকরুদ্ধ। রবিউলের চাচাতো ভাই মনিরুজ্জামান মনির জানান, কেন তাদের গ্রামে পুলিশ গুলি ছুড়ল তা তারা জানেন না। তিনি বলেন, পুলিশের গুলির শব্দে এলাকাবাসীর ঘুম ভেঙেছে। ওই সময় পরিস্থিতি বোঝার জন্য বাড়ির বাইরে যাওয়ামাত্র অনেকের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হন রবিউল।
নিহত ওয়ালিউল্লাহর চাচা স্থানীয় মাদরাসার সুপার আবদুল মালেক বলেন, পুলিশের সঙ্গে ওই অভিযানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ক্যাডাররাও অংশ নেয়। তিনি বলেন, এমন বিভীষিকাময় রাত তারা জীবনে কখনও দেখেননি। গুলির সময় নারী-পুরুষের চিৎকার আর আহাজারিতে পুরো এলাকায় তখন ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আর বিদ্যুৎ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়ী করে বলেন, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এলাকা পরিদর্শন করে যাওয়ার পরই পুলিশ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এদিকে দুপুর ১২টার দিকে শহরের পাঠানপাড়া বিএনপি কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই গণহত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান ১৮ দলের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে ১৮ দলীয় জোটের জেলা সমন্বয়কারী ও জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া অভিযোগ করেন, আসামি ধরার নামে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সদস্যরা শ্যামপুর গ্রামে গিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে। শতাধিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এর প্রতিবাদে আগামী রোববার চাঁপাইনবাবগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করবে ১৮ দল। এছাড়া শনিবার বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি, গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, জেলা জামায়াতের সাবেক আমির রফিকুল ইসলাম, জামায়াতের সাবেক এমপি লতিফুর রহমানসহ জোটের স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার বশির আহম্মেদ সাংবাদিকদের জানান, আসামি ধরার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ বাহিনীর সদস্যরা শ্যামপুর এলাকায় যায়। এ সময় আসামিপক্ষের লোকজন যৌথ বাহিনীকে অবরুদ্ধ এবং তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। একপর্যায়ে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেটসহ যৌথ বাহিনীর ১২ সদস্য আহত হয় বলে দাবি করেন তিনি। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক ড. শাহ আলম জানান, কানসাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের ধরতে গেলে গ্রামবাসীর হামলার মখে পড়ে পলিশ। ৪. স্বজনদের কা
বাগহারা ভাতিজা শফিকুলের সাথে তিনি সাঈদী সাহেবের রায়ের পর বিক্ষোভ নিয়ে আলাপ করতেন। শফিকুল আঁতকে উঠে বলতো, ওখানে গেলে গুলি করবো। মতিউর হেসে বলতেন, গুলি খেয়ে মরলে শহীদ হয়ে যাব।
মতিউর মাত্র ২১ বছর বয়সে বাবাকে হারান। একমাত্র ভাই সেও মারা যায় ১৫ বছর হলো। স্নেহময়ী মা চলে গেছেন ১০ বছর আগে। ৪৬ বছর বয়সে তার জীবনটাও দিতে হলো। পাঁচ ভাই বোনের বিশাল সংসারে তিনিই ছিলেন মূলত অভিভাবক। হয়তো তাই আল্লাহর ইচ্ছায় শহীদ হয়েও স্বপ্নযোগে স্বজনদের সান্ত্বনা দেন। ১৪ বছরের মেয়ে হাজেরা দেখে, বাড়ির পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তার বাবা। হাজেরা হাত ধরে বলে, 'চলো আব্দু বাড়ি যাই, বড় মেয়ে সাবিনা দেখে। বাবা কবরের উপড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, কি চমৎকার। পাজামা-পাঞ্জাবি পরা। বলছে, তোমরা কেমন আছ। কান্দিও না। আমি ভাল আছি। সবই শুনে ১৬ বছরের ছেলে জামাল। কিন্তু বসে থাকলেতো পেট চলবে না তাই এবারই প্রথম কাঁচি নিয়ে বের হয়েছে অন্যের ধান কাটতে। তাতে কিছু পেলে সংসারটা চলবে। সবার ছোট ৮ বছরের আসমা সে শুধু শুনে আর দেখে।
দাদা, দানী, চাচা শব্দগুলির সত্যিকার মানে ঠিক মতো বুঝে না প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আট বছরের আসমা। তার জন্মের ১৭ বছর আগেই নাকি দাদা, ৭ বছর আগে একমাত্র চাচা আর দুই বছর আগেই গল্পবলার দাদু মারা গেছেন। আব্বুই ছিল তার সমগ্র পৃথিবী, সেও চলে গেল সাদা-দাদুর পাশের কবরে। একমাত্র ভাইয়াটা তাকে খুব আদর করে, ১৬ বছরের সেই জামাল কাস্তে নিয়ে যাচ্ছে সংসারের প্রয়োজনে পরের ক্ষেতে কাজে। আসমা তার ছবির বইটা ঠেলে পান্ডুর মুখে মায়ের পাশে বসে ভাবে, জীবন কতই না কষ্টের।
৫. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
মধ্যম মানের ঘরবাড়ি। দিনমজুরি করে পরিবার চলে।
৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ মতিউর রহমান (০৯৭)। পেশা। দিনমজুর ছিলেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স। ১২,০২,১৯৬৮, ৪৭ বছর। আহত হওয়ার তারিখ। ২৯,০৩,২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ। ২৯.০৩.২০১৩, বিকাল ৩টা, স্থান। রাজশাহীতে নেওয়ার পথে ১.৩০ ঘন্টা পর তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। জানাজা নামাজ পড়ান জনাব নজরুল ইসলাম। দাফন করা হয়। বাড়ির পাশে কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। গোপান নগর, ডাকঘর। ভবানীপুর, ইউনিয়ন। শ্যামপুর, উপজেলা। শিবগঞ্জ,
জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
পিতা। মৃত জিল্লুর রহমান-৮৮ সালে।
মাতা। মৃত কায়েমা বেগম-২০০৩ সালে।।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ। স্ত্রী। সাবিনা ইয়াসমিন, গৃহিণী, ১ম ছেলে। মো। জামাল। বয়স ১৬ বছর, দিনমজুর, ধান কাটে। মেয়ে। হাজেরা খাতুন, বয়স ১৪ বছর, ১ম শ্রেণী। মেয়ে। আসমা খাতুন, বয়স ৮ বছর, ১ম শ্রেণীতে পড়ে।
ভাই-বোনের বিবরণ। রংফুল, বিবাহিত। রুহুল আমিন, শ্রমজীবী, ১৯৯৮ সালে মারা যায়। রুহিতন, বিবাহিতা। মুস্তারা, বিবাহিতা। শহীদ মতিউর রহমান।