হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ ওয়ারেছ আলী
শহীদ ওয়ারেছ আলী

শহীদ ওয়ারেছ আলী

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মোঃ ওয়ারেছ আলী (০৪৩)। জন্ম তারিখ: ৭ অক্টোবর, ১৯৫০। পিতা: মৃত ওয়াজেদ আলী। স্থায়ী ঠিকানা:গ্রাম: সৈয়দপুর, ডাকঘর: নওহাটা,থানা: এনায়েতপুর, জেলা: সিরাজগঞ্জ। আহত ও শাহাদাতের তারিখ: ০৯ ডিসেম্বর'১২, আওয়ামী যুবলীগের সন্ত্রাসীদের দ্বারা লাঠি-সোটার আক্রমণ এবং হাসপাতালে নেয়ার পথে শাহাদৎরণ। জানাজার ইমামতি করেন জনাব মাওলানা আব্দুল গফুর, উপস্থিতি ৫ হাজার প্রায়। সন্তানদের বিবরণ: শহীদুল ইসলাম-৩৬,তাঁতের ব্যবসা। হাসিমা খাতুন-৩২, গৃহিণী। সাইফুল ইসলাম-২৮,তাঁতের ব্যবসা। শাহিদা খাতুন-২৪, গৃহিণী।রাজিয়া খাতুন-২৩, গৃহিণী। বুলবুল ইসলাম-২২, আব্দুল মান্নান-১৮। লাভলী আক্তার-১৬, ৭ম শ্রেণি। শারমিন আক্তার-১২,৫ম শ্রেণি।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

"শাহাদাতের আগের রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে তিনি কেঁদে কেঁদে বলেন, 'আল্লাহ যেন নিজামী সাহেব, সাইদী সাহেবদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন; প্রয়োজনে এ জন্যে আমাকে শাহাদাতের মৃত্যু দেন।' ... শাহাদাতের ৩০ ঘন্টা পরও দাফনের সময় রক্ত করছে, যা দেখে স্থানীয় আলেমরা বলেছেন এটি শাহাদাতের মৃত্যু। ...মাত্র দুই বছরের মুজাহিদ আর পাঁচ বছরের সাগরিকা বোবাদৃষ্টিতে তাদের স্নেহের বটবৃক্ষ দাদাকে খুঁজে ফিরে। শহীদের বিয়াই সাবেক থানা আমীর মাস্টার নুরুল ইসলাম, ১০ দিন পর দোয়া অনুষ্ঠানে এসে শহীদেরকরুণ স্মৃতি স্মরণ করে স্ট্রোক করে মারা যান।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ ওয়ারেছ আলী সিরাজগঞ্জ জেলার এনায়েতপুর থানার সৈয়দপুর গ্রামে ১৯৫২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মরহুম ওয়াজেদ আলীর ছেলে। শহীদ ওয়ারেছ আলী স্ত্রী, ৪ ছেলে এবং ৫ মেয়ে রেখে শাহাদাত বরণ করেন। পেশায় ছিলেন তিনি তাঁত ব্যবসায়ী। কিন্তু বর্তমানে পুঁজি সমস্যার কারণে ১১টি তাঁতের ভেতর ৮টিই বন্ধ আছে। সন্তানদের মানুষ করতে তিনি ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী। বয়সের ভারে ন্যুজ ওয়ারেছ আলী বাকি জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হয়ে। সে জন্যই সংসারের সব দায়-দায়িত্ব সন্তানদের ওপর ছেড়ে তিনি একনিষ্ঠভাবে ইসলামী আন্দোলনের কাজ করতেন। আর আন্দোলনের কাজ করতে গিয়ে ৬২ বছর বয়সে ০৯ ডিসেম্বর '১২ শাহাদৎ বরণ করেন তিনি।
২. যেভাবেতিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
সেদিন ছিল ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, রোববার। সরকারের ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ড এবং দমন-পীড়নের প্রতিবাদেবিরোধী দলীয় জোট এ দিনটিতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করছিল। শত শত মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অবরোধ সফল করতে রাস্তায় নামে। ইসলামী আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ৬২ বছর বয়সী ওয়ারেছ আলীও লোকজনের সাথে রাস্তায় নামেন। এনায়েতপুরের থানার উত্তরপার্শ্বেমণ্ডলপাড়া মোড় নামক স্থানে অনুষ্ঠিত সমাবেশ শেষে দুপুর ১২ টার দিকে বাড়িফিরছিলেন তিনি। এ সময় আওয়ামী যুবলীগের সন্ত্রাসীরা যাদের সাথে কিছু টহল পুলিশও ছিল লাঠি-সোটা নিয়ে পেছন থেকে তাকেআক্রমণ করে। প্রচন্ড আঘাতের ব্যথায় বয়োবৃদ্ধ মানুষটি 'আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে পার্শ্বেহাটের ভেতর আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই যাটোর্ধ্ব বয়সী বৃদ্ধের 'আল্লাহু আকবর' ধ্বনীও ঘাতকদের মন গলেনি। তারা উপর্যুপরি আক্রমণ করে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। পরে লোকজন নিয়ে যায় এনায়েতপুর হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতালে পৌছানোর আগেই আহত ওয়ারেছ আলী 'আল্লাহু আকবর, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলতে বলতে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে চলে যান মহান রবের দরবারে। পরের دود দিন সৈয়দপুর বাজারে কয়েক হাজার লোকের অংশগ্রহণে মাওলানা আব্দুল গফুরের ইমামতিতে শহীদের জানাযা ও দাফন সম্পন্ন হয়। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা বিক্ষোভ মিছিল করে।
৩. সেদিনের ঘটনাবলী
সেদিন ছিল ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, রোববার। সরকারের ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ড এবং দমন-পীড়নের প্রতিবাদে বিরোধী দলীয় জোট এ দিনটিতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করছিল। শত শত মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অবরোধ সফল করতে রাস্তায় নামে। ইসলামী আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ৬২ বছর বয়সী ওয়ারেছ আলীও লোকজনের সাথে রাস্তায় নামেন। এনায়েতপুরের মঙ্গপড়া মোড় নামক স্থানে অনুষ্ঠিত সমাবেশ শেষে দুপুর ১২টার দিকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। এ সময় আওয়ামী যুবলীগের সন্ত্রাসীরা লাঠি-সোটা নিয়ে পেছন থেকে আক্রমণ করে তাকে। বিস্তারিত বিবরণ পরের দিনের দৈনিকগুলি ফলাও করে প্রচার হয়। ১০ ডিসেম্বর, ২০১২ দৈনিক সংগ্রাম বর্ণনা করে; অবরোধে গুলি ভাঙচুর সংঘর্ষ। আহত অর্ধশতাধিক। জামায়াত কর্মী শহীদ গুলিবিদ্ধ ১০, আজ সিরাজগঞ্জে হরতালের ডাক সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে জামায়াত-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে নিহত জামায়াত কর্মী ওয়ারেছআলী-সংগ্রাম ১৮ দলের ডাকা সিরাজগঞ্জে মহাসড়ক অবরোধ যথাযথ পালিত হয়েছে। অবরোধ পালনকালে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, পুলিশ ও অবরোধকারীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত ও ১০ জন গুলিবিদ্ধ হবার ঘটনা ঘটেছে। এদিকে অবরোধ শেষ করে জামায়াত-শিবিরের একটি গ্রুপ বাড়ি ফেরার পথে পেছন দিক থেকে আওয়ামী যুবলীগ, ছাত্রলীগের কর্মীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় সকলে সরে যেতে পারলেও আওয়ামী ক্যাডারদের হামলায় আহত ওয়ারেজ আলী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। তিনি এনায়েতপুর থানার সৈয়দপুর গ্রামের মৃত ওয়াজেদ আলীর ছেলে। এনায়েতপুর থানা জামায়াতের কর্মী বলে এনায়েতপুর শাখার আমীর ডা. সেলিম রেজা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। জামায়াত কর্মী হত্যার প্রতিবাদে আজ সোমবার জেলাব্যাপী হরতালের ডাক দিয়েছে জেলা জামায়াত। ৩.শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা ব্যবসায়ী ওয়ারেছ আলী ইসলামের জন্য নিবেদিত ছিলেন। ছেলেদেরকে তিনি সব সময় ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে বলতেন। এলাকার লোকজনকে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্ব বুঝাতেন। ইসলামবিদ্বেষীদের রক্তচক্ষুকে তিনিকখনও ভয় করেননি।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের বড় ছেলে: আব্বাকে হারিয়ে আমরা অভিভাবকশূন্য হয়েছি। তিনি অবসর পছন্দ করতেন না। কাজ করতে না পারলেও বাবা আমাদের বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। আমাদের সুখ-দুঃখের খোঁজ-খবর নিতেন। এখন তো তিনি আর খোঁজ-খবর নিবেন না। আব্বার জন্য খুব কষ্ট হয়। শহীদের ছোট ছেলে: আব্বা আমাদের সবাইকে ইসলামের ওপর থাকতে বলতেন। বয়স বেশি হওয়ায় তিনি সংসারের তেমন কোন কাজ করতে পারতেন না। তবে তিনি দ্বীনি কাজে কোন বাঁধা মানতেন না। অসুস্থ হলেও তিনি দ্বীনি কাজের আঞ্জাম দিতেন। আব্বার কথা মনে হলে কান্না চলে আসে। আমার আব্বাকে যারা হত্যা করেছে তারা সবাই চিহ্নিত সন্ত্রাসী। আমরা আব্বার হত্যাকারীদের বিচার চাই। শহীদের স্ত্রী বলেন: শাহাদাতের আগের রাতে ৩টায় উঠে তিনি তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন। আর কেঁদে কেঁদে বলেন, 'আল্লাহ যেন নিজামী সাহেব, সাঈদী সাহেবদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন; প্রয়োজনে এ জন্যে আমাকে শাহাদাতের মৃত্যু দেন।' গভীর রাতের এই রোনাজারিতে স্ত্রীর ঘুম ভেঙে যায়, পরম প্রভুর কাছে
এই আকুল আবেদন তিনি নিজ কানে শুনতে পান। শহীদ ওয়ারেছ আলী ফজরের ঘন্টাখানেক আগেই চালপানি খেয়ে, ভাল জামাকাপড় পরে ২য় ছেলে সাইফুলকে নিয়ে বের হয়ে যান। ফজরের নামাজ পড়েন ৪ কিঃ মিঃ দূর মন্ডলপাড়াতে। শাহাদাতের ৩০ ঘন্টা পরও দাফনের সময় রক্ত ঝড়ছে, যা দেখে স্থানীয় আলেমরা বলেছেন এটি শাহাদাতের মৃত্যু। স্ত্রীকে স্বপ্নে সান্ত্বনা দেন,- 'আমি আঘাত পেয়েছি খুবই অল্প। বড় মেয়ে দেখেন আব্বা বলছে,- 'তোমরা আল্লাহর পথে চললে এখানে আসতে পারবে। মাত্র দুই বছরের মুজাহিদ আর পাঁচ বছরের সাগরিকা বোবাদৃষ্টিতে তাদের স্নেহের বটবৃক্ষ দাদাকে খুঁজে ফিরে। শহীদের বিয়াই সাবেক থানা আমীর মাস্টার নুরুল ইসলাম, ১০ দিন পর দোয়া অনুষ্ঠানে এসে শহীদের করুণ স্মৃতি স্মরণ করে স্ট্রোক করে মারা যান।
৫.বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
অল্প জমির ওপর একটি বসতবাড়ি। টিনের তৈরি ২টি বসতঘর এবং ১টি তাঁতের ঘর। নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই। অল্প কয়েকটি হাতের তাঁত আছে। অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ।
৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ ওয়ারেছ আলী (০৪৩)। জন্ম তারিখ: ৭ অক্টোবর, ১৯৫০। পিতা: মৃত ওয়াজেদ আলী। স্থায়ী ঠিকানা:গ্রাম: সৈয়দপুর, ডাকঘর: নওহাটা,থানা: এনায়েতপুর, জেলা: সিরাজগঞ্জ। আহত ও শাহাদাতের তারিখ: ০৯ ডিসেম্বর'১২, আওয়ামী যুবলীগের সন্ত্রাসীদের দ্বারা লাঠি-সোটার আক্রমণ এবং হাসপাতালে নেয়ার পথে শাহাদৎরণ। জানাজার ইমামতি করেন জনাব মাওলানা আব্দুল গফুর, উপস্থিতি ৫ হাজার প্রায়। সন্তানদের বিবরণ: শহীদুল ইসলাম-৩৬,তাঁতের ব্যবসা। হাসিমা খাতুন-৩২, গৃহিণী। সাইফুল ইসলাম-২৮,তাঁতের ব্যবসা। শাহিদা খাতুন-২৪, গৃহিণী।রাজিয়া খাতুন-২৩, গৃহিণী। বুলবুল ইসলাম-২২, আব্দুল মান্নান-১৮। লাভলী আক্তার-১৬, ৭ম শ্রেণি। শারমিন আক্তার-১২,৫ম শ্রেণি।