শহীদ হাবীবুল্লাহ হুসাইন
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ হাবীবুল্লাহ হুসাইন
পিতার নাম: মোঃ নেয়ামত আলী খান
পিতার পেশা: গ্রাম্য ডাক্তার
মাতার নাম: জয়নব বেগম
মাতার পেশা: গৃহিণী
জন্ম তারিখ: ৪ জুলাই ১৯৯৪
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- তেবাড়িয়া, পোস্ট- শালকোনা উপজেলা- শার্শা, জেলা-যশোর।
ভাই-বোন: ৩ ভাই এর মধ্যে দ্বিতীয়
সাংগঠনিক মান: সদস্য প্রার্থী (প্রশ্নপত্র), বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির
পড়াশুনা: অনার্স ৩য় বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ, সরকারি এমএম কলেজ, যশোর
আহত হওয়ার স্থান: শহীদ আসাদ হল, সরকারী এমএম কলেজ
আঘাতের ধরণ: রড, হাতুড়ি, হকিস্টিক, স্ট্যাম্প, জি আই পাইপ দিয়ে পেটানো হয়
কাদের আঘাতে শহীদ: ছাত্রলীগ
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান: ২৩ নভেম্বর ২০১৫, যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
পিতার নাম: মোঃ নেয়ামত আলী খান
পিতার পেশা: গ্রাম্য ডাক্তার
মাতার নাম: জয়নব বেগম
মাতার পেশা: গৃহিণী
জন্ম তারিখ: ৪ জুলাই ১৯৯৪
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- তেবাড়িয়া, পোস্ট- শালকোনা উপজেলা- শার্শা, জেলা-যশোর।
ভাই-বোন: ৩ ভাই এর মধ্যে দ্বিতীয়
সাংগঠনিক মান: সদস্য প্রার্থী (প্রশ্নপত্র), বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির
পড়াশুনা: অনার্স ৩য় বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ, সরকারি এমএম কলেজ, যশোর
আহত হওয়ার স্থান: শহীদ আসাদ হল, সরকারী এমএম কলেজ
আঘাতের ধরণ: রড, হাতুড়ি, হকিস্টিক, স্ট্যাম্প, জি আই পাইপ দিয়ে পেটানো হয়
কাদের আঘাতে শহীদ: ছাত্রলীগ
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান: ২৩ নভেম্বর ২০১৫, যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
হাবীবুল্লাহ শহীদ হওয়ার দিন ফজরের নামাজের পর দোয়া করতে গিয়ে বলেছিলাম, আল্লাহ আমাকে শহীদের পিতা হিসেবে কবুল কর। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন। আমার হাবীবুল্লাহ আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে।
- শহীদের পিডা মোঃ নেয়ামত আলী খান।
শহীদের পরিচিতি
শহীদ মোঃ হাবিবুল্লাহ ১৯৯৪ সালের ৪ জুলাই যশোরের শার্শা উপজেলার তেবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা গ্রাম্য ডাক্তার মোঃ নেয়ামত আলী খান এবং মাতা মোছাঃ জয়নব বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। শহীদ হাবিবুল্লাহ দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (এমএম) কলেজের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র। তিনি যেমন মেধাবী ছাত্র ছিলেন তেমন চরিত্রবান ও সংগঠক ছিলেন। তিনি কলা অনুষদের দায়িত্বশীল ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান।
সরকারি এমএম কলেজ শাখার তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি রওশন ইকবাল শাহীর নির্দেশে জিসান, রনি, জুয়েল, নুর ইসলামসহ ৭-৮ জন ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী 'আশিক ভিলা'র মেসে হামলা চালিয়ে হাবিবুল্লাহ হুসাইনকে ধরে নিয়ে যায়। আসাদ হলের কসাইখানা খ্যাত ২০১ নম্বর রুমে আটকে রেখে হকিস্টিক, রড, স্ট্যাম্প, রামদা দিয়ে পিটিয়ে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে বিকাল ৩টার দিকে পুলিশে হস্তান্তর করে। অবশেষে বিকাল ৪টায় হাবিবুল্লাহ হুসাইন শাহাদাত বরণ করেন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
"আমি যেন আল্লাহর পথে শহীদ হতে পারি" সর্বশেষ এই দোয়া চেয়ে বন্ধু ও নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন শহীদ হাবীবুল্লাহ হুসাইন। শহীদেরা মরে না, তাঁরা অমর। তাঁদেরকে অন্য মৃতদের মধ্যে শামিল করা যায় না। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে একাধিকবার বলেছেন। সুরা বাকারায় ১৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- "আল্লাহর পথে যাঁরা নিহত হয় তাঁদেরকে মৃত বলো না বরং তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।"
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দ্বীনকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে যারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাঁদের পথচলা নিঃসন্দেহে বর্ণনাতীত কঠিন। এ কাঠিন্যের মাপকাঠি দিয়ে মহান প্রভু তাঁর অতি প্রিয় বান্দাহদেরকে বাছাই করে নেন। কিছু বান্দার জীবনের বিনিময়ে পরীক্ষা করতে চান কারা ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী। সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- "নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা, জান ও মাল এবং ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। (হে পয়গম্বরা) আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।"
শহীদ হাবীবুল্লাহ হুসাইনের সাথী মোঃ শাহাবুল আলম বলেন, যশোর শহর শাখায় আসার আগে অন্য খানা শাখায় কাজ করার কারণে শহীদদের সাথে খুব বেশি চলাফেরা হয়নি। তবে সংগঠনের শহর শাখার সেক্রেটারি থাকার কারণে থানা দায়িত্বশীল ছাড়াও শহরের সকল ক্যাম্পাসের অনুষদ সভাপতিদের নিয়মিত খোঁজখবর নিতে হতো। তা ছাড়া শহীদ হাবিবুল্লাহ সংগঠনের সর্বোচ্চ শপথের জন্য যখন ওয়ার্কশপে আসতেন তখন তাঁর আচার, ব্যবহার, প্রখর মেধা এবং আনুগত্যের ব্যাপারে সকলে সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু কে জানে এই ভাইটি হবে যশোর সরকারি এমএম কলেজ শাখার ইসলামী ছাত্র-আন্দোলনের প্রথম শহীদ। পিতা-মাতার অতি আদরের সন্তান ছিলেন শহীদ হাবিবুল্লাহ। শহীদের সাথীরা যখন হাবিবুল্লাহর বাসায় যান সন্তানহারা পিতা-মাতার কান্নায় বুঝতে পারেন শহীদ হাবিবুল্লাহ তাঁদের কত আদরের ধন ছিলেন। তাঁর পিতা আজও সন্তান হারানোর বেদনায় স্বাভাবিকভাবে কোন কাজ করতে পারেন না। শহীদ হাবিবুল্লাহ সদস্য হওয়ার জন্য চূড়ান্তভাবে বাছাইকৃত ছিলেন। তৎকালীন কেন্দ্রীয় ফাউন্ডেশন সম্পাদক আলামীন হাসান তাঁকে কন্টাকে যে কয়টি প্রশ্ন করেছিলেন তার সব কয়টির সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন, যা অনেকের বেলায় এমনটি হয় না। কিন্তু কেন্দ্রে কন্টাক পিছিয়ে যাওয়ার কারণে চূড়ান্ত শপথের আগে আল্লাহর কাছে পৌঁছে যান। শহীদ হাবিবুল্লাহ সর্বশেষ সরকারি এম এম কলেজ শাখার কলা অনুষদ সভাপতি ছিলেন। তিনি সংগঠনকে সবসময় গুছিয়ে রাখতেন। তার আমানতদারিতা ছিল অনন্য। হাবিবুল্লাহ 'আশিক ভিলা ছাত্রাবাসেরও' পরিচালক ছিলেন। শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত সংগঠন এবং মেসের সমস্ত হিসাব তার ডায়েরিতে পাওয়া যায়। আসলে আল্লাহ যাদেরকে শহীদ হিসাবে কবুল করেন তাদের জীবনটা এমনই হয়।"
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
২০১৫ সালের ২১ নভেম্বর রাত ১২টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের মামলায় অন্যায়ভাবে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। সারাদেশের মতো আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ যশোরে আনন্দ মিছিল করে। ২২ নভেম্বর সরকারি এমএম কলেজে ছাত্রলীগ মিছিল করে এবং জামায়াত-শিবির বিরোধী শ্লোগান দেয়। মিছিলের আগে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী মেসগুলাতে তারা সাধারণ ছাত্রদেরকে জোর করে অংশগ্রহণ করায়। যারা মিছিলে আসেনি তাদেরকে পরে টর্চার করে।
শহীদ কামরুল হাসান পারিবারিক চাপে সংগঠনের অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী 'নির্ঝর' নামক একটি সাধারণ মেসে থাকতেন। নিয়মিত নামাজ পড়ার কারণে ছাত্রলীগ তাঁকে আগে থেকে শিবির সন্দেহ করত। কামরুল হাসান ছাত্রলীগের মিছিলে না গিয়ে বাড়িতে চলে যান। ২৩ নভেম্বর তাঁর সম্মান ৩য় বর্ষের পরীক্ষা দেয়ার জন্য বাড়ি থেকে ক্যাম্পাসে আসেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ছাত্রলীগ তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে সরকারি এমএম কলেজের শহীদ আসাদ হলের ২০১ নম্বর রুমে নিয়ে রড, হকিস্টিক, স্ট্যাম্প এবং রামদা দিয়ে পিটিয়ে অত্যন্ত পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করে। জোর করে দায়িত্বশীলের নাম এবং অবস্থান জেনে নেয়। এরপর সরকারি এমএম কলেজ শাখার তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি রওশন ইকবাল শাহীর নির্দেশে জিসান, রনি, জুয়েল, নূর ইসলামসহ ৭-৮ জন ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী 'আশিক ভিলা ছাত্রাবাসে' হামলা চালায়। হাবিবুল্লাহ হুসাইন তাদের পরিচিত ছিল না যার কারণে মেসে গিয়ে হাবিবুল্লার নাম জিজ্ঞাসা করলে মেসের দায়িত্বশীল রাজু বলেন, হাবিবুল্লাহ মেসে নেই। এ কথা বলার সাথে সাথে তারা রাজুর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হাবিবুল্লাহ হুসাইন তখন দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। রাজুর ওপর নির্যাতন দেখে তিনি খাবার শেষ না করে বাইরে এসে বললেন, ওকে ছেড়ে দিন আমি হাবিবুল্লাহ। তখন নরপশুরা হাবিবুল্লাহকে ধরে নিয়ে আসাদ হলের কসাইখানা খ্যাত ২০১ নম্বর রুমে আটকে রেখে হকিস্টিক, রড, স্ট্যাম্প, রামদা দিয়ে পিটিয়ে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের কারণে তার সমস্ত অঙ্গে রক্ত জমাট বেধে কালো হয়ে গিয়েছিল এবং দুই পা ভেঙে গিয়েছিল। সেদিন তাঁদের চিৎকারের আর্তনাদ ছাত্রলীগের নরপশুদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি। এদিকে খানায় পুলিশকে জানালে পুলিশ নির্যাতিতদের উদ্ধার না করে ছাত্রলীগের সহায়তায় শহরের রেলগেটে অবস্থিত শিবিরের আরেকটি মেসে হামলা চালায়। সেখানে শিবিরের সাথী আল মামুনকে মেরে মারাত্মকভাবে আহত করে। পরে তাকেও মুমুর্ষু অবস্থায় যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ দিকে হাবিবুল্লাহ এবং কামরুল হাসানের অবস্থা যখন আশঙ্কাজনক, নির্যাতনের প্রায় ২ ঘণ্টা পর বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ এ দুইজনকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু পুলিশ এবং ডাক্তারদের অবহেলায় সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় তাদের অবস্থার আরো অবনতি হয়। অবশেষে বিকেল ৪টায় প্রিয় ভাই হাবিবুল্লাহ শাহাদাত বরণ করেন। কামরুল হাসানের অবস্থা আরো অবনতি হলে দায়িত্বশীলরা তাকে ঢাকায় পাঠানোর জন্য প্রশাসন এবং ডাক্তারদের কাছে অনেক অনুরোধ করেন কিন্তু তারা বিষয়টি মোটেও আমলে নেয়নি। অনেক চেষ্টার পরে তাঁদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর অনুমতি মিলল। নরপশুরা তাঁর পেটে এমনভাবে নির্যাতন করেছিল যে তাঁর ফুসফুস ফেটে গিয়েছিল। ফলে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে আসার আগে রাত সাড়ে ১২টায় আমাদের কামরুল হাসানও সবাইকে কাঁদিয়ে মহান আল্লাহর কাছে পৌঁছে যান। আর আহত মামুনকে কোনো রকম চিকিৎসা শেষে কয়েকদিন পর মিথ্যা মামলার কারাগারে পাঠায়। সেদিন শহীদের সাথীদের চাপাকান্না হয়তোবা আল্লাহর আরশে পৌঁছেছে কিন্তু সরকারের পুলিশ এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের কানে পৌঁছায়নি। পুলিশ হত্যাকারীদের নামে কোনো মামলা নেয়নি, এমনকি একটি মিছিল পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। দুনিয়ার আদালতে এর কোনো বিচার না হলেও আখেরাতের আদালতে আল্লাহ অবশ্য এর বিচার করবেন। ইনশাআল্লাহ।
ছাত্রলীগের নির্যাতনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হাবিবুল্লাহ হুসাইন হিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। এসএসসি ও এইচএসসিতে যথাক্রমে এ-প্লাস ও এ গ্রেড পেয়ে অনার্সে ভর্তি হন। থাকতেন কলেজ সংলগ্ন ছাত্রাবাসে। নিহতের স্বজন ও সহপাঠীরা জানান, হাবিবুল্লাহ ও কামরুল অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ও পরস্পরের বন্ধু। পাশের মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন। এ কারণে শিবির সন্দেহে তাঁদেরকে খাবার টেবিল থেকে ধরে এনে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত আসাদ হলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ছাত্রলীগের টর্চার সেলে নিয়ে প্রকাশ্যেই তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।
নির্যাতনে হতাহত ছাত্রদের নিজেদের কর্মী দাবি করে নতুন নাটক সাজায় ছাত্রলীগ। তখন শিবির নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, 'সরকারি এমএম কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তিনটি ছাত্রাবাস থেকে ওই ছাত্রদের ধরে আসাদ হলের ২০১ নম্বর কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করেন। পরে পুলিশ ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণাধীন হল থেকে তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে তখন ছাত্রলীগ নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ছাত্রলীগের কেউ কোনো নির্যাতন করেননি। আর আসাদ হল থেকে নয়, হলের পাশ থেকে পুলিশ তাদের নিয়ে গেছে। তবে তখন মামলা নেয়নি পুলিশ। বাধ্য হয়ে এ ঘটনার ১৯ দিন পর আদালতে মামলা দায়ের করেন কামরুলের বড় ভাই ইব্রাহিম হোসেন। এই মামলায় ১৩ জনের নাম পরিচয় উল্লেখ করে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল তৎকালীন যশোর শহর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান রনি, যুগ্ম আহ্বায়ক স্থানস্থাবিল আহমেদ জিসান, সরকারি এমএম কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান, কর্মী নূর ইসলাম, জামাল হোসেন, ইয়াসিন মোহাম্মদ কাজল ও সজিবুর রহমান। আদালত তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মামলাটি কোতোয়ালি থানায় পাঠায়।
এখন পর্যন্ত আটক হয়নি কোনো আসামি। দুইজনকে প্রকাশ্য পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত অধিকাংশ আসামিই সরকারি এমএম কলেজের ছাত্র এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার ২নং আসামি স্থানছাবিল আহম্মেদ জিসান ছিল যশোর শহর হাবলীগের যুগ্ম আহবায়ক। প্রকাশ্যে ছাত্র নির্যাতনের 'বীরত্ব' দেখানোর পর সে এখন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। পদ নির্ধারণে এমন পন্থা অবলম্বন করায় দিন-দিন ছাত্রলীগ হয়ে উঠছে আরো বেপরোয়া। আসামিরা এক সময় আইনি প্রক্রিয়া খামিয়ে দিতেও মরিয়া হয়ে ওঠে। বাদিকে হুমকি দেয়া হয়, মামলা তুলে না নিলে তাকেও একই পরিণতির শিকার হতে হবে। বাদি ইব্রাহিম হোসেন জীবনের নিরাপত্তার অভাবে মালয়েশিয়া চলে গেছেন।
মামলার অন্যতম আইনজীবী রোকনুজ্জামান বলেন, দুইজন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। আইনজীবী হিসেবে খুনিদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আকাঙ্ক্ষ্য নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিচার প্রক্রিয়া সুদূর পরাহত। চার বছরে একজন আসামিও আটক হয়নি। তিনি বলেন, দেশে বিরাজমান বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই খুনিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আবরার হত্যার মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। মামলার অন্যতম আইনজীবী রোকনুজ্জামান বলেন, দুইজন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। আইনজীবী হিসেবে খুনিদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আকাঙ্ক্ষ্য নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিচার প্রক্রিয়া সুদূর পরাহত। চার বছরে একজন আসামিও আটক হয়নি। তিনি বলেন, দেশে বিরাজমান বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই খুনিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আবরার হত্যার মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
আপনজনদের কথা
শহীদের মাতা। নিহত হাবিবুল্লাহর মা জয়নাব বেগম বলেন, এ ঘটনা সবার জানা। মামলা করে কী লাভ? বিচার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। তিনি নিশ্চয় সন্তানহারা এ মায়ের দোয়া কবুল করবেন। শহীদের শিতা। হাবীবুল্লাহ শহীদ হওয়ার দিন ফজরের নামাজের পর দোয়া করতে গিয়ে বলেছিলাম, আল্লাহ আমাকে শহীদের পিতা হিসেবে কবুল কর। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন। আমার হাবীবুল্লাহ আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে।
শহীদের পরিবার
শহীদ হাবীবুল্লাহর বড় ভাই জয়নাল আবেদীন সরকারী এমএম কলেজে মাস্টার্স অধ্যায়নরত এবং ছোটভাই বাকী বিল্লাহ কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স অধ্যায়নরত। গ্রাম্য ডাক্তার পিতা নেয়ামত আলী খানের একার উপার্জনে চলছে সংসার।
গণমাধ্যমে শাহাদাতের খবর
'যশোরে শিবির সন্দেহে গণপিটুনি, কলেজছাত্র নিহত' শিরোনামে বাংলার চোখ নিম্মোক্ত খবর প্রচার করে-যশোরে গতকাল বিকেলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী সন্দেহে গণপিটুনিতে হাবিবুল্লাহ (২২) নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তাঁর দুই সহপাঠী।
ছাত্রলীগের কর্মীরা ওই তিনজনকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয় বলে জানিয়েছেন যশোর। কোতোয়ালি খানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার আক্কাস আলী।
নিহত হাবিবুল্লাহ শার্শা উপজেলার তেবাড়িয়া এলাকার নিয়ামত আলীর ছেলে। কামরুল আহসান (২২) ও আল মামুনকে (২২) যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে আল মামুনের অবস্থা গুরুতর বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
হতাহতরা যশোর এমএম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তাঁরা কলেজের পূর্ব পাশে 'নির্বার' নামে একটি মেসে থাকতেন।
আহত আল মামুন জানান, বিকেল ৩টার দিকে চার-পাঁচজন লোক এসে তাঁদের তিনজনকে পাশের আশিক ছাত্রাবাসে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করে।
যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার আক্কাস আলী জানান, ছাত্রলীগের কর্মীরা ওই তিনজনকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরপর পুলিশ তাদের যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট
জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হাবিবুল্লাহ। তিনজনই শিবিরের কর্মী বলে শোনা যাচ্ছে। পরে সংশ্লিষ্ট ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে একটি ককটেল ও শিবিরের কিছু বইপত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
আহত কামরুলের মা আনোয়ারা বেগম দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনদিন বাড়িতে থেকে আজ যশোর এসেছিলেন পরীক্ষা দেওয়ার জন্য।
তবে যশোর জেলা জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিহত ও
আহতরা শিবিরের কর্মী। স্থানীয় ছাত্রলীগের কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়।
আহত কামরুল আহসান বাঘারপাড়া উপজেলার ছোটখুদরা গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে এবং আল মামুন মাগুরার শালিখা উপজেলার সীমাখালীর আতিয়ার রহমানের হেলে।
প্রকাশিত খবরের প্রতিবাদ।
প্রথম আলো, বাংলামেইলসহ কিছু গণমাধ্যমে যশোরে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের নির্যাতনে নিহত শিবির নেতাদের গণপিটুনিতে নিহত উল্লেখ করে অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
এক যৌথ প্রতিবাদবার্তায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল জব্বার ও সেক্রেটারী জেনারেল আতিকুর রহমান বলেন, ছাত্রলীগ নিরীহ ছাত্রদের নৃশংসভাবে খুন করে বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে আর প্রথম আলো ও বাংলামেইলের মত গণমাধ্যম তা আড়াল করার অপচেষ্টা করে বর্বরদের সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে। গত ২৩শে নভেম্বর দুপুর ২টায় যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূধন কলেজের অর্থনীতির ৩য় বর্ষের ছাত্র মোঃ হাবিবুল্লাহ হোসাইন, কামরুল আহসান, আব্দুল্লাহ আল মামুনকে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রওশন ইকবাল শাহীর নেতৃত্বে জিসান, রনি, জুয়েলসহ ১০-১৫জন ছাত্রলীগ ক্যাডার মেস থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে কলেজের আসাদ হলে আটকে রেখে তাদের উপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়। ঘন্টাখানেক পর পুলিশ এসে আহতদের উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে হাবিবুল্লাহ হোসাইনকে মৃত ঘোষণা করে কর্তব্যরত চিকিৎসক। অন্য দুই জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার মধ্যে কামরুল হাসানের অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় আনার পথে সেও রাত ১২টায় মারা যায়। ছাত্রলীগের এই বর্বরতায় যখন ধিক্কারের ঝড় উঠেছে তখন তা আড়াল করতে এসব গণমাধ্যমের এই ন্যক্কারজনক মিথ্যাচার চরম দায়িত্বহীনতার নিকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ছাত্রলীগ অব্যাহত সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া নৃশংসতার জন্য। এসব গণমাধ্যমের দায়িত্বহীন ভূমিকা অনেকাংশে দায়ী বলে দেশবাসী মনে করে। এসব গণমাধ্যমের বুঝা উচিৎ, প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে নৃশংসতা আড়াল আরেকটি নৃশংসতাকে উৎসাহিত করে।
নেতৃবৃন্দ ভবিষ্যতে এমন অমানবিক অপপ্রচার থেকে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের প্রতি আহবান জানান।
জানাজা
২৪ তারিখ আসরের নামাজের পর শহীদের গ্রামের বাড়ির ঈদগাঁ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন শহীদের গর্বিত পিতা মোঃ নেয়ামত আলী খান। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রিয় পাঠাগার সম্পাদক আলামিন হোসেন।
এক নজরে শহীদ হাবীবুল্লাহ হুসাইন
নাম
শহীদ হাবীবুল্লাহ হুসাইন
পিতার নাম: মোঃ নেয়ামত আলী খান
পিতার পেশা: গ্রাম্য ডাক্তার
মাতার নাম: জয়নব বেগম
মাতার পেশা: গৃহিণী
জন্ম তারিখ: ৪ জুলাই ১৯৯৪
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- তেবাড়িয়া, পোস্ট- শালকোনা উপজেলা- শার্শা, জেলা-যশোর।
ভাই-বোন: ৩ ভাই এর মধ্যে দ্বিতীয়
সাংগঠনিক মান: সদস্য প্রার্থী (প্রশ্নপত্র), বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির
পড়াশুনা: অনার্স ৩য় বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ, সরকারি এমএম কলেজ, যশোর
আহত হওয়ার স্থান: শহীদ আসাদ হল, সরকারী এমএম কলেজ
আঘাতের ধরণ: রড, হাতুড়ি, হকিস্টিক, স্ট্যাম্প, জি আই পাইপ দিয়ে পেটানো হয়
কাদের আঘাতে শহীদ: ছাত্রলীগ
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান: ২৩ নভেম্বর ২০১৫, যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
- শহীদের পিডা মোঃ নেয়ামত আলী খান।
শহীদের পরিচিতি
শহীদ মোঃ হাবিবুল্লাহ ১৯৯৪ সালের ৪ জুলাই যশোরের শার্শা উপজেলার তেবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা গ্রাম্য ডাক্তার মোঃ নেয়ামত আলী খান এবং মাতা মোছাঃ জয়নব বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। শহীদ হাবিবুল্লাহ দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (এমএম) কলেজের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র। তিনি যেমন মেধাবী ছাত্র ছিলেন তেমন চরিত্রবান ও সংগঠক ছিলেন। তিনি কলা অনুষদের দায়িত্বশীল ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান।
সরকারি এমএম কলেজ শাখার তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি রওশন ইকবাল শাহীর নির্দেশে জিসান, রনি, জুয়েল, নুর ইসলামসহ ৭-৮ জন ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী 'আশিক ভিলা'র মেসে হামলা চালিয়ে হাবিবুল্লাহ হুসাইনকে ধরে নিয়ে যায়। আসাদ হলের কসাইখানা খ্যাত ২০১ নম্বর রুমে আটকে রেখে হকিস্টিক, রড, স্ট্যাম্প, রামদা দিয়ে পিটিয়ে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে বিকাল ৩টার দিকে পুলিশে হস্তান্তর করে। অবশেষে বিকাল ৪টায় হাবিবুল্লাহ হুসাইন শাহাদাত বরণ করেন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
"আমি যেন আল্লাহর পথে শহীদ হতে পারি" সর্বশেষ এই দোয়া চেয়ে বন্ধু ও নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন শহীদ হাবীবুল্লাহ হুসাইন। শহীদেরা মরে না, তাঁরা অমর। তাঁদেরকে অন্য মৃতদের মধ্যে শামিল করা যায় না। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে একাধিকবার বলেছেন। সুরা বাকারায় ১৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- "আল্লাহর পথে যাঁরা নিহত হয় তাঁদেরকে মৃত বলো না বরং তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।"
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দ্বীনকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে যারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাঁদের পথচলা নিঃসন্দেহে বর্ণনাতীত কঠিন। এ কাঠিন্যের মাপকাঠি দিয়ে মহান প্রভু তাঁর অতি প্রিয় বান্দাহদেরকে বাছাই করে নেন। কিছু বান্দার জীবনের বিনিময়ে পরীক্ষা করতে চান কারা ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী। সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- "নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা, জান ও মাল এবং ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। (হে পয়গম্বরা) আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।"
শহীদ হাবীবুল্লাহ হুসাইনের সাথী মোঃ শাহাবুল আলম বলেন, যশোর শহর শাখায় আসার আগে অন্য খানা শাখায় কাজ করার কারণে শহীদদের সাথে খুব বেশি চলাফেরা হয়নি। তবে সংগঠনের শহর শাখার সেক্রেটারি থাকার কারণে থানা দায়িত্বশীল ছাড়াও শহরের সকল ক্যাম্পাসের অনুষদ সভাপতিদের নিয়মিত খোঁজখবর নিতে হতো। তা ছাড়া শহীদ হাবিবুল্লাহ সংগঠনের সর্বোচ্চ শপথের জন্য যখন ওয়ার্কশপে আসতেন তখন তাঁর আচার, ব্যবহার, প্রখর মেধা এবং আনুগত্যের ব্যাপারে সকলে সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু কে জানে এই ভাইটি হবে যশোর সরকারি এমএম কলেজ শাখার ইসলামী ছাত্র-আন্দোলনের প্রথম শহীদ। পিতা-মাতার অতি আদরের সন্তান ছিলেন শহীদ হাবিবুল্লাহ। শহীদের সাথীরা যখন হাবিবুল্লাহর বাসায় যান সন্তানহারা পিতা-মাতার কান্নায় বুঝতে পারেন শহীদ হাবিবুল্লাহ তাঁদের কত আদরের ধন ছিলেন। তাঁর পিতা আজও সন্তান হারানোর বেদনায় স্বাভাবিকভাবে কোন কাজ করতে পারেন না। শহীদ হাবিবুল্লাহ সদস্য হওয়ার জন্য চূড়ান্তভাবে বাছাইকৃত ছিলেন। তৎকালীন কেন্দ্রীয় ফাউন্ডেশন সম্পাদক আলামীন হাসান তাঁকে কন্টাকে যে কয়টি প্রশ্ন করেছিলেন তার সব কয়টির সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন, যা অনেকের বেলায় এমনটি হয় না। কিন্তু কেন্দ্রে কন্টাক পিছিয়ে যাওয়ার কারণে চূড়ান্ত শপথের আগে আল্লাহর কাছে পৌঁছে যান। শহীদ হাবিবুল্লাহ সর্বশেষ সরকারি এম এম কলেজ শাখার কলা অনুষদ সভাপতি ছিলেন। তিনি সংগঠনকে সবসময় গুছিয়ে রাখতেন। তার আমানতদারিতা ছিল অনন্য। হাবিবুল্লাহ 'আশিক ভিলা ছাত্রাবাসেরও' পরিচালক ছিলেন। শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত সংগঠন এবং মেসের সমস্ত হিসাব তার ডায়েরিতে পাওয়া যায়। আসলে আল্লাহ যাদেরকে শহীদ হিসাবে কবুল করেন তাদের জীবনটা এমনই হয়।"
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
২০১৫ সালের ২১ নভেম্বর রাত ১২টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের মামলায় অন্যায়ভাবে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। সারাদেশের মতো আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ যশোরে আনন্দ মিছিল করে। ২২ নভেম্বর সরকারি এমএম কলেজে ছাত্রলীগ মিছিল করে এবং জামায়াত-শিবির বিরোধী শ্লোগান দেয়। মিছিলের আগে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী মেসগুলাতে তারা সাধারণ ছাত্রদেরকে জোর করে অংশগ্রহণ করায়। যারা মিছিলে আসেনি তাদেরকে পরে টর্চার করে।
শহীদ কামরুল হাসান পারিবারিক চাপে সংগঠনের অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী 'নির্ঝর' নামক একটি সাধারণ মেসে থাকতেন। নিয়মিত নামাজ পড়ার কারণে ছাত্রলীগ তাঁকে আগে থেকে শিবির সন্দেহ করত। কামরুল হাসান ছাত্রলীগের মিছিলে না গিয়ে বাড়িতে চলে যান। ২৩ নভেম্বর তাঁর সম্মান ৩য় বর্ষের পরীক্ষা দেয়ার জন্য বাড়ি থেকে ক্যাম্পাসে আসেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ছাত্রলীগ তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে সরকারি এমএম কলেজের শহীদ আসাদ হলের ২০১ নম্বর রুমে নিয়ে রড, হকিস্টিক, স্ট্যাম্প এবং রামদা দিয়ে পিটিয়ে অত্যন্ত পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করে। জোর করে দায়িত্বশীলের নাম এবং অবস্থান জেনে নেয়। এরপর সরকারি এমএম কলেজ শাখার তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি রওশন ইকবাল শাহীর নির্দেশে জিসান, রনি, জুয়েল, নূর ইসলামসহ ৭-৮ জন ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী 'আশিক ভিলা ছাত্রাবাসে' হামলা চালায়। হাবিবুল্লাহ হুসাইন তাদের পরিচিত ছিল না যার কারণে মেসে গিয়ে হাবিবুল্লার নাম জিজ্ঞাসা করলে মেসের দায়িত্বশীল রাজু বলেন, হাবিবুল্লাহ মেসে নেই। এ কথা বলার সাথে সাথে তারা রাজুর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হাবিবুল্লাহ হুসাইন তখন দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। রাজুর ওপর নির্যাতন দেখে তিনি খাবার শেষ না করে বাইরে এসে বললেন, ওকে ছেড়ে দিন আমি হাবিবুল্লাহ। তখন নরপশুরা হাবিবুল্লাহকে ধরে নিয়ে আসাদ হলের কসাইখানা খ্যাত ২০১ নম্বর রুমে আটকে রেখে হকিস্টিক, রড, স্ট্যাম্প, রামদা দিয়ে পিটিয়ে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের কারণে তার সমস্ত অঙ্গে রক্ত জমাট বেধে কালো হয়ে গিয়েছিল এবং দুই পা ভেঙে গিয়েছিল। সেদিন তাঁদের চিৎকারের আর্তনাদ ছাত্রলীগের নরপশুদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি। এদিকে খানায় পুলিশকে জানালে পুলিশ নির্যাতিতদের উদ্ধার না করে ছাত্রলীগের সহায়তায় শহরের রেলগেটে অবস্থিত শিবিরের আরেকটি মেসে হামলা চালায়। সেখানে শিবিরের সাথী আল মামুনকে মেরে মারাত্মকভাবে আহত করে। পরে তাকেও মুমুর্ষু অবস্থায় যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ দিকে হাবিবুল্লাহ এবং কামরুল হাসানের অবস্থা যখন আশঙ্কাজনক, নির্যাতনের প্রায় ২ ঘণ্টা পর বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ এ দুইজনকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু পুলিশ এবং ডাক্তারদের অবহেলায় সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় তাদের অবস্থার আরো অবনতি হয়। অবশেষে বিকেল ৪টায় প্রিয় ভাই হাবিবুল্লাহ শাহাদাত বরণ করেন। কামরুল হাসানের অবস্থা আরো অবনতি হলে দায়িত্বশীলরা তাকে ঢাকায় পাঠানোর জন্য প্রশাসন এবং ডাক্তারদের কাছে অনেক অনুরোধ করেন কিন্তু তারা বিষয়টি মোটেও আমলে নেয়নি। অনেক চেষ্টার পরে তাঁদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর অনুমতি মিলল। নরপশুরা তাঁর পেটে এমনভাবে নির্যাতন করেছিল যে তাঁর ফুসফুস ফেটে গিয়েছিল। ফলে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে আসার আগে রাত সাড়ে ১২টায় আমাদের কামরুল হাসানও সবাইকে কাঁদিয়ে মহান আল্লাহর কাছে পৌঁছে যান। আর আহত মামুনকে কোনো রকম চিকিৎসা শেষে কয়েকদিন পর মিথ্যা মামলার কারাগারে পাঠায়। সেদিন শহীদের সাথীদের চাপাকান্না হয়তোবা আল্লাহর আরশে পৌঁছেছে কিন্তু সরকারের পুলিশ এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের কানে পৌঁছায়নি। পুলিশ হত্যাকারীদের নামে কোনো মামলা নেয়নি, এমনকি একটি মিছিল পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। দুনিয়ার আদালতে এর কোনো বিচার না হলেও আখেরাতের আদালতে আল্লাহ অবশ্য এর বিচার করবেন। ইনশাআল্লাহ।
ছাত্রলীগের নির্যাতনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হাবিবুল্লাহ হুসাইন হিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। এসএসসি ও এইচএসসিতে যথাক্রমে এ-প্লাস ও এ গ্রেড পেয়ে অনার্সে ভর্তি হন। থাকতেন কলেজ সংলগ্ন ছাত্রাবাসে। নিহতের স্বজন ও সহপাঠীরা জানান, হাবিবুল্লাহ ও কামরুল অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ও পরস্পরের বন্ধু। পাশের মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন। এ কারণে শিবির সন্দেহে তাঁদেরকে খাবার টেবিল থেকে ধরে এনে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত আসাদ হলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ছাত্রলীগের টর্চার সেলে নিয়ে প্রকাশ্যেই তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।
নির্যাতনে হতাহত ছাত্রদের নিজেদের কর্মী দাবি করে নতুন নাটক সাজায় ছাত্রলীগ। তখন শিবির নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, 'সরকারি এমএম কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তিনটি ছাত্রাবাস থেকে ওই ছাত্রদের ধরে আসাদ হলের ২০১ নম্বর কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করেন। পরে পুলিশ ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণাধীন হল থেকে তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে তখন ছাত্রলীগ নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ছাত্রলীগের কেউ কোনো নির্যাতন করেননি। আর আসাদ হল থেকে নয়, হলের পাশ থেকে পুলিশ তাদের নিয়ে গেছে। তবে তখন মামলা নেয়নি পুলিশ। বাধ্য হয়ে এ ঘটনার ১৯ দিন পর আদালতে মামলা দায়ের করেন কামরুলের বড় ভাই ইব্রাহিম হোসেন। এই মামলায় ১৩ জনের নাম পরিচয় উল্লেখ করে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল তৎকালীন যশোর শহর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান রনি, যুগ্ম আহ্বায়ক স্থানস্থাবিল আহমেদ জিসান, সরকারি এমএম কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান, কর্মী নূর ইসলাম, জামাল হোসেন, ইয়াসিন মোহাম্মদ কাজল ও সজিবুর রহমান। আদালত তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মামলাটি কোতোয়ালি থানায় পাঠায়।
এখন পর্যন্ত আটক হয়নি কোনো আসামি। দুইজনকে প্রকাশ্য পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত অধিকাংশ আসামিই সরকারি এমএম কলেজের ছাত্র এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার ২নং আসামি স্থানছাবিল আহম্মেদ জিসান ছিল যশোর শহর হাবলীগের যুগ্ম আহবায়ক। প্রকাশ্যে ছাত্র নির্যাতনের 'বীরত্ব' দেখানোর পর সে এখন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। পদ নির্ধারণে এমন পন্থা অবলম্বন করায় দিন-দিন ছাত্রলীগ হয়ে উঠছে আরো বেপরোয়া। আসামিরা এক সময় আইনি প্রক্রিয়া খামিয়ে দিতেও মরিয়া হয়ে ওঠে। বাদিকে হুমকি দেয়া হয়, মামলা তুলে না নিলে তাকেও একই পরিণতির শিকার হতে হবে। বাদি ইব্রাহিম হোসেন জীবনের নিরাপত্তার অভাবে মালয়েশিয়া চলে গেছেন।
মামলার অন্যতম আইনজীবী রোকনুজ্জামান বলেন, দুইজন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। আইনজীবী হিসেবে খুনিদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আকাঙ্ক্ষ্য নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিচার প্রক্রিয়া সুদূর পরাহত। চার বছরে একজন আসামিও আটক হয়নি। তিনি বলেন, দেশে বিরাজমান বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই খুনিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আবরার হত্যার মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। মামলার অন্যতম আইনজীবী রোকনুজ্জামান বলেন, দুইজন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। আইনজীবী হিসেবে খুনিদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আকাঙ্ক্ষ্য নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিচার প্রক্রিয়া সুদূর পরাহত। চার বছরে একজন আসামিও আটক হয়নি। তিনি বলেন, দেশে বিরাজমান বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই খুনিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আবরার হত্যার মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
আপনজনদের কথা
শহীদের মাতা। নিহত হাবিবুল্লাহর মা জয়নাব বেগম বলেন, এ ঘটনা সবার জানা। মামলা করে কী লাভ? বিচার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। তিনি নিশ্চয় সন্তানহারা এ মায়ের দোয়া কবুল করবেন। শহীদের শিতা। হাবীবুল্লাহ শহীদ হওয়ার দিন ফজরের নামাজের পর দোয়া করতে গিয়ে বলেছিলাম, আল্লাহ আমাকে শহীদের পিতা হিসেবে কবুল কর। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন। আমার হাবীবুল্লাহ আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে।
শহীদের পরিবার
শহীদ হাবীবুল্লাহর বড় ভাই জয়নাল আবেদীন সরকারী এমএম কলেজে মাস্টার্স অধ্যায়নরত এবং ছোটভাই বাকী বিল্লাহ কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স অধ্যায়নরত। গ্রাম্য ডাক্তার পিতা নেয়ামত আলী খানের একার উপার্জনে চলছে সংসার।
গণমাধ্যমে শাহাদাতের খবর
'যশোরে শিবির সন্দেহে গণপিটুনি, কলেজছাত্র নিহত' শিরোনামে বাংলার চোখ নিম্মোক্ত খবর প্রচার করে-যশোরে গতকাল বিকেলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী সন্দেহে গণপিটুনিতে হাবিবুল্লাহ (২২) নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তাঁর দুই সহপাঠী।
ছাত্রলীগের কর্মীরা ওই তিনজনকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয় বলে জানিয়েছেন যশোর। কোতোয়ালি খানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার আক্কাস আলী।
নিহত হাবিবুল্লাহ শার্শা উপজেলার তেবাড়িয়া এলাকার নিয়ামত আলীর ছেলে। কামরুল আহসান (২২) ও আল মামুনকে (২২) যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে আল মামুনের অবস্থা গুরুতর বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
হতাহতরা যশোর এমএম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তাঁরা কলেজের পূর্ব পাশে 'নির্বার' নামে একটি মেসে থাকতেন।
আহত আল মামুন জানান, বিকেল ৩টার দিকে চার-পাঁচজন লোক এসে তাঁদের তিনজনকে পাশের আশিক ছাত্রাবাসে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করে।
যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার আক্কাস আলী জানান, ছাত্রলীগের কর্মীরা ওই তিনজনকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরপর পুলিশ তাদের যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট
জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হাবিবুল্লাহ। তিনজনই শিবিরের কর্মী বলে শোনা যাচ্ছে। পরে সংশ্লিষ্ট ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে একটি ককটেল ও শিবিরের কিছু বইপত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
আহত কামরুলের মা আনোয়ারা বেগম দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনদিন বাড়িতে থেকে আজ যশোর এসেছিলেন পরীক্ষা দেওয়ার জন্য।
তবে যশোর জেলা জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিহত ও
আহতরা শিবিরের কর্মী। স্থানীয় ছাত্রলীগের কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়।
আহত কামরুল আহসান বাঘারপাড়া উপজেলার ছোটখুদরা গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে এবং আল মামুন মাগুরার শালিখা উপজেলার সীমাখালীর আতিয়ার রহমানের হেলে।
প্রকাশিত খবরের প্রতিবাদ।
প্রথম আলো, বাংলামেইলসহ কিছু গণমাধ্যমে যশোরে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের নির্যাতনে নিহত শিবির নেতাদের গণপিটুনিতে নিহত উল্লেখ করে অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
এক যৌথ প্রতিবাদবার্তায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল জব্বার ও সেক্রেটারী জেনারেল আতিকুর রহমান বলেন, ছাত্রলীগ নিরীহ ছাত্রদের নৃশংসভাবে খুন করে বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে আর প্রথম আলো ও বাংলামেইলের মত গণমাধ্যম তা আড়াল করার অপচেষ্টা করে বর্বরদের সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে। গত ২৩শে নভেম্বর দুপুর ২টায় যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূধন কলেজের অর্থনীতির ৩য় বর্ষের ছাত্র মোঃ হাবিবুল্লাহ হোসাইন, কামরুল আহসান, আব্দুল্লাহ আল মামুনকে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রওশন ইকবাল শাহীর নেতৃত্বে জিসান, রনি, জুয়েলসহ ১০-১৫জন ছাত্রলীগ ক্যাডার মেস থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে কলেজের আসাদ হলে আটকে রেখে তাদের উপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়। ঘন্টাখানেক পর পুলিশ এসে আহতদের উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে হাবিবুল্লাহ হোসাইনকে মৃত ঘোষণা করে কর্তব্যরত চিকিৎসক। অন্য দুই জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার মধ্যে কামরুল হাসানের অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় আনার পথে সেও রাত ১২টায় মারা যায়। ছাত্রলীগের এই বর্বরতায় যখন ধিক্কারের ঝড় উঠেছে তখন তা আড়াল করতে এসব গণমাধ্যমের এই ন্যক্কারজনক মিথ্যাচার চরম দায়িত্বহীনতার নিকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ছাত্রলীগ অব্যাহত সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া নৃশংসতার জন্য। এসব গণমাধ্যমের দায়িত্বহীন ভূমিকা অনেকাংশে দায়ী বলে দেশবাসী মনে করে। এসব গণমাধ্যমের বুঝা উচিৎ, প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে নৃশংসতা আড়াল আরেকটি নৃশংসতাকে উৎসাহিত করে।
নেতৃবৃন্দ ভবিষ্যতে এমন অমানবিক অপপ্রচার থেকে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের প্রতি আহবান জানান।
জানাজা
২৪ তারিখ আসরের নামাজের পর শহীদের গ্রামের বাড়ির ঈদগাঁ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন শহীদের গর্বিত পিতা মোঃ নেয়ামত আলী খান। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রিয় পাঠাগার সম্পাদক আলামিন হোসেন।
এক নজরে শহীদ হাবীবুল্লাহ হুসাইন
নাম
শহীদ হাবীবুল্লাহ হুসাইন
পিতার নাম: মোঃ নেয়ামত আলী খান
পিতার পেশা: গ্রাম্য ডাক্তার
মাতার নাম: জয়নব বেগম
মাতার পেশা: গৃহিণী
জন্ম তারিখ: ৪ জুলাই ১৯৯৪
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- তেবাড়িয়া, পোস্ট- শালকোনা উপজেলা- শার্শা, জেলা-যশোর।
ভাই-বোন: ৩ ভাই এর মধ্যে দ্বিতীয়
সাংগঠনিক মান: সদস্য প্রার্থী (প্রশ্নপত্র), বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির
পড়াশুনা: অনার্স ৩য় বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ, সরকারি এমএম কলেজ, যশোর
আহত হওয়ার স্থান: শহীদ আসাদ হল, সরকারী এমএম কলেজ
আঘাতের ধরণ: রড, হাতুড়ি, হকিস্টিক, স্ট্যাম্প, জি আই পাইপ দিয়ে পেটানো হয়
কাদের আঘাতে শহীদ: ছাত্রলীগ
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান: ২৩ নভেম্বর ২০১৫, যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍