শহীদ ফরমান আলী
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ মোঃ ফরমান আলী (০৩০), পেশা। ব্যবসা।
সাংগঠনিক মান। রোকন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স। ১১ অক্টোবর ১৯৮৪, ২৯ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩। শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, স্থান: জয়পুরহাটের পাঁচবিবি। দাফন করা হয়। স্থানীয় মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে নিজ গ্রাম আরজীয় অনন্তপুর।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। আরজীয় অনন্তপুর, ডাকঘর। চাঁদপুর, থানা। পাঁচবিবি, জেলা। জয়পুরহাট।
পিতা: মো: রাজিব উদ্দিন, বয়স্ক মানুষ, কৃষিকাজ করেন।
মাতা: মোছাঃ নুরজাহান বেগম।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা। টিনের এবং মাটির একটি বসতবাড়ি। চাষাবাদের কোন জমি নেই। একটি মুদি দোকান ছিল তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলতো।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: তোহরা বেগম (সদস্যা), বয়স ২৪ বছর, গৃহিণী। একটি ছেলে নাম-আব্দুল্লাহ, বয়স ৩ বছর ৩ মাস।
ভাই-বোনের বিবরণ। মো। আরমান আলী, কাঠ ব্যবসা, মোছা। লিপি, বিবাহিতা স্বামী কৃষক।
সাংগঠনিক মান। রোকন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স। ১১ অক্টোবর ১৯৮৪, ২৯ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩। শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, স্থান: জয়পুরহাটের পাঁচবিবি। দাফন করা হয়। স্থানীয় মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে নিজ গ্রাম আরজীয় অনন্তপুর।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। আরজীয় অনন্তপুর, ডাকঘর। চাঁদপুর, থানা। পাঁচবিবি, জেলা। জয়পুরহাট।
পিতা: মো: রাজিব উদ্দিন, বয়স্ক মানুষ, কৃষিকাজ করেন।
মাতা: মোছাঃ নুরজাহান বেগম।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা। টিনের এবং মাটির একটি বসতবাড়ি। চাষাবাদের কোন জমি নেই। একটি মুদি দোকান ছিল তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলতো।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: তোহরা বেগম (সদস্যা), বয়স ২৪ বছর, গৃহিণী। একটি ছেলে নাম-আব্দুল্লাহ, বয়স ৩ বছর ৩ মাস।
ভাই-বোনের বিবরণ। মো। আরমান আলী, কাঠ ব্যবসা, মোছা। লিপি, বিবাহিতা স্বামী কৃষক।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"শহীদের দাদা বলেন, তাকে বলেছিলাম, যদি গণ্ডগোল হয়? সে হেসে উত্তর দিয়েছিল, তবে শহীদ হয়ে যাব। এলাকায় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার কাছেই সে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। তার শাহাদাতের পরে সর্বস্তরের লোকেরা তাদের পেশা ফেলে রেখে তাকে একনজর দেখার জন্য ছুটে এসেছে। প্রশাসনের বাধা না থাকলে কমপক্ষে ৫০ হাজার লোক জানাযায় উপস্থিত হতো। জানাযাপূর্ব আলোচনায় যখন শহীদের জীবন সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিল তখন লোকজন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ ফরমান আলী, জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আরজীয় অনন্তপুর গ্রামে ১৯৮৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাবা রজিব উদ্দীন ও মা নুরজাহান বেগমের ৩ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। দুই বার মাদ্রাসায় যাওয়া আসা করলেও শেষ পর্যন্ত আর লেখাপড়া স্থায়ী হয়নি। অভাবের সংসারে বাবা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আর মা গৃহস্থালির কাজ করেন।
২৯ বছর বয়সী শহীদ ফরমান আলী পেশায় একজন মুদিদোকানি। তেল, লবণ সার ইত্যদি বিক্রি করেন। ছোট ভাই আরমান আলী কাঠ ব্যবসায়ী এবং একমাত্র ছোট বোন বিবাহিতা। মা-বাবা, ভাই-বোন স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান নিয়ে কোন রকমে অতিবাহিত হচ্ছিল ফরমান আলীর জীবন। দরিদ্রতা থাকলেও সে জীবনে সুখ ছিল। কিন্তু হঠাৎ এক তাগুতি সাইক্লোন সে পরিবারটিকে তছনছ করে দিল।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। আর তাই তিনিও হৃদয়ের টানে ঘরে বসে থাকতে পারেননি। সকাল ৭টার দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকে হরতালের সমর্থনে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মিছিলটি স্থানীয় বাজার থেকে পাঁচবিবির উদ্দেশে রওয়ানা হয়। এক পর্যায়ে মিছিলটি পাঁচমাথায় আসলে হরতাল সমর্থনকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সরকারের নির্দেশে পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। এখানেই বেলা ১১টার দিকে বাম পাঁজরে এবং পায়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। এর পর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তাকে রিকশা করে ঘটনাস্থল থেকে ৫/৬ কিলোমিটার দূরবর্তী মহিপুর হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়ার পথে রেললাইনের পরে তার মুখটি নড়ে ওঠে। তখন তাকে পানি পান করানো হয় এরপরই তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে এ পৃথিবীকে চিরবিদায় জানান। হাসপাতালে নিলে ডাক্তার বলেন তিনি শাহাদাত বরণ করেছেন।সন্ধ্যার দিকে পোস্টমর্টেম এর জন্য পুলিশ লাশ নিয়ে যায়। পরের দিন সকালে লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করে। ৪ মার্চ বেলা ১.৩০ মিনিটে আরজি অনন্তপুর এবতেদায়ী দাখিল মাদ্রাসা মাঠে শহীদের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। প্রচুর মানুষের উপস্থিতির কারণে মাত্র ১ হাত গ্যাপ দিয়ে জানাজার লাইন করতে হয়। প্রায় ১০ হাজার লোকের এই বিশাল জানাযায় ইমামতি করেন পার্শ্ববর্তী শিখোইল দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নিউজ আসে।
৪ মার্চ, ২০১৩ দৈনিক মানবজমিন, লিখে
জয়পুরহাটে নিহত ৬: জয়পুরহাট/পাঁচবিবি প্রতিনিধি জানান, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আর্মড ব্যাটালিয়নের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জয়পুরহাট ও পাঁচবিবিতে ৬ হরতাল সমর্থক নিহত হয়েছেন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও ৩৬ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জয়পুরহাট শহরে ও পাঁচবিবি সদরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১১টার দিকে হরতালের সমর্থনে কয়েক হাজার জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও নারী-পুরুষ জয়পুরহাট শহরের পল্লী বিদ্যুৎ, হিচমি এলাকায় মিছিল বের করলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আর্মস ব্যাটালিয়নের সদস্যরা বাধা দেয়। এতে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পাঁচবিবি উপজেলার রহমতপুর গ্রামের মজনু (৩০) মারা যান। অন্যদিকে পাঁচবিবিতে পুলিশের হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মারা যান বড় মানিক গ্রামের হাসিব (৫০) ও শালাইপুর গ্রামের আবদুল হাকিম (৩২)। এ সময় অন্তত ২০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আহতদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ও পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। জয়পুরহাট হাসপাতালে নাসির (১৬) নামে এক শিবিরকর্মী মারা যান। পাঁচবিবির মহিপুর হাসপাতালে মারা যান কাশরা গ্রামের মজিদুল ইসলাম (২০) ও আয়মা রসুলপুরের আবদুল হাকিম (৩২)।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩। শহীদদের জানাজা নিয়ে একটি রিপোর্ট করে। "জয়পুরহাটে ৬ শহীদের জানাজা সম্পন্ন" এই শিরোনামে।
জয়পুরহাট থেকে সংবাদদাতা: জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিনে জেলার সদর ও পাঁচবিবি শহরে জামায়াত-শিবির কর্মী-সমর্থক ও সাঈদী ভক্ত এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচবিবিতে নিহত ৬ জনের মধ্যে কুসুম্বা ইউপি'র ৪ জনের জানাজা স্থানীয় শালাইপুর হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। শহীদদের নামাজে জানাজায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ঢল নামে। জানাজা শেষে নিহতদের স্ব-স্ব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সাঈদী মুক্তি আন্দোলনে যোগদানকৃত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩ শতাধিক জনতা জানাজায় সংহতি প্রকাশ করতে জানাজা মাঠে উপস্থিত হন। অপরদিকে জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আরজন্তিপুরে নিহত আয়মা রসুলপুর ইউপি জামায়াতের সেক্রেটারি ফরমান আলীর নামাজে জানাজা স্থানীয় এবতেদায়ী মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।
দৈনিক আমার দেশ, "আওয়ামী লীগের হামলা ও পুলিশি হয়রানিতে পুরুষশূন্য অনেক গ্রাম' শিরোনামে কাজী জেবেল ও নজরুল ইসলাম এর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে যা বাংলাদেশের অনেক এলাকার সাথে মিলে যায়:
"পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, কালাই ও আক্কেলপুর উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রাম। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলা, মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ও পুলিশি গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িতে থাকতে সাহস পাচ্ছেন না তারা। বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন পুরুষ সদস্যরা। এসব গ্রামে শুধু নারী ও শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। অনেক বাড়িঘরে তালা ঝুলছে। জেলার বাকি দুই উপজেলা ক্ষেতলাল ও সদরের বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। বেশিরভাগ বাজারের অনেক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে জয়পুরহাট শহর ও উপজেলাগুলোতে এ অবস্থা বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পাঁচবিবিতে ৪২টি মামলা, সদর খানায় ৭টি, কালাইয়ে ৪টি ও ক্ষেতলালে ১টি মামলা হয়েছে। এতে অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। দুই শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। 'নিরীহ' বাসিন্দাদের 'নির্ভয়ে' বাড়িঘরে ফিরতে মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের এ ঘোষণায় আস্থা রাখতে পারছেন না গ্রামবাসী। বিএনপি নেতা পাঁচবিবির কুশম্বা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফুর মণ্ডল, জামায়াত নেতা সদরের বন্ধু ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া ও আমদই ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হবে বলে জনসভায় ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জয়পুরহাটের জেলা পুলিশ সুপার হামিদুল আলম আমার দেশকে বলেছেন, নিরীহ বাসিন্দাদের বাড়িঘরে ফিরে আসার জন্য প্রতিটি থানায় মাইকিং করা হচ্ছে। তাদের কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না। তিনি বলেন, মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেয়েছি। কেউ যাতে টাকা লেনদেন না করে সেজন্য অনুরোধ জানিয়েছি। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
আওয়ামী হামলা ও পুলিশি হয়রানি এড়াতে সদর উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম, পাঁচবিবিতে অন্তত ৫০টি, কালাইয়ে ২৫টি, ক্ষেতলালে ১০টি গ্রামে পুরুষ বসবাস করছেন না। গত ৩ মার্চ সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় পাঁচবিবিতে। এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ৪২ মামলা দায়েরের পর থেকে উপজেলার বেশিরভাগ গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। উপজেলার প্রাণকেন্দ্র পাঁচমাথার অনেক মার্কেটের দোকান গতকালও খোলেনি। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, গ্রেফতার এড়াতে এসব দোকানি আত্মত্মগোপনে রয়েছেন। এ উপজেলার কুশম্বা, ভাড়াহুত, কাশড়া গোবিন্দপুর, ছোটো মানিক, খুবইল, শালাইপুর, গোরনা, আরজী অনন্তপুর, রতনপুর, ধরজি, বাকিলা, ছাতিনালীসহ অন্যান্য গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামে অপরিচিত কেউ গেলে মহিলা ও শিশুরা ভয়ে সরে যাচ্ছে। তারা কোনো কথা বলতে রাজি নয়। পাঁচবিবি থানার ওসি (তদন্ত) নুর হোসেন আমার দেশ-কে বলেন, গ্রামবাসীকে বাড়ি ফেরার অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করা হয়েছে। নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হবে না। একইভাবে সদর উপজেলার আমদই, পুরানাপৈল ও বন্ধু ইউপির ২০টি গ্রামে পুরুষ নেই বললেই চলে। বিষয়টি স্বীকার করে সদর খানার ওসি খায়রুল বাশার জানান, পুরানাপৈন ও আমদই ইউনিয়নের অবস্থা বেশি খারাপ। এ দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। কালাই উপজেলার মাত্রাই, ভাউজাপাতায়, বলিগ্রাম, অনিহার, শমসিরা, ছিলিমপুর, পালুকগাড়ী, পাইলগুন, রঘুনাথপুর, বালাপুর, বিয়ালা, শিবসমন্ত্র, বেজখণ্ড, গাড়ইল, সাঁতার, উলিপুর, ভেরেন্ডী, বানদীঘি, জওগ্রাম, হিমাইল, ইন্দাহার, পার্বতীপুরসহ কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের অন্তত ২৭টি গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
এদিকে আওয়ামী তাণ্ডব ও পুলিশি হয়রানি থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানি না করতে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিটি মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কাজ চলছে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় সভা-সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল্লায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সারারাত পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে।" সন্ত্রাসীদের কিংবা পুলিশের অন্যায় গ্রেফতার বাণিজ্য মোকাবেলায় গ্রামের মানুষরা যেভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে স্মরণকালে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের স্ত্রী। তিনি ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি বলেন, সেদিন প্রোগ্রামে যাওয়ার সময় সাইকেল পাংচার হয়ে গেলে তিনি অন্যের সাইকেল নিয়ে প্রোগ্রামে যান। এমন সিরিয়াস ছিলেন।
শহীদের দাদা। আমি এতটাই ব্যখিত ও মর্মাহত যেটা আমার পক্ষে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শহীদের দাদা বলেন, তাকে বলেছিলাম, যদি গণ্ডগোল হয়? সে হেঁসে উত্তর দিয়ে ছিল, তবে শহীদ হয়ে যাব।, এলাকায় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার কাছেই সে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। তার শাহাদাতের পরে সর্বস্তরের লোকেরা তাদের পেশা ফেলে রেখে তাকে একনজর দেখার জন্য ছুটে এসেছে। প্রশাসনের বাধা না থাকলে কমপক্ষে ৫০ হাজার লোক জানাযায় উপস্থিত হতো। জানাযাপূর্ব আলোচনায় যখন শহীদের জীবন সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিল তখন লোকজন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
অভাবের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির শাহাদাতে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। আমি আল্লাহর কাছে তার শহীদি মর্যাদা কামনা করছি।
শহীদের গর্বিত ভাই। শহীদের গর্বিত ভাই তার প্রিয় ভাইকে হারিয়ে মর্মাহত ও বাকরুদ্ধ। তিনি বলেন সে একজন ভাই হিসেবে খুবই ভালো ছিল। আমাদের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। বাহির থেকে এসেই আমার এবং আমার বাচ্চার খোঁজ খবর নিতো। সে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিল। এ ব্যবসা দিয়ে আল্লাহর রহমতে কোনরকম দিনকাল চলত।
শহীদের ফুফাতো ভাই। শহীদের ফুফাতো ভাই বলেন, একজন ভালো মানুষ হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। সকল মানুষের উপকার করতেন। আমাদেরকে খুব ভালবাসতেন। যে কোন দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করতেন।
প্রতিবেশীর মতে: ব্যক্তি হিসেবে সমাজের সর্বস্তরের লোকজনের সাথে তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। ইসলামের
জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম। শহীদ মোঃ ফরমান আলী (০৩০), পেশা। ব্যবসা।
সাংগঠনিক মান। রোকন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স। ১১ অক্টোবর ১৯৮৪, ২৯ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩। শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, স্থান: জয়পুরহাটের পাঁচবিবি। দাফন করা হয়। স্থানীয় মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে নিজ গ্রাম আরজীয় অনন্তপুর।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। আরজীয় অনন্তপুর, ডাকঘর। চাঁদপুর, থানা। পাঁচবিবি, জেলা। জয়পুরহাট।
পিতা: মো: রাজিব উদ্দিন, বয়স্ক মানুষ, কৃষিকাজ করেন।
মাতা: মোছাঃ নুরজাহান বেগম।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা। টিনের এবং মাটির একটি বসতবাড়ি। চাষাবাদের কোন জমি নেই। একটি মুদি দোকান ছিল তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলতো।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: তোহরা বেগম (সদস্যা), বয়স ২৪ বছর, গৃহিণী। একটি ছেলে নাম-আব্দুল্লাহ, বয়স ৩ বছর ৩ মাস।
ভাই-বোনের বিবরণ। মো। আরমান আলী, কাঠ ব্যবসা, মোছা। লিপি, বিবাহিতা স্বামী কৃষক।
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ ফরমান আলী, জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আরজীয় অনন্তপুর গ্রামে ১৯৮৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাবা রজিব উদ্দীন ও মা নুরজাহান বেগমের ৩ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। দুই বার মাদ্রাসায় যাওয়া আসা করলেও শেষ পর্যন্ত আর লেখাপড়া স্থায়ী হয়নি। অভাবের সংসারে বাবা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আর মা গৃহস্থালির কাজ করেন।
২৯ বছর বয়সী শহীদ ফরমান আলী পেশায় একজন মুদিদোকানি। তেল, লবণ সার ইত্যদি বিক্রি করেন। ছোট ভাই আরমান আলী কাঠ ব্যবসায়ী এবং একমাত্র ছোট বোন বিবাহিতা। মা-বাবা, ভাই-বোন স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান নিয়ে কোন রকমে অতিবাহিত হচ্ছিল ফরমান আলীর জীবন। দরিদ্রতা থাকলেও সে জীবনে সুখ ছিল। কিন্তু হঠাৎ এক তাগুতি সাইক্লোন সে পরিবারটিকে তছনছ করে দিল।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। আর তাই তিনিও হৃদয়ের টানে ঘরে বসে থাকতে পারেননি। সকাল ৭টার দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকে হরতালের সমর্থনে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মিছিলটি স্থানীয় বাজার থেকে পাঁচবিবির উদ্দেশে রওয়ানা হয়। এক পর্যায়ে মিছিলটি পাঁচমাথায় আসলে হরতাল সমর্থনকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সরকারের নির্দেশে পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। এখানেই বেলা ১১টার দিকে বাম পাঁজরে এবং পায়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। এর পর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তাকে রিকশা করে ঘটনাস্থল থেকে ৫/৬ কিলোমিটার দূরবর্তী মহিপুর হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়ার পথে রেললাইনের পরে তার মুখটি নড়ে ওঠে। তখন তাকে পানি পান করানো হয় এরপরই তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে এ পৃথিবীকে চিরবিদায় জানান। হাসপাতালে নিলে ডাক্তার বলেন তিনি শাহাদাত বরণ করেছেন।সন্ধ্যার দিকে পোস্টমর্টেম এর জন্য পুলিশ লাশ নিয়ে যায়। পরের দিন সকালে লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করে। ৪ মার্চ বেলা ১.৩০ মিনিটে আরজি অনন্তপুর এবতেদায়ী দাখিল মাদ্রাসা মাঠে শহীদের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। প্রচুর মানুষের উপস্থিতির কারণে মাত্র ১ হাত গ্যাপ দিয়ে জানাজার লাইন করতে হয়। প্রায় ১০ হাজার লোকের এই বিশাল জানাযায় ইমামতি করেন পার্শ্ববর্তী শিখোইল দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নিউজ আসে।
৪ মার্চ, ২০১৩ দৈনিক মানবজমিন, লিখে
জয়পুরহাটে নিহত ৬: জয়পুরহাট/পাঁচবিবি প্রতিনিধি জানান, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আর্মড ব্যাটালিয়নের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জয়পুরহাট ও পাঁচবিবিতে ৬ হরতাল সমর্থক নিহত হয়েছেন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও ৩৬ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জয়পুরহাট শহরে ও পাঁচবিবি সদরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১১টার দিকে হরতালের সমর্থনে কয়েক হাজার জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও নারী-পুরুষ জয়পুরহাট শহরের পল্লী বিদ্যুৎ, হিচমি এলাকায় মিছিল বের করলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আর্মস ব্যাটালিয়নের সদস্যরা বাধা দেয়। এতে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পাঁচবিবি উপজেলার রহমতপুর গ্রামের মজনু (৩০) মারা যান। অন্যদিকে পাঁচবিবিতে পুলিশের হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মারা যান বড় মানিক গ্রামের হাসিব (৫০) ও শালাইপুর গ্রামের আবদুল হাকিম (৩২)। এ সময় অন্তত ২০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আহতদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ও পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। জয়পুরহাট হাসপাতালে নাসির (১৬) নামে এক শিবিরকর্মী মারা যান। পাঁচবিবির মহিপুর হাসপাতালে মারা যান কাশরা গ্রামের মজিদুল ইসলাম (২০) ও আয়মা রসুলপুরের আবদুল হাকিম (৩২)।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩। শহীদদের জানাজা নিয়ে একটি রিপোর্ট করে। "জয়পুরহাটে ৬ শহীদের জানাজা সম্পন্ন" এই শিরোনামে।
জয়পুরহাট থেকে সংবাদদাতা: জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিনে জেলার সদর ও পাঁচবিবি শহরে জামায়াত-শিবির কর্মী-সমর্থক ও সাঈদী ভক্ত এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচবিবিতে নিহত ৬ জনের মধ্যে কুসুম্বা ইউপি'র ৪ জনের জানাজা স্থানীয় শালাইপুর হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। শহীদদের নামাজে জানাজায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ঢল নামে। জানাজা শেষে নিহতদের স্ব-স্ব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সাঈদী মুক্তি আন্দোলনে যোগদানকৃত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩ শতাধিক জনতা জানাজায় সংহতি প্রকাশ করতে জানাজা মাঠে উপস্থিত হন। অপরদিকে জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আরজন্তিপুরে নিহত আয়মা রসুলপুর ইউপি জামায়াতের সেক্রেটারি ফরমান আলীর নামাজে জানাজা স্থানীয় এবতেদায়ী মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।
দৈনিক আমার দেশ, "আওয়ামী লীগের হামলা ও পুলিশি হয়রানিতে পুরুষশূন্য অনেক গ্রাম' শিরোনামে কাজী জেবেল ও নজরুল ইসলাম এর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে যা বাংলাদেশের অনেক এলাকার সাথে মিলে যায়:
"পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, কালাই ও আক্কেলপুর উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রাম। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলা, মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ও পুলিশি গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িতে থাকতে সাহস পাচ্ছেন না তারা। বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন পুরুষ সদস্যরা। এসব গ্রামে শুধু নারী ও শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। অনেক বাড়িঘরে তালা ঝুলছে। জেলার বাকি দুই উপজেলা ক্ষেতলাল ও সদরের বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। বেশিরভাগ বাজারের অনেক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে জয়পুরহাট শহর ও উপজেলাগুলোতে এ অবস্থা বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পাঁচবিবিতে ৪২টি মামলা, সদর খানায় ৭টি, কালাইয়ে ৪টি ও ক্ষেতলালে ১টি মামলা হয়েছে। এতে অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। দুই শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। 'নিরীহ' বাসিন্দাদের 'নির্ভয়ে' বাড়িঘরে ফিরতে মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের এ ঘোষণায় আস্থা রাখতে পারছেন না গ্রামবাসী। বিএনপি নেতা পাঁচবিবির কুশম্বা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফুর মণ্ডল, জামায়াত নেতা সদরের বন্ধু ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া ও আমদই ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হবে বলে জনসভায় ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জয়পুরহাটের জেলা পুলিশ সুপার হামিদুল আলম আমার দেশকে বলেছেন, নিরীহ বাসিন্দাদের বাড়িঘরে ফিরে আসার জন্য প্রতিটি থানায় মাইকিং করা হচ্ছে। তাদের কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না। তিনি বলেন, মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেয়েছি। কেউ যাতে টাকা লেনদেন না করে সেজন্য অনুরোধ জানিয়েছি। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
আওয়ামী হামলা ও পুলিশি হয়রানি এড়াতে সদর উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম, পাঁচবিবিতে অন্তত ৫০টি, কালাইয়ে ২৫টি, ক্ষেতলালে ১০টি গ্রামে পুরুষ বসবাস করছেন না। গত ৩ মার্চ সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় পাঁচবিবিতে। এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ৪২ মামলা দায়েরের পর থেকে উপজেলার বেশিরভাগ গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। উপজেলার প্রাণকেন্দ্র পাঁচমাথার অনেক মার্কেটের দোকান গতকালও খোলেনি। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, গ্রেফতার এড়াতে এসব দোকানি আত্মত্মগোপনে রয়েছেন। এ উপজেলার কুশম্বা, ভাড়াহুত, কাশড়া গোবিন্দপুর, ছোটো মানিক, খুবইল, শালাইপুর, গোরনা, আরজী অনন্তপুর, রতনপুর, ধরজি, বাকিলা, ছাতিনালীসহ অন্যান্য গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামে অপরিচিত কেউ গেলে মহিলা ও শিশুরা ভয়ে সরে যাচ্ছে। তারা কোনো কথা বলতে রাজি নয়। পাঁচবিবি থানার ওসি (তদন্ত) নুর হোসেন আমার দেশ-কে বলেন, গ্রামবাসীকে বাড়ি ফেরার অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করা হয়েছে। নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হবে না। একইভাবে সদর উপজেলার আমদই, পুরানাপৈল ও বন্ধু ইউপির ২০টি গ্রামে পুরুষ নেই বললেই চলে। বিষয়টি স্বীকার করে সদর খানার ওসি খায়রুল বাশার জানান, পুরানাপৈন ও আমদই ইউনিয়নের অবস্থা বেশি খারাপ। এ দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। কালাই উপজেলার মাত্রাই, ভাউজাপাতায়, বলিগ্রাম, অনিহার, শমসিরা, ছিলিমপুর, পালুকগাড়ী, পাইলগুন, রঘুনাথপুর, বালাপুর, বিয়ালা, শিবসমন্ত্র, বেজখণ্ড, গাড়ইল, সাঁতার, উলিপুর, ভেরেন্ডী, বানদীঘি, জওগ্রাম, হিমাইল, ইন্দাহার, পার্বতীপুরসহ কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের অন্তত ২৭টি গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
এদিকে আওয়ামী তাণ্ডব ও পুলিশি হয়রানি থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানি না করতে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিটি মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কাজ চলছে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় সভা-সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল্লায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সারারাত পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে।" সন্ত্রাসীদের কিংবা পুলিশের অন্যায় গ্রেফতার বাণিজ্য মোকাবেলায় গ্রামের মানুষরা যেভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে স্মরণকালে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের স্ত্রী। তিনি ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি বলেন, সেদিন প্রোগ্রামে যাওয়ার সময় সাইকেল পাংচার হয়ে গেলে তিনি অন্যের সাইকেল নিয়ে প্রোগ্রামে যান। এমন সিরিয়াস ছিলেন।
শহীদের দাদা। আমি এতটাই ব্যখিত ও মর্মাহত যেটা আমার পক্ষে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শহীদের দাদা বলেন, তাকে বলেছিলাম, যদি গণ্ডগোল হয়? সে হেঁসে উত্তর দিয়ে ছিল, তবে শহীদ হয়ে যাব।, এলাকায় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার কাছেই সে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। তার শাহাদাতের পরে সর্বস্তরের লোকেরা তাদের পেশা ফেলে রেখে তাকে একনজর দেখার জন্য ছুটে এসেছে। প্রশাসনের বাধা না থাকলে কমপক্ষে ৫০ হাজার লোক জানাযায় উপস্থিত হতো। জানাযাপূর্ব আলোচনায় যখন শহীদের জীবন সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিল তখন লোকজন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
অভাবের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির শাহাদাতে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। আমি আল্লাহর কাছে তার শহীদি মর্যাদা কামনা করছি।
শহীদের গর্বিত ভাই। শহীদের গর্বিত ভাই তার প্রিয় ভাইকে হারিয়ে মর্মাহত ও বাকরুদ্ধ। তিনি বলেন সে একজন ভাই হিসেবে খুবই ভালো ছিল। আমাদের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। বাহির থেকে এসেই আমার এবং আমার বাচ্চার খোঁজ খবর নিতো। সে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিল। এ ব্যবসা দিয়ে আল্লাহর রহমতে কোনরকম দিনকাল চলত।
শহীদের ফুফাতো ভাই। শহীদের ফুফাতো ভাই বলেন, একজন ভালো মানুষ হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। সকল মানুষের উপকার করতেন। আমাদেরকে খুব ভালবাসতেন। যে কোন দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করতেন।
প্রতিবেশীর মতে: ব্যক্তি হিসেবে সমাজের সর্বস্তরের লোকজনের সাথে তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। ইসলামের
জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম। শহীদ মোঃ ফরমান আলী (০৩০), পেশা। ব্যবসা।
সাংগঠনিক মান। রোকন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স। ১১ অক্টোবর ১৯৮৪, ২৯ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩। শাহাদাতের তারিখ: ০৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, স্থান: জয়পুরহাটের পাঁচবিবি। দাফন করা হয়। স্থানীয় মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে নিজ গ্রাম আরজীয় অনন্তপুর।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। আরজীয় অনন্তপুর, ডাকঘর। চাঁদপুর, থানা। পাঁচবিবি, জেলা। জয়পুরহাট।
পিতা: মো: রাজিব উদ্দিন, বয়স্ক মানুষ, কৃষিকাজ করেন।
মাতা: মোছাঃ নুরজাহান বেগম।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা। টিনের এবং মাটির একটি বসতবাড়ি। চাষাবাদের কোন জমি নেই। একটি মুদি দোকান ছিল তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলতো।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: তোহরা বেগম (সদস্যা), বয়স ২৪ বছর, গৃহিণী। একটি ছেলে নাম-আব্দুল্লাহ, বয়স ৩ বছর ৩ মাস।
ভাই-বোনের বিবরণ। মো। আরমান আলী, কাঠ ব্যবসা, মোছা। লিপি, বিবাহিতা স্বামী কৃষক।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍