শহীদ মো: হেছাব উদ্দীন মণ্ডল
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ মো: হেছাব উদ্দীন মণ্ডল (০৩১), পেশা- কৃষক।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৬৩ সাল, ৫০ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩.০৩.২০১৩, সকাল ১১টা শাহাদাতের তারিখ ও সময়: ০৩ মার্চ ২০১৩, সকাল ১১টা। স্থান। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি
উপজেলার পাঁচমাথা। দাফন করা হয়। নিজ এলাকার কবর স্থান।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। দইবক নন্দনপুর, ডাকঘর। কোতোয়ালী বাগ, ইউনিয়ন। ধরনদি, খানা।
পাঁচবিবি, জেলা: জয়পুরহাট।
পিতা। মরহুম হাফিজ উদ্দীন মণ্ডল।
মাতা: মরহুম নুরুন বিবি।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা। কৃষিকাজ করতেন, চাষাবাদের জমি নাই।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ। নাম: ১ম ছেলে। হাফেজ মো: জাহাঙ্গীর আলম, বয়স-২৭, হাফেজী মাদ্রাসার শিক্ষক, ২য় ছেলে। মো: জামিরুল ইসলাম, বয়স-২৫, কৃষিকাজ, পড়াশুনা ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত, ১ম মেয়ে। মোছা: মনিরা (হাফেজা), বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, ২য় মেয়ে। মোছা। জেসমিন আজার, বিবাহিতা-স্বামী কৃষক। ভাই-বোনের বিবরণ। ৮ ভাই, ২ বোন।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৬৩ সাল, ৫০ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩.০৩.২০১৩, সকাল ১১টা শাহাদাতের তারিখ ও সময়: ০৩ মার্চ ২০১৩, সকাল ১১টা। স্থান। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি
উপজেলার পাঁচমাথা। দাফন করা হয়। নিজ এলাকার কবর স্থান।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। দইবক নন্দনপুর, ডাকঘর। কোতোয়ালী বাগ, ইউনিয়ন। ধরনদি, খানা।
পাঁচবিবি, জেলা: জয়পুরহাট।
পিতা। মরহুম হাফিজ উদ্দীন মণ্ডল।
মাতা: মরহুম নুরুন বিবি।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা। কৃষিকাজ করতেন, চাষাবাদের জমি নাই।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ। নাম: ১ম ছেলে। হাফেজ মো: জাহাঙ্গীর আলম, বয়স-২৭, হাফেজী মাদ্রাসার শিক্ষক, ২য় ছেলে। মো: জামিরুল ইসলাম, বয়স-২৫, কৃষিকাজ, পড়াশুনা ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত, ১ম মেয়ে। মোছা: মনিরা (হাফেজা), বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, ২য় মেয়ে। মোছা। জেসমিন আজার, বিবাহিতা-স্বামী কৃষক। ভাই-বোনের বিবরণ। ৮ ভাই, ২ বোন।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"শহীদ হিসেবে তাকে গোছল ছাড়াই রক্তাক্ত জামাকাপড়সহ দাফন করা হয়েছে। জীবদ্দশায় স্বামী স্ত্রी উভয়েই ১০-১২ জনের কাছে বলেছেন, 'ক্যাম করে, কুঠায় গেলে শহীদ হওয়া যাবে?... সাড়ে ৩ বছরের দু নাতির নাম তাজিম আর জেম। সর্বশেষ বিদায়বেলায় যাদের কোলে নিয়ে চুমা খেয়ে গিয়েছিলেন তাদের প্রদ্ধেয় দাদা হেহাবউদ্দীন। সেই জেম প্রায় করুণ কান্না কেঁদে বসে, "আমার দাদু কই? আমিও অলি খাব। মারা যাব। আবার বলে, পুলিশের চাকুরিতে যাব, যে আমার দাদুকে গুলি করেছে তাকে গুলি করব। দাদাহারা এই কচি হৃদয়ের অভিশাপ আর ক্ষোভের দায় কে শোষ করবে?"
১. শহীদের পরিচিতি
মো। হেছাব উদ্দীন মণ্ডল, জয়পুরহাট জেলার পাচবিবি উপজেলার সইবক নন্দনপুর গ্রামে ১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাবা মরহুম হাফিজ উদ্দীন মণ্ডল ও মা মরহুম নুরুন বিবির ১০ ছেলে-মেয়ের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করার পর অভাবের তাড়নায় আর তার পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারেননি। ৫০ বছর বয়সী ৪ সন্তানের জনক মো: হেছার উদ্দীন মণ্ডল অতি কষ্টের সংসারে ছেলে-মেয়েদের মধ্য থেকে এক ছেলে ও এক মেয়েকে কোরআনের হাফেজ হিসেবে তৈরি করেছিলেন। কোরআন পাগল এই মানুষটি অতি সাধারণ ভাবে দরিদ্রতার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করতেন। তার পারিবারিক আয়ের
একমাত্র উৎস ছিল কৃষিকাজ।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ৯.৩০ মিনিটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নওদায় যান। সেখান থেকে সকলের সাথে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মিছিলটি পাঁচমাথা পর্যন্ত পৌঁছালে সকাল ১১টার দিকে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়। আনোয়ার চৌধুরীর বাড়ির পাশে গেলে পুলিশ পেছন থেকে গুলি করে। গুলি তার বাম গালে লাগে যার ফলে ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। এরপরে সার্থীরা তাকে ভ্যানে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেদিন মাগরিবের পূর্বেই তার জানাযার নামাজ সম্পন্ন হয়। প্রায় ৩ হাজার লোকের উপস্থিতিতে জানাযার নামাজে ইমামতি করেন শহীদের বড় ছেলে হাফেজ মো: জাহাঙ্গীর আলম।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
০৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধ ট্রাইব্যুনাদের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও
হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নিউজ আসে।৪ মার্চ, ২০১৩ দৈনিক মানবজমিন, লিখে
জয়পুরহাটে নিহত ৬: জয়পুরহাট/পাঁচবিবি প্রতিনিধি জানান, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আর্মড ব্যাটালিয়নের
সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জয়পুরহাট ও পাঁচবিবিতে ৬ হরতাল সমর্থক নিহত হয়েছেন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও ৩৬ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জয়পুরহাট শহরে ও পাঁচবিবি সদরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১১টার দিকে হরতালের সমর্থনে কয়েক হাজার জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও নারী-পুরুষ জয়পুরহাট শহরের পল্লী বিদ্যুৎ, হিচমি এলাকায় মিছিল বের করলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আর্মস ব্যাটালিয়নের সদস্যরা বাধা দেয়। এতে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পাঁচবিবি উপজেলার রহমতপুর গ্রামের মজনু (৩০) মারা যান। অন্যদিকে পাঁচবিবিতে পুলিশের হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মারা যান বড় মানিক গ্রামের হাসিব (৫০) ও শালাইপুর গ্রামের আবদুল হাকিম (৩২)। এ সময় অন্তত ২০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আহতদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ও পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। জয়পুরহাট হাসপাতালে নাসির (১৬) নামে এক শিবিরকর্মী মারা যান। পাঁচবিবির মহিপুর হাসপাতালে মারা
যান কাশরা গ্রামের মজিদুল ইসলাম (২০) ও আয়মারসুলপুরের আবদুল হাকিম (৩২)। সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩। শহীদদের জানাজা নিয়ে একটি রিপোর্ট করে।
"জয়পুরহাটে ৬ শহীদের জানাজা সম্পন্ন এই শিরোনামে।
জয়পুরহাট থেকে সংবাদদাতা জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিনে জেলার সদর ও পাঁচবিবি শহরে জামায়াত-শিবির কর্মী-সমর্থক ও সাঈদী ভক্ত এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচবিবিতে নিহত ৬ জনের মধ্যে কুসুম্বা ইউপি'র ৪ জনের জানাজা স্থানীয় শালাইপুর হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। শহীদদের নামাজে জানাজায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ঢল নামে। জানাজা শেষে নিহতদের স্ব-স্ব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সাঈদী মুক্তি আন্দোলনে যোগদানকৃত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩ শতাধিক জনতা জানাজায় সংহতি প্রকাশ করতে জানাজা মাঠে উপস্থিত হন। অপরদিকে জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আরজজিপুরে নিহত আয়মা রসুলপুর ইউপি জামায়াতের সেক্রেটারি ফরমান আলীর নামাজে জানাজা স্থানীয় এবতেদায়ী মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।
দৈনিক আমার দেশ, "আওয়ামী লীগের হামলা ও পুলিশি হয়রানিতে পুরুষশূন্য অনেক গ্রাম' শিরোনামে কাজী জেবেস ও নজরুল ইসলাম এর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে যা বাংলাদেশের অনেক এলাকার সাথে মিলে যায়।
"পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, কালাই ও আক্কেলপুর উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রাম। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলা, মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ও পুলিশি গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িতে থাকতে সাহস পাচ্ছেন না তারা। বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন পুরুষ সদস্যরা। এসব গ্রামে শুধু নারী ও শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। অনেক বাড়িঘরে তালা ঝুলছে। জেলার বাকি দুই উপজেলা ক্ষেতলাল ও সদরের বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। বেশিরভাগ বাজারের অনেক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে জয়পুরহাট শহর ও উপজেলাগুলোতে এ অবস্থা বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পাঁচবিবিতে ৪২টি মামলা, সদর থানায় ৭টি, কালাইয়ে ৪টি ও ক্ষেতদানে ১টি মামলা হয়েছে। এতে অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। দুই শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। 'নিরীহ' বাসিন্দাদের 'নির্ভয়ে' বাড়িঘরে ফিরতে মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের এ ঘোষণায় আস্থা রাখতে পারছেন না গ্রামবাসী। বিএনপি নেতা পাঁচবিবির কুশম্বা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফুর মণ্ডল, জামায়াত নেতা সদরের বন্ধু ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া ও আমদই ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হবে বলে জনসভায় ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জয়পুরহাটের জেলা পুলিশ সুপার হামিদুল আলম আমার দেশকে বলেছেন, নিরীহ বাসিন্দাদের বাড়িঘরে ফিরে আসার জন্য প্রতিটি থানায় মাইকিং করা হচ্ছে। তাদের কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না। তিনি বলেন, মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেয়েছি। কেউ যাতে টাকা লেনদেন না করে সেজন্য অনুরোধ জানিয়েছি। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
আওয়ামী হামলা ও পুলিশি হয়রানি এড়াতে সদর উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম, পাঁচবিবিতে অন্তত ৫০টি, কালাইয়ে ২৫টি, ক্ষেতলালে ১০টি গ্রামে পুরুষ বসবাস করছেন না। গত ৩ মার্চ সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় পাঁচবিবিতে। এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ৪২ মামলা দায়েরের পর থেকে উপজেলার বেশিরভাগ গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। উপজেলার প্রাণকেন্দ্র পাঁচমাথার অনেক মার্কেটের দোকান গতকালও খোলেনি। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, গ্রেফতার এড়াতে এসব দোকানি আত্মগোপনে রয়েছেন। এ উপজেলার কুশম্বা, ভাড়াহত, কাশড়া গোবিন্দপুর, ছোটো মানিক, ধুবইল, শালাইপুর, গোরনা, আরজী অনন্তপুর, রতনপুর, ধরঞ্জি, বাবিলা, ছাতিনালীসহ অন্যান্য গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামে অপরিচিত কেউ গেলে মহিলা ও শিশুরা ভয়ে সরে যাচ্ছে। তারা কোনো কথা বলতে রাজি নয়। পাঁচবিবি থানার ওসি (তদন্ত) নুর হোসেন আমার দেশ-কে বলেন, গ্রামবাসীকে বাড়ি ফেরার অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করা হয়েছে। নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হবে না। একইভাবে সদর উপজেলার আমদই, পুরানাপৈন ও বন্ধু ইউপির ২০টি গ্রামে পুরুষ নেই বললেই চলে। বিষয়টি স্বীকার করে সদর থানার ওসি খায়রুল বাশার জানান, পুরানাপৈল ও আমদই ইউনিয়নের অবস্থা বেশি খারাপ। এ দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। কালাই উপজেলার মাত্রাই, ভাউজাপাতার, বলিগ্রাম, অনিহার, শমসিরা, ছিলিমপুর, শালুকণাড়ী, শাইলগুন, রঘুনাথপুর, বালাখুর, বিয়ালা, শিবসমদ্র, বেজখণ্ড, গাড়ইল, সাঁতার, উলিপুর, ভেরেজী, বানদীঘি, ছত্রগ্রাম, হিমাইল, ইন্দাহার, পার্বতীপুরসহ কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের অন্তত ২৭টি গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
এদিকে আওয়ামী তাণ্ডব ও পুলিশি হয়রানি থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানি না করতে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিটি মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কাজ চলছে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় সভা-সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল্লায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সারারাত পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে।
সন্ত্রাসীদের কিংবা পুলিশের অন্যায় গ্রেফতার বাণিজ্য মোকাবেলায় গ্রামের মানুষরা যেভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে স্মরণকালে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের স্ত্রী। স্বামীকে হারিয়ে শহীদের স্ত্রী আজ প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, আমার স্বামী খুব ভালো লোক ছিলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, সাঈদী সাহেবের মুক্তির জন্য রক্তের বন্যা বয়ে গেল। আমার স্বামী রক্ত দিয়ে গোসল করল। স্থানীয় আলেমগণ তার সার্বিক দিক বিবেচনায় শহীদ হিসেবে তাকে গোছল ছাড়াই রক্তাক্ত জামাকাপড়সহ দাফন করেছেন।
জীবদ্দশায় তারা স্বামী স্ত্রী উভয়েই প্রায় ১০-১২ জনের কাছে বলেছেন, 'ক্যাম করে, কুঠায় গেলে শহীদ হওয়া যাবে? অবশেষে শুধু স্বামী একাই যখন যাছে আর কাছে ঘর থেকে দুয়ার পর্যন্ত ১০-১২ বার শাহাদাতের কথা বলেছে।' ২৭ বছরের বড় ছেলে হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম যার কোলে মাথা রেখে শহীদ হন হেছাব উদ্দীন, যিনি বাবার জানাজার নামাজ পড়িয়েছেন তার ছেলের নাম তাজিম। ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে দরিদ্রতার কারণে পড়তে পারেননি। ২৫ বছরের সেই জামিরুল ইসলাম যার সাড়ে ৩ বছরের ছেলে নাম জেম। সর্বশেষ বিদায়বেলায় যাদের কোলে নিয়ে চুমা খেয়ে গিয়েছিলেন তাদের প্রদ্ধেয় দাদা হেছাব উদ্দীন। সেই জেম প্রায় করুণ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে, 'আমার দাদু কই? আমিও গুলি খাব। মারা যাব। আবার বলে, পুলিশের চাকরিতে ধাব, যে আমার দাদুকে গুলি করেছে তাকে গুলি করব।' দাদাহারা এই কচি হৃদয়ের অভিশাণ আর ক্ষোভের দায় কে শোধ করেবে?
বড় দুলাভাই স্বপ্ন দেখে, এত সুন্দর পোশাক, এত সুন্দর লাগছে হাসি খুশি ভাল আছ। ঈদের মাঠের মতো লোক।
শহীদের বিয়াই। শহীদের বিয়াই বলেন, আমি তাকে বাড়িতে ঢাকতে গেলে তিনি বলেন কাজের লোক রেখেছি আজ আমি যাব না। পরে তাকে মিছিলে দেখলে তিনি বলেন, বাড়িতে থাকতে পারলাম না। তিনি মিছিলের সামনের কাতারে ছিলেন।
প্রতিবেশীর মতে। তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। খুব বেশি শিক্ষিত নন কিন্তু মানুষের অনেক উপকার করতেন। বিভিন্ন সময় মানুষ তার কাছে পরামর্শের জন্য আসতেন। তিনি না থাকার কারণে আজ মানুষ তার অনেক উপকার থেকে বঞ্চিত।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: হেছাব উদ্দীন মণ্ডল (০৩১), পেশা- কৃষক।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৬৩ সাল, ৫০ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩.০৩.২০১৩, সকাল ১১টা শাহাদাতের তারিখ ও সময়: ০৩ মার্চ ২০১৩, সকাল ১১টা। স্থান। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি
উপজেলার পাঁচমাথা। দাফন করা হয়। নিজ এলাকার কবর স্থান।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। দইবক নন্দনপুর, ডাকঘর। কোতোয়ালী বাগ, ইউনিয়ন। ধরনদি, খানা।
পাঁচবিবি, জেলা: জয়পুরহাট।
পিতা। মরহুম হাফিজ উদ্দীন মণ্ডল।
মাতা: মরহুম নুরুন বিবি।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা। কৃষিকাজ করতেন, চাষাবাদের জমি নাই।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ। নাম: ১ম ছেলে। হাফেজ মো: জাহাঙ্গীর আলম, বয়স-২৭, হাফেজী মাদ্রাসার শিক্ষক, ২য় ছেলে। মো: জামিরুল ইসলাম, বয়স-২৫, কৃষিকাজ, পড়াশুনা ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত, ১ম মেয়ে। মোছা: মনিরা (হাফেজা), বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, ২য় মেয়ে। মোছা। জেসমিন আজার, বিবাহিতা-স্বামী কৃষক। ভাই-বোনের বিবরণ। ৮ ভাই, ২ বোন।
১. শহীদের পরিচিতি
মো। হেছাব উদ্দীন মণ্ডল, জয়পুরহাট জেলার পাচবিবি উপজেলার সইবক নন্দনপুর গ্রামে ১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাবা মরহুম হাফিজ উদ্দীন মণ্ডল ও মা মরহুম নুরুন বিবির ১০ ছেলে-মেয়ের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করার পর অভাবের তাড়নায় আর তার পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারেননি। ৫০ বছর বয়সী ৪ সন্তানের জনক মো: হেছার উদ্দীন মণ্ডল অতি কষ্টের সংসারে ছেলে-মেয়েদের মধ্য থেকে এক ছেলে ও এক মেয়েকে কোরআনের হাফেজ হিসেবে তৈরি করেছিলেন। কোরআন পাগল এই মানুষটি অতি সাধারণ ভাবে দরিদ্রতার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করতেন। তার পারিবারিক আয়ের
একমাত্র উৎস ছিল কৃষিকাজ।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৩ মার্চ ২০১৩ সকাল ৯.৩০ মিনিটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নওদায় যান। সেখান থেকে সকলের সাথে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মিছিলটি পাঁচমাথা পর্যন্ত পৌঁছালে সকাল ১১টার দিকে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়। আনোয়ার চৌধুরীর বাড়ির পাশে গেলে পুলিশ পেছন থেকে গুলি করে। গুলি তার বাম গালে লাগে যার ফলে ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। এরপরে সার্থীরা তাকে ভ্যানে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেদিন মাগরিবের পূর্বেই তার জানাযার নামাজ সম্পন্ন হয়। প্রায় ৩ হাজার লোকের উপস্থিতিতে জানাযার নামাজে ইমামতি করেন শহীদের বড় ছেলে হাফেজ মো: জাহাঙ্গীর আলম।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
০৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধ ট্রাইব্যুনাদের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও
হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নিউজ আসে।৪ মার্চ, ২০১৩ দৈনিক মানবজমিন, লিখে
জয়পুরহাটে নিহত ৬: জয়পুরহাট/পাঁচবিবি প্রতিনিধি জানান, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আর্মড ব্যাটালিয়নের
সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জয়পুরহাট ও পাঁচবিবিতে ৬ হরতাল সমর্থক নিহত হয়েছেন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও ৩৬ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জয়পুরহাট শহরে ও পাঁচবিবি সদরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১১টার দিকে হরতালের সমর্থনে কয়েক হাজার জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও নারী-পুরুষ জয়পুরহাট শহরের পল্লী বিদ্যুৎ, হিচমি এলাকায় মিছিল বের করলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আর্মস ব্যাটালিয়নের সদস্যরা বাধা দেয়। এতে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পাঁচবিবি উপজেলার রহমতপুর গ্রামের মজনু (৩০) মারা যান। অন্যদিকে পাঁচবিবিতে পুলিশের হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মারা যান বড় মানিক গ্রামের হাসিব (৫০) ও শালাইপুর গ্রামের আবদুল হাকিম (৩২)। এ সময় অন্তত ২০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আহতদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ও পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। জয়পুরহাট হাসপাতালে নাসির (১৬) নামে এক শিবিরকর্মী মারা যান। পাঁচবিবির মহিপুর হাসপাতালে মারা
যান কাশরা গ্রামের মজিদুল ইসলাম (২০) ও আয়মারসুলপুরের আবদুল হাকিম (৩২)। সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩। শহীদদের জানাজা নিয়ে একটি রিপোর্ট করে।
"জয়পুরহাটে ৬ শহীদের জানাজা সম্পন্ন এই শিরোনামে।
জয়পুরহাট থেকে সংবাদদাতা জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিনে জেলার সদর ও পাঁচবিবি শহরে জামায়াত-শিবির কর্মী-সমর্থক ও সাঈদী ভক্ত এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচবিবিতে নিহত ৬ জনের মধ্যে কুসুম্বা ইউপি'র ৪ জনের জানাজা স্থানীয় শালাইপুর হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। শহীদদের নামাজে জানাজায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ঢল নামে। জানাজা শেষে নিহতদের স্ব-স্ব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সাঈদী মুক্তি আন্দোলনে যোগদানকৃত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩ শতাধিক জনতা জানাজায় সংহতি প্রকাশ করতে জানাজা মাঠে উপস্থিত হন। অপরদিকে জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আরজজিপুরে নিহত আয়মা রসুলপুর ইউপি জামায়াতের সেক্রেটারি ফরমান আলীর নামাজে জানাজা স্থানীয় এবতেদায়ী মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।
দৈনিক আমার দেশ, "আওয়ামী লীগের হামলা ও পুলিশি হয়রানিতে পুরুষশূন্য অনেক গ্রাম' শিরোনামে কাজী জেবেস ও নজরুল ইসলাম এর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে যা বাংলাদেশের অনেক এলাকার সাথে মিলে যায়।
"পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, কালাই ও আক্কেলপুর উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রাম। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলা, মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ও পুলিশি গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িতে থাকতে সাহস পাচ্ছেন না তারা। বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন পুরুষ সদস্যরা। এসব গ্রামে শুধু নারী ও শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। অনেক বাড়িঘরে তালা ঝুলছে। জেলার বাকি দুই উপজেলা ক্ষেতলাল ও সদরের বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। বেশিরভাগ বাজারের অনেক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে জয়পুরহাট শহর ও উপজেলাগুলোতে এ অবস্থা বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পাঁচবিবিতে ৪২টি মামলা, সদর থানায় ৭টি, কালাইয়ে ৪টি ও ক্ষেতদানে ১টি মামলা হয়েছে। এতে অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। দুই শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। 'নিরীহ' বাসিন্দাদের 'নির্ভয়ে' বাড়িঘরে ফিরতে মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের এ ঘোষণায় আস্থা রাখতে পারছেন না গ্রামবাসী। বিএনপি নেতা পাঁচবিবির কুশম্বা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফুর মণ্ডল, জামায়াত নেতা সদরের বন্ধু ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া ও আমদই ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হবে বলে জনসভায় ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জয়পুরহাটের জেলা পুলিশ সুপার হামিদুল আলম আমার দেশকে বলেছেন, নিরীহ বাসিন্দাদের বাড়িঘরে ফিরে আসার জন্য প্রতিটি থানায় মাইকিং করা হচ্ছে। তাদের কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না। তিনি বলেন, মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেয়েছি। কেউ যাতে টাকা লেনদেন না করে সেজন্য অনুরোধ জানিয়েছি। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
আওয়ামী হামলা ও পুলিশি হয়রানি এড়াতে সদর উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম, পাঁচবিবিতে অন্তত ৫০টি, কালাইয়ে ২৫টি, ক্ষেতলালে ১০টি গ্রামে পুরুষ বসবাস করছেন না। গত ৩ মার্চ সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় পাঁচবিবিতে। এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ৪২ মামলা দায়েরের পর থেকে উপজেলার বেশিরভাগ গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। উপজেলার প্রাণকেন্দ্র পাঁচমাথার অনেক মার্কেটের দোকান গতকালও খোলেনি। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, গ্রেফতার এড়াতে এসব দোকানি আত্মগোপনে রয়েছেন। এ উপজেলার কুশম্বা, ভাড়াহত, কাশড়া গোবিন্দপুর, ছোটো মানিক, ধুবইল, শালাইপুর, গোরনা, আরজী অনন্তপুর, রতনপুর, ধরঞ্জি, বাবিলা, ছাতিনালীসহ অন্যান্য গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামে অপরিচিত কেউ গেলে মহিলা ও শিশুরা ভয়ে সরে যাচ্ছে। তারা কোনো কথা বলতে রাজি নয়। পাঁচবিবি থানার ওসি (তদন্ত) নুর হোসেন আমার দেশ-কে বলেন, গ্রামবাসীকে বাড়ি ফেরার অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করা হয়েছে। নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হবে না। একইভাবে সদর উপজেলার আমদই, পুরানাপৈন ও বন্ধু ইউপির ২০টি গ্রামে পুরুষ নেই বললেই চলে। বিষয়টি স্বীকার করে সদর থানার ওসি খায়রুল বাশার জানান, পুরানাপৈল ও আমদই ইউনিয়নের অবস্থা বেশি খারাপ। এ দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। কালাই উপজেলার মাত্রাই, ভাউজাপাতার, বলিগ্রাম, অনিহার, শমসিরা, ছিলিমপুর, শালুকণাড়ী, শাইলগুন, রঘুনাথপুর, বালাখুর, বিয়ালা, শিবসমদ্র, বেজখণ্ড, গাড়ইল, সাঁতার, উলিপুর, ভেরেজী, বানদীঘি, ছত্রগ্রাম, হিমাইল, ইন্দাহার, পার্বতীপুরসহ কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের অন্তত ২৭টি গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
এদিকে আওয়ামী তাণ্ডব ও পুলিশি হয়রানি থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানি না করতে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিটি মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কাজ চলছে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় সভা-সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল্লায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সারারাত পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে।
সন্ত্রাসীদের কিংবা পুলিশের অন্যায় গ্রেফতার বাণিজ্য মোকাবেলায় গ্রামের মানুষরা যেভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে স্মরণকালে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের স্ত্রী। স্বামীকে হারিয়ে শহীদের স্ত্রী আজ প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, আমার স্বামী খুব ভালো লোক ছিলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, সাঈদী সাহেবের মুক্তির জন্য রক্তের বন্যা বয়ে গেল। আমার স্বামী রক্ত দিয়ে গোসল করল। স্থানীয় আলেমগণ তার সার্বিক দিক বিবেচনায় শহীদ হিসেবে তাকে গোছল ছাড়াই রক্তাক্ত জামাকাপড়সহ দাফন করেছেন।
জীবদ্দশায় তারা স্বামী স্ত্রী উভয়েই প্রায় ১০-১২ জনের কাছে বলেছেন, 'ক্যাম করে, কুঠায় গেলে শহীদ হওয়া যাবে? অবশেষে শুধু স্বামী একাই যখন যাছে আর কাছে ঘর থেকে দুয়ার পর্যন্ত ১০-১২ বার শাহাদাতের কথা বলেছে।' ২৭ বছরের বড় ছেলে হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম যার কোলে মাথা রেখে শহীদ হন হেছাব উদ্দীন, যিনি বাবার জানাজার নামাজ পড়িয়েছেন তার ছেলের নাম তাজিম। ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে দরিদ্রতার কারণে পড়তে পারেননি। ২৫ বছরের সেই জামিরুল ইসলাম যার সাড়ে ৩ বছরের ছেলে নাম জেম। সর্বশেষ বিদায়বেলায় যাদের কোলে নিয়ে চুমা খেয়ে গিয়েছিলেন তাদের প্রদ্ধেয় দাদা হেছাব উদ্দীন। সেই জেম প্রায় করুণ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে, 'আমার দাদু কই? আমিও গুলি খাব। মারা যাব। আবার বলে, পুলিশের চাকরিতে ধাব, যে আমার দাদুকে গুলি করেছে তাকে গুলি করব।' দাদাহারা এই কচি হৃদয়ের অভিশাণ আর ক্ষোভের দায় কে শোধ করেবে?
বড় দুলাভাই স্বপ্ন দেখে, এত সুন্দর পোশাক, এত সুন্দর লাগছে হাসি খুশি ভাল আছ। ঈদের মাঠের মতো লোক।
শহীদের বিয়াই। শহীদের বিয়াই বলেন, আমি তাকে বাড়িতে ঢাকতে গেলে তিনি বলেন কাজের লোক রেখেছি আজ আমি যাব না। পরে তাকে মিছিলে দেখলে তিনি বলেন, বাড়িতে থাকতে পারলাম না। তিনি মিছিলের সামনের কাতারে ছিলেন।
প্রতিবেশীর মতে। তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। খুব বেশি শিক্ষিত নন কিন্তু মানুষের অনেক উপকার করতেন। বিভিন্ন সময় মানুষ তার কাছে পরামর্শের জন্য আসতেন। তিনি না থাকার কারণে আজ মানুষ তার অনেক উপকার থেকে বঞ্চিত।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: হেছাব উদ্দীন মণ্ডল (০৩১), পেশা- কৃষক।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৬৩ সাল, ৫০ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৩.০৩.২০১৩, সকাল ১১টা শাহাদাতের তারিখ ও সময়: ০৩ মার্চ ২০১৩, সকাল ১১টা। স্থান। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি
উপজেলার পাঁচমাথা। দাফন করা হয়। নিজ এলাকার কবর স্থান।
স্থায়ী ঠিকানা। গ্রাম। দইবক নন্দনপুর, ডাকঘর। কোতোয়ালী বাগ, ইউনিয়ন। ধরনদি, খানা।
পাঁচবিবি, জেলা: জয়পুরহাট।
পিতা। মরহুম হাফিজ উদ্দীন মণ্ডল।
মাতা: মরহুম নুরুন বিবি।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা। কৃষিকাজ করতেন, চাষাবাদের জমি নাই।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ। নাম: ১ম ছেলে। হাফেজ মো: জাহাঙ্গীর আলম, বয়স-২৭, হাফেজী মাদ্রাসার শিক্ষক, ২য় ছেলে। মো: জামিরুল ইসলাম, বয়স-২৫, কৃষিকাজ, পড়াশুনা ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত, ১ম মেয়ে। মোছা: মনিরা (হাফেজা), বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, ২য় মেয়ে। মোছা। জেসমিন আজার, বিবাহিতা-স্বামী কৃষক। ভাই-বোনের বিবরণ। ৮ ভাই, ২ বোন।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍