শহীদ লোকমান হোসেন
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ লোকমান হোসেন, মৌলভীবাজারের বড়লেখায় জন্ম নেওয়া এক বিশ্বাসী, শান্ত স্বভাবের ও পরিশ্রমী তরুণ। যিনি দারিদ্র্যের মাঝে থেকেও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন বুকে লালন করতেন। অল্প বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে কৃষিকাজে নেমে পরিবারকে টানতে থাকেন। কিন্তু অন্তরে ছিল ঈমান, ন্যায় ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি গভীর ভালোবাসা। আল্লামা সাঈদীর রায় ঘোষণার প্রতিবাদে তিনি জনতার কাতারে দাঁড়ান এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। তার জানাজায় এলাকায় জনসমাবেশের রূপ নেয়। এলাকার মানুষ তাকে সত্যের পথে অবিচল এক সাহসী শহীদ হিসেবে স্মরণ করে। স্বল্প বয়সের জীবন দিয়ে হলেও লোকমান হোসেন রেখে গেছেন সংগ্রাম, আদর্শ ও ত্যাগের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ লোকমান হোসেন
মৌলভীবাজার, বড়লেখা
"মা-বাবা বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের দেখা শুনার কেউ নেই। মা ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাদের নানীর বাড়িতে থাকেন। শহীদ লোকমান হোসেন কাজ করে ভাই বোনদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ...বয়সে ছোট হলেও তার মন ছিল সদা ঈমানদীপ্ত। কখনো কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না। প্রায়ই বন্ধুদের বলতেন সাঈদী সাহেবের কিছু হলে আমি শহীদ হয়ে যাব।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ লোকমান হোসেন মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার পূর্ব দক্ষিণভাগ গাংকুল গ্রামে ১৯৯৬ সালে জন্মগ্রহন করেণ। পিতা আব্দুল মান্নান ও মাতা রুফিয়া বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে শহীদ লোকমান হোসেন দ্বিতীয়। পিতা-মাতার অভাবী সংসারে অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে শহীদ মোঃ লোকমান হোসেন টিলাবাজারের মোহাম্মদিয়া মাদ্রসায় ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখা-পড়ার পর আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। বরং ক্ষেত-খামারে কাজ করাটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে হয়েছে। ধরতে হয়েছে পরিবারের হাল। তা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে অন্য ভাইয়েরাও লেখা-পড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। দু'টি বোন গাংকুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণীতে লেখা-পড়া চালিয়ে যাচ্ছে। মা বাবা বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের দেখাশুনার কেউ নেই। মা ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাদের নানীর বাড়িতে থাকেন। শহীদ লোকমান হোসেন কাজ করে ভাই বোনদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
কিন্তু স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বুলেটের আঘাত তার এ স্বপ্নকে ভেঙে খান খান করে দেয়। পিতা-মাতা ও ভাই-বোনের মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে সকলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে শ্লোগানরত। অবস্থায় মহান রবের ডাকে ইহধাম ত্যাগ করেন তিনি।
বয়সে ছোট হলেও তার মন ছিল সদা ঈমানদীপ্ত। কখনো কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না। প্রায়ই বন্ধুদের বলতেন সাঈদী সাহেবের কিছু হলে আমি শহীদ হয়ে যাব।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখ বৃহস্পতিবার আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় শোনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলী বাজারে তৌহিদী জনতা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এলাকার বিভিন্ন স্থানে একত্রিত হতে থাকে হাজারো সাঈদীভক্ত। শহীদ লোকমান হোসেন ক্ষেতে কাজ করছিলেন। খবর পেয়ে ছুটে যান জনতার কাতারে। প্রতিবাদে নেমে পড়েন রাস্তায়। শ্লোগানে মুখরিত বিক্ষোভ মিছিল। মিছিল শহরের দিকে যাওয়ার সময় কাঁঠালতলী এলাকয় সওদাগর ব্রিক ফিল্ড সংলগ্ন স্থানে পুলিশ বাধা দেয় এবং গুলি করতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ শহীদ লোকমান হোসেনকে টার্গেট করে গুলি করলে তার শরীরের বাম পাশে গুলি লাগে। সাথে সাথে ঘটনাস্থলেই বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
পোস্টমর্টেমের পর ১ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো মানুষ উপজেলার রতুলীস্থ গাংকুল মনসুরিয়া ফাযিল মাদ্রাসা মাঠে জড়ো হতে থাকেন। বিকেল ৫টায় জানাযা হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন শহীদের চাচা সুমন আহমেদ। জানাযায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার লোক অংশগ্রহণ করেন। এ সময় বিজিবি, পুলিশ, আনসার-ভিডিপির কড়া নজরদারি থাকায় অনেকে ভয়ে জানাযায় আসতে পারেননি। তারপরও এলাকার লোকজনের বক্তব্য হলো এ এলাকায় এত বড় সমাগম আর কখোনো হয়নি।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখ বৃহস্পতিবার আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় শোনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলী বাজারে তৌহিদী জনতা লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এলাকার বিভিন্ন স্থানে একত্রিত হতে থাকে হাজারো সাঈদী ভক্ত। শহীদ লোকমান হোসেন ক্ষেতে কাজ করছিলেন। খবর পেয়ে ছুটে যান জনতার কাতারে। প্রতিবাদে নেমে পড়েন রাস্তায়। শ্লোগানে মুখরিত বিক্ষোভ মিছিল। মিছিল শহরের দিকে যাওয়ার সময় কাঁঠালতলী এলাকায় সওদাগর ব্রিক ফিল্ড সংলগ্ন স্থানে পুলিশ বাধা দেয় এবং গুলি করতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ শহীদ লোকমান হোসেনকে টার্গেট করে গুলি করলে তার শরীরের বাম পাশে গুলি লাগে। সাথে সাথে ঘটনাস্থলেই বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। এ সময় আরো ৩ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হন অন্তত ৪০ জন ব্যক্তি। জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সমূহে এ বিষয়ে বিস্তর নিউজ আসে যার কিঞ্চিৎ এখানে দেওয়া হলো।
দৈনিক সংগ্রাম, ১ মার্চ, ২০১৩
সিলেট ব্যুরো: গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আহবানে সিলেটে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়েছে। সরকার ও শাহবাগীদের আহবানকে ব্যবসায়ী ও মোটর মালিক শ্রমিকরা প্রত্যাখ্যান করে সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। দূরপাল্লার কোন যানবাহন চলাচল করেনি। নগরীতে ২/৪টি রিক্সা চলাচল করলেও আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণার পর তাও বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় কাঁঠালতলী বাজারে জামায়াত শান্তিপূর্ণ মিছিল বের করে। মিছিল শেষ হলে পুলিশ জামায়াত কর্মীদের ওপর গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে বড়লেখা উপজেলার পূর্ববাগ গ্রামের জামায়াত কর্মী লোকমান হোসেন নিহত হন এবং আরো ১০ জন নেতকর্মী গুলিবিদ্ধ হন।
দৈনিক আমার দেশ, ১ মার্চ, ২০১৩
মৌলভীবাজারে নিহত ১: মৌলভীবাজারের বড়লেখা দক্ষিণভাগ ও কাঁঠালতলী ইউনিয়নের প্রায় ১২টি গ্রামের কয়েক শতাধিক সাঈদীভক্ত ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত একজন নিহত ও ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়। নিহতের নাম লোকমান হোসেন। এছাড়াও আবদুর রহমান নামের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া জামায়াত-শিবিরের হামলায় দক্ষিণভাগসহ বড়লেখার বিভিন্ন স্থানে দোকানপাট ভাঙচুর ও একটি স'মিলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শতাধিক রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করেছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে দৈনিক মানবজমিন, ১ মার্চ,২০১৩।
বড়লেখায় নিহত ১ শুক্রবার,
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, পুলিশের সঙ্গে জামায়াত কর্মীদের সংঘর্ষে বড়লেখায় একজন জামায়াত কর্মী নিহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে ৩ জন। একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বড়লেখা থানা পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পরপরই বিক্ষুব্ধ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী গতকাল দুপুরে মৌলভীবাজারের বড়লেখা দক্ষিণভাগ বাজারের প্রায় ১০টি দোকানে ভাঙচুর চালায়। এই সময় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি লতা মিয়ার স-মিলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। অপরদিকে কাঁঠালতলী সওদাঘর ব্রিকফিল্ডের সামনে দু'টি ইউনিয়নের কয়েক শতাধিক গ্রামবাসী রাস্তায় বেরিয়ে এসে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শতাধিক রাউন্ড গুলি ও টিয়ারসেল ছুড়ে। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন প্রায় ১০ জন। গতকাল সন্ধ্যায় এক প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বড়লেখা থানার ওসি (তদন্ত) ওয়াকিল উদ্দিন জানিয়েছেন, গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সাঈদীর ফাঁসির রায় শুনার পর জামায়াত কর্মীরা বিক্ষোভমিছিল বের করে এবং পুলিশের গুলিতে একজন নিহত, তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। নিহত ব্যক্তির নাম লোকমান হোসেন (১৯)। সে পূর্ব-দক্ষিণভাগ গ্রামে আবদুল মান্নানের পুত্র। সে পেশায় কাঠমিস্ত্রি বলে জানা গেছে। গুলিবিদ্ধ তিনজনের মধ্যে আবদুর রহমানের (২০) অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বিজিবি ও পুলিশ যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। মৌলভীবাজার পুলিশ সুপার হারুন-অর রশিদ একজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে বলেছেন এখন পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
৪. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ লোকমান হোসেন (০৯০)।
পেশা: কৃষি ও দিনমজুর।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৪ মার্চ ১৯৯৬ ইং, ১৭ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হন।
শাহাদাতের তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩,
স্থান: বড়লেখা উপজেলার, কাঁঠালতলী বাজার।
দাফন করা হয়: নিজ গ্রামের কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: গাংকুল, ডাকঘর: দক্ষিণভাগ, থানা: বড়লেখা, জেলা: মৌলভীবাজার।
পিতা: আব্দুলা মান্নান, দিন মজুর।
মাতা: রুফিয়া বেগম, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: টিনের ছাপরা বাড়ি। নিজেদের কোন জায়গা জমি নেই: বাবা-মায়ের মাঝে ডিভোর্স হওয়ার মা ও ভাই-বোনেরা নানীর বাড়িতে থাকে। তারা কোন খরচ পায় না। এক ভাই কার্পেন্টারি করে কিছু আয় রোজগার করে।
ভাই-বোনের বিবরণ: কামিল হোসেন, রাজমিস্ত্রি। মোঃ লোকমান হোসেন, শহীদ। ইকবাল হোসেন, ১ম শ্রেণী পাস, লেখাপড়া করতে চায়। রায়দা বেগম, ৩য় শ্রেণী, গাংকুল প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুহাদা বেগম, ৩য় শ্রেণী, গাংকুল প্রাথমিক বিদ্যালয়।
মৌলভীবাজার, বড়লেখা
"মা-বাবা বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের দেখা শুনার কেউ নেই। মা ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাদের নানীর বাড়িতে থাকেন। শহীদ লোকমান হোসেন কাজ করে ভাই বোনদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ...বয়সে ছোট হলেও তার মন ছিল সদা ঈমানদীপ্ত। কখনো কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না। প্রায়ই বন্ধুদের বলতেন সাঈদী সাহেবের কিছু হলে আমি শহীদ হয়ে যাব।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ লোকমান হোসেন মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার পূর্ব দক্ষিণভাগ গাংকুল গ্রামে ১৯৯৬ সালে জন্মগ্রহন করেণ। পিতা আব্দুল মান্নান ও মাতা রুফিয়া বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে শহীদ লোকমান হোসেন দ্বিতীয়। পিতা-মাতার অভাবী সংসারে অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে শহীদ মোঃ লোকমান হোসেন টিলাবাজারের মোহাম্মদিয়া মাদ্রসায় ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখা-পড়ার পর আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। বরং ক্ষেত-খামারে কাজ করাটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে হয়েছে। ধরতে হয়েছে পরিবারের হাল। তা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে অন্য ভাইয়েরাও লেখা-পড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। দু'টি বোন গাংকুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণীতে লেখা-পড়া চালিয়ে যাচ্ছে। মা বাবা বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের দেখাশুনার কেউ নেই। মা ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাদের নানীর বাড়িতে থাকেন। শহীদ লোকমান হোসেন কাজ করে ভাই বোনদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
কিন্তু স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বুলেটের আঘাত তার এ স্বপ্নকে ভেঙে খান খান করে দেয়। পিতা-মাতা ও ভাই-বোনের মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে সকলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে শ্লোগানরত। অবস্থায় মহান রবের ডাকে ইহধাম ত্যাগ করেন তিনি।
বয়সে ছোট হলেও তার মন ছিল সদা ঈমানদীপ্ত। কখনো কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না। প্রায়ই বন্ধুদের বলতেন সাঈদী সাহেবের কিছু হলে আমি শহীদ হয়ে যাব।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখ বৃহস্পতিবার আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় শোনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলী বাজারে তৌহিদী জনতা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এলাকার বিভিন্ন স্থানে একত্রিত হতে থাকে হাজারো সাঈদীভক্ত। শহীদ লোকমান হোসেন ক্ষেতে কাজ করছিলেন। খবর পেয়ে ছুটে যান জনতার কাতারে। প্রতিবাদে নেমে পড়েন রাস্তায়। শ্লোগানে মুখরিত বিক্ষোভ মিছিল। মিছিল শহরের দিকে যাওয়ার সময় কাঁঠালতলী এলাকয় সওদাগর ব্রিক ফিল্ড সংলগ্ন স্থানে পুলিশ বাধা দেয় এবং গুলি করতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ শহীদ লোকমান হোসেনকে টার্গেট করে গুলি করলে তার শরীরের বাম পাশে গুলি লাগে। সাথে সাথে ঘটনাস্থলেই বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
পোস্টমর্টেমের পর ১ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো মানুষ উপজেলার রতুলীস্থ গাংকুল মনসুরিয়া ফাযিল মাদ্রাসা মাঠে জড়ো হতে থাকেন। বিকেল ৫টায় জানাযা হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন শহীদের চাচা সুমন আহমেদ। জানাযায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার লোক অংশগ্রহণ করেন। এ সময় বিজিবি, পুলিশ, আনসার-ভিডিপির কড়া নজরদারি থাকায় অনেকে ভয়ে জানাযায় আসতে পারেননি। তারপরও এলাকার লোকজনের বক্তব্য হলো এ এলাকায় এত বড় সমাগম আর কখোনো হয়নি।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখ বৃহস্পতিবার আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় শোনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলী বাজারে তৌহিদী জনতা লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এলাকার বিভিন্ন স্থানে একত্রিত হতে থাকে হাজারো সাঈদী ভক্ত। শহীদ লোকমান হোসেন ক্ষেতে কাজ করছিলেন। খবর পেয়ে ছুটে যান জনতার কাতারে। প্রতিবাদে নেমে পড়েন রাস্তায়। শ্লোগানে মুখরিত বিক্ষোভ মিছিল। মিছিল শহরের দিকে যাওয়ার সময় কাঁঠালতলী এলাকায় সওদাগর ব্রিক ফিল্ড সংলগ্ন স্থানে পুলিশ বাধা দেয় এবং গুলি করতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ শহীদ লোকমান হোসেনকে টার্গেট করে গুলি করলে তার শরীরের বাম পাশে গুলি লাগে। সাথে সাথে ঘটনাস্থলেই বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। এ সময় আরো ৩ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হন অন্তত ৪০ জন ব্যক্তি। জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সমূহে এ বিষয়ে বিস্তর নিউজ আসে যার কিঞ্চিৎ এখানে দেওয়া হলো।
দৈনিক সংগ্রাম, ১ মার্চ, ২০১৩
সিলেট ব্যুরো: গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আহবানে সিলেটে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়েছে। সরকার ও শাহবাগীদের আহবানকে ব্যবসায়ী ও মোটর মালিক শ্রমিকরা প্রত্যাখ্যান করে সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। দূরপাল্লার কোন যানবাহন চলাচল করেনি। নগরীতে ২/৪টি রিক্সা চলাচল করলেও আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণার পর তাও বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় কাঁঠালতলী বাজারে জামায়াত শান্তিপূর্ণ মিছিল বের করে। মিছিল শেষ হলে পুলিশ জামায়াত কর্মীদের ওপর গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে বড়লেখা উপজেলার পূর্ববাগ গ্রামের জামায়াত কর্মী লোকমান হোসেন নিহত হন এবং আরো ১০ জন নেতকর্মী গুলিবিদ্ধ হন।
দৈনিক আমার দেশ, ১ মার্চ, ২০১৩
মৌলভীবাজারে নিহত ১: মৌলভীবাজারের বড়লেখা দক্ষিণভাগ ও কাঁঠালতলী ইউনিয়নের প্রায় ১২টি গ্রামের কয়েক শতাধিক সাঈদীভক্ত ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত একজন নিহত ও ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়। নিহতের নাম লোকমান হোসেন। এছাড়াও আবদুর রহমান নামের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া জামায়াত-শিবিরের হামলায় দক্ষিণভাগসহ বড়লেখার বিভিন্ন স্থানে দোকানপাট ভাঙচুর ও একটি স'মিলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শতাধিক রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করেছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে দৈনিক মানবজমিন, ১ মার্চ,২০১৩।
বড়লেখায় নিহত ১ শুক্রবার,
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, পুলিশের সঙ্গে জামায়াত কর্মীদের সংঘর্ষে বড়লেখায় একজন জামায়াত কর্মী নিহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে ৩ জন। একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বড়লেখা থানা পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পরপরই বিক্ষুব্ধ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী গতকাল দুপুরে মৌলভীবাজারের বড়লেখা দক্ষিণভাগ বাজারের প্রায় ১০টি দোকানে ভাঙচুর চালায়। এই সময় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি লতা মিয়ার স-মিলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। অপরদিকে কাঁঠালতলী সওদাঘর ব্রিকফিল্ডের সামনে দু'টি ইউনিয়নের কয়েক শতাধিক গ্রামবাসী রাস্তায় বেরিয়ে এসে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শতাধিক রাউন্ড গুলি ও টিয়ারসেল ছুড়ে। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন প্রায় ১০ জন। গতকাল সন্ধ্যায় এক প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বড়লেখা থানার ওসি (তদন্ত) ওয়াকিল উদ্দিন জানিয়েছেন, গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সাঈদীর ফাঁসির রায় শুনার পর জামায়াত কর্মীরা বিক্ষোভমিছিল বের করে এবং পুলিশের গুলিতে একজন নিহত, তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। নিহত ব্যক্তির নাম লোকমান হোসেন (১৯)। সে পূর্ব-দক্ষিণভাগ গ্রামে আবদুল মান্নানের পুত্র। সে পেশায় কাঠমিস্ত্রি বলে জানা গেছে। গুলিবিদ্ধ তিনজনের মধ্যে আবদুর রহমানের (২০) অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বিজিবি ও পুলিশ যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। মৌলভীবাজার পুলিশ সুপার হারুন-অর রশিদ একজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে বলেছেন এখন পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
৪. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ লোকমান হোসেন (০৯০)।
পেশা: কৃষি ও দিনমজুর।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৪ মার্চ ১৯৯৬ ইং, ১৭ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হন।
শাহাদাতের তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩,
স্থান: বড়লেখা উপজেলার, কাঁঠালতলী বাজার।
দাফন করা হয়: নিজ গ্রামের কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: গাংকুল, ডাকঘর: দক্ষিণভাগ, থানা: বড়লেখা, জেলা: মৌলভীবাজার।
পিতা: আব্দুলা মান্নান, দিন মজুর।
মাতা: রুফিয়া বেগম, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: টিনের ছাপরা বাড়ি। নিজেদের কোন জায়গা জমি নেই: বাবা-মায়ের মাঝে ডিভোর্স হওয়ার মা ও ভাই-বোনেরা নানীর বাড়িতে থাকে। তারা কোন খরচ পায় না। এক ভাই কার্পেন্টারি করে কিছু আয় রোজগার করে।
ভাই-বোনের বিবরণ: কামিল হোসেন, রাজমিস্ত্রি। মোঃ লোকমান হোসেন, শহীদ। ইকবাল হোসেন, ১ম শ্রেণী পাস, লেখাপড়া করতে চায়। রায়দা বেগম, ৩য় শ্রেণী, গাংকুল প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুহাদা বেগম, ৩য় শ্রেণী, গাংকুল প্রাথমিক বিদ্যালয়।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍