শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিন
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিন
পিতার নাম: এনামুল হক
মাতার নাম: কমেলা বেগম
জন্ম তারিখ : ১০.০২.১৯৯৮
ভাই বোন : ৩ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সবার ছোট
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চরমহনপুর চকপাড়া, থানা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
সাংগঠনিক মান : সাথী
সর্বশেষ পড়ালেখা : দ্বাদশ শ্রেণি, বাণিজ্য বিভাগ
শাহাদাতের তারিখ: ১২/০২-২০১৩
শাহাদাতের স্থান : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিটি কলেজ। : র্যাব ক্যাম্প
পিতার নাম: এনামুল হক
মাতার নাম: কমেলা বেগম
জন্ম তারিখ : ১০.০২.১৯৯৮
ভাই বোন : ৩ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সবার ছোট
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চরমহনপুর চকপাড়া, থানা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
সাংগঠনিক মান : সাথী
সর্বশেষ পড়ালেখা : দ্বাদশ শ্রেণি, বাণিজ্য বিভাগ
শাহাদাতের তারিখ: ১২/০২-২০১৩
শাহাদাতের স্থান : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিটি কলেজ। : র্যাব ক্যাম্প
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"তার বাবা অথবাআমি যদি কখনও কোনবিষয়ে বকা দিতাম, ধমক দিয়ে কথা বলতাম, সব সময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে শুনতো। কখনও উত্তর দেয়ার চেষ্টা করতো না। গ্রামের কেউ বলতে পারবে না যে, সে কারো সাথে কখনও খারাপ আচরণ করেছে। সবাই তাকে ভালোবাসতো। সেও সবাইকে প্রদ্ধা করতো। ছোটদের আদর করতো। যেকোন সিদ্ধান্ত নিলে সেবিষয়ে সে অনড় থাকতো। তাকে কোন কাজ দিলে ঠিকভাবে করতো।"-শহীদের মা
শহীদের পরিচিতি
শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিন ১০.০২.১৯৯৮ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর থানার চরমহনপুর চকপাড়া গ্রামেজনুগ্রহণ করেন।তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিটি কলেজের সভাপতি ছিলেন। উক্তকলেজে দ্বাদশ শ্রেণীর বাণিজ্য বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। তিন ভাই এক বোনের মাঝে তুহিন ছিলেন সবার ছোট।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন:
২৬ জানুয়ারি ২০১৫। র্যাব বাহিনী আসাদুল্লাহ তুহিনকে পিতা-মাতার সামনে থেকে তুলে নিয়েযায় তার বাড়ি থেকে। রাতভর অমানুষিক নির্যাতন করলে, রাতেই শাহাদাতবরণ করেন মেধাবী ছাত্র আসাদুল্লাহ তুহিন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা: ছোট থেকে অতি আদরে বড় হয়েছিলেন। বড়ভাই এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর পারিবারিক বাস্তবতায় আর পড়াশোনা করতে পারেননি। মেজো ভাই এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর আর পড়তে পারেননি। সবার আশা ছিল তুহিন পড়াক্তনা চালিয়ে যাবে।তাদের বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে। সেজন্যই তাকে সবসময় সবাই নজরে নজরে রাখতো। সবাই স্নেহ করতো, ভালোবাসতো। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তুহিনের উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি। দেহ ছিল সুঠাম। তাকে অনেকে বলতো, তুমি তো সেনাবাহিনীতে দাঁড়ালেই টিকে যাবে। তুহিন নিজেও সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশসেবায় ভূমিকা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ২০১৩ সালে সে সেনাবাহিনীতে পরীক্ষা দিয়ে টিকেছিল। তখন তার কাছে সাড়ে চার লাখ টাকা চাওয়া হয়। তুহিন বলেছিল, আমার বাবা দরিদ্র মানুষ। এত টাকা দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর তুহিন চাকরির আশা ছেড়ে দেয়। ২০১৪ সালে আবার সেনাবাহিনীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে সেআবেদন করে। শহীদের মামা কবির হোসেন জানালেন, 'তুহিন টাকা চেয়ে পায়নি এমন কোন ঘটনা আমরা ঘটতে দেইনি। সে যে একাদশ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় সিটি কলেজ শিবিরের সভাপতি ছিল, এটা আমিও জানতাম না। প্রথমে শুনেও বিশ্বাসকরতে পারিনি। কারণ আমি জানি কলেজ সভাপতিহিসেবে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়, এরাসিনিয়র হয়। মনে হয় প্রশাসনের কাছে এ দায়িত্বই তার বড় অপরাধ ছিল।' তুহিনের মামা কবির হোসেন আরো বলেন, 'হঠাৎ একদিন সে আমার মোটরসাইকেলের সামনে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে কাঁদতে শুরু করে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "মামা কী হয়েছে? কেউ কিকিছু বলেছে?" বললো, না। আবার জিজ্ঞেসা করতেই সে বললো, মামা সেনাবাহিনীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, কিছু টাকা খরচ হলেও আপনি আমাকে সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে দেন। আমি বললাম,আচ্ছা ঠিক আছে তুমি আবেদন করো, আমি ব্যবস্থা করছি। আমার কথা শুনে সেমহা খুশি। দুই- তিন দিন পর বলে, মামা আমাকে ৪০০ টাকা দেন। কেন জিজ্ঞেস করতেই বললো ২টা,ট্রাউজার কিনবো। পাড়ার দুই জন গত বছর সেনাবাহিনীতে টিকেছে, তারা ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। এখন থেকেই তাদের কাছ থেকে ট্রেনিংয়ের বিষয়গুলো নিয়মিত দেখে নিতে পারলে পরে কষ্ট কম হবে। সেই আবেদনের পর গত ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখ ওর বাছাইয়ের জন্য রাজশাহী রেঞ্জে দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হলো না। ২৭ জানুয়ারি ওর লাশ পাওয়া গেল হাসপাতালের লাশঘরে।' ২৬ জানুয়ারি সকালে তুহিন মামার বাসায় গিয়েছিল মোটরসাইকেলের জন্য। কোথায় নাকি যাবে চিন্তা করেছিল। তারা তিনজন। মামা বলেছিলেন, একজনের বেশি মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলে পুলিশ রাস্তায় আটকাবে। তাই তিনি সাইকেল নিতে নিষেধ করলেন। সেখান থেকে এসে সারাদিন আর বের হয়নি তুহিন। অথচ ২০১৩-১৪ সালের এই সময়ে সে বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকতো। দেশের পরিবেশ ভালো ছিল না। সে সময় যে বাড়িতে প্রশাসনের লোক যেতো,কাউকে না কাউকে ধরে নিয়ে যেতো।
ঘটনার সামগ্রিক বিবরণ:
শহীদের মামা কবির হোসেন সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন- বেলা পৌনে ৩টা। দুপুরে খাওয়া শেষ করেনিজের রুমে বিশ্রাম নিচ্ছিল তুহিন। হঠাৎ বাসার সামনে এসে ২টা পাড়ি থামে। সাথে সাথে গাড়ি থেকে সবাই লাফিয়ে নেমে তুহিনের শোবার রুম ঘেরাও করে ফেলে। গ্রেফতারকরা হয় তাকে। তন্নতন্নকরে তাদের থাকার ঘর, পাকঘর সব খোঁজা হয়। জামায়াত নেতা নূরুল ইসলাম বুলবুলের নাম লেখা একটি ক্যালেন্ডার ও ক্রিকেট খেলার ব্যাট এবং স্ট্যাম্প পায়। তাদের একজন বলে, বুলবুলের এক নম্বর লোক পাওয়া গেছে। এরপরই শুরু হয় তুহিনের ওপর নির্যাতন। সবার সামনে স্ট্যাম্প দিয়ে মারতে মারতে তিনটা স্ট্যাম্পই ভেঙে ফেলে। জিজ্ঞেস করে, কোথায় অস্ত্র রেখেছিস বল? তুহিন বলে, আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই। র্যাবের একজন তুহিনদের গাছ থেকে লেবু পেড়ে বলে, এখন স্বীকার করবে না, যখন চামড়া ছিলে লবণ, লেবুর রস লাগাবো তখন স্বীকার করবে। অন্য একজন ভাঙাস্ট্যাম্পগুলো তার মায়েরদিকে ছুঁড়ে মেরে বলে, লাকড়ি করার জন্য এগুলো রেখে গেলাম। আমি ঘটনা শুনে স্তম্ভিত হই। কী অসভ্যতা। কী বর্বরতা! তুহিনের মামা সাংবাদিকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ছবি দেখান। তুহিনের শরীরের চামড়া কেটে সত্যিই লবণ-লেবুর রস লাগানো হয়েছিল। তুহিনকেআটক করে নিয়ে যাওয়ার পর রাতভর তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। নির্মম নির্যাতনের ফলে সে রাতেই তুহিন শাহাদাত বরণ করে। মৃত্যু নিশ্চিত জানার পর তার লাশ সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে র্যাব অজ্ঞাত ট্রাক চালককে আসামি করে মামলা করে। সেখানে তারা উল্লেখ করে, রাতে তুহিনকে নিয়ে যখন বের হয়, তখন সে পালিয়ে যাওয়ার জন্য লাফ দিলে বিপরীত দিক থেকে আসা,ট্রাক তাকে চাপা দিয়ে চলেযায়। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ট্রাক চাপা দেয়ার তো কোন আলামত দেখা যাচ্ছে না। বরং আপনাদের নির্যাতনের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। র্যাব তখন জানায়,ওপর থেকে যেভাবে নির্দেশ দেয়া আছে, সেভাবেই বললাম। আমাদের এর বাইরেকিছু বলার নেই।সকালবেলায় স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলাকালীন সকাল ৯টায় স্কুল মাঠ থেকেগ্রেফতার করা হয় ফুলকুঁড়ি স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র আল আমিন ও রাফিকে। অপর দিকে হেফজুল ইসলাম কামিল মাদরাসা হোস্টেল থেকে বেলা ২টায় গ্রেফতার করা হয় আলীম প্রথম বর্ষের ছাত্র মেহেদি হাসানকে। আসাদুল্লাহ তুহিনকে নিয়ে গিয়েছিল বাসা থেকে। র্যাব ক্যাম্পে সবাইকে একত্রে রাখা হয়েছিল। একে একে সবাইকে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনকালে এক র্যাব সদস্য বলে, তোদের জীবন এখানে শেষ, যা সবাই অজু করে আয়। কেউ যেতে চাইলো না,কিন্তু আসাদুল্লাহ তুহিন সাথে সাথেগিয়ে থেঁতলানো শরীর নিয়ে পাশের পানি দিয়ে অজু করে নেয়। এরপর সবার ওপর আবার নির্যাতন চলে। বিদ্যুৎশক দেয়া হয়। শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষত করেলবণ-লেবুর রস লাগিয়ে দেয়া হয়। এক পর্যায়ে সবাইকে র্যাব অফিসারের পা ধরে মাফ চাইতে বলে। বাকি সবাই মাফ চাইলেও তুহিন তখনও বলেছে, আমি আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করতে পারবো না। আমি কোন অপরাধ করিনি। আমি কেন মাফ চাইবো? তার দৃঢ়তা দেখে র্যাব সদস্যরা আবার নির্যাতন চালাতে থাকে। বাকি তিনজনকে পরদিন থানায় দিলেও তুহিনের লাশ দেয় হাসপাতালে। পরবর্তী সময়ে নির্যাতনের শিকার অন্যরা এসব ঘটনা জানায়।
আপনজনদের কথা:
শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিনের মা কমেলা বেগম বলেন- 'আমার কাছে মনে হয় আমার বাবা মরে নাই। সে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সবসময়ের মত এখনও বলে, যাচ্ছি মা। আবার ফিরে এসে বলে,কী করছো মা। আমার চারপাশে ঘোরাঘুরি করে। মনে হয় এই বুঝি আসছে,আবার চলে যাচ্ছে। আর আমি বলছি, সাবধানেযাস বাবা।' পুত্র হারানোর শোকে কাতর এই মা কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে ফেলেছেন। তবে এখনও তিনি বুঝতে পারেননি কেন তাঁর সন্তানকে তাঁর চোখেরসামনে থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। মা আরও বলেন, যত সমস্যাই থাকুক সে প্রতিদিন স্কুলে যেতো। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর কখনও কলেজ কামাই করতে তাকে আমরা দেখিনি। রওনা দিয়েই বলতো, মা যাচ্ছি। আবার ফিরে এসে কী করছি জানতে চাইতো।' মা বললেন, 'তার বাবা অথবা আমি যদি কখনও কোন বিষয়ে বকা দিতাম, ধমক দিয়ে কথা বলতাম, সব সময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে শুনতো। কখনও উত্তর দেয়ার চেষ্টা করতো না। গ্রামের কেউ বলতে পারবে না যে, সে কারো সাথে কখনও খারাপ আচরণ করেছে। সবাই তাকে ভালোবাসতো। সেও সবাইকে শ্রদ্ধা করতো। ছোটদের আদর করতো। যে কোন সিদ্ধান্ত নিলে সেবিষয়ে সে অনড় থাকতো। তাকে কোন কাজ দিলে ঠিকভাবে করতো।'
এক নজরে শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিন
শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিন
পিতার নাম: এনামুল হক
মাতার নাম: কমেলা বেগম
জন্ম তারিখ : ১০.০২.১৯৯৮
ভাই বোন : ৩ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সবার ছোট
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চরমহনপুর চকপাড়া, থানা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
সাংগঠনিক মান : সাথী
সর্বশেষ পড়ালেখা : দ্বাদশ শ্রেণি, বাণিজ্য বিভাগ
শাহাদাতের তারিখ: ১২-০২-২০১৩
শাহাদাতের স্থান : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিটি কলেজ। : র্যাব ক্যাম্প
শহীদের পরিচিতি
শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিন ১০.০২.১৯৯৮ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর থানার চরমহনপুর চকপাড়া গ্রামেজনুগ্রহণ করেন।তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিটি কলেজের সভাপতি ছিলেন। উক্তকলেজে দ্বাদশ শ্রেণীর বাণিজ্য বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। তিন ভাই এক বোনের মাঝে তুহিন ছিলেন সবার ছোট।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন:
২৬ জানুয়ারি ২০১৫। র্যাব বাহিনী আসাদুল্লাহ তুহিনকে পিতা-মাতার সামনে থেকে তুলে নিয়েযায় তার বাড়ি থেকে। রাতভর অমানুষিক নির্যাতন করলে, রাতেই শাহাদাতবরণ করেন মেধাবী ছাত্র আসাদুল্লাহ তুহিন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা: ছোট থেকে অতি আদরে বড় হয়েছিলেন। বড়ভাই এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর পারিবারিক বাস্তবতায় আর পড়াশোনা করতে পারেননি। মেজো ভাই এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর আর পড়তে পারেননি। সবার আশা ছিল তুহিন পড়াক্তনা চালিয়ে যাবে।তাদের বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে। সেজন্যই তাকে সবসময় সবাই নজরে নজরে রাখতো। সবাই স্নেহ করতো, ভালোবাসতো। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তুহিনের উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি। দেহ ছিল সুঠাম। তাকে অনেকে বলতো, তুমি তো সেনাবাহিনীতে দাঁড়ালেই টিকে যাবে। তুহিন নিজেও সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশসেবায় ভূমিকা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ২০১৩ সালে সে সেনাবাহিনীতে পরীক্ষা দিয়ে টিকেছিল। তখন তার কাছে সাড়ে চার লাখ টাকা চাওয়া হয়। তুহিন বলেছিল, আমার বাবা দরিদ্র মানুষ। এত টাকা দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর তুহিন চাকরির আশা ছেড়ে দেয়। ২০১৪ সালে আবার সেনাবাহিনীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে সেআবেদন করে। শহীদের মামা কবির হোসেন জানালেন, 'তুহিন টাকা চেয়ে পায়নি এমন কোন ঘটনা আমরা ঘটতে দেইনি। সে যে একাদশ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় সিটি কলেজ শিবিরের সভাপতি ছিল, এটা আমিও জানতাম না। প্রথমে শুনেও বিশ্বাসকরতে পারিনি। কারণ আমি জানি কলেজ সভাপতিহিসেবে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়, এরাসিনিয়র হয়। মনে হয় প্রশাসনের কাছে এ দায়িত্বই তার বড় অপরাধ ছিল।' তুহিনের মামা কবির হোসেন আরো বলেন, 'হঠাৎ একদিন সে আমার মোটরসাইকেলের সামনে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে কাঁদতে শুরু করে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "মামা কী হয়েছে? কেউ কিকিছু বলেছে?" বললো, না। আবার জিজ্ঞেসা করতেই সে বললো, মামা সেনাবাহিনীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, কিছু টাকা খরচ হলেও আপনি আমাকে সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে দেন। আমি বললাম,আচ্ছা ঠিক আছে তুমি আবেদন করো, আমি ব্যবস্থা করছি। আমার কথা শুনে সেমহা খুশি। দুই- তিন দিন পর বলে, মামা আমাকে ৪০০ টাকা দেন। কেন জিজ্ঞেস করতেই বললো ২টা,ট্রাউজার কিনবো। পাড়ার দুই জন গত বছর সেনাবাহিনীতে টিকেছে, তারা ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। এখন থেকেই তাদের কাছ থেকে ট্রেনিংয়ের বিষয়গুলো নিয়মিত দেখে নিতে পারলে পরে কষ্ট কম হবে। সেই আবেদনের পর গত ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখ ওর বাছাইয়ের জন্য রাজশাহী রেঞ্জে দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হলো না। ২৭ জানুয়ারি ওর লাশ পাওয়া গেল হাসপাতালের লাশঘরে।' ২৬ জানুয়ারি সকালে তুহিন মামার বাসায় গিয়েছিল মোটরসাইকেলের জন্য। কোথায় নাকি যাবে চিন্তা করেছিল। তারা তিনজন। মামা বলেছিলেন, একজনের বেশি মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলে পুলিশ রাস্তায় আটকাবে। তাই তিনি সাইকেল নিতে নিষেধ করলেন। সেখান থেকে এসে সারাদিন আর বের হয়নি তুহিন। অথচ ২০১৩-১৪ সালের এই সময়ে সে বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকতো। দেশের পরিবেশ ভালো ছিল না। সে সময় যে বাড়িতে প্রশাসনের লোক যেতো,কাউকে না কাউকে ধরে নিয়ে যেতো।
ঘটনার সামগ্রিক বিবরণ:
শহীদের মামা কবির হোসেন সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন- বেলা পৌনে ৩টা। দুপুরে খাওয়া শেষ করেনিজের রুমে বিশ্রাম নিচ্ছিল তুহিন। হঠাৎ বাসার সামনে এসে ২টা পাড়ি থামে। সাথে সাথে গাড়ি থেকে সবাই লাফিয়ে নেমে তুহিনের শোবার রুম ঘেরাও করে ফেলে। গ্রেফতারকরা হয় তাকে। তন্নতন্নকরে তাদের থাকার ঘর, পাকঘর সব খোঁজা হয়। জামায়াত নেতা নূরুল ইসলাম বুলবুলের নাম লেখা একটি ক্যালেন্ডার ও ক্রিকেট খেলার ব্যাট এবং স্ট্যাম্প পায়। তাদের একজন বলে, বুলবুলের এক নম্বর লোক পাওয়া গেছে। এরপরই শুরু হয় তুহিনের ওপর নির্যাতন। সবার সামনে স্ট্যাম্প দিয়ে মারতে মারতে তিনটা স্ট্যাম্পই ভেঙে ফেলে। জিজ্ঞেস করে, কোথায় অস্ত্র রেখেছিস বল? তুহিন বলে, আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই। র্যাবের একজন তুহিনদের গাছ থেকে লেবু পেড়ে বলে, এখন স্বীকার করবে না, যখন চামড়া ছিলে লবণ, লেবুর রস লাগাবো তখন স্বীকার করবে। অন্য একজন ভাঙাস্ট্যাম্পগুলো তার মায়েরদিকে ছুঁড়ে মেরে বলে, লাকড়ি করার জন্য এগুলো রেখে গেলাম। আমি ঘটনা শুনে স্তম্ভিত হই। কী অসভ্যতা। কী বর্বরতা! তুহিনের মামা সাংবাদিকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ছবি দেখান। তুহিনের শরীরের চামড়া কেটে সত্যিই লবণ-লেবুর রস লাগানো হয়েছিল। তুহিনকেআটক করে নিয়ে যাওয়ার পর রাতভর তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। নির্মম নির্যাতনের ফলে সে রাতেই তুহিন শাহাদাত বরণ করে। মৃত্যু নিশ্চিত জানার পর তার লাশ সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে র্যাব অজ্ঞাত ট্রাক চালককে আসামি করে মামলা করে। সেখানে তারা উল্লেখ করে, রাতে তুহিনকে নিয়ে যখন বের হয়, তখন সে পালিয়ে যাওয়ার জন্য লাফ দিলে বিপরীত দিক থেকে আসা,ট্রাক তাকে চাপা দিয়ে চলেযায়। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ট্রাক চাপা দেয়ার তো কোন আলামত দেখা যাচ্ছে না। বরং আপনাদের নির্যাতনের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। র্যাব তখন জানায়,ওপর থেকে যেভাবে নির্দেশ দেয়া আছে, সেভাবেই বললাম। আমাদের এর বাইরেকিছু বলার নেই।সকালবেলায় স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলাকালীন সকাল ৯টায় স্কুল মাঠ থেকেগ্রেফতার করা হয় ফুলকুঁড়ি স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র আল আমিন ও রাফিকে। অপর দিকে হেফজুল ইসলাম কামিল মাদরাসা হোস্টেল থেকে বেলা ২টায় গ্রেফতার করা হয় আলীম প্রথম বর্ষের ছাত্র মেহেদি হাসানকে। আসাদুল্লাহ তুহিনকে নিয়ে গিয়েছিল বাসা থেকে। র্যাব ক্যাম্পে সবাইকে একত্রে রাখা হয়েছিল। একে একে সবাইকে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনকালে এক র্যাব সদস্য বলে, তোদের জীবন এখানে শেষ, যা সবাই অজু করে আয়। কেউ যেতে চাইলো না,কিন্তু আসাদুল্লাহ তুহিন সাথে সাথেগিয়ে থেঁতলানো শরীর নিয়ে পাশের পানি দিয়ে অজু করে নেয়। এরপর সবার ওপর আবার নির্যাতন চলে। বিদ্যুৎশক দেয়া হয়। শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষত করেলবণ-লেবুর রস লাগিয়ে দেয়া হয়। এক পর্যায়ে সবাইকে র্যাব অফিসারের পা ধরে মাফ চাইতে বলে। বাকি সবাই মাফ চাইলেও তুহিন তখনও বলেছে, আমি আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করতে পারবো না। আমি কোন অপরাধ করিনি। আমি কেন মাফ চাইবো? তার দৃঢ়তা দেখে র্যাব সদস্যরা আবার নির্যাতন চালাতে থাকে। বাকি তিনজনকে পরদিন থানায় দিলেও তুহিনের লাশ দেয় হাসপাতালে। পরবর্তী সময়ে নির্যাতনের শিকার অন্যরা এসব ঘটনা জানায়।
আপনজনদের কথা:
শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিনের মা কমেলা বেগম বলেন- 'আমার কাছে মনে হয় আমার বাবা মরে নাই। সে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সবসময়ের মত এখনও বলে, যাচ্ছি মা। আবার ফিরে এসে বলে,কী করছো মা। আমার চারপাশে ঘোরাঘুরি করে। মনে হয় এই বুঝি আসছে,আবার চলে যাচ্ছে। আর আমি বলছি, সাবধানেযাস বাবা।' পুত্র হারানোর শোকে কাতর এই মা কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে ফেলেছেন। তবে এখনও তিনি বুঝতে পারেননি কেন তাঁর সন্তানকে তাঁর চোখেরসামনে থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। মা আরও বলেন, যত সমস্যাই থাকুক সে প্রতিদিন স্কুলে যেতো। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর কখনও কলেজ কামাই করতে তাকে আমরা দেখিনি। রওনা দিয়েই বলতো, মা যাচ্ছি। আবার ফিরে এসে কী করছি জানতে চাইতো।' মা বললেন, 'তার বাবা অথবা আমি যদি কখনও কোন বিষয়ে বকা দিতাম, ধমক দিয়ে কথা বলতাম, সব সময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে শুনতো। কখনও উত্তর দেয়ার চেষ্টা করতো না। গ্রামের কেউ বলতে পারবে না যে, সে কারো সাথে কখনও খারাপ আচরণ করেছে। সবাই তাকে ভালোবাসতো। সেও সবাইকে শ্রদ্ধা করতো। ছোটদের আদর করতো। যে কোন সিদ্ধান্ত নিলে সেবিষয়ে সে অনড় থাকতো। তাকে কোন কাজ দিলে ঠিকভাবে করতো।'
এক নজরে শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিন
শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিন
পিতার নাম: এনামুল হক
মাতার নাম: কমেলা বেগম
জন্ম তারিখ : ১০.০২.১৯৯৮
ভাই বোন : ৩ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সবার ছোট
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চরমহনপুর চকপাড়া, থানা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
সাংগঠনিক মান : সাথী
সর্বশেষ পড়ালেখা : দ্বাদশ শ্রেণি, বাণিজ্য বিভাগ
শাহাদাতের তারিখ: ১২-০২-২০১৩
শাহাদাতের স্থান : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিটি কলেজ। : র্যাব ক্যাম্প
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍